Home বাঁধন রূপের অধিকারী বাঁধন রূপের অধিকারী পর্ব ২৪

বাঁধন রূপের অধিকারী পর্ব ২৪

বাঁধন রূপের অধিকারী পর্ব ২৪
সুমি চৌধুরী

আকাশের ক্লাস শেষ করে স্বভাবমতো আজও রূপা ছুটি নিয়ে বের হয়। তবে আজ সে একা না, বৃষ্টিও আছে। তার নাকি কলেজে আর একদম ভালো লাগছিল না, তাই রূপার দেখাদেখি সেও প্রিন্সিপালের কাছ থেকে ছুটি নিয়ে একসাথে চলে আসলো। রাস্তায় এসে রূপা বৃষ্টির মুখোমুখি দাঁড়িয়ে কপালে হালকা ভাঁজ ফেলে বলল,
—- “তুই তাহলে বাড়ি চলে যা। বাড়িতে যদি আমার কথা জিজ্ঞেস করে, তাহলে বলবি আমি এখনো ক্লাসেই আছি।”
বৃষ্টি নিজের ওড়নার কোণটা আঙুলে পেঁচাতে পেঁচাতে ঠোঁট উল্টে বলল,

—- “আমি একা একা বাসায় গিয়ে কী করব? চল, আজকে তোর সাথে আমিও ওই ডেলিভারির কাজটা করব। ‘না’ করবি না একদম। এই সুযোগে একটু ঘোরাও হবে, অনেক দিন ধরে কোথাও ঘুরতে যাই না।”
রূপা আর তাকে বারণ করার মতো কোনো জোর পেল না, মৃদু হেসে মাথা নাড়ল। অতঃপর দুজনে একটা ফাঁকা রিকশা ডেকে চেপে বসল এবং সরাসরি কেকের দোকানের সামনে চলে আসলো। দোকানের ভেতরে তখন ক্যাশ কাউন্টারে আনসার শেখ গম্ভীর মুখে বসেছিলেন। বৃষ্টি আর রূপা দুজনেই একসাথে ভেতরে এসে তাকে নিচু গলায় সালাম দিল,
—- “আসসালামু আলাইকুম, আঙ্কেল।”
আনসার শেখ চশমার ওপর দিয়ে তাকিয়ে নরম হেসে সালামের উত্তর নিলেন,
—- “ওয়ালাইকুম আসসালাম। এসেছো? আমি তোমার অপেক্ষাতেই ছিলাম মা।”
রূপা নিজের কাঁধের ব্যাগটা ঠিক করতে করতে বলল,
—- “আমি ভেতরে গিয়ে রেডি হয়ে আসছি আঙ্কেল, আপনি ততক্ষণ কেকগুলো একটু প্যাক করার ব্যবস্থা করেন।”
বলেই রূপা যেই না ভেতরের ঘরের দিকে পা বাড়াতে যাবে, ঠিক তখনই পেছন থেকে আনসার শেখ গলা উঁচিয়ে ডাক দিলেন,

—- “আচ্ছা, তুমি জানি কত টাকা চেয়েছিলা অগ্রিম হিসেবে?”
তাৎক্ষণিকভাবে রূপার পা দুটো মেঝের ওপর থমকে যায়, বুকের ভেতরটা যেন এক পলকের জন্য কেঁপে ওঠে। অতঃপর সে খুব ধীরে ঘাড় ঘুরিয়ে আনসার শেখের দিকে তাকিয়ে কাঁপা গলায় জবাব দেয়,
—- “এক লাখ দশ হাজার টাকা।”
কাউন্টারের ড্রয়ার থেকে একটা ভারী খাম বের করে আনসার শেখ রূপার খানিকটা কাছে এগিয়ে আসেন। নিজের গম্ভীর মুখে এক চিলতে ভরসার হাসি ফুটিয়ে রূপার কাঁপতে থাকা হাতের ওপর সাদা খামের প্যাকেটটা তুলে দিয়ে বলেন,
—- “এতদিন তোমার সততা আর কাজের প্রতি একাগ্রতা দেখে আমি খুব ভালো করেই বুঝেছি যে তুমি কাজে ফাঁকি দেওয়ার মতো মেয়ে নও। তাই তোমার ওপর আমার পুরো বিশ্বাস হয়েছে। নাও, এই খামের মধ্যে পুরো এক লাখ দশ হাজার টাকাই আছে।”
রূপার মনে হলো সে যেন আকাশের চাঁদ হাতে পেয়ে গেল। তার চোখের মণি দুটো খুশিতে চকচক করে ওঠে, গলার আওয়াজটা আটকে গিয়ে তোতলাতে তোতলাতে বলে,

—- “স-স-ত্যি বলছেন আঙ্কেল?”
আনসার শেখ ড্রয়ারটা আটকে মৃদু হেসে বলেন,
—- “হ্যাঁ, আর আজকে থেকে তোমার আর এই কড়া রোদের মধ্যে হেঁটে হেঁটে বা রিকশা দিয়ে ডেলিভারির কাজ করতে হবে না। বাইরে একটা স্কুটার রেখেছি, এখন থেকে ওইটা দিয়েই তুমি কেক ডেলিভারির কাজে যাতায়াত করবে।”
কথাটা শোনামাত্রই রূপা নিজের মাথাটা নিচু করে ফেলে, তার ফর্সা কপালে একরাশ চিন্তার ভাঁজ পড়ে, সে আমতা আমতা করে নিচু গলায় জবাব দেয়,
—- “কিন্তু আমি তো স্কুটার চালাতে জানি না আঙ্কেল। আর ওটায় চড়তেও আমার ভয় লাগে।”
রূপার এই দ্বিধা দেখে দ্রুত গতিতে এগিয়ে আসে বৃষ্টি। সে রূপার কাঁধের ওপর নিজের হাত দিয়ে ভর রেখে বেশ চওড়া একটা হাসি দিয়ে দাঁড়িয়ে বলে,
—- “নো টেনশন। আমি তো পারি, একদম পানির মতো শিখিয়ে দেবো তোকে।”
রূপা নিজের নিচের ঠোঁটটা হালকা কামড়ে ধরে বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে ওড়নাটা খামচে ধরে বলে,
—- “কিন্তু আমার ভীষণ ভয় লাগে রে?”
বৃষ্টি রূপার দুই গালে মৃদু টোকা দিয়ে আশ্বস্ত করার সুরে বলল,

—- “আমি আছি তো সাথে। একবার হ্যান্ডেল ধরা শিখে গেলে আর একটুও ভয় পাবি না।”
দুজনের এই কাণ্ড দেখে আনসার শেখ চশমাটা নাকের ওপর ঠিক করে গম্ভীর মুখে বলেন,
—- “আজকে তোমাদের ছুটি, কোনো কাজ করতে হবে না। আজ নতুন কোনো কেকের অর্ডার নেই।”
আজকের দিনে আর কোনো কাজ নেই শুনে বৃষ্টি তো খুশিতে প্রায় নেচেই ওঠে। সে দুই হাত নেড়ে আহ্লাদী গলায় বলল,
—- “তাহলে তো খুব ভালো। অনেক মজা হবে আজকে, আমরা অনেক ঘুরবো। আঙ্কেল, আপনি যদি কিছু মনে না করেন, তাহলে স্কুটারটা কি আমরা আজকে একটু নিতে পারি? কথা দিচ্ছি সময়মতো একদম ঠিকঠাক ফিরিয়ে দিয়ে যাবো।”
আনসার শেখ আর কোনো কথা বাড়িয়ে সময় নষ্ট করলেন না। তিনি চুপচাপ কাউন্টার এর ভেতরের ড্রয়ার থেকে স্কুটারের চাবিটা বের করে এনে বৃষ্টির বাড়িয়ে দেওয়া হাতের তালুর ওপর রেখে মুচকি হেসে বলেন,
—- “এই নাও চাবি। যতক্ষণ ইচ্ছে ঘুরতে পারো তোমরা, সাবধানে চালিও।”
বৃষ্টি খুশিতে চাবিটা নিয়ে হাসতে হাসতে রূপার হাত টেনে ধরে দোকানের বাইরে চলে আসে। সে ডানে-বামে, আশেপাশে তাকিয়ে স্কুটারটা খুঁজতে থাকে। দোকানের ঠিক একটুখানি সামনেই একটা চকচকে স্কুটার পার্ক করা দেখে বৃষ্টি এক ছুটে সেটার কাছে চলে যায়। স্কুটারটা স্টার্ট না দিয়েই ঠেলে রূপার সামনে এনে বেশ জাঁকজমক গলায় বলে,

—- “উঠ।”
রূপা নিজের দুই হাত বুকের কাছে গুটিয়ে নিয়ে ভয়ে পিছিয়ে গিয়ে বলে,
—- “আমার বড্ড ভয় লাগছে রে, আমি একদম পারব না। চল না, আমরা আজ হেঁটেই যাই।”
বৃষ্টি স্কুটারের হ্যান্ডেলটা শক্ত করে ধরে চোখ বড় বড় করে বলে,
—- “আরে পাগলি। কিচ্ছু হবে না। তুই শুধু সিটে ওঠ আর আমাকে পেছন থেকে একদম শক্ত করে জড়িয়ে ধরে থাকবি। তারপর দেখিস তোর ভয় লাগে কিনা।”
রূপা নিজের মাথাটা ডানে-বামে নেড়ে কাঁদো কাঁদো গলায় বলে,
—- “তবুও আমি পারব না রে। আমার কেন জানি মনে হচ্ছে আমি ওটায় উঠলেই নিশ্চিত ধপাস করে নিচে পড়ে যাবো।”
বৃষ্টি এবার বেশ বিরক্ত হওয়ার ভান করে রূপার কোনো ওজর-আপত্তি না শুনে জোর করেই টেনে তাকে স্কুটারের পেছনের সিটে বসিয়ে দিল। অতঃপর নিজে সামনের সিটে জাঁকিয়ে বসে চাবিটা লকের ভেতর ঢুকিয়ে খটাস করে বলল,

—- “আমাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধর। ভয় পাস না কিচ্ছু হবে না”
রূপা নিজের কাঁপা কাঁপা দুটো হাত বাড়িয়ে বৃষ্টিকে পেছন থেকে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ধরে। ভয়ের চোটে তার ভেতরের আত্মাটা যেন থরথর করে কাঁপছে। বৃষ্টি নিজের সবটুকু ট্যালেন্ট খাটিয়ে চাবিটা ঘুরিয়ে এক সেলফেই বাইকটা স্টার্ট দিল, অতঃপর্যাক্সিলারেটর ঘুরিয়ে মসৃণভাবে রাস্তায় চালাতে শুরু করল। রূপা আতঙ্কে নিজের চোখ জোড়া শক্ত করে বন্ধ করে ফেলে দুই হাত দিয়ে জামা খামচে ধরে বৃষ্টিকে আরও জোরে চেপে ধরে। অন্য দিকে বৃষ্টি মুখ চওড়া করে হাসতে হাসতে বেশ ফুরফুরে মেজাজে স্কুটার চালাচ্ছে। এই জিনিস চালানো তার কাছে একদমই নতুন কিছু না, বৃষ্টি আগে থেকেই বাইক, স্কুটার এবং বড় প্রাইভেট কার গাড়ি খুব নিখুঁতভাবে চালাতে জানে। এসব জিনিস অনেক আগেই তার খুব ভালো করে শেখা হয়ে গেছে। আর এই সবকিছু তাকে হাতে-কলমে শিখিয়েছে তার আপন কাকাতো ভাই আবিদ, যে বর্তমানে ইতালিতে আছে। আবিদ মূলত ইতালিরই নাগরিক, কারণ শুরু থেকেই বৃষ্টির কাকা আর কাকি ইতালিতে স্থায়ীভাবে বসবাস করেন। আবিদ যখনই বাংলাদেশে বেড়াতে আসতো, তখনই সময় পেলেই বাইক আর গাড়ি চালানো শেখাতো বৃষ্টিকে। ভাইয়ের সেই কড়া ট্রেনিংয়ে ধীরে ধীরে বৃষ্টি সত্যিই সত্যি এসব জিনিস খুব দারুণভাবে চালানো শিখে যায়।বৃষ্টি মুখ চওড়া করে হাসতে হাসতে গ্লাসে রূপার ভয়ার্ত চেহারাটা দেখে বেশ মজা নিয়ে বলে,

—- “এখনো কি তোর ভয় লাগছে রে?”
রূপা খুব ধীরে ধীরে নিজের বন্ধ চোখের পাতা দুটো মেলে তাকায়। সে ডানে-বামে, আশেপাশে তাকায়। রাস্তায় কত শত গাড়ি নিজেদের মতো চলাচল করছে, আর সেই সব ট্রাফিকের মাঝখান দিয়ে তাদের স্কুটারটাও কী সুন্দর বাতাস কেটে কেটে মসৃণভাবে এগিয়ে যাচ্ছে। এক মুহূর্তের মধ্যে রূপার মনের সব ভয় যেন কর্পূরের মতো উবে যায়, এক অদ্ভুত, অচেনা ভালো লাগা আর স্বাধীনতার অনুভূতি তার বুকের ভেতর কাজ করতে শুরু করে। সে নিজের ঠোঁটের কোণে এক চিলতে বাঁধনহারা হাসি ফুটিয়ে অজান্তেই বৃষ্টিকে ছেড়ে দিয়ে নিজের দুই হাত পাখির ডানার মতো দুই পাশে মেলে দেয়। চারপাশের হাওয়া এসে তার চুলে আর ওড়নায় দোলা দিয়ে যায়। বৃষ্টি লুকিং গ্লাসে রূপার এই উড়ন্ত অবস্থা দেখে মুচকি হেসে বলল,
—- “কী? আমি তোকে বললাম না যে একবার উঠলে একটুও ভয় পাবি না। দেখলি তো? তুই যদি কখনো কোনো গাড়িতে উঠে আসল রোমাঞ্চ আর আনন্দ চাস, তাহলে সেই চরম আনন্দ শুধু এই দুই চাকার বাইকেই সম্ভব। বাইকে চড়ার যে কী স্বাধীনতা আর আনন্দ, সেটা আর অন্য কোনো চার চাকার বন্ধ গাড়িতে কখনোই নেই।”
রূপা চোখ বন্ধ করে মৃদু স্বরে বলে,

—- “তুই ঠিক বলেছিস, অনেক ভালো লাগছে। এই প্রথম আমি কোনো গাড়িতে উঠে এত ফিল পাচ্ছি।”
বাতাসে রূপার চুলগুলো উড়ছে, ঠোঁটের কোণে লেগে আছে এক চিলতে প্রশান্তি। দুজনে অনেকক্ষণ ঘোরে। অতঃপর বৃষ্টি স্কুটার থামায় রায়ান্স কম্পিউটার্স দোকানের সামনে। বড় আর চকচকে দোকানটা দেখে রূপা ভ্রু কুঁচকে কপালে হালকা ভাঁজ ফেলে বলে,
—- “এখানে কেন আসলি?”
বৃষ্টি স্কুটার থেকে নেমে চাবিটা হাতে নিয়ে চটপটে গলায় বলে,
—- “কেন, ল্যাপটপ কিনবি না?”
মুহূর্তে মনে পড়ে রূপার। তার তো ল্যাপটপ কেনার কথা। চলে গেছে, আর সে কিনা ভুলেই গেছে। অপরাধবোধে রূপার ফর্সা মুখটা হঠাৎ থমকে যায়, চোখের মণি দুটো স্থির হয়ে আসে। সে তাড়াতাড়ি গাড়ি থেকে নেমে চোখ-মুখ শক্ত করে বলে,
—- “ভুলেই গিয়েছিলাম, চল চল।”

দুজনেই একতলার শোরুমে প্রবেশ করে। অতঃপর কাউন্টারের লোকের সাথে গম্ভীর মুখে অনেক দামাদামি করে EliteBook 840 অবশেষে ল্যাপটপটা কিনেই ফেলে।কেনা শেষে দুজনে বাইরে আসে। ল্যাপটপের বক্সটা শক্ত করে ধরে রাখতে গিয়ে রূপার হাত দুটো হালকা কাঁপছে। অপমানের জবাব দেওয়ার স্বস্তিতে তার চোখ জোড়া টলমল করে ওঠে, খুশিতে সে যেন এখনই কেঁদে দেবে এমন অবস্থা। বৃষ্টি রূপার মুখের সেই আবেগ দেখে চওড়া হেসে উল্লাসে বলে,
—- “অবশেষে তুই তোর কথা রাখলি, এক সপ্তাহের মধ্যে তাহলে তুই ল্যাপটপটা দিয়েই দিলি ভাইয়াকে?”
রূপা ল্যাপটপের বক্সটা বুকের সাথে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরে হালকা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে,
—- “কী করব বল, অন্যের জিনিস ভাঙার এই অপবাদের দায় নিয়ে আমি সত্যি আর একটা মুহূর্তও চলতে পারছি না।”

অপমানের ক্ষোভ আর ল্যাপটপ কিনতে পারার স্বস্তি দুটোই এক সাথে তার গলার স্বরে ফুটে ওঠে। বৃষ্টি আলতো হেসে স্কুটারে উঠে বসে তাড়া দেওয়ার ভঙ্গিতে বলে,
—- “হুম, খুব ভালো করেই বুঝেছি তোর মনের অবস্থা। এখন ওঠ।”
রূপা স্কুটারের পেছনে শক্ত হয়ে বসে, বৃষ্টিও সাথে সাথে এক্সিলারেটর ঘুরিয়ে গাড়ি চালানো শুরু করে। কিন্তু কিছুদূর যেতেই হুট করে মাঝরাস্তায় ধুলো উড়িয়ে সাঁ সাঁ করে ঠান্ডা বাতাস চলা শুরু করে। চোখের পলকে চারপাশের নীল আকাশটা কালো মেঘে অন্ধকার হতে থাকে। গাছপালার পাতারা মাতাল হয়ে দুলছে দেখে দুজনেই খুব ভালো করে বুঝে যায়, যেকোনো মুহূর্তে এবার ঝুমঝুমিয়ে বৃষ্টি নামবে।ভিজে যাওয়ার ভয়ে বৃষ্টি আর এক সেকেন্ডও দেরি করে না। সে তাড়াতাড়ি স্কুটার চালিয়ে সোজা সাকিন ভাইয়ের ফুলের দোকানের সামনে এসে ব্রেক কষে দাঁড়ায়। গাড়ি থামার মুহূর্তে লাফিয়ে নেমে পড়ে বৃষ্টি, রূপাও বক্সটা আগলে তার পিছু পিছু দৌড়ায়। দুজনে হন্তদন্ত হয়ে দৌড়ে দোকানে ঢুকে পড়ে। হঠাৎ তাদের এভাবে হাঁপাতে হাঁপাতে ঢুকতে দেখে কাউন্টার থেকে সাকিন মুখ তুলে তাকায়। দুজনকে একসাথে দেখে সে বেশ অবাক আর খুশি হয়ে বলে,

—- “আরে তোমরা। কী খবর, কেমন আছো দুজনে?”
রূপা আর বৃষ্টি এতক্ষণের দৌড়ঝাঁপের ক্লান্তি ভুলে সাকিন ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে মিষ্টি করে হেসেই উত্তর দেয়,
—- “খুব ভালো আছি ভাইয়া। আপনি কেমন আছেন?”
সাকিন একটা মলিন হেসে মাথা নেড়ে বলে,
—- “এই তো ভাই, আছি কোনো রকম দিন কেটে যাচ্ছে।”
বাইরে তখন মেঘের ডাক আরও গম্ভীর হচ্ছে। বৃষ্টি আকাশের দিকে একবার তাকিয়ে সাকিনের দিকে ঘুরে বেশ চতুর একটা মুচকি হেসে বলে,
—- “ভাইয়া, আজ তো যে হারে মেঘ ডাকছে, নিশ্চিত বৃষ্টি নামবে। এমন আবহাওয়ায় মনে হয় না আজ আর তেমন ফুল বিক্রি করা যাবে। তার চেয়ে বরং আজ রূপাকে ছুটি দিয়ে দেন না?”
সাকিন হাহা করে হেসে উঠে বেশ আন্তরিক গলায় বলল,

—- “আরে, ছুটি দেওয়ার জন্য আবার বলার কী আছে। তা ছাড়া আজ পাইকারি বাজার থেকে কোনো ফুলই আসেনি দোকানে। আমি নিজেই সকালের আকাশের এই গুমোট অবস্থা দেখে ফুল আনতে নিষেধ করে দিয়েছি, যদি বৃষ্টি এসে সব ফুল নষ্ট করে দেয়, এই আশঙ্কায়। ঠিক তাই হলো দেখ, যেমন ভেবেছিলাম ঠিক তেমনই বৃষ্টি নেমে আসলো।”
সাকিন ভাইয়ের কথা শেষ হতেই রূপার ঠোঁটের কোণে একটা দুষ্টুমি ভরা হাসি খেলে যায়। সে কী মনে করে জানি বৃষ্টির একদম গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে, তার কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিসিয়ে টিপ্পনী কাটার সুরে বলে,
—- “একটা কথা বলি বেস্টি? খবরদার, রাগ করিস না কিন্তু। আজ কেমন জানি তুই আর আকাশ ভাইয়া এই দুইটা শব্দই প্রকৃতির সাথে বেশি বেশি মিলছে রে। এই দেখ, প্রকৃতির আকাশটা যেমন ভালো নেই আর মনে হচ্ছে বৃষ্টি আসবে, তার মানে ঠিক তেমনই আমাদের আকাশ ভাইয়ের মনটাও আজ একদম ভালো নেই, তুই এসেছিস বলেই বোধহয় বৃষ্টি হয়ে তাঁর মনটা এবার ভালো করে দিবি।”
বৃষ্টি চোখ পাকিয়ে তাকায়, রূপা খিলখিল করে হেসে ফেলে। তাদের এই খুনসুটির মাঝেই বাইরে ততক্ষণে ঝুমঝুমিয়ে বৃষ্টি নেমে পড়েছে। চারপাশের ধুলোবালি ধুয়ে দিয়ে আকাশ ভেঙে জল পড়ছে। হুট করে এই বৃষ্টি দেখে বৃষ্টির নিজের খুব ভেজার শখ হলো। সে রূপার দিকে জলভরা চোখ দুটো বড় বড় করে তাকিয়ে বলে,

—- “রূপা চল ভিজি, ভালো লাগছে না এভাবে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকতে।”
রূপা বাইরে বৃষ্টির ছাঁটের দিকে তাকিয়ে একটু ইতস্তত করে বলে,
—- “আমার বৃষ্টিতে ভিজলে যে জ্বর আসে রে।”
বৃষ্টি তা শুনে মোটেও দমল না, সে রূপার হাতটা শক্ত করে টেনে ধরে আবদারের সুরে বলে,
—- “ধুর, একদিন জ্বর আসলে কিচ্ছু হবে না, চল তো।”
অতঃপর ল্যাপটপের দামী বাক্সটা সাকিন ভাইয়ের দোকানে সাবধানে রেখে, দুজনেই এক লাফে নেমে পড়ে রাস্তার ধারে। ছাঁট এসে লাগছে ওদের মুখে-চোখে। হাঁটতে হাঁটতে দুজনে একসময় একেবারে ফাঁকা একটা রাস্তায় চলে আসে, যেখানে কোনো মানুষের কোলাহল নেই। দেখতে দেখতে দুজনেই ভিজে একদম একাকার হয়ে যায়। ঠিক সেই মুহূর্তে তারা যেন এই শীতল বৃষ্টির ছোঁয়া পেয়ে বর্তমানের সব জটিল স্মৃতি, অপমান আর কষ্ট এক নিমেষে ভুলে ডুব দেয় হারিয়ে যাওয়া ছোটবেলার সোনালী স্মৃতিতে। কোনো এক জাদুবলে তারা যেন ফিরে গেছে সেই অতীতে। দুজনেই দুই কাঁধের স্কুল ব্যাগটা শক্ত করে ধরে একদম ছোট বাচ্চাদের মতো মনের আনন্দে রাস্তায় লাফাতে শুরু করে। রূপা পা দিয়ে বৃষ্টির জমা জল ছিটিয়ে দেয় বৃষ্টির গায়ে, বৃষ্টিও খিলখিল করে হেসে পাল্টা পায়ের ছিটায় রূপাকে ভিজিয়ে দেয়। একপর্যায়ে দুজনে একে অপরের হাত শক্ত করে ধরে গোল হয়ে চড়কির মতো মনের সুখে ঘুরতে থাকে। মাথা ওপরের দিকে তুলে বৃষ্টির জল সরাসরি মুখে মাখে। সেই ঘোর লাগা মুহূর্তটুকু শেষ হতেই তারা নিজেদের কাঁধের ব্যাগটা বারবার আকাশের দিকে উঁচুতে ছুঁড়ে মেরে আবার লুফে নেয়, যেন ক্যাচ ধরার কোনো মহা প্রতিযোগিতা চলছে। এক কথায়, বর্তমানের সব বড় বেলার দায়-দায়িত্ব ভুলে দুজনে পুরোপুরি ডুবে গেছে এক নিষ্পাপ কিশোরী জগতে।হাঁটতে হাঁটতে দুজনে হুট করে একটা তিনতলা বাসার সামনে নিচু এক লিচু গাছ দেখতে পায়। গাছের ডালে ডালে থোকায় থোকায় লাল লাল লিচু ঝুলে আছে। বৃষ্টি চট করে আশেপাশে তাকিয়ে দেখে কোনো মানুষজন কোথাও নেই, চারদিকে শুধু ঝুমঝুমিয়ে বৃষ্টি পড়ছে। সে রূপার দিকে তাকিয়ে চোখের ইশারায় চটুল গলায় বলে,

—- “ওই দেখ। লিচুগুলো কেমন রসালো হয়ে আমাদের দিকেই তাকিয়ে আছে।”
বৃষ্টির কথায় রূপা চট করে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায়। সবুজ পাতার ফাঁকে ওই বড় বড় পাকা টকটকে লিচু দেখে রূপার জিভে জল আসার মতো অবস্থা। সে আর লোভ সামলাতে না পেরে উত্তেজিত গলায় বলে,
—- “তাহলে চল, আর দেরি কিসের।”
দুজনে মিলে পা টিপে টিপে এগিয়ে আসে। তারপর এক সাথে লাফিয়ে উঠে লিচু গাছের একটা নিচু ডাল শক্ত করে ধরে ফেলে। রূপা দুই হাতে ডালটা টেনে ধরে রাখে, আর বৃষ্টি ঝটপট একটা পর একটা লিচু ছিঁড়তে থাকে। রূপাও ডাল ধরে রেখেই এক হাত বাড়িয়ে কয়েকটা লিচু ছিঁড়ে নেয়। ঠিক তখনই হুট করে ওপর থেকে বৃষ্টির মাথার ওপর একটা কলার খোসা এসে পড়ে। বৃষ্টি চরম চমকে উঠে ওপরে তাকায়। দেখে, সেই বাসার দোতলার জানালাটা হা হয়ে খোলা, আর জানালার ওপাশে একটা বারো বছর বয়সী ছেলে দাঁড়িয়ে অবাক চোখে নিচে তাদের এই লিচু চুরির কাণ্ডই দেখছে। ছেলেটার সাথে চোখাচোখি হতেই বৃষ্টি লিচু খামছে এক উল্টো দৌড় মারতে মারতে চিৎকার করে বলে,

—- “সর্বনাশ রূপা ভাগ। দেখে ফেলছে রে।”
বৃষ্টির কথা শুনে রূপার কলিজা তো ভয়ে শুকিয়ে কাঠ। সে এক ঝটকায় হাতের ডাল ছেড়ে দিয়ে বৃষ্টির পেছন পেছন অন্ধের মতো দৌড় লাগায়। দুজনে একনাগাড়ে দৌড়াতে দৌড়াতে অনেক দূরে, একটা নিরাপদ জায়গায় এসে থামে। বুকটা ধড়ফড় করছে, দুজনেই হাঁপাতে হাঁপাতে দম নিচ্ছে। রূপা হাতের লিচুর খোসা ছাড়িয়ে মুখে পুরে চিবুতে চিবুতে একটু চিন্তিত গলায় বলে,
—- “কপালে আজকে নিশ্চিত দুঃখ আছে, বুঝছি।”
বৃষ্টিও হাত থেকে একটা লিচু মুখে দিয়ে বেশ তারিয়ে তারিয়ে খেতে খেতে হেসে বলে,
—- “রাখ তোর দুঃখ। এমন রঙিন মুহূর্ত জীবনে খুব কম সময়েই আসে রে। খেলাম না হয় দু-একটা বকুনি, কিন্তু আজকের দিনটা আজীবন স্মরণীয় হয়ে থাকবে।”

দুজনে অনেকক্ষণ ধরে বৃষ্টিতে ভেজে। অতঃপর দুপুর তিনটার দিকে সাকিনের দোকান থেকে ল্যাপটপ আর স্কুটারটা নিয়ে তারা রওনা দেয়। আসার পথে আনসার শেখের দোকানে স্কুটারটা জমা দিয়ে দুজনে একটা রিকশা নিয়ে অবশেষে বাসায় ফিরে আসে।
কলিংবেল টিপতেই দরজা খোলেন রজনী রহমান। দুজনকে ওভাবে আধভেজা অবস্থায় দেখে তিনি বেশ অবাক হয়ে ভ্রু কুঁচকে বলেন,
—- “দুজনেই এভাবে ভেজা কেন?”
বৃষ্টি অপরাধীর মতো মাথা নিচু করে একটু আমতা আমতা করে বলে,
—- “ইয়ে মানে আন্টি আসলে অনেক দিন ধরে বৃষ্টিতে ভিজি না তো, তাই আজ একটু ইচ্ছে করেই ভিজেছি।”
রজনী রহমান এবার রূপার দিকে কড়া চোখে তাকিয়ে ক্ষুব্ধ স্বরে বলেন,

—- “বৃষ্টি ভিজেছে বুঝলাম, কিন্তু তোর বৃষ্টিতে ভিজলে যে জ্বর আসে সেটা কি জানিস না? তারপরও বৃষ্টিতে ভিজছিস কোন সাহসে?”
রূপা মায়ের চোখের দিকে না তাকিয়ে মাথা নিচু রেখেই একরোখা গলায় জবাব দিল,
—- “মন চেয়েছে, ভিজেছি।”
মেয়ের এমন দায়সারা উত্তর শুনে রজনী রহমান আরও রেগে যান। তিনি গলার আওয়াজ চড়িয়ে বলেন,
—- “মন চেয়েছে বলেই ভিজে নিবি? এখন যদি জ্বর আসে, তখন কী হবে?”
রূপা এবার একটু চড়া সুরে পাল্টা বলল,
—- “আসলে আসুক, সেটা নিয়ে তোমার ভাবতে হবে না।”
হুট করে মেয়ের মুখে এভাবে মুখের ওপর জবাব শুনে রজনী রহমান নিজের রাগ আর ধরে রাখতে পারলেন না। রাগে তাঁর শরীর কাঁপতে থাকে। তিনি ক্ষিপ্ত হয়ে সজোরে একটা থাপ্পড় বসিয়ে দেন রূপার গালে। ঠাস করে একটা শব্দ হতেই পুরো ড্রয়িংরুমটা থমথমে হয়ে যায়।
—- “সাহস কত বড়। মায়ের মুখের ওপর দাঁড়িয়ে তর্ক করিস।”

রূপা আর একটা কথাও বাড়াল না। চোখ দুটো পানিতে টলমল করে উঠলেও সে চুপচাপ মাথা নিচু করে নিজের গালে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। কিন্তু রজনী রহমান এতেও শান্ত হচ্ছেন না, তিনি একটার পর একটা কটু কথা বলেই যাচ্ছেন। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা বৃষ্টি তখন রাগে অপমানে গজগজ করছে। রজনী রহমানের ওপর তার প্রচণ্ড রাগ লাগছে। এক ফোঁটা বৃষ্টিতে ভিজেছেই তো, তা নিয়ে একটা মেয়ের ওপর এভাবে হাত তোলার আর এত রাগ দেখানোর কোনো মানে হয়? কিন্তু বড়দের মাঝে সে তো বাইরের মানুষ, তাই মুখ ফুটে কিচ্ছু বলতে পারছে না। আজ বাড়ির পুরুষের মধ্যে কেউ-ই এই মুহূর্তে উপস্থিত নেই। আহসান রহমান আর আতিক রহমান দুজনেই অফিসে। হাজি রহমান সকালে একটু গ্রামের বাড়িতে গিয়েছেন, আকাশও বাইরে, আর বাঁধন তো তার নিজের ডিউটিতে ব্যস্ত। বাড়িতে কোনো পুরুষ মানুষ নেই বলেই রজনী রহমান আজ সুযোগ পেয়ে যা ইচ্ছে তাই রূপাকে বলে যাচ্ছেন। নয়তো আহসান রহমান বা অন্য কোনো পুরুষ মানুষ বাসায় থাকলে রূপাকে এভাবে একটা কড়া কথা বলার সাহসও তিনি পেয়েতেন না।ঠিক সেই মুহূর্তে বাইকের চাবি আঙুলে ঘোরাতে ঘোরাতে বাড়িতে প্রবেশ করে আকাশ। কানে ব্লুটুথ গোঁজা, কোনো কিছু একটা শুনছে আর ঠোঁটের কোণে মুচকি হাসছে। কিন্তু হলরুমে পা রাখতেই রূপা আর বৃষ্টিকে ওভাবে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তার পায়ের গতি কমে যায়। রজনী রহমান তখনো রূপাকে একনাগাড়ে বকে যাচ্ছেন। পুরো দৃশ্যটা দেখে আকাশ এগিয়ে এসে নরম কিন্তু গম্ভীর গলায় বলে,

—- “কী হয়েছে চাচি? এভাবে ওকে বকছ কেন?”
আকাশের আকস্মিক কণ্ঠস্বরে বৃষ্টি ভেতর থেকে কেঁপে ওঠে। সে চমকে মাথা উঁচু করে একপলক আকাশের দিকে তাকায়, পরক্ষণেই আবার চোখ নামিয়ে নেয়। রজনী রহমান আকাশের দিকে তাকিয়ে ক্ষোভের সুরে বলেন,
—- “আর বোলো না। মেয়েটাকে কত করে বলেছি কখনো বৃষ্টিতে ভিজবি না, ভিজবি না। কারণ ওর বৃষ্টিতে ভিজলেই তো জ্বর আসে। আর আজ সেই দেখো, দুজনে বৃষ্টিতে ভিজে কী এক অবস্থা করে বাড়ি ফিরে এসেছে।”
আকাশ এবার রূপা আর বৃষ্টি দুজনের দিকেই খুব ভালো করে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে তাকায়। সাদা কলেজ ড্রেসটা বৃষ্টির জলে আবছা আবছা ভিজে শরীরের সাথে লেপ্টে আছে, চুলগুলোও কিছুটা ভেজা। চারদিকের পরিস্থিতি আর ওদের অবয়ব দেখে আকাশের মনে খটকা লাগে। সে চোখ দুটো ছোট করে, ভ্রু কুঁচকে রূপার দিকে তাকিয়ে সরাসরি প্রশ্ন করে,

—- “তোরা কি সত্যি কলেজ থেকে আসলি?”
হুট করে আকাশের এমন তীক্ষ্ণ আর সরাসরি প্রশ্নে রূপা আর বৃষ্টি দুজনেই ভেতরে ভেতরে চরম চমকে যায়। তাদের বুকের ধড়ফড়ানি বেড়ে যায়, দুজনে কেউই তাৎক্ষণিক কোনো উত্তর খুঁজে পায় না। হলরুমের নীরবতা দেখে আকাশ এবার একটু চড়া সুরে ধমক দিয়ে বলে,
—- “কানে শুনতে পাচ্ছিস না কী বলছি? উত্তর দে।”
আকাশের ধমকে রূপা ভয় পেয়ে যায়। সে কাঁপতে কাঁপতে কোনোমতে মুখ খুলে বলে,
—- “জি জি ভাইয়া, কলেজ থেকেই এসেছি।”
আকাশের চোখ দুটো তখনো ওদের ওপর স্থির। সে আর কথা না বাড়িয়ে আদেশের সুরে বলে,
—- “দশ মিনিটের মধ্যে দুজনে রুমে গিয়ে ফ্রেশ হবি, তারপর সোজা আমার রুমে আসবি।”
কথাটা বলেই সে রজনী রহমানের দিকে তাকিয়ে সুর নরম করে বলে,
—- “চাচি, তুমি আর কিছু বোলো না। ওদের এখন রুমে যেতে দাও।”
বলেই আকাশ নিজের ঘরের দিকে চলে যায়। রজনী রহমানও আর একটা কথাও না বাড়িয়ে মুখ ভার করে নিজের ঘরে চলে যান। চারপাশ ফাঁকা হতেই বৃষ্টি আর রূপা দুজনেই প্রায় দৌড়ে নিজেদের রুমে চলে আসে। ঘরের দরজাটা আটকে দিয়ে বৃষ্টি নিজের দুই কান ধরে রূপার দিকে অপরাধী চোখে তাকায়। অত্যন্ত অনুতপ্ত গলায় সে বলে,

—- “আই অ্যাম সো সরি বেস্টি। একদম কান ধরছি, আমার কারণেই তোকে বকা আর মারটা খেতে হলো।”
রূপা খিলখিল করে হেসে ফেলে।
—- “ওলে আমার লক্ষ্মী বান্ধবী রে। তখন রাস্তায় নিজেই বললি দু-একটা বকা খাওয়াই যায়, আর এখন নিজেই বকা খেয়ে সরি বলছিস? শালী আস্ত একটা হাঁদারাম।”
বৃষ্টি নিজের ভুল বুঝতে পেরে মাথা চুলকাতে চুলকাতে হেসে ফেলে। পরক্ষণেই তার মাথায় চট করে আসে যে আকাশ ওদের দুজনকে ফ্রেশ হয়ে তাঁর রুমে যেতে বলেছে। সে রূপার দিকে তাকিয়ে বেশ চিন্তিত গলায় বলে,
—- “আচ্ছা, আকাশ স্যার হঠাৎ আমাদের রুমে কেন যেতে বলল রে?”
রূপা কপালে হালকা ভাঁজ ফেলে বেশ চিন্তিত সুরে বলে,
—- “সেটা তো আমিও বুঝতে পারছি না রে।”
—- “এই রে। জেনে গেছে নাকি যে আমরা আজ কলেজ থেকে ফিরিনি?”
—- “আল্লাহই জানে কী হয়েছে।”

—- “আচ্ছা, যা হবার তা হবে। এখন চল তো, আগে শাওয়ারটা নিয়ে নিই, শরীরটা কেমন ঘিনঘিন করছে।”
অতঃপর দুজনে একসাথে ওয়াশরুমে গিয়ে ঝটপট শাওয়ার নিয়ে নেয়। আলমারি থেকে বের করে দুজনে একই ডিজাইনের গোলাপি রঙের ঢিলেঢালা টি-শার্ট আর ট্রাউজার পরে ফেলে। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ভেজা চুলগুলো ভালো করে শুকিয়ে দুটো সাদা হেয়ারব্যান্ড দিয়ে সুন্দর করে বেঁধে নেয়। রূপা বিছানা থেকে তার আদরের ক্যান্ডিকে কোলে তুলে নেয়। আকাশের রুমে যাওয়ার উদ্দেশ্যে বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে বলে,
—- “চল এখন, গিয়ে দেখি কী মহাশাস্তি বা বাণী অপেক্ষা করছে আমাদের জন্য।”
বৃষ্টি নিজের দুই হাত কচলাতে কচলাতে বেশ ভয় পাওয়া গলায় বলে,
—- “আমার না সত্যি কেমন জানি একটা ভয় ভয় লাগছে রে রূপা।”
রূপা অভয় দেওয়ার ভঙ্গিতে বলে,
—- “আরে চল তো, আগে যাই। নাহলে ওখানে যেতে দেরি হলে ভাইয়া আরও বেশি রেগে যাবে।”
দুজনে ধীরে ধীরে গুটিগুটি পায়ে আকাশের রুমের দরজার সামনে এসে দাঁড়ায়। রূপা দরজায় আলতো করে নক দিয়ে নিচু স্বরে বলে,

—- “ভাইয়া, আসব?”
ভেতর থেকে আকাশের সেই চেনা গম্ভীর কণ্ঠস্বর ভেসে আসে,
—- “আয়।”
দুজনে আস্তে করে দরজা ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করে। রুমে ঢুকে দেখে আকাশ নিজের টি-শার্ট আর ট্রাউজার পরে সোফায় বেশ আরাম করে পায়ের ওপর পা তুলে বসে আছে, আর কোলে রাখা ল্যাপটপে মনোযোগ দিয়ে কিছু একটা করছে। রূপা আর বৃষ্টি দুজনে একদম জড়োসড়ো হয়ে আকাশের সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। রূপা সাহসে ভর করে আমতা আমতা করে বলে,
—- “কিসের জন্য জানি ডেকেছিলে ভাইয়া?”
আকাশ এবার কোলে থাকা ল্যাপটপটা এক ঝটকায় ওদের দিকে ঘুরিয়ে একদম সামনে ধরে শক্ত গলায় বলে,

—- “ভালো করে দেখ তো, এই দুজনকে তোরা চিনিস কিনা?”
দুজনে একসাথে ল্যাপটপের স্ক্রিনের দিকে তাকায়। স্ক্রিনে দৃশ্যটা দেখামাত্রই মুহূর্তে ওদের পায়ের তলা থেকে যেন মাটি সরে গেল। কারণ ল্যাপটপের সিসিটিভি ফুটেজে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে—রূপা আর বৃষ্টি কলেজের মূল গেট দিয়ে বাইরে বেরিয়ে যাচ্ছে। রূপা আর বৃষ্টি ভয়ে ফ্যাকাশে মুখে একে অপরের দিকে তাকায়, দুজনেরই বুকের ভেতর তখন দুরুদুরু কাঁপন। আকাশ কোল থেকে ল্যাপটপটা পাশে রেখে ওদের দিকে তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে বলে,
—- “ফুটেজ অনুযায়ী তোরা যখন কলেজ থেকে বের হয়েছিস, তখন ঘড়িতে বাজে ঠিক সকাল এগারোটা। অথচ তোরা বাড়ি ফিরলি দুপুর তিনটায়। মাঝখানের এই চারটে ঘণ্টা কোথায় ছিলি এতক্ষণ?”
কারো মুখে কোনো রা কাড়ার সাহস নেই, দুজনেই অপরাধীর মতো মাথা নিচু করে থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে দাঁড়িয়ে থাকে। আকাশ ওদের এই নীরবতা দেখে এবার চরম রাগী কণ্ঠে চেঁচিয়ে বলে,
—- “কী হলো, কানে শুনতে পাসনি কী বলছি? আমার এক কথা দুবার কেন বলতে হয়?”

আকাশের প্রচণ্ড ধমকে দুজনেই ভেতর থেকে কেঁপে ওঠে, কিন্তু ভয়ে গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে যাওয়ায় কেউই কোনো জবাব দিতে পারে না। ওদের মুখ বন্ধ দেখে আকাশ সোফা থেকে উঠে দাঁড়ায়। সে সোফার পাশ থেকে একটা চিকন বেতের লাঠি হাতে নিয়ে সোজা ওদের সামনে এসে দাঁড়ায়। অতঃপর কোনো কিছু বোঝার আগেই দুজনের পাছায় ধুমধাম কয়েকটা শক্ত মার বসিয়ে দেয়। লাঠির চোটে দুজনেই ব্যথায় টাকি মাছের মতো ছটফট করে লাফাতে থাকে। অতর্কিত এই লাঠির বাড়িতে রূপার কোল থেকে ক্যান্ডিটা এক লাফে নেমে ভয়ে রুম থেকে দৌড়ে পালায়। আকাশ লাঠিটা উঁচিয়ে ধরে কড়া সুরে বলে,
—- “এখনো মুখ ফুটে সত্যিটা বলবি, নাকি এভাবেই অনবরত মার খেয়ে যাবি?”
রূপা ব্যথায় চোখ-মুখ কুঁচকে, পাছায় হাত দিয়ে লাফাতে লাফাতে কান্নাবিজড়িত গলায় বলে ওঠে,
—- “আহহ্। থামো ভাইয়া, প্লিজ আর মেরো না, সব বলছি।”
আকাশ হাতের লাঠিটা নামিয়ে একটু থমকে যায়। চোখ দুটো সরু করে কড়া গলায় বলে,
—- “বল। কোথায় ছিলি?”
বৃষ্টি তখন ব্যথায় পাছা ডলতে ডলতে, চোখমুখ কুঁচকে নিজের মুঠো করা হাতের তালুটা মেলে ধরে। তার হাতের তালু থেকে দুটো লাল টকটকে পাকা লিচু বের করে একদম আকাশের চোখের সামনে মেলে ধরে। নিজের সব ভয় আর কান্না এক পাশে ঠেলে, কিঞ্চিৎ কাঁদোকাঁদো দুষ্টুমি ভরা গলায় বলে,

—- “ইয়ে লিচু চুরি করতে গিয়েছিলাম স্যার। আপনার জন্য এই দুটো অনেক কষ্ট করে লুকিয়ে রেখেছি। খাবেন স্যার?”
আকাশ বৃষ্টির হাতের তালুতে ওই দুটো পাকা লিচু দেখে চরম তাজ্জব বনে যায়। সে তীব্র বিস্ময়ে ভ্রু কুঁচকে কর্কশ গলায় বলে,
—- “হোয়াট।”
বৃষ্টি নিজের জায়গায় দাঁড়িয়েই হাতটা আরেকটু এগিয়ে দিয়ে বেশ মাসুম গলায় বলে,
—- “হ্যাঁ স্যার, এই দুটো স্পেশালি আপনার জন্যই এনেছি। খাবেন?”
আকাশের কপালে রাগের আর বিরক্তির ভাঁজ আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সে লাঠিটা একহাতে শক্ত করে ধরে ঝাঁঝালো গলায় বলে,
—- “এই মেয়ে। তোমার কী মনে হয় আমি তোমার চুরির লিচু খাব?”
বৃষ্টি ঠোঁট উল্টে হাতটা নামিয়ে নিতে নিতে বেশ সহজ সুরে বলে,
—- “আচ্ছা, না খেলে নাই স্যার।”
আকাশ এবার নিজের রাগটা সামলাতে না পেরে হুংকার দিয়ে বলে,

—- “আমার সাথে ফাজলামি করলে পিঠে আবার লাঠির বাড়ি বসাব। একদম সোজা সাপ্টা বলো, এতক্ষণ কোথায় ছিলে তোমরা?”
বৃষ্টি এবার আর কোনো লুকোছাপা না করে একদম সটাং সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে একনাগাড়ে বলে যায়,
—- “কলেজ থেকে বের হয়ে আমরা রাস্তায় ঘুরেছি, মনের সুখে বৃষ্টিতে ভিজেছি, আর ওই তিনতলা বাসার নিচু গাছটা থেকে লিচু চুরি করেছি। ব্যস, বেশি কিছু না স্যার। আসলে আজ কলেজে একদম ভালো লাগছিল না, তাই দুজন মিলে একটু বাইরে ঘোরার প্ল্যান করেছিলাম। এবার একদম সত্যি বলছি স্যার, আর একটাও মিথ্যা বলছি না।”
আকাশ বৃষ্টির কথাগুলো শুনে কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে রূপার দিকে তাকায়। তার চোখের মণি দুটো ছোট করে বেশ কড়া গলায় জিজ্ঞেস করে,
—- “বৃষ্টি যা বলছে, সব কি সত্যি?”
রূপা ভয়ে ভয়ে আর কোনো কথা না বাড়িয়ে কেবল অপরাধীর মতো হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়ায়। আকাশ ওদের দুজনের অবস্থা দেখে একটা গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে লাঠিটা একপাশে রেখে দেয়। চরম হুঁশিয়ারি দিয়ে বলে,
—- “আজকে তোদের প্রথমবার দেখেছি বলে আর কিছু বললাম না। কিন্তু আরেকদিন যদি কোনোভাবে জানতে পারি তোরা কলেজ ফাঁকি দিয়েছিস, সেদিন পিঠের চামড়া একটাও আস্ত রাখব না বলে দিলাম। এখন দূর হ তোরা এখান থেকে।”
কথাটা শেষ হতেই দুজনে এক দৌড়ে ঘর থেকে বের হয়ে যায়। আকাশ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে পুনরায় ল্যাপটপটা নিজের কোলের ওপর টেনে নিয়ে কাজে বসে পড়ে।

রাত এগারোটার দিকে বাঁধন বাড়ি ফেরে। ক্লান্ত শরীরে নিজের রুমে ঢুকেই দেখে আকাশ তার বিছানায় চিত হয়ে শুয়ে ল্যাপটপে কিছু একটা করছে, কানে হেডফোন লাগানো আর সে কিছু একটা শুনে আপনমনেই হাসছে। বাঁধন কোনো কথা না বাড়িয়ে কোমরের বেল্ট থেকে ভারী রিভলবারটা সাবধানে টেবিলের ওপর রেখে দেয়। এক এক করে ইউনিফর্মের শার্টের বোতামগুলো খুলতে থাকে। কাপড়ের খসখস আর বেল্টের শব্দ পেয়ে আকাশ চোখ মেলে তাকায়। বাঁধনকে দেখে সে কান থেকে হেডফোনটা নামিয়ে বিছানায় সোজা হয়ে বসে বলে,
—- “এসেছিস? তোর জন্যই এতক্ষণ অপেক্ষা করছিলাম।”
বাঁধন গায়ের ইউনিফর্মটা খুলে হ্যাঙ্গারে ঝুলিয়ে রাখতে রাখতে হাতের ঘড়িটা খোলে। ঘড়ির বেল্টটা আলগা করতে করতে বেশ নিরাসক্ত গলায় জবাব দেয়,
—- “হোয়াই?”
আকাশ ল্যাপটপটা একপাশে সরিয়ে রেখে বলে,
—- “তেমন কিছু না রে, চল দুজনে মিলে কিছুক্ষণ গেম খেলি।”
বাঁধন আলমারি থেকে তোয়ালেটা টেনে নিয়ে বলে,
—- “তুই বস, আমি ফ্রেশ হয়ে আসছি।”

বলেই সে তোয়ালেটা কাঁধে ফেলে সোজা ওয়াশরুমে ঢুকে গেল। ঝরনার শাওয়ারটা ছেড়ে দিয়ে ঠান্ডা জলের নিচে চোখ বন্ধ করে দাঁড়িয়ে থাকে বাঁধন। এই মুহূর্তে তার মাথায় হাজারো জটিল চিন্তা এসে ভিড় করছে। কেসটার কোনো কূল-কিনারা হচ্ছে না। মারুফ হোসেন লক-আপে থেকেও কোনোভাবেই রূপার আসল পরিচয় দিচ্ছে না, প্রতিবারই শুধু এক কথা সে তাকে চেনে না। আবার ওদিকে সেদিন রাতের রহস্যময় মেয়েটা আসলে কে, তাও সে কোনোভাবে বের করতে পারছি না। একের পর এক অমীমাংসিত প্রশ্ন আর হাজারো চিন্তা তাকে যেন ভেতর থেকে গ্রাস করছে।
টানা ত্রিশ মিনিট শাওয়ারের নিচে দাঁড়িয়ে শরীরটা ঠাণ্ডা করে সে বাইরে বের হয়। আলমারি থেকে একটা সাধারণ সাদা রঙের টি-শার্ট আর কালো ট্রাউজার পরে সে সোফায় এসে ক্লান্ত ভঙ্গিতে বসে পড়ে। বাঁধনের মুখের গম্ভীর অবয়ব দেখে আকাশ জিজ্ঞেস করে,

—- “কী রে, খুব টেনশন?”
বাঁধন সোফার পেছনে মাথাটা এলিয়ে দিয়ে চোখ বুজে বলে,
—- “না।”
—- “তাহলে ও রকম মুখ করে আছিস কেন?”
—- “এমনি।”
দুজনের এই সংক্ষিপ্ত কথার মাঝেই হুট করে বাঁধনের ঘরের দরজায় হালকা দুটো নক পড়ে। ওপাশ থেকে রূপার অতি পরিচিত নিচু কণ্ঠস্বর ভেসে আসে,
—- “আসব?”
রূপার গলার আওয়াজ শুনতেই বাঁধনের কপালে এক তীব্র কুঞ্চন রেখা ভেসে ওঠে। মেয়েটা এত রাতে তার রুমে আসতে চাইছে, এটা তো ভাবাই যায় না। যেখানে সামান্য দু-একটা ধমক দিলেই মেয়েটা ভয়ে একদম কুঁকড়ে যায়, সেখানে সে আজ নিজে থেকে তার রুমে আসার সাহস দেখাচ্ছে। বাঁধন চোখের পলক স্থির করে ঘরের দরজার দিকে তাকিয়ে বেশ রাশভারী গলায় বলে,

—- “আয়।”
রূপা অত্যন্ত ধীর পায়ে মাথা নিচু করে রুমে প্রবেশ করে। তার দুই হাতের ওপর শক্ত করে ধরা ল্যাপটপের সেই নতুন বাক্সটা। দরজার একদম কিনারা ঘেঁষে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে বৃষ্টি। বাঁধনের রুমে ঢোকার মতো পর্যাপ্ত সাহস সে নিজের ভেতর guছিয়ে উঠতে পারছে না, তাই কোনোমতে দরজার চৌকাঠে শরীরটা আড়াল করে দাঁড়িয়ে রইল।
রূপা গুটিগুটি পায়ে এগিয়ে এসে সরাসরি বাঁধনের সামনে মাথা নিচু করে দাঁড়ায়। হুট করে ওকে দেখে পাশ থেকে আকাশ বেশ নরম সুরে জিজ্ঞেস করে,
—- “কিছু বলবি রূপা?”
রূপা থমথমে মুখে আকাশের দিকে না তাকিয়েই শুধু আলতো করে হ্যাঁ-সূচক মাথা নাড়ায়। বাঁধন তখনো সোফায় হেলান দিয়ে বসে আছে। সে নিজের দুই হাত ট্রাউজারের পকেটে ঢুকিয়ে সোজা রূপার চোখের দিকে তাকিয়ে একদম সরাসরি আর কড়া গলায় বলে,

—- “বল?”
রূপা নিজের ভেতরের সবটুকু জড়তা আর কান্না চেপে ধরে হাতের ল্যাপটপের বাক্সটা বাঁধনের একদম সামনে উঁচিয়ে ধরে কাঁপা কাঁপা অথচ স্পষ্ট গলায় বলে,
—- “এই নিন আপনার ল্যাপটপ। আপনার ল্যাপটপ ভেঙে ফেলার জন্য আমি সত্যিই দুঃখিত। আমি কারও জিনিস নষ্ট করার দায় নিজের ওপর রেখে বাঁচতে পারি না, তাই আপনার জন্য নতুন ল্যাপটপ কিনে এনেছি। আশা করি, এর পর আপনি আর আমার ক্যান্ডির ওপর রাগ করে থাকবেন না। আর হ্যাঁ, আপনি তো সবসময় আমাকে একটা আপদই মনে করেছেন। আপনার বাবার ভালোবাসা থেকে আপনাকে বঞ্চিত করার জন্য হয়তো আমিই দায়ী।

বাঁধন রূপের অধিকারী পর্ব ২৩

আমার কারণেই হয়তো আপনি আপনার প্রাপ্য ভালোবাসাটা পাননি। তাই কাল থেকে আমি আপনাদের সবাইকে মুক্তি দিয়ে চলে যাব। আমি আর কখনো আপনাদের বাড়ির বোঝা হয়ে থাকব না, আর আপনার বাবার ভালোবাসা পাওয়ার পথে বাধাও হব না। আমি শুধু দোয়া করব, আমি চলে যাওয়ার পর যেন আপনি আপনার হারানো সবকিছু ফিরে পান, আপনার জীবনের সব অপূর্ণতা পূর্ণ হয়ে যায়। আর সবচেয়ে বেশি দোয়া করব, আপনি যেন সবসময় ভালো থাকেন।”

বাঁধন রূপের অধিকারী পর্ব ২৫

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here