Home বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৭৮

বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৭৮

বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৭৮
রানী আমিনা

“ডর্মে থাকো?”
শুধোলো আনাবিয়া। সেলিন নামক মেয়েটি মাথা নাড়ালো ওপর নিচে। নার্স ড্রেসিং করছে তার ক্ষতগুলোর৷ ইনজেকশন লেগেছে কয়েকটি। আনাবিয়া নিজের স্বভাবসুলভ মিষ্টি হাসি দিয়ে বলল,
“আমি আজই এসেছি, ফার্স্ট ইয়ার। নেস্ট ওয়ান, ফোর্থ ফ্লোর, রুম ফোর জিরো এইট।”
সেলিনের চোখ জোড়া চকচক করে উঠলো, খুশি খুশি চেহারায় সে বলল,
“তবে তুমিই আমার রুমমেট! আজ ভোর বেলা তবে ওই দুজন হ্যান্ডসাম এসে তোমার ব্যাগপত্র রেখে গেছে? আমি তো ভাবতেই পারছিনা, শেষে কিনা আমারও রুমমেট হবে!
আমি সেকেন্ড ইয়ারে আছি। কোন ডেপ্ট তুমি?”

“জ্যুলোজি।”
“আমি হিস্ট্রিতে। ডর্মে আমার রুমের ওই বেডটাই স্পেয়ার ছিলো। ওই রুমে কেউ থাকেনা, এমনিতে খালিই থাকে সবসময়।”
“কেন?”
“কিছু বছর আগে সেখানে একটা মেয়ে সুইসাইড করেছিলো, তারপর থেকে ভয়ে কেউ সেখানে থাকতে পারেনা।”
“তুমি থাকো যে!”
“আমাকে বার্থা জোর করে সেখানে দিয়েছে, আমি যেতে চাইনি।”
“বার্থাটা কে? হান্টারের মালকিন?”
“হ্যাঁ, মুরসালিন জাবিনের মেয়ে৷
তার বাসা ভার্সিটি থেকে বোধ হয় দু মিনিটের পথ, তবুও সে ডর্মেই থাকবে, নেতাগিরি দেখিয়ে মানুষকে যন্ত্রণা দেওয়ার জন্য। আমি অন্য রুমে ছিলাম, অনেক ভালো রুমে ছিলাম। কিন্তু আমার বেডে অন্য কাউকে দিয়ে আমাকে আমার জিনিসপত্র সহ ফোর জিরো এইটে ফেলে দিয়ে দরজা আঁটকে রেখেছিলো দু’দিন।”
বলতে বলতে চোখে পানি জমলো সেলিনের৷ আনাবিয়া এটা সেটা বলে স্বান্তনা দিলো ওকে। এইড শেষ হলো তার, পায়ে বেশ জখম হয়েছে। আনাবিয়া ওকে ধরে উঠিয়ে গল্প করতে করতে ধীর পায়ে চলল নেস্ট ওয়ানের দিকে।

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

“এখনি বার্থা আসবে দেখো। তোমাকে ওদের দলে টানতে চাইবে।”
আনাবিয়া নতুন কেনা বইগুলো খুটিয়ে খুটিয়ে দেখছিলো। নতুন বইয়ের ঘ্রাণ নেশার মতো, বুক ভরে ঘ্রাণ নিচ্ছিলো সে। সেলিনের কথায় মাথা উঁচু করে শুধোলো,
“আমাকে কেন?”
“তুমি সুন্দরী তাই। ওর সাথে যতগুলো সুন্দরী মেয়ে দেখছো সবাইকেই ও ব্যাবহার করে, ভার্সিটি বা বাইরের যেসব ছেলে ওর হয়ে কাজ করে তাদের খায়েশ মেটাতে। সেখানে তোমার মতো চোখ ধাধানো সুন্দরী পেলে ওরা বার্থার কথায় উঠবে আর বসবে। বার্থা এলো বলে।”
শেষোক্ত কথাটা কিঞ্চিৎ চাপা স্বরে বলল সেলিন। আনাবিয়া কৌতুকপূর্ণ হাসলো। সত্যি সত্যিই কিছুক্ষণ বাদে নক পড়লো ওদের কামরার দরজায়। ওপাশ থেকে ভেসে এলো একটি মেয়েলি স্বর,

“বার্থা বলছি, ভেতরে আসতে পারি?”
“না।”
বলে উঠলো আনাবিয়া। পরক্ষণেই আবার মুখ গুজলো বইয়ে। সেলিন মুখ টিপে হাসলো, শব্দ হলোনা সে হাসিতে। ওপাশে নিরবতা বিরাজ করলো ক্ষণিক। পরক্ষণেই দরজার এপর জোরালো শব্দে করাঘাত পড়লো, বার্থা ডেকে উঠলো,
“সেলিন, দরজা খুলো। কথা বলার আছে।”
সেলিন অনুমতির জন্য তাকালো আনাবিয়ার দিকে। আনাবিয়া সম্মতি জানাতেই সেলিন উঠে খুলে দিলো দরজা। বার্থা এলো ভেতরে। পেছন পেছন এলো তার সাথের তথাকথিত সুন্দরী গুলো। বার্থা এসে সেলিনকে এক ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিলো ওর বিছানার ওপর, কোমর দুলিয়ে হেটে এসে দাঁড়ালো আনাবিয়ার পাশে। আনাবিয়া এক ভ্রু উঁচু করে দেখতে রইলো ওর কান্ডকারখানা।

“উঠে দাঁড়াও।”
বুকে হাত বেধে বলে উঠলো বার্থা। আনাবিয়া কিয়ৎক্ষণ ওর দিকে চেয়ে থেকে প্রশ্ন করলো,
“কেন?”
“এখানে সিনিয়রদেরকে দাঁড়িয়ে সম্মান করতে হয়, উঠে দাঁড়াও।”
“পারছিনা, দুঃখিত।”
বলে আবার বইয়ে মুখ গুজলো আনাবিয়া। বার্থা অপ্রস্তুত হলো, অপমানিত মুখে একবার দেখলো আনাবিয়াকে। কিন্তু দমে গেলো না। এগিয়ে এসে ক্ষিপ্র বেগে ছিনিয়ে নিলো হাতে থাকা বই খানা। বলল,
“আমি যখন কথা বলবো তখন মনোযোগ শুধু আমার দিকে থাকবে, অন্য দিকে নয়।”
আনাবিয়া ফোস করে শ্বাস ছাড়লো একটা। ঘুরে বসলো সে বার্থার দিকে, বলল,
“মনোযোগ দিয়েছি, দুই মিনিটে শেষ করবে। ফাস্ট।”

বার্থা অপ্রস্তুত হয়ে গলা খাকারি দিলো, ওর সাথের মেয়েগুলোর একটি এগিয়ে এসে কর্কশ স্বরে বলে উঠলো,
“এই, কার সাথে কথা বলছো জানো তুমি? বেয়াদবি করলে বেড সহ বাইরে ফেলে দিয়ে আসবো, বোঝা গেছে?”
বার্থা হাত উঁচিয়ে থামালো ওকে। শান্ত স্বরে আনাবিয়াকে বলল,
“তোমার জন্য আমার কাছে কিছু দারুণ দারুণ অফার আছে৷”
আনাবিয়ার আপাদমস্তক একবার পরখ করে বলল,

“তোমার ফিগার সুন্দর, পোশাকেও বেশ বড় ঘরের মেয়ে বলেই মনে হচ্ছে। নইলে এইখানে অ্যাডমিশনের ক্ষমতা হতোনা। এই ফকিন্নির মতোন যে স্কলারশিপে আসোনি, এটা বুঝতে পেরেছি।”
শেষোক্ত কথাটা সেলিনকে উদ্দ্যেশ্য করে বলল সে৷ সেলিনের মাথা নিচু হয়ে গেলো মুহুর্তেই। বার্থা আবারও বলল,
“আমি চাই তুমি আমার গ্রুপে চলে আসো। অনেক সুবিধা পাবে, এই ভুতুড়ে রুম বদলে তোমাকে আমি আমার রুমে নিয়ে আসবো। আমার রুমমেট হবে তুমি, কেউ তোমাকে কিচ্ছুটি বলার সাহস করবেনা কখনো। তোমার ক্লাসে তুমিই অলওয়েজ ফার্স্ট গার্ল থাকবে, যা খুশি তাই করতে পারবে, রাত বিরাতে বাইরে বের হতে পারবে, কোনো বাঁধা নেই।
বিনিময়ে শুধু আমার কথা শুনে চলতে হবে, যা করতে বলবো তাই করতে হবে। জীবন বদলে যাবে তোমার, আমিই বদলে দিবো তোমার জীবন। একবার জনপ্রিয় হতে পারলেই দেমিয়ান বেগাম দের মতোন আভিজাত্যপূর্ণ জীবন যাপন করবে তুমি…”

বার্থা হয়তো আরও কিছু বলতো, কিন্তু তার আগেই আনাবিয়া ঘড়ি দেখে বলে উঠলো,
“টাইমস্‌ আপ, এখন তুমি যেতে পারো।”
পরক্ষণেই বার্থার হাত থেকে বইটা টেনে নিয়ে সামনে মেলে ধরলো আবার৷ বার্থা দাঁতে দাঁত চেপে তাকিয়ে রইলো আনাবিয়ার দিকে। ওর সাথের মেয়েগুলো আনাবিয়াকে শাসন করতে চাইলে বাঁধা দিলো সে নিঃশব্দে। শান্ত স্বরে বলল,
“আমার অফারের উত্তর ‘হ্যাঁ’ হওয়া চাই, তোমার জীবন বদলে যাবে। ‘না’ হলেও বদলাবে, তবে সেটা উল্টো দিকে।”
“তোমার মতোন বেশ্যাগিরি আর চুরিবিদ্যায় টপার হওয়ার কোনো শখ আমার নেই, এটাই আমার অ্যানসার। এখন তুমি আসতে পারো।”

নির্বিকার স্বরে কথাটি বলে আনাবিয়া পাতা ওল্টালো বইয়ের। বার্থার মুখের রঙ উড়ে গেলো। এত বছরে তার সাথে এমন ভাষায় কথা বলার স্পর্ধা কারো হয়নি। হয়তো লোকে পেছনে বলে, কিন্তু সামনে? সেটাও এভাবে? অপমানে কান লাল হয়ে উঠলো তার!
বার্থার পেছনে দাঁড়ানো মেয়েটি এবার তেড়ে এলো আবার, উচ্চ স্বরে কিছু বলতে নিবে তার পূর্বেই আনাবিয়া উঠে দাঁড়ালো ঝটিতি, কঠিন স্বরে বলে উঠলো,
“আ’ ওয়ান্ট সাম পিস অ্যান্ড কোয়্যাইট। ইউ হ্যাভ ফাইভ সেকেন্ডস টু লিভ, অর এল্‌স….!
আনাবিয়ার রাগান্বিত চেহারা দেখে দমে গেলো মেয়েটি, অপ্রস্তুত ভঙ্গিতে পিছিয়ে গেলো তৎক্ষনাৎ। রাগে চোখে জল জমলো বার্থার। কান্না জড়ানো ক্রুদ্ধ স্বরে বলে উঠলো,

“এই ডর্মে তুই পিস অ্যান্ড কোয়্যাইট কিভাবে পাস আমিও দেখবো।”
তারপর দুমদাম পা ফেলে বেরিয়ে গেলো বাইরে, দরজা টা বন্ধ করলো সশব্দ। সেলিন এক কোণে সিঁটিয়ে ছিলো। ওরা চলে যেতেই লাফিয়ে উঠলো সে, ভয়ার্ত স্বরে বলল,
“এবার কি হবে? ও যদি কিছু করে! হান্টারকে পাঠালে কি হবে?”
“ডায়নোসর পাঠালেও আমার কিছু যায় আসেনা সেলিন, তুমি পড়ো চুপচাপ।”
সেলিন চুপ হয়ে গেলো তৎক্ষনাৎ। বইয়ের দিকে মুখ ফিরিয়ে আড়চোখে দেখতে রইলো সে আনাবিয়াকে। মনে মনে বেজায় খুশি হলো। আনাবিয়া দেখতে পেলো ওর হাসিমুখ, নিজেরও ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি ফুটে উঠলো তার।

ক্লাসরুমের সামনে বারান্দায় রেলিঙ ঘেঁষে দাঁড়িয়ে বার্থা। মুখখানা থমথমে। সাগরেদ গুলোও বসের এমন মুখাবয়ব দেখে চুপ হয়ে আছে। নিরবতা ভেঙে কথা শুরু করলো বার্থা,
“গতরাতে বাবা এসেছিলেন।”
“হঠাৎ তিনি এসেছিলেন কেন? তিনি তো তোর সাথে কথা বলেননা।”
জিজ্ঞেস করলো কেউ একজন। বার্থা একটি দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল,
“সাবধান করে গেলেন, ফোর জিরো এইটের নতুন মেয়েটিকে যেন ভুলেও বিরক্ত না করি। বললেন আমার জন্য তিনি কোনো বিপদে পড়তে চান না, আমি যদি তার কথা মতোন না চলি তবে তিনি আমাকে ত্যাজ্য করবেন।”
ক্ষণিক নিরব থেকে সে আবার বলল,
“মেয়েটির ব্যাকগ্রাউন্ড সম্পর্কে খোঁজ নেওয়া উচিত আমাদের, কোন পরিবার থেকে এসেছে জানা দরকার। যতদূর জেনেছি সে কিমালেব থেকে এসেছে। হতে পারে সে কিমালেবের কন্ট্রোলার জায়ান সাদির কেউ৷ মেয়ে যে নয় সে ব্যাপারে নিশ্চিত, তার এত ছোট মেয়ে থাকার কথা নয়৷ কিন্তু সে জায়ান সাদির কেউ হলে জুনায়েদ ভাইয়ের তার সাথে দেখা করতে আসার কথা৷”

“ফিজিক্সের জুনায়েদ সাদি?”
“হু, জায়ান সাদির ছোট ছেলে। তার সাথে একবার দেখা করে বিষয় গুলো পরিষ্কার হওয়া উচিত৷”
তাদের কথার মাঝেই বারান্দায় শোনা গেলো পদশব্দ। সিঁড়ি বেয়ে উঠে এলো আনাবিয়া, বার্থার সামনে দিয়ে হেটে চলে গেলো ফার্স্ট ইয়ারের ক্লাসের দিকে৷ বার্থা তাকিয়ে রইলো ওর যাওয়ার পানে, না চাইতেও ওই মোহনীয় চলার ভঙ্গিমা নজর কাড়লো তার। আনাবিয়া চোখের আড়াল হতেই সে মেয়েগুলোর একজনকে বলল ফিজিক্স ডেপ্টের জুনায়েদ সাদি ভার্সিটিতে উপস্থিত আছে কিনা খোঁজ নিতে।

ক্লাসরুমে পা রেখেই চতুর্দিকে একবার চোখ বুলালো আনাবিয়া। জানালার বাইরের গাছে চুপচাপ বসা লিয়াম। আনাবিয়া নাম জানেনা ওর, কিন্তু এটা ঠিকই জানে তার কাজ কি। আনাবিয়া ঠোঁটের কোণ বাঁকিয়ে হাসলো। ছেলেমেয়েরা অনেকেই তাকিয়ে আছে তার দিকে; মুগ্ধ, উৎসুক দৃষ্টি তাদের। আনাবিয়া এগিয়ে গেলো ভেতরে। সেকেন্ড রো এর ফার্স্ট ডেস্কের লম্বা, চওড়া সুদর্শন ছেলেটির পেছনের ফাঁকা ডেস্কে বসে পড়লো।
ছেলেটি বইয়ে মুখ গুজে থাকায় দেখেনি আনাবিয়াকে, পেছনে কেউ বসেছে টের পেয়ে ভরাট গলায় বলে উঠলো,
“আমার পেছনের ডেস্কে বসার অনুমতি দেইনি আমি কাউকে। অন্য কোথাও গিয়ে বসো।”
“আমি এখানেই বসবো।”

পিঠ থেকে ব্যাগ নামিয়ে রাখতে রাখতে বলল আনাবিয়া। অপরিচিত মেয়েলি মিষ্টি কন্ঠস্বরে কৌতুহলী হয়ে একবার ঘাড় ঘুরিয়ে দেখলো সে পেছনে, প্রচন্ড আকর্ষণীয়, শুভ্র মুখখানা দেখে ক্ষণিকের জন্য স্থির হয়ে গেলো সে। পরক্ষণেই সম্পুর্ন ঘুরে বসলো আনাবিয়ার দিকে, ভরাট স্বরে জিজ্ঞেস করলো,
“নিউ?”
বাহিরে গাছের মগডালে বসে থাকা লিয়াম আচমকা ডেকে উঠলো তীক্ষ্ণ স্বরে। তার তারস্বরে চিৎকারে চমকে উঠলো সকলেই, চকিতে তাকালো বাহিরে। এমন বিশাল আকৃতির পেরিগ্রিন ফ্যালকন দেখে ওরা বেশ অবাকই হলো, কেউ কেউ জানালার দিকে ছুটলো তার ফটোশ্যুট করতে।
আনাবিয়া সেদিকে তাকালো একবার, মুখে দুর্বোধ্য হাসি ফুটলো তার। উত্তরে মিষ্টি স্বরে বলল,

“হু, নিউ। আজই ফার্স্ট ক্লাস।”
ছেলেটি হাত বাড়িয়ে দিলো ওর দিকে, বলল,
“আ’ম লিভয়, লিভয় ব্লাকউড।”
আনাবিয়া তাকালো ওর বাড়িয়ে দেওয়া হাতের দিকে৷ বাহির থেকে আরেকবার লিয়ামের তারস্বরে চিৎকার শোনা গেলো তখুনি৷ আনাবিয়া নিজেও বাড়িয়ে দিলো হাত, লিভয় এর সাথে হ্যান্ডশেক করে বলে উঠলো,
“নূরিয়া, নূরিয়া তাজদিন।”
আনাবিয়া স্পর্শ করতেই চমকে উঠলো লিভয়, এক অদ্ভুত বিদ্যুৎ খেলে গেলো তার শরীরে। কেঁপে উঠলো সে তৎক্ষনাৎ! আনাবিয়া অস্বস্তিতে সাথে সাথেই ছেড়ে দিলো ওর হাত, লিভয়ের দৃষ্টি এড়িয়ে ট্রাউজারের সাথে ঘষে নিলো নিজের হাতখানা। লিভয় বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে রইলো ওর দিকে! আনাবিয়া পরিস্থিতি অনুকূলে আনতে ব্যাস্ত স্বরে জিজ্ঞেস করলো,

“ব্লাকউড? ব্লাকউড প্রাইম শপিংমল অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ…. দ্যাট ব্লাকউড?”
লিভয় মাথা নাড়ালো ওপর নিচে, মুখে বলল,
“ইয়াপ, দ্যাট ব্লাকউড।”
গর্বিত মুখে হাসলো সে। আনাবিয়া চিনে ওদেরকে, বেশ ভালোভাবেই। বংশগত বিজনেসমেন। বিয়ের পরের বছর ব্লাকউড দের বিরাট শপিংমলের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে দাওয়াত পড়েছিলো তাদের দুজনের। মীরের সাথে নাচতে নাচতে গেছিলো সে। লিভয়ের বাবা তখন মাত্র হাটতে শিখেছে, পিচ্চি বাচ্চাটার কিউটনেসে ঘায়েল হয়ে কোলেও তুলেছিলো আনাবিয়া, সে হিসেবে লিভয় ওর নাতি ছেলে। ঠোঁট টিপে হাসলো আনাবিয়া।

“হুমমম, তবে তো তুমি গ্রাজুয়েশন শেষ করে বিজনেসে হাত দিবে।”
ভাবুক ভঙ্গিতে বলল আনাবিয়া। লিভয় মনোযোগী, মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে রইলো ওর হ্যাজেল চোখের দিকে। আনাবিয়ার শেষোক্ত কথাটিকে উপেক্ষা করে জিজ্ঞেস করলো,
“ইউ নো, হ্যাজেল ইজ ওয়ান অভ দ্যা মোস্ট রেয়ারেস্ট আই কালার ইন দ্যা ওয়ার্ল্ড?”
আনাবিয়া মিষ্টি ভঙ্গিতে মাথা নাড়ালো ওপর নিচে। সেদিন ক্লাসের ফাকে ফাকে লিভয় আনাবিয়ার দিকে ঘুরে বসে গল্প করেই কাটিয়ে দিলো।

“লিভয় ছেলেটা কিন্তু বেশ হ্যান্ডসাম, আমার খুব ভালো লেগেছে।”
বলল সেলিন। ক্যাফেটেরিয়ায় ডিনারের জন্য যেতে তৈরি হচ্ছিলো দুজনে। আনাবিয়া ওর কথা শুনে হাসলো মৃদু, জিজ্ঞেস করলো,
“খুব ভালো লেগেছে নাকি? সেটিং করিয়ে দিবো?”
“ধ্যাত! আমি তো তোমার জন্য বলছি। তোমার জন্য ওকে ভালো লেগেছে। দেখো না, কি সুন্দর রোজ ক্যাফেটেরিয়ায় গিয়ে বসে থাকে, তোমার সাথে এক টেবিলে খাবে বলে। সব দিক থেকে পার্ফেক্ট! নিজেদের এত্ত বড় বিজনেস, একাডেমিক রেজাল্ট সেই, তার ওপর কত্ত হ্যান্ডসাম! ইশ, প্রিন্স চার্মিং!”
বলতে বলতে লাজুক হাসিতে উদ্বেলিত হয়ে উঠলো সেলিন। আনাবিয়া বললো না কিছুই। স্নিকার্সের ফিতা লাগাতে উদ্যত হলো। সেলিন ওকে চুপ দেখে বলে উঠলো,
“কিছু বলছো না যে! ওকে তোমার ভালো লাগে না৷”
“হুম, লাগে।”

“তবে আর চিন্তা কিসের! অ্যাই শুনো, তুমি আজ আর এই হুডি ট্রাউজার পরে টমবয় সাজবে না। এগুলো খুলো, খুলে মেয়েদের মতোন কিছু পরো। এত সুন্দর একটা মেয়ে, সারাক্ষণ পুতুলের মতো সেজেগুজে বেড়াবে, তা নয়! সারাক্ষণ ব্লাক হুডি ট্রাউজারে ভূতের মতোন ক্যাম্পাসে ঘুরবে, হুহ্‌!”
আনাবিয়া হাসলো, সেলিন এগিয়ে এসে আনাবিয়ার ট্রলি গুলো খুলতে ব্যাস্ত হলো। কয়েক সপ্তাহ পেরিয়ে গেছে, এখনো মেয়ে ট্রলি খোলেনি! সারাক্ষণ একটা বাদে একটা হুডি পরতেই আছে। নিজের মনে বক বক করতে করতে ট্রলি খুলতে রইলো সেলিন। আনাবিয়া নিজের ঘাড় সমান চুল গুলোতে চিরুনি দিতে ব্যাস্ত হয়ে পড়লো।
ট্রলি খুলেতেই সেলিনের চোয়াল নেমে গেলো, চকচকে চোখে এক এক টা করে পোশাক বের করতে রইলো সে, উচ্ছাসে চেচিয়ে চেচিয়ে বার বার বলে উঠলো,
“আরেএএ, এটা কি সুন্দর! এসব পোশাক রেখে তুমি হুডি ট্রাউজার পরে ঘুরো কোন কারণে? এই মেয়েকে কি বলতে হয়!”

আনাবিয়া ওর কান্ড কারখানা দেখতে রইলো চুপচাপ। সেলিন অবশেষে তার মনের মতো একটা পোশাক বের করে ধরলো আনাবিয়ার সামনে, খুশি খুশি মুখে বলল,
“এটা পরো না এখন! দেখি তোমাকে কেমন লাগে!”
“আমরা ক্যাফেটেরিয়ায় যাচ্ছি সেলিন, পার্টিতে নয়।”
বলে আনাবিয়া হুডির হুডটা মাথায় তুলে দিয়ে বেরিয়ে গেলো কামরা থেকে। মনমরা হয়ে সেলিনও বেরোলো ওর পেছন পেছন।
ক্যাফেটেরিয়ায় পৌঁছতেই চোখে পড়লো লিভয়কে, একা বসে এক কোণে। আনাবিয়া ভেতরে ঢুকতেই মুখে এক চওড়া হাসি হানা দিলো তার। হাত উঁচিয়ে ইশারায় ডাকলো সে আনাবিয়াকে৷ আনাবিয়া সেদিকে এগোতেই যাচ্ছিলো, তখনি চোখে পড়লো সার্ভিস লাইনের অপর পাশে কুকের পোশাকে দাঁড়ানো ব্রায়ানকে, একমনে সার্ভ করে চলেছে স্টুডেন্ড দেরকে।
আনাবিয়া বিস্মিত হলো, এগিয়ে গেলো সেদিকে। ডেকে উঠলো,

“ব্রায়ান!”
ব্রায়ান চমকালো সাথে সাথেই। এদিক ওদিক চেয়ে খুঁজতে রইলো কন্ঠস্বরের মালকিনকে। এই কন্ঠ তার চেনা, কিন্তু এর মালকিন এখানে কিভাবে আসবে ভেবে কিনারা পেলোনা। তখনি সামনে তাকিয়ে হুডি ট্রাউজারে আবৃত আনাবিয়াকে হাসিমুখে দাঁড়িয়ে থাকিতে দেখে ব্রায়ান থমকালো ক্ষণিকের জন্য। পরমুহূর্তে মাথা নত করে আনুগত্য জানাতে গেলেই আনাবিয়া মানা করে দিলো ইশারায়, উচ্ছ্বসিত স্বরে জিজ্ঞেস করলো,
“এখানে কি করো তুমি?”
“শেহ….. ইয়ে মানে… আমি এখানে… পার্ট টাইম জব নিয়েছি।”
“কবে নিয়েছো, আমি এতদিন এসেছি, দেখিনিতো তোমাকে!”
“শেহ…. ”

“নূর, নূরিয়া তাজদিন। তুমি আমাকে নূর বলেই ডেকো।”
ব্রায়ান অস্বস্তিতে পড়লো, এমন সম্মানিতা কাউকে এভাবে কিভাবে, হোক সেটা অন্য নাম তবুও কিভাবে নাম ধরে ডাকবে ভেবে পেলোনা। ঢোক গিলতে রইলো বারবার। আনাবিয়া দ্বিতীয় বার শুধোলো,
“বললে না তো!”
“আসলে….. আসলে আমি এখানে কয়েক মাস আগেই এসেছি, কিন্তু এ মাসে শার্লট হঠাৎ অসুস্থ হয়ে যাওয়ায় আসতে পারিনি। ছুটি নিয়েছিলাম।”
“শার্লট অসুস্থ? কি হয়েছে ওর?”
উদ্বিগ্ন স্বরে জিজ্ঞেস করলো আনাবিয়া। ব্রায়ান অপ্রস্তুত হেসে বিনীত স্বরে বলল,

“আসলে….. আপনি হিজ ম্যাজেস্টির সাথে চলে যাওয়ার পর আমি, শার্লট, ফাতমা তিনজনে কিমালেবেই থেকে গেছিলাম। জাভেদ ভাইজান আমাদের প্রাপ্য জমিজমা উদ্ধার করে দিয়েছিলেন। সেগুলো সব বিক্রি করে আমি ওদের নিয়ে কুরো আহমারে চলে এসেছি, পার্মানেন্টলি। কিন্তু হঠাৎ করে এখানে এসে সেভাবে গুছিয়ে উঠতে পারছিলাম না, খাবার দাবারেরও কিছু শর্টেজ ছিলো। এসবের মাঝে পড়ে অসুস্থ হয়ে গেছিলো ও। এখন সুস্থ আছে যদিও, হসপিটাল থেকে রিলিজ দিয়েছে আজ সকালেই৷”
আনাবিয়া আহত হলো। ব্যাথিত স্বরে জিজ্ঞেস করলো,
“তুমি কাউকে জানাওনি কেন? কোকো, লিও বা অন্য কাউকে জানালে তো এত ঝামেলায় পড়তে হতোনা।”
“আপনাদের সবার সাথে এমনিতেই এতগুলো বছর পরগাছার মতোন লটকে ছিলাম, এত কিছুর পর এখনো যদি পরনির্ভরশীল হয়ে থাকি তবে কিভাবে চলবে….. তাই…!”

আনত চোখে বলল ব্রায়ান। আনাবিয়া কিছু বলতে নিবে তখুনি পেছন থেকে ভেসে এলো লিভয় এর গলা,
“কি হয়েছে নূর, এত দেরি হচ্ছে কেন? কোনো সমস্যা?”
লিভয়ের ধ্বংসাত্মক চাহনি ব্রায়ানের দিকে। আনাবিয়া ওকে পাত্তা দিলোনা, ব্রায়ানকে উদ্দ্যেশ্য করে বলল,
“আমাদের সাথে খাবে এসো৷”
“ক্ষমা করবেন শেহ্‌…. নূর… চাকরি চলে যাবে আমার।”
“আরে কিছু হবে না, বেরিয়ে এসো তুমি। আমি আছি তো, চিন্তা কিসের তোমার? এসো এসো।”
বলে আনাবিয়া ব্রায়ানকে একপ্রকার টেনে বের করে নিয়ে এলো। ব্রায়ান অপ্রস্তুত ভঙ্গিতে মাথা নিচু করে এগোলো আনাবিয়ার পেছন পেছন। লিভয় আর সেলিন তাকালো একে অপরের দিকে। এই সামান্য সার্ভিস ম্যানকে নিয়ে আনাবিয়ার টানা হ্যাচড়া একদমই ভালো লাগলোনা ওদের কারো।
ব্রায়ান বসলো টেবিলে এসে। আনাবিয়া নিজের আর ব্রায়ানের জন্য দু’প্লেট ভর্তি খাবার নিয়ে গেলো টেবিলে। সেলিন অসন্তুষ্ট মুখে টেবিল ছেড়ে এগোলো সার্ভিস লাইনের দিকে। লিভয় দাঁড়িয়ে ছিলো ওখানেই, সেলিন চাপা স্বরে বলে উঠলো,

“তুমি কিছু মনে কোরোনা, ও অমনই। সেদিন রাস্তায় এক পাগলিকে কত খাতির যত্ন করে খাইয়ে দাইয়ে নিজের পোশাক পরিচ্ছদ অর্ধেক দান করে এসেছে বোধ হয়। একটু বেশিই দয়াল।”
লিভয় মজা পেয়ে হাসলো ওর কথায়। ওখানে দাঁড়িয়েই মুগ্ধ চোখে দেখতে রইলো আনাবিয়ার এই সস্তা পোশাকের সার্ভিস ম্যানের সাথে উচ্ছসিত ভঙ্গিতে কথা বলার ভঙ্গি। একটু বিরক্ত হলেও সেটুকু হজম করে নিলো।
“কি করছো তুমি এখন, মেইনলি?”
কৌতুহলী স্বরে জিজ্ঞেস করলো আনাবিয়া। ব্রায়ান নরম গলায় উত্তর করলো,
“মেডিক্যালে ঢুকেছি আবার, যদিও অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে। এমক্যাট এক্সাম দিয়েছি, ক্রিমিনাল রেকর্ড প্লাস বেশি বয়স হওয়ায় নিতে চাইছিলোনা। কিন্তু কোকো ভাইজান ব্যাবস্থা করে দিয়েছিলেন।
ভাগ্য ভালো ছিলো, পাস করে গেছি। কিন্তু কলেজের ফিস, শার্লটের পড়ার খরচ সব সামলাতে কিছুতো একটা করতেই হতো। তাই এখানে পার্টটাইমে ঢুকে গেছি। বেতনও ভালো, তাই আর…..”

“শার্লট কোথায় পড়ছে?”
“পাশেই, একটা ছোট কলেজে, গ্রেড ইলেভেনে ভর্তি করিয়েছি। কোকো ভাইজান স্কলারশিপের ব্যাবস্থা করে দিয়েছিলেন বলে একটু সহজ হয়েছে৷”
“আর ফাতমা?”

“আবার নার্সিং এ ঢুকেছে, আমি যে কলেজে পড়াশোনা করছি সেখানের হসপিটালেরই নার্স। আমাদের সাথেই থাকছে। বিয়ে করবে হয়তো শিগগিরই, ওখানের এক হার্ট সার্জন ওকে খুব পছন্দ করেছে। জানেনই তো, ওর আচার ব্যাবহার কেমন, নম্র স্বভাবের। মন কেড়েছে ডাক্তারটির। কিন্তু ডাক্তার ডিভোর্সি, বয়সও একটু বেশি, বছর পাঁচের একটা বাচ্চা আছে, বাচ্চাটিকে জন্ম দিতে গিয়েই আগের স্ত্রী মারা গেছিলেন। ভদ্রলোক এতগুলো বছর ডিপ্রেসড ছিলেন, এখন মোটামুটি ডিপ্রেসন কাটিয়ে আবার নতুন করে জীবন শুরু করতে চাইছেন। ফাতমাও চাইছে তাকে বিয়ে করতে, বাচ্চাটা এত ছোট দেখে মায়া বেড়ে গিয়েছে তার। ওর আগ্রহ দেখে আমিও আর না করিনি।”
আনাবিয়ার মন খারাপ হলো আচানক। রেড জোনের অর্কিড বাগানে পতিত নিজের ছোট্ট অংশটির কথা মনে পড়লো মুহুর্তেই। আনমনে হাত চলে গেলো তলপেটের ওপর। সেলিন আর লিভয় এসে বসলো তখন ওদের পাশে। ব্যাস্ত ভঙ্গিতে পেট থেকে হাত সরিয়ে নিলো আনাবিয়া। গলা খাকারি দিয়ে স্বাভাবিক করার চেষ্টা করলো নিজেকে, কিন্তু কোন এক নিদারুণ দুঃখের স্মৃতি যেন দলা পাকিয়ে উঠে আসতে চাইলো বারংবার, চোখ জোড়া অকারণেই ভরে আসতে চাইলো লোনা পানিতে।

সেলিন খেয়াল করেনি তখনো, লিভয়ের সাথে মিলে ব্রায়ানের সাথে উচ্চস্বরে খোশ গল্পে মেতে উঠেছে। আনাবিয়ার সাথে তার কোথায় কিভাবে পরিচয় সেগুলো জিজ্ঞেস করছে খুটিয়ে খুটিয়ে। ব্রায়ান অপ্রস্তুত হচ্ছে বার বার, কি উত্তর দিবে বুঝতে না পেরে চুপ করে থাকছে। আনাবিয়ার শরীরটা ভালো লাগলোনা, আচমকা এমন দুঃখের আক্রমণে একটু একা থাকতে চাইলো সে। টেবিল ছেড়ে উঠে যেতে নিতে বলে উঠলো,
“তোমরা খাও, আমি আসছি একটু পরেই।”

লিভয় ভ্রু কুচকে তাকিয়ে রইলো তার দিকে, আনাবিয়ার মুখশ্রীতে লেগে থাকা দুঃখের ছাপ দৃষ্টিগোচর হলো তার। একবার ভাবলো যাবে আনাবিয়ার সাথে। সেই মুহুর্তেই সেখানে এসে হাজির হলো বার্থা। বড় বড় পা ফেলে এসে পথ আঁটকে দাঁড়ালো আনাবিয়ার সামনে। বাজখাঁই গলায় বলে উঠলো,
“এটাকি খোশগল্প করার জায়গা? নিজেরা তো করছোই সাথে ডাইনিং স্টাফকেও নিয়ে এসেছো! তোমাদের জন্য এখানের পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে দেখতে পাচ্ছোনা? যে যার লিমিটের ভেতর থাকবে, লিমিট ক্রস করলেই ঘাড় ধাক্কা দিয়ে ভার্সিটি থেকে বের করে দিবো!”

ব্রায়ান অপ্রস্তুত ভঙ্গিতে উঠে দাঁড়ালো দ্রুতই। এই মেয়েকে সে চিনে, ভালোভাবেই চিনে। কি করতে পারে সেটাও তার জানা। লিভয় পাশ থেকে কৌতুকপূর্ণ স্বরে বার্থাকে বলল,
“তোমার এত সমস্যা হচ্ছে কেন? রোজ যখন তোমার পোষা জন্তু গুলোকে নিয়ে এখানে বসে দাড়কাকের মতো চিৎকার করে লোকের কান ঝালাপালা করো তখন তোমার এসব নীতিবাক্য কোথায় যায়?”
“তুমি এসব থেকে দূরে থাকো লিভয়! নেহাত আমাদের বাবারা ভালো বন্ধু, নইলে তোমার এ কথার ঋণ আমি এখানেই মিটিয়ে দিতাম।”
লিভয় তাচ্ছিল্য হাসলো। ব্রায়ান ঝামেলা এড়াতে চলে যেতে চাইলো সার্ভিস এরিয়াতে, অপ্রস্তুত হয়ে পা বাড়ালো যাওয়ার উদ্দেশ্যে। কিন্তু আনাবিয়া হাতের ইশারায় থামিয়ে দিলো ওকে, বার্থার দিকে ফিরে শীতল স্বরে বলে উঠলো,
“ও এখানে বসেই খাবে। তোমার সমস্যা হলে বেরিয়ে যাও, দরজাটা ওদিকে।”
“কাকে বেরিয়ে যেতে বলছো তুমি? চেনো আমাকে? আমি তোমার কি অবস্থা করতে পারি সে সম্পর্কে কোনো ধারণা আছে তোমার?”

“লিসেন, আমি কোনো ঝামেলা চাইনা। ডিনার সারবো, বেরিয়ে যাবো। আ’ ওয়ান্ট সাম পিস অ্যান্ড কোয়্যাইট, এটা না পেলে আমি অশান্তিতে থাকবো, তখন সেটা তোমাদের কারো জন্যই ভালো হবে না। তাই ভালো হয় তুমি চুপচাপ এখান থেকে কেটে পড়ো।”
পেছন ফিরে ব্রায়ানের উদ্দ্যেশ্যে বলল,
“এখানে বসে খেয়ে, প্লেট সাফ করে তবেই উঠবে৷”
বার্থাকে পাশ কাটিয়ে বেরিয়ে যেতে চাইলো সে, বার্থা আচমকা এক হাতে রোধ করলো আনাবিয়ার রাস্তা, ব্রায়ানের দিকে ফিরে বলে উঠলো,
“এখনি টেবিল ছেড়ে তোমার নির্ধারিত স্থানে চলে যাও।”
পরক্ষণেই আনাবিয়ার দিকে ফিরে বিকৃত স্বরে বলে উঠলো,
“এখানে শুধু আমার কথা চলবে, অন্য কারো নয়। ভুলেও আমার ওপর ছড়ি ঘোরানোর চেষ্টা করবেনা নূরিয়া তাজদিন। খুব খারাপ হবে বলে দিলাম।”

আনাবিয়া নিজের সামনে বার্থার বাড়িয়ে দেওয়া হাতের দিকে তাকালো একবার, বলল,
“আমি মানুষের স্পর্শ পছন্দ করিনা, আমার শরীর টাচ হওয়ার আগেই তোমার হাত সরাও। আর ব্রায়ান ওখানে বসেই খাবে, ও যদি ওখানে বসে না খেতে পারে তবে এই ক্যাফেটেরিয়া আস্ত থাকবেনা, আর না থাকবে তুমি।”
“কেন? তোর বাপের ক্যাফেটেরিয়া নাকি এটা, যে চাইলেই ভেঙে ফেলবি?
“উহুম, বাপের নয়, আমারই৷”

কথাটি বলে আনাবিয়া দু’কদম এগিয়ে গেলো বার্থার দিকে। ওর বুক সমান বার্থা মাথা উঁচু করে, নিজেকে যথাসম্ভব শক্ত দেখানোর চেষ্টা করে দাঁড়িয়ে রইলো স্থির। আনাবিয়ার ক্রুদ্ধ দৃষ্টি ভড়কালো তাকে। আনাবিয়া ওর খুব কাছাকাছি এসে দাঁতে দাঁত চেপে হিসহিসিয়ে বলে উঠলো,
“আজ যা বলেছিস বলেছিস, ক্ষমা করে দিলাম। দ্বিতীয়বার আমার বাপ তুলে কথা বললে তোর এমন অবস্থা করবো, তোর বাপের নাম যে মুরসালিন জাবিন সেটাই ভুলে যাবি, মাইন্ড ইট!”
বার্থা ওর ওই ধ্বংসাত্মক দৃষ্টির সামনে অস্বস্তি বোধ করলো প্রচন্ড। দ্রুত পায়ে, বিনাবাক্য ব্যয়ে তৎক্ষনাৎ সে বেরিয়ে গেলো ক্যাফেটেরিয়া থেকে। আনাবিয়া চোয়াল শক্ত করে একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলে শান্ত করার চেষ্টা করলো নিজেকে। ফিরে এসে আবার ধপ করে বসে পড়লো চেয়ারে।
ব্রায়ান তখনো দাঁড়িয়ে, উত্তপ্ত পরিবেশ দেখে কোনদিকে যাবে, কি করবে ঠাহর করতে পারছেনা। আনাবিয়া চোখ ঘুরিয়ে তাকালো ওর দিকে। ব্রায়ান তৎক্ষনাৎ চেয়ারে বসে খাওয়া শুরু করলো ব্যাস্ত ভঙ্গিতে।
সেলিন আর লিভয় এতক্ষণ বিস্মিত হয়ে দেখছিলো ওকে।লিভয় আস্তে আস্তে পাশ থেকে উঠে গুটিগুটি পায়ে বেরিয়ে গেলো বাইরে৷ সেলিন ওর যাওয়ার পানে একবার তাকিয়ে আনাবিয়ার দিকে এগিয়ে দিলো কোল্ড ড্রিংকস এর ক্যান। ভয়ে ভয়ে বলল,

“এটা খাও, মাথা ঠান্ডা করো।”
আনাবিয়া সেটা উঠিয়ে নিয়ে চুমুক দিলো। কোল্ড ড্রিংকস খাওয়া নিষেধ তার, বাইরের কোনো পানীয়ই গ্রহণের অনুমতি নেই। আনাবিয়া দুটো চুমুক দিলো পরপর। এসব নিষেধ মানতে তার আর ইচ্ছে করেনা।
মীর তাকে বাইরের খাবারও খেতে দেয়নি কখনো, যেটাই খেতে চেয়েছে প্রাসাদের দক্ষ শেফের হাতে তৈরি হয়েছে তা, তবুও বাইরে নয়। ফাস্ট ফুডের ক্ষেত্রে পুরোপুরি নিষেধাজ্ঞা, স্ট্রিট ফুডের কথা তো উচ্চারণই করা যাবে না!
ক্যানটা পাশে রেখে টেবিলের ওপর দুহাত ভাজ করে মাথা রাখলো আনাবিয়া। জীবনটা তেতো হয়ে গেছে, কোনোদিকে কোনোভাবেই আর ভালো লাগে না, অস্বস্তি আর অস্বস্তি! কোথাও যেন শান্তি বেঁচে নেই আর! সেলিন ডাকতে চাইলো ওকে, জানতে চাইলো কোনো অসুবিধা হচ্ছে কিনা। কিন্তু ব্রায়ান ইশারায় মানা করে দিলো তাকে। চুপচাপ বসে অল্প অল্প করে খেতে রইলো দুজনেই।
লিভয় এলো তখুনি। হাতে এক গুচ্ছ টকটকে লাল গোলাপ নিয়ে বসে পড়লো আনাবিয়ার পাশে। ওকে এভাবে দেখে সেলিনকে ইশারায় জিজ্ঞেস করলো কি হয়েছে৷ সেলিন দুদিকে মাথা নাড়িয়ে জানিয়ে দিলো সে জানেনা, পরক্ষণেই ফিসফিসিয়ে বলল,

“আমি ভেবেছি তুমি ভয় পেয়ে পালিয়ে গেছো।”
লিভয় হেসে উঠলো নিঃশব্দে। আনাবিয়ার সামনে রাখলো গোলাপের তোড়াটি। নরম সুরে ডাকলো,
“নূর, নূর…!”
আনাবিয়া মাথা তুললো। নিজের সামনে এমন টকটকে লাল গোলাপের সমাহার দেখে মুহূর্তেই মন ভালো হয়ে গেলো তার! মুখে ফুটে ওঠা অবসাদ কেটে গেলো অবিলম্বে। লিভয় পাশ থেকে বলে উঠলো,
“তোমার জন্য…..”
আনাবিয়া ওর দিকে তাকাতেই ভড়কে গিয়ে কৈফিয়তের স্বরে বলে উঠলো,
“জাস্ট….জাস্ট অ্যাজ অ্যা ফ্রেন্ড, নাথিং এলস্‌। তোমার মন খারাপ তাই, এছাড়া কোনো কারণ নেই, আ’ সয়্যার।”
আনাবিয়া দুহাতে তুলে নিলো ফুলগুলো, কাছে নিয়ে বুক ভরে ঘ্রাণ নিলো, মৃদু স্বরে বলল,
“থ্যাঙ্কস, আই ব্যাডলি নিডেড দ্যাট!”
পরক্ষণেই চেয়ার ছেড়ে উঠে কাউকে কিছু না বলেই বেরিয়ে গেলো বাইরে৷

গোলাপের তোড়াটি হাতে নিয়ে হাটতে হাটতে একসময় ভার্সিটি থেকেই বেরিয়ে এলো আনাবিয়া।
রাস্তায় লোকসমাগম কম, হাতে গোনা কয়েকজন ফুটপাত দিয়ে চলেছে গন্তব্যে। চকচকে স্ট্রিট লাইট গুলোর নিচে দাঁড়িয়ে হাসিমুখে গল্প করছে কয়েক জোড়া দম্পতি, বাড়ি ফেরার তাড়া নেই তাদের।
আনাবিয়া হাটতেই রইলো, হাটতেই রইলো। আশেপাশে বোধ হয় কোনো জঙ্গল আছে, একবার ঘুরে দেখতে পারলে মন্দ হয়না। আনাবিয়া এগোলো সেদিকে। বেশি বড় নয়, ছোট খাটো বন। মেহগনি আর চন্দন গাছের সমাহার, মাঝে মাঝে থোকায় থোকায় ঝোপঝাড়। ভালো লাগলো ওর, কেমন যেন শান্তি শান্তি অনুভূতি।
কিছুটা গভীরে যেতেই নিরব হয়ে এলো সব, শহরের কোলাহল পৌছোলোনা এ পর্যন্ত। দূরে কয়েকটি শেয়াল ছুটতে ছুটতে দাঁড়িয়ে গেলো ওকে দেখে, জ্বলজ্বলে চোখে লেজ নাড়াতে রইলো আদুরে ভঙ্গিতে। আনাবিয়া মিষ্টি হাসলো, এগিয়ে যেতে চাইলো ওদের দিকে। কিন্তু শেয়াল গুলো আচমকা ভীত হয়ে দ্রুত পায়ে ছুটে পালালো কোনো এক দিকে।

বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৭৭

ওদের যাওয়ার পানে চেয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেললো আনাবিয়া। আকাশের দিকে তাকালো একবার। বাজ টাকে আর দেখছেনা, একটু আগেও অনুসরণ করছিলো ওকে। হাঁফ ছেড়ে বাঁচলো যেন ও, কোথাও ওর একটু প্রাইভেসি নেই, সারাটাক্ষন কেউ না কেউ নজর রেখে চলেছে তার ওপর৷
সেই মুহুর্তেই আচমকা বুকের ভেতর ধক করে উঠলো তার, হৃৎপিণ্ডের গতি বেড়ে গেলো মুহুর্তেই। খাড়া হয়ে গেলো শরীরের সমস্ত পশম, আঁতকে উঠে পেছনে তাকাতেই শুভ্র মুখখানা আঁটকে গেলো কারো প্রশস্ত, পুরুষালি বক্ষ….

বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৭৯