বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৯৪
রানী আমিনা
রাজসভার গুরুত্বপূর্ণ মিটিং শেষ করে অনেক রাতে রয়্যাল ফ্লোরে ফিরলো মীর৷ সাইয়্যিদ কাঁদছে তার কামরায়, হঠাৎ করেই শরীর খারাপ হয়েছে তার৷ হেকিম এসে দেখে গিয়েছেন, আবহাওয়া পরিবর্তনের কারণে সিজনাল ফ্লু ছড়িয়েছে চারদিকে। তার প্রভাব শেহজাদার শরীরেও পড়েছে৷
মীর এ নিয়ে রাগারাগি করেছে অনেক। সাইয়্যিদের দুধমা মাহ্নূর নিয়মিত তার স্বামীকে হাসপাতালে দেখতে যায়, মীরের ধারণা নিজের সাথে করে ফ্লু সে-ই প্রাসাদে নিয়ে এসেছে৷ আপাতত তার বাইরে বের হওয়া সম্পুর্ন বন্ধ৷
মহসিন বারান্দাতেই ছিল। মীর ওকে দেখে জিজ্ঞেস করলো,
“শিনজোর খাবার পাঠিয়েছো?”
“জ্বি ইয়োর ম্যাজেস্টি৷ লিও কাঞ্জি ভাইজান সন্ধ্যার পরেই পৌঁছে দিয়ে এসেছেন।”
মীর নিরবে ঢুকে পড়লো নিজ কামরায়৷ শেহজাদাদের নিয়ে আনাবিয়া ট্রি হাউজে পাকাপোক্ত ভাবে শিফট হয়েছে সপ্তাহ দুই হলো। ছোট খাট কুঠুরি সদৃশ কোটর টায় ওরা ছ’জনে বেশ ভালোভাবেই ধরে যায়। মীর সারাদিন পর প্রাসাদ ছেড়ে সেখানেই হানা দেয়৷ আনাবিয়া যদিও বিছানায় জায়গা রাখেনা ওর জন্য, অগত্যা মীরকে বালিশ কাঁথা নিয়ে মেঝেতে ঘুমোতে হয়৷ অক্টোবরের শেষ প্রায়, শীত শীত লাগে ভোরের দিকে। কিছুদিন ধরে কাশি লেগে আছে, তবুও তার এখানেই ঘুমোনো চাই।
আনাবিয়া বলেনা কিছুই, বারণও করেনা৷ মীর নিজ ইচ্ছেতে আসে, আনাবিয়া ঘুমোলে রাতে বাচ্চাদের খেয়াল রাখে, ভোরে আবার নিজ ইচ্ছেতে চলে যায়৷ প্রাসাদ থেকে তিন বেলা খাবার পাঠানো হয় আনাবিয়ার জন্য, আনাবিয়ার পছন্দের সব খাবার, সাথে হেকিম নির্ধারিত খাবার।
এখনো একাই থাকে সে ও এলাকায়। অন্যদের বসবাসের নিষেধাজ্ঞা এখনো পর্যন্ত জারি আছে। ফ্যালকন আসে কখনো কখনো, শেহজাদাদের দূর থেকেই দেখে সে। আনাবিয়াকে কিছুক্ষণ সঙ্গ দিয়ে আবার চলে যায়, নিয়মিত দেখা করায় আনাবিয়ার বারণ আছে৷
মীর তড়িঘড়ি গোসল খাওয়া শেষ করলো। রাত অনেক হয়ে গেছে, এতক্ষণে হয়তো ঘুমিয়েও পড়েছে আনাবিয়া৷ তৈরি হয়ে বাইরে বের হল সে, তখনি বারান্দায় মহসিনের পেছনে বিরাট বিরাট বক্স হাতে কয়েকজন পুরুষকে দেখে ভ্রুতে ভাজ ফেললো সে। মীরকে দেখা মাত্রই মাথা নত করে আনুগত্য জানালো ওরা। মীর কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই মহসিন বলে উঠলো,
“ইয়োর ম্যাজেস্টি, আর্মি চিফের পক্ষ থেকে সব শেহজাদাদের জন্য উপহার এসেছে।”
মীর প্রতি উত্তরে বলল না কিছুই। মহসিন সাইয়্যিদের উপহার তার কামরায় পাঠিয়ে পাঁচ শেহজাদার উপহার আনাবিয়ার কামরাতে রাখতে চলে গেলো। আনাবিয়ার কামরা ভর্তি হয়ে আছে শেহজাদাদের জন্য পাঠানো উপহারে। মহসিন পর্যাপ্ত জায়গার সংকটে পড়লো, তবুও কোনোমতে ঠিকঠাক করে রাখলো সেগুলো।
মীর পরণের পাতলা সাদা রঙা শার্টের বোতাম আঁটকাতে উদ্যত হয়ে গিয়ে দাঁড়ালো সাইয়্যিদের কামরার সামনে। টোকা দিলো কয়েকবার। ক্ষণিক পরেই মাহ্নূর মেয়েটা দরজা খুললো, ওকে দেখেই সরে দাঁড়ালো একপাশে। মীর ঢুকলো ভেতরে। সাইয়্যিদ ঘুমিয়ে আছে দোলনায়, ক্ষণিক পর পর ঠোঁট ফুলে কেঁপে উঠছে তার। গা থেকে উত্তাপ উঠছে যেন!
মীর হাটু গেড়ে বসলো দোলনার পাশে, স্নিগ্ধ হয়ে এলো তার দৃষ্টি। সাইয়্যিদের উত্তপ্ত ললাটে হাত বুলিয়ে একটা স্নেহের চুম্বন বসিয়ে দিলো সে৷ বাবার স্পর্শে ঠোঁট ফুলানি কম হলো সাইয়্যিদের, শান্ত হয়ে এলো সে, নড়েচড়ে ঘুমোলো আবার। ওর ছোট্ট হাত জোড়া নিজের মুঠির ভেতর আঁকড়ে ধরলো মীর, ক্ষণিক ওর ঘুমন্ত, উত্তপ্ত ছোট্ট মুখখানার দিকে চেয়ে থেকে উঠে পড়লো আবার। পরক্ষণেই বেরিয়ে গেলো কামরা থেকে৷
ট্রি হাউজের দরজা ঠেলে মীর ঢুকলো ভেতরে। আনাবিয়া ঘুমিয়ে পড়েছে, বাচ্চারা ঘুমোচ্ছে ওর গায়ের সাথে লেপ্টে। দোলনায় ঘুমোতে চায়না একটাও, মায়ের থেকে দূরে রাখলেই তারস্বরে চিৎকার শুরু করে। কান্না নয়, তেজের চিৎকার, যেন এখুনি ভেঙে ফেলবে সব।
আরসালান জেগে আছে, মায়ের পেটের ওপর শুয়ে হাত পা ছুড়ছে৷ সারাদিন ঘুমিয়ে সে রাতে জেগে থাকে। মীরের উপস্থিতি টের পেয়ে হাত পা ছোড়ার বেগ দ্বিগুণ হল তার, দুহাত আকাশে উঁচিয়ে ধরে রইলো যেন বাবা এসে তাকেই কোলে তুলে নেয়৷
মীর করলোও তাই, মীষ্টি করে হেসে তুলতুলে বাচ্চাটিকে তুলে নিলো বুকের ওপর। ভয় পেতো প্রথমে, এত ছোট্ট ছোট্ট বাচ্চা সে কিভাবে কোলে নিবে, কিভাবে হাতে ধরবে বুঝতে পারতোনা। কিন্তু এখন সয়ে গেছে।
কপালে চুম্বন বসিয়ে দিয়ে আরসালানকে বুকে করে মেঝেতে নিজের বিছানা করতে ব্যাস্ত হয়ে পড়লো সে। আরসালান বাবার কাঁধে মুখ লাগিয়ে মরিয়া হয়ে খাবার খুঁজতে লেগে পড়লো। মীর চাপা স্বরে গা কাঁপিয়ে হাসলো তাতে, বিছানা তৈরি রেখে আরসালানকে আনাবিয়ার বুকের ওপর শুইয়ে খাওয়ার ব্যাবস্থা করে দিয়ে বিছানা তৈরি শেষ করলো।
আনাবিয়া গভীর ঘুমে, থেকে থেকে মিহি সুরে নাক ডাকাচ্ছে। মীর এসে কিছুক্ষণ স্নিগ্ধ চোখে চেয়ে ওর কপালেও বসালো চুম্বন। মীরের চুম্বনে ঘুম পাতলা হয়ে এলো আনাবিয়ার, নড়েচড়ে পাশ ফিরে ঘুমোতে নিলো সে। মীর তৎক্ষনাৎ দুহাতে জাঁপটে ধরলো ওকে, আনাবিয়া ধড়মড়িয়ে উঠে পড়লো তখনি। কিংকর্তব্যবিমুঢ় হয়ে মীরের দিকে ঘুমঘোর, বিস্মিত চোখে চেয়ে হতভম্ভের ন্যায় জিজ্ঞেস করলো,
“কি হয়েছে? কিছু হয়েছে?”
“চ্যাপ্টা করে দিতে যাচ্ছিলে তোমার দুই বাচ্চাকে। তোমার বাচ্চা যে একটা নয় এটা মনে রাখতে হবে তো!”
কৌতুকের স্বরে বলল মীর। আনাবিয়া ঘাড় ঘুরিয়ে দেখলো পাশে, ফিরাস আর কাসওয়ার শুয়ে সেখানে। ও উঠে পড়ায় বিছানায় আছড়ে পড়ে মোচড়াতে শুরু করলো দুজনেই, পরক্ষণেই ঠোঁট ফুলিয়ে শুরু করলো কান্না! আনাবিয়া দুজনকে সাথে সাথেই উঠিয়ে নিলো কোলে।
আরসালান মীরের হাতে, মাঝপথে খাবারে বাঁধা পড়ায় সে যে খুবই বিরক্ত সেটা তার ভ্রুর ভাজ দেখেই টের পাওয়া গেলো। খাবার দিতেই ওরা দুজন কান্না থামিয়ে ফুলে ফুলে উঠে ঘুমোতে রইলো আবার। আনাবিয়া মীরের দিকে ফিরে তেজস্বী গলায় বলল,
“যেমন বাপ তেমন তার ছেলেরা!”
“আমার ছেলেরা আমার মতো হবেনা তো কার মত হবে? শুকরিয়া করো যে ওরা তোমার মত হয়নি, নইলে তুমি যা করেছো বাচ্চাবেলায় তাতে এত গুলো সামলাতে গিয়ে সালিম ভাইজানের নাম ভুলে যেতে৷”
“হুহ্!”
মুখ বেকিয়ে অন্যদিকে ফিরে বসলো সে৷ মীর নিজের কোলে থাকা আরসালানকে দেখিয়ে বলল,
“ওদের পেট ভরলে এটাকে খাওয়াবে, এটার থেকে খাবার ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে বলে সে তেজে শক্ত হয়ে গেছে।”
“একবার বলেছি আমার বাচ্চাদের সাথে ভদ্রভাবে কথা বলবে, এটা ওটা করবেনা। লাস্ট ওয়ার্নিং দিলাম তোমাকে!”
“না মানলে কি করবে?”
“প্যাম্পার্সের ভেতরের পাশ মুখে ঢুকিয়ে দিব।”
“আচ্ছা, দিও৷ আপাতত ওই দুটোকে রেখে এটাকে খাওয়াও।”
আনাবিয়া ঝলসানো চোখে তাকালো ওর দিকে। মীর মিষ্টি করে হাসলো তাতে, সাথে ছুড়ে দিলো একটা উড়ন্ত চুম্বন। মেঝের বিছানায় শুয়ে গলা খাকারি দিয়ে বলল,
“কেউ একজন আজকাল নাক ডাকাচ্ছে।”
“এহ্, ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে বাঘের মত গর্জন তোলা ব্যাক্তিও আজকাল অন্য মানুষের নাক ডাকা নিয়ে খোঁচা দেয়। আমার বাচ্চা গুলো যে দৈত্য ভেবে ভয়ে কাঁদেনা এটাই অনেক।”
“আমি একদমই নাক ডাকাই না।”
“হুম, জেগে জেগে ঘুমোও তো!”
“প্রমাণ না দিলে বিশ্বাস করিনা।”
“এবার রেকর্ড করে শুনোবো, নিজের গর্জনের ভয়ে নিজেই দৌড় মারো কিনা দেখিও।”
মীর হাসলো সশব্দে, বিছানা থেকে মিশআল আর জিবরানকে উঠিয়ে নিলো নিজের বুকের ওপর। তার সবচেয়ে শান্ত দুই বাচ্চা, ক্ষুধা পেলেও কান্না করেনা, আরসালানের মত তেজও দেখায় না, চেয়ে থাকে মায়ের দিকে৷ আনাবিয়ার উদ্দ্যেশ্যে বলে উঠলো,
“দেখেছো, তোমার রঙ পাওয়া ছেলে দুটোই তোমাকে বিরক্ত করছে, একদম তোমার মত হয়েছে। আমার রঙ পাওয়া বাচ্চা দুটোকে দেখো! এরকম ভদ্র সভ্য বাচ্চা যে তুমি আমার বদৌলতে পেয়েছো তাতে তোমার আমাকে হাজার খানেক চুমু খাওয়া উচিত।”
“অনেক কম বলে ফেললে।”
“তাহলে কোটি খানেক খেয়ো, আমি কিছু মনে করবো না।”
“চুপ করে ঘুমোও, আমাকে বিরক্ত করবেনা৷ আর রোজ রোজ তোমাকে এখানে কে আসতে বলে? প্রাসাদে থাকবে, এখানে এসে ঢং করার দরকার নেই তো।”
“আমি না এলে তো তুমি আমার ছানাগুলোকে চিড়ে চ্যাপ্টা করে ফেলবে৷ আমি তো দুর্ঘটনা ঘটার ভয়ে চলে আসি।”
আনাবিয়া প্রতি উত্তরে কিছু বললনা। ফিরাশ, কাসওয়ারকে বালিশে শুইয়ে দিয়ে আরসালানকে বুকে নিয়ে শুয়ে পড়লো। আরসালান খেতে খেতে হাত পা ছুড়তে রইলো আগের মতোই৷ নিরবতা ভেঙে মীর হঠাৎ বলে উঠলো,
“শিনজো, মেইক আ উইশ।”
আনাবিয়া স্থীর হলো ক্ষণিকের জন্য। ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালো পেছনে, বলল,
“আগামী এক সপ্তাহ তুমি এইখানে রাত কাটাতে পারবেনা।”
মীর প্রতিবাদ করে কিছু বলতে নিবে তখনি আনাবিয়া আবার বলে উঠলো,
“কোনো কথা বলবেনা৷ তুমি আমার উইশ কখনো অপূর্ণ রাখোনা, সুতরাং তোমার কাছে সুযোগ নেই উপেক্ষা করার। যদি করো তবে ভেবে নিব তুমি আমাকে কখনো ভালোবাসোনি৷”
মীর মিইয়ে গেলো, বেদনাতুর চোখে চেয়ে রইলো সে আনাবিয়ার দিকে৷ নেমে যাওয়া স্বরে শুধোলো,
“এমন করো কেন? তুমি জানো যে আমি ওদের ছাড়া, তোমাকে ছাড়া ঘুমোতে পারবোনা, জেনে শুনেও এমন করো। এরকম ব্যাবহার পাওয়ার মতো কিছুই করিনি আমি।”
আনাবিয়া উত্তর দিলোনা। আরসালানকে ঘুম পাড়াতে ব্যাস্ত হয়ে উঠলো। মীর উত্তরের জন্য অপেক্ষা করলো কিছুক্ষণ। আনাবিয়ার কোনো সাড়া শব্দ না পেয়ে হতাশ হয়ে বিছানায় শরীর ছেড়ে দিলো সে। ক্ষণিক পরেই শ্বাস ভারী হয়ে এলো তার৷
আনাবিয়া উঠে এলো সন্তর্পণে। মীরের ঘুমন্ত, ক্লান্ত মুখখানাকে দেখলো ক্ষণিক৷ ঝুঁকে ওর কপালে নরম ঠোঁট ছুইয়ে দিয়ে ফিরে এলো আবার বিছানায়৷
পর পর কয়েক রাত মীর সত্যিই আর আসলোনা৷ আনাবিয়া প্রথম কয়েকদিন মনের অজান্তেই অপেক্ষা করতো, অপেক্ষার মাঝেই ঘুমিয়ে পড়তো কখন! বাচ্চাদের দোলনায় রাখতো, ভয় হতো কখন না জানি ঘুমের মাঝে উঠে পড়ে ওদের ওপর৷ ওরা কাদলে উঠে পড়তো, ঘুমের ঘোরে কাকে খাওয়াতে কাকে খাওয়াতো বুঝতে পেতো না৷
আজ অনেক রাত হওয়ার পরও ঘুম ধরলোনা আনাবিয়ার, বুকের ভেতর কোথাও দুঃখ দুঃখ বোধ হলো। একা পাঁচ বাচ্চা সামলানো যে তার পক্ষে সম্ভব নয় এটা গত ক’দিনেই বুঝে গেছে সে৷ মীর থাকতে রাতে খুব কমই ঘুম ভেঙেছে তার, ওর ঘুম না ভাঙিয়েই মীর কিভাবে বাচ্চাদের খাইয়ে দিতো, ও টেরও পেতো না৷ সেদিন অমন কঠিন উইশ করা ঠিক হয়নি হয়তো তার, নিজের পায়ে নিজেই কুড়াল মেরেছে।
বাচ্চারা ঘুমোলো সব, আরসালান বরাবরের মতোই জেগে রইলো। নিশাচর হয়েছে ছেলে তার৷ আনাবিয়া তাকালো ওর দিকে, সৃষ্টিকর্তা যে দুজনকে এভাবে একত্রে করে পৃথিবীতে এনে দিবে সেটা তার জানা ছিলনা! আরসালানকে দেখতে দেখতেই আচমকা মীরকে ভীষণ মনে পড়তে রইলো তার। রোজ যত রাতই হোক ছুটে আসতো, এসেই কোলে তুলে নিত কাউকে। আনাবিয়া ঘুমিয়ে গেলে কখনোই বুঝতোনা কোন সময়ে আসতো মীর, খুব চুপিচুপি এসে বাচ্চাদের ভালোভাবে শুইয়ে দিত, ন্যাপকিন বদলে দিত, ক্ষুধা পেলে যেন কান্না করে আনাবিয়ার ঘুম না ভেঙে দেয় তারও ব্যাবস্থা রাখতো সে।
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আরসালানের কপালে চুমু খেয়ে আনাবিয়া মিষ্টি গলায় বলল,
“থাকো আমার বাবা, ভাইদের পাহারা দিও। মা এখনি আসছে৷”
বলেই বেরিয়ে গেলো সে৷
আকাশে বাঁকা চাঁদ, আশপাশটা বেশ পরিষ্কার। কয়েকটা জোনাকি মিটমিট করে জ্বলছে দূর জঙ্গলের ভেতর। থেকে থেকে নেকড়ের করুণ ক্রন্দনধ্বনি ভেসে আসছে গভীর জঙ্গল থেকে৷ আনাবিয়া হেটে চলেছে প্রাসাদের দিকে, দূর থেকে মীরকে একটু দেখেই চলে আসবে এমনটাই পরিকল্পনা। বেশি কাছে গেলে মীর টের পেয়ে যাবে, পরে ওকে দুর্বল ভেবে খোঁচাবে৷
পরণে তার পাতলা গাউন, মাটিতে টেনে চলেছে। বৃষ্টি হয়েছে সন্ধ্যায়, মাটি ভেজা৷ আনাবিয়া দুহাতে গাউন টেনে তুলে মাটিতে দেখে হাটতে রইলো। বৃষ্টিতে সাপ পোকা মাকড় বেরিয়ে টো টো কম্পানি করার সম্ভাবনা অনেক বেশি৷ পোকা মাকড় তার ধারে কাছে না এলেই হলো।
কিছুদূর আসতেই আনাবিয়ার পা আঁটকে গেলো কাদায়, সফেদ জুতা জোড়া কাদায় মাখামাখি হলো। মুখ বিকৃত করে আনাবিয়া পা থেকে জুতা খুলে হাতে নিলো, দুইটা ঝাঁকুনি নিয়ে মেখে যাওয়া নরম কাদা ফেলে দেওয়ার চেষ্টা করলো জুতা থেকে। সেই মুহুর্তেই আচমকা কেঁপে উঠলো তার বুকের ভেতর৷ চমকে উঠে এদিক ওদিক তাকালো সে।
অকস্মাৎ অদূর জঙ্গলে কারো ছায়া নজরে এলো ওর, এগিয়ে আসছে এদিকেই। মীর! সর্বনাশ!
আনাবিয়া জুতা জোড়া হাতে নিয়েই উলটো দিকে সজোরে ছুটে পালালো! সে ছোটা শুরু করতেই পেছন থেকে ভেসে এলো মীরের ধমকানো স্বর,
“অ্যাই দাঁড়াও, অ্যাই কোথায় পালাচ্ছো, দাঁড়াও বলছি!”
আনাবিয়া দাঁড়ালোনা, এভাবে ধরা পড়ে যাবে সে ঘূর্ণাক্ষরেও ভাবেনি৷ ছুটতে ছুটতেই কাদায় আচমকা পা পিছলে গেলো তার, আছাড় খেয়ে পড়তে নিতেই মীর এসে সজোরে বুকে জাপটে ধরলো ওকে, ধমকে বলল,
“অযথা ছুটছো কেন? আমি তোমাকে খেয়ে ফেলবো নাকি?”
“ফেলতেও পারো, একসময় তো কাঁচা মাংস গিলেছো।”
“তোমাকে খাওয়ার কিছু বাদও রাখিনি। এখন বলো এত রাতে ওদিকে কোথায় যাচ্ছিলে?”
আনাবিয়া চুপসে গেলো, কি বলবে বুঝতে পেলোনা। মীরের সাথে মিথ্যা বলার অভ্যাস নেই তার, বলতে গেলেই ঘুলিয়ে ফেলে! গলা খাকারি দিয়ে কিছু বলবে তখনি খেয়াল হলো সে মীরের আলিঙ্গণের ভেতর৷ বাঁজখাই গলায় বলে উঠলো,
“এভাবে ধরে রেখেছো কেন? ছাড়ো বলছি!”
মীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে ওকে ছাড়তেই আনাবিয়া গটগট পায়ে ট্রি হাউজের দিকে এগোলো। মীর ছুটে গিয়ে দাঁড়ালো ওর পথ আগলে, বলে উঠলো,
“কথার উত্তর না দিয়ে কোথায় চলে যাচ্ছো?”
“দেখতে পাচ্ছোনা? নাকি বয়সের ভারে চোখে ছানি পড়েছে?”
“ওদিকে কেন যাচ্ছিলে? আমাকে দেখতে?”
“কি এমন নায়ক হয়েছো যে তোমাকে দেখতে যাব? আমি হাওয়া খেতে বেরিয়েছিলাম।”
“তো পালাচ্ছিলে কেন?”
“পালাচ্ছিলাম কোথাকার কোন দানব হানা দিয়েছে সেই ভয়ে৷”
“তুমি ভয়ও পাও? জানতাম না তো!”
“এখন জানলে।”
মীর পাশের ওক গাছটায় বাহুতে হেলান দিয়ে দাঁড়ালো, ঠোঁটের কোণ বাকিয়ে ভ্রু নাচিয়ে জিজ্ঞেস করলো,
“মিস মি?”
“এহ্!”
অবজ্ঞার স্বরে বলল আনাবিয়া, মীর চোখ মারলো তৎক্ষনাৎ। আনাবিয়ার গালে রক্তিম আভা দেখা দিলো তৎক্ষনাৎ, ঝাঁঝিয়ে বলে উঠলো,
“এখানে এসে একদম বখাটে গিরি করবেনা বলে দিলাম।”
“তুমি ব্লাশ করছো কেন?”
ঠোঁট টিপে হেসে বলল মীর, আনাবিয়া নিজের দুগালে তৎক্ষনাৎ হাত বুলিয়ে বলল,
“অন্ধকারে চোখে ভুলভাল দেখছো, প্রাসাদে যাও৷ এত রাতে জঙ্গলে এসেছো কোন আনন্দে?”
“এইতো, হাওয়া খেতে৷ রোজই আসি, নতুন নয়তো।”
“এ ক’দিনও এসেছো?”
“অবশ্যই।”
“তোমাকে কি বলেছিলাম? বলেছিলাম না এখানে আসলে আমি ভাববো তুমি আমাকে কখনো ভালোবাসোনি?”
“বলেছো ‘এখানে’, কোথায় সেটা তো নির্দিষ্ট করে বলোনি। সুতরাং তোমার ট্রি হাউজ ব্যাতিত আমি আর সবখানেই যেতে পারি, এমনকি আমি ট্রি হাউজেও যেতে পারি। কারণ তুমি বলেছিলে আমি যেন এখানে রাত না কাটাই, আমি তো পুরো রাত কাটাচ্ছিনা। সো আমি তোমার উইশও ভঙ্গ করিনি।”
“তবে তুমি এ ক’দিন রোজ এসেছো ট্রি হাউজে?”
মীর ভ্রু তুলে দুষ্টু হাসলো। আচমকাই নিজের পায়ের দিকে নজর দিল সে, ঠান্ডা কোনো কিছু ধীরে ধীরে উঠছে তার পা বেয়ে, ট্রাউজারের ভেতর৷ মীর সাবধানে ঝুঁকে দেখলো, একটা মাঝারি আকারের পাইথন ধীরে ধীরে ঢুকে যাচ্ছে তার ট্রাউজারের ভেতর, হাটুর ওপর উঠে পড়েছে৷
অস্ফুটে একটা গালি দিয়ে সেটার লেজ ধরে সজোরে টেনে দূরে ছুড়ে ফেলে দিল সে৷ আনাবিয়া ঠোঁট চেপে হাসি আঁটকালো, বিড়বিড়িয়ে বলল,
“জাত ভাইয়ের সাথে দেখা করতে যাচ্ছিলো মনে হয়।”
“শুনতে পেয়েছি।”
“ভালো হয়েছে।”
ভেঙচি কেটে বলল আনাবিয়া। পরক্ষণেই এগোলো ট্রি হাউজের পথে। মীর পেছন থেকে আবদারের ভঙ্গিতে উচ্চস্বরে বলে উঠলো,
বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৯৩
“অ্যাই আমি আসবো? কিছুক্ষণ থেকেই চলে যাবো, প্রমিস!”
আনাবিয়া উত্তর দিলনা, চলতে রইলো। মীর ক্ষণিক দাঁড়িয়ে থেকে অপেক্ষা করলো অনুমতির। কোনো সাড়া না পেয়ে নিরবতাকেই সম্মতি ধরে নিয়ে নিজ দায়িত্বে এগোলো ওর পেছন পেছন।
