বাবুই পাখির সুখী নীড় পর্ব ৬৬
ইশরাত জাহান
অনেকদিন পর ভার্সিটিতে এসে মনটা ফুরফুরে লাগছে শোভার কাছে।দিজা হাতের মোবাইলটা দেখে শোভার উদ্দেশে বলে,“তুমি তোমার ডিপার্টমেন্টে যাও।আমি আমার ক্লাসে যাচ্ছি।তোমার ক্লাস শেষে আমাকে কল দিও।”
শোভা সম্মতি দিয়ে চলে যায়।তুহিন ভয় পেতে শুরু করে।না জানি একটু পর কি হয়! দিজার উদ্দেশে বলে,“ভাবীকে প্লিজ সামলে নিও।আর হ্যাঁ ক্লাস শেষ করে ভাবীকে নিয়ে সোজা আমার কাছে আসবে।আমি তোমাদের নিয়ে ফিরব।”
দিজা আমতা আমতা শুরু করে।কিছুক্ষণ ধরে হাত কচলে বলে,“আমার খালাতো বোন আসবে।আমরা মাঠেই থাকবো নাহয়।আপনি কাজ শেষ করে আমাকে কল দিবেন।আমি অপেক্ষায় থাকব আপনার।”
তুহিন একপলক চাইলো দিজার মুখোশ্রীতে।অতঃপর মুখে কোনো প্রতিক্রিয়া দেখালো না।গম্ভীর চাপা ভাব নিয়ে চলে গেলো।দিজা নিজের ডিপার্টমেন্টে চলে গেলো।
আজ শোভা ক্লাসে ঢুকলো। বেঞ্চের দিকে তাকাতে পিছনের দিকে আর একেবারে সামনের দিকে সিট ফাঁকা পেলো।এখানে হিজাব বাধা মেয়ে অনেক আছে কিন্তু শোভার মতো একেবারে হাত মুখ ঢেকে কেউ নেই।শোভা তো হাত মোজাও পরে আছে।অনেকেই শোভাকে দেখে আস্তে আস্তে কি যেনো কথা বলছে।শোভার মধ্যে খারাপ লাগা কাজ করে।মনে মনে বলে,“মিস্টার ফরাজি তাহলে ভুল কিছুও করেনি।আমাকে ভার্সিটিতে না পাঠিয়ে ভালই করে।এরা আমার পর্দা করা নিয়ে মজা নিচ্ছে।মন তো চাচ্ছে ওদের মাথা ফাটিয়ে দেই।”
এর মধ্যে আরেকটা মেয়ে টপ জিন্স পরে দৌড়ে এলো একটা সুদর্শন যুবকের কাছে।দুজনে দুজনকে জড়িয়ে ধরে বলে,“আই মিস ইউ দোস্ত।”
যুবকটি বলে,“ইয়ার অনেক মিস করেছি রে।তারপর বল হবু বর কালকে সারাদিন কোথায় কোথায় নিয়ে গেলো?”
মেয়েটা কোমর বেকিয়ে মুখে হাসি ফুটিয়ে বলে,“অনেক অনেক জায়গায়।আর আমাকে শুধু ঘুরতেই নিয়ে যায়নি আমাকে বসুন্ধরা থেকে শাড়ি কিনে দিয়েছে।”
শোভা চমকে গেলো।এই মেয়ের হবু বর আছে আবার নিজের বন্ধুকে জড়িয়ে ধরে।নাকমুখ কুঁচকে বলে,“নাউজুবিল্লাহ,আস্তাগফিরুল্লাহ।আল্লাহ মাফ করো আমার চোখকে আল্লাহ।বেশড়ম মেয়েমানুষ!এই জন্যই মিস্টার ফরাজি মেয়েদের ঘৃণা করে।কি আর করবে?একেতো তার মা তাকে ধোঁকা দিয়েছে তারউপর বাইরের মেয়েগুলোই এমন।এগুলো দেখলে কেউ মেয়েদের উপর বিশ্বাস রাখে?লেখাপড়া করতে এসে কি না জড়িয়ে ধরে।ছি ছি।”
ভাবনার শোভাকে কেউ ধাক্কা দিলো।সালোয়ার কামিজ পরিহিত মিষ্টি দেখতে মেয়ে।বিনুনি করে এসেছে।শোভাকে দেখে বলে, “সরি,তাড়াহুড়ো করতে গিয়ে দেরি হলো।”
শোভা মাথা নাড়িয়ে বলে,“সমস্যা নেই।দোষ আমারও আছে।আজকে প্রথমদিন ক্লাসে আসা তো।কোথায় বসবো কি করবো বুঝতে পারছি না।”
মেয়েটা শোভার হাত ধরে দ্বিতীয় বেঞ্চে বসে বলে,“পিছনে বসে লাভ নেই ও।ওরা ফাঁকিবাজি করে।ক্লাস ফাঁকি দিতে পিছনে বসেবে।রোল কল হলেই পালাবে।আর ওদের যে গসিপ শুনলে তোমার মাথা ধরে যাবে।”
শোভা হেসে দিলো।কেউ দেখতে পায়নি।মেয়েটা বুঝলো শুধু।শোভা বলে,“এমনটা স্কুল এবং ইন্টার জীবনেও কলেজে থাকতে দেখেছি।কিন্তু আমি তো বালিকা বিদ্যালয় ও মহিলা কলেজে পড়তাম।তাই ছেলেদের সাথে মেয়েদের এভাবে চলাফেরা দেখিনি।দেখে কেমন যেনো লাগছে।স্বামী ছাড়া অন্য পুরুষদের জড়িয়ে ধরা…
শোভা থেমে সামনের দিকে তাকায়।মেয়েটা ফিক করে হেসে বলে,“আমিও গ্রাম থেকে আসা মেয়ে এসব দেখে অভ্যস্ত না।”
“তুমি গ্রাম থেকে এসেছো?কোথায় থাকো?”
“হোস্টেলে।”
“ওহ।”
“তুমি?”
“নিজের বাসায়।”
“ঢাকায় নিজস্ব বাড়ি!”
শোভার পর্দা করা দেখে একদম সাদামাটা লাগছে।গরিব ধরে নিতে সময় ব্যয় করে না কেউ।এটা মানুষের মস্তিষ্কের ব্যাপার।পরিপূর্ণকে পর্দাকে এসব সমাজের মানুষ হেয় করে বেশি।শোভা সোজাসাপ্টা ভাষায় বলে,“আমি বিবাহিত।আমার হাসব্যান্ডের সাথে থাকি এখানে।”
“তোমার নাম কি?”
“শোভা,তোমার?”
“আমার নাম হিবা।”
“সুন্দর নাম।আচ্ছা টিচার আসবে কখন?”
“এই তো আর কিছুক্ষণ বাদেই।”
শোভা চিন্তিত হয়ে বলে, “ইনকর্স কি খুব কঠিন হবে?না মানে ক্লাসে আসলে ধারণা রাখতাম।তোমার প্রস্তুতি কেমন?”
“এত তাড়াতাড়ি কিসের প্রস্তুতি নিবো?সময় হলে এমনিতেই হবে।”
“সময় হলে মানে?একটু পরেই তো পরীক্ষা।”
“কিসের পরীক্ষা?”
হিবার কথা শুনে শোভা কথা খুঁজে পাচ্ছে না।কেমন যেনো চুপসে যায়।ছাত্রী হয়ে করি পরীক্ষার ব্যাপারে না জানে তাহলে বলবেই বা কি?তবুও শোভা কিছু সাজেশন দেখিয়ে বলে, “ইনকর্সের জন্য না এগুলো?”
হিবা দেখে বলে,“হ্যাঁ এগুলো ইনকর্সের জন্য।আরো কিছু সাজেশন দিবে।”
“পরীক্ষা কবে?”
“বোর্ড পরীক্ষার আগে টেস্ট হবে।টেস্টের ডেট দেওয়ার আগে বলে দিবে স্যার, ম্যাম।কেন তুমি কি পরীক্ষা দিতে এসেছো?”
“হ্যাঁ।”
“তাহলে তুমি ভুল জেনে এসেছো।পরীক্ষা আজকে নেই।”
শোভা মনে মনে বলে,“এতবড় ভুল তুহিন ভাইয়া করবে!”
শোভা তেমন গুরুত্ব না দিয়ে ক্লাসে মন দেয়।যেহেতু এসেছে সেহেতু ক্লাস সবগুলো করার সিদ্ধান্ত নেয়।পরে নাহয় তুহিনের সাথে কথা হবে।
দিজা দুটো ক্লাস শেষ করে বাইরে আসলো।খালাতো বোন তানিয়া এসেছে।দিজা নিজেই ডেকেছিল।তানিয়ার সাথে দেখা হতেই জড়িয়ে ধরে তানিয়াকে।দুজনেই ভালো মন্দ কথা বলতে ব্যাস্ত।এর মধ্যেই তানিয়ার চোখ যায় দ্বিতীয় ফ্লোরের দিকে।তুহিন যাচ্ছে ক্লাসের দিকে তানিয়া মাথা নাড়িয়ে বলে,“লোকটা ভালো ছিল শুধু তোর বয়ফ্রেন্ড আছে বলেই তাকে রিজেক্ট করতে হলো।”
দিজা ভ্রু কুঁচকে বলে,“কার কথা বলছো আপু?”
“ওই যে একটা লোকের কথা বলেছিলাম না তোকে একদিন?তোকে আমাদের সাথে দেখে পছন্দ করেছিল।তোর অল্প বয়স হবার কারণে আম্মু খালামনির সাথে কথা বলে।খালামণি বলেছিলো তোর এত অল্প বয়সে তোর ভাই নাকি বিয়ে দিবে না।নিজেই তো অল্প বয়সী মেয়ে বিয়ে করে বাসার সবার উপর চটে আছে।আমি লোকটাকে শুধু বয়সের অজুহাত দিয়ে রিজেক্ট করি।সে তবুও আমাদের সাথে তোর জন্য যোগাযোগ রাখতো।বলেছিলো অন্তত আঠারো বছর বয়স পর্যন্ত অপেক্ষা করবে।ভাগ্যিস আমি গ্যারান্টি দেইনি।বলেই রাখছিলাম ওর এরমধ্যে অন্য কোথাও পছন্দ থাকলে আমি কিছুই জানি না।উনি বলেছিলো অপেক্ষা করতে দোষ কোথায়?ভাগ্যে থাকলে আপনাপানী আসবে।”
দিজা বড় করে নিশ্বাস ছেড়ে বলে,“ওনার ভাগ্যে আমি নাই বা থাকলাম কিন্তু তোমাকে আমি অন্য বিষয়ে ডেকেছি।”
“কি বিষয়ে?”
“মিস্টার মাহমুদ তোমাকে কিভাবে চেনে?শুধু তোমাকে না তোমাদের সবাইকে।”
তানিয়া মিস্টার মাহমুদকে চেনার চেষ্টা করছে।একটু ভেবে বলে,“কে সে?”
“ভাইয়ার বন্ধু।আমাকে বলল তোমাদের মাধ্যমে নাকি আমাকে আগে থেকেই চিনতো।”
তানিয়া ভাবনায় পড়ে বলে,“আমাদেরকে চেনে?”
“হ্যাঁ।”
“আমরাও চিনি?”
“হুমমম।নাহলে বলল কেন?”
“কি করে সে?”
“উনি তো এই ভার্সিটির শিক্ষক।যার টানে আমি এই ভার্সিটিতে এসেছি।”
তানিয়ার চিন্তা বাড়ল।গভীরে ভেবে কপালের ভাঁজ ছেড়ে বলে,“পুরো নাম কি তুহিন আল মাহমুদ?”
দিজা উজ্জ্বল হাসি দিয়ে লাজুক মুখে বলে,“হুমমম।”
কোমরে হাত দিয়ে তানিয়া বলে,“ওনাকে তুই ভালোবাসিস?”
“ভীষণ।”
সাথে সাথেই দিজার কপালে আলতো চাপড় মেরে তানিয়া বলে,“গাধি একটা।উনিই তো সেই লোক যার সাথে আমরা তোকে বিয়ে দিতে চেয়েছিলাম।তোর কাছে ওই লোকের কথা বলেছিলাম।তুইই তো না বলে দিতে বললি।”
দিজার মুখটা চুপসে গেলো। হা হয়ে বলে,“না বলে দিয়েছো?”
“তোরা পরীক্ষা দিতে আসার দিনই বলেছিলাম।”
“সাথে আর কি কি বলেছিলে?”
“তুই একজনকে ভালোবাসিস।তার জন্য তুই ওনাকে বিয়ে করতে পারবি না।”
দিজা চুপ করে এক দৃষ্টিতে দেখছে তানিয়াকে।অতঃপর কান্না মুখে বলে,“এটা কি করলাম আমি?এতবড় ভুল!যার জন্য বেহায়াপনা করছি তাকেই না বুঝে রিজেক্ট করেছি।পাবো কি পাবো না দোটানায় থেকেও আমি যার টানে এতদূর এসেছি তাকে পেয়েও হারালাম।”
দিজা ঘাসের উপর বসে পড়ল।তানিয়া আশপাশ দেখে বলে,“উঠে দাড়া।মানুষ দেখছে।”
“তাকে আবার পাবো কিভাবে?”
দিজার অবস্থা বুঝতে পেরে তানিয়া বলে,“আমি আরেকবার কথা বলে দেখছি।যেহেতু তোরা অজান্তেই দুজন দুজনকে ভালোবেসেছিস তোদের ব্যাপারে আবারও এগোনো যায়।”
দিজা চোখের পানি মুছে কালো বোরকার হাতা ভিজিয়ে দেয়।মেয়েটা কিছুক্ষণের জন্য এতোটাই ভেঙে পড়েছিল যে চোখের পানি বোরকা ভিজিয়ে দেয়।তানিয়া দ্রুত কল দেয় তুহিনের কাছে।তুহিন ধরলো না।তানিয়া বলে,“একটু পর দেই।হয়তো ক্লাস করাচ্ছেন।”
দিজা সম্মতি দিয়ে শোভার কাছে কল করে বলে,“তোমার পরীক্ষা কি শেষ?”
“আমার তো পরীক্ষাই নেই।তুহিন ভাই ভুল জানিয়েছে।”
“ভুল?”
“হ্যাঁ,এসে শুনলাম তোমার যেমন দেরি আছে পরীক্ষার আমারও সেই একই ডেট।”
“ওহ,আমি মাঠেই আছি।আমার খালাতো বোন তানিয়া এসেছে।তুমিও চলে আসো।আমরা একসাথে গল্প করি।”
“আচ্ছা,আসছি।”
বলেই হিবার উদ্দেশে বলে,“আমার ননদ ডাকছে।আমি বাকি ক্লাসগুলো করবো না।চলে যাচ্ছি।”
“তোমার ননদ এই ভার্সিটিতে পড়ে?”
“হ্যাঁ,আমরা একই ইয়ার কিন্তু ডিপার্টমেন্ট আলাদা।”
“তোমাদের পরিবার অনেক কিউট তো।ননদ ভাবী একসাথে একই ভার্সিটিতে পড়ছো।দুজনেই বান্ধবী আবার ননদ ভাবীও।”
শোভা সৌজন্যতার সাথে বলে,“যাবে আমার সাথে?”
হিবা একটু ভেবে বলে,“আচ্ছা চলো।”
দুজনে একসাথে গেলো মাঠের দিকে।দিজার সাথে হিবাকে পরিচয় করিয়ে দেয় শোভা।দুজনে পরিচিত হবার মাঝেই তুহিনের কল আসে তানিয়ার কাছে।তানিয়া জানায়,“তুহিন ভাইয়ের কল এসেছে।”
দিজা আনন্দের সাথে বলে, “ধরো আপু।”
শোভা দুজনকে দেখে বলে,“তুহিন ভাইয়া?”
দিজা মাথা নাড়িয়ে বলে,“অনেক কথা আছে।তোমাকে আমি পরে বলছি।”
শোভা কোনো কথা বলল না।তানিয়ার কথা শুনতে আগ্রহ দেখালো।তানিয়া লাউডে দিয়েই বলে,“আসসালামু আলাইকুম ভাইয়া।”
“ওয়ালাইকুম আসসালাম।”
“কেমন আছেন?”
“আলহামদুলিল্লাহ,আপনি?”
“আমিও।আপনাকে গুড নিউজ দিতে কল দিয়েছি ভাইয়া।”
“কিসের?”
তানিয়া এক পলক দিজাকে দেখে খুশি মুখে বলে,“আপনি যে মেয়েকে এতগুলো বছর ধরে ভালোবেসে এসেছেন সে মেয়ে সিঙ্গেল।”
তুহিন থমকে গেলো।তারপর বলে,“তবুও তো অন্য কাউকে পছন্দ করে।”
দিজা মুখ গোমড়া করে।তানিয়া ইশারা করে বোঝায় আমি দেখছি অতঃপর বলে,“হ্যাঁ সে ঠিক কিন্তু সেই ছেলেটা অন্য কেউ না…
তুহিন কথা শেষ করতে না দিয়েই বলে,“কে সে এটা জেনে আমার কী?”
“কারণটা আপনি নিজেই সেই ব্যক্তি তুহিন আল মাহমুদ।আমাদের প্রেমা আপনাকেই ভালোবাসে।আপনার টানে ঢাকায় এসেছে।”
উপর থেকে এক দৃষ্টিতে দিজার দিকে তাকিয়ে থাকা তুহিনের চোখ আচমকা বন্ধ হলো এমন কথায়।বুকটা ঠান্ডা বাতাসে ছেয়ে গেলেও দর্শনের মুখটা মনে পড়তেই তুহিন বলে,“তবুও আমাদের সম্পর্ক এগোনো সম্ভব না।”
তানিয়া সাথে সাথে মুখের হাসি ম্লান করে তাকালো দিজার দিকে।দিজা হাসি হাসি মুখে থাকলেও সেই হাসি আর মুখে বজায় রাখতে পারল না।ভেবেছিল তুহিন এই কথাটা শুনেই হয়তো দিজার সাথে কথা বলতে চাইবে কিন্তু না।উল্টো জানালো তাদের এই সম্পর্ক এগোনো সম্ভব না।তানিয়া আবারও বলতে থাকে,“আপনি প্রেমাকে ভালোবাসতেন তো।প্রেমাও আপনাকে ভালোবাসে।তাহলে সমস্যা কোথায়?”
“ভালোবাসতাম।অতীত হয়েগেছে সে আমার।ভবিষ্যৎ হবার সম্ভাবনা নেই।”
“কিন্তু কেন?”
“সব কিন্তুর উত্তর হয়না।আমার কাছে এর উত্তর নেই।”
তানিয়া আর কিছু বলতে নিলে তুহিন কল কেটে দেয়।নিজের ক্লাসে চলে গেলো।দিজা ঢলে পড়তে নিলে শোভা আঁকড়ে নেয়।দিজা কান্না করে দিলো সাথে সাথে।কান্নাভেজা কণ্ঠে বলে,“পেয়েও কেন হারাতে হলো তাকে?আমি তো ওনাকে নিয়েই স্বপ্ন দেখতাম।একটা ছোট্ট সংসারের।বাড়ির বউরা স্বামীদের জন্য যা যা করে আমিও তার সাথে সেভাবে চলার স্বপ্ন দেখতাম।সব স্বপ্ন তার এক না করে দেওয়াতে চুরমার হয়েগেলো।”
শোভা কাধ থেকে ব্যাগ ফেলে দেয়।দিজাকে সামলাতে গিয়ে কাধের বাগ ধরে রাখতে পারেনি।তানিয়া ব্যাগ উঠিয়ে দেয়।দিজার চোখের পানি পড়তে পড়তে নিকাব ভিজে যাচ্ছে।শোভা হাত দিয়ে চোখের পানি মুছে দিচ্ছে।তানিয়া মনক্ষুন্ন হয়ে বলে,“আমি বুঝলাম না লোকটার কি হলো?আমি তো ভেবেছিলাম না না আমি শিওর হয়েছিলাম যে প্রেমার মনে উনি আছে জেনে উনি আরো খুশি হবেন।টানা আড়াই বছর ভিখারির মত আমাদের কাছে প্রেমার জন্য ছুটে আসতো।সেই মানুষ পাওয়ার সুযোগটা হারাবে!”
শোভা জড়িয়ে ধরে দিজাকে।ওর মনটাও দিজার জন্য কষ্ট পাচ্ছে।হিবা বলে ওঠে,“তুহিন স্যারের সাথে প্রেমার বিয়ে নিয়ে কথা হচ্ছিলো?”
দিজাকে কেউ দিজা নামে ডাকেনি এখানে।তাই তানিয়ার মুখে প্রেমা নাম শুনে দিজাকে প্রেমা হিসেবে চিনলো।তানিয়া এক পলক হিবাকে দেখে বলে,“কাউকে বলো না এসব।”
হিবা উত্তর না দিয়ে মিনমিন করে বলে,“আমি আসছি।”
হিবা যেতেই শোভার মনে দর্শনের নামটা জেগে উঠলো।শোভা দিজাকে শান্তনা দিয়ে বলে,“আমি তোমার ভাইয়ের সাথে কথা বলব।এখনই কথা বলব।তোমার ভাই দরকার হয় আজ ভার্সিটিতে আসবে।একটা ফয়সালা তো হবেই আজ।”
দিজার মনে পড়ল শোভা একদিন দর্শনের বলা কথাগুলো তাকে জানিয়েছে। দিজা কান্না বাড়িয়ে দিয়ে বলে,“ভাইয়া জানতে পারলে আমাকে খুন করে দিবে।সাথে তোমাকেও।”
“তোমার যে অবস্থা তাতে তো মনে হচ্ছে বেঁচে থেকেও মরে যাবে।এর থেকে ভালো একটাবার সত্যতা সবাইকে জানিয়ে একটা সমাধান করা।”
“তোমাকে ভাইয়া কিছু বললে?”
“আমি বুঝে নিবো।তবুও ভালো যখন বেসেছো তার একটা তো সমাধান হওয়া উচিত।”
বলেই শোভা কল দেয় দর্শনকে।দর্শন ধরছে না।একটার পর একটা কল।শোভা বিরক্ত। হয়ে ম্যাসেজ দেয়,“কল ধরতে অসুবিধা কোথায়?”
ওদিক থেকে কিছু ছবি আসলো।শোভা ছবিগুলো দেখে থমকে গেলো।দর্শনের ফোন থেকে সিনথিয়ার অর্ধ উলঙ্গ ছবি।শোভাকে ছবি পাঠানোর সাথে সাথে ভয়েস পাঠায়।সেখানে সিনথিয়ার কণ্ঠে থাকে,“তোমার হাসব্যান্ড এখন আমার কস্টিউম ঠিক করে দিচ্ছে।আমরা একসাথে ব্যাস্ত আছি হানি।তোমার সাথে নাহয় বাসায় গিয়েই কথা হবে।”
সিনথিয়ার ভয়েস পেয়ে শোভার কান ঝালাপালা করছে।শোভা হাসফাঁস করতে করতে দিজার উদ্দেশে বলে,“তোমার ভাইয়ের অফিসে চলো।”
দিজা কান্না থামিয়ে বলে,“কেন?”
শোভা ফোন এগিয়ে দিয়ে বলে,“এই দেখো।”
“সিনথিয়া আপু আবার?”
“তোমার ভাইয়ের ফোনটাও বা ওর কাছে কেন?তোমার ভাই পেয়েছেটা কি? বউ হিসেবে আমি তার কোনো জিনিসে হাত রাখার অধিকার পাইনা অথচ ওই মেয়ে একের পর এক অধিকার পাচ্ছে।আমি এসব সহ্য করব না।হয় আমাকে ছাড়তে হবে নয় তাকে আমার সাথে সংসার করতে হবে।সেই সংসার যে সংসারে এসব নোংরা মেয়ে থাকবে না।”
তানিয়া চোখ বড় বড় করে বলে,“দর্শন ভাইয়ের বউ হুবহু দর্শন ভাইয়ের মতো।সোজাসাপ্টা কথা বলে।কোনো জড়তা নেই।”
শোভা ভদ্রভাবে বলে,“আমি আসছি আপু। পরে কথা হবে।আপনার দাওয়াত থাকলো আমাদের বাসায়।”
যেতে যেতে বলে,“অবশ্য বাসাটাও থাকে নাকি সন্দেহের।”
বলেই রাস্তার মাথায় দাঁড়ালো দিজাকে নিয়ে।এদিকে তানিয়া দ্রুত মোবাইল বের করে কল দিল পারুল বেগমের কাছে।পারুল বেগমের কাছে সবকিছু বললে তিনি মাথায় হাত দিয়ে সোফায় বসে পড়েন।অসহায় হয়ে বলেন,“ছেলে মেয়েরা কি শুরু করলো?এরা কি শুধরে চলবে না?একজন আরেকজনকে বুঝতে চায়না।দুদিন পরপর ঝামেলা তৈরি করে।এক কাহিনী প্রতিদিন।”
তানিয়ার সাথে কথা শেষ করে কল কাটতেই দীপ্ত ফরাজি জিজ্ঞাসা করেন,“কি হয়েছে?”
পারুল বেগম সব বলতেই দাদাজান শুনে রেগে গিয়ে বলেন,“এবার আমাকেই মাঠে নামতে হবে।ওই ছেলের বাড়াবাড়ি এবার আমি বন্ধ করছি সাথে মেয়েটাকেও ঠান্ডা করার ব্যাবস্থা করছি।”
“কি করবেন আব্বাজান?”
“দুজনের তালাক দেওয়ার ব্যবস্থা করো।”
পারুল বেগম সাথে সাথে তাকালেন দীপ্ত ফরাজির দিকে।দীপ্ত ফরাজি শান্ত হবার ইশারা করে দাদাজানের উদ্দেশে বলেন,“সংসার কোনো পুতুল খেলা না।ওদেরকে সংসারের গুরুত্ব বুঝতে না দিয়ে তালাক দেওয়ানোটা ঠিক হবে কি?”
দাদাজান রাগী দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলেন,“ওদেরকে ও সংসারের গুরুত্ব বোঝানোর একটা দুটো সুযোগ দিনি আমি।ওদেরকে একেক রঙ্গের পর আবারও বুঝিয়েছি।ওরা আসলে সোজা আঙুলে বুঝবার মানুষ না।”
“তাই বলে তালাক?”
“হ্যাঁ তালাক।এটাই সমাধান।”
“আর দিজার কি সমাধান?”
“ওটাও তোমার পুত্রর কারণে বাধা সৃষ্টি হচ্ছে।”
“কি করবে তাই বলো আগে।”
“আগে সংসার করা ব্যক্তি দুজনের তো ব্যবস্থা করি তারপর অন্যদের সংসার হবে কি না তাই নিয়ে ভাববো।”
বলেই কল দিলো।দাদাজান কিছু কথা বলতেই দীপ্ত ফরাজি ও পারুল বেগমের চোখ ছানাবড়া।অনেক্ষন দাঁড়িয়ে থাকার পর শোভা রিক্সা পেলো।যেটা পুরাণ ঢাকার দিকে আসবে।দর্শনের অফিসের এদিকে অতি সহজে রিক্সা বা বাইক আসতে চায়না।কিছুক্ষণ চেষ্টা করার পর পেলো।দিজা একবার তুহিনকে কল দিতে চাইলেও আত্মসম্মানের কথা ভেবে কল দিল না।ননদ ভাবী মিলে যেতে পারবে।
রিক্সায় দুজন দুরকম পরিস্থিতে বসে আছে।একজন রাগে হাঁসফাঁস আরেকজন দুঃখে।কিছুদূর যেতেই শুনশান রাস্তায় হঠাৎ রিক্সা আক্রমণ হলো।রিক্সা চালককে নিয়ে একপাশে সরিয়ে দিলো হামলাকারীরা।শোভা ও দিজা দুজনেই আতকে উঠল।হামলাকারীরা কোনো সময় ব্যয় না করেই শোভা ও দিজাকে অজ্ঞান করে নিয়ে গেলো।গাড়িতে ননদ ভাবীর বসিয়ে দিতেই একজন আরেকজনের উপর ভর দিয়ে ঘুমোতে শুরু করে।হামলাকারীর একজন হতাশ হয়ে কল দিল ওদের লিডারকে।ওদিকে লিডার ধরতেই হামলাকারী বলে,“তোমার নাতবউ আর নাতনি এখন নাক ডেকে ঘুমায়।”
ওপাশ থেকে লিডার অর্থাৎ দাদাজান বলেন,“সাব্বাস বাপ কা ব্যাটা।এবার দুটোকে নিয়ে পিরোজপুর চলে যা।যেনো কেউ কিচ্ছুটি বুঝতে না পারে।”
হামলাকারী রাজি হয়ে নিয়ে গেলো দুজনকে।দীপ্ত ফরাজি চিন্তিত হয়ে বলেন, “কিডন্যাপের মতো কাজটা কি ঠিক হলো?”
বাবুই পাখির সুখী নীড় পর্ব ৬৫
“একদম।গল্পের মোড় ঘোরাতে এটাই সঠিক কাজ বলে আমি মনে করি।এবার বউ হারানোর ভয়ে বেচারা একটু ছুটুক অন্যদিকে বিপদে পরে মেয়েটা তার বরের জন্য ছটফট করুক।”
