বিষাদ ও বসন্ত পর্ব ৩৬
অলকানন্দা ঐন্দ্রি
মিথি আর আদ্রর বিবাহবিচ্ছেদ,অর্থ্যাৎ আদ্রর মুখে সে তালাক শব্দটা শোনার আজ চারমাস পূর্ণ হলো। মিথির উদ্দেশ্যে যে তালাকনামার নোটিশটা তার কয়েকদিন পর পাঠানো হয়েছিল মিথি তাতে সম্মতি জানিয়েছিল নিজেই।স্বাক্ষর সমেত নিজের বিবাহবিচ্ছেদের স্বপক্ষে মত দিয়েছিল। অতঃপর নোটিশ পাঠানোর মাস তিনেকের মধ্যেই যখন তাদের সমঝোতা হলো না, তখন তাদের বিবাহবিচ্ছেদ কার্যকর হলো স্পষ্ট ভাবেই।আদ্র নিশ্চুপে বিছানায় শুয়ে আছে। মিথির মধ্যে একটু কষ্টের ছাপ ছিল না, একটুও আদ্রর কাছে থেকে যাওয়ার ইচ্ছা ছিল না। একটুও না। বাকিসব বাঙালি নারীর মতো আহাজারি করেনি মিথি। মেনে নিয়েছে এক দৃঢ় মনোভাব দেখিয়ে। আদ্রকে নতুন জীবনের জন্য শুভকামনাও জানিয়েছিল। অথচ সে শুভকামনা আর কাজে লাগে নি৷ আদ্রর আজকাল মিথির মুখটা প্রায়সই মনে পড়ে। খুব করেই মনে পড়ে।
আজকাল ঘুমালেও ঐ সাদামাটা মিথির সুশ্রী মুখটা, মেয়েটার স্পষ্ট দৃঢ় মনোভাব, আদ্রকে এড়িয়ে চলা সবই ফুটে উঠে স্বপ্নে প্রায়সই।আদ্র আজও রাত জাগল। আজও কোন এক অজানা কারণে মিথিকে নিয়ে ভাবল। অতঃপর পা বাড়াল নিজের মায়ের ঘরের দিকে। তার আব্বু আজকাল বাসাতেই ফিরে খুব কম৷ আদ্র নিজেই দেখে তার আম্মু এখনো রাত জাগে। এখনো বাবা আসা পর্যন্ত জেগে অপেক্ষা করে। এখনো তার আর তার বাবার পছন্দের খাবার রান্না করে। এখনও, এখনও সব বোধহয় এক। আবার কোথাও একটা এক নয়। ভিন্ন! আদ্র স্পষ্টই টের পায় তার আম্মুর প্রতি তার আব্বুর আগ্রহ কমেছে।তার আম্মুর লেখাগুলোও যে এমনি এমনিই ছিল না তা আদ্র আজকাল বুঝে উঠে। আদ্র স্পষ্টই দেখে অফিসে খুব একটা কাজ থাকে না, তবুও তার বাবা কাজের দোহাই দিয়েই প্রতিরাতে বাড়ি ফিরে না। আদ্র প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ হয়েও বুঝি বুঝে না এসব?
এই কয়েক মাসে স্পষ্টই বুঝেছে।স্পষ্টই টের পেয়েছে ও সবটা। অথচ সন্তান হিসেবে আজকাল তার নিজেকে ব্যর্থ লাগে। বাবা মায়ের একসাথে সংসার থাকার আনন্দ এবং সংসার ভাঙার কষ্ট দুটোই আদ্র অনুভব করে। এবং মা বাবা আলাদা হয়ে যাওয়ার যন্ত্রনাটাও বোধহয় তার জানা হয়ে গেছে। আজও আদ্রর আম্মু তার পছন্দের বিরিয়নি রান্না করেছে। সময়টা সুন্দর হলে আদ্র এবং তার মা বাবা সকলে একসাথেই খাবার খেত। একসাথেই আনন্দ করত। আদ্র দূর থেকে মাকে দেখে। বসে আছে। মুখে না বললেও আদ্রর জানে মা কেন এখনো জেগে আছে কিংবা কার অপেক্ষা করছে। আদ্র কিয়ৎক্ষন মায়ের দিকে চেয়ে থেকেই নজর সরাল। আচ্ছা? তার মায়ের মতো মিথিও কি অপেক্ষা করত? তার জন্য এভাবে বসে থাকত? আর সে? সে কি করত? মুহুর সাথে সময় কাঁটিয়ে মদ্যপ অবস্থায় মাঝরাতে বাড়ি ফিরেই মিথির উপর ঝাপিয়ে পড়ত? মিথির কি কষ্ট হতো? তার মায়ের মতোই দুঃখ হতো মিথি নামা মেয়েটারও? যাকে আদ্র একটা সময় দু চোখেই সহ্য করতে পারত না।
মিথি একটু আগেই টিউশনি করে বেরিয়েছে রাস্তায়। হাঁটতে হাঁটতেই সে দীর্ঘসময়ের এই কথাগুলো ভাবে। অতঃপর হিমেলদের বিল্ডিং এর টিউশনিটার উদ্দেশ্যে পা বাড়াতেই এক ভদ্র মহিলার সাথে দেখা হলো। সাথে অবশ্য হিমেলের ভাবী ওআছে। মিথি দুইজনকেই চেনে। দুইজনের সাথেই তার প্রথম দিকে হেসে হেসে কথা হলো। অতঃপর কথার এা পর্যায়ে ভদ্র মহিলা বলে উঠল হেসে হেসেই,
“ ইশশ এইটুকু বয়সেই স্বামী ছাড়া হয়ে একা একা জীবন কাটাচ্ছো। সমাজটা ডিভোর্সী মেয়েদের জন্য খুব কঠিন বুঝলে মিথি? তার উপর আবার তোমার একটা ছোট্ট বাচ্চা আছে। একা বাঁচা সম্ভব? আগের স্বামীর সাথে যেহেতু হয়নি, সেটা নাহয় আর ভাবলে না। কিন্তু জীবন নিয়ে নতুন করে কিছু ভাবো। এভাবে কি একা একা মেয়েরা চলতে পারে নাকি? ”
মিথির মুখটা এবার কালো হয়ে এল। অপ্রস্তুত হলো ও৷ ভদ্রমহিলা আবারও হাসলেন। হিমেলের ভাবীর দিকে তাকিয়ে বলে উঠলেন এবারে,
“ আমার এক দেবর আছে বুঝলে? দুই মেয়েকে রেখে মা পালিয়ে গেছে অন্য এক ছেলের সাথে। আশপাশে খুব করে মেয়ে খুঁজছে বিয়ের জন্য। মিথির কথা বলে দেখলে খারাপ নয় বলো? আর যায় হোক, মিথির ও একটা গতি হলো। ”
হিমেলের ভাবী বোধহয় প্রস্তাবটা শুনে খুবই খুশি হলো। হিমেলের পরিবারও খুব খুশি হবে এই প্রস্তাবটা শুনলে। কারণ মিথির যদি অন্য কারোর সাথে বিয়ে হয় তাহলে তো হিমেল পাগলামো করবে না। এমন নয় যে, তারা মিথিকে অপছন্দ করে। মিথি ভালো, পছন্দ হওয়ার মতো একটা ভালো মেয়ে। কিন্তু ঐ যে নিজের ছেলের জন্য কেউ বিবাহিত মেয়েকে বউ হিসেবে আনতে চান না। ঐ একটাই কারণ! ঐ একটাই কারণে মিথিকে মেনে নেওয়া কোনকালে সম্ভব নয়। সে বলল,
“ ঠিকই তো বলেছেন। মিথি আর কতই বা একা একা লড়াই করবে? জীবনে অবশ্যই কাউকে প্রয়োজন। ”
মিথি কপাল কুঁচকাল। নিজেকে কেন্দ্র করে এই আলোচনা শুনে তার বিরক্ত লাগছে। শরীর ঘিনঘিন করে উঠল কেমন যেন। নিজের উপর অন্যদের করুণা এবং নিজেকে নিয়ে অন্যদের চিন্তাভাবনা দেখে ওর নিজেরই নিজের উপর ঘৃণা হচ্ছে। মিথি নিজের প্রতি এই ঘৃণাটা অদৃশ্য রেখেই শুধাল,
“ কে বলল মেয়েরা একা চলতে পারে না? আপনারা আমায় নিয়ে ভেবেছেন এর জন্য আমি খারাপ কিছু বলব না আপনাদের। কিন্তু এত বেশি ভাবার প্রয়োজন নেই ভাবী, আমি একা চলতে খুব পারব। ”
মিথি এইটুকু বলেই পা বাড়াল। এর আগেও তাকে দুয়েকজন আকারে ইঙ্গিতে বুঝিয়েছে সে ডিভোর্সী নারী। তার গর্ব করার মতো কিছু নেই। এ ও বুঝিয়েছে যে একজন পুরুষমানুষ ছাড়া জীবনে খুব বেশিদূর চলতে পারে না মেয়েরা। একা একা একটা বাচ্চা বড় করা তো আরো কঠিন। মূলত উনারা ইনিয়ে বিনিয়ে বারবার এটাই বুঝাতে চাইল যে মিথির উচিত হয়নি স্বামীকে ছেড়ে আসা। একদমই উচিত হয়নি।মিথি একা চলতে পারবে না স্বামী ছাড়া। এই সমাজে সে মেয়ে হিসেবে একা বাঁচতেই পারবে না। মিথি হাসে। অভিশাপ সঙ্গে নিয়ে বেঁচে থাকা কি গর্বের? অভিশপ্ত জীবন কাটানো গর্বের? সে তো আপসোস করে না। সে তো তার আগের জীবন নিয়ে একটুও দুঃখ করে না। বরং সে মনে করে সে মুক্ত হয়েছে। একটা দুর্বিষহ জীবন থেকে মুক্ত হয়ে পাখির মতো উড়তে শিখেছে। নিজে নিজে চলতে শিখেছে।
হিমেল কয়েকদিন আগেই বাসায় একটা প্রস্তাব তুলেছিল। প্রস্তাবটা এমন যে যেহেতু পরিবারের চোখে সে বিবাহ উপযুক্ত ছেলে, চাকরীও হয়েছে, সেহেতু হিমেল বিয়ে করতেই পারে। একটা মেয়েকে বউ করে তার সমস্ত দায়িত্ব, দেখবাল সে করতেই পারে। সে হিসেবে মেয়েটা কি মিথি হওয়া যায় না?
ব্যস! এই ছোট্ট একটা প্রস্তাব তার বাসার কেউই মেনে নিতে পারল না৷ ভাবী, ভাই, বাবা কেউই নন৷ হিমেলের মা নেই। মারা গিয়েছেন বছর কয়েক আগেই। বাবা আছেন। তবে হিমেল মায়ের পরেও যে ভদ্রমহিলাকে খুব করে মা হিসেবে মানেন সে হলো মুহিবের আম্মু। তাকেই সে মায়ের মতো ভালোবাসে। অথচ এই ভালোবাসাকে কাজে লাগিয়ে হিমেলকে ডাকিয়ে পাঠানো হলো বাড়িতে। সাথে তার পুরো পরিবারও গেল। মুহিবও এল বাড়িতে।অতঃপর খাওয়ার পর্ব শেষ হতেই মুহিবের মা হিমেলের সাথে কথা বলতে ডাকল। যার প্রথম কথাই হলো,
“ আব্বু? আমার কথা শোনো। আশপাশে দেখ কত মেয়ে আছে বিবাহ উপযুক্ত। সুন্দরী, সুশ্রী, শিক্ষিত মেয়ে। আচ্ছা মানলাম, তুমি সাবিহাকে বিয়ে করবে না। আমরা মেনেও নিলাম যাও। কিন্তু মিথি? এটা কেমন কথা আব্বু? মিথির তো একবার বিয়ে হয়েছে বলো। বিবাহিত, তার উপর এক বাচ্চা আছে এমন মেয়েকে আমরা কি করে তোমার জন্য মেনে নেই বাবা? আমরা তোমায় বড় করেছি। লালন পালন করেছি। আমাদের ইচ্ছে থাকতে পারে না তোমার বিয়ে নিয়ে? ”
হিমেল সমস্তটাই শুনল। এবং শুনে এইটুকুও বুঝল যে এখানে ডাকার কি অর্থ ছিল। হিমেল ছোটশ্বাস ফেলে মামনির দিকে চেয়ে। উত্তরে গম্ভীর স্বরে বলল,
“ অবশ্যই থাকতে পারে মামনি। কিন্তু সে একজনকে ছাড়া আমি বিয়ে শব্দটা অন্য কারোর সঙ্গে ভাবতেও পারব না। আপনাদের ইচ্ছার বিনিময়েও নয় । কাজেই, হয় আমি তাকে না পেয়েও তার জন্যই আজীবন কাঁটিয়ে দিতে পারব। আর নয়তো তাকে আগলে রেখে সারাজীবন কাটাব। কোনটা ভালো হয় মামনি? ”
মামনি বোধহয় হতাশ হলে। হিমেল বুঝদার, পরিপক্ব মানসিকতার পুরুষ। ওর থেকে প্রেম-ভালোবাসার জন্য পাগলামো আশায়ই করেনি সে। তার উপর এসব বিষয়ে ভেবেছিল হিমেল বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিবে। কিন্তু ডিভোর্সী এবং এক বাচ্চা সমেত মেয়েকে বিয়ে করার সিদ্ধান্তকে উনি কোনভাবেই বুদ্ধিমত্তার পরিচয় বলে মেনে নিতে পারলেন না। কেবল উনি নন, হিমেলের পুরো পরিবারই মেনে নিতে পারেননি৷ উনা শুধালেন,
“ তুমি খুব বুঝদার ছেলে হিমেল। মুহিবের মতো তো অন্তত ছেলেমানুষ নও তুমি। তুমি জানো না এই সমাজে তোমার কেমন দুর্নাম রটবে একটা বিবাহিত মেয়ে বিয়ে করলে? মানুষ হাসাহাসি করবে। তুমি চাইছো মানুষজন হাসাহাসি করুক এই বাড়ি নিয়ে? এটা কেমন বোকামো হিমেল? ”
মুহিব তখন পাশ দিয়েই যাচ্ছিল। মায়ের মুখে কথাগুলো শুনে স্পষ্টই বুঝে উঠল যে কোন প্রসঙ্গে কথা হচ্ছে। মুহিবের পা থামল। আসলেই কি বোকামো? মুহিবের তো এই বোকামো করার সাহসটাও হয়ে উঠেনি। এই যে মিথির জন্য জ্বলন্ত এক আপসোস সে দিনরাত বয়ে বেড়াচ্ছে অথচ মিথির জন্য কিচ্ছুটি প্রকাশ করেনি কোথাও শুধুমাত্র বদনাম হওয়ার ভয়ে। সেদিক থেকে বোধহয় মুহিবের মায়ের দৃষ্টিভঙ্গিতে সে খুব বুদ্ধিমানের মতো কাজ করেছে। এই যে মিথির ভাবী যেবার কল করল? মুহিব তো চাইলেই খোঁজ নিতে পারত। একটাবার ছুটে এসে খবর নিতে পারত। নেয়নি। যদি তার চরিত্র নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়? শুধুমাত্র গ্রামে নিজের সম্মান হারানোর ভয় করেই মুহিব একটাবার সরাসরি খোঁজ করল না। এই জায়গায় মুহিব বোধহয় বড্ড ভীতু, আর হিমেল সাহসী। মুহিব ওভাবেই দাঁড়াল হিমেলের উত্তর শোনার অপেক্ষায়। কিয়ৎক্ষন পর হিমেল হেসে উত্তর করল,
“ যে যন্ত্রনাটা আমি সয়ে এসেছি, যে দুঃখটা আমি চুপচাপ হজম করেছি সে দুঃখ টা তো মানুষ হজম করেনি মামনি। যদি হজম করত তাহলে তাদের হাসিকে আমি গুরুত্ব দিতাম। কিন্তু এখন গুরুত্ব দেওয়ার মতো সময় নেই।”
মুহিবের মা এবং হিমেলের ভাবী এইটুকুতেই থেমে থাকল না। এর কয়েকদিন পরই সরাসরিই আবারও দেখা করল মিথির সাথে। মুহিবের মা এইক্ষেত্রেও মিথিকে শুধাল,
“ মিথি, তোকে তো আমরা ছোট থেকেই বড় হতে দেখেছি মা। আমরা জানি তুই কেমন। কিন্তু তুই-ই বল, হিমেল কি কোন অংশে কম আছে? কোনদিক দিয়ে অক্ষম ও? আমরা কি করে ওর জন্য একজন ডিভোর্সী মেয়েকে মেনে নেই বল? মেনে নেওয়া যায় এটা? ”
মিথি ক্লান্ত! ইচ্ছে করে বাসাটা চেঞ্জ করে ছুটে যাক। অথচ বাসাটা চেঞ্জ করাও এতোটা সহজ কর্ম নয়। বাড়িওয়ালা ব্যাক্তিরা এতোটাও সহজ মানুষ নন যে একজন একা মেয়েকে ভাড়া দিবেন বাসা। মিথি খুঁজেছে বাসা, খোঁজ যে করেনি এমন নয়৷ ছোটশ্বাস ফেলল ও। মুহিবের মায়ের কথার প্রসঙ্গ ও ঠিকই বুঝল। উনি আবারও বললেন,
” ও ছেলে মানুষ। সুযোগ দিলে তো ও সুযোগ নিবেই মিথি। তুই কেন ওকে প্রশ্রয় দিচ্ছিস? কোন কারণে? ওকে পিছু পিছু ঘুরিয়ে ওর মাথাটা আয়ত্ত করতে চাইছিস? ”
মিথি এবার ভ্রু কুঁচকাল। তাকে নিয়েই কেন হিমেলের পরিবার পড়ে আছে? সে তো সুযোগ দেয়নি। প্রশ্রয় দেয়নি। হিমেলও তেমন কোন ইঙ্গিত দেখায়নি কখনো। তবুও? তবুও এইসব প্রশ্ন? মিথি সরাসরিই উত্তর করল,
“ আপনার কেন মনে হচ্ছে যে আমি আপনাদের ছেলেকে ঘুরাচ্ছি চাচী? আমি কেন ঘুরাব? আমি তো কোন সুযোগ দেয়নি। মোটেই নয়।”
“ না ঘুরালে তুই এই জায়গা থেকে চলে যাচ্ছিস না কেন? জেনেশুনে এখানেই তো পড়ে আছিস। এই যে কাছাকাছি আছিস, এতে তো ওর দুর্বলতা বাড়ছেই মিথি। ”
মিথি চোখ ছোট ছোট করে তাকাল। এবারে উত্তরে বলল,
“ চাচী, বিশ্বাস করুন। আপনার আগে আমিই সবথেকে বেশি চাই যে বাসাটা চেঞ্জ করে ফেলি। কিন্তু ঐ যে,বাস্তবতা ভিন্ন। আপনাদের দুই চারজনের ন্যায় আমার জীবনটা এতোটাও স্মুথ নয় যে আমি চাইব আর হয়ে যাবে সবটা। তবে আমি চিন্তা করবে না, আমি কখনোই আপনাদের ছেলের অনুভূতিকে প্রশ্রয় দিব না। আমার দিক থেকে এইটুকুও সুযোগ এই বিষয়ে দিব না। ”
এইটুকু বলেই ও পা বাড়াল। হিমেল ভাই এর প্রতি তার রাগ হচ্ছে । অযথাই রাগ হচ্ছে। উনি উনার পরিবারের কাছে ওকে নিয়ে কি বলেছে? কি বলেছে যে সবাই তার দিকে আঙ্গুল তুলছে? কেন?
মিথি কয়েকদিন যাবৎ-ই খুব করে বাসার খোঁজ করেছে। অতঃপর হিমেলের ভাবী নিজেই নিজ দায়িত্বে একটা বাসার খোঁজ করে দিল।অল্প কিছুটা দূরেই বিল্ডিংটা। হিমেলের ভাবীর বাসা খোঁজ করে দেওয়ার কারণটা বুঝতে মিথির দেরি হলো না। বিকালবেলায় সে বাসাটা যখন দেখতে গেল সে বাড়িওয়ালার সুন্দর ব্যবহারে মুগ্ধই হলো। সেখানে বাড়িওয়ালার সাথে সাথে কথা বলার এক পর্যায়েই উনি পাশের এক পুরুষকে দেখিয়েই বলে উঠলেন,
” শোনো, তোমাকে আমার পছন্দ ভালোই হয়েছে। তোমার এক বাচ্চা আছে তাতে আমাদের সমস্যা নেই একটুও, আমাদের শিফুরও ছয় বছরের এক ছেলে আছে। আমি, আমি কিন্তু তোমার ভাই ভাবীর সাথেও কথা বলেছি। মুহিবের মা ওবলল তুমি ভালো মেয়ে। নেহাৎই স্বামী ভালো পড়েনি বলে… ”
আরো কিছুকিছু কথা মহিলা বলেই গেল। মিথি বুঝতে পারল মহিলার সাথে এই বিষয়ে কথা আজকে কালকের নয়। বরং ভালোভাবেই প্রস্তাবটা রাখা হয়েছিল কারোর তরফ থেকে।
হিমেল কোন এক ভাবেই নিজের পরিবারের এই সস্তা চালটা বুঝেছিল। এই যে কোথাও একটা মিথির বিয়ে হয়ে গেলেই হিমেল শুধরে যাবে এই ধারণা থেকে তারা আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছে কোথাও একটা মিথির জন্য সুযোগ্য এক পাত্র খুঁজতে। গত কয়েকদিন যাবৎই যে এই বিশ্রী খেলাটায় তারা অংশ নিয়েছে তা হিমেল বুঝেছি। তা আরও নিশ্চিত হলো যখন আজ ভাবীকে ফোনে মিথির প্রশংসা করতে শোনা গেল। হিমেল তখনই বিকালের দিকে আয়মানকে নিয়ে বের হয়েছিল। ভাবীর কথায় যে বিল্ডিং এ মিথির বাসা নেওয়ার কথা সেখানে দুইজনে এসে থেমেই বাড়িওয়ালা যে বাসায় থাকেন ওখানেই গেল জিজ্ঞেস করে করে। অতঃপর কলিংবেল বাজায়। তারপরের মুহুর্তে বাড়িওয়ালার মহিলাকে দেখামাত্রই হিমেল হেসে অত্যন্ত ভদ্র বাচ্চা সেজে বলে উঠল,
“ আসসালামু আলাইকুম আন্টি, কেমন আছেন? ”
ভদ্র মহিলা হাসলেন। হিমেলকে উনি চিনেন। হিমেলও উনাকে চিনেন। মুহিবের আম্মুর আত্মীয়। ভদ্রমহিলা বললেন,
“ আরেহ হিমেল। তুমি এখানে? হঠাৎ? এই দেখো না, তোমাদের গ্রামে আমার ভাই এর ছেলের জন্য সম্বন্ধ করতে চাইছি। কেমন হবে বলো তো? ভালো হবে না? ”
কথাটুকু বলেই সোফার অপর দিকে বসা পুরুষটির ইঙ্গিত করল। তার ঠিক সামনের সোফাটাতেই মিথি বসা। হিমেল ভ্রু কুঁচকায়। বাহ! মিথি কি রাজি এই সম্বন্ধে? নয়তো এখনে বসে আছে কেন চুপচাপ? উঠে চলে যায়নি কেন? উঠে চলে যাওয়া উচিত ছিল না ওর? হিমেল তাকিয়েই পরখ করল। ভ্রু বাঁকাল এক মুহুর্তের জন্য। অতঃপর হেসে বলল,
“ তাই নাকি আন্টি? তো কার জন্য সম্বন্ধ করছেন? ”
ভদ্রমহিলা মিথিকে দেখিয়ে হেসে বলল,
“ এই তো,ও। মিথি। খুব ভালো মেয়ে বলো? ওর বাচ্চাটারও তো একটা বাবার দরকার আছে বলো? ভাবছি আমাদের শিফু ওর স্বামী, এবং ওর বাচ্চার বাবা হিসেবে খারাপ হবে না। সংসারটা সুন্দরই হবে বলো? ”
হিমেল শুনল। ভ্রু বাঁকিয়ে মিথির দিকে চেয়ে বলল,
“ ও? মিথি? ”
” হু।”
হিমেল হাসে। হুট করেই এবার ভদ্রমহিলাকে একটা মিথ্যে বলে দিল আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে,
“ কিন্তু আন্টি, আপনি তো দেরি করে ফেললেন। যার জন্য সম্বন্ধ করার কথা ভাবছেন সে তো ইতমধ্যেই আমার স্ত্রী। তার বাচ্চার বাবাও আমি আপাতত। আসলে গোপণে বিয়ে করাতে তেমন কাউকেই খুব একটা জানানো হয়নি। আমার পরিবারকেও না। ”
“ কিসব কি বলছো হিমেল? তোমার ভাবী আর চাচীই তো প্রস্তাবটা প্রথমে রাখল আমার কাছে। আর তুমি এসব কি আবোতাবোল বলছো? ”
মাঝখানে এবার আয়মানই লাফিয়ে উঠল। বলল,
বিষাদ ও বসন্ত পর্ব ৩৫
“ আন্টি, ও একেবারেই সত্য বলছে। আমি নিজেই সাক্ষী ছিলাম ওদের বিয়ের। ”
হিমেল হাসল। এই নাহলে বন্ধু? মনে মনে বিড়বিড় করল,
“ মিথিফুল, তোকে না পেয়েও আজীবন ভালোবাসার সাধ্য আমার আছে। কিন্তু প্রথমবার তোকে অন্যের হতে দেখে যে যন্ত্রনা আমি অনুভব করেছি তা দ্বিতীয়বার অনুভব করার সাধ্য নেই। এইটুকুও না। ”
