Home বিষাদ ও বসন্ত বিষাদ ও বসন্ত পর্ব ৩৫

বিষাদ ও বসন্ত পর্ব ৩৫

বিষাদ ও বসন্ত পর্ব ৩৫
অলকানন্দা ঐন্দ্রি

আদ্রর সাথে সেদিন আর ওর আম্মুর দেখাই হলো না। একটা ছোট্ট দুমড়ে মুঁছড়ে রাখা কাগজ। সামান্য একটা পাতা। অথচ আদ্রর সেদিনের অস্থিরতায় ঘুম হারাম করে দেওয়ার জন্য ঐ কাগজের পাতাটাই যথেষ্ট ছিল। নিজের আম্মু আব্বুকে দেখে সে বড় হয়েছে। সবসময় দেখেছে তাদের মিষ্টি সম্পর্ক, ভালোবাসা, খুনসুটি। অথচ বাবার বিরুদ্ধে মায়ের এমন অভিযোগ ও মানতেই পারল না। লেখাগুলো সত্য ভাবলেই কষ্ট হচ্ছে তার। তার বাবা এমন কিছুতেই করতে পারে না। কিছুতেই না। আদ্র মনে মনে লেখাগুলোকে মায়ের ঠুনকো অভিযোগ হিসেবেই নিল। তবুও একেবারেই অবহেলায় রাখল না। সারাদিন-রাত ভেবে সে হাঁসফাঁস করল। তার মা কোন এক আত্মীয়ের বাসায় গিয়েছেন। দাদীর থেকে এটাই জেনেছে সে। অথচ আম্মুর সাথে কথা বলার জন্য আদ্র উদ্গ্রীব হয়ে থাকল। অবশেষে যখন তার মা পরদিন বিকালে ফিরল সে একমুহুর্তও দেরি করল। আম্মুর ঘরে গিয়ে সর্বপ্রথম বলে উঠল,

“ আম্মু? তোমার সাথে কথা আছে।বসবে একটু? ”
আদ্রর মাকে আজ ফুরফুরে দেখাল। কেন তা জানে না। তবে মুখটা হাসিহাসি দেখাল। আদ্রর দিকে ফিরে হেসে শুধাল,
” বলে ফেলো আদ্র। ”
আদ্র বহুদিন পর মাকে ভালোভাবে হেসে কথা বলতে দেখে বোধহয় নিজেও খুশি হলো। অতঃপর পকেট থেকে কালকের দুমড়ে মুঁছড়ে রাখা কাগজটা হাতে নিয়ে বলল,
“আম্মু?তুমি এসব কেন লিখেছো? ”
“ কোনসব? ”
আদ্র কাগজটা বাড়িয়ে দিয়ে বলল,
“ এটা? এটা তোমার হাতের লেখা তাই না? ”
আদ্রর মা কাগজটা দেখল। লেখাগুলো লেখার পর কাগজটা বোধহয় ঘরেই ছুড়ে ফেলেছিল। আদ্র কিভাবে পেল? উনি ছোটশ্বাস ফেলে বলল,
“ হ্যাঁ। ”
আদ্র এবার মায়ের দিকে চাইল। শুকনো গলায় জিজ্ঞেস করার চেষ্টা করল,

“ আব্বু, আব্বু কি অন্য কারোর সাথে… ”
বাকিটুকু বলতে পারল না আদ্র। বাকিটুকু মুখে এলও না ওর। আদ্রর মা হাসল। বোধহয় ছেলের জিজ্ঞাসু দৃষ্টি দেখে স্পষ্টই বুঝে গেল কি বলতে চাইছে। শুধাল,
“থামলে কেন আদ্র? জিজ্ঞেস করো। ”
আদ্র জিজ্ঞেস করতে পারল না যেন। অসহায়ের মতো চাইল। তারপর অনেকটা সময় থেমে সে আবারও বলল,
“ আব্বু আর তোমার সম্পর্ক ঠিক আছে না আম্মু?
আদ্রর মা বিপরীতে ফের হাসল। বলল,
“ উত্তরটা কি হলে তুমি খুশি হবে আদ্র? ”
“ আম্মু প্লিজ বলো না আব্বু কোন খারাপ কাজ করেছে। ”
উনি ভ্রু কুঁচকালেন। ছেলের দিকে চেয়ে বললেন,
“ খারাপ কাজ? খারাপ কাজ কোন যুক্তিতে আদ্র? ”
” তোমাকে রেখে যদি আব্বু অন্য কারোর সাথে সম্পর্ক রাখে তবে সেটা খারাপ কাজ নয়? ”

“ নাহ তো। সে পুরুষ। পুরুষ হিসেবে তার চাহিদা থাকতেই পারে। সে মানুষ। মানুষ হিসেবে সে বদলাতেই পারে, তার পছন্দও বদলাতে পারে। মানুষ তে বদলায়।কারণে হোক,অকারণে হোক বদলায় তারা। ”
এই কথাগুলোই, এই কথাগুলোই তার স্বামী তাকে বলেছে। যে সে পুরুষ মানুষ। তার অন্য নারীর প্রতি দ্বিতীয়বার আকর্ষন আসতেই পারে। দোষ কি তাতে? সে কি প্রথম স্ত্রীর দায়িত্ব নিচ্ছে না? নাকি প্রথম স্ত্রীর ভরণপোষণ চালাচ্ছে না? কোনটা? তাহলে? অপরাধ কি? সামর্থ্য আছে যেহেতু সে আরো পাঁচ ছয়টা বিয়ে করবে, বউ পালবে সমস্যা কি? ঠিক এই কথাগুলোই সে তার ছেলেকে এখন শুধাল মুখে মৃদু হাসি রেখে। আদ্র মানল না কথাগুলো। মুহুর্তেই শুধাল,
“ মানে? তুমি বলতে চাইছো আব্বু যদি অন্য কাউকে পছন্দ করে তা ভুল নয়? যদি তোমায় ঠকায় তা ভুল নয় আম্মু? কি বলছো হ্যাঁ?কোন যুক্তিতে? ”
“ আদ্র, হাসাচ্ছো তুমি আমায়। তুমিও এখন প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষমানুষ। তুমিও ঠকিয়েছিলে। তুমিও একজনকে ঠকিয়ে অন্য একজনের সাথে সম্পর্কে ছিলে। আমার ছেলে হলেও আমি দিনশেষে এটাই বলব যে তুমি একজন মেয়েকে ঠকিয়েছিলে, একজন স্ত্রীকে ঠকিয়েছিলে, এবং সবশেষে একজন মাকেও ঠকিয়েছিলে। তোমার যুক্তিতে তো তা ঠিকই ছিল তাই না? ”
আদ্র বোকার মতো চাইল। কিভাবে ঠিক? সে তো মানতে পারছে না। কেন তার আব্বু তার আম্মুকে রেখে অন্য কাউকে চাইবে? কেন? শুধাল,

“ হু? ”
“ আমি, আমি ঠিক এই জায়গায় এসে মিথির জায়গাটা উপলব্ধি করতে পারছি আদ্র। মিথিকে যে সময়টা অতিক্রম করে যেতে হয়েছিল তা আমি আজ নিজেকে এই জায়গায় বসিয়ে টের পাচ্ছি। খুব করে টের পাচ্ছি। ”
আদ্রর মনে পড়ল মিথির কথা। মিথিকে রেখে দিনের পর দিন মুহুর কাছে যাওয়া। অবহেলা করা। গায়ে হাত তোলা। মিথি না চাইতেও জোরজবরদস্তিতে হামলে পড়া। এক মুহুর্তের জন্য মিথির জায়গায় নিজের আম্মুকে কল্পনা করে ও শিউরে উঠল। নাহ! এমনটা হতেই পারে না। আর যায় হোক, তার আব্বু তার মায়ের সাথে এমন করবে না। এইটুকু বিশ্বাস তার আছে। মুহুর্তেই শুধাৱ,
“ কিসব বলছো আম্মু? তুমি ওর জায়গায় থাকতেই পারো না। আব্বু কখনো এমন করবে না। কখনো না। আব্বু তোমায় ভালোবাসে আম্মু। আব্বু আমাদের ভালোবাসে। ”
আদ্রর আম্মু হাসল ছেলের ভয় দেখে। বলল,

“ বাসে না তা তো বলিনি তোমায়। আমি শুধু প্রসঙ্গ টেনে কথা বললাম।”
“ তাহলে যে বললে ওর জায়গাটা তুমি টের পাচ্ছো? কেন বললে? ”
উনি ফের হেসে শুধালেন,
“ তোমার অনুভূতিটা দেখছিলাম। যা নিজের মায়ের সাথে মানতে পারছো না, তা অন্য একটা মেয়ের ক্ষেত্রে কিভাবে মেনে নিয়েছো? সে অন্য ঘরের মেয়ে বলে? ”
আদ্র চোখ বুঝল। তার এখনও মিথির জন্য তেমন কোন কষ্ট হচ্ছে না। অনুভূতি আসছে না। তবে মিথির জায়গায় তার মাকে বসালেই হৃদয় হু হু করে উঠছে। অস্থির অনুভূতি জাগছে।চোখ খুলে সে আবারও নিশ্চিত হতে বলল,
“ আম্মু? তুমি এই কাগজে এসব কেন লিখেছো? সত্যি সত্যিই সব ঠিক আছে তাই না? ”
উনি আস্বস্ত করে একটা মিথ্যে বললেন,

“ সব ঠিক আছে আদ্র।আচ্ছা, কখনো যদি তোমার সামনে এমন সিদ্ধান্ত আসে যে। তোমার মা অথবা বাবা যে কোন একজনকে বাচাই করতে হবে, তুমি কাকে করবে আদ্র? কাকে চাইবে? ”
আদ্র এবারে নিজের ভয় চেপে রাখতে পারল না। ছোটকাল থেকে তাকে মাথার উপরে রেখে বড় করেছে তার আম্মু আব্বু। আদরে আদরে রেখেছে সর্বক্ষণ।সবসময় সে তার বাবা মায়ের উপরই নির্ভরশীল হয়ে বড় হয়েছে। তার জন্য এই পৃথিবীতে একা চলা কোনকালেই সম্ভব নয়৷ কোনকালেই নয়। হয়তো বড় হওয়র পর বাবা মায়ের সাথে দূরত্ব বেড়েছে কিন্তু সে বাবা মাকে ছাড়া নিজেকে কল্পনাই করতে পারে না। কখনো করেও নি। শুধাল,
“ আমি দুইজনকেই চাইব। দুইজনকেই। তোমাদের দুইজনের একজন বাদেও আমার চলবে না আম্মু। আমি তোমাদের দুইজনকেই চাই। তোমাদের দুইজনের উপরই আজীবন নির্ভরশীল ছিলাম আমি আম্মু। একটা দিনও চলতে পারব না তোমাদের ছাড়া। ”

মিথির সাথে এর মাঝে হিমেলের সাথে আরও কয়েকবার দেখা হয়েছে। একইভাবে সাবিহা নামক মেয়েটির সাথেও এই নিয়ে দুইবার দেখা হয়েছে। এবং দুইবার ও সাবিহার কথাতে কোথাও একটা টের পেল সাবিহা হিমেল ভাইকে চায়। হিমেল ভাইকে ভালোবাসে। কিন্তু, কিন্তু কোথাও না কোথাও সাবিহা বোধহয় মিথিকে নিয়েই ইনসিকিউরড ফিল করছে। অথচ মিথির সাথে হিমেলের সম্পর্ক নেই। তবুও? মিথি যদিও আজকাল অনুমান করেছে হিমেল ভাই বোধহয় তাকে অন্য নজরে দেখেন৷ আবার কখনো কখনো মনে হয় এই অনুমান স্রেফ ভুল ধারণা। কারণ হিমেল ভাই মানুষটার ব্যাক্তিত্বই এমন। উনি তো সাবিহাকেও সেদিন রিক্সায় এগিয়ে দিলেন। রিক্সা না পাওয়া অব্দি দাঁড়িয়ে ছিলেন। মিথি বুঝে উঠে না৷তবুও নিজের জায়গায়, নিজের ঠিক থাকা উচিত। কেউ যাতে তার দিকে আঙ্গুল তুলতে না পারে সেটা তার নিজেরই দেখা উচিত। কেন সে অন্য কারোর সম্পর্কে বিনা কারণেই তৃতীয় ব্যাক্তি হবে? কোন কারণে? হিমেল ভাই আর সাবিহা আপুর যদি সম্পর্ক থেকেও থাকে সে তাদের মাঝে কেন যাবে? তার নামই বা কেন উঠবে? মিথি ছোটশ্বাস ফেলে। টিউশন করিয়ে ফেরার পথে সাবিহার সাথে আজও দেখা হলো। অত্যন্ত সুন্দরী, নরম, চঞ্চল মনের মেয়েটিকে মিথির ভালো লাগে। মিথি মনে করে তাকেও এই মেয়েটার ভালো লাগে। অথচ আজকাল মনে হচ্ছে সে মিথিকে পছন্দ করছে না খুব একটা। কোন নিরব দ্বন্ধ স্পষ্ট ফুটে উঠে কথায় কথায়। বিনা কারণেই কারোর অপছন্দের তালিকায় চলে যেতে বোধহয় কারোরই ভালো লাগে না। মিথিরও না। মিথি আজও হেসে বলল,

“ ভালো আছেন সাবিহা আপু? ”
সাবিহা হাসে। মুখে দম্ভ টেনে বলে,
“ থাকব না কেন ভালো? তুমি কি চাও আমি ভালো না থাকি? ”
মিথি কথাটার ইঙ্গিত বুঝতে পারল। তবুও হেসে বলল,
“ একদমই না আপু। আমি চাই আপনি সবসময় ভালো থাকুন। ”
এইটুকু বলে হাসতেই সাবিহা তাকাল। ওর দিকে কিছুটা সময় তাকিয়ে হঠাৎ শুধাল,
“ মিথি? ”
“ হু? ”
“ আজকাল কাজলও দাও চোখে? সুন্দর দেখাচ্ছে। ”
মিথি এবারে সংকোচ বোধ করল। সাঁজগোজ খুব একটা পছন্দ না হলেও একটা সময় কাজল দিতে সে পছন্দ করত। বোধহয় প্রতিটা মেয়েই পছন্দ করে।আজ এতদিন পর কাজল দিয়েছিল মেয়ের কপালে কাজলের ফোঁটা দিতে গিয়ে। কিন্তু সাবিহা আপু কথাটা দ্বারা কি এমন বুঝাল যে, সে কাজল দিয়ে নিজেকে সুন্দর দেখাতে চাইছে? মিথির মুখটা দেখে সাবিহা আবারও হেসে বলে,

“ তোমার কি দ্বিতীয়বার বিয়ে করার ইচ্ছে আছে? ”
এই প্রশ্নটায় মিথি আবারও অপ্রস্তুত বোধ করল। অস্ফুট স্বরে বলল,
“ হু? ”
এবারে সাবিহা আবারও হাসল৷ শুধাল,
“ তুমি কি হিমেলকে চাও মিথি? ”
“ এই প্রশ্ন? ”
“ তুমি জানো না কেন এই প্রশ্ন? ”
মিথির এবারে নিজের প্রতিই অসহ্যকর এক অনুভূতি হলো। মানে? কি বুঝাল সাবিহা আপু? হেসে উত্তর করল,
“ আপনি যেভাবে মিন করেছেন আমি হিমেল ভাইকে সেভাবে কখনো ভাবিইনি আপু। আপনাদের এই বিল্ডিং য়ে আসা যাওয়া হয় শুধুমাত্র টিউশনির কারণে। হিমেল ভাই এর জন্য নয়। প্রয়োজন হলে হিমেল ভাইকে জিজ্ঞেস করবেন আপু।”

“ প্রয়োজন নেই জিজ্ঞেস করার মিথি।মজা করছিলাম কেবল। তুমি বোধহয় জানোই না হিমেল আর আমার বিয়ে ঠিক করে রাখা হয়েছে। ”
মিথিও হাসল। শুধাল,
“ আমি খুব খুশি হয়েছি। শুভকামনা আপনাদের জন্য আপু। ”
“ ধন্যবাদ। তুমিও তোমার মেয়েকে নিয়ে ভালো থেকো মিথি। আপু আসলে হিমেল আর তোমাকে নিয়ে অন্য কিছু ভাবে শুধুশুধুই। তুমিই বরং দূরে থেকো। ভাবাভাবির প্রশ্নও উঠবে না আর। আর যায় হোক, মেয়েদের চরিত্র কিন্তু সাদা কাগজের মতো বুঝলে? ”
মিথির হাসি হাসি মুখে বলা কথাগুলোর ইঙ্গিত বুঝতে দেরি হলো না। ও বুঝল কি বুঝাতে চাইছে। স্পষ্টই বুঝল।

মিথি ঠিক এরপর থেকে হিমেলকে প্রায়সই এড়িয়ে চলত। ইচ্ছে করেই এড়িয়ে চলত। হিমেল এই বিষয়টা খেয়াল করল সেদিন, যেদিন সে মিথির থেকে কিছুটা দূরত্বেই রিক্সার জন্য দাঁড়িয়ে ছিল। অতঃপর হিমেল হুট করেই দেখল মিথি সেখানে দাঁড়ালই না। পায়ে হেঁটে অনেকটুকু দূর গেল। ওখানে দাঁড়াল। হিমেল ভ্রু কুঁচকায়। এমন করল কেন ও? কি বুঝাতে চাইল? হিমেল ওকে বিরক্ত করে কখনো? নাকি বখাটেদের মতো তাকিয়েছে? ও জায়গা ছেড়ে দূরে দাঁড়াল কেন? হিমেলের বোধহয় কোথাও এই ছোট্ট বিষয়টা ইগোতে লাগল। এড়িয়ে যাওয়ার বিষয়টা মানতে না পেরে ও স্থির ওভাবে দাঁড়িয়ে থাকল। অতঃপর হুট করেই দৃশ্যমান হলো মিথি যেখানটায় দাঁড়িয়ে ছিল ওখানটায় একদল কুকুরের আগমন। ঘেউ ঘেউ শব্দ তুলে ওদিকেই আসছিল। মিথি সিটিয়ে গেল এক মুহুর্তেই। চোখ খিচে বন্ধ করে নিল। এক বাচ্চার মা হলেও, একা একা চলতে শিখলেও মিথি কুকুর দেখলে ভয় পায়। এখনও কলিজা কেমন করে কুকুর আশপাশ দিয়ে গেলে। মিথি পা বাড়াল। আস্তে ধীরে এদিকে পা বাড়াতে নিলেও দেখা গেল কুকুর গুলো ওর পিছু পিছুই আসছে। মিথি বেচারীকে ভয়ে শেষ হতে দেখে হিমেলের মুখে না চাইতেও হাসি এসে গেল। উপরে কত ভাব দেখায় এই মেয়ে, যেন সব পারে। কারোর সাহায্যের প্রয়োজন নেই। অথচ কুকুর ভয় পাচ্ছে! হিমেল পা বাড়াল। গিয়ে মিথির পাশে পাশে হাঁটতে লাগল। অতঃপর যেতে যেতে শুধাল,

“ সব পারে, সাহায্য লাগে না এমন ব্যাক্তিরা ও কুকুর ভয় পায়। ”
মিথি হুট করে হিমেলের স্বর শুনে পাশে চাইল। এতক্ষনের ভয় ভুলে ওর আবার মনে পড়ল সেদিনের কথা। মুহুর্তেই ও স্থির দাঁড়িয়ে গেল। একটা কথাও না বলে ওভাবে দাঁড়িয়ে থাকল৷ হিমেল এবারে ভ্রু কুঁচকাল। পাশের চা দোকান থেকে কয়েকটা পাউরিটি কিনে কুকুর গুলোর দিকে ছিটকে দিল। বলল,
“ আমি বখাটে ছেলে নই যে আমার কাছাকাছি থাকলে তোকে আমি আক্রমন করব মিথি। আমার আম্মু আব্বু, বড় ভাইয়া আমাকে মেয়েদের সম্মান করতে শিখিয়েছে। ”
মিথি ছোট ছোট চোখ করে তাকাল। ও কখনোই এটা বুঝায়নি যে হিমেল ভাই বখাটে। বরং হিমেল ভাই এর ব্যাক্তিত্ব সুন্দর। বরাবরই সুন্দর দেখে এসেছে এই মানুষটার ব্যাক্তিত্ব।বলল,
“ আমি কখনো তা বুঝাইনি হিমেল ভাই। আমি আপনার থেকে এমনিই দূরে থাকতে চাইছি। ”
হিমেল ভ্রু কুঁচকায়। ডান ভ্রু উঠিয়ে শুধাল,

“ আমি তোর খুব কাছের ছিলাম কোনকালে? কাছাকাছিই যেহেতু ছিলাম না, দূরে থাকার প্রসঙ্গ হঠাৎ?”
“ কারণ আমি একজন নারী, আর আপনি একজন পুরুষ। একজন নারী অন্য একজন পরপুরুষের সাথে কথা বলবে? কথা বলাটাও তো উচিত না। সমাজ খারাপ চোখে দেখে বিষয়টা। চরিত্রে দোষ দিতেও দুই সেকেন্ড সময় নেয় না। ”
হিমেল ফের ভ্রু কুঁচকায়। পকেটে হাত গুঁজে একদম সোজা, স্থির দাঁড়িয়ে ভ্রু কুঁচকে বলল,
“ চরিত্রে দোষ? আমার জন্য? সিরিয়াসলি? তোর দিকে বাজে ইঙ্গিতে কখনো তাকাইনি বখাটে ছেলের মতো। আমার উদ্দেশ্য খারাপ ও নয়। ”
এইটুকু বলেই হিমেল টং দোকানটার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। আরো কয়েক টুকুরো পাউরুটি ছুড়ে দিয়ে কুকুর গুলোকে ওদিকে নিয়ে এল। অতঃপর নিজ মনেই শুধাল,
“ তোর চরিত্রে দোষ হোক কখনোই তা চাওয়া ছিল না মিথিফুল। তোর ভালো চেয়েছি। সবসময় চেয়েছি তুই ভালো থাক। দিনশেষে তোকে কষ্টে দেখলে আমারও চাপা দীর্ঘশ্বাস বুকে জমে। তোকে আগলে নিতে না পারার আপসোস জাগে। তোর সুখগুলো কুড়িয়ে এনে দিতে না পারার দুঃখ হয়।”

ছাদের এককোণে বসে আছে হিমেল আর আয়মান। বাসায় নিয়মিত কিছু না কিছু নিয়ে ঝামেলা হতে হতে হিমেল বিরক্ত। বরাবরই এাই প্রসঙ্গ। বিয়ে! অথচ হিমেলই জানে সে একজনেতেই মুগ্ধ। একজনকে নিয়েই স্বপ্ন বুনেছে সংসার করার। সে জায়গা থেকে সরে আসতে কস্মিনকালেও চায়নি সে। এখনও নয়। হিমেল রাতের আকাশে তাকাল। উজ্জ্বল চাঁদটা আজ চকচকে দেখাচ্ছে। ওদিকে তাকিয়েই আয়মানকে বলল হঠাৎ,

বিষাদ ও বসন্ত পর্ব ৩৪

“ আয়মান? আমি কি মিথির দিকে হাত বাড়ানোর সাহস করতে পারি না? ওকে আগলে নেওয়ার সাহসটুকু করতে পারি না বল? ”
আয়মান হুট করে কথার প্রসঙ্গ বদলাতে দেখে বন্ধুর দিকে চাইল। বন্ধুর ঘাড়ে চাপড় মেরে শুধাল,
“ অবশ্যই পারিস। ”

বিষাদ ও বসন্ত পর্ব ৩৬