বিষাদ ও বসন্ত পর্ব ৩৪
অলকানন্দা ঐন্দ্রি
হিমেলের চাকরী হয়েছে। আর এই ছোট্ট কারণটাই এখন ওর পরিবারের কাছে ওর বিয়ের উপযুক্ত কারণ হিসেবে গণ্য হলো। সাবিহার সাথে হিমেলের বিয়েটা দেওয়ার ইচ্ছে অনেককাল থেকেই মনে মনে পুষে রেখেছিল ওর পরিবার। তার উপর এই কয়েক মাস হিমেলকে অনেকবারই এই প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। কারণটা হলো মিথির প্রতি হিমেলের দুর্বলতা। যা এই কয়েক মাসে আরো স্পষ্টই লক্ষ্য করেছে ওর পরিবার। বিশেষ করে ওর ভাবী। আর যায় হোক, পরিবার হিসেবে কি করে তারা এই দুর্বলতা মেনে নিবে? মিথি বিবাহিত। তার উপর একটা বাচ্চা মেয়ে আছে। কোন বাঙ্গালি পরিবার মানবে এই দুর্বলতা? এই অনুভূতি? কস্মিন কালেও নয়। বাঙ্গালিরা সবসময় চায় তাদের ছেলের জন্য একদম পার্ফেক্ট একটা মেয়ে। যে সবদিক দিয়ে পার্ফেক্ট হবে। কোথাও খুঁত থাকবে না। সেখানে মিথি তো ওদের চোখে অযোগ্যই গণ্য হবে। হিমেলের ভাবী রোজকার মতো আজ ও খাওয়ার ফাঁকে হিমেলকে জিজ্ঞেস করল,
“ হিমেল, চাকরি হয়েছে। প্রতিষ্ঠিত এখন তুমি। বিয়ে করতে কি অসুবিধা বলো? এমন তো নয় যে, তুমি কখনো বিয়ে করবে না। করবে যখন, আগে করলেই কি ক্ষতি? ”
হিমেল খাচ্ছিলো। খেতে খেতে ভাবীর কথা শুনে মাথা তুলে চাইল। মুহুর্তেই ভ্রু জোড়া কুঁচকাল। মাস কয়েকে তাকে তার ভাবী বহুবার ইনিয়ে বিনিয়ে বুঝাতে চেয়েছে মিথির সাথে না মিশতে। মিথির সাথে এত কথা টথাও বা কিসের? মিথির প্রতি দুর্বলতা কমাতে। কারণ মিথি অন্য কারোর স্ত্রী, অন্য কারোর সন্তানের মা। অথচ হিমেল কোন বাড়াবাড়ি করেনি, অনুভূতি প্রকাশ করে নি, পাগলামো করে নি। তবুও ভাবীর এত ভয়? কোথাও বোধহয় উনি নিজেও হিমেলের অনুভূতির ভীত খু্ব মজবুত দেখে ভয় পাচ্ছেন। হিমেল হাসল। মৃদু হেসে পরের গ্রাসটা মুখে নিয়ে বলল,
“ বিয়ের বহু সময় এখনো ভাবী। সময় হয়ে গেলে অবশ্যই করে নিব বিয়ে। এত তাড়াহুড়ো কিসের? ”
হিমেলের ভাবী তাকালেন। চেয়ার টেনে বসে শুধালেন,
“ সাবিহার বয়স হচ্ছে। তোমার কি মনে হয় না ওর বিয়ের বয়স পেরিয়ে যাচ্ছে? ”
হিমেল ভ্রু কুঁচকাল। সাবিহাকে ইচ্ছে করেই ওর সাথে জড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা কেন করা হচ্ছে তা সে নিজেও বুঝল না। অথচ এ কখনে সাবিহাকে অন্য নজরে দেখেনি৷ বলল,
“ সাবিহা? ওকে তো আমি অপেক্ষা করতে বলিনি ভাবী। কেন অপেক্ষা করে বসে আছে ও? আমি কি বলেছি ওকে কখনো?
“ তুমি না বললেও আমি বলেছি। কারণ ও আমার বোন হয় হিমেল। তোমায় পছন্দ করে। বুঝি আমি ওকে।”
“ হু। ”
হিমেলের ভাবী আবারও বলে উঠল,
“ তোমার যদি বিয়ে নিয়ে এতই অনাগ্রহ থাকে তাহলে অন্তত আকদটা করে রাখো। দুইজনে সময় নাও। তারপর নাহয় সংসার হোক। ”
হিমেল এবার হেসে ফেলল। স্পষ্ট বোধ হলো তার ভাবী অনিশ্চিত কোন আশংকায় ভয় পাচ্ছে। এবং সেটা যে মিথিকে নিয়ে তা বুঝতে কষ্ট হলো না। হিমেল মুখে অল্প হাসি ফুটিয়ে জিজ্ঞেস করল,
“ আপনি কি ভয়ে আছেন ভাবী? ”
মুহুর্তেই প্রশ্ন এল,
“ কি নিয়ে? ”
হিমেল এবারেও হেসে উত্তর করল,
“ তা আপনি ভালো জানবেন। কিন্তু আমি সত্যি সত্যিই সাবিহাকে কখনো অন্য নজরে দেখিনি। কখনোই না। ”
“ তো কাকে দেখেছো? মিথিকে? ”
“ উত্তরটা জানেন আপনি। ”
এই পর্যায়ে বোধহয় তার ভাবী একটু হলেও অসন্তুষ্ট হলো। মুখচোখে ফুটে উঠল স্পষ্ট বিরক্তির ছাপ।সে জানে মিথি ভালো মেয়ে, হিমেল ভালো ছেলে। এবং কোথাও একটা এই দুইজনের প্রতি তার একটা ভালো লাগাও আছে। তবুও এই মুহুর্তে দাঁড়িয়ে হিমেল মিথিকে এখনো পছন্দ করে উত্তরটা সহ্য হলো না। বলল,
“ জানি বলেই জিজ্ঞেস করছি। ওকে অন্য নজরে দেখেছো ভালো। কিন্তু ওকে বিয়ে করবে তুমি? বিয়েটা তো সম্ভব নয়। আর এমন তো নয় তুমি আজীবন ওর জন্য বিয়ে না করে থেকে যাবে। ওসব শুধু আবেগই হিমেল। বাস্তবতা ভিন্ন। ”
হিমেলের কন্ঠ এবার যথেষ্ট গম্ভীর শোনাল। দৃঢ় এবং গম্ভীর স্বরে সে জানাল,
“মিথি কখনো আমার আবেগ ছিল না ভাবি। কখনো সো কল্ড আবেগে পরিণত হবে ও না। আর এই যে বললেন বিয়ে তে সম্ভব নয়। অথজ সম্ভব হলে আমি মিথিকে অনেক আগেই বিয়ে করে নিতাম। ওকে আগলে নেওয়ার দায়িত্ব নিয়ে নিতাম এক মুহুর্তেই। আমি শুধু আবেগ ভেসে ওর প্রতি অনুভূতি রাখিনি, বরং আমি অনুভূতি বলতেই জেনেছি আস্ত এক মিথিকে। ”
বিপরীতে মুহুর্তেই উত্তর এল,
“ এক বাচ্চার মা ও, তবুও মিথিকে বিয়ে করার আগ্রহ কি করে পাও হিমেল? যদি স্বামীর সাথে ছাড়াছাড়ি হয়েও থাকে। তবুও তো দিনশেষে মিথি ডিভোর্সীই। ডিভোর্সী মেয়েকে বিয়ে করবে ঠিক কি কারণে? তোমার কি কম আছে? ”
হিমেলের মুখ স্থির। দৃষ্টিও স্থির। উত্তর করল,
“ কারণ ঐ একজনই আছে, যাকে আমি আমার সমস্ত অনুভূতি দিয়ে বসে আছি। ঐ একজনই আছে, যাকে ছাড়া আমি অন্য কাউকে জীবনে বসানোর কথা কখনো ভাবিইনি৷ যাকে আমি কখনো ভুলতেই চাইনি। ”
“ কি বুঝাতে চাচ্ছো? ”
হিমেল হাত ধুয়ে উঠে দাঁড়াল। যাওয়ার আগে শুধু বলল,
“ মিথি ব্যাতীত অন্য কাউকে জীবনে জড়ানো সম্ভব নয় এটাই স্পষ্ট করে বুঝাতে চাইছি। জেনেশুনে নিজের বোনকে দুঃখের দিকে ঠেলে দিবেন না। কারণ আমি ইতোমধ্যে জানি, একপাক্ষিক ভালোবাসার যন্ত্রনা ঠিক কতটুকু গাঢ়! ”
আদ্র মায়ের ঘরের সামনে দিয়ে যাচ্ছিল। হুট করেই মনে হলো মায়ের সাথে তার গল্প করা উচিত,কথক বলা উচিত। তার মা কেমন অনুভূতিহীন হয়ে যাচ্ছে বোধহয়। আদ্র খেয়াল করেছে। আদ্র পকেটে হাত গুঁজেই মায়ের রুমে এল। অথচ মাকে রুমের কোথাও না দেখে দু পা বাড়াতে নিতেই পায়ে বাঁধলো একটা দুমড়ে মুঁছড়ে রাখা গোল হওয়া কাগজ। আদ্র ভ্রু কুঁচকাল। নিচের দিকে চেয়ে বুঝল এটা কাগজ। অনেক অবহেলায়, রাগ, জেদ মিশিয়ে কেউ দুমড়ে মুঁছড়ে ফেলে দিয়েছে। এবং ফেলে দেওয়া মানুষটা যে তার আম্মুই তা বুঝতে কষ্ট হলো না আদ্রর। আদ্র কাগজটা হাতে নিল। দুই হাতে মেলে ধরে দৃষ্টি ফেলল। মুহুর্তেই চোখে ভাসল মায়ের সুন্দর হাতের লেখায় লিখা,
প্রিয় আমজাদ,
এই নিয়ে চতুর্থবার তুমি আমার গায়ে হাত উঠালে। চতুর্থবার! তুমি বোধহয় খেয়াল করোনি, আমার গালে তোমার পাঁচ আঙ্গুলের ছাপ বসেছে আমজাদ। স্পষ্ট দাগ ফুটে উঠেছে। ঠোঁটের এক কোণ কেঁটে গিয়েছে বিশ্রীভাবে। অথচ এই তুমিই একটা সময়ে আমার শরীরে ফুলের টোকাটা অব্দি পড়তে দিতে না। কতোটা আদর -যত্ন, ভালোবাসায় আগলে রাখতে। সামান্য মশা কামড় দিলে অব্দি তোমার কত হাহাকার। আজ কোথায় সেসব ভালোবাসা আমজাদ? বয়সের সাথে সাথে মরে গেছে কি? নাকি সৌন্দর্য হারাচ্ছি বলেই ভালোবাসারা বিলীন হয়ে গেল আমজাদ? আসলে বয়স হলো তো। এককালের সৌন্দর্যে ভরা রূপ আর নেই। তোমাকেও বোধহয় এই কারণেই আর আকৃষ্ট করে ধরে রাখতে পারলাম না। তুমি ভোমরের ন্যায় অন্য ফুলের সৌন্দর্যে আকৃষ্ট হলে, ছুটে গেলে। হয়তো তাকেও আমার মতো করেই আদর সোহাগে ভালোবেসেছো। আগলে নিয়েছো। যত্নে রেখেছে। আর আমি ঐ যে দিনের শেষে মলিন হওয়া ফুলের ন্যায় ঝড়ে পড়ছি ক্রমাগত। তুমি খুব নিষ্ঠুর ভাবে পিষে দিয়ে গেলে আমায় আমজাদ। খুব নিষ্ঠুর ভাবে। আমি মেনে নিতে পারছি না। নিজের এই করুণ পরিণতি কি করে মেনে নেই বলো? যে মেয়েটাকে তার আব্বা মাথায় করে রাখত, তার ভাই আদর যত্নে বড় করে তুলল, তার স্বামী যত্নে যত্নে মাথায় করে রাখল সংসারের রাণী হিসেবে সে মেয়েটা আজ জীবনের এই পর্যায়ে এসে স্বামীর হাতে মার খাচ্ছে। অবহেলিত হচ্ছে সামান্য এক হাঁটুর বয়সী মেয়ের কারণে।
কি করুণ পরিণতি দেখেছো আমজাদ? হাস্যকর, খুবই হাস্যকর! তবুও দেখো, এই সংসারের মায়া ভুলতে পারছি না। এতকালের সংসার আমার, কি করে ভুলি বলো? কি করি ভুলি তোমার হাত ধরে এই বাড়ি আসা? কি করে ভুলি তোমার সাথে অল্প অল্প করে গড়ে তোলা এই সংসারটা? কি করে ভুলি দুইজনের একসাথে মিলে সেই ছোট্ট আদ্রকে বড় করে তোলা? আচ্ছা আমজাদ, তুমি কি ভুলে বসেছো সব?সবটুকুই? কি করে পারলে? আমি কেন পারছি না আমজাদ? আমায় কেন বিধাতা সেই শক্তি দিল না?
বিষাদ ও বসন্ত পর্ব ৩৩
আদ্রর গলা শুকিয়ে আসল। তার আম্মু কি লিখল এসব? কি লিখল? কি বুঝাল? আদ্র আবারও পড়ল ঐটুকু লেখা। এবং আবারও টের পেল ওর গলা শুকিয়ে এসেছে। কন্ঠ রোধ হয়ে আসছে। নিজের মায়ের এহেন আহাজারি নিজেই যেন সহ্য করতে পারল না৷ নিজে নিজেই মনে মনে বলল,
‘ কি লিখেছো আম্মু? কেন লিখেছো এসব? শুধু তোমার অভিমান এসব?সত্যি নয় তো? তুমি এসব আব্বুর উপর অভিমান নিয়ে লিখেছো তাই না? ”
এইটুকু মনে মনে বলেই ও ঠোঁট নাড়াল। বহুকষ্টে কন্ঠ দিয়ে শব্দ বের করে ডেকে উঠল সে,
“ আ্ আম্মু?”
