Home বিষাদ ও বসন্ত বিষাদ ও বসন্ত পর্ব ৩৯

বিষাদ ও বসন্ত পর্ব ৩৯

বিষাদ ও বসন্ত পর্ব ৩৯
অলকানন্দা ঐন্দ্রি

“ ফিরে আসুন আপনার বাসায় হিমেল ভাই। আর কত বলুন? আমি আমার জীবনে আর কত দোষ নিব হিমেল ভাই? আপনি এতোটাও ইমম্যাচিউর নন যে বুঝবেন না পরিস্থিতি। আপনি চলে গেলেন, আমাকে এই প্রসঙ্গে জড়ালেন। ভালো কথা। কিন্তু দিনশেষে চরিত্রের দোষ কার হবে জানেন? আমার। এই মিথিয়া মাহমুদের। এই সমাজ কখনো ছেলেদের দোষ দেখে না হিমেল ভাই। শুধু মেয়েদের দোষটুকুই দেখে। কোন ছেলর প্রেমে পড়ুক,সমাজ প্রথমে মেয়ের দিকেই আঙ্গুল তুলবে। বলবে ছেলেকে সেই পাগল করেছে। একটা মেয়ের ডিভোর্স হোক। সমাজ সর্বপ্রথম বলবে, মেয়েটা এত ভালো হলে ডিভোর্স হলো কেন? সর্বোপরি ছেলেদের কোন দোষ হয়না হিমেল ভাই। দোষ হয় মেয়েদের। ”

কথাগুলো মিথি থেমে থেমেই বলল। অপর পাশ থেকে কথাগুলো শুনে হিমেল ভ্রু কুঁচকাল। বলল,
“ আমি তোকে দোষী বানিয়েছি বুঝাতে চাইছিস? ”
মিথি মৃদু হাসল তাচ্ছিল্য নিয়ে। দোষী তো বানালই। আবার জিজ্ঞেস করছে? বলল,
“ আমি না বললেও দোষী বানিয়েছেনই হিমেল ভাই। মিথ্যে নয় এটা। আমার চরিত্র নিয়ে আঙ্গুল তোলা হচ্ছে আপনার জন্য। ভালো দেখাচ্ছে না নিশ্চয় এটা? বাসায় ফিরুন বিয়ে করুন, সংসার সাঁজান। আমাকে এই প্রসঙ্গ থেকে রেহাই দিন। ”
হিমেলের মুখচোখ ফের শক্ত হলো। বারবার সংসার সাঁজান, সংসার সাঁজান বলে কি বুঝাতে চাইছে? হিমেল চাইলে সংসার সাঁজাতে পারত না? বহুআগেই পারত। মিথিকে বলতে হতো তা? দৃঢ় অথচ গম্ভীর গলায় বলল সে,

“ মিথি,আমি তোকে এমনি এমনিই প্রস্তাবটা দেইনি। এতোটা ঠুনকো ছিল না আমার কথা গুলো। ”
“ ঠুনকো না হলেও আপনার কথাগুলোর কোন ভিত্তি নেই হিমেল ভাই। এই সমাজে এমন সম্পর্ক হয় না। এমন প্রস্তাবেরও ভিত্তি নেই।আমার তরফ থেকে তো কখনোই এউ প্রস্তাবো রাজি হওয়া হবে না। আপনার বুঝা উচিত। ”
“ তোরও জানা উচিত যে, সবকিছু সবসময় নিয়ম মেনে চলেনা। কিছু কিছু বিষয় অনিয়মেও সুন্দর। ”
মিথির কন্ঠ স্পষ্টই। শুধাল,
“ সুন্দর নয়। আপনার পরিবারের সম্পূর্ণ অধিকার আছে আপনার জীবন নিয়ে ভাবার। এদিক থেকে আমায় অপরাধী করবেন না হিমেল ভাই। ”
হিমেল তাচ্ছিল্য নিয়ে হাসল। অপরাধী? মিথি তো এমনিতেই অপরাধী। তার না পাওয়া ভালোবাসার হিসেবে মিথি অবশ্যই অপরাধী। হিমেল বলল,
“তুই আমার জীবনের খাতায় এমনিতেই অপরাধী হয়ে আছিস মিথি। কতগুলো অপরাধ যে তুই নিজের অজান্তেই করে গেছিস মিথি। অথচ জানিসও না। ”
মিথি এই কথাগুলো বুঝল না। অস্ফুট স্বনে জানাল,

“ হু? ”
“ সে অপরাধ গুলোর জন্য হলেও তোর আমার প্রস্তাবে হ্যাঁ বলা উচিত মিথি। ”
“ যা সম্ভব নয় তা নিয়ে আশা রাখবেন হিমেল ভাই। ”
“ অসম্ভব ও নয়। আমি ছোট মিথিফুলকে নিজের কাছে রাখবই মিথি। তুই না বললেও রাখব। ”
এই কথাটাই মিথি মানতে পারল না। এই যে সমাজের মানুষ প্রতিনিয়ত ওকে বলে যাচ্ছে, একা বাচ্চা মানুষ করতে পারবে না। এই কথাটাই সর্বপ্রথম মনে পড়ল। হিমেল ভাই দয়া দেখাচ্ছেন? বাচ্চা মানুষ করতে পারবে না সে? মুহুর্তেই গলা শক্ত করে শুধাল,
“ দয়া দেখাবেন না হিমেল ভাই। আমার ছোট্ট প্রাণ দয়ার পাত্র নয়৷ ওর বাবা সাজার মোটেও প্রয়োজন নেই আপনার। ওর বাবা এবং মা দুইজন হিসেবেই আমি পার্ফেক্ট অন্য কাউকে প্রয়োজন নেই। ওর মা একাই যথেষ্ট। ”
হিমেল ফের ভ্রু কুঁচকাল। মেজাজ ও খারাপ হলো বোধহয়। বলল,

“ দয়া বলে কি বুঝাতে চাইলি মিথি? ”
“ ওটাকে দয়া, সহানুভূতিই বলে হিমেল ভাই। এবং আপনি যেটা করছেন সেটা সুস্থ মস্তিষ্কে থেকে অসুস্থ কাজ করা বলে। একটা মেয়ের চরিত্রে দোষ দেওয়া বলে। আমি না চাইলে আপনি কখনোই আমায় জোর করতে পারেন না এই রকম সিদ্ধান্তে। আর আমি কখনোই চাইব না। ”
“ ওটা যে দয়া নয় তুই জানিস মিথি। খুব ভালো করেই জানিস। আর চাওয়া না চাওয়র প্রসঙ্গ বাদ থাকুক। কখনো সময় হলে আমি অবশ্যই তোদের দুইজনকে আগলে নেওয়ার লোভ সামলাব না। ”
“ জোর করবেন আমায় হিমেল ভাই? মিথি এতোটা স্বস্তা নয়। জীবনে বাঁচতে শিখেছি এখন। কাজেই নিজের জীবনের সিদ্ধান্ত টুকু নিতে পারি। আপনাকে সম্মান করতাম, করি হিমেল ভাই। দয়া করে সেই সম্মানটা ঘৃণায় রূপান্তরিত করবেন না। ”
এইটুকু বলেই মিথি কল রাখল। হিমেল দীর্ঘশ্বাস ফেলে। মিথি কি বলল? ঘৃণা? ঘৃণা করবে মিথি তাকে? হিমেল আকাশপানে চেয়ে নিজেই বিড়বিড় করল,
“ মিথিফুল? তোকে অন্য কারোর নামে পুণরায় লিখে দেওয়ার যে বিশ্রী পরিকল্পনাটা সবাই করছে না? এতেই ভয় হয়। যদি দ্বিতীয়বারও হারিয়ে ফেলি? যদি দ্বিতীয়বার তোকে অন্যের হতে দেখি? নয়তো তোকে না পেয়েও আমি সারাজীবন ভালোবাসতে পারব। কিন্তু আগলে রাখা? দূর থেকে আগলে রাখতে পারছি কই? তোকে এবং বাচ্চা মিথিফুলকে আগলে রাখার লোভ করা কি অন্যায়? ”

আদ্রর বাবা আমজাদ সাহেব একটা ট্যুরে গিয়েছিল। বিজন্যাস ট্যুরে। পরিবারে এমনটাই বলে গিয়েছিল। তবে ফিরতে একা ফিরলেন না তিনি। সঙ্গে করে এনেছেন এক নব বিবাহিতা বধূ। পরণে লাল শাড়ি, মুখে কৃত্রিম বঁধুয়া সাঁজ। আদ্রর মা আরুনিমা কিছুটা সময় শুধু পরখই করল মেয়েটাকে। একদম মেয়েলি বয়স, রূপের দিক থেকে কি চমৎকার রূপ! বয়সে হয়তো আদ্রর বয়সী, অথবা তার চেয়ে কম। আরুনিমা মাহমুদ কিয়ৎক্ষন তাকিয়েই স্বামীর দিকে চাইলেন। উনার মস্তিষ্ক যা আন্দাজ করছেন তা যেন সত্যই তা বুঝতে কষ্ট হলো না। তবুও, তবুও কোথায় একটা বিধছে। মানতে পারছেন না। গলার কাছে কিছু যেন আটকে আসছে। সে সমস্তটুকুই লুকিয়ে স্বামীর কাছে জানতে চাইল,
“আমজাদ? সে? সেই তাহলে…”
বাকিটুকু বলা হলো না। শুকনো ঢোক গিলল কেবল। আমজাদ সাহেব নিজেই বললেন এবারে,
“ এখন থেকে ও এই বাড়িতেই থাকবে।সমস্যা নেই তো তোমার? যদি সমস্যা হয় অন্য ফ্লার্টে থাকার ব্যবস্থা করব। ”
অস্ফুট স্বরে ভেসে এল,

“ হু?”
ফের পর মুহৃর্তেই শুধাল,
“ বিয়ে করেছো তোমরা আমজাদ? ”
উত্তর এল,
“ হ্যাঁ। ”
“ কতদিন হলো বিয়ে করেছো? ”
“ দুদিন।”
আদ্রর মায়ের হৃদয় কাঁপে। নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। এতগুলো দিনে যে কষ্টটা সে অনুভব করে গেছে তা যেন আজ চূড়ান্ত রূপ নিল স্বামীকে অন্য কারোর হতে দেখে। কিয়ৎক্ষন চুপই থাকল। চোখ দিয়ে যেন পানি গড়াবে। অথচ গড়াতে দিল। দৃঢ় ব্যাক্তিত্বের ন্যায় চেয়ে থেকে হুট করে বলল,
“ আমার, আমার এখন কি করা উচিত আমজাদ? তোমাদের বাসর সাজানো উচিত? ”
এইটুকৃ জিজ্ঞেস করে আবার বলল
“ উচিত তো। তুমি এতবছর পর, এত শখ করে বউ তুলেছো ঘরে। আমার আয়োজন করা উচিত।আমজাদ, তোমার এভাবে লুকিয়ে চুরিয়ে বিয়ে করা উচিত হয়নি। অনুষ্ঠান করে বিয়ে করতে নাহয়। তোমার এত টাকাপয়সা, বিয়ের অনুষ্ঠান করলে কি কম পড়ত?”
আমজাদ সাহেব ভ্রু কুঁচকালেন। বললেন,

“ কি বুঝাচ্ছো? ”
“ কিছু নয়। তবে অনুষ্ঠান করে ঝাকঝমক করে অনুষ্ঠান করে অবশ্যই উচিত ছিল।”
অহেতুক প্রশ্নগুলোকে গুরুত্বই দিলেন না আমজাদ সাহেবে। একপ্রকার তুচ্ছতাচ্ছিল্য নিয়ে বলল,
“ আমি ঘরে যাচ্ছি। তোমায় জানানোর ছিল জানালাম। ”
আদ্রর মা হাসল। নব বিবাহিতা বউকে রেখে চলে যেতে দেখে মুহুর্তেই শুধাল,
“তুমি? তুমি বুঝি দাঁড়িয়ে থাকবে? আমজাদ, নিয়ে যাও না ওকেও সঙ্গে করে।”

আদ্রর মা সেই সন্ধ্যা থেকেই বাড়িঘর সাঁজানোর ব্যবস্থা করেছেন। লোক ভাড়া করে ফুল দিয়ে বাসর ঘর সাঁজানোর ও ব্যবস্থা করেছেন। ভালোমন্দ রান্না করেছেন। এই এতসব আয়োজনের মধ্যে হুট করেই উপস্থিত হলো আদ্র। নিজের বাড়িতে এতকিছুর কারণ বুঝে না উঠে মাকেই শুধাল প্রথমে,
“ কি হচ্ছে আম্মু বাড়িতে? ”
উত্তর এল,
“ বাড়ি সাজাচ্ছি। ”
“ কেন? ”
“ সাজাচ্ছি যখন কারণ আছে আদ্র। এত প্রশ্ন করো কেন? ”
আদ্র বুঝল না হেয়ালি কথাগুলো। ঠিক তখনই তার দাদী এল। ছেলের এমন কান্ডে তিনি হতাশ। এই বয়সে ছেলে এমন করবেন বোধহয় ধারণাও করেননি। আজীবন তো দেখেছেন ছেলে এবং ছেলের বউ এর সুন্দর সম্পর্ক। আদ্রকে দেখেই ভরসা হিসেবে বলে বসলেন উনি,
“দাদুভাই, তোমার আব্বায় কোন এক মাইয়ারে বিয়ে করে আনছে। তোমার আম্মা মাইনাও নিছে। নিজের কপালডা ও নিজে পুড়াইল না কও। ”
আদ্র ভ্রু কুঁচকাল। কথাগুলো অবিশ্বাস্য মনে হলেও আদ্র জানে এগুলো অসম্ভব ও নয়। তবুও এমনটা করবে তার ধারণার বাইরে। শুধাল,

“ কি বললে? ”
আদ্রর মা এড়িয়ে যেতে চাইল যেন। শ্বাশুড়িকে বললেন,
“আম্মা, ছেলে আপনারই। ছেলের নতুন জীবনের জন্য শুভকামনা জানানো উচিত আপনার। ”
তিনি আহাজারি করে বলে উঠলেন,
“ ঐ মাইয়া, ঐ মাইয়া নির্ঘাত আমার পোলার মাথাটা গিলছে। নয়তো আমার আমজাদ এমন করতই না। ”
আদ্র কিয়ৎক্ষন চুপই থাকল। অতঃপর ধীরে ধীরে মস্তিষ্ক সবকিছুই যেন বুঝতে পারল। একে একে সবকিছু সাজিয়ে ও স্থির দাঁড়িয়ে থাকল৷ কষ্ট হচ্ছে না তার, বরং রাগ হচ্ছে। বাবার প্রতি ক্ষোভ জম্মাচ্ছে। সে ক্ষোভ প্রকাশ করতে দেরিও করল না সে। বাবার কাছেই গেল৷ সর্বপ্রথম জিজ্ঞেস করল,
“ এসব কি? তুমি বিয়ে করেছো? আমার আম্মু থাকতেও তুমি অন্য কাউকে বিয়ে করেছো? সাহস হলো কি করে তোমার? ”
আদ্রর আব্বু আকস্মিক আক্রমন এবং ছেলের প্রশ্নে উত্তর দিতে পারলেন না। আদ্র ফের আবারও রাগ, জেদ, ক্ষোভ সব উগড়ে দিয়ে বলল,
“ উত্তর দিচ্ছো না কেন? বলো। এতগুলো দিন কিছু বলিনি। অনেক, অনেক আগেই টের পেয়েছিলাম তোমার আর আম্মুর সম্পর্কের পরিণতি। আমি ভেবেছিলাম তুমি আমার কথা হলেও একটু ভাববে। ভাবোনি, আমার আম্মুর কথাও ভাবোনি। ছিহ!”
আদ্রর সমস্ত রাগ জেদ নিয়েই সদ্য ফুল দিয়ে সাজাতে থাকা ঘরটা এলোমেলো করল। প্রত্যেক আসবাবপত্রে ভাঙ্গচুর করে শাসিয়ে বলে গেল,

“ কোন বাসর হবে না। বুঝলে? কোনকিছু হবে না। আমার আম্মু, এই সংসারটা কেবল আমার আম্মুরই থাকবে। আর কারোর নয়। আর কাউকে আনার চেষ্টা করলে আমি তোমাকে ছেড়ে দিব না। ”
আদ্র হনহন করেই বের হয়ে এল। মায়ের হাত টেনে মুহুর্তেই বলল,
“ আম্মু, তুমি মেনে নিচ্ছো? মেনে নিচ্ছো এসব? এই লোকটাকে শাস্তি দেওয়া উচিত ছিল তোমার। চড় দিয়ে গাল লাল করে দেওয়া উচিত ছিল তোমাকে ঠকানোর জন্য। মেনে নিচ্ছো কেন তুমি আম্মু? ”
আদ্রর মা ছেলের এমন আচরণ দেখে চোখ রাঙালেন। যেন সবটাই স্বাভাবিক। বরং আদ্রই অস্বাভাবিক কথা বলছে যেন। ধমকে বললেন,
“ আদ্র!”
“ শুনব না তোমার ধমক। আর এক মুহুর্তও থাকবা না আমরা এখানে আম্মু। এক মুহুর্তও না। এই বাড়িতে থাকা সম্ভব নয়। চলো আমার সাথে.. ”
ঠিক এইটুকু বলার পরই আদ্রর গালে থাপ্পড় পড়ল। একটা জোরাল থাপ্পড়। রেগে তার মা বলে উঠল,

বিষাদ ও বসন্ত পর্ব ৩৮

“ আদ্র..! কথা শুনছো না কেন? বলেছি না আমি এই বাড়ি ছেড়ে যাব না? আমার বাড়ি এটা। কত মায়া! তুমি বারবার বাড়ি ছেড়ে যাওয়ার কথা কেন বলো হুহ?আমার সংসার রেখে যাব না আমি। ”
“ যাবে তুমি আম্মু। এই লোকটার সাথে আর এক মুহুর্তও সংসার করবো না। ”
“ যাব না। শুনেছো? তোমার ইচ্ছে হলে তুমি যাও। ”
আদ্র রাগে জেদে না পেরে সামনের চেয়ারটায় লাথি মারল। ইচ্ছে হচ্ছে নিজের মাথাটা ফাটিয় ফেলুক রাগে। ইচ্ছে হচ্ছে বাবা নামক মানুষটাকে খু’ন করতে। তার মায়ের সাথে এই বিশ্বাসঘাতকতা কেন করল এই লোক?

বিষাদ ও বসন্ত পর্ব ৪০