বিষাদ ও বসন্ত পর্ব ৪০
অলকানন্দা ঐন্দ্রি
যে স্বামীর সাথে এতকাল সংসার করেছে, যে স্বামীকে এতকাল শুধু এবং শুধুই নিজের বলে জেনে এসেছে সে স্বামী আজ অন্য কারোর। কি সবিনয়েই তার কাছে প্রার্থনা করেছে যেন স্বামীকে ভাগ করে নিতে সে আপত্তি না করে৷ আদ্রর মা হাসে।উপহাসের হাসি। ঘাড় ফিরিয়ে তাকায় দেওয়ালে টাঙানো ছবিটার দিকে। আমজাদ সাহেব, আরুনিমা মাহমুদ এবং ছোট্ট আদ্র। কি সুন্দর! কি সুখময় ছবি। আমজাদ এসেছিল তার কাছে। বলেছে এই বাড়িতে নতুন বউটার যেমন অধিকার, তারও তেমনই অধিকার আছে। নতুন বিয়ে করেছে মানে এই নয় যে সে আরুনিমার অধিকার কেড়ে নিয়েছে। এই বাড়িতে, এই সংসারের সবকিছুতেই আরুনিমার অধিকার থাকবে। তবে নতুন বউকে ত্যাগ করতে যেন কখনো না বলে।
আরুনিমা মাহমুদ তাচ্ছিল্যের হাসি হাসল।এই যে এত আয়োজন করল, একটা বাড়ি সাঁজাল, একটা ঘর সাঁজাল। নিজেরই স্বামীর নতুন বিবাহিত স্ত্রীর আগমনের জন্য। তার কি কষ্ট হচ্ছে না? যন্ত্রনা হচ্ছে না? এই যে এতকালের সংসারটা এভাবে নষ্ট হলো আরুনিমার বুঝি নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে না? আমজাদ সাহেব তা বুঝল কোথায়? অধিকার? যেখানে তার অধিকার খোয়া গেছে বহু আগেই সেখানে নতুন করে কি অধিকার রাখবে সে? বিড়বিড় করে বলে গেল,
“ এই বয়সে এসে সমাজের এই ঠুনকো উপহাস না আমি চাইনি আমজাদ। কোনভাবেই চাইনি। এই যে খুব গর্ব করে বলতাম আমজাদ আমায় বেশ যত্ন করে। বেশ ভালোবাসে? আরুণিমার সে গর্ব চূর্ণ বিচূর্ণ হয়ে ভেঙে গিয়েছে আজ। আরুনিমা মুখ থুবড়ে পড়েছে লজ্জায়, ব্যর্থতায়, ভালোবাসা না পাওয়ার যন্ত্রনায়। ”
আদ্রর মা কাঁদে না। চোখের পলক ফেলে না। ঠিক একই ভাবে আয়নায় চেয়ে থেকে জড়বস্তুর ন্যায় বসে থাকল।যন্ত্রনা হচ্ছে তার। কষ্ট হচ্ছে। অথচ কষ্ট বুঝানোর মতো কেউ নেই। এই বয়সে এসে স্বামী নিয়ে এই আহ্লাদ করাটা বোধহয় মানায় ও না তার মতে।মানুষ হাসবে। আমরা মানুষরা খুব অদ্ভুত। কেউ দুঃখ শোনাতে এলে আমরা মিথ্যে স্বান্তনা অথবা উপহাস উগড়ে দেই। এটুকু ভেবেই অনেকটা সময় পর তিনি আবারও তাচ্ছিল্যের হাসি হাসলেন। বললেন,
“ আমজাদ? প্রিয় আমজাদ! এই বয়সে এসেও আমার কিশোরীদের মতো পাগলামো করতে ইচ্ছে হচ্ছে জানো? আহাজারি করতে ইচ্ছে হচ্ছে। তুমি কেন আমায় আমার মতো করেই ভালোবাসলে না আমজাদ? কেন আমায় শেষ অব্ধি রাখলে না তোমার মনে? কেন সে জায়গাটা অন্য কারোর হলো বলবে? শরীরের লোভে? শারিরীক সৌন্দর্য এতই বুঝি গুরুত্বপূর্ণ ছিল আমজাদ? ”
এর ঠিক পরপরই আদ্রর মায়ের চোখ গড়িয়ে জল পড়ল। নিজের হৃদয়ের সমস্ত ব্যাথার পরিচয় ঐ একফোঁটা চোখের জল বহন করতে পারল কিনা কে জানে। আবারও বলল,
“ আমি খুব বোকা আমজাদ! খুব বোকা। তা নাহলে এখনো অব্দি তোমার জন্য কষ্ট পাচ্ছি কেন? এই যে তোমায় অন্য একটা মেয়ের সাথে বদ্ধ ঘরে দিয়ে এলাম হেসেখেলে? আমার না যন্ত্রনা হচ্ছে আমজাদ। ইচ্ছে হচ্ছে চিৎকার করে কেঁদে পৃথিবীকে বুঝাই, কেউ একজন আমায় ঠকিয়েছে। ভীষণ ভাবে ঠকিয়েছে। কেউ একজনকে আমি হারিয়েছি, কিংবা কেউ একজন আমাকে হারিয়েছে….
বাকিটুকু গলায় আটকে রইল যেন। ভীষণ করে কান্না আসছে তার। চোখ লাল টকটকে হয়ে এসেছে। নিজের সাদা ধবধবে মুখটা লাল হয়ে এসেছে কেমন। এমনকি নাকের অগ্রভাগও। উনি আবারও বিড়বিড় করতে করতে বললেন,
“ জানো আমজাদ? ভালোবাসে বোকারাই। বুদ্ধিমানরা কখনো ভালোবাসতে পারে না। এই দেখো না, এত বয়স হলো। তবুও আমি বুদ্ধিমতী হতে পারলাম না। তোমার প্রতি আমার অভিযোগ নেই আমজাদ। কোন অভিযোগ নেই। কিন্তু এভ…
থেমে ফের আবার বিড়বিড় করল,
“ আমার মানুষটা আর আমার নেই। আমার মানুষটা আর আমায় ভালোবাসে না। আমার…আমার মানুষটা আমায় দেওয়া আহ্লাদটা, যত্নটা, ভালোবাসাটা সব অন্য কাউকে দিচ্ছে। এই কষ্টটা, এই যন্ত্রনাটা না আমজাদ মৃত্যুযন্ত্রনার থেকেও বিষাক্ত।”
আদ্রর মা উঠে দাঁড়ালেন। এক পা এক পা করে বাড়াতে বাড়াতে বলতে লাগলেন,
“ তুমি বললে না আমারও সমান অধিকার আছে? অথচ আমার মানুষটা একটুও যদি অন্য কারোর হয় না আমজাদ, আমি তাকে পুরোটাই দিয়ে দিতে প্রস্তুত। যতদিন আমার মানুষটার পুরোটাই আমি ছিলাম, ততদিন অব্দি তুমি আমার ছিলে আমজাদ। কিন্তু যে সময়টায় এসে তুমি একটু একটু করে অন্যের হতে লাগলে আমি সে সময় থেকেই বুঝে নিয়েছি তুমি আমার নেই আর। ”
অতঃপর দেওয়ালে টাঙানো সে ছবিটার সামনে গিয়ে স্থির দাঁড়াল। আমজাদ সাহেবের চেহারাটা দিকে বেশ অনেকক্ষন তাকিয়ে থেকে হেসে উঠলেন। চোখের অশ্রুর মুঁছে নিয়ে বললেন,
“ এই পৃথিবী আমায় মৃত্যুর আগ অব্দি কি শিখিয়েছে জানো আমজাদ? পুরুষ মানুষ হয় বিশ্বাসঘাতক। নিজের সবটুকু দিয়ে ভালোবাসলেও পুরুষ মানুষ সে ভালোবাসার মূল্য দিতে জানে না। বিশ্বাসের দাম রাখে না। পুরুষ নারীর সৌন্দর্যে বারবার মজে, পুরুষ নারীর প্রেমে বারবার পড়ে। পুরুষ একাধিক নারীকে তার মন দেয়,একাধিক নারীর কাছে শান্তি খুঁজে আমজাদ।পুরুষ মানুষকে কখনো চেনা যায় না। বহুকাল, বহুবছর সংসার করেও চেনা যায় না।নয়তো আমি চিনলাম না কেন তোমায়? কেন বোকার মতো নিজের জীবনটা তোমায় সপে দিয়েছিলাম? কেন সব ছেড়ে যার হাত ধরে জীবনের সুখ খুঁজেছিলাম,সে তুমিই আমায় মৃত্যুর আগে গলা টিপে মে’রে ফেললে আমজাদ? আমি তো বাঁচতে চেয়েছিলাম তোমার সাথে। বৃদ্ধ হতে চেয়েছিলাম তোমার হাত ধরে। পাঁকা চুল, কুচকানো চামড়া, দাঁত পড়ে যাওয়া খালি চোয়াল নিয়েও আমাদের ভালোবাসার গল্পটা সজীব থাকুক এমনটাই তো চেয়েছিলাম। তুমি সে গল্পটায় এভাবে সমাপ্তি টানলে কেন আমজাদ? ”
কথাগুলো বলার সময়েই ছবিটা দেওয়াল থেকে খুলে নিয়েছিলেন তিনি। অতঃপর রাগ, ঘৃণা, যন্ত্রনায় এক মুহুর্তেই ছবিটা ছুড়ে ফেললেন ফ্লোরে। ছবির কাঁচের ফ্রেমটা মুহুর্তের মধ্যেই ঝনঝন আওয়াজ তুলে চূর্ণ বিচূর্ণ হয়ে ছড়িয়ে পড়ল। ছবির মাঝ থেকে তবুও দেখা গেল আমজাদ সাহেবের মুখটা। একদম আরুনিমা মাহমুদের পাশে। সহ্য হলো না উনার। ফ্লোরে ছড়িয়ে যাওয়া সে কাঁচের টুকরো গুলোর পা চালিয়েই ঝুঁকে বসলেন তিনি। আশপাশে উদ্ভ্রান্তের মতো চেয়ে এক টুকরো কাঁচ নিজের হাতে তুলে নিয়ে তা দিয়ে আমজাদ সাহেবের মুখটা মুঁছে দেওয়ার চেষ্টা করলেন। পাগলের মতো বলতে লাগলেন,
“ তোমাকে আমার পাশে সহ্য করতে পারছি না আমজাদ। একটুও সহ্য করতে পারছি না। মুঁছে যাও। সবকিছু থেকে মুঁছে যাও তুমি। আমার, আমার তোমাকে লাগবে না আমজাদ। একটুও লাগবে না…”
অতঃপর আরো অনেকটা সময় ওভাবেই বসে থাকলেন। নিজের পা জোড়া কাঁচের ধারালো আঘাতে ক্ষতবিক্ষত হয়েছে অনেক আগেই। অথচ ব্যাথারা বোধহয় আজ অনুভবই হলো না। রক্তের দেখা মিলল মসৃণ ফ্লোরটায়। তবুও নিশ্চুপ উনি। ওভাবেই বসে থাকলেন অনেকটা সময়।
তারপর কি বুঝে উঠে দাঁড়ালেন। টেবিলে বসে একটা ছোট্ট কাগজ নিয়ে কিছু লিখলেন। ঠিক এরপরই গিয়ে আলমারি খুললেন। সমস্ত কাপড় এলোমেণো করে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছুড়ে ফেললেন ফ্লোরে। অতঃপর হুট করেই নিজের বিয়ের সাদামাটা সেকেলে বেনারসিটা হাতে তুলে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখলেন। বিড়বিড় করলেন,
“ মনে আছে? আজকের মতোই কোন একদিন আমিও তোমার হাত ধরে এই বাড়ি এসেছিলাম। তোমার নব বিবাহিতজ বউটিকে বউ সাঁজে আজ যেমন সুন্দর দেখাচ্ছে, তেমনই সেদিন আমার সাদামাটা সাজেও আমায় বোধহয় খুব সুন্দর দেখাচ্ছিল। নয়তো তুমি মোহগ্রস্ত হয়ে বারবার তাকাতে না সেদিন তাই না আমজাদ?এই শাড়িটাই, এই শাড়িটাই সেদিন আমার গায়ে ছিল। এই শাড়িটা পড়েই আমি এ বাড়িতে, এই সংসারে প্রথম পা রেখেছিলাম আমজাদ। তোমার কি মনে আছে? ”
অতঃপর অনেকটা সময় নিয়ে নিয়ে আদ্রর মা শাড়ি পড়ল। সে শাড়িটাই যেটা তিনি বিয়েতে পরেছিলেন। লাল টকটকে একটা সাদামাটা বেনারসি। গায়ের শুভ্র চামড়াটা এখনো সে বেনারসিতে কি চমৎকার মিশে আছে। লম্বা, ঘন চুল গুলো ছেড়ে দিলেন কোমড় অব্দি৷আয়না দেখে চোখে কাজল দিলেন। একদম নববধূর সেই সাঁজটা নিজের মধ্যে ধারণ করে আরুণিমা মাহমুদ মিষ্টি করে হাসলেন। আয়নায় চেয়ে শুধালেন,
“ এই সাঁজটা আমার মৃত্যুর সাঁজ আমজাদ। শেষবার এই বাড়ি ছেড়ে যাওয়ার সাঁজ। তুমি ভালো থেকো। খুব ভালো থেকো তোমার প্রিয়তমার সঙ্গে।”
এইটুকু বলে হাসলেন আরুনিমা। একটা বক্স থেকে পরপর একটা মোটা দড়ি বের করলেন। তার একটু পরই সে বক্স থেকে বেরিয়ে একটা সিরিঞ্জ। দড়িটা পাশে রেখেই আরুণিমা সে সিরিঞ্জটা হাতে নিলেন। খালি সিরিঞ্জ। তাতে তাকিয়েই হেসে বলল,
“ আমি এটা করতে চাইনি আমজাদ। কিছুতেই করতে চাইনি। তুমি আমায় বাধ্য করালে আমজাদ। তুমি যদি না চাইতে কিচ্ছু হতো না। কিচ্ছু না!”
আদ্র সারারাত বাড়ি ফিরেনি। রাতভর একটা বারে পড়ে ছিল। মধ্যরাতে অ্যালকোহলের নেশায় মজে থাকতে চেয়েও যেন পারল না। আজ অ্যালকোহলের নেশা তাকে টানছে না। দুঃখরা রাগ হয়ে শিরায় শিরায় জমেছে। যন্ত্রনা হচ্ছে। অতঃপর তার অল্প স্বল্প নেশাটা শেষ রাতে মিলিয়ে যেতেই আদ্রর তখন বুক ছিড়ে দীর্ঘশ্বাস বের হয়ে আসে। মায়ের মুখটা বার কয়েক ভেবেই বিড়বিড় করল,
“ মিথি? আমি তোর সাথে যে অন্যায় গুলো করেছিলাম তার প্রতিটা শাস্তিই কি আল্লাহ আমার আম্মুকে ফেরত দিচ্ছেন? আমার পাপের শাস্তি কেন আল্লাহ আমায় দিলেন না মিথি? কেন আমার আম্মুকেই ভাঙ্গলেন এভাবে? কেন আমার পাওয়া শাস্তিটুকু আমার আম্মুর ভাগ্যে লিখে দিলেন? আমার আম্মু যে সইতে পারবে না এই বিষাদের যন্ত্রনা…”
এইটুকু বলেই চোখ বুঝল সে। ফের আবারও বলল,
“ বিধাতা, আমি কতোটা অমানুষ ছিলাম তা বুঝাতেই কি আমার আম্মুর জীবনে তুমি এমন কষ্ট লিখে দিলে? পাপ তো আমি করলাম বিধাতা। অমানুষ তো আমি ছিলাম। তাহলে…”
আদ্রর কাছে এই ভোরটা খুব তিক্ত ছিল। বাড়ি ফেরার একটুখানিও ইচ্ছে ছিল না। আগ্রহও নেই। বরং মনেপ্রাণে সে সিদ্ধান্ত নিয়েই নিয়েছিল যে সে আর বাড়ি ফিরবে না। কিছুতেই না। অথচ নিয়তি বোধহয় চেয়েছিল তাকে যেতে হবে। তাইতো সকাল দশটা এগারোটা পার হতেই আদ্রর ফোন বাজল। আদ্র ভেবেছিল তার আম্মু কল করেছে। কিন্তু না, বাড়ির নাম্বার থেকে কল এসেছে।আদ্র বিরক্ত হয়েই কল কাটল। এর পর একের পর এক কল আসতেই থাকল। অপরপাশের ব্যাক্তিটি থামলই না। আদ্র বিরক্ত হয়েই একপ্রকার কল তুলল। ওপাশ থেকে তার দাদী বলে উঠল অস্থির স্বরে,
“ দাদুভাই? তাড়াতাড়ি, তাড়াতাড়ি একটু বাসায় আহো দাদুভাই।তুমি কই এহন? আছো আশেপাশে? ”
কন্ঠে স্পষ্টই অস্থিরতা টের পাওয়া যাচ্ছে। আদ্র বুঝল। বিরক্তি নিয়ে বলল,
“ এমন ভাবে কথা বলছো কেন? নতুন কিছু শুনাবে নাকি? ”
ফের অস্থিরতা নিয়ে বললেন তিনি,
“ দাদুভাইই..”
“ কি আশ্চর্য! এমন করতেছো কেন? তোমার ছেলে নতুন বউ নিয়ে বাসর করতে গিয়ে হার্ট এ্যাটাক করে মারা যায় নি নিশ্চয়? ”
অন্যসময় হলে তার দাদী হয়তো শুনাত যে বাবাকে এমন বলে না। কিন্তু আজ বলল না। বরং অস্থির স্বরে জানাল,
“ তুমি তাড়াতাড়ি বাড়ি আহো। বউমা দরজা খুলে না। ”
“ আম্মু? ”
“ হ। অনেকবার ডাক দিলাম। সবাই ডাকতাছে। কোন সাড়াশব্দ নাই দাদুভাই। কাল রাইতে তো ঠিকই স্বাভাবিক ছিল৷ সব করল।সবাইরে খাইতেও দিল। কিন্তু সকালে আর সাড়াশব্দ করে না। তুমি,তুমি একটু তাড়াতি আহো। ”
আদ্র হুট করেই স্তব্ধ হয়ে চাইল। দাদীর কন্ঠের অস্থিরতাটার জন্য একটু আগে বিরক্ত হলেও এখন সে অস্থিরতা নিজের উপর ভর করেছে। অজানা কোন এক ভয়ে কলিজা মোচড় দিচ্ছে। আদ্র যেমনই হোক, সে তার আম্মুকে ভালোবাসে। সত্যিই ভালোবাসে। বোধহয় প্রত্যেকটা ছেলেই এমন। বিড়বিড় করে শুধাল,
“ না, না আম্মু! তুমি কিছু করবে না। ”
ফের পরের মুহুর্তেই সামনে থাকা বেঞ্চটায় লাথি বসিয়ে বলল,
“ কি করে করলাম এই ভুলটা? কি করে? রাগের মাথায় আম্মুকে একা রেখে চলে আসলাম কিভাবে আমি? আম্মু যদি কিছু করে বসে? সত্যি সত্যিই যদি আমার ভয়টা… ”
ফের আবার নিজেকে বুঝিয়ে বলল,
“ না না!আম্মু এমনটা করতেই পারে না। আমায় রেখে চলে যাওয়ার কথা আম্মু ভাবতেই পারেন না। ”
আদ্র বাড়িতে ফিরল খুব তাড়াহুড়ো করেই। বাড়িতে ইতোমধ্যেই প্রতিবেশী, কাজের মহিলা সবাই মিলে ভীড় করেছে আদ্রর মায়ের ঘরের সামনে। আদ্র খুব দ্রুতই গিয়ে দাঁড়াল সেখানে। একপাশে দেখা গেল তার বাবা নামক মানুষটাকে এবং তার সদ্য বিয়ে করা বউটাকে। আদ্রর রাগগুলো আবারও সতেজ হয়ে এল যেন৷কিন্তু ওখন রাগার মতো বা রাগ দেখানোর মতো সময়ও নেই।আদ্র সোজা দাদীকেই জিজ্ঞেস করল,
“ আম্ আম্মু কোথায় দাদী? ”
আদ্রকে দেখা মাত্রই তার দাদী হুহু করে কেঁদে উঠলেন। এমন ভাবে কেঁদে উঠল যেন খুব মূল্যবান কিছু তিনি হারিয়ে ফেলেছেন। আদ্র বিরক্ত হয়েই বলল,
“ কান্না করছো কেন এভাবে? কি আশ্চর্য! কাঁদছো কেন তুমি এভাবে? বিরক্তিকর! ”
“ দাদুভাই…বউ মা..”
আদ্র যেতে চাইল। দাদীর কান্না দেখে ভ্রু কুঁচকে শুধাল,
“ সমস্যা কি? এভাবে আটকাচ্ছো কেন?”
“ শোন দাদুভাই..”
“ পথ ছাড়ো নয়তো বলো আম্মু কোথায়? দরজা খুলেছে নিশ্চয়? ”
আদ্রর দাদী কথা বলতে বারবার আটকাচ্ছিল। নাতিকে সরাসরি জবাবই দিতে পারছিলেন না। যে ছেলে ছোটবেলা থেকে এতোটা আদর যত্ন পেয়ে বড় হয়েছে সে ছেলেটাই গতকাল এত বড় একটা ধাক্কার সম্মুখীন হলো, আজ.. আজ আবার! কাঁপা গলায় বলার চেষ্টা করলেন,
“ আম্…”
বাকিটুকু আদ্রকে বলতে হলো না। ততোটা সময়ে আদ্র ভীড় ঠেলে রুমের জানালার সামনে গিয়ে দাঁড়িয়েছে। অতঃপর স্পষ্টই দৃশ্যমান হলো একটা ভয়ানক দৃশ্য। লাল শাড়ির আড়ালে দুটো ঝুলন্ত পা। যে পা জোড়া ক্ষতবিক্ষত। রক্ত শুকিয়ে এসেছে প্রায়। আদ্র শুকনো ঢোক গিল। বুকের ভেতর হৃৎযন্ত্র স্থির হয়ে গেল যেন এক মুহুর্তেই। আম্মু? এটা তার আম্মুই তো?আদ্র মুহুর্তেই চোখ উপরে নিল। খোলা চুলে, লাল শাড়ি পরিহিত একটা দেহ ঝুলছে। যে দেহের মালিককে একটু একটু করে মেরে ফেলা হয়েছিল তীব্র আঘাত, বিশ্বাসঘাতকতা আর অবহেলা দিয়ে। আদ্র আর এক মুহুর্তও স্থির থাকতে পারল। দৌড়ে গেল ঘরের দরজার কাছে। এখনও দরজাটা খোলার ব্যবস্থা করা হয়নি। কি রকম দায়িত্বহীস পুরুষ তার বাবা। আদ্র বহুবার ধাক্কা দিল। বহুবার। অথচ দরজাটা খুলতে সক্ষম হয়ে উঠতে পারল। শেষমেষ যখন পারল তখন কতটা দ্রুত গতিতে যে সে তার মায়ের কাছে গেল তা সে নিজেও জানে না হয়তো। মায়ের ঝুলন্ত শরীরটা জড়িয়ে ধরেই বাচ্চাদের মতো কেঁদে উঠল। বিড়বিড় করে শুধু এটাই বলে গেল,
“ আম্মু! আম্মু.. কেন করলে এমনটা?কেন? ঐ জা’নোয়ারটা তুমি চলে আম্মু? এভাবে চলে গেলে? ”
ফের চাইল মায়ের ঝুকে থাকা মুখটার দিকে। মায়ের শরীরটা তো ঝুলছে। কতোটা সময় যাবৎ যে এভাবে ঝুলছে। কেউ একটু তার মাকে নামাতেও আসল না। কি পাষন্ড! আদ্র তাড়াহুড়ো করে মাকে ধরে নামাতে চাইল। বিড়বিড় করে বলল,
“ এই আম্মু? আম্মু? তোমায় কে ঝুলিয়েছে এখানে? কে? এই লোকটা মে’রে ফেলেছে তোমায়? আম্মু? কথা বলো না। কথা বলছো না কেন আম্মু? তুমি… তুমি এমনটা করোনি তাই না আম্মু? কতোটা কষ্ট হলো তোমার আম্মু। আমি কিচ্ছু করতে পারলাম না। কিচ্ছু না..”
আদ্র যখন মাকে নামাতে পারছিলেন তখনই আমজাদ সাহেব এগিয়ে আসতে চাইলেন। ছেলের এবং নিজের প্রথম স্ত্রীর এই অবস্থা দেখে তার নিজেরও কলিজাটা কেমন মোচড় দিচ্ছে। সে তো চায়নি আরুনিমা চলে যাক এভাবে। একবারও আন্দাজ হলো না, আরুনিমা এমন কিছু করতে পারে। একবারও না? হয়তো শরীর এবং মনে অন্য এক নারীর প্রতি প্রেম, মোহ জম্মেছিল। কিন্তু এতকালের অভ্যাস যে নারী তার মৃত্যু মেনে নেওয়া এতোটাই সহজ? আমজাদ সাহেব কি জানতেন তার বিশ্বাসঘাতকতাই ছিল তার প্রথম প্রেয়সীর মৃত্যুক্ষণ! আমজাদ সাহেবকে এগোতে দেখেই আদ্র মুহুর্তেই রাগে জেদে বলে উঠল,
“ খবদ্দার। আসবেন না। আমার আম্মুকে ছুঁবেন না। আমার আম্মুকে একদম ছুঁবেন না। দূরে থাকুন। ”
আমজাদ সাহেব আর এগোনোর সাহস করলেন না। আদ্র কাঁদছে। আগের মতোই কাঁদতে কাঁদতে আম্মুকে জড়িয়ে বলতে লাল,
“ এই আম্মু? আমি কখনো তোমাদের ছাড়া থাকিইনি আম্মু। আমি তো ছোটকাল থেকে তোমাদের আদরে আদরে থেকেছি আম্মু। এখন, এখন কে দেখবে আমায় আম্মু? আমি একা কিভাবে বাঁচব আম্মু? ”
অতঃপর অনেকটা কষ্টের পর আদ্র নিজের মাকে নামাল। একটা মৃত দেহ কোলে তুলে আহাজারি করল। অতঃপর মাটিতে শুঁইয়ে মায়ের কাজল দেওয়া চোখ খেয়াল করল। ঠোঁটগুলোও ফ্যাঁকাশে লাগছে কেমন। আদ্র বাচ্চাদের মতোই মাকেই জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলল। রোধ হওয় স্বরে বলার চেষ্টা করল,
“ এই আম্মু…উঠো না একবার। আম্মু? একবার উঠো না। তুমি যা বলবে তাই করব আম্মু। একটুও অবাধ্য হবো না। দেখে নিও। আদ্র সবসময় তোমার কথা শুনে চলবে আম্মু। ”
“ তুমি আমার কথা কেন ভাবোনি? কেন একবারও ভাবলে না আম্মা? তোমার ছেলে ছিল তো আম্মু। ঐ জানো’য়ারের কথা ভাবলে তুমি। ”
আমজাদ সাহেব ছেলেকে এভাবে আহাজারি করে কাঁদতে দেখে দাঁড়িয়ে থাকতে পারলেন না। শত হোক ছোট থেকে কোলে পিঠে করে এই ছেলেকে আদর যত্ন দিয়ে মানুষ করেছেন তো। ছেলের কাঁধে হাত দিয়ে বলার চেষ্টা করল,
“ আদ্র…”
আদ্র তড়িৎ গতিতে মাথা তুলল কন্ঠটা শুনে। চোখ অস্বাভাবিক লাল হয়ে আছে তার। নাকের ডগাটাও লাল টকটকে লাগছে। ঘন চুলগুলো কপালে ঠেকেছে। প্রতিবাদ স্বরূপ বাবার হাতটা সরিয়ে দিয়ে তেড়ে বলল,
“মে’রে ফেলেছেন না আমার আম্মুকে? আপনিই মে’রে ফেলেছেন? মে’রে ফেললেন আমার আম্মুকে? ”
আমজাদ সাহেবের চোখগুলো ও রক্তিম। বোধহয় বহুকষ্টেই তিনি কান্না দমিয়ে রেখেছেন পরিবারের এই অবস্থায়। চাপা স্বরে বললেন,
“ আদ্র, না। আমি মারিনি তোমার আম্মুকে। ”
আদ্র মানল না। হিতাহিত জ্ঞানশূণ্য হয়ে বাবার কলার চেপে ধরল। রাগে ক্ষোভে বলল,
“ জাস্ট শাটাপ। আপনিই খু’নী। আপনিই আমার আম্মুর খু’নী। নতুন সংসার বেঁধেছেন তাই না? আমার আম্মু আপনার বাসরও সাঁজিয়ে দিয়েছেন। কিন্তু আমি আপনার এই সংসারটা করতেই দিব না। সোজা খু’ন করব আপনাকে মিস্টার আমজাদ। ”
আদ্র কলারটা জোরেই চেপে ধরল। আমজাদ সাহেব হতভম্ব হয়ে বললেন,
“ আদ্র, ছাড়ো। আমি সত্যিই তোমার আম্মুকে মারিনি। সে আমার স্ত্রী হয়।কেন মারব আমি তাকে? ”
“ চুপ, একদম চুপ। কেমন স্ত্রী? মুখেও আনবেন না এই কথাটা। আমার আম্মু আপনার স্ত্রী হয় না। কোন ভাবেই না। ”
“ আদ্র..”
আদ্রর রাগটা ক্রমশ বাড়ল। এই পৃথিবীতে তো তার আর কিছুই নেই। কিছুই না। যাও একমাত্র আম্মু ছিল সেও নেই। বাবা নামা মানুষটা তো থেকেও নেই। আঙ্গুলে তুলে শাসিয়ে বলল সে,
“ আমার নাম উচ্চারণ করবি না জা’নো’য়ার। আমার আম্মুকে, আমার আম্মুকে মেরেই ফেলেছিস শু’য়োর কোথাকার। তোকে আমি বাঁচতে দিব ভেবেছিস? বাঁচতে দিব না। আমার আম্মুকে আঘাত দিয়ে দিয়ে মে’রেছিস আবার আমার প্রতি দরদ দেখাস জা’নোয়ার? আদ্র আদ্র করিস তুই?”
আদ্রর রাগ যখন চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছাবে তখনই ছুটে এল তার দাদী। আদ্রকে ছাড়িয়ে নেওয়ার ব্যর্থ চেষ্টা চালিয়ে বলল,
“ দাদুভাই, এসব কি কথা কও? তোমার বাপ হয় আমজাদ।”
আমজাদ সাহেব পাশ থেকে অসহায় গলায় বললেন,
“ আমি তোমার আম্মুকে খু’ন করিনি আদ্র। বিশ্বাস করো.. ”
“ তুই আমার বিশ্বাস ভেঙেছিস, আমার বিশ্বাস ভেঙেছিস। আমার.. আমার একটা ছোট্ট পরিবার ছিল। মা বাবা ছিল। সব কেড়ে নিয়েছিস জা”নোয়ার। সবব!তোকে বিশ্বাস করব আমি?তোকে যে ছুঁয়েছি না? এতেও আমার পাপ হচ্ছে। ”
কথাগুলো বলতে বলতেই আদ্র ছেড়ে দিল তাকে। এই পর্যায়ে সামনে এল আমজাদ সাহেবের দ্বিতীয় স্ত্রী। আদ্রকে বলল,
“ শোনো আদ্র, পুলিশকে খবর দেওয়া হয়েছে।ময়নাতদন্ত হোক৷ তখন তো জানা যাবে এটা খুন নাকি আত্মহত্যা তাই না? ”
আমজাদ সাহেব ছেলের হাত ছাড়া পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কথাটা শুনে তাকালেন। প্রথম স্ত্রী আরুনিমাকে সে ঠকিয়েছে, বিশ্বাসঘাতকতা করেছে তার সঙ্গে। সব ঠিকাছে। কিন্তু ময়না তদন্ত হোক তা তিনি চান না। যে নারীটির শরীরে শুধুই তার অধিকার ছিল সে নারীর শরীর অন্য কেউ পর্যবেক্ষষ করুক,কাটাছেড়া করুক তা তিনি কখনোই চান না। সামান্য অন্য পুরুষ তাকালেও যে আমজাদ সাহেব রাগ পুষতেন এককালে সে আমজাদ সাহেব এটা হতে দেবেননা এমনটাই সিদ্ধান্ত নিয়ে শুধালেন,
“ না! ময়নাতদন্ত হবে না। সে আমার স্ত্রী ছিল। সময়ের সাথে সাথে তোমার প্রতি অনুভূতি কাজ করলেও আমার পুরোনো ভালোবাসা একেবারেই মরে যায় নি। আমি চাই নি আমি ব্যাতীত তাকে অন্য কেউ দেখুক। কোনভাবেই না। মৃত্যুর পরেও না। ”
আদ্র দ্বিগুণ ক্ষেপে বলল,
“ নাটক করিস তুই তাই না? নাটক? এত ভালোবাসা থাকলে আমার আম্মুকে জীবিত থাকতেই এত বড় শাস্তি দিয়েছিলি কেন? বল.. ”
আমজাদ সাহেবের দ্বিতীয় স্ত্রী এবারে বললেন,
“ এসব তুই তোকারি করছো কেন? বাবার সাথে কিভাবে কথা বলে শিক্ষা পাওনি একটুও..? ”
কথাটা বলতে দেরি হলো কিন্তু আদ্রর তেড়ে আসতে দেরি হলো। সোজা গলা চে’পে ধরল মেয়েটার। দাঁতে দাঁত চেপর বলল,
“ তোকে কথা বলতে বলেছি? তুই কে? কোথাকার কে তুই? আমার মায়ের জায়গা নিতে এসেছিস? পারবি তুই? খু’ন করে দিব। তোর মতো কীটদের জন্যই মানুষেন সংসার নষ্ট হয়। টাকার জন্য বিয়ে করেছিস না? টাকার জন্যই তো ফাঁসিয়েছিস তাই না? আমার মায়ের সংসারটা নষ্ট করছিস। ”
আদ্রর বাবা পাশ থেকে ছেলেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করছে।অথচ পারছেন না। ছড়ানোর চেষ্টা করছেন। আরো দুয়েকজন প্রতিবেশীও আদ্রকে ছাড়ানোর চেষ্টা করছেন এবং বলছেন,
বিষাদ ও বসন্ত পর্ব ৩৯
“ কি করছো এসব? মরে যাবে তো। ”
“ মরে যাক। এই জা’নোয়াররা পৃথিবীতে থেকেও কি করবে? ”
কথাটক বলেই ছাড়ল সে। পরমুহুর্তেই নিজের বাবা এবং সে মেয়েটার দিকে আঙ্গুল তাক করে বলল,
“ বেঁচে গেলেন এই যাত্রায়। কিন্তু বাঁচবেন না। আরেকবার আমার আশপাশে দেখলে সত্যি সত্যিই মরবেন দুজনে। মিস্টার এন্ড মিসেস আমজাদ প্রস্তুত থাকুন। ”
