বিষাদ ও বসন্ত পর্ব ৪১
অলকানন্দা ঐন্দ্রি
আদ্র সব হারিয়ে নিঃস্ব হওয়ার পরও ,
নিঃস্ব হওয়ার যে কেমন দুঃখ অনুভূত হয় বা ঠিক কিরকম দুঃখ পাওয়া উচিত তা বোধহয় অনুভবই করতে পারল না। দুঃখের পরিমাণটা এতোটাই গাঢ় যে অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যৎ কিছুই অনুভূত হলো না। এমনকি এই যে মা হারানোর দুঃখটা এতেও আদ্র বহুক্ষন হলো স্খির শান্ত হয়ে বসে আছে। মাঝেমাঝেই মাকে জড়িয়ে কাঁদছে, বিড়বিড় করছে।খুব সুন্দর একটা জীবন ছিল আদ্রর। খুব চমৎকার। আদর, স্নেহ, ভালোবাসা, আনন্দ কোন কিছুরই কমতি ছিল না। আদ্র বোধহয় এতোটাই সুখে ছিল যে মানুষ হওয়ার প্রয়োজনীয়তাটাই বুঝে উঠে নি। আর আজ? সবটুকু সুখ মিলিয়েছে। সব মিশে গিয়েছে! আদ্রর মায়ের মুখের দিকেই চাইল। বিধ্বস্তের ন্যায় বসা সে। শার্টটা এলোমেলো, চুলগুলো ও। মুখচোখ দেখে স্পষ্টই বুঝা যাচ্ছে আদ্রর এই মুহুর্তে নিজের মধ্যে নেই। মায়ের নিথর শরীরটা, মলিন মুখটা,বুঝে থাকা চোখজোড়া সব পরখ করতে করতে আদ্র বিড়বিড় করল,
“ তুমি আমার সাথে অন্যায় করলে আম্মু। খুব করে অন্যায় করলে। প্রতিশোধ নিলে কি আম্মু? তোমার ভাই এর মেয়েকে একে জীবনযুদ্ধে ছেড়ে দিয়েছি বলে তুমিও আমায় একা করে দিলে তাই না? আমার জন্য.. আসার জন্য ও কি থাকতে পারতে না আম্মু? সন্তান হিসেবে কি আমি এতটুকুও ভালোবাসা দেই নি তোমাকে কোনদিন? তাহলে.. তাহলে কেন করলে আমার সাথে এমন? ”
একটু থেমেই আদ্র চোখ মুঁছল বাম হাতের তালুতে। আবারও বলল,
“ এইতো সেদিন বললে তাই না? যে তুমি চলে গেলে আমার কি থাকবে? কে থাকবে? অথচ তুমি চলেই গেলে নিষ্ঠুরের মতো। একবারও ভাবোনি আমার কথা আম্মু..তোমরা সবাই খুব নিষ্ঠুর আম্মু। সবাই! আমার কথা কেউ একবারও ভাবলে না তোমরা…”
আদ্র থেমে থেমে অনেক কথাই বিড়বিড় করল। একদম উদ্ভ্রান্তের ন্যায় বিধ্বস্ত বেশে বসে বসে মাকে দেখে গেল। ঠিক এর অনেকটা সময় পরই এক প্রতিবেশী এগিয়ে এলেন। আদ্রর কাঁধে হাত দিয়ে জানালেন,
“ পুলিশের লোক এসেছে আদ্র। আমজাদ ও থাকবে এখানে। ঝামেলা করো না কেমন? শত হোক তোমার বাবা তো বলো? ”
বাবা? ঐ লোকটা আদ্রর বাবা? ছিহ! আদ্রর মনেও আনতে চাইল মানুষটাকে। ঘৃণায় চিড়চিড় করে উঠল শরীরের সমস্ত অংশ। ক্ষ্রিপ্ত হয়ে শুধাল,
“ বাবা? কে? ঐ জা’নোয়ারকে আমি মানুষ বলেই তো মানতে পারছি না। আবার বাবা! ”
এর একটু পর সত্যি সত্যিই আমজাদ সাহেবের সাথে দেখা মিলল কয়েকজন লোকের। যাদের শরীরে স্পষ্টই পুলিশি পোশাক। আদ্র তাকাল। আমজাদ সাহেব হাত নাড়িয়ে ঘটনার বিবরণ দিচ্ছিলেন। ঠিক যখনই অপরপক্ষ থেকে কারণ জিজ্ঞেস করা হলো তখন আমজাদ সাহেব উত্তরে শোনালেন,
“ আসলে আমি কালই দ্বিতীয় বিবাহ করেছি। হয়তো এই বিষয়টাই আমার প্রথম স্ত্রী মেনে নিতে পারেন নি… ”
আদ্র ঠিক তখন ক্ষেপে গেল আবারও৷ ক্ষেপা সিংহের মতো ফের বাবার কলার চেপে ধরে চেঁচাতে চেঁচাতে শুধাল,
“ মেনে নিতে পারে নি মানে? মেনে নিতে পারে নি মানে কি শা”লা? মেনে নেওয়ার কথা ছিল? আমার আম্মুকে বলে বিয়ে করেছিলি তুই? ”
আকস্মিক আক্রমন এবং অপমানে আমজাদ সাহেব থতমত খেলেন। যায় হোক সাথের লোকগুলো তার পরিচিত৷ এভাবে নিজেরই ছেলে নিজের সাথে এমন আচরণ করছে তা অসম্মানজনকই। আদ্র থামল না। আঙ্গুল উঁচিয়ে আবারও চেঁচিয়ে বলল,
“ এই লোকটাই! এই লোকটাই আমার আম্মুকে খু’ন করেছে অফিসার। এই লোকটাই আমার আম্মুর মৃত্যুর জন্য দায়ী। ”
আদ্রর কথাটা হয়তো আপাত দৃষ্টিতে অফিসার বিশ্বাসও করে নিতেন। কিন্তু বিশ্বাস করা হলো না কয়েকটা কাগজের কারণে। তার একটু পরই ছোট ছোট তিনটে কাগজ পাওয়া গেল। যার একটিতে খুব যত্ন নিয়েই লেখা হয়েছে,
“ প্রিয় আদ্র,
এই শেষ বেলায় আর কাউকে কিছু লিখতে ইচ্ছে না হলেও তোমার জন্য আমার লেখা উচিত। ধরে নাও, তোমার জন্য এটাই আম্মুর শেষ কথা, শেষ চিঠি।আম্মু চলে যাচ্ছি আদ্র। তোমাকে একদম একা রেখেই চলে যাচ্ছি। জানো আদ্র? এই মুহুর্তে তোমার জন্য আমার কষ্ট হচ্ছে। খুব করে কষ্ট হচ্ছে আদ্র। আমার ছেলে তো তুমি। সেই ছোট্ট আদুরে পুতুলটা ছিলে দুদিন ও হলো না। এই তো সেদিনই ঘুম পাড়িয়ে একটু এদিক সেদিক হলেই তুমি ঘর জুড়িয়ে কান্না করতে। তোমার হাত গুলো খুব ছোট, চিকন আর তুলতুলে নরম ছিল জানো? আম্মুর চুলগুলো তুমি সেই হাত দিয়েই মুঠো করে ধরতে। আদ্র, তুমি জানো তোমায় আমি কতোটা ভালোবাসি? এই যে বড় হওয়ার পর তুমি শত অন্যায় করতে? বাইরে কঠোরতা দেখালেও আড়ালে আমি ঠিকই তোমার যত্ন নিতাম, খেয়াল করতাম। এখন এসব কে করবে বলো তো? কে খেয়াল রাখবে আমার বাচ্চাটার? আদ্র, আমার না বাঁচতে ইচ্ছে করছে। তোমার জন্য হলেও বাঁচতে ইচ্ছে করছে। কিন্তু আমার বাঁচার উপায়টা রাখা হলো না বাবা। আম্মু নিরুপায়। আম্মুকে পৃৃথিবী ছাড়তেই হতো যে। ক্ষমা করে দিও আব্বু। তোমাকে একা এভাবে ছন্নাছাড়া জীবনে ছেড়ে যাওয়ার জন্য আম্মুকে ক্ষমা করে দিও আব্বু। আম্মু চলে যাচ্ছি, এর মানে এইনয় তোমাকে আম্মু ভালোবাসেনি আদ্র। শুধু জেনো, আম্মু পারে নি এই পৃথিবীতে টিকে থাকতে..!
ইতি,
তোমার আম্মু। ”
এই চিঠিটার কত জায়গায় কলমের কালি গুলো ছড়িয়ে গিয়েছে। স্পষ্টই বুঝা যাচ্ছে আদ্রর আম্মু এই চিঠিটা লেখার সময় কেঁদেছিল। কান্নার ফোঁটা গুলো পড়েছিল এই আদর আদর মাখা চিঠিটায়। আদ্র রক্তিম চোখ বেয়ে আবারও জল গড়াল। আবারও।ফের অন্য কাগজটায় দেখা মিলল,
“ বিধাতা,
যে আমায় খুব নিষ্ঠুর ভাবে ভেঙে দিয়েছে? তাকে তুমি সুন্দরভাবে গড়ে দিও। এতোটাই সুন্দর ভাবে গড়ে দিও যাতে সে সুন্দরের মাঝেও ধুকপুক করতে করতে মরে। যে আমায় আঘাতে আঘাতে শেষ করল? তাকে তুমি আঘাত দিও না, তবে আপসোস দিও! পৃথিবী সমান আপসোস ও যেন তার আপসোসের ভান্ডারের কম পড়ে যায় বিধাতা। তাকে সুখ দিও, খুব করে সুখ দিও। তবে সে সুখ যেন তার জন্য যন্ত্রনা হয়। আঘাতে আঘাতে আমার হৃদয়টক যেমন রক্তাক্ত করে গেছে সে.. তার সুখগুলোও তার হৃদয়কে ক্ষতবিক্ষত করুক। যন্ত্রনায় যেন ছটফট করুক। কষ্ট? কষ্ট সে না পাক বিধাতা। তবে কষ্টের সংজ্ঞা তাকে হাড়ে হাড়ে বুঝাবে। এইটুকুই অনুরোধ।
শোনো, এসব অভিশাপ নয়। অভিশাপ নয়। তাকে আমি অভিশাপে ও রাখতে পারি না। ”
তৃতীয় কাগজটায় স্পষ্ট অক্ষরে শুধু এইটুকু লেখা,
বিষাদ ও বসন্ত পর্ব ৪০
“ আমি স্বেচ্ছায় নিজের মৃত্যু নামক সুখকে গ্রহণ করেছি৷ কেউ দায়ী নয়৷ যে সকল সুখ তারা চেয়েছে তারা তো সে সকল সুখই পেয়েছে৷ আমি কেন বাকি থাকি পৃথিবীতে বেঁচে থেকে? সবশেষে, আমায় ক্ষমা করে দিও পৃথিবী।আমি যে এতোটাও ভালো নই। এতোটাও উদার নই যে। যে নিকৃষ্টতা তারা আমার সাথে করেছে সে নিকৃষ্টতার উপহারস্বরূপ আমি সামান্যই উপহার দিয়েছি তাদের। এই উপহারটুকু তাদের প্রাপ্য। এই উপহারটুকু তোমার প্রাপ্য হে বিশ্বাসঘাতক পুরুষ। তোমার বিশ্বাসঘাতকতার উপহার । ”
