বিষাদ ও বসন্ত পর্ব ৪২
অলকানন্দা ঐন্দ্রি
তিনটে ছোট ছোট কাগজে যে বিষয়গুলো ফুটে উঠেছে তাতে অফিসার নিশ্চিতই হলেন এটা আত্মহত্যা। অথচ একটা আত্মহত্যার পেছনে থাকে হাজারটা হত্যার গল্প। যা হয়তো চোখে দেখা যায় না, কানে শোনাও যায় না। অথচ এই যে একটা মানুষ আত্মহত্যা করলো বলে আমরা সংজ্ঞা দেই প্রতিনিয়ত? প্রকৃতপক্ষে এর সংজ্ঞা হবে, ঐ মানুষটাকে একটু একটু করে মেরে ফেলা হয়েছিল। তিলে তিলে আঘাত করতে করতে ঐ মানুষটার প্রাণটাকে থামিয়ে দেওয়া হয়েছিল। বাহ্যিক ভাবে জীবিত থাকলেও ভেতরে ভেতরে সে মৃত হিসেবেই এই পৃথিবীতে অনেক গুলো দিন, অনেকগুলো মাস ছিল। অতঃপর…? অতঃপর ঐ মানুষটা সত্যি সত্যিই পৃৃথিবীর মানুষদের জানান দিয়ে নামমাত্রই মৃত্যুর উপাধি গ্রহণ করল। এই বিশাল প্রক্রিয়াটিকেই আমরা আত্মহত্যা হিসেবে বিবেচনা করি। অথচ এটা নিখুঁত হত্যা!অফিসার যখন তিনটে কাগজই পড়ে শেষ করলেন ঠিক এর পরপরই আরো একটা ছোট্ট কাগজ পাওয়া গেল। দুমড়ে মুঁছড়ে থাকা কাগজটা। লিখা আছে,
তিনটে ছোট ছোট কাগজে যে বিষয়গুলো ফুটে উঠেছে তাতে অফিসার নিশ্চিতই হলেন এটা আত্মহত্যা। অথচ একটা আত্মহত্যার পেছনে থাকে হাজারটা হত্যার গল্প। যা হয়তো চোখে দেখা যায় না, কানে শোনাও যায় না। অথচ এই যে একটা মানুষ আত্মহত্যা করলো বলে আমরা সংজ্ঞা দেই প্রতিনিয়ত? প্রকৃতপক্ষে এর সংজ্ঞা হবে, ঐ মানুষটাকে একটু একটু করে মেরে ফেলা হয়েছিল। তিলে তিলে আঘাত করতে করতে ঐ মানুষটার প্রাণটাকে থামিয়ে দেওয়া হয়েছিল। বাহ্যিক ভাবে জীবিত থাকলেও ভেতরে ভেতরে সে মৃত হিসেবেই এই পৃথিবীতে অনেক গুলো দিন, অনেকগুলো মাস ছিল। অতঃপর…? অতঃপর ঐ মানুষটা সত্যি সত্যিই পৃৃথিবীর মানুষদের জানান দিয়ে নামমাত্রই মৃত্যুর উপাধি গ্রহণ করল। এই বিশাল প্রক্রিয়াটিকেই আমরা আত্মহত্যা হিসেবে বিবেচনা করি। অথচ এটা নিখুঁত হত্যা!অফিসার যখন তিনটে কাগজই পড়ে শেষ করলেন ঠিক এর পরপরই আরো একটা ছোট্ট কাগজ পাওয়া গেল। দুমড়ে মুঁছড়ে থাকা কাগজটা। লিখা আছে,
“ আমজাদ, কিচ্ছু লিখব না লিখব না বলেও তোমায় লিখতে ইচ্ছে করছে শেষ কিছু কথা। শোনো আমজাদ ? আশপাশে ছোটবেলা থেকে শুনে এসেছি যে মানুষ যা করে তাই জীবনে ফিরে পায় কোন না কোন ভাবেই। কিন্তু আমি তো কখনো এমন করিনি আমজাদ। কাউকে ঠকায়নি। তবুও বিধাতার তরফ থেকে এই উপহারটা আমি পেয়েছি। প্রিয়তম পুরুষের থেকে প্রতারণা পেয়েছি। কেন পেয়েছি তার উত্তর যদিও বা আজও পেয়ে উঠিনি। হয়তো অতিরিক্ত বিশ্বাস, ভালোবাসা আর যত্নের বিনিময়ে এইটুকুই প্রাপ্য ছিল আমার। শুনেছি, মানুষ যা পাপ করে তার শাস্তি নাকি বিধাতা কোন না কোন ভাবে ঠিকই দিয়ে দেন তাকে। প্রকৃতির নিয়ম বলে কথা!কিন্তু আমি যে প্রকৃতির নিয়মের উপর বিশ্বাস রাখতে পারলাম না আমজাদ। তোমার অজান্তেই, তোমায় এক বাস্তবিক শাস্তি দেওয়ার জন্য আমি হাঁসফাঁস করছিলাম । খুব করে চাইছিলাম তুমি ভুগতে থাকো, সে মেয়েটি ভুগতে থাকুক যে আমার সংসার ভেঙেছে। আমি বোধহয় তোমাদের ভোগার ব্যবস্থা করেও দিয়েছি। তোমায় এক নামমাত্রই শাস্তি দেওয়ার চেষ্টা চালিয়েছি যাতে আর পাঁচজন পুরুষ নিজের স্ত্রীকে ঠকাতে একটু হলেও ভাবে আমজাদ। একটু হলেও ভাবুক পরকীয়ায় জড়াতে, শরীরের মোহে জড়াতে! সবশেষে, সে অনুচিত কাজের জন্য আমি একটুও দুঃখিত নই আমজাদ। একটুও নয়। ”
আমজাদ সাহেব পুরোটাই শুনলেন। স্তব্ধ হয়ে চেয়ে রইলরন আরুনিমা মাহমুদের মুখের দিকে। কেমন যেন হয়ে আছে। কথায় আছে না? মৃত্যুর পর মৃত ব্যাক্তির প্রতি ভালোবাসা বেড়ে যায়? আমজাদ সাহেবের ও বোধহয় তাই হলো। মৃত স্ত্রীর প্রতি হুট করেই তার ভালোবাসারা সজীব হয়ে উঠছে। অন্যদিকে নতুন বিবাহিতা স্ত্রীর প্রতি শুধুই বিরক্তি জম্মাল। কিয়ৎক্ষণ আরুণিমা মাহমুদের মুখের দিকে চেয়েই একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল। কোথাও একটা অপরাধবোধ কাজ করছে। খারাপ লাগছে। মনে হচ্ছে, অনেককিছুই হারিয়ে ফেলেছে সে। এটা তো সত্যি যে, আরুণিমা তাকে যেভাবে বুঝে আর কেউই কখনো তাকে বুঝে নি সেভাবে। ভালোবাসেনি! আমজাদ সাহেব এগোলেন। একদম বিধ্বস্তের ন্যায় মৃত স্ত্রীর সামনে বসে নিজের পরকীয়ার পাপ স্বীকার করে বললেন,
“ আরু? তোমার গায়ে হাত ও তুলেছিলাম আমি। ঠকিয়েছি ও। তোমার প্রিয়তম পুরুষ হয়েও ঠকিয়েছি আরু। শেষ কয়েকটা মাস কি ভীষণ অবহেলা করেছি আরু। যে আরুকে আমি যত্নে যত্নে রাখতাম, ফুলের কাঁটাও লাগতে দিতাম সে আরুকে আমি নিজেই কতোটক কষ্ট দিয়েছি। নতুন এক জনকে পেয়ে তখন তোমার কথা তখন আমার মাথাতেই থাকত না আরু। লোভে পড়ে গিয়েছিলাম। লোভে…”
এইটুকু বলেই আটকালেন। কেন জানি গলা ধরে এল বোধহয়। অতঃপর আবারও বলল,
“ কি শাস্তি…?কি শাস্তি দিলে আমায় আরু? তুমি চলে গেলে, এটাই শাস্তি হিসেবে রেখে গেলে? তীব্র অপরাধবোধে আমি শেষ হই চাইলে? এভাবে.. এভাবে চলে যাওয়া টা তো উচিত হয়নি আরু। আমি তো জানতাম তুমি শক্তিশালী, সাহসী এক নারী আরু। শুধু আমার ঠকানো মানতে না পেরে তুমি চলে গেলে আরু? ”
এইটুকু বলেই হাতটা এগিয়ে ধরলেন কাঁপা হাতে। এই মুহুর্তে মনে হলো আরুণিমা জীবিত থাকলে হয়তো হাতটা ধরতেই দিতেন না। চাইতেন না। আমজাদ সাহেবের পাশে তখন পুলিশ অফিসার এলেন। বললেন
“ নোট দেখে তো বুঝা যাচ্ছে সুইসাইড কেইস। তবুও, আইনি প্রক্রিয়ার জন্য তো উনার ডেডবডিটা নিতে হবে। আপনার খুব কষ্ট হচ্ছে বুঝতে পারছি। যায় হোক স্ত্রী হয় তো। ”
আমজাদ সাহেব উত্তরে বললেন,
“ প্রথম স্ত্রী, প্রথম ভালোবাসা অফিসার। দীর্ঘ অনেক বছরের সংসার। শত অমানুষ হলেও কষ্ট লাগার কথা তো। কথা নয় বলুন? ”
“ হয়তো! ”
“ ডেডবডিটা..”
আমজাদ সাহেব ঠিক তখনই বাঁধ সেধে বললেন,
“ না, আমি চাইছি না আপনারা ওর ডেডবডি নিয়ে যান অফিসার। পারিবারিক দিক থেকে হলেও আমি চাইছি না। আমার স্ত্রীর প্রতি আমার এইটুকু…”
আমজাদ সাহেব বাকিটা বলে উঠতেই পারলেন না৷ আদ্র তেড়ে এল। আদ্র এতোটা সময় নিজ জ্ঞানেই ছিল না। মায়ের পাশে বসে আহাজারি করতে করতেই তার উদ্দেশ্যে লেখা চিঠিটা পড়ার পরপরই এসে জ্ঞান হারিয়েছিল সে। অতঃপর পানি ছিটিয়ে জ্ঞান ফেরার পরপরই আবার ছুটে এল সে। ছুটে এসেই আমজাদ সাহেবকে তার মায়ের হাত ধরে বসে থাকতে দেখেই তেতে গেল। আমজাদ সাহেবের কথাগুলো শুনে উনার দিকে এগিয়ে কলার চেপে ধরেই বসা থেকে উঠাল আদ্র। মুহুর্তেই শাসিয়ে শুধাল,
“ স্ত্রী বলিস কেন জানো’য়ার? বলেছি না আমার আম্মু তোর স্ত্রী নয়? ”
আমার আম্মুকে ছুঁলি কেন? কেন ছুঁতে গেলি? বলেছি তোকে? বলেছি আমি ছুঁতে?কাপুরুষ…”
পুলিশ অফিসারটি আদ্রর বাবার খুবই পরিচিত। বলা চলে খুবই বন্ধুসুলভ সম্পর্ক। সে মানুষটির সামনেই নিজের ছেলে এমন আচরণ করছে তার সাথে এই অপমানটুকু মানতে না পেরে আমজাদ সাহেব এবার প্রতিক্রিয়া দেখালেন। কলার ছাড়ানোর চেষ্টা করে বললেন,
“ আদ্র, সে তোমার আম্মু হওয়ার আগে আমার স্ত্রী হয়েছে। তার প্রতি আমারও অধিকার ছিল..ছিল তো? ”
আদ্র আঙ্গুল উঁচিয়ে বলল,
“ ছিল না।তুই অধিকার হারিয়ে ফেলেছিস। নতুন বউ আছে না? তাকে নিয়ে পড়ে থাক জানোয়ার। ”
আদ্রর বাবা সঙ্গে সঙ্গে চেঁচিয়ে উঠলেন,
“ আদ্র!”
আদ্র দাঁতে দাঁত চাপে। মুহুর্তেই একপাশ থেকে একটা ফল কাঁটার চুরি এগিয়ে নিয়ে একদম বাবার কন্ঠনালি বরাবর রাখল। রক্তলাল চোখ নিয়ে তাকিয়ে শুধাল,
“ কিসের আদ্র বলিস? একবার বলেছি না নাম উচ্চারণ করবি না জানোয়ার?”
আকস্মিক আক্রমনে আমজাদ সাহেব থমকালেন। কিছুটা ঘাবড়ালেন ও। বললেন,
“ আদ্র..”
“ বলেছিলাম না আমার আম্মুর আশপাশে না আসতে? বলেছি কিনা? এসেছিলি কেন? বলেছিলাম না মে’রে দিব? ”
আদ্রকে ঠিক সেই মুহুর্তেই সবাই ছাড়িয়ে আনতে চেষ্টা করল। আবার আদ্রর অবস্থা যা মারাত্মক ক্ষেপাটে সে মুহুর্তে যে আসলেই চুরিটা চালিয়ে দিবে না তার নিশ্চায়তা নেই। পুলিশ অফিসারটি বলার চেষ্টা করল সাবধানে,
“ আদ্র শোনো, শান্ত হও। শোনও..”
আদ্র শুনল না। ঠিক পরমুহুর্তেই বাবার হাতটা তুলে ধরে চুরিটা দিয়ে আঘাত করে গেল ফটাফট। একবার, দুইবার তিনবার! আমজাদ সাহেব মুহুর্তেই আহাজারি করে চেঁচিয়ে উঠলেন। আর্তনাদ করলেন। আদ্র যেন আনন্দ পেল বাবার এই আর্তনাদ দেখে। বেশ মজা পেল যেন ও। ফের আবার ও আঘাত চালাতে নিতেই অফিসার এসে আটকানোর চেষ্টা করল মুহুর্তেই। আদ্র ফোঁসফাঁস করল। ছাড়ানো গেল না ওকে। তখনও একইভাবেই আছে। শাসিয়ে বলে,
“ তোর পাপী হাতে আমার আম্মুকে ছুঁয়েছিস। এই হাতটা কেটে ফেলে দিলেই তো ভালো হতো। ”
বলেই এক দলা থুতু ছিটিয়ে ফেলল বাবা নামক মানুষটার মুখে। ঘৃণা নিয়ে বলল,
” আমার আম্মুর মতো মানুষকে যে ঠকিয়েছে তাকে আমি ঘৃণা করি। ঘৃণা!”
এবারে কয়েক পা ফেলে অফিসারকেই শুধাল,
“ ঐ লোকটাই আমার আম্মুর খু”নী অফিসার। দয়া করে উনাকে আগে নিয়ে যান। প্লিজ। একে আগে নিয়ে যান চোখের সামনে থেকে। আমি এই জা’নোয়ারটাকে সহ্য করে উঠতে পারছি না। আমি বলছি অফিসার, এই লোকটা আমার আম্মুকে টর্চার করত। দিনের পর দিন আমার আম্মুকে টর্চার করেছে। মানসিক, শারিরীক..!সব ভাবে..সব ভাবেই!একে প্লিজ নিয়ে যান অফিসার। প্লিজ নিয়ে যান। ”
আমজাদ সাহেবের বোধহয় এই কয়েক ঘন্টাতেই জীবনের সর্বোচ্চ তিক্ত অনুভূতি পাওয়া হয়ে গেল। স্ত্রীর মৃত্যু, সন্তানের ঘৃণা! সন্তানের এসব আচরণ, শেষ অব্দি মুখে থুতু ছেটাল?অসম্মান অপমানে হুট করেই তার চোখ গলিয়ে পানি গড়াল। আদ্র তা খেয়াল করেই শুধাল,
“ ন্যাকা কান্না কাঁদবি না শা’লা। আমার আম্মুর জন্য কাঁদছিস? আমার আম্মুর জন্য? এসব তো তোর মিথ্যে অভিনয়। যাতে মানুষ বলে আমজাদ সাহেবের মতো মানুষই হন না। বউকে এতই ভালোবাসেন। মে’রে দেই? তোকে মে’রে দেই জা”নোয়ার? তোর তো বাঁচার অধিকার নাই। আমার আম্মুকে মেরে দিয়েছিস তুই। বাঁচতে দিব নাকি?”
ক্ষেপে থাকার আদ্রর চোখ ঠিক পরমুহুর্তেই গেল আমজাদ সাহেবের দ্বিতীয় স্ত্রীর দিকে। আমজাদ সাহেবে কাঁটা হাত দেখে এগিয়ে এসেছে। হাত ধরে ভালোবাসা দেখাচ্ছে। আদ্রর সহ্য হলো। ছোটবেলা থেকে তো এই ভালোবাসা তার আব্বু আম্মুর মধ্যে দেখে এসেছে সে। কত সুখী পরিবার ছিল তার। সব শেষ! আদ্র এগিয়ে আমজাদ সাহেবের হাতটা মুঁছড়ে ধরতে নিতেই তার দ্বিতীয় স্ত্রী বলে উঠল,
” এই কি করছো তুমি? কি করছো? ব্যাথা পাচ্ছো দেখছো না?”
আদ্র যেন এই সুযোগটারই অপেক্ষায় ছিল। চুরিটা তার দিকেই তাক করে বলে উঠল,
“ একদম মেরে ফেলব। একদম! তোকেও। তুই -ই তো আমার আম্মুর সংসার ভেঙেছিস…”
একটু আগের ঘটনাটা দেখে তখন আদ্র যে মেরে ও ফেলতে পারে তা বিশ্বাসযোগ্য। মেয়েটাে গলা কাঁপল। অফিসার তখন দ্রুত এসেই শুধালেন,
“ এই চুরি সরাও আদ্র। চুরি ফেলো। কি করছো? ”
আদ্র শুনল না। শুধু মেয়েটার ভয়ার্ত চোখের দিকে চেয়ে থাকল। হেসে বলল,
“ ভয় হচ্ছে? পরকীয়া প্রেমে জড়ানোর আগে ভয় হয়নি? আমার আম্মুকে একটু একটু করে শেষ করার আগে ভয় হয়নি? বাঁচবি না তোরা!”
হিমেল, হিমেলের পরিবার এবং মিথিকে মিথ্যে স্ত্রী পরিচয় দেওয়া এই এতগুলো কাহিনী নিয়ে মিথি সত্যিই এতগুলো দিনে তিক্ত বিরক্ত! জীবনে ঝড় ঝঞ্জাট এর মধ্যে নতুন করে এসবে তার অশান্তি লাগছে। অনেক কষ্টে সে জীবনটাকে গুঁছিয়ে নিচ্ছিল। অথচ? মিথি ছোটশ্বাস ফেলে। একটা বাসা দেখেছে এখান থেকে কিছুটা পথ পর। বহু কষ্টে বাড়ি ওয়ালাকে ম্যানেজ করেছে। বাসাটা দুই রুমের। অথচ দুই রুমের ভাড়া দেওয়াটা তার জন্য ব্যয়বহুল হবে তবুও শুধুমাত্র এসব কাহিনীর জন্যই ও ওখানে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। জিনিসপত্র উঠানোর জন্য একটা ভ্যান ভাড়া করেছে। আয়েশা খালাকেও আজ থাকতে বলেছেন। নয়তো মেয়েকে রাখা জিনিস নিয়ে যাওয়া সব কঠিন হবে তার জন্য।
মিথি যে চলে যাচ্ছে এই খবরটা হিমেল একটু আগেই পেল। এতদিন বাসায় ফেরেনি। তবুও আড়াল থেকে মিথিকে ঠিকই পরখ করেছে। অথচ অন্য কোথাও চলে গেলে? হিমেল অফিস থেকে ছুটি নিয়েই এল মিথির উদ্দেশ্যে। এসেই প্রথমে শুধাল,
” বাসা চেঞ্জ করছিস কেন? আমি তো তোকে আর বিরক্ত করিনি। করেছি? ”
মিথি হাসল। উত্তর করার ইচ্ছে না হলেও করল,
“ হিমেল ভাই, এই যে বিশ্রী ভাবে আমায় ফাঁসাচ্ছেন? আমার চরিত্রে দাগ ফেলছেন? সত্যি বলছি এর জন্য হলেও আপনার প্রতি আমার সম্মানটা একটু একটু করে কমে যাচ্ছে। আমি জানতাম আপনি মেয়েদের সম্মান করেন। কিন্তু আমার বেলাতেই…!শুনুন, সত্যিই আপনাকে শ্রদ্ধা করি হিমেল ভাই।দয়া করে এই শ্রদ্ধাটা নিজ হাতে নষ্ট করবেন না হিমেল ভাই। দয়া, উপহাস, চরিত্রের দোষ সব থেকে রেহাই দিন। ”
হিমেলের রাগ হলো কেন যেন। মুখ টানটান হয়ে এল। বলল,
“ আমি তোর চরিত্রে দাগ ফেলছি? শুধু তোদের বৈধভাবে নিজের করে চেয়েছি? পাপ তা? বিয়ে কি পাপ? আমি, আয়মান তোকে কিডন্যাপ করে জোর করেও বিয়েটা সম্পন্ন করতে পারতাম। পারতাম না তোদের পেয়ে যেতে জোর করে? করিনি। কারণ আমি সত্যিই তোকে শ্রদ্ধা করতাম, আমি অসম্মানের চোখর দেখিনি কখনো তোকে। ”
মিথি তাকাল। উত্তরে বলল,
” বিয়ে! বিয়ে নামক শব্দটায় যদি আপনি কখনো আমায় জোর করেও থাকেন। জোর করে যদি বিয়েটা হয়েও যেত না হিমেল ভাই? আপনি স্রেফ ঘৃণার কারণ হতেন শুধু। আমি শুধু আপনাকে ঘৃণাই করতাম হিমেল ভাই। সবসময়! ”
এইটুকু বলেই ফের বলল,
“ ভালো হয় কি জানেন? আমার সামনে আপনি আর কখনোই আসার চেষ্টা করবেন না হিমেল ভাই। আমায় নিয়ে এসব ছড়ানো বন্ধ করুন প্লিজ। আমার সত্যিই অনুরোধ, আমার সামনে আর আসবেন না। আমি চলে যাচ্ছি। আপনার থেকে দূরত্ব বজায় রাখতেই যাচ্ছি। আমি চাই না আপনার সাথে আমার আর কখনো দেখা হোক, কথা হোক,আমার চরিত্রর দোষ পড়ুক। কখনোই চাই না।”
হিমেলের পুরুষালি ইগো বোধহয় থম ধরে রইল। ভেতরে ভেতরে বোধহয় কষ্ট পেল। বলল,
“ তুই না বললে জানতামই না যে, আমার সাথে কেউ কথা বললেও তার চরিত্রের দোষ হয়। আশ্চর্য!সমস্যা নেই, চিন্তা করিস না। হিমেল এতোটাও বখাটে টাইপের না যে তোর পিছু পিছু ঘুরবে মিথি। ”
অতঃপর সেদিনের কথাটাই হিমেল আর মিথির শেষ কথা ছিল। মাঝে আর কথাই হয়নি আজ দেড় বছর। দেড় বছর! অনেক সময়! অথচ হিমেল দেড় বছর আগে পিছু ঘুরবে না বলেও আজও মিথির পিছনেই আছে। মিথি যে বিল্ডিং এ থাকে ঠিক তার দোতালাতেই সেও বাসা নিয়েছে। একাই থাকে। মিথি থাকে তিনতালায়। হিমেল আর মিথির বহুবারই দেখা হয়েছে। কিন্তু কথা হয়নি একবারও এর মাঝে। হিমেল নিশ্চুপ ভাবে। মিথির আড়ালেই মিথির মেয়েকে নিয়ে ঘুরেফিরে সে, খেলে, আদর করে। তবে মিথির সম্মুখে নয়। আজও সে হিসেবে তিনতালায় গেল। হিসেব অনুযায়ী এখন মিথির বাসায় থাকার কথা নয়। হিমেল কলিং বেল বাজায়। ঠিক একটু পরই আয়েশা খালা দরজা খুললেন। হিমেল মুহুর্তেই বলল,
“ খালা? মিষ্টি কোথায়? ঘুমিয়ে আছে নাকি? ”
আয়েশা খালা হাসলেন। তার ধারণা মতে এই ছেলেটা খুবই ভালো। মনে মনে ভাবেন ও যে মিথির সাথে এই ছেলেটার বিয়ে হলেও খুবই ভালোই হয়। উত্তর করলেন,
“ না, না ঘুমায় নাই আব্বা। খেলতাছে খেলনা দিয়া। ”
হিমেল মাথা নাড়াল। বলল,
” মিথি তো নেই তাই না?”
“ না, বাজারে গেল বাজার করে আনতে। ”
হিমেল এবার হাসল। দু পা বাড়িয়ে মিষ্টিকে দেখল। অতঃপর যাক দিল,
” মিষ্টি? এই মিত্তি আম্মু…”
মিষ্টি দেখল হিমেলকে। তাকিয়ে দেখেই মুহুর্তেই চকচকে চাইল। সে চেনে হিমেলকে। খুব করেই চেনে। মুখ নাড়িয়ে আওড়াল,
“ হি হি হিম! ”
হিম ডাকটা হিমেলই শিখিয়েছে।হিমেল হাসল। মিষ্টি হাত বাড়াতেই কোলে তুলল সে। বাম গালে একটা চুমু দিয়ে বলল,
” চলেন,ঘুরে আসি আম্মুজান। আপনার আম্মা আবার কখন চলে আসে…”
অতঃপর কোলে নিয়ে খালাকে বলল,
“ আমি নিয়ে যাই? মিথি আসার আগেই নিয়ে আসব৷ ”
“ আচ্ছা, নিয়া যাও। একটু পর দিয়া যাই ও। আম্মা আবার চইলা আসব। ”
“ আচ্ছা, আচ্ছা। ”
অতঃপর মিষ্টিকে নিয়ে পা বাড়ালের।যেতে যেতে হেসে বলল,
” আপনার আম্মুর জেদের জন্যই শুধু আপনাকে আমি আমার কাছে সর্বক্ষণ রাখতে পারি না। আপনার আম্মুর তো আত্মসম্মানের পাহাড়! জানেন? ”
.
মিথি সবজি বাজার করেছে এক ব্যাগ। ভীড়ের মধ্যে সেসব বাজার নিয়ে মাছ বাজারে গেল। অতঃপর বাজার শেষ করে যখন রিক্সার জন্য ঠিক তখনই দেখা হলো সাবিহার সাথে। সাবিহা নিজেই প্রথমে কথা বলল। অতঃপর বলল,
“ তুমি কি জানো হিমেল ঠিক তুমি যে বিল্ডিং এ থাকো ঐ বিল্ডিং এই বাসা নিয়েছে আজ প্রায় বছর খানেক? ”
মিথি জানে। কয়েকবার দেখাও হয়েছে হিমেলের সাথে তবে কথা হয়নি। সে পুরোনো ঝামেলা এড়িয়ে যেতে উত্তরে বলল,
“খেয়াল করিনি। কেন আপু? ”
সাবিহা হাসল। বলল,
“ মিথ্যে বলছো কেন? জানো তুমি। ”
“ জানলেও আমার কি করার আছে এতে সাবিহা আপু? আমার পক্ষে কি বারবার বাসা চেঞ্জ করা সম্ভব? ”
সাবিহা শুনল। অতঃপর আপসোস নিয়ে বলল,
“ সে তোমায় অনেক ভালোবাসে। ”
মিথি শুনল। উত্তর করল,
” কিন্তু আমি বাসি না।আমি ক্লান্ত এই বিষয়টা নিয়ে। আমি সত্যিই হিমেল ভাইয়ের পিছনে পড়ে নেই। ”
“ জানি।। কিন্তু হিমেল তোমায় ভালোবাসে। ও তোমার জন্য এতোটা কেন উম্মাদ? ”
মিথির কাছে এই প্রশ্নটাও কেমন শোনাল। বলল,
“ এর কারণ ও তো আমার জানা থাকার কথা নয় আপু। আমি তো উনার সাথে দীর্ঘ দেড় বছর হলো কথাই বলিনি। মিথ্যে মনে হলে উনাকেই জিজ্ঞেস করে নিবেন। ”
“ না, মিথ্যে মনে হচ্ছে না। ও যেভাবে ভালোবাসে তাতে তুমি সারাজীবন যোগাযোগ না করলেও ভালোবাসবে। ”
“ তুমি ভেবো না, তোমায় দোষ দিচ্ছি । প্রথমে তোমার প্রতি একটা তিক্ত অনুভূতি জম্মালেও ধীরে ধীরে বুঝেছি হিমেলের ভালোবাসাটা কি গভীর! ইশশ! এই ভালোবাসাটা যদি আমি পেতাম? আগলে নিতাম সযত্নে মিথি।”
মিথি এর বিনিময়ে কি বলবে বুঝল না। তবে ছোটশ্বাস ফেলল। বলল,
“ ভালো থাকবেন আপু। আসি। ”
মিথি দুই হাতে বাজারের ভারী ব্যাগ নিয়ে পা বাড়াতেই সাবিহা ফের পেছন থেকে ডাক দিল।
“ মিথি? ”
মিথি ঘাড় ঘুরাল।
“ হু। ”
“আমার বিয়ে ঠিক করেছে আম্মু আব্বু। কিন্তু…
আমি হিমেলকে ভালোবাসি মিথি। সে তো এখনো অন্য কারোর হয়নি বলো? আশা রাখতে নিষেধ কি? তুমি কি একবার বুঝিয়ে বলবে হিমেলকে মিথি? তুমি তো ওকে ভালোবাসো না । কিন্তু আমি বাসি। কি নিদারুন ভাবে একপাক্ষিক ভালোবাসার যন্ত্রনায় জ্বলে পুড়ে শেষ হচ্ছি আমি। বিশ্বাস করো, ভালোবাসা এতোটা যন্ত্রনার হলে আমি কখনোই ভালোবাসার মতো ভুল করতাম না মিথি। ”
মিথি শুনল। বুঝাবে? সে বুঝালে শুনবে? বলল,
“ আমি তো পূর্বেও বহুবার বুঝিয়েছি আপু। বহুবার বলেছি। আমার সাথে আবারও দেখা হলে আমি আবার বলব নাহয়। বুঝিয়েই বলব। ”
মিথি ফিরল বাসায়। সিঁড়ি বেয়ে উঠতে নিতেই হিমেলের সাথে দেখা হলো। কথা বলবে কি বলবে না ভেবে ভেবেই বলে ফেলল,
“ হিমেল ভাই শুনুন? ”
হিমেল চাইল। ভ্রু বাঁকাতেই মিথি বলে উঠল,
“ বাসাটা এখানেই নিয়েছেন কি কারণে? এতগুলো দিন হলো, বিয়ে করেননি কেন? ”
হিমেলের মুখ টানটান। গম্ভীর মুখে শোনাল,
“ কি বুঝাতে চাইছিস? তোর পিছু পড়ে আছি?”
“ আমি বুঝাচ্ছি না। সবাই এটাই ভাবছে বা ভাবে। ”
“ তোর পিছু নিয়েছি কে বলেছে? এই বিল্ডিং এ বাসা কি কেবল তুই-ই নিতে পারিস? অন্য কেউ পারে না? ”
মিথি উত্তর করল,
“ আমি নেওয়র আগে নেননি কেন? ”
“ তখন বাসা ছাড়ারও প্রয়োজনীয়তা ছিল না। পরে প্রয়োজন ছিল, বাসাও খালি পেয়েছিলাম তাই নতুন বাসা নিয়ে নিয়েছি। ”
মিথি হাসল এবারে। বলল,
“ মিথ্যে বলছেন। ”
“ তো সত্যটা কি? জানিস তুই? ”
“ না। ”
এইটৃকু বলে থেমে গিয়েই আবার বলল,
“ হিমেল ভাই, শুনুন। সাবিহা আপু ভালো, ভদ্র মেয়ে। আপনার সাথে একদম পার্ফেক্ট মানাবে। ”
“ হু, তো? ”
মিথি তাকাল। হিমেলকে পরখ করে বলল,
“ আমি চাই আপনি বিয়ে করুন। সংসার করুন। জীবনটাকে সুন্দর করে সাজান। ”
হিমেল ফের ভ্রু কুঁচকে তাকাল। ভ্রু জোড়া নাচিয়ে জানতে চাইল,
“ তুই রাজি তাতে? ”
“ হুহ? ”
ফের গম্ভীর আওয়াজ তুলে বলল হিমেল,
“ আমার সংসার, আমার বিয়ের জন্য কি তুই রাজি? ”
মিথি কপাল কুঁচকায়। সঙ্গে সঙ্গেই বলে,
“ কেন রাজি হবো না? ”
হিমেল গম্ভীর মুখেই ঠোঁট টেনে হাসল কেমন। অতঃপর বলল,
“ কারণ সংসারটা হলে তোর সাথেই হবে। অন্য কারোর সাথে হওয়ার সম্ভাবনা নেই মিথি৷ ”
আমজাদ সাহেব পুরোটাই শুনলেন। স্তব্ধ হয়ে চেয়ে রইলরন আরুনিমা মাহমুদের মুখের দিকে। কেমন যেন হয়ে আছে। কথায় আছে না? মৃত্যুর পর মৃত ব্যাক্তির প্রতি ভালোবাসা বেড়ে যায়? আমজাদ সাহেবের ও বোধহয় তাই হলো। মৃত স্ত্রীর প্রতি হুট করেই তার ভালোবাসারা সজীব হয়ে উঠছে। অন্যদিকে নতুন বিবাহিতা স্ত্রীর প্রতি শুধুই বিরক্তি জম্মাল। কিয়ৎক্ষণ আরুণিমা মাহমুদের মুখের দিকে চেয়েই একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল। কোথাও একটা অপরাধবোধ কাজ করছে। খারাপ লাগছে। মনে হচ্ছে, অনেককিছুই হারিয়ে ফেলেছে সে। এটা তো সত্যি যে, আরুণিমা তাকে যেভাবে বুঝে আর কেউই কখনো তাকে বুঝে নি সেভাবে। ভালোবাসেনি! আমজাদ সাহেব এগোলেন। একদম বিধ্বস্তের ন্যায় মৃত স্ত্রীর সামনে বসে নিজের পরকীয়ার পাপ স্বীকার করে বললেন,
“ আরু? তোমার গায়ে হাত ও তুলেছিলাম আমি। ঠকিয়েছি ও। তোমার প্রিয়তম পুরুষ হয়েও ঠকিয়েছি আরু। শেষ কয়েকটা মাস কি ভীষণ অবহেলা করেছি আরু। যে আরুকে আমি যত্নে যত্নে রাখতাম, ফুলের কাঁটাও লাগতে দিতাম সে আরুকে আমি নিজেই কতোটক কষ্ট দিয়েছি। নতুন এক জনকে পেয়ে তখন তোমার কথা তখন আমার মাথাতেই থাকত না আরু। লোভে পড়ে গিয়েছিলাম। লোভে…”
এইটুকু বলেই আটকালেন। কেন জানি গলা ধরে এল বোধহয়। অতঃপর আবারও বলল,
“ কি শাস্তি…?কি শাস্তি দিলে আমায় আরু? তুমি চলে গেলে, এটাই শাস্তি হিসেবে রেখে গেলে? তীব্র অপরাধবোধে আমি শেষ হই চাইলে? এভাবে.. এভাবে চলে যাওয়া টা তো উচিত হয়নি আরু। আমি তো জানতাম তুমি শক্তিশালী, সাহসী এক নারী আরু। শুধু আমার ঠকানো মানতে না পেরে তুমি চলে গেলে আরু? ”
এইটুকু বলেই হাতটা এগিয়ে ধরলেন কাঁপা হাতে। এই মুহুর্তে মনে হলো আরুণিমা জীবিত থাকলে হয়তো হাতটা ধরতেই দিতেন না। চাইতেন না। আমজাদ সাহেবের পাশে তখন পুলিশ অফিসার এলেন। বললেন
“ নোট দেখে তো বুঝা যাচ্ছে সুইসাইড কেইস। তবুও, আইনি প্রক্রিয়ার জন্য তো উনার ডেডবডিটা নিতে হবে। আপনার খুব কষ্ট হচ্ছে বুঝতে পারছি। যায় হোক স্ত্রী হয় তো। ”
আমজাদ সাহেব উত্তরে বললেন,
“ প্রথম স্ত্রী, প্রথম ভালোবাসা অফিসার। দীর্ঘ অনেক বছরের সংসার। শত অমানুষ হলেও কষ্ট লাগার কথা তো। কথা নয় বলুন? ”
“ হয়তো! ”
“ ডেডবডিটা..”
আমজাদ সাহেব ঠিক তখনই বাঁধ সেধে বললেন,
“ না, আমি চাইছি না আপনারা ওর ডেডবডি নিয়ে যান অফিসার। পারিবারিক দিক থেকে হলেও আমি চাইছি না। আমার স্ত্রীর প্রতি আমার এইটুকু…”
আমজাদ সাহেব বাকিটা বলে উঠতেই পারলেন না৷ আদ্র তেড়ে এল। আদ্র এতোটা সময় নিজ জ্ঞানেই ছিল না। মায়ের পাশে বসে আহাজারি করতে করতেই তার উদ্দেশ্যে লেখা চিঠিটা পড়ার পরপরই এসে জ্ঞান হারিয়েছিল সে। অতঃপর পানি ছিটিয়ে জ্ঞান ফেরার পরপরই আবার ছুটে এল সে। ছুটে এসেই আমজাদ সাহেবকে তার মায়ের হাত ধরে বসে থাকতে দেখেই তেতে গেল। আমজাদ সাহেবের কথাগুলো শুনে উনার দিকে এগিয়ে কলার চেপে ধরেই বসা থেকে উঠাল আদ্র। মুহুর্তেই শাসিয়ে শুধাল,
“ স্ত্রী বলিস কেন জানো’য়ার? বলেছি না আমার আম্মু তোর স্ত্রী নয়? ”
আমার আম্মুকে ছুঁলি কেন? কেন ছুঁতে গেলি? বলেছি তোকে? বলেছি আমি ছুঁতে?কাপুরুষ…”
পুলিশ অফিসারটি আদ্রর বাবার খুবই পরিচিত। বলা চলে খুবই বন্ধুসুলভ সম্পর্ক। সে মানুষটির সামনেই নিজের ছেলে এমন আচরণ করছে তার সাথে এই অপমানটুকু মানতে না পেরে আমজাদ সাহেব এবার প্রতিক্রিয়া দেখালেন। কলার ছাড়ানোর চেষ্টা করে বললেন,
“ আদ্র, সে তোমার আম্মু হওয়ার আগে আমার স্ত্রী হয়েছে। তার প্রতি আমারও অধিকার ছিল..ছিল তো? ”
আদ্র আঙ্গুল উঁচিয়ে বলল,
“ ছিল না।তুই অধিকার হারিয়ে ফেলেছিস। নতুন বউ আছে না? তাকে নিয়ে পড়ে থাক জানোয়ার। ”
আদ্রর বাবা সঙ্গে সঙ্গে চেঁচিয়ে উঠলেন,
“ আদ্র!”
আদ্র দাঁতে দাঁত চাপে। মুহুর্তেই একপাশ থেকে একটা ফল কাঁটার চুরি এগিয়ে নিয়ে একদম বাবার কন্ঠনালি বরাবর রাখল। রক্তলাল চোখ নিয়ে তাকিয়ে শুধাল,
“ কিসের আদ্র বলিস? একবার বলেছি না নাম উচ্চারণ করবি না জানোয়ার?”
আকস্মিক আক্রমনে আমজাদ সাহেব থমকালেন। কিছুটা ঘাবড়ালেন ও। বললেন,
“ আদ্র..”
“ বলেছিলাম না আমার আম্মুর আশপাশে না আসতে? বলেছি কিনা? এসেছিলি কেন? বলেছিলাম না মে’রে দিব? ”
আদ্রকে ঠিক সেই মুহুর্তেই সবাই ছাড়িয়ে আনতে চেষ্টা করল। আবার আদ্রর অবস্থা যা মারাত্মক ক্ষেপাটে সে মুহুর্তে যে আসলেই চুরিটা চালিয়ে দিবে না তার নিশ্চায়তা নেই। পুলিশ অফিসারটি বলার চেষ্টা করল সাবধানে,
“ আদ্র শোনো, শান্ত হও। শোনও..”
আদ্র শুনল না। ঠিক পরমুহুর্তেই বাবার হাতটা তুলে ধরে চুরিটা দিয়ে আঘাত করে গেল ফটাফট। একবার, দুইবার তিনবার! আমজাদ সাহেব মুহুর্তেই আহাজারি করে চেঁচিয়ে উঠলেন। আর্তনাদ করলেন। আদ্র যেন আনন্দ পেল বাবার এই আর্তনাদ দেখে। বেশ মজা পেল যেন ও। ফের আবার ও আঘাত চালাতে নিতেই অফিসার এসে আটকানোর চেষ্টা করল মুহুর্তেই। আদ্র ফোঁসফাঁস করল। ছাড়ানো গেল না ওকে। তখনও একইভাবেই আছে। শাসিয়ে বলে,
“ তোর পাপী হাতে আমার আম্মুকে ছুঁয়েছিস। এই হাতটা কেটে ফেলে দিলেই তো ভালো হতো। ”
বলেই এক দলা থুতু ছিটিয়ে ফেলল বাবা নামক মানুষটার মুখে। ঘৃণা নিয়ে বলল,
” আমার আম্মুর মতো মানুষকে যে ঠকিয়েছে তাকে আমি ঘৃণা করি। ঘৃণা!”
এবারে কয়েক পা ফেলে অফিসারকেই শুধাল,
“ ঐ লোকটাই আমার আম্মুর খু”নী অফিসার। দয়া করে উনাকে আগে নিয়ে যান। প্লিজ। একে আগে নিয়ে যান চোখের সামনে থেকে। আমি এই জা’নোয়ারটাকে সহ্য করে উঠতে পারছি না। আমি বলছি অফিসার, এই লোকটা আমার আম্মুকে টর্চার করত। দিনের পর দিন আমার আম্মুকে টর্চার করেছে। মানসিক, শারিরীক..!সব ভাবে..সব ভাবেই!একে প্লিজ নিয়ে যান অফিসার। প্লিজ নিয়ে যান। ”
আমজাদ সাহেবের বোধহয় এই কয়েক ঘন্টাতেই জীবনের সর্বোচ্চ তিক্ত অনুভূতি পাওয়া হয়ে গেল। স্ত্রীর মৃত্যু, সন্তানের ঘৃণা! সন্তানের এসব আচরণ, শেষ অব্দি মুখে থুতু ছেটাল?অসম্মান অপমানে হুট করেই তার চোখ গলিয়ে পানি গড়াল। আদ্র তা খেয়াল করেই শুধাল,
“ ন্যাকা কান্না কাঁদবি না শা’লা। আমার আম্মুর জন্য কাঁদছিস? আমার আম্মুর জন্য? এসব তো তোর মিথ্যে অভিনয়। যাতে মানুষ বলে আমজাদ সাহেবের মতো মানুষই হন না। বউকে এতই ভালোবাসেন। মে’রে দেই? তোকে মে’রে দেই জা”নোয়ার? তোর তো বাঁচার অধিকার নাই। আমার আম্মুকে মেরে দিয়েছিস তুই। বাঁচতে দিব নাকি?”
ক্ষেপে থাকার আদ্রর চোখ ঠিক পরমুহুর্তেই গেল আমজাদ সাহেবের দ্বিতীয় স্ত্রীর দিকে। আমজাদ সাহেবে কাঁটা হাত দেখে এগিয়ে এসেছে। হাত ধরে ভালোবাসা দেখাচ্ছে। আদ্রর সহ্য হলো। ছোটবেলা থেকে তো এই ভালোবাসা তার আব্বু আম্মুর মধ্যে দেখে এসেছে সে। কত সুখী পরিবার ছিল তার। সব শেষ! আদ্র এগিয়ে আমজাদ সাহেবের হাতটা মুঁছড়ে ধরতে নিতেই তার দ্বিতীয় স্ত্রী বলে উঠল,
” এই কি করছো তুমি? কি করছো? ব্যাথা পাচ্ছো দেখছো না?”
আদ্র যেন এই সুযোগটারই অপেক্ষায় ছিল। চুরিটা তার দিকেই তাক করে বলে উঠল,
“ একদম মেরে ফেলব। একদম! তোকেও। তুই -ই তো আমার আম্মুর সংসার ভেঙেছিস…”
একটু আগের ঘটনাটা দেখে তখন আদ্র যে মেরে ও ফেলতে পারে তা বিশ্বাসযোগ্য। মেয়েটাে গলা কাঁপল। অফিসার তখন দ্রুত এসেই শুধালেন,
“ এই চুরি সরাও আদ্র। চুরি ফেলো। কি করছো? ”
আদ্র শুনল না। শুধু মেয়েটার ভয়ার্ত চোখের দিকে চেয়ে থাকল। হেসে বলল,
“ ভয় হচ্ছে? পরকীয়া প্রেমে জড়ানোর আগে ভয় হয়নি? আমার আম্মুকে একটু একটু করে শেষ করার আগে ভয় হয়নি? বাঁচবি না তোরা!”
হিমেল, হিমেলের পরিবার এবং মিথিকে মিথ্যে স্ত্রী পরিচয় দেওয়া এই এতগুলো কাহিনী নিয়ে মিথি সত্যিই এতগুলো দিনে তিক্ত বিরক্ত! জীবনে ঝড় ঝঞ্জাট এর মধ্যে নতুন করে এসবে তার অশান্তি লাগছে। অনেক কষ্টে সে জীবনটাকে গুঁছিয়ে নিচ্ছিল। অথচ? মিথি ছোটশ্বাস ফেলে। একটা বাসা দেখেছে এখান থেকে কিছুটা পথ পর। বহু কষ্টে বাড়ি ওয়ালাকে ম্যানেজ করেছে। বাসাটা দুই রুমের। অথচ দুই রুমের ভাড়া দেওয়াটা তার জন্য ব্যয়বহুল হবে তবুও শুধুমাত্র এসব কাহিনীর জন্যই ও ওখানে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। জিনিসপত্র উঠানোর জন্য একটা ভ্যান ভাড়া করেছে। আয়েশা খালাকেও আজ থাকতে বলেছেন। নয়তো মেয়েকে রাখা জিনিস নিয়ে যাওয়া সব কঠিন হবে তার জন্য।
মিথি যে চলে যাচ্ছে এই খবরটা হিমেল একটু আগেই পেল। এতদিন বাসায় ফেরেনি। তবুও আড়াল থেকে মিথিকে ঠিকই পরখ করেছে। অথচ অন্য কোথাও চলে গেলে? হিমেল অফিস থেকে ছুটি নিয়েই এল মিথির উদ্দেশ্যে। এসেই প্রথমে শুধাল,
” বাসা চেঞ্জ করছিস কেন? আমি তো তোকে আর বিরক্ত করিনি। করেছি? ”
মিথি হাসল। উত্তর করার ইচ্ছে না হলেও করল,
“ হিমেল ভাই, এই যে বিশ্রী ভাবে আমায় ফাঁসাচ্ছেন? আমার চরিত্রে দাগ ফেলছেন? সত্যি বলছি এর জন্য হলেও আপনার প্রতি আমার সম্মানটা একটু একটু করে কমে যাচ্ছে। আমি জানতাম আপনি মেয়েদের সম্মান করেন। কিন্তু আমার বেলাতেই…!শুনুন, সত্যিই আপনাকে শ্রদ্ধা করি হিমেল ভাই।দয়া করে এই শ্রদ্ধাটা নিজ হাতে নষ্ট করবেন না হিমেল ভাই। দয়া, উপহাস, চরিত্রের দোষ সব থেকে রেহাই দিন। ”
হিমেলের রাগ হলো কেন যেন। মুখ টানটান হয়ে এল। বলল,
“ আমি তোর চরিত্রে দাগ ফেলছি? শুধু তোদের বৈধভাবে নিজের করে চেয়েছি? পাপ তা? বিয়ে কি পাপ? আমি, আয়মান তোকে কিডন্যাপ করে জোর করেও বিয়েটা সম্পন্ন করতে পারতাম। পারতাম না তোদের পেয়ে যেতে জোর করে? করিনি। কারণ আমি সত্যিই তোকে শ্রদ্ধা করতাম, আমি অসম্মানের চোখর দেখিনি কখনো তোকে। ”
মিথি তাকাল। উত্তরে বলল,
” বিয়ে! বিয়ে নামক শব্দটায় যদি আপনি কখনো আমায় জোর করেও থাকেন। জোর করে যদি বিয়েটা হয়েও যেত না হিমেল ভাই? আপনি স্রেফ ঘৃণার কারণ হতেন শুধু। আমি শুধু আপনাকে ঘৃণাই করতাম হিমেল ভাই। সবসময়! ”
এইটুকু বলেই ফের বলল,
“ ভালো হয় কি জানেন? আমার সামনে আপনি আর কখনোই আসার চেষ্টা করবেন না হিমেল ভাই। আমায় নিয়ে এসব ছড়ানো বন্ধ করুন প্লিজ। আমার সত্যিই অনুরোধ, আমার সামনে আর আসবেন না। আমি চলে যাচ্ছি। আপনার থেকে দূরত্ব বজায় রাখতেই যাচ্ছি। আমি চাই না আপনার সাথে আমার আর কখনো দেখা হোক, কথা হোক,আমার চরিত্রর দোষ পড়ুক। কখনোই চাই না।”
হিমেলের পুরুষালি ইগো বোধহয় থম ধরে রইল। ভেতরে ভেতরে বোধহয় কষ্ট পেল। বলল,
“ তুই না বললে জানতামই না যে, আমার সাথে কেউ কথা বললেও তার চরিত্রের দোষ হয়। আশ্চর্য!সমস্যা নেই, চিন্তা করিস না। হিমেল এতোটাও বখাটে টাইপের না যে তোর পিছু পিছু ঘুরবে মিথি। ”
অতঃপর সেদিনের কথাটাই হিমেল আর মিথির শেষ কথা ছিল। মাঝে আর কথাই হয়নি আজ দেড় বছর। দেড় বছর! অনেক সময়! অথচ হিমেল দেড় বছর আগে পিছু ঘুরবে না বলেও আজও মিথির পিছনেই আছে। মিথি যে বিল্ডিং এ থাকে ঠিক তার দোতালাতেই সেও বাসা নিয়েছে। একাই থাকে। মিথি থাকে তিনতালায়। হিমেল আর মিথির বহুবারই দেখা হয়েছে। কিন্তু কথা হয়নি একবারও এর মাঝে। হিমেল নিশ্চুপ ভাবে। মিথির আড়ালেই মিথির মেয়েকে নিয়ে ঘুরেফিরে সে, খেলে, আদর করে। তবে মিথির সম্মুখে নয়। আজও সে হিসেবে তিনতালায় গেল। হিসেব অনুযায়ী এখন মিথির বাসায় থাকার কথা নয়। হিমেল কলিং বেল বাজায়। ঠিক একটু পরই আয়েশা খালা দরজা খুললেন। হিমেল মুহুর্তেই বলল,
“ খালা? মিষ্টি কোথায়? ঘুমিয়ে আছে নাকি? ”
আয়েশা খালা হাসলেন। তার ধারণা মতে এই ছেলেটা খুবই ভালো। মনে মনে ভাবেন ও যে মিথির সাথে এই ছেলেটার বিয়ে হলেও খুবই ভালোই হয়। উত্তর করলেন,
“ না, না ঘুমায় নাই আব্বা। খেলতাছে খেলনা দিয়া। ”
হিমেল মাথা নাড়াল। বলল,
” মিথি তো নেই তাই না?”
“ না, বাজারে গেল বাজার করে আনতে। ”
হিমেল এবার হাসল। দু পা বাড়িয়ে মিষ্টিকে দেখল। অতঃপর যাক দিল,
” মিষ্টি? এই মিত্তি আম্মু…”
মিষ্টি দেখল হিমেলকে। তাকিয়ে দেখেই মুহুর্তেই চকচকে চাইল। সে চেনে হিমেলকে। খুব করেই চেনে। মুখ নাড়িয়ে আওড়াল,
“ হি হি হিম! ”
হিম ডাকটা হিমেলই শিখিয়েছে।হিমেল হাসল। মিষ্টি হাত বাড়াতেই কোলে তুলল সে। বাম গালে একটা চুমু দিয়ে বলল,
” চলেন,ঘুরে আসি আম্মুজান। আপনার আম্মা আবার কখন চলে আসে…”
অতঃপর কোলে নিয়ে খালাকে বলল,
“ আমি নিয়ে যাই? মিথি আসার আগেই নিয়ে আসব৷ ”
“ আচ্ছা, নিয়া যাও। একটু পর দিয়া যাই ও। আম্মা আবার চইলা আসব। ”
“ আচ্ছা, আচ্ছা। ”
অতঃপর মিষ্টিকে নিয়ে পা বাড়ালের।যেতে যেতে হেসে বলল,
” আপনার আম্মুর জেদের জন্যই শুধু আপনাকে আমি আমার কাছে সর্বক্ষণ রাখতে পারি না। আপনার আম্মুর তো আত্মসম্মানের পাহাড়! জানেন? ”
মিথি সবজি বাজার করেছে এক ব্যাগ। ভীড়ের মধ্যে সেসব বাজার নিয়ে মাছ বাজারে গেল। অতঃপর বাজার শেষ করে যখন রিক্সার জন্য ঠিক তখনই দেখা হলো সাবিহার সাথে। সাবিহা নিজেই প্রথমে কথা বলল। অতঃপর বলল,
“ তুমি কি জানো হিমেল ঠিক তুমি যে বিল্ডিং এ থাকো ঐ বিল্ডিং এই বাসা নিয়েছে আজ প্রায় বছর খানেক? ”
মিথি জানে। কয়েকবার দেখাও হয়েছে হিমেলের সাথে তবে কথা হয়নি। সে পুরোনো ঝামেলা এড়িয়ে যেতে উত্তরে বলল,
“খেয়াল করিনি। কেন আপু? ”
সাবিহা হাসল। বলল,
“ মিথ্যে বলছো কেন? জানো তুমি। ”
“ জানলেও আমার কি করার আছে এতে সাবিহা আপু? আমার পক্ষে কি বারবার বাসা চেঞ্জ করা সম্ভব? ”
সাবিহা শুনল। অতঃপর আপসোস নিয়ে বলল,
“ সে তোমায় অনেক ভালোবাসে। ”
মিথি শুনল। উত্তর করল,
” কিন্তু আমি বাসি না।আমি ক্লান্ত এই বিষয়টা নিয়ে। আমি সত্যিই হিমেল ভাইয়ের পিছনে পড়ে নেই। ”
“ জানি।। কিন্তু হিমেল তোমায় ভালোবাসে। ও তোমার জন্য এতোটা কেন উম্মাদ? ”
মিথির কাছে এই প্রশ্নটাও কেমন শোনাল। বলল,
“ এর কারণ ও তো আমার জানা থাকার কথা নয় আপু। আমি তো উনার সাথে দীর্ঘ দেড় বছর হলো কথাই বলিনি। মিথ্যে মনে হলে উনাকেই জিজ্ঞেস করে নিবেন। ”
“ না, মিথ্যে মনে হচ্ছে না। ও যেভাবে ভালোবাসে তাতে তুমি সারাজীবন যোগাযোগ না করলেও ভালোবাসবে। ”
“ তুমি ভেবো না, তোমায় দোষ দিচ্ছি । প্রথমে তোমার প্রতি একটা তিক্ত অনুভূতি জম্মালেও ধীরে ধীরে বুঝেছি হিমেলের ভালোবাসাটা কি গভীর! ইশশ! এই ভালোবাসাটা যদি আমি পেতাম? আগলে নিতাম সযত্নে মিথি।”
মিথি এর বিনিময়ে কি বলবে বুঝল না। তবে ছোটশ্বাস ফেলল। বলল,
“ ভালো থাকবেন আপু। আসি। ”
মিথি দুই হাতে বাজারের ভারী ব্যাগ নিয়ে পা বাড়াতেই সাবিহা ফের পেছন থেকে ডাক দিল।
“ মিথি? ”
মিথি ঘাড় ঘুরাল।
“ হু। ”
“আমার বিয়ে ঠিক করেছে আম্মু আব্বু। কিন্তু…
আমি হিমেলকে ভালোবাসি মিথি। সে তো এখনো অন্য কারোর হয়নি বলো? আশা রাখতে নিষেধ কি? তুমি কি একবার বুঝিয়ে বলবে হিমেলকে মিথি? তুমি তো ওকে ভালোবাসো না । কিন্তু আমি বাসি। কি নিদারুন ভাবে একপাক্ষিক ভালোবাসার যন্ত্রনায় জ্বলে পুড়ে শেষ হচ্ছি আমি। বিশ্বাস করো, ভালোবাসা এতোটা যন্ত্রনার হলে আমি কখনোই ভালোবাসার মতো ভুল করতাম না মিথি। ”
মিথি শুনল। বুঝাবে? সে বুঝালে শুনবে? বলল,
“ আমি তো পূর্বেও বহুবার বুঝিয়েছি আপু। বহুবার বলেছি। আমার সাথে আবারও দেখা হলে আমি আবার বলব নাহয়। বুঝিয়েই বলব। ”
মিথি ফিরল বাসায়। সিঁড়ি বেয়ে উঠতে নিতেই হিমেলের সাথে দেখা হলো। কথা বলবে কি বলবে না ভেবে ভেবেই বলে ফেলল,
“ হিমেল ভাই শুনুন? ”
হিমেল চাইল। ভ্রু বাঁকাতেই মিথি বলে উঠল,
“ বাসাটা এখানেই নিয়েছেন কি কারণে? এতগুলো দিন হলো, বিয়ে করেননি কেন? ”
হিমেলের মুখ টানটান। গম্ভীর মুখে শোনাল,
“ কি বুঝাতে চাইছিস? তোর পিছু পড়ে আছি?”
“ আমি বুঝাচ্ছি না। সবাই এটাই ভাবছে বা ভাবে। ”
“ তোর পিছু নিয়েছি কে বলেছে? এই বিল্ডিং এ বাসা কি কেবল তুই-ই নিতে পারিস? অন্য কেউ পারে না? ”
মিথি উত্তর করল,
“ আমি নেওয়র আগে নেননি কেন? ”
“ তখন বাসা ছাড়ারও প্রয়োজনীয়তা ছিল না। পরে প্রয়োজন ছিল, বাসাও খালি পেয়েছিলাম তাই নতুন বাসা নিয়ে নিয়েছি। ”
মিথি হাসল এবারে। বলল,
“ মিথ্যে বলছেন। ”
“ তো সত্যটা কি? জানিস তুই? ”
“ না। ”
এইটৃকু বলে থেমে গিয়েই আবার বলল,
“ হিমেল ভাই, শুনুন। সাবিহা আপু ভালো, ভদ্র মেয়ে। আপনার সাথে একদম পার্ফেক্ট মানাবে। ”
“ হু, তো? ”
মিথি তাকাল। হিমেলকে পরখ করে বলল,
“ আমি চাই আপনি বিয়ে করুন। সংসার করুন। জীবনটাকে সুন্দর করে সাজান। ”
হিমেল ফের ভ্রু কুঁচকে তাকাল। ভ্রু জোড়া নাচিয়ে জানতে চাইল,
“ তুই রাজি তাতে? ”
“ হুহ? ”
ফের গম্ভীর আওয়াজ তুলে বলল হিমেল,
বিষাদ ও বসন্ত পর্ব ৪১
“ আমার সংসার, আমার বিয়ের জন্য কি তুই রাজি? ”
মিথি কপাল কুঁচকায়। সঙ্গে সঙ্গেই বলে,
“ কেন রাজি হবো না? ”
হিমেল গম্ভীর মুখেই ঠোঁট টেনে হাসল কেমন। অতঃপর বলল,
“ কারণ সংসারটা হলে তোর সাথেই হবে। অন্য কারোর সাথে হওয়ার সম্ভাবনা নেই মিথি৷ ”
