বিষাদ ও বসন্ত পর্ব ৪৩
অলকানন্দা ঐন্দ্রি
হিমেল আর মিথির সে কথোপকথন এর ঠিক এক সপ্তাহ পরই মিথির একটা এক্সিডেন্ট হলো। টিউশনি করিয়ে রিক্সা নিয়ে ফিরতে নিয়েই একটা সি এন জির ধাক্কাতেই ঘটল ঘটনাটা। মিথির মাথাটায় বেশ ভালোই ব্যাথা পেল। রাস্তার খসখসে জমিনে মাথাটা উপড়ে পড়ে প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই একপাশ দিয়ে রক্ত গড়াল। যন্ত্রনায়, ব্যাথায় মিথির চোখজোড়াও ঝাপসা হয়ে আসছিল। শুধু বুঝতে পারছিল যে আশপাশে অসংখ্য মানুষ আর হৈ চৈ। সবাই ঘিরে রয়েছে। আর, আর খুব যন্ত্রনা! এইটুকুই। এর বাইরে মিথি বোধহয় আর কিছুই টের পেল না। ধীরে ধীরে শরীরের ভারসাম্য হারিয়ে জ্ঞান হারাল। এরপর উপস্থিত পথিকরাই সময় নিয়ে তাকে হসপিটালে নিয়ে গেল। সরকারি হাসপাতাল, চিকিৎসা পেতে বহু জটিলতা অতিক্রম করতে হবে। এর মধ্যেই একজন লোক মিথির ব্যাগ থেকে ফোন খুঁজে কল দিল শেষ ডায়ালকৃত নাম্বারটায়। প্রথমবার কল দিতেই ওপাশ থেকে কেউ কল তুলল না। ফের আবারও কল দিতেই ওপাশ থেকে কেউ কল দিল। বলল,
“হ্যালো, মিথি আম্মা। কিছু কইবা? ”
নাম্বারটা আয়েশা খালার। কাজ করতে করতে কল আসাতে তিনি কিছুটা বিরক্তই হলেন যেন।তবুও মিথির নাম্বার দেখে স্মিত হেসে বললেন। এই পাশের ব্যাক্তিটা তখন তাড়াহুড়ো করে শুধালেন,
“ এই নাম্বারের মেয়েটি আপনার কি হয়? মেয়েটির এক্সিডেন্ট হয়েছে। একটু তাড়াতাড়ি হসপিটালে আসতেন যদি। ”
আয়েশা খালা শুনলেন। প্রথম দফায় বুঝে না উঠে বললেন,
“ আপনে কেডা? মিথি আম্মা কোথায়?”
এপাশের লোকটি আবারও বলল,
“ এই ফোনটি যার তার এক্সিডেন্ট হয়েছে। হসপিটালে এখন। আপনি কি শুনতে পাচ্ছেন? ”
” পাইতাছি। কিন্তু কি কন? কেমনে এক্সিডেন্ট হইছে আম্মার? হায় আল্লাহ! এহন কি হইব মাইয়াডার। ”
ওপাশ থেকে লোকটা দ্রুত তাড়াহুড়ো করে শুধাল,
“ আপনারা প্লিজ দ্রুত আসুন। তাড়াতাড়ি আসুন একটু। ”
আয়েশা খালা আকস্মিক খবরটা পেয়ে হতবিহ্বল হয়ে রইলেন যেন। এই শহরে উনার অনেককালের বাস হলেও একটা একা মেয়ের এক্সিডেন্টের মতো ঘটনায় ঢাল হয়ে দাঁড়াবে কি করে বুঝে উঠল না যেন। ক্ষানিকটা সময় থম মেরে বসে থাকার পর হুট করেই মনে এল হিমেলের কথা। ছেলেটা মিথির কথা অনেক ভাবে। এইটুকু সময়ে যা বুঝেছে তা হলো ছেলেটা সত্যিই মিথিকে ভালোবাসে। সাথে থাকতে চায়। আয়েশা খালা দ্রুতই বাসার তালি চাবি নিলেন। হিমেল একটু আগেই মিষ্টি নিয়ে গেছিল। হয়তো বেশিদূর যাবে না। নিচেই আছে। এইটুকু ভেবেই দ্রুত বাসায় তালা দিয়ে নিচে এলেন উনি। গেইট পেরিয়ে এদিক ওদিক তাকিয়েও যখন হিমেলকে দেখা গেল না তখন আয়েশা খালার মুখটা অনেকটাই হতাশ। কয়েক পা বাড়িয়েই তবুও খোঁহ করতেই দেখা মিলল হিমেল আর মিষ্টির। মিথির প্রাণ যে সর। হিমেলের হাত ধরে পা ফেলছে কি সুন্দর। আয়েশা খালা দূর থেকে দেখেই হাসলেন। কি মিষ্টি দেখাচ্ছে দৃশ্যটা। যেন সত্যি সত্যিই দুইজনে বাবা -মেয়ে। উনি আর এক মুহুর্তও না দাঁড়িয়ে দ্রুত ছুটে গেলেন হিমেলের কাছে। তাড়াহুড়ো করে শুধালেন,
“ শোনো আব্বা? ‘
হিমেল মুহুর্তেই তাকাল। আয়েশা খালাকে ওভাবে ছুটে আসতে দেখে এবং হাঁফাতে দেখে ভ্রু জোড়াও কুঁচকে নিল। মিষ্টিকে কোলে তুলে শুধাল,
“কোন সমস্যা খালা? এভাবে হাঁফাচ্ছেন কেন? ”
ঠিক একইভাবেই হাঁফাতে হাঁফাতে উনি উত্তর করলেন,
“ আব্বা, সর্বনাশ হইয়া গেল যে। আম্মার তো এক্সিডেন্ট হইছে। কি করুম এহন আমি? ”
হিমেল শুনল। বুঝে না উঠে বলল,
“ মানে? ”
“ মিথি আম্মার নাকি এক্সিডেন্ট হয়েছে। মাত্রই কল কইরা কইল কেউ। হাসপাতালে নিয়া গেছে। যাইতে কইল তাড়াতাড়ি। ”
হিমেল শুনল। স্পষ্টই শুনল। কিন্তু বিশ্বাস করতে ইচ্ছে হলো না। হৃদয় ধড়ফড় ধড়ফড় করছে যেন। আবারও শুধাল,
“হু? কার এক্সিডেন্ট খালা? ”
“ আরেহ মিষ্টির মায়ের। মিথি আম্মার।মাত্রই কইল। ”
হিমেল এবারর স্থিরই তাকায়। শান্ত স্থির ভাবে উত্তরটা বুঝে নিয়ে দাঁড়াল। এক্সিডেন্ট? মিথির? এই শব্দগুলোই মস্তিষ্কের ভেতর কেমন চাপ সৃষ্টি করল যেন। কলিজা মোচড় দিয়ে উঠল। ভালো আছে তো সে? খুব খারাপ কিছু হয়নি তো? নাকি খুব সিরিয়াস কিছু? কতশত কিছু ভেবে নিজের অস্থিরতাকে আর দমাতে পারল না হিমেল। হা পা কেমন কাঁপছে যেন। মিষ্টিকে কোলে নিয়ে ওভাবেই শুধাল,
“ খালা আর কি বলেছে? ঠিক আছে তো ও? ঠিক আছে তাই না? আর কি বলেছে খালা? খুব বেশি আঘাত পেয়েছে কি? ”
উনি স্পষ্টই দেখলেন হিমেলের মুখচোখের অবস্থা। স্পষ্টই অস্থিরতা! হিমেল আবারও শুধাল,
“ আমাকে প্লিজ নাম্বারটা দিন খালা। ও ঠিক আছে কিনা কে জানে…যেতে হবে তো। ওখানে একা একা কেমন ছটফট করছে না জানি। প্লিজ নাম্বারটা দিন খালা। ”
আয়েশা খালা ছোট শ্বাস ফেললেন। নিজের বাটন ফোনের স্ক্রিনে মাত্রই কল করা মিথির নাম্বারটা দিল। হিমেলের কাছে মিথির নাম্বার আগে থেকেই ছিল। কখনো কল না করা হলেও আজ একের পর এক কল দিল সে। ওপাশ থেকে কেউ কলই তুলল না। হিমেল অস্থির চিন্তায়। মাথার চুল ছিড়ে ফেলতে ইচ্ছে হচ্ছে। কোন এক অজানা কারণে নিজের প্রতি রাগও জম্মাচ্ছে। মিথির প্রতি খেয়াল রাখা উচিত ছিল তো। ছিল! মিথি না করলেও জোর করে হলেও ওদের আগলে রাখার দায়িত্বটা ওর নিয়ে নেওয়া উচিত ছিল। হিমেল যখন অস্থির, উদ্গ্রীব হয়ে পা চালাচ্ছিল আর কল করতেই ছিল ঠিক তখনই কেউ কল তুলল। হিমেল হসপিটালের ঠিকানা আর মিথির কথা জানতে চাইতেই ওপাশ থেকে মিথির অবস্থা জানাল। হিমেল ছটফট করল। অস্থির, রোধ হয়ে আসা স্বরে মুহৃর্তেই জানাল,
” এই ভাই, ভাই ও কেমন আছে? খুব কষ্ট হচ্ছে ওর? একটু চিকিৎসাটা কন্টিনিউ করেন প্লিজ ভাই। প্লিজ অবহেলায় ফেলে রাখবেন না আমার মিথিফুলকে। আমি আসছি, খুব দ্রুত আসছি। ভাই, অনুরোধ করছি একটু ওরে দেখুন। ডক্টরদের গাফিলতি করার সুযোগ দিবেন না প্লিজ। ভাই…”
এইটুকু বলতে বলতেই প্রায় কল কেটে গেল। হিমেল ঠোঁট কামড়ে দাঁড়িয়ে। দুঃখ, কষ্ট, হারিয়ে ফেলার ভয় সব মিলিয়ে বিচিত্র এক অনুভূতি নিয়ে ও মিষ্টির গালে চুমু দিল। বুঝানোর ন্যায় বলল,
“ হিম তোমার আম্মুর কিচ্ছু হতে দিবে না আম্মুজান। আম্মুকে না পেয়ে কান্না করবে না হুহ? খালার কাছে থেকো। হিম আসব তোমায় আম্মুর কাছে নেওয়র জন্য। ”
এইটুকু বলেই আয়েশা খালার কোলে নিল মিষ্টিকে। আয়েশা খালাকে ওর দেখাশোনা করতে বলেই যতদ্রুত সম্ভব ও পা চালিয়ে একটা অটোতে উঠল ।
.
রাত প্রায় আটটা। মিথির তখনও জ্ঞান ফেরেনি। দীর্ঘ চারঘন্টা যাবৎ হসপিটালের বেডে পড়ে আছে মেয়েটা। মাথায় আঘাতটা একটু বেশি হলেও গুরুতর নয়৷ ব্লিডিং হয়েছে বেশ তাই ব্লাড দেওয়া হয়েছে। সাথে বাম পা টা মচকে গিয়েছে। কয়েক জায়গায় চামড়া উঠে ছিলে গিয়ে রক্ত ঝরেছে বেশ। ডান হাতের একটা হাড্ডিও বেশ ভালো ভাবেই ভেঙ্গেছে। এই সমস্ত কিছু ডক্টরই রিপোর্ট চ্যাক করে জানিয়েছে। ভয়ের তেমন কিছু নেই, জ্ঞান ফিরবে এটাও বলেছে। অথচ মিথির জ্ঞান ফিরছে না। হিমেল যখন হসপিটালের করিডোরে মশার কাঁমগ খেয়ে চিন্তা করছিল মিথির জ্ঞান ফিরছে না কেন ঠিক তখন মনে পড়ল মিষ্টির কথা। কি করছে না করছে খোঁজ করার জন্য কল দিলেন বাসার দারোয়ান এর কাছেই। কারণ আয়েশা খালার নাম্বার তার কাছে নেই। দারোয়ানক আঙ্কেলকেই বললেন ফোনটা খালার কাছে নিতে। অতঃপর আয়েশা খালা কথা বলে জানাল উনি বাসায় যাবেন। অন্য বাসাগুলোর কাজে আজ না গেলেও বাসায় অসুস্থ স্বামীর জন্য ফিরতে হবে। এদিকে মিষ্টিও কান্না জুড়েছে। কি করবে তা যেন বলেন।হিমেল কিয়ৎক্ষন চুপ থাকল। হসপিটালে শিশুদের আনা হয়তো উচিত না তবে এই মুহুর্তে আর অপশনও নেই।তাই সেটাই বলল। অতঃপর আয়েশা খালা প্রায় আধঘন্টা পরই মিষ্টিকে দিয়ে গেল। হিমেল সে পিচ্চি মেয়েটাকে কোলে নিয়েই পায়চারি করল ক্রমশ। মিষ্টি বোধ হয় তার মাকেই খুঁজছিল। বারবার ঠোঁট নেগে শুধু এইটুকুই বলে বেড়াতে চাইল,
“ আম আম্ মু! ”
হিমেল ও বুঝল। অনেকটা সময় মাকে ছাড়া থাকার পর মায়ের খোঁজ করা অস্বাভাবিক কিছু নয়। কিন্তু ভুলিয়ে রাখা উচিত। হিমেল পায়চারি করে, হাঁটিয়ে, এদিক সেদিক থেকে সে চেষ্টাই করল। অতঃপর একটা সময় পর একজন নার্স এসে বলে গেলেন,
“ আপনার প্যাশেন্টের জ্ঞান ফিরেছে। ”
হিমেল শুনল। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই ঘাড় ঘুরিয়ে চাইল ও৷ এক টুকরো বরফের ন্যায় হৃদয়ের যেন প্রশান্তিময় একটা অনুভূতি বইল। লাল টকটকে হয়ে আসা চোখজোড়াও কেমন শান্ত হয়ে এল। শুকনো ঢোক গিলে বলল,
“ মিথির জ্ঞান ফিরেছে? ”
“ হ্যাঁ, আপনার প্যাশেন্টের নাম মিথিয়া তো। উনারই। ”
হিমেল মুহুর্তেই প্রশ্ন করল,
“ দেখা করা যাবে? ”
“ যাবে। ”
হিমেল প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই পা বাড়াল। একটা স্যাতস্যাতে বেডে মিথিকে ফ্যাল ফ্যাল চোখে তাকিয়ে থাকতে দেখে হিমেল ছোটশ্বাস ফেলল। হিমেলের যেন কান্না আসে মুহুর্তটায়। যদি গম্ভীরমুখো না হতো, হসপিটালে এত মানুষ না থাকত তাহলে হয়তো হিমেল সত্যিই চিন্তায় অস্থির হয়ে কেঁদে ফেলত। হিমেল নিরব দৃষ্টিতেই চেয়ে পা বাড়ায়। মিথি যেন কিছু খুঁজছে আশপাশ তাকিয়ে। হয়তো ভাবছে ওর জন্য কেউই আসবে না। কেউই না। কেউ তো নেই ও ওর। ঠিক তখনই চোখে পড়ল কারোর কোলে থাকা তার প্রাণটাকে। তাকে দেখেই হাত ঝাপটে আধো আদো স্বরে বলে বেড়াচ্ছে,
“ আম্, আম্ মু! ”
মিথির চোখ টলমল করে যেন। সারা শরীর ময় ব্যাথা যন্ত্রনা হলেও ঠোঁটে হাসি ফুটল ওর। ঠিক একই সাথেই কেঁদেও ফেলে ঠোঁট ভেঙ্গে। ভাঙা গলাতেই কোন ভাবে ডাকল,
“ প্রা..ণ। ”
মায়ের থেকে ডাক মিষ্টি প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই হাত ঝাপটে উঠল মায়ের কাছে যাওয়ার জন্য৷ হিমেল অল্প হাসল এই কান্ড দেখে। এগিয়ে এল। মিথিকে কেঁদে ফেলতে দেখে ওভাবেই কিছুটা ঝুঁকে শুধাল,
“ খুব তো নিজের খেয়াল নিজে রাখতে পারিস মিথি। কাউকে আগলে রাখার দায়িত্ব দিলেই তো অপরাধ হয়ে যাবে। সমাজ প্রশ্ন তুলবে। অথচ দিনশেষে নিজে সাবধানে থাকিস না কেন? তোর কিছু হলে ওর কি হবে? ”
ঠিক শেষের বাক্যটাতেই যেন মিথির আরো বেশি কান্না পায়। আসলেই তো। ওর কিছু হলে? ওর কিছু হলে ওর প্রাণকে কে দেখবে? কিভাবে থাকবে ওর প্রাণটা? ওর তো পৃথিবীতে কেউই নেই! মিথি কান্নায় ভেজা চোখ নিয়েই মেয়ের দিকে চাইল। তার কোলে আসার জন্য হা পা ঝাপটাচ্ছে। অথচ হিমেল বুঝিয়ে বলছে শান্তস্বরে,
“ মিষ্টি আম্মুজান, আপনার আম্মু তো অসুস্থ। হাত পা ভেঙ্গে বসে আছে বুঝলেন? উনি আপনার কি খেয়াল রাখবে নিজেরই খেয়াল রাখতে পারে না বুঝলেন? কোলে উঠবেন না উনার। বলেন আড়ি। ”
মিথি শুনল সবটাই৷ তবে নিজের খেয়াল সে রেখেছিল এর পক্ষে আজ আর যুক্তি খন্ডাল না। এমনিতেই হিমেল ভাই নামক মানুষটার একে পর এক কাজ দেখে সে কেবল মুগ্ধই হয়।একটা মানুষের এতোটা ভালোবাসা উচিত হয়নি। একটুও উচিত হয়নি। দিনশেষে মিথি যে ভালোবাসার উত্তরটুকু ফেরত দিতে পারবে না! আপসোস!
হিমেল আয়মানকে ডাকিয়ে এনেছিল প্রায় রাত দশটায়। হসপিটালের পরিবেশ ভালো না। তার উপর মশার যন্ত্রনা । হিমেলকে মশা কাঁমড়িয়েছে ঠিক আছে, কিন্তু এত সাবধানতার পরও মিষ্টিকে দুই দুটো মশা কামড় দিয়ে চলে গেছে। ফর্সা হাতে লাল লাল দাগ হয়ে আছে ওর। এত মশা- ফশার যন্ত্রনায় হিমেল আর মিষ্টিকে এখানে রাখতে চাইল না। পরে যদি ও অসুস্থ হয়ে যায়? অথচ এই পরিবেশেও বাচ্চাটা হিমেলের কাঁধে ঘুমিয়ে গেছে। দুই হাত গলায় জড়িয়ে মাথাটা রেখেছে হিমেলের কাঁধে। হিমেল সরু শ্বাস ফেলে। আয়মানের কোলে ঘুমন্ত মিষ্টিকে খুব সাবধানেই দিল ও। অতঃপর বলল,
“সাবধানে নিয়ে যাবি। কিচ্ছু খায়নি ও। একটু পারলে আন্টিকে বলে খিঁচুড়ি বানিয়ে ওকে খাইয়ে দিস আয়মান। সম্ভবত মিথিকে কাল বাসায় নিয়ে যেতে দিবে। ওকে বাসায় নিয়ে গিয়ে মিষ্টিকে নিয়ে আসব। একটু খেয়াল রাখিস প্লিজ। রাতে কান্না করলে একটু কল দিস আমায়। ভুলিয়ে টুলিয়ে রাখিস কোনভাবে হুহ? ”
আয়মান বন্ধুর সব কথায় শুনল। অতঃপর শুনে বলল,
“ দোস্ত, তুই তো পাক্কা বাবা হয়ে গেছিস। মিথিকে যদি কোন ভাবে জোর করেও রাজি করানো যেত না তাহলে আমি তোদের সুন্দর এই সংসারটা মিস করতাম না। ”
হিমেল শুনল। অতঃপর গম্ভীর গলায় বলল,
“ করবি না মিস। ”
যেহেতু মিথিকে সরকারি হসপিটালেই নিয়ে যাওয়া হয়েছিল পরদিন
বিকালেই মিথিকে হসপিটাল থেকে ছাড় দেওয়া হলো। তবে রেস্ট নিতে বলা হয়েছে। মিথি ঐ সময়টায় সজ্ঞানে থাকলেও পা ফেলতে পারার মতো সক্ষমতা নেই৷ পা টা ফুলে গেছে অনেক। হাতেও প্লাস্টার করা। মাথায় ব্যান্ডেজ। শরীরময় তখনও যন্ত্রনা, ব্যাথা। অতঃপর মিথির অবস্থাটা টের পেয়ে হিমেল নিজেই জিজ্ঞেস করল,
“ তুই নিশ্চয় পায়ে হেঁটে উপরে উঠতে পারবি না মিথি? কোলে নিলে নিশ্চয় ক্ষতি হবে না তোর? প্রমিজ,খারাপ উদ্দেশ্য নিয়ে কোলে নিব না তোকে।”
মিথি শুনল। এই যে ওর অসুস্থতার একমাত্র এই মানুষটি ছুটে গেল, পাশে থাকল, নিজের ঐটুকুন মেয়েকে কোলে নিয়ে নিয়ে রাখল এতোটা সময় এতে মিথি সত্যিই কৃতজ্ঞ। এমন নয় যে, এমনটা না হলে সে ভাবত হিমেল ভাই এর খারাপ উদ্দেশ্য আছে বা থাকতে পারে। কিন্তু খারাপ উদ্দেশ্য না থাকলেও মিথি এতে মত দিবে না আগেরই জানা।কোলে নেওয়ার উত্তরটা এড়িয়ে বলল,
“ এক পায়েই তো ব্যাথা। একটু ধরলে উঠতে পারব হিমেল ভাই। ”
হিমেল ছোট শ্বাস ফেলে। মুখ টানটান করে। অতঃপর গাড়ি থেকে বেরিয়ে সামনেই দাঁড়াল। দারোয়ান চাচা মুহুর্তেই মিথির খবরাখবর জিজ্ঞেস করলেন। বিল্ডিং এর মোটামুটি সবার কাছেই আয়েশা খালা আর দারোয়ান চাচার মাধ্যমে খবর পৌঁছে গেছে যে মিথির এক্সিডেন্ট হয়েছে৷ তাই বিল্ডিং এর আরো কয়েকজনও যাওয়ার পথে জিজ্ঞেস করে গেল। কেউ আবার এটাও জিজ্ঞেস করল হিমেল কিভাবে জেনেছে, তার মেয়ে কোথায় এইসেই।হিমেল সবারই উত্তর দিল। এই বিল্ডিং এ আবার এক ভাড়াটিয়ার মেয়ের কাল আকদও। বিল্ডিং এর ছাদেই অনুষ্ঠান হবে। মিথিকে ইনভাইটও করেছিল অবশ্য মহিলা। সে অনুষ্ঠানের জন্য মোটামুটি আজ মানুষজনের দেখা পাওয়া যাচ্ছে। হিমেল মিথিকে রেখেই উপরে এল। মিথির বাসার চাবিটা ওর কাছে নেই, আয়েশা খালার কাছে। আবার আয়শা খালার নাম্বার ও তার কাছে নেই৷ কাজেই কিছু একটা ভেবে নিজের বাসার তালাটাই খুলল। অতঃপর আবারও নিচে এল। নিচে গুঁটি কয়েক মানুষ মিথিকে ভালোমন্দ জিজ্ঞেস করছিল। ঠিক তখনই হিমেল এসে উনাদের উত্তর দিলেন। অতঃপর সে মানুষজনের সামনেই হুট করে মিথিকে কোলে তুলল একদম সযত্নেই। যাতে মিথি ব্যাথা না পায়৷ তুলেই ফিসফিস গলায় প্রথমেই বলল,
“ আমার প্রতি এইটুকু বিশ্বাস তোর রাখা উচিত মিথি। খারাপ উদ্দেশ্য নিয়ে তুলিনি তোকে কোলে। ”
মিথি জানে খারাপ উদ্দেশ্য নিয়ে তুলেনি। কিন্তু এতগুলো মানুষের সামনে কোলে তোলার বিষয়টা কেমন নয়? মানুষ কি ভাববে? কি বলাবলি করবে?
মিথিকে হিমেলের বাসাটাতেই নিয়ে আসা হলো। পাশের রুমের খাটটায় ওকে আলগোছে বসিয়ে দিয়ে হিমেল প্রথমেই এখানে আনার কারণটা এক্সপ্লেইন করল। মিথি কিছুই বলল না। শুধু শুনল। অস্বস্তি হচ্ছে কেমন। হিমেল ভাইকে তার জন্য অনেক কিছুই করতে হচ্ছে। শুধু শুধু ভোগান্তিতে পড়েছে মানুষটা। এসবই মনে মনে ভাবল। এর একটু সময় পরই আয়মান এল সাথে মিষ্টিকে নিয়ে। মাকে দেখে সে যেন অনেক খুশি। হিমেল হাসে। ঝুঁকে গিয়ে মিষ্টিকে ফিসফিস করে বলল,
” মিষ্টি,খুশি? আম্মুকে পেয়েছো?”
মিষ্টি সাথে সাথেই হাত নাড়াল। মাথাও নাড়াল। হিমেল হাসে। আয়মান একটু পরই তার পাশের রুমেই মিষ্টিকে নিয়ে দুষ্টুমি করছিল। এর পরপর বিল্ডিং এর প্রায় অনেকই এল মিথিকে দেখতে। হাল-অবস্থা জিজ্ঞেস করতে।ঠিক একটু সময় পরই হিমেল খেয়াল করল বাসার দরজার সামনে কেউ বলছে ফিসফিস স্বরে,
“ বুঝলাম না এক্সিডেন্ট হলো এই মেয়ের। অসুস্থ ও হলো মেয়েটা। কিন্তু পরিবারের কারোরে দেখলাম না। এই ছেলেটাই বা এত কিছু করছে কেন? রাখল ও ছেলের বাসাতেই। ”
দ্বিতীয় মহিলাটি মাথায় ঘোমটা টেনে শুধাল,
“ছেলেটা আসলে মেয়েটার কে হয় এটাই জানি না। ঐ যে মেয়েকে দেখাশোনার জন্য যে খালাটা ছিল উনার কাছে শুনেছি ছেলে নাকি মেয়েটারে খুব ভালোবাসে। দেখো না,বাচ্চাটাকেও কোলে নিয়ে ঘুরেফিরে এদিক সেদিক। এখনও কতোটা যত্ন করতেছে। আজ দেখলাম কোলে তুলে বাসায় ও আনল। ”
পাশের থেকে চশমা পরিহিত মহিলাটি শুধাল,
“ কিজানি! শুনছিলাম মেয়েটার ডিভোর্স হয়েছিল। দেখতে তো ভদ্রই মনে হয়। শালীন চালচলন। কোন ছেলের সাথে মেলামেশাও চোখে পড়ে না। এই ছেলের সাথে কিভাবে কি কে জানে। ”
প্রথম মহিলাটাই আবার মুখ ভেঙ্গিয়ে শুধাল,
“ আরেহ মেলামেশা না হলে একটা ছেলের ওর প্রতি এতকিছু কেন থাকবে? আমার আগে থেকেই সন্দেহ হচ্ছিল। ছেলে কি এমনে এমনে পাগল হইছে? নিশ্চয় মেয়েরও হাত আছে বুঝছো? নয়তো কোন ছেলে এক ডিভোর্সী মেয়ের পিছে ঘুরে? দেখছো কখনো? নির্ঘাত ছেলেরে কিছু করছে।”
দ্বিতীয়জন মুখ কুঁচকালেন। বলল,
“ অবশ্য আজকাল কিছু বলা যায় না। দোষ না থাকলে তো এমনি এমনিই আর ডিভোর্স হয়নি। নিশ্চয় কোন দোষ ছিল। ”
তৃতীয় জন এবারে মিনমিনে স্বরে বলল,
“ আরেহ একটা মেয়ে অসুস্থ৷ ছোট একটা বাচ্চা আছে। এখন এসব আলোচনা না করলেই বা কি হয়? মেয়েটার পরিস্থিতিতে কি তোমরা পড়েছো? ওর পরিস্থিতি অনুমান করতে পারছো? ওর সাথে বেশ কয়েকবারই কথা হয়েছে। একটুও মনে হয়নি ও চরিত্রহীন। ”
প্রথম জন মানলেন না। চুপও থাকলেন না। আবারও বলল,
“ দেখো হয়তো এই ছেলের সাথেই কিছু হওয়ার জন্যই বিয়ে ভেঙেছিল কিনা? এমনি এমনি কি আর বিনাদোষে ডিভোর্স হইব? নিশ্চয় মেয়েরও চরিত্রে কিছু আছে। যতোটা ভদ্রতা দেখায় অতোটা ভদ্র যে তার কি প্রমাণ? এমন ভদ্র গুলাই ভেতরে ভেতরে আরো বেশি অপকর্ম করে। ”
হিমেল এই কথাগুলো শুনেই আর নিজেকে থামাতে পারল না। ফের চরিত্রের দোষেরই প্রসঙ্গ। মিথি শুনলে? মিথি শুনলে নিশ্চয় বলবে যে হিমেলই ওর চরিত্রে দোষ দিয়েছে। অথচ সমাজটাই এমন। নোংরা! হিমেল দরজার সামনে এসেই ভ্রু বাঁকাল। শুধাল,
“ এক্সিউজ মি, কিছু বলছিলেন আন্টি? ”
মহিলা গুলো হকচকাল। যাদের পেছনে সমালোচনা করারই অভ্যাস তারা সামনে কথা বলতে তো হকচকাবেই। একজন হু না করে বলল,
“ হু? না না। আমরা তো এটা বলাবলি করছিলাম যে তুমি ওর কি হও। পরিচিত নাকি তোমরা? ”
হিমেল হাসল কথা চেঞ্জ হতে দেখে। উত্তরে বলল,
“ মনে হয় পরিচিত কেউই হবে ও। ওর মতো দেখতে হুবুহু একটা মেয়েকে আমি ছোটকাল থেকেই চিনি। ”
একজন তখন বাঁকা চোখে তাকাল। বলল,
“ তাই নাকি? তো কি হয় ও তোমার? বউ নয় নিশ্চয়? বহুদিন থেকে লক্ষ্য করছি তোমাদের মাঝে কিছু একটা আছে। ”
হিমেল এই পর্যায়েও হাসল। আকস্মিক প্রশ্নটার উত্তর হিসেবে ও সঙ্গে সঙ্গেই বলল,
“ আপনার ব্রেইন তো খুব ভালো আন্টি। ওয়াইফই হয়। আপনারা জানতেন না? ”
হিমেল ইচ্ছে করেই কথাটা বলেছিল। যাতে আঙ্গুল না তোলে, প্রশ্ন না করে। মিথির কান অব্ধি এই চরিত্রের দোষের প্রসঙ্গ যাতে না যায় সে কারণেই। তাছাড়া মিথি যে দুর্ঘটনা ঘটল এরপর হিমেল মিথিকে একা ছাড়বেও না। যেভাবেই হোক মিথিকে নিজের কাছেই রাখত। আর নিজের কাছে রাখার এই সম্পর্কটাকে বৈধভাবে বিয়েই বলে। তাই বলতে আটকাল না। অপরদিকর মহিলাটা ভেবেছিল উত্তরটা অন্যকিছু হবে। এমন উত্তর আশাই করেননি। ভ্রু কুঁচকে সঙ্গে সঙ্গেই শুধালেন,
” হু? ওয়াইফ মানে? বিয়ে করেছো নাকি তোমরা? ”
“ বিয়ে না করে ওয়াইফ বলব কেন?”
“ আমরা তো জানতাম না। স্বামী স্ত্রী যখন তোমরা তখন, আলাদা থাকো কেন? তুমি নিচতলায় ভাড়া থাকো, ও উপরতলায়। মিথ্যে বলার আর জায়গা পাও না না? ”
পাশ থেকে চশমা পড়া মহিলাটা তখন শুধালেন,
“ ভাবী, ওটা হয়তো ওদের ব্যাক্তিগত বিষয়। বাদ দিন না। কি দরকার ওদের এই বিপদের সময় এত ঘাটানোর। ”
হিমেল তবুও উত্তর হিসেবে শুধাল,
“ কিছু রাগ অভিমানের কারণে সেপারেশনে ছিলাম আন্টি। এখন আর থাকব না। স্ত্রীর সেবাযত্ন করতে হবে তো। ”
চশমা পড়া মহিলাটা হাসলেন এবারে। বাকি সবার মুখে অসন্তোষ থাকলেও উনার মুখে তা দেখা গেল না। হেসে বললেন,
“ এতদিনে বুঝলে তা? এতগুলো দিন দেখতাম মেয়েটা কত পরিশ্রম করছে, টিউশনি করাচ্ছে, নিজ হাতে বাজার করছে, রান্না করছে, বাচ্চা মানুষ করছে। তুমি সহ সাহায্য করলে তো আরো সহজ হতো ওর জন্য। এতগুলো দিন বউ এর যত্ন নেওয়ার কথা মাথায় ছিল না না?”
হিমেল হাসে। মনে মনে আওড়ায়,
” আরো আগেই চেয়েছিলাম আন্টি। কিন্তু সে আমাকে দিলই না যত্ন করতে।”
কিন্তু মুখে বলল,
“ হু, তখন ও আর আমি কেউ বুঝিনি এটা। এখন বুঝতে পেরেছি যখন আলাদা থাকব না আর।”
মহিলাটা আবারও বললেন,
“ স্বামী স্ত্রীর মধ্যে আর রাগ অভিমান রেখো না কেমন? মিলে যাও। তাছাড়া বাচ্চাটার ও তো একটা সুস্থ পরিবেশ প্রয়োজন আছে বলো?আর স্ত্রীর খারাপ সময়ে স্বামীই তো পাশে থাকবে তাই না? সংসারটা করো দুইজনে মন দিয়ে। আর কোন অভিমান,অভিযোগ রেখো না । ”
হিমেল মাথা দুলাল। ঠিক তখন দেখা গেল সিঁড়ি বেয়ে দুই চারজন উঠছে। বোধহয় উপরতলায় যাবে। যার মেয়ের বিয়ে উনাদেরই অতিথি বোধহয়। মহিলা গুলো সবাই ঘাড় বাঁকিয়ে চাইতেই হিমেলও দৃষ্টি ঘুরাল। অতঃপর দেখা গেল সে মহিলাকে যার কাছে মিথি বাসা খুঁজতে গিয়েছিল দেড় বছর আগেই৷ যার ভাই এর ছেলের জন্য প্রস্তাব রাখা হয়েছিল মিথির কাছে। যার সাথে তার চাচীর সম্পর্ক ভালো। সবচেয়ে বড় কথা যার কাছে সে মিথিকে স্ত্রী পরিচয় দিয়েছিল। মহিলাটি হিমেলকে দেখেই নাক মুখ কুঁচকাল। কোন এক কারণে এই ছেলেকে উনি পছন্দ করেন না আর। মনে মনে এই ছেলের প্রতি তীব্র আক্রোশ আর ক্ষোভ ও পুষেছেন এতকাল। কারণ উনার মনে হয় সেদিন হিমেলরা মিথ্যেটা বলে তাকে অপমানই করেছেন। সূক্ষ্মভাবে রিজেক্ট এ করেছেন। মিথি মেয়েটা ডিভোর্সী হিসেবে তার প্রস্তাবটা অবশ্যই অবশ্যই ভালো ছিল। কিন্তু এই যে পরোক্ষ ভাবে উনাকে অপমান করলেন, প্রত্যাখান করলেন এর জন্যই উনার রাগ। নিরব এক ক্ষোভ। তার বদ্ধমূল ধারণা এই ছেলের জন্যই মিথি নামক মেয়েটার সাথে তার ভাই এর ছেলের বিয়ে হয়নি। তিক্তবিরক্ত হয়ে উনি কপাল কুঁচকালেন। বললেন,
“ একি! তুমি না? কি যেন নাম..”
হিমেল হেসে ফেলল। বলল,
“ আসসালামু আলাইকুম আন্টি। হিমেল আমি। সারফারাজ আহমেদ হিমেল। চিনতে পেরেছেন? ”
মহিলা একইভাবেই কপাল কুঁচকে বললেন,
“ চিনব না কেন? শুধু নামটা ভুলে গেছি৷ তো এখানে কি তোমার? ভাই ভাবীর সাথে থাকো না এখন? ”
পাশ থেকে চশমা পড়া মহিলাটাই তখন বলল,
“ আর বলবেন না ভাবী, ওর বউ এর এক্সিডেন্ট হয়েছে। ছোট্ট একটা মেয়ে নিয়ে বেচারা তো হিমশিম খাচ্ছে এখন।”
মহিলা ভ্রু বাঁকালেন।কিসের বউ? কিসের বাচ্চা? ছেলে তো বিয়েই করেনি। ছেলের চাচীর সাথে রোজ রোজ কথা হয় উনার। ছেলে নিশ্চয় এখানেও সবাইকে বোকাই বানাচ্ছেে।মিথ্যে বলছে, যেভাবে উনাকে মিথ্যে বলেছিল। আর এই মিথ্যে বলার জন্য উনার এখনও রাগ হয় এই ছেলের প্রতি। এই ছেলের জন্যই সেদিন ঐ মেয়েটার সাথে তার শাফুর ব্যবস্থাটা করতে পারেননি। এক নিরব আক্রোশ তো আছেই এই ছেলের প্রতি।
.
হিমেলে খু্ব যত্ন নিয়ে চাল, ডাল মেপে মেপে নিচ্ছে। আয়মান চলে গিয়েছে একটু আগেই। পাশ মিষ্টি দাঁড়িয়ে আছে৷ হিমেল একটু পরপরই তাকাচ্ছে ওর দিকে আর চাল ডাল এগুলোর সাথে পরিচয় করাচ্ছে। অথচ সেই শুধু নামমাত্র পরিচয়েই থেমে থাকার বাচ্চা নয়। একদম ছুঁয়ে দেখতে হবে তো৷ সে জন্যই দুই হাতে মুঠো করে করে চাল তুলছে। পরপর আবার ডালও তুলছে। দুটো পাত্রেই এলোমেলো করে ছুড়ে দিচ্ছে। কখনো চালের পাত্রে ডাল,কখনো ডালের পাত্রে চাল। হিমেল বেচারা হতাশ হয়ে চাইল। বুঝানোর ভঙ্গিতে বলল,
“ আম্মুজান, সব তো এক হয়ে যাচ্ছে। কড়াইতে রাখি কেমন? এই যে এখানে রাখো। ”
মিষ্টি শুনল ড্যাবড্যাব করে চেয়েই। হিমেলের একটু আগের চাল পরিচয় করা শব্দটা আওড়িয়ে বলার চেষ্টা করল,
“ চাআআআআ!”
“ চাল। বলো চাল।”
“ চাআআআআ!”
হিমেল হেসে ফেলল। মিষ্টি অনবরত একই শব্দই বলে যাচ্ছিল। অতঃপর একটা সময় পর হাত পা ছড়িয়ে বসে গেল ফ্লোরে। একটা কড়াই টেনে নিয়ে রাখল সামনেই। অতঃপর তাতে আরো একটক পাতিল নিয়ে শুরু করল শব্দ করা। যেন চমৎকার এক খেলা। এই খেলায় আওয়াজটা তৈরি করতে পেরেই সে চরম খুশি। যাকে বলে খুশি হয়ে আকাশ ছুঁয়ে ফেলা। হিমেল হেসে ফেলে ওর উচ্ছাস দেখে। মোবাইল ঘেটে বাচ্চাদের খিঁচুড়ি রান্না শিখছিল ও। রান্নায় খুবই কাঁচা সে। কখনো তেমন রান্না করা হয়নি। এই দেড় বছরে পরিবার থেকে ভিন্ন হওয়ার পর অধিকাংশ সময় সে বাইরেই খেয়ে নিত। কখনো কখনো বা নিজেই রান্না করে আধপোড়া খাবার খেত। কিন্তু আজ আধপোড়া হলে ঐটুকু মিষ্টি যে খাবারটা মুখেই তুলবে না সে শিওর। তাই খুব সতর্কতার সাথেই মেপে সব নিয়ে কড়াইতে বসাল। কিন্তু নুন দেওয়ার সময় বিপাকে পড়ল। যদি বেশি হয়ে যায়? চামচে বার কয়েক নুন তুলেই আবারও পাত্রে রেখে দিল। আবার ও তুলল, আবার রেখে দিল। কি করবে না বুঝেই মিষ্টিকে কোলে তুলল। ছোটশ্বাস ফেলে একটা চামচে নুন তুলে নিয়ে মিষ্টিকে বলল,
“ আপনার আম্মুর কাছে যাব। চলেন। এখানে থেকে আগুন টাগুন ছুঁয়ে ফেললে তো বিপদ হয়ে যাবে বলুন? ”
অতঃপর ওকে নিয়েই মিথির কাছে এল। মিথি বিছানায় হেলান দিয়ে বসা ছিল। অতঃপর রুমে পা ফেলেই গলা ঝেড়ে বলল,
” খিঁচুড়িতে এতটুকুই নুন দেয় তাই না মিথি? ঠিক আছে না?”
মিথি তাকাল। চামচ ভর্তি নুন। এত নুন দিবে? ছোট ছোট চোখে তাকাল সে। অতঃপর হিমেল যে খুব বেকায়দায় পড়েছে তা বুঝে অস্বস্তি অনুভব করল। মুখ কাচুমাচু করে বলল,
“ আপনাকে খুব বিরক্ত করে ফেলছি হিমেল ভাই। অনেক কষ্ট করতে হচ্ছে আপনাকে। আপনি কি আয়েশা খালার সাথে একবার কথা বলিয়ে দিবেন আমার? তাহলে নাহয় খালাকে ম্যানেজ করতাম কয়েকটা দিনের জন্য। এভাবে আপনাকে কষ্ট দিতে নিজেরই খারাপ লাগছে আমার। ”
হিমেল শুনল। ভ্রু শিথীল করে বলল,
“ খারাপ লাগছে নাকি আমার সাহায্য নিতে তোর ইগোতে লাগছে মিথি? ”
মিথি ছোটশ্বাস ফেলে। শুধাল,
“যে মানুষটা আমার খারাপ সময়ে পাশে ছিল তার সাহায্য নিতে আমার ইগোতে লাগবে কেন হিমেল ভাই? অকৃতজ্ঞ নই আমি। বরং মনে মনে হাজারবার ভাবছি যে আপনার এই উপকারের ঋণ হয়তো আমি কখনোই শোধ করতে পারব না। কিন্তু একটা মানুষকে এভাবে ভোগান্তিতে ফেলাও তো উচিত নয়।আপনার বাসায় থাকছি এটাও তো ভালো দেখাচ্ছে না। তাই।”
হিমেল শুনল। বলল,
“ যদি আমার বাসায়ই থাকতে হয় এরপর থেকে? ”
মিথি অস্পষ্ট গলায় বলল,
“ হু? ”
হিমেল এড়িয়ে গেল এবারে। ফের চামচ এগিয়ে ধরে নুন দেখিয়ে বলল,
” নুন কতটুকু দিব? ”
“ বেশি তো রান্না করছেন না। শুধু প্রাণের জন্যই। অল্প একটু দিলেই হবে।”
“ আচ্ছা। ”
এরপর পরই আবার মিষ্টিকে কোলে নিয়ে রান্নাঘরে গেল। এক হাতে ওভাবে কোলে নিয়েই রান্না করল খুব কাঁচা হাতে। অতঃপর ছোট চামচে একটু তুলে ফুঃ দিয়ে ঠান্ডা করল। মিষ্টির মুখের সামনে তুলে ধরে বলল,
“ মিষ্টি? দেখো তো আম্মু, হলো কিনা?”
মিষ্টি ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে ছিল। বোধহয় বুঝে উঠেনি। অতঃপর বাড়িয়ে দেওয়া চামচের দিকে চাইল। হিমেল বলল,
“ আ করো । ”
মিষ্টি প্রথমবারেই হা করল না। হিমেল আরো দুবার বলল। অতঃপর হা করল মুখ এগিয়ে। হিমেল হাসে। খাবারটুকু মুখে দিয়েই ওর রিয়্যাকশন দেখার জন্য তাকিয়ে থাকে। অথচ মিষ্টি মুখে নিয়েই সর্বপ্রথম নাক কুঁচকাল। হিমেলের দিকেই চাইল। হিমেল ভাবল বোধহয় মজা হলো না। হয়তে স্বাদই হয়ি। হতাশ হয়ে বলল,
“ হলো না? ”
মিষ্টি উত্তর করল না কিছুই। বেচারা হিমেল এবার চামচে তুলে পা চালাল মিথির দিকে। মিথির সামনে এসেই চামচটা বাড়িয়ে বলল,
“ মিথি? হলো এটা? হা কর তো। ”
মিথি এভাবে শুঁয়ে বসে বিরক্ত হচ্ছিল। হুট করে কথাটা শুনে শুধাল,
“ হু? ”
“ সব ঠিক হয়েছে কিনা তার জন্য। হা কর। ”
মিথি বা হাত বাড়াতে চাইল। হিমেলই তখন বলল,
“ হা করলে সমস্যা হয়ে যাবে তোর? ”
মিথি এবার হা ঐ করল। সঙ্গে সঙ্গেই মিষ্টির মতো করে তার মাকেও মুখে তুলে দিল। উত্তরের জন্য অপেক্ষা না করে বলল,
“ ঠিক আছে? ”
মিথি তাকাল। হিমেল ভাই এর উত্তর শোনার জন্য অস্থিরতা দেখে বলল,
“ হ্যাঁ ঠিক আছে। ”
“ পেরেছি ঠিক ভাবে রান্না করতে? ”
“ হ্যাঁ। ”
“ মিষ্টিকে খাইয়ে দেই? ”
বিষাদ ও বসন্ত পর্ব ৪২
মিষ্টি নামটা হিমেলই ডাকে বেশি। মিথিও মাঝে মাঝে মিষ্টি মা ডাকে। তবে হিমেল যে ডাকে সে জানে না। তাই ভ্রু কুঁচকাল। হিমেল তা বুঝেই বলল,
“ বাচ্চা মিথিফুল। ”
“ ওহ ওহ।”
