Home বিষাদ ও বসন্ত বিষাদ ও বসন্ত পর্ব ৫৫

বিষাদ ও বসন্ত পর্ব ৫৫

বিষাদ ও বসন্ত পর্ব ৫৫
অলকানন্দা ঐন্দ্রি

আজ মিথির পরীক্ষা ছিল। সে দুপুরে পরীক্ষা দিতে এসে এখন সন্ধ্যা গড়াল। পরীক্ষার সময় প্রায় শেষ বললেই চলে। মিষ্টিও মাকে ছাড়া মোটামুটি বাসায় থাকতে অভ্যস্ত হলেও হিমেল ইচ্ছে করেই মিষ্টিকে কোলে নিয়ে মিথিকে নিতে এসেছে। একদম পার্ফেক্ট ফেমিলি তার। হিমেলের মাঝেমাঝেই সুখে হৃদয় শান্ত হয়ে আসে।হিমেল বেশ অনেকটা সময় দাঁড়িয়ে থেকেই রাস্তার এপাশ ওপাশ হাঁটাহাঁটি করছিল। মিষ্টির সাথে এইসেই কথা বলছিল। ঠিক তখনই অনেক দূরে মাঠ দিয়ে হেঁটে আসা মিথিকে চোখে পড়ল হিমেলের।তারপর কিছুটা হেঁটে আসতেই দেখা গেল মিথি পিছু ফিরে চেয়েছে। হিমেল ভ্রু কুঁচকে চাইতেই দেখল পেছনের দুটো ছেলে এগিয়ে এসেছে মিথির পাশেই। বেশ হাসিমুখে এই সেই কথাও বলে যাচ্ছে মিথির সাথে। বোধহয় মিথির ডিপার্টমেন্ট এরই হবে। এইটুকু ভেবে হিমেল ভ্রু কুঁচকে দূর থেকেই খেয়াল করছিল মিনিটকয়েক। কিন্তু যখন দেখা গেল একটা ছেলে কেমন করে চেয়েই আছে তখন থেকে আর মিথি ঠাঁই দাঁড়িয়ে কথা বলে যাচ্ছে তখনই কেমন রাগ হলো। মিথি কেন অন্য দুটো ছেলের সাথে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কথা বলবে? হিমেল কপাল কুঁচকাল। অবশেষে ওভাবেই মিষ্টিকে কোলে নিয়ে পা বাড়াল। মিথির সামনে গিয়ে গলা ঝেড়ে শীতল অথচ দৃঢ় স্বরে

“ মিসেস মিথিয়া মাহমুদ, পরীক্ষা শেষ? সোজা বাসায় না ফিরে এদিক সেদিক কি জানতে পারি? ”
মিথি সঙ্গে সঙ্গেই চাইল। হিমেলের মুখটা গম্ভীর কিছুটা। বোধহয় রেগে আছে। ছেলে দুটোর সাথে কথা বলার কারণেই কি? মিথি বোধহয় বুঝল ও। সঙ্গে সঙ্গেই বিদায় নিয়ে পা বাড়াল হিমেলের সাথে। হিমেল আবার কন্ঠে চাপা রাগ ঢেলে বলল,
“ কারা ওরা? এত কিসের কথা তোর ওদের সাথে? ”
“ ওরাই প্রথমে কথা বলেছে। কেউ কথা বলতে চাইলে ভদ্রভাবে উত্তর দেওয়া উচিত না?”
হিমেল রাগল আরেকটু। কপাল কুঁচকাল। শুধাল,
“ এমন কত মানুষই তো তোর সাথে কথা বলার জন্য ছটফট করে। কই, তখন তো ভদ্রভাবে কথা বলতে দেখি না তোকে। ”

“ কার সাথেই বা অভদ্রভাবে কথা বলেছি আমি হিমেল ভাই? ”
হিমেল কিছুই বলল না উত্তরে। তবে মুখ ওভাবেই গম্ভীর রাখল। পাশাপাশি হাঁটতে হাঁটতে মিথির দিকে এমন একটা চাহনি দিয়ে মুখ ফিরিয়ে নিল যেন কত জন্মের চাপানো রাগ মিথির উপর। মিথি ফের আবারও বলল,
“ আপনার সাথে? ”
হিমেল এবারেও উত্তর করল না কেন জানি। মিথি আবারএ ডাকল,
“ হিমেল ভাই,কথা বলছেন না কেন?আমি তো কিছু করলাম না। ”
হিমেল ডান ভ্রু উঁচিয়ে প্রশ্ন ছুড়ল,
“ কিছু করেছিস বলেছি আমি? ”
“ তো কথা বলছিলেন না কেন? ”
“ কারণ আমি তোর মতো উদার নই যে কেউ কথা বললেই তার উত্তর দিব নেচে নেচে। ”
মিথির মুখটা চুপসে এল। নিরাশ স্বরে জানাল,

“ ওদের সাথে আগে পরিচয় হয়েছিল। এখন ডাকল বলে কথা বললাম।”
“ অথচ হিমেল নামের একটা পুরুষের সাথে কথা বললে চরিত্রে দোষ পড়ে যাবে বলে তাকে তুই কি পরিমাণ ইগ্নোর করতিস, করিস এবং আমি জানি ভবিষ্যৎ এ ও করবি। ”
“ এটাই মেয়েদের বাস্তবতা। ওদের সাথে আজকে একদিন কথা বলেছি ঠিক আছে। কিন্তু প্রতিদিন এভাবে দাঁড়িয়ে কথা বললে রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাওয়া পথিকগুলোও বাঁকা চোখে তাকাবে। ”
হিমেল কপাল কুঁচকে বলতে লাগল,
“ তাকানো উচিত। ওদের কথা বলার ধরণই তেমন লাগছিল। তোকেও বা কেন ওদের সাথে বকবক করতে হবে? করবি না আর বকবক। বুঝলি? ”
“ করলে অবিশ্বাস করবেন আমায়? ভাববেন যে চরিত্র খারাপ আমার? ”
হিমেল তাকাল গম্ভীর মুখে। গম্ভীর ভাবেই উত্তর করল,
“ না, যে ভদ্রতা তোর সামনে দেখাচ্ছি তা শুধু অভদ্রতায় পরিণত হবে। আই থিংক, হাসব্যান্ডরা অভদ্রই হওয়া উচিত। ”

তখন দুপুর বেলা। তীব্র গরমের কারণে আদ্রর শরীরটা ঘেমে চুপসে আছে ময়লামতো পোশাকটার সাথে। অযত্নে বেড়ে উঠা দাঁড়ি, কিছুটা বড় হওয়া চুল আর কয়েদীদের পোশাকেও সুদর্শন পুরুষটাকে চমৎকার বোধ হয় যেন। আদ্রর দৃষ্টি শূণ্যতে। জেলখানার সেলগুলোতে থাকা ছোট্টমতে জানালা গুলো দিয়ে আলো এসে পড়েছে খসখসে ফ্লোরে। দেওয়ালের কিছু কিছু জায়গায় সিমেন্ট খসে পড়েছে। আশপাশে কোথাও প্রহরীদের ব্যস্ত পা চালানোর আওয়াজও ভেসে আসছে। অথচ আদ্র শান্ত। আদ্র এখন হাতের আঙ্গুলে দিন গুণে। হিসেব অনুযায়ী আজ তার মায়ের জন্মদিন। পৃথিবীর সবচাইতে সুন্দর দিনগুলোর মধ্যে একটা। তার মায়ের জন্মদিন। আদ্র কতোটা খুশি থাকে এই দিনটায়। তার পুতুলের মতো মা টা আজই দুনিয়ায় এসেছিল এই আনন্দে সে মাকে জড়িয়ে ধরত। অথচ এখন তো তার ভালোবাসার আম্মুটাই আর নেই। অন্য সব বার মায়ের জন্মদিনে আদ্র বেশ উৎসুক থাকলেও এই দুটোবার আদ্র একটু হাসেও নি অব্দি। মাকে জন্মদিনের ছোট্ট উইশটুকু করার সৌভাগ্যও বিধাতা তার থেকে কেড়ে নিয়েছে এই দুটো বছর। আদ্রর চোখ লাল হয়ে আসে।আদ্রর মুখটা কেমন শক্ত হয়ে আছে যেন। আদ্র চোখ বুঝে মুহুর্তেই। একটা চাপা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মনে মনে বিড়বিড় করে,

“ আম্মু? কি হতো তুমি যদি বেঁচে থাকতে? কি হতো তুমি আমায় ভালোবেসে থেকে গেলে? কেন চলে গেলে আম্মু? আমি তো এখনো তোমায় ছাড়া চলতে পারি না আম্মু। এখনো বাচ্চা ছেলের মতো তোমার অপেক্ষায় থাকি। জানো আম্মু? তোমার মতো কেউ বিরিয়ানি রান্না করে খাওয়ায়নি আমাকে আর। কেউ আমায় তোমার মতো করে আর ভালোবাসেনি আম্মু। তোমার মতো কেউ জ্বর হলে মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়নি, তোমার মতো কেউ গরম চা-কফি করে দেয় না।তোমার মতো কেউ নেই আম্মু, কেউ নেই। তুমি খুব নিষ্ঠুর আম্মু, আমায় একা করে দিয়ে চলে গেলে কি দারুণ।”
আদ্র যখন ম্লান আলো থাকা ঘরটায় বিড়বিড় করছিল ঠিক তখনই দেখা গেল লোহার শিকের অপর প্রান্তর একটা উৎসুক মুখ। পুলিশ অফিসার সাইয়ারা মেহজাবীন।আগের অফিসারটা বদলি হয়েছে যে কিনা আদ্রর বাবারই বন্ধু ছিল। যার কারণে খুব ভালোভাবেই আদ্রকে মামলায় আটকাতে সুবিধা করে উঠতে পেরেছিল আদ্রর নামমাত্র বাবার কমবয়সী বউটা। আদ্র ওসব ভেবেই মৃদু হাসতে কানে এল,

“ আদ্র, পাগল হয়ে যাচ্ছেন দিনদিন? নিজে নিজে বকবক করেন, নিজে নিজেই হাসেন। আশ্চর্য। ”
সাইয়ারা মেহজাবীনকে আদ্র চেনে প্রায় বহুবছর। তার এক ফ্রেন্ডের বোন। খু্ব সম্ভবত এই কারণেই তাকে আপনি বলে সম্বোধন করে মেয়েটি। নয়তো কোন আসামীকে কেউ আপনি বলে সম্বোধন করে? আদ্র মৃদু হেসেই এগোল। গা ঝাড়া দিয়ে দাঁড়িয়ে বলল,
“ দুনিয়া সব ভালো মানুষ থাকলেই চলবে ম্যাম? পাগলও থাকতে হয়। তারপর বলুন, কি ভাবলেন? ”
“ কি বিষয়ে? ”
“ চুক্তির বিষয়ে। ভেবে দেখুন ভালো করে। আমি জেলখানায় বন্দি হলেও মোটামুটি আশি শতাংশ সম্পত্তিই আমার নামেই আছে বুঝলেন? তো এত সম্পত্তি পড়ে থেকে লাভ কি বলুন যদি নিজের মায়ের খু’নীদেরই না মারতে পারলাম? আপনার সারাজীবন গড়ে দিব ম্যাম, শুধু একটাবার আমায় বের হওয়ার সুযোগ দিন। একটবার৷ আমি ওদের শেষে করে আবার আত্মসমর্পন করে জেলে ডুকব। ”
সাইয়ারার মুখ শক্ত হলো এবারে। এতোটা সময় আদ্রর মুখের দিকে চেয়ে থাকলেও এবার কন্ঠ শক্ত করে উত্তর দিল,

“ সাইয়ারা মেহজাবীন লোভী নয় আদ্র। আর যে কেইসে আছে খুব সহজেই বের হতে পারবেন আপনি কিন্তু যা পরিকল্পনা করছেন তাতে বের হওয়া কঠিন হবে। জীবনকে সুযোগ না দিয়ে নিজের হাতেই শেষ করতে উঠে পড়ে লেগেছেন আপনি। ”
আদ্র হাসল। তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে জানাল,
” যা শেষ তা আর নতুন করে শেষ করার উপায় থাকে নাকি? ”
“ যা শেষ ভাবছেন তা আসলেই শেষ নয়। শেষ থেকে শুরু ও হয় আদ্র। ”
আদ্র তাকায়। মৃদু হেসে জানাল,
“ আপনি মানুষটা পুলিশ অফিসার হলেও বয়সে আমার ছোটই হবেন সাইয়ারা।এবং একই ভাবে বোকাও আপনি। ”

তখন অনেক রাত। দীপ্রর বোনের দাওয়াতেই হিয়া এসেছিল দীপ্রদের বাসায়। বিশেষ করে দীপ্রর বিয়ে ঠিক হয়েছে জানার পর থেকেই হিয়া আরো বেশি বেশি হাসিখুশি থাকার চেষ্টা করছে। বেশি বেশি খুশি দেখাচ্ছে যাতে করে কেউ টের না পায় তার খারাপ লাগছে। কেউ যাতে বুঝে না যায় হিয়া দীপ্রকে ভালোবাসে। হিয়া ছোটশ্বাস ফেলে। রাত দেড়টায় ও ঘুম না হওয়াতে উঠে গিয়ে দাঁড়াল বেলকনিতেই। অন্ধকারে হাঁটু ঘেষে বসেই হিয়া কেঁদে ফেলল। কি হতো যদি দীপ্র তাকে ভালোবাসত? কি হতো তার ভাবনা যদি সত্যি হতো? কেন হিয়ার ভাগ্যেই এমন হলো? কেন দীপ্রর মনটা বুঝেও বুঝে উঠতে পারল না সে? হিয়া যখন কাঁদতে কাঁদতে হেঁচকি উঠে গেল ঠিক তখনই কারো কন্ঠস্বর ভেসে এল,
“ হিয়ার বাচ্চা হিয়া, ঘুমোসনি তুই? আরেকটু হলেই তো আমার কলিজাটা লাফিয়ে আকাশে উড়ে যাচ্ছিল। ”
হিয়া হুট করেই কান খাড়া করল। কেউ মোবাইলের ফ্ল্যাশ লাইট তাক করে রেখেছে তার দিকে। তবে উল্টো পিঠ হয়ে থাকায় তার পিঠটায় সে লোক দেখতে পাবে।হিয়া দ্রুতই চোখ মুঁছল। উঠে দাঁড়িয়ে দেখল ঠিক এই বেলকনিটার থেকে অল্প দূরত্বের বেলকনিটাতেই দীপ্র দাঁড়ানো।মোবাইলের আলো ছুড়ে তার দিকে চেয়ে আছে। হিয়া মৃদু কন্ঠে বলল,

“ ঘুমোসনি? ”
“ কি করে ঘুমাব? তুই এমন প্যা প্যা করে নাক টানছিলি আমি তো ভাবলাম কোন ভূতপ্রেত এই বেলকনিতে। ”
“ সরি। ”
“ কবে থেকে এত ভদ্র হয়ে গেলি? ”
হিয়া ছোটশ্বাস ফেলে।দাঁত বের করে হেসে বলল,
“ ঘুমাব। তুই তোর ফিয়ন্সের সাথে কথা বল। ”
হিয়া আজকাল দীপ্রর সাথে খুব কমই কথা বলে। আবার যেটুকু সময় বলে সেটুকু বেশ হাসিখুশি ভাবেই বলে। কিন্তু ঐ যে কম কথা বলাটা দীপ্রর সহ্য হচ্ছিল না। দীপ্র এক ঘন্টা আগেও হিয়াকে ম্যাসেজ করেছিল। অথচ হিয়া সুন্দর ভাবেই জবাব দিয়েছিল সে ঘুমাবে। কিন্তু ঘুমাল কোথায়? এখনও বলল ঘুমাবে। আর এইটুকু বলেই যখন হিয়া চলে যেতে নিচ্ছিল ঠিক তখনই দীপ্র বলল,

“ আমায় ইগ্নোর করছিস কি? ”
হিয়া হেসে উঠল। বলল,
“ কোন দুঃখে? তুই কি আমার কোন ক্ষতি করেছিস নাকি করবি যে ইগ্নোর করব হুহ? ”
“ তাহলে হুট করে তোর এত ঘুম, ব্যস্ততা? আগে তো আমরা অনেক কথা বলতাম। ”
“ পাগল নাকি দীপ্র? এখন তোর সাথে আমি দিনরাত কথা বলব হুহ…? তোর বউ আমায় জুতো নিয়ে পিটাবে। নির্ঘাত সন্দেহ করবে।”
“ সব তো তুই জানিস। ও মোটেই এমন নয়। ”
ও মোটেই এমন নয়। কথাটা স্বাভাবিক শোনালেও হিয়ার বুকে কেমন যেন লাগল। ওদের সম্পর্কটা নিশ্চয় খুব সুন্দর? খুব বেশিই? হিয়ার কান্না আসে। বলে,
“ তবুও আমার একটা বোধজ্ঞান আছে না? নিজের জায়গায় স্বচ্ছ থাকাটাই বেটার । একটা সম্পর্কের মধ্যে তৃতীয় ব্যাক্তি হয়ে ঢুকাটা শোভা পায় না। ”
দীপ্র হাসল। জানাল,

“ আমরা তো বন্ধুই পাগল। বন্ধুরা আবার তৃতীয় ব্যাক্তি হয়? ”
হিয়া ভীষণ আক্ষেপ নিয়েই চাইল। দীপ্রর চোখেমুখে কিছুটা সময় তাকিয়ে হঠাৎ আনমনে বলল,
“ আমরা শুধু বন্ধুই, তাই না দীপ্র? আমাদের সম্পর্কটা তো শুধু বন্ধুত্বই, তাই না? ”
দীপ্র চেয়ে ফের হাসল মৃদু। উত্তরে মুহুর্তেই বলল,

বিষাদ ও বসন্ত পর্ব ৫৪

” হ্যাঁ, আমরা তো বন্ধুই। বন্ধুত্বই তো আমাদের সম্পর্কের নাম।কেন? ”
হিয়ার চোখ ছলছল করল। শুকনো ঢোক গিলে নিয়ে মনে মনে বিড়বিড় করল,
“ কারণ আমি চেয়েছিলাম, আমাদের সম্পর্কটা বন্ধুত্বের থেকেও বেশি কিছু হোক দীপ্র। অথচ….হলো না। কিচ্ছু হলো না। হিয়া বড্ড বোকা। বড্ড। ”

বিষাদ ও বসন্ত পর্ব ৫৬