Home বুনো মেঘের হাতছানি বুনো মেঘের হাতছানি পর্ব ২৪ (২)

বুনো মেঘের হাতছানি পর্ব ২৪ (২)

বুনো মেঘের হাতছানি পর্ব ২৪ (২)
ইসরাত জাহান দ্যুতি

সকাল তখন প্রায় পৌনে আটটা। কুয়াশার চাদরে ঢাকা অরণ্য এক অদ্ভুত রূপ নিয়েছে। সূর্যের ম্লান আলো ওপরের ডালপালায় ধাক্কা খেয়ে নিচে নামার আগেই ধোঁয়াটে হয়ে যাচ্ছে। দিব্যর কপাল দিয়ে দরদর করে ঘাম ঝরছে। মিনিট বিশেক আগে এক ঝোপের আড়ালে মারিশার নীল স্কার্ফের একটা টুকরো দেখতে পেয়েই আশফি হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে সেদিকে ছুটেছিল।

​দিব্য যে ওর পিছু নেয়নি তা নয়, সে আপ্রাণ চেষ্টা করেছিল। কিন্তু দুর্গম পাহাড়ের ওই খাঁজটায় নামতে গিয়ে পাথরের শ্যাওলায় ওর পা প্রচণ্ডভাবে পিছলে যায়। সেই সাময়িক পতন আর গোড়ালি মচকে যাওয়ার অসহ্য যন্ত্রণা সামলে ও যখন আবার উঠে দাঁড়াল, ততক্ষণে আশফি চোখের আড়ালে চলে গেছে। ঘন কুয়াশার দেয়াল আর গোলকধাঁধার মতো ওক বন কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই আশফিকে গিলে ফেলল। দিব্য ল্যাংচাতে ল্যাংচাতে কিছুটা এগিয়েছিল, কিন্তু ও বুঝতে পারছিল একা এই ঘন জঙ্গল আর কুয়াশায় এগোলে ও নিজেও পথ হারাবে। তাই ও দাঁড়িয়ে পড়ে আগে পরাগ আর সৌভিককে খবর দেওয়াটাকেই শ্রেয় মনে করল।

​কাঁপাকাঁপা হাতে ফোনটা বের করল পকেট থেকে। সিগন্যাল বারটা একটা-দুটো করে ওঠানামা করছে। ও দ্রুত আশফির নম্বরে ডায়াল করল। ওপার থেকে রিং হচ্ছে, কিন্তু কেউ ধরছে না। পরপর তিনবার ফোন করার পর চতুর্থবারে যান্ত্রিক নারী কণ্ঠ বলে উঠল, “দ্য সাবস্ক্রাইবার ইউ আর কলিং ইজ নট রিচিবেল…”
​মেজাজ খারাপ হলো দিব্যর। মচকে যাওয়া পায়ের যন্ত্রণারয় আর ওকে একা ফেলে আশফির গায়েব হয়ে যাওয়ার কারণে বিড়বিড়িয়ে অকথ্য কটা গালিও দিল আশফিকে। এক মিনিট অপেক্ষা করে কলটা আরও একবার ঢোকাল সে৷ কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে ভেসে এল নারী কণ্ঠের সেই একই কথাগুলো। এবার কেমন যেন একটু দুশ্চিন্তা হতে লাগল ওর৷ এই গহিন জঙ্গলে একবার পথ হারিয়ে একা থাকা মানেই বিপদের মুখোমুখি হওয়া। ও আর দেরি না করে দ্রুত পরাগ আর সৌভিককে কনফারেন্স কলে ধরল। ওরা তখন ট্রেইলের অন্য প্রান্তে মারিশাকে খুঁজছিল। বেশ খানিকক্ষণ বাজার পর রিসিভ হলো কলটা।

“পরাগ! সর্বনাশ হয়ে গেছে…”‚ উদ্বেগ সুরে বলল দিব্য, “আশফিকে তো হারিয়ে ফেলেছি।”
​”কী বলছিস?” পরাগের বজ্রকণ্ঠ শোনা গেল ওপার থেকে, “একসাথে ছিলি না তোরা? একসাথে থেকেও কীভাবে হারিয়ে ফেলিস!”
বিরক্তি ঝেড়ে বলে উঠল দিব্য, ​”আরে বাল, মারিশার চিহ্ন পেয়ে ও পাগলের মতো বনের গভীরে ঢুকে পড়েছে। আমি তো আটকাতে চেয়েছিলামই। কিন্তু পিছু নিতে গিয়ে পড়ে গিয়েছিলাম। এখন হারামজাদা ফোন ধরছে না। শালার ব্যাটা শালার কিছু হয়ে গেলে ওর বাপ আর দাদা তো আমার ঘুম হারাম করে দেবে। তোরা জলদি কালচে পোখরির ট্রেইলে আয়, আমার কেমন যেন ভয় লাগছে ওকে নিয়ে।”

​পরাগ আর কোনো কথা বাড়াল না। কলটা কেটেই সৌভিককে নিয়ে মুহূর্তের মধ্যে অবস্থান বদলে দৌড়াতে শুরু করল। সৌভিক ওর ব্যাগের শক্তিশালী এলইডি টর্চটা জ্বালিয়ে কুয়াশার দেয়াল ভেদ করার চেষ্টা করল। ওরা তিনজন এখন দুদিক থেকে বনের গভীরে ঢুকে পড়ল। কুয়াশার কারণে কেউ কাউকে দেখতে পাচ্ছিল না, কেবল একে অপরের চিৎকার শুনে বনের ভেতর নিজেদের অবস্থান বুঝতে পারছিল ওরা।
​হঠাৎ করেই দিব্যর কানে এল একটা চাপা হুঙ্কার আর মানুষের হাড়হিম করা গোঙানি। ও দেখল ওর ফোনের নেটওয়ার্ক একদম জিরো হয়ে গেছে। ও আর ফোনের ভরসায় থাকল না। পাগলের মতো চিৎকার করে দুই বন্ধুকে দিকনির্দেশনা দিল, “পরাগ! সৌভিক! ওই দিকে… জলাশয়ের দিক থেকে শব্দ আসছে! জলদি আয়! আওয়াজ লক্ষ করে দৌড়া!”

​কাঁটাঝোপ সরিয়ে সেই একটা সময় কালচে পোখরির সামনে এসে ওরা যখন পৌঁছাল একে একে। সকালের ফ্যাকাশে আলোয় ওদের চোখে তখন ধরা পড়ল এক আত্মা কাঁপানো দৃশ্য। সামনে একটা প্রকাণ্ড মরা ভালুক, আর তার ঠিক পাশেই রক্তে মাখামাখি হয়ে নিথর পড়ে আছে আশফি আর মারিশা।
​ “ও খোদা…!” আর্ত চিৎকার করে উঠে পরাগ পাগলের মতো দৌড়ে গিয়ে আশফির পাশে আছড়ে পড়ল।
​দিব্য আর সৌভিক তখন স্তম্ভিত। দৃশ্যটা দেখে দিব্যর হাত থেকে ফোনটা প্রায় খসে পড়ছিল। ওরা দেখতে পেল মারিশার বুকের ওপর নিস্তেজ হয়ে পড়ে আছে রক্তে ভেজা আশফির শরীরটা। মারিশাকেও দেখাচ্ছে কেমন ফ্যাকাশে। ওরা বেঁচে আছে তো আদৌ? ওদের কাছে ছুটে এল দুজন।
নিজের মচকানো পায়ের ব্যথা ভুলে চিৎকার করে বলে উঠল দিব্য, “পরাগ, মাথা ঠান্ডা কর! সৌভিক, ব্যাগ থেকে ফার্স্ট এইড কিট বের কর জলদি! বেশিক্ষণ এখানে থাকা বিপদ। রক্তের গন্ধ চিতা বা নেকড়ে টেকড়ে চলে আসতে পারে।”

কথা শেষ করেই ​ওরা তিনজন মিলে দ্রুত কাজে নেমে পড়ল। পরাগ আশফিকে আলতো করে মারিশার ওপর থেকে সরিয়ে নিচে শোয়াল। আশফির কাঁধের অবস্থা দেখে সৌভিকের মুখ রক্তশূন্য হয়ে গেছে। ভালুকের নখ আক্ষরিক অর্থেই ওর মাংস উপড়ে নিয়েছে, পেশীর তন্তুগুলো বীভৎসভাবে ঝুলে আছে।
পরাগ জলদি ওর নিজের ট্র্যাকিং জ্যাকেট খুলে ভেতর থেকে সিন্থেটিক টি-শার্টটা ছিঁড়ে ফেলল, “সৌভিক, প্রেশার দে! শক্ত করে চেপে ধর!”
ওরা দুজনে মিলে আশফির উপড়ানো মাংসের ক্ষতের ওপর গজ আর কাপড় দিয়ে প্রচণ্ড চাপ দিয়ে ধরল যাতে অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণ কমে। তারপর সৌভিক দ্রুত হাতে অ্যান্টিসেপটিক লিকুইড ঢালল ক্ষতের ওপর। অসহনীয় যন্ত্রণার চোটে অবচেতন আশফির শরীরটা একবার ধনুকের মতো বেঁকে উঠে আবার নিস্তেজ হয়ে গেল।
এদিকে দিব্য তখন মারিশা মারিশার পালস চেক করে দেখল পালস খুব ধীর। ওর কপালে আর ঠোঁটে গভীর নীল আভা। অতিরিক্ত আতঙ্ক আর শকে ও তখন প্রায় অচেতন। দিব্য দৌড়ে গিয়ে আঁজলা ভরে পোখরির বরফশীতল পানি এনে ওর মুখে-চোখে ঝাপটা দিতে শুরু করল।

​“মারিশা! এই মারিশা, চোখ খোলো! এই তাকাও, শুনতে পাচ্ছ? মারিশা?” ওর গালে আলতো আলতো চাপড় দিয়ে ডাকতে লাগল দিব্য৷ কিন্তু কোনো সাড়া নেই।
তারপরই সে খেয়াল করল মারিশার বাঁ কাঁধের জ্যাকেটটা চিরে গিয়ে ভেতর থেকে সাদাটে হাড়ের একটা আভা উঁকি দিচ্ছে। ভালুকের থাবাটা সরাসরি কাঁধের ওপর বসায় মাংসপেশিগুলো চিরে ফালি ফালি হয়ে গেছে। যদিও আশফির মতো একদলা মাংস ছিঁড়ে বেরিয়ে আসেনি, কিন্তু ক্ষতটা এতটাই চওড়া যে সেখান থেকে চুইয়ে রক্ত নামছে না, বরং স্রোতের মতো গড়িয়ে পড়ছে।
ঠিক তখনই যন্ত্রণায় কঁকিয়ে উঠে চোখ মেলল আশফি। ওর চোখের মণি দুটো রক্তবর্ণ, কপালে যন্ত্রণায় নীল শিরাগুলো ফুলে উঠেছে। প্রথম কয়েক সেকেন্ড ও কিছুই বুঝতে পারল না। চারপাশের জঙ্গল, বন্ধুদের চিৎকার আর ওর নিজের শরীরের অসহ্য জ্বলন — সবকিছু মিলেমিশে একটা বিভীষিকাময় ঘোরের মতো লাগছিল। মুখ দিয়ে কেবল একটা অস্ফুট গোঙানি বের হলো ওর, যেন ও এখনো সেই মৃত্যুর হিমশীতল সুড়ঙ্গে আটকে আছে।
​”আশফি! এই আশফি”, পরাগ ওর কাঁধের সুস্থ পাশে হাত দিয়ে জোরে ঝাঁকুনি দিল, “আমাদের দিকে তাকা… শ্বাস নে লম্বা করে!”

​আশফি তখন বিহ্বল হয়ে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল। ওর মস্তিষ্ক যেন স্মৃতির জট ছাড়াতে হিমশিম খাচ্ছে। কানে একটা তীব্র ভোঁ-ভোঁ শব্দ হচ্ছে, যেন কেউ ড্রাম বাজাচ্ছে মাথার ভেতরে। সেই ঘোরের মধ্যেই হঠাৎ ওর নজর পড়ল কয়েক হাত দূরে। দিব্য উন্মাদের মতো মারিশার মুখে পানির ঝাপটা দিচ্ছে, বারবার ওর নাম ধরে ডাকছে। কিন্তু মারিশা পাথরের মতো নিথর।
​মারিশার ওই নিস্পন্দ শরীরটা দেখা মাত্রই আশফির স্মৃতির দরজাগুলো এক ঝটকায় খুলে গেল। ওর মস্তিষ্কে হাজির হলো শেষ মুহূর্তগুলো, ভালুকের সেই মরণকামড়, আর তখন মারিশার নিভে আসা চোখ।
মনে পড়তেই ​বিড়বিড় করে উঠল আশফি, “মাহি…! ওর কী হয়েছে? ও ঠিক আছে তো?”
নিজের শরীরের ক্ষতবিক্ষত অবস্থা ওর কাছে তুচ্ছ হয়ে উঠল মুহূর্তেই। অমানুষিক এক চেষ্টায় উঠে বসার চেষ্টা করল, কিন্তু কাঁধের উপড়ানো মাংসের ক্ষতে টান লাগতেই মাংসের গভীরে যেন একশটা বিষাক্ত সুঁই একসাথে বিঁধে গেল। মুখ দিয়ে বেরোল এক হাড়হিম করা গোঙানি। তবুও ও থামল না। থরথর করে কাঁপতে থাকা শরীরটা টেনে নিয়ে হামাগুড়ি দিয়ে মারিশার কাছে কাছে যাওয়ার চেষ্টা করল। ওর ঘষটে যাওয়া শরীরের পেছনে সেই মুহূর্তে রক্তের একটা কালচে দাগ পড়ে যাচ্ছিল। কিন্তু ওর স্থির দৃষ্টি তখন মারিশার ওই নিথর দেহটার দিকেই।
​”কিরে? ও… ও সাড়া দিচ্ছে না কেন?” কাতরাতে কাতরাতে আশফি ভাঙা গলায় ডাকল মারিশাকে, “মাহি! এই মাহি? চোখ খোলো!”

বিরতিহীন ডাকতেই লাগল সে। ওর ব্যাকুলতা তখন নিজের শারীরিক যন্ত্রণাকে ছাপিয়ে গেছে। হাত বাড়িয়ে মারিশার গালটা ছুঁলো।
তারপর হঠাৎ তার ফ্যাকাসে মুখ আর নীল হয়ে আসা নখগুলো দেখে আশফির মাথায় হঠাৎ একটা বজ্রপাতের মতো আশঙ্কার উদয় হলো। মারিশা তো টাইপ-ওয়ান ডায়াবেটিক রোগী! চিন্তাটা আসতেই এবার যেন পাগলই হয়ে উঠল আশফি। নিমিষেই চিৎকার করে উঠল ও, ​”সৌভিক! পরাগ! জলদি কর! ওকে এখান থেকে সরা!”
চিৎকার করতে গিয়ে কাশতে শুরু করল। ফুসফুসে টান লাগল ওর, মুখ দিয়ে রক্তের তিতো স্বাদ উপচে পড়ল। তবু বলে গেল আহাজারি গলায়, “ওর ডায়াবেটিস আছে রে! ওর ব্লিডিং থামছে না। ও খোদা, কতক্ষণ ধরে ওর ব্লিডিং চলছে! এই ব্লিডিও তো ওর জন্য বিষ! আর দেরি হলেই ও তো শেষ হয়ে যাবে।”
তিন বন্ধুই অপ্রস্তুত হয়ে ওর দিকে তাকাল। তা দেখে আশফি মেজাজ হারাল। খেপে গেল মুহূর্তেই, হাঁপাতে হাঁপাতেই ব্যাখ্যা করতে লাগল, যেন ও একাই জানে মারিশার শরীরের ভেতরে এখন কী ধ্বংসলীলা চলছে, ​”ওরকম তাকিয়ে আছিস কেন তোরা? কী বলেছি বুঝিসনি? অতিরিক্ত ট্রমা আর এই ইনজুরিতে ওর শরীরে এখন কিটোঅ্যাসিডোসিস শুরু হয়ে যাবে। ওর ব্লাড সুগার এখন হয় একদম জিরোতে নেমে গেছে, নয়তো আকাশচুম্বী হয়ে গেছে…”
বলতে বলতে গলাটা বুজে আসতে চাইল ওর, “ডায়াবেটিকদের রক্ত সহজে জমাট বাঁধে না রে, ওর ইন্টারনাল ব্লিডিং থামবে না! ওর ব্রেইন অক্সিজেন পাচ্ছে না… ও কোমায় চলে যাচ্ছে! বেশিক্ষণ এই অবস্থায় থাকলে… ও আর ফিরবে না!”

পরাগ, দিব্য, সৌভিক স্পষ্ট দেখতে পেল আশফির রক্তবর্ণ চোখদুটোই পানি জমে গেছে। কান্না চেপে রাখতে গিয়েই গলাটা অমন বুজে আসছিল ওর৷ তবে আশফির এই আতঙ্কিত ব্যাখ্যা ওদের ভেতরেও এক অদ্ভুত হিমশীতল ভয় ঢুকিয়ে দিল। ওরাও বুঝতে পারল, মারিশার হাতে সময় একদম নেই।
​দিব্য আর এক মুহূর্ত দেরি করল না। কোনো কিছু না ভেবেই ও মারিশাকে আলতো করে পাজাকোলা করে বুকে জড়িয়ে নিল, “পরাগ, আমি নামছি! তোরা আশফিকে নিয়ে আয়!”
মারিশার নিস্তেজ মাথাটা দিব্যর কাঁধে ঝুলে পড়তেই আশফির বুকের ভেতরটায় হাহাকারের পাশাপাশি এক অদ্ভুত তপ্ত হিংসা আর অন্ধ অধিকারবোধে ফেটে পড়ল। ওর নিজের শরীর তখন আধমরা, কাঁধের মাংস ছিঁড়ে রক্তে কাদা মাখামাখি, নড়াচড়া করার ক্ষমতা নেই। তাও ও যেন এক লহমায় সব ভুলে গেল। এক অমানুষিক কষ্টে ও কাদার ওপর থেকে মাথাটা সামান্য উঁচিয়ে একটা হাত বাড়িয়ে ধরল, যেন ও দিব্যকে টেনে ছিঁড়ে ফেলবে। নিস্তেজ গলাতেই চেঁচিয়ে উঠল, “এই, তুই ওকে কোলে তুললি কেন? আমি বলেছি তোকে কোলে তুলতে? আমি থাকতে তুই আমার সামনেই ওকে কোলে তুলিস! এত সাহস তুই কই পাচ্ছিস, দিব্য?”

এমন পরিস্থিতিতে ওর এই প্রলাপ শুনে পরাগ আর সৌভিক একে অপরের দিকে তাকাল৷ বিস্ময় আর চরম বিরক্তিও ফুটে উঠল ওদের চোখেমুখে। একটা মানুষ মরতে বসেছে, অথচ এখনো তার দেমাগ আর হিংসা কমছে না! এই ছেলে তাহলে চারটা বছর কী করে থেকেছে, কেন অন্য কোনো নারীই তাকে আটকে রাখতে পারেনি, আর কেন বছরের পর বছর এমন বনে-বাদাড়ে, পাহাড়ে পাহাড়ে, তুষার ঝড়ে জীবনকে হেলাফেলা করে চড়ে বেরিয়েছে — তা আজও আরও ভালোভাবে পরিষ্কার হলো ওদের কাছে।
দিব্যও বিরক্ত হয়ে একবার আড়চোখে কাদার ওপর পড়ে থাকা রক্তে ভেজা আশফির দিকে তাকাল। ও কোনো উত্তর না দিয়ে, কেবল একটা অবজ্ঞার দৃষ্টি ছুড়ে মারিশাকে আরও শক্ত করে বুকে চেপে ধরল, “সৌভিক, একে নিয়ে আয়। আমি আর এক সেকেন্ডও এই পাগলের বাচ্চার বকবক শোনার জন্য দাঁড়িয়ে থাকব না। মারিশার পালস পাওয়া যাচ্ছে না!”

তারপর আশফির দিকে আর দ্বিতীয়বার না তাকিয়েই বড়ো বড়ো পা ফেলে চলতে শুরু করল। আর তা দেখে আশফি যেন আরও হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে পড়ল। ও কাদার ওপর নিজের শরীরটা হেঁচড়ে নেওয়ার চেষ্টা করল, যন্ত্রণায় ওর মুখ নীল হয়ে যাচ্ছে, তাও ওর মুখ থামল না, “দিব্য! কুত্তার ** কুত্তা! ওকে আমার কাছে আন বলছি! হারামজাদা, তোকে আমি দেখে নেব! নামা ওকে বলছি!”
আশফি আরও জোরে চিৎকার করতে চাইল, কিন্তু গলা দিয়ে কেবল ভাঙা গোঙানি বের হলো, “তুই কিন্তু আমি চিনিস, দিব্য? আমি দাঁড়াতে পারলেই তোকে আমি জ্যান্ত পুঁতে ফেলব বলে দিলাম!”
এবার দিব্যর ধৈর্য বাঁধ ভেঙে গেল। ওর চোয়াল শক্ত হয়ে এল রাগে। ঘুরে দাঁড়িয়ে এক ভয়ঙ্কর ধমক দিল, “চুপ কর শু** বা**! তোর জন্যই আজ ওর এই অবস্থা। তোর এই বালের জেলাসি এখন দেখালে আমিই তোকে এখানে পুঁতে দিয়ে যাব, শালা বান**।”
আশফি আবারও চেঁচিয়ে উঠবে, তার আগেই পরাগ এবার ওকে ধমক লাগাল, “চুপ করবি তুই? শয়তানের বাচ্চা, নিজেই বললি ওর কী ক্রাইসিস অবস্থা এখন। ব্লিডিঙে শেষ হয়ে যাচ্ছে। আর তাও এখানে জেলাসি দেখাচ্ছিস? দিব্য কোলে না নিলে কে নেবে এখন? তুই নিতে পারবি, হারামজাদা? নিজেকে দেখেছিস? তুই এখন একটা লাশ ছাড়া আর কিছু না!”

​সৌভিকও পাশে এসে দাঁড়াল। ও-ও তিক্ত গলায় বলল, “তোর গালাগাল বন্ধ কর, আশফি। ওকে দিব্য হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছে। পালিয়ে যাচ্ছে না কোথাও।”
​যন্ত্রণায় ছটফট করছিল আশফি। কিন্তু ওর চোখ তখনো কুয়াশার আড়ালে হারিয়ে যাওয়া দিব্যর পিঠের দিকে। ওদের কথা কানে ঢুকলেও ওর মনে চলতে থাকল একই জেদ, ওকে তোয়াক্কা না করেই দিব্য কেন মারিশাকে কোলে নিল… ও কেন ওকে বুকে চেপে ধরল? তবে দিব্যর বদলে অন্য কেউ হলে এভাবে যে খেপে যেত না সে, তা পরাগ আর সৌভিক বেশ বুঝতে পারল।
ওরা দুজন মিলে আশফিকে আক্ষরিক অর্থেই টেনে-হিঁচড়ে তুলে নিল। আশফির শরীরের পুরো ভর এখন বন্ধুদের কাঁধে। প্রতিটা পদক্ষেপে ওর উপড়ানো মাংসের ক্ষতটা যখন নিজের কাপড়ে বা বন্ধুদের গায়ে ঘষা খাচ্ছিল, তখন ও ব্যথায় কুঁকড়ে গিয়ে অস্ফুট স্বরে দিব্যর গুষ্ঠি উদ্ধার করে যাচ্ছিল, ​”কুত্তার *** দিব্য… তোর হাত ভেঙে যাক…! শালা জানোয়ার, তুই সব জেনেশুনেও ওর দিকে হাত বাড়ালি? আমার সাথে শত্রুতামি করলি! তুই আমার কিসের ভাই? তুই নামের কলঙ্ক! বহুত ছাড় দিয়েছি তোকে৷ একবার হাতের কাছে তোকে পাই, তোর বাপও তোকে বাঁচাতে পারবে না, শুয়োর!”

পাহাড়ের সেই পিচ্ছিল আর এবড়োখেবড়ো ঢাল বেয়ে ওরা নামতে শুরু করল। আশফির শরীরের রক্তে পরাগ আর সৌভিকের জ্যাকেট ভিজে একাকার হয়ে যাচ্ছিল। আশফি ব্যথায় গোঙাচ্ছিল ঠিকই, কিন্তু ওর অবশ হয়ে আসা মস্তিষ্কের কোথাও একটা কাঁটার মতো বিঁধতে লাগল, চার বছর আগের মতো আজ ও মারিশাকে বিপদ থেকে আগলাতে পারল না। বরং অন্য কেউ ওকে নিজের বাহুতে আগলে নিয়ে যাচ্ছে।
​বন থেকে সিডিং ট্রেইলহেডের রাস্তাটা সাধারণ মানুষের জন্য বড়জোর কুড়ি মিনিটের পথ, কিন্তু অকেজো শরীর আর কাঁধের বীভৎস ক্ষত নিয়ে আশফিদের নামতে নামতে প্রায় চল্লিশ মিনিট পার হয়ে গেল। জঙ্গল চিরে ওরা যখন সমতলে রাখা সেই পুরনো মাহিন্দ্রা জিপটার কাছে পৌঁছাল, ততক্ষণে ট্রেইলহেডের আকাশে ভোরের কাঁচা রোদ ফুটে উঠেছে।

​দিব্য আগেই পৌঁছে গিয়েছিল। ও মারিশাকে জিপের পেছনের বড় সিটটায় শুইয়ে দিয়েছে। মারিশার মাথাটা নিজের কোলের ওপর আলতো করে রেখে ও এক হাত দিয়ে ওর কপাল চেপে ধরে আছে, অন্য হাতে ট্র্যাকিং জ্যাকেটটা চেপে ধরে আছে মারিশার রক্তাক্ত কাঁধে। মারিশার সেই নীল হয়ে আসা মুখ আর নিথর শরীরটা দেখে যে কেউ ভাববে প্রাণপাখি বোধহয় উড়াল দিয়েছে।
​পরাগ আর সৌভিক যখন ধুঁকতে ধুঁকতে আশফিকে পাঁজাকোলা করে জিপের পেছনে টেনে তুলল, তখন আশফি প্রায় অচেতন। কিন্তু সিটে শোয়ানোর সময় ওর ঝাপসা নজরে পড়ল করুণ দৃশ্যটা, মারিশা শুয়ে আছে দিব্যর কোলে। ওই মরণাপন্ন অবস্থাতেও ওর ভেতরে সেই তপ্ত হিংসার আগুনটা দপ করে জ্বলে উঠল আবার। থরথর করে কাঁপতে থাকা একটা হাত দিয়ে দিব্যর জ্যাকেট খামচে ধরার বৃথা চেষ্টা করল। ওর শরীর তখন ঝুলে পড়ছে। কিন্তু ওর রক্তবর্ণ চোখ দুটো স্থির হয়ে রইল দিব্যর ওপর। এক অমানুষিক কষ্টে ও শেষবারের মতো বিড়বিড় করল, “ছাড় ওকে… দিব্য… হাত সরা বলছি… ওকে ছুঁবি না, জানোয়ার…”

চোখ গরম করে একবার শুধু ওর দিকে তাকাল দিব্য। ওর চোখে তখন আশফির জন্য কোনো দয়া নেই, কেবল একরাশ অবজ্ঞা আর বিরক্তি ছাড়া। কোনো জবাবই দিল না সে। বরং মারিশার মাথাটা আরও একটু সাবধানে নিজের দিকে টেনে নিল।

বুনো মেঘের হাতছানি পর্ব ২৪

​আশফির হাতটা নিস্তেজ হয়ে সিটের ওপর আছড়ে পড়ল। ওর চেতনার আলোটা ধীরে ধীরে নিভে আসছিল। অন্ধকারের এক অতল গহ্বরে তলিয়ে যাওয়ার ঠিক আগের মুহূর্তে ও শুধু দেখল, জিপটা তীব্র গতিতে স্টার্ট দিয়ে পাহাড়ি বাঁক পার হচ্ছে, আর দিব্য মারিশাকে বুকে জড়িয়ে রেখেছে।
কিন্তু মারিশা? মেয়েটার শরীর কেমন আরও বেশি নীল দেখাচ্ছে। অমন নীল হয়ে যাচ্ছে কেন ও? বেঁচে আছে তো পাগলটা? না-কি কোমাতে চলে গেল?

বুনো মেঘের হাতছানি পর্ব ২৫