Home ব্যাকুল হৃদয়ের প্রনয়িনী ব্যাকুল হৃদয়ের প্রনয়িনী পর্ব ২৫+২৬

ব্যাকুল হৃদয়ের প্রনয়িনী পর্ব ২৫+২৬

ব্যাকুল হৃদয়ের প্রনয়িনী পর্ব ২৫+২৬
তানিশা ভট্টাচার্য্য

রিসোর্টে পৌঁছে সবাই একে একে ফ্রেশ হচ্ছে। ঋষি পৌঁছেই তার বাবা কে ফোন করে জানিয়ে দিয়েছে যে তারা সবাই সুস্থ ভাবে পৌঁছে গেছে। তানভীরা যে রিসোর্টে আছে সেটা সাধারণত বেশ বড় জায়গা জুড়ে রয়েছে। এখানে থাকা-খাওয়ার পাশাপাশি বিনোদন, সুইমিং পুল এবং পার্কের ব্যবস্থা আছে। ফ্রেশ হয়ে এসে সবাই ক্লান্ত থাকার জন্য একটু বিশ্রাম করছে। ঋষি ঘুমিয়ে পড়েছে। তৃষাণ বিছানায় বসে চিপস্ খাচ্ছে। তানভী বেলকনিতে ছিল, রুমে আসতেই তৃষাণ আহ্লাদী কন্ঠে বলল

-“দিভাই চল না একটু পার্কে যাই প্লিজ।”
তানভীরও রুমে ভালো লাগছে না তাই সে বলল
-“ঠিক আছে চল।”
এরপর তানভী আর তৃষাণ বাবা মা কে বলে পার্কে গেল। তানভীদের যাওয়ার ৫ মিনিট পর ঋষির ফোনটা বেজে উঠল। ঋষি ঘুমের রেশ হাকলা হয়ে যায়। সে ঘুমের মধ্যে মাথার পাশে থাকা ফোনটা রিসিভ করল। ফোনের ওপাশের মানুষটির গলা পেয়ে তার সব ঘুম মুহূর্তের মধ্যে উধাও হয়ে যায়। সে ফোনটা যাহোক করে বেডসাইড টেবিলে রেখে, তড়িঘড়ি করে বিছানা থেকে নেমে রুমের বাইরে যেতে নিলে রুদ্র বাবু কিছুটা কপাল কুঁচকে চিন্তিত স্বরে জিজ্ঞেস করলেন

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

-“এভাবে কোথায় যাচ্ছো ? কিছু হয়েছে ?”
ঋষি আমতা আমতা করে বলল
-“ন…না আ…আঙ্কেল। বোনু আর তোজোর কাছে যাচ্ছি।”
-“সে ঠিক আছে। কিন্তু এভাবে কেন যাচ্ছো?”
ঋষি বিড়বিড় করে বলল
-“২ মিনিটের মধ্যে যেতে না পারলে… আমার কপালে দুঃখ আছে।”
-“কিছু বললে?”
-“ক..কই না তো”
এরমধ্যে দোয়েল ব্যানার্জী এসে ঋষিকে বলল
-“ঋষি বাবা গুল্লু আর তোজো কে ডেকে নিয়ে আসো তো। এক্ষুনি খাবার নিয়ে আসবে।”
ঋষি মাথা নাড়িয়ে চলে গেল। পার্কে তোজো একটা দোলনায় বসে আছে আর তানভী তাকে দোল দিচ্ছে। পুরো পার্কে বলতে গেলে তানভী তৃষাণ বাদে ৮-১০ জন মতো ছেলে আছে। বয়স সবার ২২-২৩ বছরের মধ্যে। হঠাৎ তানভীর ফোনটা বেজে উঠল। তানভী নাম না দেখেই রিসিভ করল। ফোনের ওপাশ থেকে কেউ একজন শক্ত কন্ঠে বলল

-“You have only 2 minutes এরমধ্যে তোজো কে নিয়ে রুমে না গেলে বাড়ি ফিরে সবার আগে তোকে তুলে এক আছাড় দেবো।”
কথাটা শুনে তানভীর বুঝতে বাকি রইল না যে এটা হতে পারে। তানভী যেন আকাশ থেকে পরল সে ভাবল
“আর্ভিক ভাই কিভাবে জানলেন যে আমি এখন পার্কে আছি ভাইয়ের সাথে”
তানভীর ভাবনার মাঝে আর্ভিক আবার শক্ত কণ্ঠের ধমক দিল
-“কি হল! কথা কানে যাইনি।”
তানভীর থতমতো খেয়ে গেল তারপর নিজেকে ধাতস্থ করে বলল
-“আপনি কি…”
কথাটা পুরো বলতে পারল না এর মাঝে আর্ভিক বলে উঠল
-“Only one minute left.”

এটা বলেই আর্ভিক ফোন কেটে দিল। তানভীর বুকের ভেতরটা ভয়ে ধড়ফড় করে উঠলো। সে দ্রুত দোলনায় বসে থাকা তৃষাণের হাতটা ধরে রীতিমতো প্রাণপণে দৌড় দিল। বেচারা তৃষাণ বোকার মতো তানভীর দিকে তাকিয়ে আছে। সে বুঝতে পারছে না যে তারা এভাবে দৌড়াচ্ছে কেন। আস্তে আস্তে ও তো যাওয়া যায়। তৃষাণের এত জোড়ে দৌড়াতে অনেক কষ্ট হচ্ছে। তাই সে তানভীকে বলল
-“দিভাই! একটু আস্তে। আমি আর দৌড়াতে পারছি না।”
তানভী তৃষাণের কথা কানে তুলল না। বরং আগের থেকে আরও দৌড়ানোর গতি বাড়িয়ে দিল। কে চায় আছাড় খেয়ে কোমড় ভাঙতে। তানভী দৌড়ানোর মাঝে তৃষাণের দিকে তাকিয়ে ভাবল
“ভাইরে! তুই-ই ভালো আছিস। আমার তো প্রাণ হাতে নিয়ে কোমড় সামলে ঘুরতে হয়। কখন না জানি তুলে আছাড় দিয়ে ভেঙে দেয়।”

এসব ভাবতে ভাবতে রিসোর্টের মেইন গেটের কাছে এসে তানভী আর তৃষাণ দেখল ঋষি দৌড়ে দৌড়ে তাদের দিকে আসছে। ঋষিকে আসতে দেখে তৃষাণ উত্তেজিত কন্ঠে বলল
-“ঋষি ভাইয়া তুমি আর দিভাই কি ম্যারাথনে যাবে? ওই জন্য এখন থেকে প্র্যাকটিস করছো ?”
ঋষি তৃষাণের কথায় পাত্তা দিল না। তানভীর দিকে তাকিয়ে ভীত স্বরে বলল
-“বোনু চল”
তানভী উপর নিচ মাথা নাড়িয়ে চলে গেল।

মথুরা কেবল একটি ভৌগোলিক স্থান নয়, এটি ভক্তি, প্রেম এবং ইতিহাসের এক অনন্য সঙ্গমস্থল। যমুনার কলতান আর মন্দিরের শঙ্খধ্বনিতে মুখরিত মথুরা এক চিরন্তন কাব্য। আজকে তানভীরা শ্রীকৃষ্ণের জন্মভূমি দর্শন করতে এসেছে। এটি মথুরার প্রধান আকর্ষণ। মনে করা হয়, এখানেই কংসের কারাগারে শ্রীকৃষ্ণ জন্মগ্রহণ করেছিলেন। বর্তমানে এখানে একটি বিশাল মন্দির কমপ্লেক্স রয়েছে, যার স্থাপত্য এবং আধ্যাত্মিক পরিবেশ অত্যন্ত গম্ভীর ও পবিত্র।
এরপর একে একে ওরা সবাই বিশ্রাম ঘাট, দ্বারকাধীশ মন্দির সব কিছু দর্শন করে সন্ধ্যা বেলায় তাড়াতাড়ি রিসোর্টে ফিরে এল। কারণ পরের দিন আবার বৃন্দাবনের জন্য রওনা দিতে হবে।

অক্টোবরের শেষ হিমেল পরশে মথুরার ভোর যেন এক মায়াবী কাব্য। যমুনার শান্ত জলে কুয়াশার পাতলা চাদর, আর মন্দিরে মন্দিরে বেজে ওঠা মঙ্গল আরতির শঙ্খধ্বনি বাতাসে পবিত্রতা ছড়ায়। ধূপের সুবাস আর আধো-আলোর সেই স্নিগ্ধতায় শ্রীকৃষ্ণের চরণে নিবেদিত ভোরের আলো এক অপার্থিব প্রশান্তি বয়ে আনে। আজ ভোরে তানভীরা বৃন্দাবনের জন্য যাত্রা শুরু করেছে। গাড়ি সবে ছেড়েছে তখনই রুদ্র বাবু তানভী কে বললেন

-“মামনি এই সুন্দর মনোরম ভোরে একটা গান শোনাবে ?”
তানভী মুচকি হেসে সম্মতি সূচক মাথা নাড়ল। তারপর শুরু করল
“শ্যাম-সুন্দর-গিরিধারী।
মানস মধু-বনে মধুমাধবী সুরে মুরলী বাজাও বনচারী॥
শ্যাম-সুন্দর-গিরিধারী
শ্যাম-সুন্দর-গিরিধারী।।”
প্রায় ২ ঘন্টা পর তানভীরা বৃন্দাবনের পবিত্র ভূমিতে পৌঁছাল। ততক্ষণে সকাল হয়ে গেছে। পুব আকাশে সিঁদুরে আভা ফুটতেই ভক্তদের ‘রাধে রাধে’ ধ্বনিতে জেগে ওঠে কুঞ্জবন। কদম শাখায় পাখির কলতান আর ধূপের সুবাসে মর্ত্য যেন এক টুকরো বৈকুণ্ঠ হয়ে ওঠেছে। এসব দৃশ্য তানভী মুগ্ধ নয়নে দেখতে ব্যস্ত।

পরন্ত বিকেলে পার্কের একটা বেঞ্চে অন্যমনস্ক হয়ে বসে কারোর জন্য অপেক্ষা করছে সোহাগ। দৃষ্টি তার ঝিলের জলে। এমন সময় এক পুরুষ এসে তার পাশে বসল। সেই পুরুষটি আস্তে করে সোহাগ কে ডাকল
-“সোহাগ!”
পুরুষটির ডাকে সোহাগ তার দিকে তাকাল। তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সামনের দিকে তাকাল। পুরুষটি গলা ঝেড়ে কোমল কন্ঠে বলল
-“আমাকে কী কারণে ডাকলে সোহাগ?”
সোহাগ অভিযোগ মিশ্রিত কন্ঠে জবাব দিল
-“আর কতদিন প্রেম? এবার তো আমার বাবার কাছে যাও আমার হাত চাইতে।”
সোহাগ একটু থেমে আবার বলা শুরু করল

-“তখন বেকার ছিলে বলে বারবার না করে ছিলে। আমিও জোর করিনি। কিন্তু এখন তুমি প্রতিষ্ঠিত। একজন আই.পি.এস পুলিশ অফিসার। এখন যেতে তোমার সমস্যা কোথায়?”
-“সোহাগ আমাকে আর একটু নিজেকে গুছিয়ে নেওয়ার সময় দাও। আমি তো বললাম যাব শুধু একটু সময় দাও।”
প্রেমের কথায় সোহাগ একটু রেগে গিয়ে বলল
-“৫টা বছর কী কম সময় ছিল? সাফ সাফ বলে দাও না যে আমাকে এখন আর ভালো লাগে না। তুমি অন্য কাউকে বিয়ে করতে চাও।”
সোহাগের এমন কথা শুনে প্রেম তাকে ধমক দিয়ে বলল
-“সোহাগ! তোমাকে কতবার বলবো তুমি আমার ভালো লাগা নয় তুমি আমার সবকিছু তুমি আমার প্রথম ভালোবাসা।”
সোহাগ প্রেমের ধমক শুনে কিছুটা থতমত খেল। তারপর নিজেকে স্বাভাবিক করে কন্ঠস্বর গম্ভীর করে বলল

-“এটা অক্টোবর মাস, নভেম্বর মাসের মধ্যে আমার বাবাকে বলতে না পারলে, তোমার সামনে দিয়ে অন্য কাউকে বিয়ে করে নেবো আমি। Mind it।”
সোহাগের কথায় প্রেম ভয় পেয়ে যায়। সে ভয় মিশ্রিত কাঁপা কাঁপা কন্ঠে বলল
-“ন..না.. আমি বলবো… আর্ভিক এলেই ওকে নিয়ে সোজা তোমার বাবার কাছে যাবো।”
-“তুমি কি করবে সেটা তোমার ব্যাপার। আমার বলার দরকার আমি বলে দিলাম।”
এই বলে সোহাগ সেখানে থেকে উঠে চলে গেল। প্রেম কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে সোহাগের যাওয়ার পানে তাকিয়ে রইল।

রাত ১১.৫৫ বাজে। তানভীর বাবা মা, তৃষাণ, ঋষি সবাই ঘুমাচ্ছে কিন্তু তানভীর ঘুম আসছে না। সে বিছানায় চুপচাপ শুয়ে আছে। দৃষ্টি তার সিলিং-এ। ১২টা বাজতেই তানভীর ফোনে একটা মেসেজ এল। তানভী মাথার কাছ থেকে ফোনটা নিয়ে দেখল আর্ভিকের নম্বর থেকে একটা মেসেজ এসেছে। তানভী ভাবল
“এত রাতে আর্ভিক ভাই কেন মেসেজ করেছেন?”
তানভী কৌতুহল বশত মেসেজটা ওপেন করল। সে দেখল আর্ভিক তাকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানিয়েছে।
My dear Orchid,

সময়ের হিসেবে তুমি আমার চেয়ে আট বছরের ছোট হতে পারো, কিন্তু আমার হৃদয়ের প্রতিটি স্পন্দনে তোমারই পূর্ণ অধিকার। তুমি আমার জীবনের সেই স্নিগ্ধ সকাল, যাঁর আগমনে আমার ধূসর পৃথিবীটা রঙিন হয়ে ওঠে। তোমার ওই সতেজ প্রাণবন্ততা আর নিষ্পাপ হাসি আমার প্রবীণ অভিজ্ঞতায় নতুন করে বাঁচার রসদ দেয়।
শুভ জন্মদিন আমার রাজকন্যা! মহাদেবের কাছে প্রার্থনা করি, তোমার আগামীর প্রতিটি পথ চলায় ঝরে পড়ুক শিউলি ফুলের শুভ্রতা আর জীবন ভরে উঠুক পরম সুখে। তোমার হাসিতেই আমার পূর্ণতা।
এরপর আস্তে আস্তে সকাল হল। রুদ্র বাবু, ঋষি তৃষাণ, তানভীর মা তাকে শুভেচ্ছা জানালেন। এরপর রিকি, মেঘাদ্রি, অভিক সাহেব আর্ভিকের মা সকলে একে একে তানভী কে ফোন করে শুভেচ্ছা জানালেন।

অক্টোবরের এক মায়াবী ভোরে বৃন্দাবন যেন এক জীবন্ত কবিতা। শরতের হালকা কুয়াশা যমুনার বুক ছুঁয়ে আলতো করে ভেসে বেড়ায়, যেন কৃষ্ণের অঙ্গে সাদা চাদর। মন্দিরে মন্দিরে বেজে ওঠা মঙ্গল আরতির শঙ্খধ্বনি আর ঘণ্টা কাঁপন ধরিয়ে দেয় বাতাসে। বকুল আর শিউলি ফুলের স্নিগ্ধ সুবাসে ভরে ওঠে কুঞ্জবনের সরু গলিগুলো। ঘাসের ডগায় জমে থাকা শিশিরবিন্দু ভোরের প্রথম সূর্যের আলোয় মুক্তোর মতো ঝিলমিল করে। আকাশ জুড়ে পেঁজা তুলোর মতো মেঘ আর নিচে ভক্তদের কণ্ঠে ‘রাধে রাধে’ সুর—সব মিলিয়ে এক অপার্থিব প্রশান্তি। বৃন্দাবনের এই সকাল কেবল সময়ের পরিবর্তন নয়, যেন এক আধ্যাত্মিক জাগরণ।

এমন মুগ্ধকর সকাল বেলায় তানভীরা বাঁকে বিহারী মন্দিরে ভগবানের দর্শনের জন্য গিয়েছে। আজ তানভী ক্রিম আর লাল রঙের কম্বিনেশনের একটা গোপী ড্রেস পড়েছে। তানভীর আজ জন্মদিন সেটা জানার পর মন্দিরের পুরোহিত তানভীকে বিহারীজির একটা বাঁশি উপহার দিলেন। তানভী সেটা হাতে নিয়ে প্রনাম করে কোমড়ে থাকা ওড়নায় গুঁজে রাখল। তারপর তারা বাঁকে বিহারী মন্দির থেকে বের হয়ে প্রেম মন্দিরে গেল। সব মন্দির দর্শনের পর একটা মন্দিরে তানভীর নামে ভোগ-প্রসাদ ও বস্ত্র বিতরণ করা হল। তারপর একে একে নিধুবন,সেবা কুঞ্জ,কালীয় দহ,কেশী ঘাট দর্শন করল। সবশেষে রুদ্র বাবু তানভীকে বললেন

-“মামনি সবই তো হলো এবার বলো কি চাই তোমার?”
তানভী মাথা নিচু করে একটু আমতা আমতা করে বলল
-“বাবা…মানে… আসলে… আমার অনেক দিনের ইচ্ছা ছিল একটা গোপাল নেওয়ার…তো বৃন্দাবন এসেছি যখন…”
রুদ্র বাবু বুঝে গেলেন যে ওনার মেয়ে কি চায়। তাই তিনি তানভীর পুরো কথা শেষ না করতে দিয়ে হেসে তার মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন
-“আচ্ছা বেশ! আমার মামনির ইচ্ছা আমি অবশ্যই পুরন করবো।”
এরপর ঋষি তানভীকে বলল
-“বোনু কি চাই শুধু একবার বল!”
তানভীর একগাল হেসে ঋষি কে বলল
-“ভাইয়া আমার কিচ্ছু চাই। তুমি সারা জীবন আমার পাশে থেকো। তাতেই হবে।”

এরপর তানভীরা গোপালের বিগ্ৰোহ নেওয়ার জন্য রঙ্গনাথ মন্দিরের দিকে রওনা দিল। আজকে বিকালে বৃন্দাবনের বাজারে প্রচন্ড ভীড় হয়েছে। রুদ্র বাবু তানভী আর তৃষাণের হাত শক্ত করে ধরে ছিলেন। কিন্তু এতটা ভীড় ছিল, কখন যে তানভীর হাতটা ছেড়ে গিয়েছে বুঝতেই পারেননি। তানভী তাদের থেকে পুরোপুরি আলাদা হয়ে যায়। এমন পরিস্থিতিতে সে কি করবে বুঝতে পারছে না। সে এখানে তো কিছুই চেনে না জানে না। এক পর্যায়ে তানভী ভয়ে কান্না করে দেয় আর মনে মনে কৃষ্ণকে স্মরণ করতে করতে একটা ঘাটের কাছে গিয়ে বসে পড়ে।
এদিকে রঙ্গনাথ মন্দিরের কাছাকাছি একটা ঠাকুরের মূর্তির দোকানে পৌঁছে রুদ্র বাবু তানভী কে ডাকতে গিয়ে দেখেন যে তানভী নেই। তিনি চিন্তিত হয়ে দোয়েল ব্যানার্জী কে বললেন

-“মামনি কোথায়?”
-“কোথায় মানে! তোমার সাথেই তো ছিল।”
দোয়েল ব্যানার্জী কপাল কুঁচকে চিন্তিত স্বরে বললেন। রুদ্র বাবু কাঁপা কাঁপা কন্ঠে বললেন
-“নে….নেই তো”
দোয়েল ব্যানার্জী শব্দ কান্না করে দেন। তিনি কান্না মিশ্রিত কন্ঠে বললেন
-“আমি জানি না আমার মেয়ে কে আমার কাছে এনে দাও।”
রুদ্র বাবু ওনার স্ত্রীকে শান্তনা দিতে দিতে একটা জায়গায় বসিয়ে বললেন
-“শান্ত হও আমি দেখছি।”
তারপর বিড়বিড় করে বললেন

“এত বড় বৃন্দাবনে‌ মামনি কে আমি কোথায় খুঁজব? হে রাধামাধব! আমার মেয়ে কে আমার কাছে এনে দাও।”
রুদ্র বাবুর চোখ থেকে নিঃশব্দে জল গড়িয়ে পড়ল। সময় যত এগিয়ে যাচ্ছে দোয়েল ব্যানার্জীর কান্না ততোই বেড়ে চলেছে। ঋষি আর রুদ্র বাবু তানভী কে তন্ন তন্ন করে খুঁজছেন। তৃষাণও তার মায়ের পাশে বসে কান্না করছে। তৃষাণ ছোট হলে কি হবে তানভী তৃষাণের নয়নের মনি। তার একমাত্র দিদি তানভী,তার প্রাণ।

অনেকক্ষণ ধরে ঘাটে মাথা নিচু করে বসে কান্না করছে তানভী। চোখ মুখ লাল হয়ে গেছে। ঘাটে যমুনা থেকে আসা দমকা হাওয়ায এলোমেলো ভাবে ছুঁয়ে যাচ্ছে তাকে। এমন সময় একটা বাচ্চা ছেলের কন্ঠস্বর শুনে মাথা তুলে তাকাল তানভী। তানভী দেখল, একটা ছোট বাচ্চা অসম্ভব সুন্দর তার রুপ ছটা। ছেলেটা ৩ থেকে ৪ বছরের মধ্যে বয়স হবে। পরনের একটা ক্রিম কালারের হাফ হাতা পাঞ্জাবী, হলুদ ধুতি, কোমড়ে একটা গাঢ় লাল রঙের ওড়না বাঁধা, সোনালী রঙের বডার দেওয়া তাতে। কপালে বৈষ্ণব তিলোক। একটা মাঝারি সাইজের বাঁশি সেখানে গুঁজে রাখা বাঁশিটার শেষের দিকে একটা ময়ূরের পালক লাগানো। হাতে পায়ে সোনার বালা আর নূপুর, নগ্ন পা। মাথার চুল গুলো মাঝারি আর এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে হাওয়ায়। মুখে একগাল হাসি নিয়ে তানভীর দিকে তাকিয়ে আছে। সেই হাসি দেখলে যেন জীবন ধন্য। ছেলেটা তানভীর একটু কাছে এসে বলল

-“সখী, তুমি কাঁদছো কেন?”
তানভী তার কান্নার কারণ বলতে যাবে তার আগেই ছেলেটা বলল
-“আমি জানি তোমার বাবা মা কোথায় আছে। চলো আমি নিয়ে যাচ্ছি তোমাকে।”
এই বলে ছেলেটা তানভীর বাম হাতটা আলতো করে ধরল। তানভী ছেলেটার কথা শুনে পুরোই অবাক হয়ে গেল। সে মনে মনে ভাবল
“এই ছেলে এসব কি ভাবে জানল।”
ছেলেটা তানভীর দুচোখের জল মুছে একটু হেসে বলল
-“কি ভাবছো? আমি কি ভাবে জানলাম?”
তানভী অবাক নয়নে তাকিয়ে আছে তার দিকে। ছেলেটা আবার একগাল হেসে বলল

-“আমি সব জানি। চল দেরি হয়ে যাচ্ছে। তোমার বাবা মা চিন্তা করছে।”
তানভী ছেলেটার কথা শুনে পুরোই আবাক হয়ে যাচ্ছে। সে ছেলেটা কে বলল
-“তোমার নাম কী ছেলে?”
ছেলেটা তানভীর হাত ধরে তাকে বসা থেকে তুলতে তুলতে বলল
-“যেতে যেতে কথা বলি।”
এরপর ছেলেটা তানভীর হাত ধরে এগিয়ে যেতে লাগে। কিন্তু কি আশ্চর্য ব্যাপার! অত ভীড়, মুহূর্তের মধ্যেই সব ফাঁকা হয়ে গেল। তানভী যেন একটা ঘোরের মধ্যে আছে আর বাচ্চাটার হাত ধরে এগিয়ে যাচ্ছে। তানভী কিছুটা গিয়ে বাচ্চাটাকে জিজ্ঞেস‌ করল
-“তোমার নামটা বললে না তো!”
বাচ্চাটা তানভীর দিকে তাকিয়ে একগাল হেসে বলল
-“আমার নাম কেশব”
-“কোথায় থাকো তুমি?”
বাচ্চাটা তানভীর কথায় খিলখিল করে হেসে বলল
-“আমি সব জায়গায় থাকি”

তানভী কেশবের কথার কোনো মানে খুঁজে পেল না। সে ভাবল ‘বাচ্চা মানুষ কি বলতে কি বলেছে’। এরপর দুজনের মধ্যে আর কোনো কথা হলো না। প্রায় আধঘন্টা হাঁটার পর কেশব তানভীকে রঙ্গনাথ মন্দিরের কাছাকাছি নিয়ে এল। সেখানে একটা দোকানকে ঘিরে প্রচুর ভীড়। কেশব তানভীর হাত ধরে এগিয়ে নিয়ে গেল সেদিকে। তারা ভীড় ঠেলে এগিয়ে গিয়ে দেখল তানভীর মা আর তোজো দুজনেই অঝোরে কাঁদছেন তার জন্য। তানভী কেশবের হাত ছেড়ে দৌড়ে গিয়ে তার মা কে জড়িয়ে ধরল। সেও ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। তানভীকে সুস্থ সবল অবস্থায় পেয়ে তানভীর মা আর তৃষাণ দুজনেই তাকে জড়িয়ে ধরল। সেই মুহূর্তে ঋষি আর রুদ্র বাবু তানভী কে না পেয়ে হতাশ হয়ে ফিরে এসে দেখল তানভী তার মা আর তৃষাণকে জড়িয়ে কান্না করছে। ঋষি দৌড়ে এসে তানভীর সামনে দাঁড়ায়। তার দুই চোখ বেয়ে অনবরত জল গড়িয়ে পড়ছে। কিন্তু মুখে বোন কে ফিরে পাওয়ার তৃপ্তির হাসি। রুদ্র বাবু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে মনে মনে ভগবান কে অসংখ্য ধন্যবাদ জানালেন।
এরপর রুদ্র বাবু তানভী কে বললেন

-“মামনি কোথায় চলে গেছিলে?”
তানভী সহসা জবাব দিল
-“বাবা ওই ভীড়ে আমার হাত ছেড়ে গিয়েছিল আর আমি তোমাদের থেকে আলাদা হয়ে গিয়েছিলাম। আমি কি করব বুঝতে পারছিলাম না আমার ফোনটাও আমার কাছে ছিল না মায়ের ব্যাগে ছিল। একটা ঘাটের কাছে গিয়ে বসে কান্না করছিলাম, তখন একটা বাচ্চা ছেলে ওর নাম কেশব। সে আমাকে পথ দেখিয়ে এখানে নিয়ে এল।”
তানভীর কথা শুনে উপস্থিত সকলের অবাক হয়ে যায়। রুদ্র বাবু জিজ্ঞাসু কন্ঠে বললেন
-“কোথায় সে বাচ্চা ছেলেটা?”
-“এই তো বাবা এখা….”

তানভী কথাটা বলতে বলতে পিছনে ফিরে তাকিয়ে দেখে কেশব নেই। তানভী বসা থেকে উঠে তাকে খুঁজতে গেল। ঋষিও তার পিছন পিছন গেল। কিন্তু তারা কেউ বাচ্চাটাকে পেল না। তানভী আর ঋষি সেই জায়গায় ফিরে এল। সেখানে কিছু লোক নিজেদের মধ্যে কি সব আলোচনা করছিল। তাদের মধ্যে থেকে একজন লোক রুদ্র বাবু কে বলল
-“বাচ্চা নাহি মিলে গা। ও কই মামুলি বাচ্চা নাহি থা। ও সোয়াম হামারে লাড্ডু গোপাল জি থে। জিনোনে আপ লোগো কি মাদাদ কি। হামারে বৃন্দাবন মে এসে কিসসে আকসার হতে রায়তে হ্যাঁ।”
আরো একজন বলল
-“আপকি বেটি বহুত ভাগ্যেশালী হ্যাঁ ভাইসাব। সোয়াম লালা জি নে ওসকি মাদাদ কি।”
তারপর একে একে সকলে চলে গেল সেখান থেকে।তানভীরাও একটা মূর্তির দোকানে গেল। সেখানে গিয়ে তানভী একটা ১৬ নম্বর শিশু রুপ লালার বিগ্ৰোহ নিল। বিগ্ৰোহটা অনেক সুন্দর। একটা ১ বছরের বাচ্চা বসে থাকলে যতটা হাইট বিগ্ৰোহটারও ততটা হাইট।

আজকে তানভীদের বাড়ি ফেরার দিন। তারা বৃন্দাবনের পবিত্র ধুলো মেখে যখন ফেরার পথ ধরেছে, তখন ভোরের আকাশটা যেন এক অদ্ভুত মায়াবী রঙে সেজে উঠেছে । যমুনার শান্ত জলে ভোরের প্রথম সূর্যচ্ছটা যেন রাধারানি আর কৃষ্ণের অলৌকিক প্রেমের মহিমা প্রচার করে। বাঁশির সুর তখন বাতাসে নেই বটে, কিন্তু মন্দিরের ঘণ্টার ধ্বনি আর ধূপের সুবাস মনের মণিকোঠায় এক গভীর প্রশান্তি বুনে দেয়।

ব্যাকুল হৃদয়ের প্রনয়িনী পর্ব ২৩+২৪

নিধুবনের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় তাদের মনে হচ্ছিল, প্রতিটি বৃক্ষ আর লতা যেন তাদের এই বিদায়বেলায় কানে কানে বলছে— “আবার এসো।” হৃদয়ে একরাশ ভক্তি আর চোখে এক ফোঁটা জল নিয়ে যখন বৃন্দাবনের মাটি ছাড়ল, তখন তানভীর মনে হচ্ছে তার প্রাণটা হয়তো এই কুঞ্জবনেই রয়ে গেছে। যান্ত্রিক জীবনে ফিরলেও, সঙ্গে নিয়ে যাচ্ছে এক টুকরো স্বর্গীয় বৃন্দাবন। আর তানভী এই সতেরো বছরের জন্মদিনটা চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে তার কাছে।

ব্যাকুল হৃদয়ের প্রনয়িনী পর্ব ২৭+২৮