Home ব্যাকুল হৃদয়ের প্রনয়িনী ব্যাকুল হৃদয়ের প্রনয়িনী পর্ব ৪১+৪২

ব্যাকুল হৃদয়ের প্রনয়িনী পর্ব ৪১+৪২

ব্যাকুল হৃদয়ের প্রনয়িনী পর্ব ৪১+৪২
তানিশা ভট্টাচার্য্য

আর্ভিকদের গ্ৰামে আসতে প্রায় বিকেল হয়েগেছে। বিকেলের সোনাঝরা রোদ তখন অভিক সাহেবদের গ্ৰামের বাড়ির পুরোনো আমলকির বাগান মাড়িয়ে বাড়ির কারুকার্যময় ফটকের ওপর লুটিয়ে পড়েছে। তোরণদ্বারে শ্যাওলাধরা পাথরের ওপর খোদাই করা নামটা এখনো আভিজাত্যের সাক্ষী দিচ্ছে—‘রায়চৌধুরী এস্টেট’। রায়চৌধুরী এস্টেটের ভেতরটা যেন এক জীবন্ত রূপকথা। চওড়া বারান্দা, লাল মেঝের বিশাল বিশাল ঘর আর কড়িকাঠের কড়িডোরগুলো ইতিহাসের গল্প বলে। বাড়ির পেছন দিকেই বিশাল এক টলটলে পুকুর, যার ঘাটে নামলে পদ্মফুলের সুবাস নাকে লাগে।

পরপর তিনটে গাড়ি এসে যখন বাড়ির সামনে থামল, তখন স্তব্ধ গ্রাম্য নিস্তব্ধতা ভেঙে একঝাঁক কোলাহল ছড়িয়ে পড়ল চারদিকে। গাড়ি থেকে নেমেই সবাই হাঁ করে তাকিয়ে রইল বিশাল অট্টালিকাটার দিকে। বিশাল বড় এলাকা জুড়ে বিস্তৃত জমিদার বাড়িটা। আর গ্ৰামের এত সুন্দর মনোরম প্রকৃতি দেখে ওদের সবার চোখ জুড়িয়ে গেল।
ঠিক সেই মুহূর্তে বাড়ির সামনের ঝকঝকে উঠানে একটি আরামকেদারায় বসে থাকতে দেখা গেল এক বৃদ্ধাকে। তিনি বেশ আয়েশি ভঙ্গিতে হাতের লাঠি উঁচিয়ে কাজের লোকদের নির্দেশ দিচ্ছেন বাগান পরিষ্কারের জন্য। এই বৃদ্ধা হলেন অভিক সাহেবের মা, এই বিশাল সাম্রাজ্যের বর্তমান অভিভাবিকা। অভিক সাহেবের বাবার মৃত্যুর পর যখন অভিক সাহেবরা শহরে যেতে চাইলেন, তখন ওনার মা সাফ জানিয়ে দিয়েছিলেন—যে মাটিতে তাঁর সিঁথির সিঁদুর মুছেছে, যে ভিটের ঘ্রাণে তাঁর স্বামীর অস্তিত্ব মিশে আছে, ওনার শেষ নিশ্বাস অবধি তিনি সেখানেই থাকবেন।
গাড়ি থেকে নেমে দোয়েল ব্যানার্জী, রাখী রায়চৌধুরী এবং পর্ণা দেবী গিয়ে বৃদ্ধা কে প্রনাম করলেন বৃদ্ধা ওনাদের পরম মমতায় জড়িয়ে ধরলেন। রুদ্র বাবুর বাবা-মা অকালে চলে যাওয়ার পর এই মহিলাই তাঁকে নিজের সন্তানের মতো আগলে মানুষ করেছেন। অবাক করার মতো বিষয় হলো, রুদ্র বাবুর মায়ের সাথে এই বৃদ্ধার সখ্যতা ছিল সেই বাল্যকাল থেকে; দুই প্রিয় বান্ধবী একই গ্রামে দুই সম্পন্ন পরিবারে ঘর বেঁধেছিলেন। তাই রুদ্র বাবু বৃদ্ধা কে সইমা ডাকেন।

বৃদ্ধা সবাই কে ভেতরে আসার জন্য বললেন। তখনই বৃদ্ধার নজর স্থির হলো সবার পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা সপ্তদশী তানভীর ওপর। বৃদ্ধার চোখ দুটো মুহূর্তেই ভিজে উঠল। তিনি ধীর পায়ে তানভীর কাছে এগিয়ে এলেন। কাঁপাকাঁপা হাতে তানভীর থুতনি ছুঁয়ে আদর করে অশ্রুভেজা কণ্ঠে বললেন
-“একদম তোর বাবার মতো দেখতে হয়েছিস তুই! ঠিক যেন সেই পুরোনো মুখখানা ফিরে এলো। কী সুন্দর মায়াবী রূপ… আয় মা, ভেতরে আয়।”
বড়রা সবাই বাড়ির ভেতরে ঢুকে গেল। এস্টেটের উঠানটা এখন তরুণ বাহিনীর দখলে। আর্ভিক বাদে বাকি সবাই তখন জমিদার বাড়ির স্থাপত্য দেখে মুগ্ধ, কিন্তু সেই মুগ্ধতা বেশিক্ষণ টিকল না রিকির কারণে। গাড়ি থেকে নিজের বিশাল লাগেজটা নামাতে গিয়ে রিকি ধপাস করে উল্টে পড়ল। সেটা দেখে মেঘাদ্রি একচোট হেসে নিয়ে বলল

-“কিরে রিকি, জমিদার বাড়িতে ঢোকার আগেই কি মাটি কামড়ে প্রণাম করা শুরু করলি? এই রায়চৌধুরী এস্টেটের প্রতি ভক্তি তো তোর দেখি উপচে পড়ছে!”
রিকি ধুলো ঝাড়তে ঝাড়তে মুখ বাঁকিয়ে বলল
-“ভক্তি নয় রে, এটা স্ট্র্যাটেজি। মাটির কন্ডিশন চেক করছিলাম।”
প্রেম তখন সোহাগের রাগ ভাঙানোর শেষ চেষ্টা হিসেবে ওর ব্যাগটা তুলে নিতে গেল। সোহাগ কটমট করে তাকিয়ে বলল,

-“থাক, আইপিএস অফিসারকে আর কুলিগিরি করতে হবে না। যেভাবে দেরি করে এসে আমাদের লেট করিছেন, তখন দেখা যাবে লাগেজ নিয়ে ঘরের ভেতর যেতে সকাল হয়ে যাবে।”
পাশ থেকে তৃষাণ মোবাইলে গেম খেলতে খেলতে নির্লিপ্ত গলায় বলল
-“সকাল হলেও সমস্যা নেই, ওই ব্যাগে সোহাগ দির মেকআপ কিট আছে। সেটা সময় মতো পৌঁছে দিলেই হবে।”
তৃষাণের কথায় হাসির রোল উঠতেই আর্ভিক এক ধমক দিল।
-“হাসি থামিয়ে ব্যাগগুলো তোল। তৃষাণ গেমটা এবার বন্ধ কর। আর রিকি, তোর ওই মাটি পরীক্ষা শেষ হলে ভেতরে আয়, নয়তো রাতটা ওই রাস্তার কুকুরটার সাথেই কাটাতে হবে।”
আর্ভিকের ধমকে সবাই তড়িঘড়ি ব্যাগ নিয়ে ভেতরে ঢোকার প্রতিযোগিতায় নামল। ভিড়ের চাপে তানভী আর্ভিকের একদম গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে পড়ল। আর্ভিক আড়চোখে তানভীর লাল হয়ে যাওয়া মুখটা দেখে নিঃশব্দে মুচকি হাসল। তানভী কোনোমতে একটা ঢোক গিলে ব্যাগটা জাপ্টে ধরে মেঘাদ্রির পেছনে লুকানোর চেষ্টা করল। পুরো দলটা হাসাহাসি আর খুনসুটি করতে করতে ভেতরে ঢুকল।
এস্টেটের অন্দরমহলে পা রাখতেই সবার চোখ ছানাবড়া। ঘর তো নয়, যেন একেকটা আস্ত ফুটবল মাঠ! কিন্তু সমস্যাটা শুরু হলো তখন, যখন ঠাকুমা লাঠি ঠুকে ঘোষণা করলেন,

-“বড়রা সব ওপরতলার পুবের সারিতে থাকবে, আর তোরা এই বাঁদরবাহিনী সব নিচতলার বৈঠকখানার পাশের ঘরগুলোতে থাকবি।”
আর্ভিক মুচকি হেসে বলল
-“ঠাম্মি, ঘর তো অনেক, কিন্তু এদের এক একটা ঘরে একা রাখলে ভুতের ভয়ে আধমরা হয়ে যাবে। তার চেয়ে বরং কিছু কিছু জন মিলে একসাথে থাকাই ভালো।”
ঘর বণ্টনের দায়িত্বটা আর্ভিক নিজের কাঁধে নিতেই রণক্ষেত্র তৈরি হলো। আর্ভিক গম্ভীর গলায় বলল
-“তৃষাণ, ঋষি আর নীলাদ্রি—তোরা ওই বড় ঘরটায় যা। প্রেম আর পবিত্র থাকবি পাশেরটায়।”
তৃষাণ সাথে সাথে প্রতিবাদ করে উঠল
-“আর্ভিক ভাইয়া, প্রেম দাদার সাথে পবিত্র দাদা কে দিও না! প্রেম দাদা সারারাত সোহাগ দিদির সাথে ফোনে ঝগড়া করবে, আর বেচারা পবিত্র দাদার ঘুমের বারোটা বাজবে।”
প্রেম একটা বালিশ ছুড়ে মারল তৃষাণের দিকে
-“এই পাকা ছেলে! তুই গেম খেলিস সেটা বুঝি খুব সাইলেন্ট মোডে?”
অন্যদিকে, মেয়েদের ঘরে থাকবে তানভী, মেঘাদ্রি, পেখম, সোহাগ। সবার ঘর বন্টন করা হলেও রিকি কোথায় থাকবে সেটা আর্ভিক বলে নি তাই রিকি বলল

-“আমি কোথায় থাকব‌ দাদা?”
আর্ভিক রিকির দিকে তাকিয়ে একটা বাঁকা হাসি দিল, তারপর বলল
-“রিকি তুই তো বীর পুরুষ। তুই একাই ওই শেষ মাথার ঘরটায় থাকবি।”
রিকির মুখটা মুহূর্তেই শুকিয়ে গেল। ও দেয়ালের ঝোলানো এক বিশাল তৈলচিত্রের দিকে তাকিয়ে ঢোক গিলে বলল
-“না মানে… দাদা, একা থাকাটা ঠিক হবে না। আমাকে বাকিদের সাথে দাও।”
আর্ভিক বলল
-“বাকিদের জিজ্ঞাসা কর তারা যদি রাজি থাকে তাহলে তুই থাকতে পারিস”
রিকি কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল কিন্তু তখনই বাকি সব ছেলে গুলো সাফ জানিয়ে দিল যে তারা রিকি কে নেবে না। রিকি অসহায় দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল তাদের দিকে। আর্ভিক বলে উঠল
-“শুনে নিয়েছিস! এবার নিজের ঘরে যা”
রিকি করুন কন্ঠে বলল

-“তানভীদের ঘরে….আমি মেঝেই শুয়ে থাকব, তাও ওদের সাথে থাকব।”
আর্ভিক কঠোর কন্ঠে বলল
-“না মেয়েদের ঘরে থাকা যাবে না।”
রিকি অসহায়ের মতো মাথায় হাত দিয়ে বসে আছে। তানভী তার করুন অবস্থা দেখে আর্ভিক কে বলল
-“আর্ভিক ভাই, রিকি থাকুক না সমস্যা হবে না আমাদের।”
তানভীর সম্মতি শুনে রিকি কে আর ধরে কে। সে যেন পারলে আনন্দে নেচে ওঠে। সে গাল ভর্তি হাসি নিয়ে তাকিয়ে আছে আর্ভিকের দিকে। আর্ভিক কটমট করে রিকির দিকে তাকাতেই রিকির মুখের হাসি দপ করে নিভে গেল। তারপর রিকির দিক থেকে দৃষ্টি সরিয়ে আর্ভিক তানভীর দিকে তাকিয়ে গম্ভীর কন্ঠে বলল
-“থাকুক! কিন্তু কেউ বাঁদরামি যদি মেরেছে তাহলে আমি তোকে তুলে আছাড় মারব। তাতে তোর দোষ থাকুক বা না থাকুক। মনে থাকে যেন। এখন সব যে যার রুমে যা ফ্রেশ হয়ে আয়।”
আর্ভিকের কথা শুনে তানভী‌ বিড়বিড় করে বলল

-“যত দোষ নন্দ ঘোষ! কিছু হলেই আমাকে আছাড় মারার হুমকি দেবে।”
আর্ভিক যখন সেখানে থেকে উঠে যাবে, তখনই রিকি করুণ সুরে ডাকল
-“দাদা, রাতে যদি ভয় পাই, তোমার ঘরে আসতে পারি?”
আর্ভিক যেতে যেতে বলল
-“অবশ্যই আসবি। বসিয়ে সারা রাত অঙ্ক করাব।”
আর্ভিকের কথা শুনে রিকি বিড়বিড় করল
-“তার চেয়ে ভূতের হাতে মরা ভালো! অন্তত সারারাত অঙ্ক করতে হবে না।”
তানভী আর মেঘাদ্রি হেসেই কুটিপাটি। রায়চৌধুরী এস্টেটের সেই বিশাল ঘরে তখন হাসির হুল্লোড় আর খুনসুটি মিলেমিশে একাকার হয়ে গেল।

রাতে বিশাল ডাইনিং টেবিলে তখন রাজকীয় আয়োজন। আজ রাতে অভিক সাহেবের মায়ের হাতের স্পেশাল নলেন গুড়ের পায়েস রান্না হয়েছে। ঘন দুধ আর গোবিন্দভোগ চালের গন্ধে পুরো বাড়ি ম ম করছে। বড়রা সবাই খাবার খেয়ে উঠে যাওয়ার পর আসর জমিয়েছে এই তরুণ বাহিনী।
পায়েসের বাটি হাতে নিয়ে রিকি প্রথম চামচ মুখে দিয়েই চোখ বন্ধ করে ফেলল।
-“আহ! জাস্ট স্বর্গ! আর্ভিক দাদা, এই পায়েস খেলে তো আমি সারা জীবন এই গ্রামেই থেকে যেতে রাজি।”
আর্ভিকও তখন পায়েস খাচ্ছিল। রিকির কথা শুনে মুচকি হাসল। তানভী হাসিমুখে পায়েস উপভোগ করছিল, কিন্তু আর্ভিকের দিকে চোখ পড়তেই দেখল আর্ভিক ওর দিকেই তাকিয়ে আছে। লজ্জায় তানভী তাড়াতাড়ি বাটিতে মুখ গুজল।
তৃষাণ সবার মাঝে বসে গপগপ করে পায়েস খাচ্ছিল। ও হঠাৎ মুখ তুলে বলল

-“রিকি দাদা, তুমি যে বললে এখানে থেকে যাবে, তাহলে তোমার স্কুলের কী হবে? আর্ভিক ভাইয়া তো বলেছে তুমি নাকি খুব ফাঁকিবাজ!”
রিকি বিষম খেয়ে বলল
-“এই পুচকে! তুই নিজের গেম নিয়ে থাক না, বড়দের কথায় নাক গলাচ্ছিস কেন?”
নীলাদ্রি, পবিত্র আর পেখম হেসেই খুন। সোহাগ আর প্রেমও নিজেদের মধ্যে খুনসুটি শুরু করল। পায়েসের বাটি হাতে নিয়ে প্রেম যখন সোহাগের পাশে একটু ঘেঁষে বসার চেষ্টা করল, সোহাগ অমনি সরে গিয়ে মুখটা ঘুরিয়ে নিল। প্রেম নিচু স্বরে মিনমিন করে বলল
-“আরে বাবা, একটু ক্ষমাও পাব না? ইচ্ছাকৃত তো দেরি করিনি।”
সোহাগ তেরছা চোখে তাকিয়ে বলল
-“ক্ষমা? যে মানুষ সময় মতো কোনো কাজ করে না,সে আবার চোর-ডাকাত ধরবে কী করে? আমার তো মনে হয় চোররাই তোমার স্পিড দেখে নিজে থেকেই থানায় চলে আসে।”
পাশ থেকে নীলাদ্রি ফোড়ন কাটল

-“একদম ঠিক বলেছিস সোহাগ! প্রেমের আইপিএস ডিগ্রির পেছনে নির্ঘাত কোনো গোলমাল আছে।”
প্রেম অসহায় হয়ে এক চামচ পায়েস সোহাগের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল
-“এই নাও, পায়েস খেয়ে রাগ কমাও। মিষ্টি খেলে মনটাও মিষ্টি হয়।”
সোহাগ পায়েসটা না নিয়েই উঠে দাঁড়িয়ে বলল,
-“মিষ্টি খেয়ে লাভ নেই, কাল সকালে যদি আমাদের আগে রেডি না হতে পারো, তবে এই পায়েসের বাটিটাই তোমার মাথায় উপুড় হবে!”
প্রেম শুধু একটা শুকনো ঢোক গিলে সোহাগের দিকে তাকিয়ে করুণ হাসল। আর্ভিক এবার উঠে দাঁড়িয়ে বলল
-“অনেক হয়েছে, এবার সবাই ঘুমাতে যা। কাল সকাল সকাল উঠতে হবে।”

রাতে ঘুমানোর আগে রিকি আর মেঘাদ্রি নিজেদের মধ্যে ঝগড়া করছে। সোহাগ আর পেখম তা দেখে হেসেই খুন। তানভী তাদের দিকে তাকিয়ে কপাল কুঁচকে ধমক দিয়ে বলল
-“এই থামবি তোরা! তোদের জন্য যদি আর্ভিক ভাই আমাকে আছাড় মারেন, তাহলে রিকি তোকে এক লাথি দিয়ে রুম থেকে বের করে দেব। তখন একা থাকবি, ভালো হবে।”
তানভীর কথা শুনে রিকি ভয়ে আতঙ্কে নিজের দুহাত দিয়ে মুখ চেপে বলল
-“নে নে চুপ হয়ে গেছি।”
মেঘাদ্রি এসে তানভীকে পিছনে থেকে জড়িয়ে বলল
-“আরে রাগ করছিস কেন।”
তখনই তাদের রুমের দরজায় কড়াঘাত হল। প্রেম দরজার ওপাশ থেকে সোহাগকে তোষামোদ করে বলল
-“সোহাগ, কাল সকালে কি একটু গরম জল পাওয়া যাবে? এই শীতে ঠান্ডা জলে স্নান করলে তোমার হবু বর তো আইসক্রিম হয়ে যাবে!”
সোহাগ ভেতর থেকে রাগী গলায় উত্তর দিল

-“আইসক্রিম হলে ভালোই হবে, বিকেলে তৃষাণকে খেতে দেব। এখন চুপচাপ ঘুমাও, না হলে কাল সকালে তোমাকে ওই পদ্মপুকুরের মাঝখানে চুবিয়ে পুলিশি ট্রেনিং করাব।”
তৃষাণ পাশের রুমে ছিল সে নীলাদ্রির পিঠে উঠে জিজ্ঞাসা করল
-“নীলাদ্রি দাদা, রিকি দাদা এত ভীতু কেন?”
নীলাদ্রি কিছু বলার আগেই অন্ধকার বারান্দা থেকে আর্ভিকের গম্ভীর কন্ঠ শোনা গেল
-“যার গলার আওয়াজ এরপরে পাব, তাকে এই শীতে ছাদে দিয়ে আসব সেখানে গিয়ে সে সারারাত তারা গুনবে।”
এক লহমায় পুরো পিনপতন নিস্তব্ধতা নেমে এল। রিকি অতি সাবধানে চাদরের তলা থেকে বেশ জোরে বলল
-“দাদা, আমি কিন্তু অলরেডি ঘুমিয়ে পড়েছি, বিশ্বাস করো!”
তানভী সহসা রিকির দিকে একটা বালিশ ছুঁড়ে বলল
-“এই বাঁদর ঘুমালে মানুষ কথা বলে? এই কমনসেন্স টুকুও কি নেই তোর!!”
আর্ভিক বাইরে দাঁড়িয়ে সব কিছু শুনে একটা তৃপ্তির হাসি হাসল।

এস্টেটের বিশাল ঘরে তখন ক্লান্তির ঘুম নেমেছে। রিকি, মেঘাদ্রি, সোহাগ আর পেখমদের সমবেত নিশ্বাসের শব্দে ঘরটা ভারী হয়ে আছে। কিন্তু তানভীর চোখে ঘুম নেই। একজায়গা থেকে অন্য জায়গায় এলে তার এমন হয়।
শুয়ে থাকতে না পেরে তানভী নিঃশব্দে বিছানা ছাড়ল। পা টিপে টিপে ঘর সংলগ্ন ছোট বেলকনিটাতে গিয়ে দাঁড়াল ও। বাইরের প্রকৃতি তখন কুয়াশার চাদরে ঢাকা, চাঁদটা মেঘের আড়ালে লুকোচুরি খেলছে। হঠাৎ ওর নজরে এল এস্টেটের পুরোনো সিংহদরজার ওপাশে একটা ছায়া নড়াচড়া করছে। তানভী ভালো করে লক্ষ্য করতেই ওর হৃৎপিণ্ড যেন একটা স্পন্দন মিস করল।
অন্ধকারের আবছায়া ভেদ করে যে দীর্ঘকায় অবয়বটি সদর দরজা দিয়ে সন্তর্পণে বেরিয়ে যাচ্ছে, সে আর কেউ নয়—আর্ভিক ভাই!
তানভী দ্রুত উঁকি দিয়ে রুমের দেওয়াল ঘড়িটার দিকে তাকাল। রাত ঠিক দুটো। তানভী মনে মনে ভাবল
“এই নিঝুম রাতে যখন পুরো গ্রাম নিস্তব্ধতায় মগ্ন, তখন আর্ভিক ভাই কোথায় যাচ্ছেন?”
আর্ভিক গেট ছাড়িয়ে ডাইনে মোড় নিল, কুয়াশার গাঢ় মেঘে আর্ভিকের ছায়াটা ধীরে ধীরে মিলিয়ে যেতেই তানভীর মনে একরাশ সন্দেহ দানা বাঁধল। তার গা শিউরে উঠল। সে মনে মনে ভাবল
“আমি কি আর্ভিক ভাই কে ডাকব?”
কিন্তু আর্ভিকের সেই শীতল দৃষ্টির কথা মনে পড়তেই ও স্থির হয়ে গেল। বেলকনির রেলিংটা শক্ত করে চেপে ধরে তানভী কেবল কুয়াশার দিকে তাকিয়ে রইল, যেখানে আর্ভিক এক বুক রহস্য নিয়ে মিলিয়ে গেছে।

ভোরের কুয়াশা তখনো রায়চৌধুরী এস্টেটের কারুকার্যময় খিলানগুলোতে মায়ার মতো জড়িয়ে আছে। পুরানো জমিদার বাড়ির ভেতর থেকে পাখিদের কিচিরমিচির শব্দ ভেসে আসছে। বাড়ির সকলে ঘুমে মগ্ন, তবে তানভীর চোখে ঘুম পাতলা; সারা রাতের অজানার কৌতূহল ওকে যেন ঘুমাতে দিচ্ছিল না। আলসেমি ঝেড়ে বিছানা ছেড়ে ও যখন নিচে নামল, তখন চারদিকের পরিবেশটা ঠিক যেন কোনো ধ্রুপদী সিনেমার দৃশ্য।
বাড়ির পিছনের বাগানটা এখন কর্মমুখর। ভোরের নরম রোদে চিকচিক করছে ঘাসের ওপর জমে থাকা শিশিরবিন্দু। মালঞ্চের পরিচর্যায় ব্যস্ত মালিদের নির্দেশ দিচ্ছে আর্ভিক। তানভীর চোখের পলক পড়ল না। আর্ভিককে আজ একদম অন্যরকম লাগছে। পরনে একটা সাদা রঙের সালোয়ার কামিজ, আর কাঁধের ওপর রাজকীয় ঢঙে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়ানো দামি কাশ্মীরি শাল, হাতে একটা লেদারের ঘড়ি, পায়ে একটা চামড়ার জুতো। কোনো এক সময়ের জমিদারের আভিজাত্য যেন ওর অবয়বে ভর করেছে। মালিদের মধ্যে কেউ ফুলের চারা বসাচ্ছে, কেউবা দীর্ঘদিনের অবহেলায় বেড়ে ওঠা জঙ্গল সাফ করে গাছে জল দিচ্ছে। আর্ভিক গম্ভীর মুখে দাঁড়িয়ে সেই সব কিছু তদারকি করছে। মুগ্ধ নয়নে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে তানভী ধীর পায়ে দরজার দিকে এগিয়ে গেল। এরপর অস্ফুটে ডাকল

-“আর্ভিক ভাই?”
আর্ভিক থমকে দাঁড়িয়ে ঘাড় ঘোরাল। তানভীকে দেখতেই ওর কঠিন মুখে একটা প্রসন্ন হাসির রেখা ফুটে উঠল।
-“কী রে এই ভোরবেলা এখানে কী করছিস?”
তানভী কোনো উত্তর না দিয়ে আর্ভিকের কাছে গেল। তানভী যেতেই আর্ভিক খেয়াল করল, মেয়েটা এই হাড়কাঁপানো ঠান্ডায় একটা পাতলা জামা পরে চলে এসেছে। গায়ে কোনো সোয়েটার বা চাদর নেই। মুহূর্তেই আর্ভিক নিজের গায়ের সেই উষ্ণ কাশ্মীরি শালটা খুলে তানভীর কাঁধের ওপর জড়িয়ে দিল। তারপর শাসনের সুরে বলল
-“ঠান্ডা লাগে না? গায়ে কিছু দিসনি কেন? তোর কি নিজের শরীরের ওপর মায়া নেই, নাকি নিউমোনিয়া হওয়ার শখ জেগেছে?”
চাদরের ওম আর আর্ভিকের শরীরের মাতালকরা ঘ্রাণে তানভী এক লহমায় বিভোর হয়ে গেল। ও প্রসঙ্গ পাল্টাতে বলে উঠল

-“আর্ভিক ভাই, বাগানটা কী সুন্দর! রূপকথার গল্পে রাজাদের যেমন থাকে ঠিক ওই রকম। আমার যদি এমন একটা বাগান থাকত!”
আর্ভিক উত্তর দিল না, শুধু এক চিলতে রহস্যময় হাসি ওর ঠোঁটের কোণে ঝিলিক দিয়ে গেল। ওর সেই নীরবতার আড়ালে হয়তো কোনো গভীর সংকল্প লুকানো আছে, যা ও কেবল নিজের মনেই তালাবন্ধ করে রাখল।
খানিক বাদেই তানভীর মনে পড়ে গেল কাল রাতের সেই রহস্যময় দৃশ্য। ও একটু ইতস্তত করে জিজ্ঞেস করল
-“আর্ভিক ভাই, একটা কথা জিজ্ঞেস করব?”
আর্ভিক সহসা জবাব দিল
-“হুম বল।”
তানভী একটু ভয়ে ভয়ে বলল
-“আগে কথা দাও রাগ করবে না।”
-“আচ্ছা করব না। বল, কী হয়েছে?”
তানভী বলতে শুরু করল

-“কাল রাতে…আপনি কোথায় বেরিয়েছিলেন?”
আর্ভিক এক মুহূর্তের জন্য থমকাল, তারপর খুব স্বাভাবিক স্বরে রসিকতা করে বলল
-“কোথায় আর যাব? লুকোচুরি খেলতে গিয়েছিলাম।”
তানভী আকাশ থেকে পড়ল
-“অ্যাঁ! রাত দুটোর সময়! কাদের সাথে খেলতে গিয়েছিলেন?”
-“কেন? একা একা।”
আর্ভিক যেন মজা পাচ্ছিল তানভীর অসহায় মুখটা দেখে।
-“একা একা লুকোচুরি? আপনি কি তেনাদের সাথে খেলতে গিয়েছিলেন? মানে ওই ভূত-প্রেতদের কথা বলছি…”
আর্ভিক এবার সশব্দে হেসে উঠল
-“আরে ধুর! বাড়িতেই যখন এমন একটা আস্ত পেত্নী মজুদ আছে, তখন বাইরের ভূত প্রেতের সাথে খেলতে যাব কেন?”
তানভী রাগে ফোঁস করে উঠে বলল

-“আর্ভিক ভাই!”
আর্ভিক হাসি চেপে বলল
-“আরে বাবা, সত্যিই তো বললাম। লুকোচুরিই তো! আসলে আমাদের এই বাড়ির মশাগুলো না একদম বেইমান। মশারি টাঙিয়েছিলাম, তাও দেখি দুটো ভেতরে ঢুকে লুকোচুরি খেলছে। ওগুলোকেই বাড়ির বাইরে গেটের ওপারে সম্মানের সাথে রেখে আসতে গিয়েছিলাম। তা তুই কি রাত জেগে আমাকে পাহারা দিচ্ছিলি নাকি?”
তানভী নাক কুঁচকে বলল
-“পাহারা দিতে বয়েই গেছে আমার! ঘুম আসছিল না তাই বারান্দায় দাঁড়িয়েছিলাম। তা মশা তাড়াতে অত দূরে যাওয়ার কী দরকার ছিল? পাশের ঘরেই তো আমি ছিলাম, আমাকে একটা ডাক দিলেই হতো!”
আর্ভিক এবার তানভীর কপালে হালকা একটা টোকা দিয়ে বলল
-“তোকে বলব? তোকে ডাকলে তো মশা তাড়ানোর বদলে তুই নিজেই ভয়ে আমার কোলে উঠে বসে থাকতিস! তখন মশা তাড়াব না তোকে সামলাব? তার চেয়ে পেত্নীদের সাথে লুকোচুরি খেলা অনেক সেফ, বুঝলি পুচকে?”
তানভী ঝাঁঝালো কন্ঠে বলল

-“আমি একদম পুচকে নই! আর আমি ভূতকে একটুও ভয় পাই না, বুঝলেন?”
-“আচ্ছা আচ্ছা, বড় হয়ে গেছিস বুঝলাম। ভয় পাস না যখন, তাহলে আজ রাতে নয় ভোরে তৈরি থাকিস, তোকেও সাথে নিয়ে যাব।”
আর্ভিকের চোখের কোণে তখনো এক অদ্ভুত রহস্যের ঝিলিক, যার প্রকৃত মানে তানভীর অবুঝ মনে তখনো ধরা পড়েনি। তানভী সেখান থেকে চলে গেল আর আর্ভিক তানভীর যাওয়ার পানে তাকিয়ে নিঃশব্দে হেসে দুদিকে মাথা নাড়িয়ে বলল
-“পাগলী একটা”

রায়চৌধুরী এস্টেটের বড় ঘড়িটায় আটটা বাজতেই বাড়ির নিস্তব্ধতা টুটে এক এলাহি কাণ্ড শুরু হলো। রোদের ঝিলিক বারান্দায় এসে পড়েছে। তরুণ বাহিনী ঘুম থেকে উঠে একে একে ফ্রেশ হতে লাগল।
সবচেয়ে করুণ দশা প্রেমের। সে চোখ কচলাতে কচলাতে বৈঠকখানায় পা রাখল, দেখল সোহাগ ততক্ষণে ফিটফাট হয়ে চা হাতে আয়েশ করে বসে আছে। প্রেমকে দেখা মাত্রই সোহাগ চশমাটা নাকের ডগায় নামিয়ে টিপ্পনী কাটল
-“বাহ! আইপিএস সাহেবের সূর্যোদয় হলো তবে? কাল রাতে তো বিশাল বড় বড় কথা বলছিলেন যে আপনিই নাকি কাল সবাইকে ঘুম থেকে টেনে তুলবেন। এখন দেখছি আপনার ঘুমের রেশ ভাঙাতে নির্ঘাত ব্যান্ড পার্টি ডাকতে হবে!”
প্রেম অপ্রস্তুত হয়ে চুলে হাত বোলাতে বোলাতে বলল
-“না মানে, আবহাওয়াটা একটু বেশি ভালো ছিল তো, তাই অ্যালার্মটা বোধহয় কানে যায়নি।”
সোহাগ চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে ভ্রু কুঁচকে বলল

-“অ্যালার্ম কানে যায়নি না কি অ্যালার্মটা নিজেই আপনাকে দেখে লজ্জায় বন্ধ হয়ে গেছে? পুলিশের লোক যদি এত বেলা পর্যন্ত ঘুমায়, তবে তো চোরেরা আপনার পাশে বসে টিফিন খেয়ে পালাবে!”
ওদিকে রিকি আর মেঘাদ্রি নিজেদের মধ্যে লড়াই শুরু করেছে। রিকি হন্তদন্ত হয়ে বাথরুমের সামনে দাঁড়িয়ে মেঘাদ্রিকে চিৎকার করে বলছে
-“মেঘাদ্রি, একঘণ্টা ধরে বাথরুমে কী করছিস? ওইটুকু মুখে সাবান ঘষতে কি পুরো কোম্পানির ফ্যাক্টরি খালি করতে হবে?”
মেঘাদ্রি ভেতর থেকে চেঁচিয়ে উত্তর দিল
-“চুপ কর রিকি! জমিদার বাড়ি যখন, একটু তো জমিদারি ঢঙে স্নান করতে হবে। তোর যদি খুব তাড়া থাকে তাহলে পুকুর ঘাটে গিয়ে স্নান করে আয়।”
রিকি নাক কুঁচকে বিড়বিড় করল
-“পুকুরের জল তো যা ঠান্ডা, একবার নামলে আমার শরীর তো বরফ হয়ে যাবে!”

স্নান সেরে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে রিকি তখন মহাব্যস্ত। গায়ের জামাটা কোনোমতে গলিয়ে চিরুনি দিয়ে চুলে একের পর এক বাহারি স্টাইল দিচ্ছে সে। আয়নায় নিজেকে দেখে নিজেই মুগ্ধ হয়ে বিড়বিড় করছে
-“উফ রিকি! এই চেহারায় গ্রামের মেয়েরা তোকে দেখলে একদম ফিদা হয়ে যাবে।”
ঠিক এই আত্মমুগ্ধতার মুহূর্তেই দৃশ্যপটে তৃষাণের এন্ট্রি। সে দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে সব শুনছিল। হুট করে সামনে এসে ফিক করে হেসে তৃষাণ বলল
-“ও বাবা! রিকি দাদা, তোমার এই হিরো সাজার কথা যদি আমি মেঘাদ্রি দিদিকে গিয়ে বলি তোমাকে আস্ত রাখবে তখন?”
রিকির হাতের চিরুনিটা প্রায় পড়তে পড়তে বাঁচল। সে থতমত খেয়ে বলল

-“এই পুচকে! তুই এখানে কখন এলি? মেঘাদ্রিকে এসব উল্টোপাল্টা কথা একদম বলবি না কিন্তু! তাহলে ও আমার হিরো গিরি বের করে জিরো বানিয়ে দেবে।”
তৃষাণ দুই হাত কোমরে দিয়ে বেশ ভাব নিয়ে বলল
-“কেন বলব না? আমি অবশ্যই বলব যে তুমি মেঘাদ্রি দিদির সঙ্গে চিট করছ।”
রিকি এবার দমে গিয়ে কাঁচুমাচু মুখে বলল
-“আরে না ভাই না! প্লিজ বলিস না। তুই তো আমার লক্ষ্মী সোনা ভাই।”
তৃষাণ সুযোগ বুঝে দাবার চাল চালল
-“ঠিক আছে বলব না, কিন্তু আমার একটা শর্ত আছে।”
রিকি মরিয়া হয়ে বলল
-হ্যাঁ ভাই বল! তোর সব শর্তে আমি রাজি। এমনকি মেলায় তোকে লজেন্স কিনে দিতেও রাজি, শুধু মেঘাদ্রিকে কিছু বলিস না।”
তৃষাণ হেসে বলল

-“না, আমাকে লজেন্স নয়, তোমাকে আমার ভালো ভালো গল্প শোনাতে হবে। রাজি?”
রিকি মনে মনে বিড়বিড় করে উঠল
“এই পুচকেটা তো আস্ত একটা ড্রাকুলা! দেখতে ছোট হলে কী হবে, বুদ্ধিতে যেন ঘুণপোকা।”
মুখে কৃত্রিম হাসি এনে বলল
-“রাজি বাবা রাজি! তুই যা বলবি তাতেই আমি সিলমোহর দিয়ে দিলাম।”
তৃষাণ খুশি হয়ে যেই লাফ দিতে যাবে, অমনি নিচের তলা থেকে আর্ভিকের গম্ভীর কন্ঠস্বর ভেসে এল
-“তোজো! রিকি! তোদের কি ব্রেকফাস্টের নিমন্ত্রণপত্র পাঠাতে হবে? সবাই টেবিলে বসে গেছে, তোরা এখনো উপরে কী করছিস? নিচে আয় দ্রুত!”

আর্ভিকের ডাক শুনে রিকি এক ঝটকায় চিরুনিটা রেখে তৃষাণের হাত ধরল।
-“চলো মহারাজ, চলো! দাদার ডাক পড়েছে, আর দেরি করলে আমার গল্পের ঝুলি খোলার আগেই দাদা আমার আর তোমার কান খুলে দেবে!”
তৃষাণ হাসতে হাসতে রিকির সাথে ডাইনিং হলের দিকে দৌড় দিল।
ব্রেকফাস্ট টেবিল তখন লুচি আর আলুর দমের গন্ধে ম ম করছে। আর্ভিক চায়ের কাপে শেষ চুমুক দিয়ে উঠে যেতে যেতে গম্ভীর গলায় জিজ্ঞেস করল

-“সবার স্নান সারা হয়েছে তো? খাওয়া শেষ করে আধঘণ্টার মধ্যে সবাই ছাদে আসবি। ঘুড়ি ওড়ানো হবে।”
‘ঘুড়ি ওড়ানো’—এই শব্দটা কানে যাওয়া মাত্রই তৃষাণ উত্তেজনায় চেয়ার থেকে প্রায় লাফিয়ে উঠল। লুচিটা মুখে না দিয়ে আধখাওয়া অবস্থায় চেয়ার ছেড়ে আর্ভিকের পিছু নিতে চাইল। ডাইনিং হল থেকে বেরোতে বেরোতে আর্ভিক ঘাড় ঘুরিয়ে একবার তাকাল। সেই তীক্ষ্ণ আর কড়া দৃষ্টির সামনে তৃষাণের সব তেজ মুহূর্তেই জল হয়ে গেল।
আর্ভিক শান্ত কিন্তু দৃঢ় স্বরে বলল
-“আগে খাবারটা শেষ কর তোজো। খাবারের অমর্যাদা করলে তোর ছাদে যাওয়ার টিকিট কিন্তু ক্যান্সেল হয়ে যাবে।”
তৃষাণ ভেজা বিড়ালের মতো চুপচাপ গিয়ে নিজের চেয়ারে বসল। রিকি পাশ থেকে ফিসফিস করে টিপ্পনী কাটল
-“কী হলো হিরো? ইঞ্জিন তো দেখি গরম হওয়ার আগেই ঠান্ডা হয়ে গেল!”
তৃষাণ রাগে এক টুকরো লুচি মুখে পুরল, ওর চোখ তখনো জানলার বাইরের নীল আকাশে, যেখানে ঘুড়িরা ডানা মেলার অপেক্ষায়।

বেলা একটু বাড়তেই রায়চৌধুরী এস্টেটের চওড়া বারান্দার এক কোণে তখন পৌষ-পার্বণের মহোৎসব শুরু হয়েছে। রাখী রায়চৌধুরী, দোয়েল ব্যানার্জী, অভিক সাহেবের মা আর বাড়ির কর্মচারীরা গোল হয়ে বসেছেন পিঠে তৈরির মহাযজ্ঞে। পিতলের বড় গামলায় রাখা হয়েছে নতুন আতপ চালের গুঁড়ো, আর পাশের মালসায় রাখা খেজুর গুড়ের পাটালি থেকে মিষ্টি সুবাস চারদিকের বাতাসকে ভারী করে তুলেছে।
দোয়েল ব্যানার্জী নিপুণ হাতে চালের গুঁড়োর মণ্ড মেখে ছোট ছোট বাটির মতো গড়ছেন, আর রাখী রায়চৌধুরী তাতে নারকেলের ছাই আর ক্ষীরের পুর ভরে দিচ্ছেন। ওদিকে অভিক সাহেবের মা উনুনে দুধের কড়াই বসিয়েছেন; ঘন দুধে এলাচের সুবাস মিশে এক স্বর্গীয় আমেজ তৈরি হয়েছে।
পিঠে গড়তে গড়তে তাঁদের মধ্যে চলছে পুরনো দিনের গল্পের ঝুলি—কখনো হাসি, কখনো বা পুরোনো স্মৃতির রোমন্থন।

উঠোনের এক কোণে ঢেঁকির মড়মড় শব্দ আর অন্দরমহল থেকে ভেসে আসা পিঠে ভাজার ‘ছ্যাঁক ছ্যাঁক’ আওয়াজ জানিয়ে দিচ্ছে, আজ এ বাড়িতে কেবল উৎসব নয়, বরং এক টুকরো ঐতিহ্য ফিরে এসেছে। অনেক বছর পর গ্ৰামে আসার জন্য রুদ্র বাবু আর অভিক সাহেব গ্ৰাম ঘুরতে বেরিয়েছেন।

ছাদের রেলিংয়ে হাত রেখে তানভী যখন আকাশের দিকে তাকাল, ওর চোখের মণি দুটো বিস্ময়ে স্থির হয়ে গেল। পৌষ সংক্রান্তির এই মাহেন্দ্রক্ষণে মথুরাপুর আর বিষ্ণুপুর—দুই গ্রামের আকাশ যেন এক বিশাল রঙিন ক্যানভাসে পরিণত হয়েছে। যতদূর দৃষ্টি যায়, কেবল ঘুড়ির মেলা। লাল, নীল, হলদে বেগুনী আরও নানা রঙের শত শত ঘুড়ি আকাশের নীলিমাকে আড়াল করে দিয়েছে।
মথুরাপুর আর বিষ্ণুপুরের ঐতিহ্যবাহী সেই মেলা উপলক্ষে আজ যেন আকাশটাই উৎসবের প্রাণকেন্দ্র। কোনোটা বকের মতো ডানা মেলে ভাসছে, কোনোটা আবার বাজপাখির মতো ক্ষিপ্র গতিতে অন্য ঘুড়িকে কাটতে ধেয়ে যাচ্ছে। মাঞ্জা দেওয়া সুতোর ঝিলিক রোদে চিকচিক করছে, ঠিক যেন আকাশের গায়ে কেউ রুপোলি মাকড়সার জাল বুনেছে। দূর দূরান্ত থেকে ভেসে আসছে জয়ের উল্লাস আর ‘ভো-কাট্টা’র সম্মিলিত চিৎকার।
তানভী এক গভীর প্রশান্তি নিয়ে সেই দৃশ্যটা দেখছিল। এই নিঝুম পল্লীপ্রকৃতির বুকে আকাশটা যে এত বৈচিত্র্যময় হতে পারে, তা তানভী আগে কখনো ভাবেনি। বাতাসের শোঁ শোঁ শব্দ আর অগণিত ঘুড়ির এই স্বাধীন উড়ান ওকে মুহূর্তের জন্য এক অন্য জগতে নিয়ে গেল।

কিছুক্ষণ পর সবাই হইহই করে ছাদে চলে এল। আকাশে আজ মেঘের ছিটেফোঁটা নেই, ঠিক যেন এক নীল ক্যানভাস। ঘুড়ি ওড়ানোর জন্য তৈরি দুটি দল। আর্ভিকের নেতৃত্বে ছেলেদের আর তানভীর নেতৃত্বে মেয়েদের দল। যুদ্ধের শর্ত বেশ কড়া—যে দল হারবে, সেই দলের লিডারকে কাল দুপুরে এলাহি মাংসের ভোজ রান্না করে খাওয়াতে হবে। যেহেতু আজ পৌষ সংক্রান্তি, তাই আমিষ ছোঁয়া বারণ।
তানভী লাটাই ধরে আকাশপানে তাকালেও মনে মনে বেশ ঘাবড়ে আছে। ছোটবেলায় আর্ভিক ওকে দু-একবার ঘুড়ি ওড়ানো শিখিয়েছিল বটে, কিন্তু সেই বিদ্যের এখন কেবল ঝাপসা স্মৃতিটুকুই অবশিষ্ট। অন্যদিকে আর্ভিক তখন ছাদে পুরো দস্তুর ‘খিলাড়ি’। পরনে সাদা পাঞ্জাবি, চোখে রোদচশমা সে যেন আজ আকাশের রাজা। ঘুড়ি উড়াতে উড়াতে আর্ভিক তানভীর দিকে তাকিয়ে গুনগুন করে গাইতে শুরু করল—

“উড়ি উড়ি যায়, উড়ি উড়ি যায়…
দিল কি পাতাঙ্গ দেখো উড়ি উড়ি যায়!”
ওর গলার সুর আর ঘুড়ির টান—দুটোই যেন পাল্লা দিয়ে উড়ছে। তানভী দাঁতে দাঁত চেপে নিজের ঘুড়িটা সামলানোর আপ্রাণ চেষ্টা করল। সোহাগ পাশ থেকে চিৎকার করে উৎসাহ দিচ্ছিল, কিন্তু শেষরক্ষা হলো না। আর্ভিকের একটা মোক্ষম টানে তানভীর ঘুড়িটা মাঝ আকাশ থেকে কেটে লাট খেতে খেতে নিচে পড়ে গেল। ছেলেদের দল হইহই করে জয়ধ্বনি দিয়ে উঠল। রিকি তো খুশিতে ছাদে নাচ শুরু করে দিয়েছে।
বিজয়ীর হাসি হেসে আর্ভিক এগিয়ে এল।
-“কী ম্যাডাম কেমন দিলাম!”
তানভী মুখ ভার করে বলল

-“আপনার ওই গানে আমার মনঃসংযোগ নষ্ট হয়ে গিয়েছিল, এটা চিটিং!”
তানভীর অবস্থা দেখে আর্ভিক হেসে ফেললো। কিন্তু শর্ত তো শর্তই। ছেলেদের দল কিছুতেই ছাড় দেবে না। অগত্যা ঠিক হলো, তানভীকেই কাল হেঁশেল সামলাতে হবে।
কিন্তু আর্ভিকের হাসিটা হঠাৎ ম্লান হয়ে গেল। ও জানত, তানভীর রান্নাবান্নার অভিজ্ঞতা খুব একটা সুখকর নয়। তাছাড়া কাল পুরো বাড়ির মানুষের জন্য অত মাংস রান্না করা ওর শরীরের ওপর বড় ধকল যাবে। আর্ভিক গম্ভীর হয়ে বলল

-“না, ওসব হবে না। তানভীর রান্না করতে হবে না। ওর বদলে আমি করব।”
আর্ভিকের কথায় কেউ রাজি হচ্ছিল না। শেষমেশ তানভী জেদ ধরে বসল। ও আর্ভিকের চোখের দিকে তাকিয়ে স্পষ্ট গলায় বলল
-“না আর্ভিক ভাই, আপনাকে করতে হবে না। আমি হেরেছি যখন, রান্না আমিই করব। শর্ত তো শর্তই!”
আর্ভিকের কপালে ভাঁজ পড়ল। ও কিছুতেই মানতে পারছিল না যে তানভী আগুনের পাশে দাঁড়িয়ে অতটা সময় পরিশ্রম করবে। কিন্তু তানভীর জেদি চোখের সামনে আর্ভিকের সেই ‘শাসন’ আজ যেন হার মানল। ও শুধু মনে মনে বলল
-“হে মহাদেব আমাকে শক্তি দাও,এই বাচ্চা মেয়েটাকে সামলানোর জন্য।”

বিষ্ণুপুরের মেলা যেন এক জীবন্ত উৎসবের কোলাজ। নাগরদোলার ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দ, মাটির পুতুলের পসরা আর গরম জিলিপির ম ম গন্ধে মথুরাপুর আর বিষ্ণুপুর—দুই গ্রামের মানুষ আজ একাকার। রায়চৌধুরী এস্টেটের এই ‘ইয়াং ব্রিগেড’ যখন মেলায় পা রাখল, তখন হুল্লোড় যেন দ্বিগুণ হয়ে গেল।
রিকি মেলায় ঢুকেই একটা বিদঘুটে বড় লাল রঙের প্লাস্টিকের চশমা আর বাঁশি কিনে সোজা মেঘাদ্রির কানের কাছে বাজাতে শুরু করল। মেঘাদ্রি রেগে গিয়ে রিকিকে ধাওয়া করল, আর সেই দৌড়াদৌড়ির চক্করে রিকি গিয়ে পড়ল এক ফুচকাওয়ালার গায়ের ওপর। সোহাগ আর প্রেম তখন নিজেদের মধ্যে সব মান-অভিমান পালা চুকিয়ে মাটির ভাঁড়ের গরম চা খেতে ব্যাস্ত।

এদিকে আর্ভিক আর তানভীর জগৎটা ছিল একদম আলাদা। জনঅরণ্যের মাঝেও আর্ভিক সারাক্ষণ আগলে রাখছিল তানভীকে। ভিড়ের ঠেলা থেকে বাঁচাতে ও বারবার তানভীর কাঁধে হাত রেখে নিজের দিকে টেনে নিচ্ছিল। তানভী একটা চুড়ি কিনতে গিয়ে দরাদরি করছিল, আর আর্ভিক দূর থেকে মুচকি হেসে দোকানিকে চোখের ইশারায় বোঝালো বাকি টাকাটা সে দিয়ে দেবে।
মেলায় এক জায়গায় বায়োস্কোপ চলছিল। তৃষাণ আর ঋষি সেখানে হুমড়ি খেয়ে পড়ল। রিকি হঠাৎ একটা বড় কাঠের তলোয়ার নিয়ে আর্ভিকের সামনে এসে বীরত্ব দেখাতে গিয়ে নিজেই হোঁচট খেয়ে কাদার ওপর বসে পড়ল। পুরো দলটা তার দেখে তখন অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল।

বেশ অনেকটা সময় পর আর্ভিকরা যখন এস্টেটে ফিরল তখন সন্ধ্যা ঘনিয়ে রাত নেমেছে। কুয়াশার চাদরে ঢাকা গ্রামটা যেন এক গভীর নিস্তব্ধতায় ডুবে গেছে। সারা বিকেলের হুল্লোড়, নাগরদোলার চক্কর আর অকারণ দৌড়াদৌড়িতে প্রত্যেকের শরীরেই তখন ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট।
বিশাল ডাইনিং টেবিলের ঝাড়বাতির আলোয় সবার মুখগুলো আজ একটু বেশিই শান্ত দেখাচ্ছিল। সবাই তাড়াতাড়ি রাতের খাওয়া সেরে নিজের নিজের ঘরের দিকে পা বাড়াল। বড় হলঘরের কাঠের সিঁড়িতে ওদের ক্লান্ত পায়ের শব্দ প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল। কোনো রকমে বিছানায় গা এলিয়ে দিতেই যেন ঘুমের রাজ্যে তলিয়ে গেল সবাই। সারা বাড়ি যখন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন, তখন কেবল বাইরের ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক আর দূর থেকে আসা শিয়ালের হুক্কাহুয়া শব্দ জানান দিচ্ছিল যে—রাত এখন তার নিজস্ব ছন্দে রাজত্ব করছে।

ভোরের কুয়াশা তখনো অপার্থিব এক চাদরে মুড়িয়ে রেখেছে রায়চৌধুরী এস্টেটকে। জানলার বাইরে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক স্তিমিত হয়ে আসছে, আর ঠিক তখনই তানভীর মাথার কাছে রাখা ফোনটা মৃদু কম্পনে বেজে উঠল। আধো-ঘুম আধো-জাগরণ অবস্থায় হাতড়ে ফোনটা কানে তুলতেই ওপাশ থেকে ভেসে এল এক গভীর, মখমলি কণ্ঠস্বর
-“কী ম্যাডাম, ঘুম ভাঙল? চলুন মশা তাড়াতে যাই, কালকে তো বললেন যে আপনাকে ডাকতে।”
তানভী চোখ না খুলেই ঘড়ঘড়ে গলায় বিড়বিড় করল,
-“উমম… কে? আর্ভিক ভাই? এত সকালে!”
ওপাশে আর্ভিকের মৃদু হাসির শব্দ পাওয়া গেল, যা এই নিস্তব্ধ ভোরে তানভীর কানে এক অদ্ভুত সুরের মতো শোনাল।

-“ভোর পাঁচটা বাজে তানভী। সূর্য ওঠার আগেই তৈরি হয়ে নিচে আয়।”
তানভী ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখল সত্যিই পাঁচটা। আলসেমি ঝেড়ে, গায়ে একটা হালকা পশমি চাদর জড়িয়ে ও ঘর থেকে বেরিয়ে এল। বড় হলঘরের অন্ধকার আর ধুলোমাখা আসবাবপত্র পেরিয়ে যখন ও উঠোনে পা রাখল, দেখল সিংহদ্বারের বিশাল তোরণের সামনে কুয়াশার অস্পষ্টতায় একটা দীর্ঘকায় অবয়ব দাঁড়িয়ে। আর্ভিক! ওর পরনে একটা কালো রঙের সালোয়ার কামিজ আর আগের দিনের সেই শালটা।
তানভী কাছে গিয়ে দাঁড়াতেই আর্ভিক কোনো কথা না বলে ওর নরম হাতটা নিজের শক্ত হাতের মুঠোয় পুরল। সেই স্পর্শে তানভীর শরীরের ভেতর দিয়ে যেন এক বিদ্যুৎলহরী বয়ে গেল। এক অজানা অনুভূতিতে ওর বুকটা কেঁপে উঠল। কাঁপাকাঁপা গলায় ও জিজ্ঞেস করল

-“কোথায় যাচ্ছি আমরা আর্ভিক ভাই? এত অন্ধকার চারপাশ…”
আর্ভিক ওর হাতের বাঁধনটা আর একটু শক্ত করে মুচকি হাসল, কিন্তু কিছু বলল না। দুজনে হাঁটতে শুরু করল মেঠো পথ ধরে। চারদিকে ঘন কুয়াশা, হাতের তালু ছাড়া একে অপরের অস্তিত্ব অনুভব করা দায়। পথের দু-ধারে ক্ষেতের সবুজ আভা কুয়াশার ভেতর দিয়ে যেন মায়াবী এক আলো ছড়াচ্ছে। তানভী দেখল, ঘাসের ওপর জমে থাকা শিশিরবিন্দুগুলো মুক্তোর মতো চিকচিক করছে। শীতের সেই হিমেল হাওয়া যখন ওর গালে চাবুক মারছে, আর্ভিকের হাতের উষ্ণতা তখন ওকে এক অদ্ভুত নিরাপত্তা দিচ্ছিল।
তানভী খুশিতে আত্মহারা হয়ে কখনও কুয়াশার দিকে হাত বাড়িয়ে দিচ্ছে, কখনও বা রাস্তার ধারের বুনো ফুলের গন্ধ শুঁকছে। ওর ছোট ছোট চপলতাগুলো আর্ভিক অপলক নেত্রে দেখছিল। শহরের সেই গম্ভীর আর্ভিক আজ যেন এক নীরব মুগ্ধ দর্শক। তানভী যখন শিশিরভেজা মাটির রাস্তা দিয়ে দৌড়াতে গিয়ে টাল সামলাতে পারল না, আর্ভিক ওকে আলতো করে টেনে নিজের কাছে নিয়ে এল।

সেকেন্ডের কয়েক ভগ্নাংশের জন্য সময়টা যেন থমকে গেল। কুয়াশার আড়ালে দুজনের নিশ্বাসের শব্দ একাকার হয়ে যাচ্ছিল। আর্ভিক তানভীর কপালে আলতো করে হাত রেখে মনে মনে বলল
“তোর এই পাগলপনাগুলো না দেখলে জানতেই পারতাম না যে ভোরবেলাটা এত সুন্দর হয়।”
কয়েক কদম এগোতেই সামনে একটা স্কুল এল। স্কুলের মেইন গেটে বড় বড় করে লেখা “জ্ঞানেন্দ্র শিশু বিদ্যামন্দির”। আর্ভিক তানভীর দিকে তাকিয়ে বলল
-“এই স্কুলে আমি পড়তাম।”
তানভী কপাল কুঁচকে বলল
-“আপনি তো ছোট থেকেই ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে পড়তেন”
আর্ভিক সহসা জবাব দিল
-“না আমি ক্লাস 3 পর্যন্ত এখানে পড়েছি”
এই বলে আর্ভিক তানভীকে নিয়ে সামনে এগিয়ে গেল।
~~~
ভোরের সেই কুয়াশাঘেরা মায়াবী মুহূর্তগুলো পার করে যখন সূর্য মাথার ওপর উঠতে শুরু করেছে, তখন আর্ভিক আর তানভী বাড়ির পথ ধরল। ঘড়ির কাঁটা তখন আটটার ঘর ছুঁইছুঁই। গ্রামের মেঠো পথ দিয়ে ফেরার সময় হঠাৎ এক জায়গায় এসে আর্ভিকের পায়ের গতি শ্লথ হয়ে গেল। এক পা, দু পা এগিয়ে ও নিথর পাথরের মতো স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল রাস্তার ধারের এক জীর্ণ কঙ্কালসার অট্টালিকার সামনে।
পুরো বাড়িটা এখন এক বিশাল ধ্বংসস্তূপ। আগাছা আর লতানো বুনো গাছ চারপাশ থেকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরেছে ভাঙা দেওয়ালগুলোকে। ঝুরঝুরে ইঁটের পাঁজর বেরিয়ে আসা সেই ইমারতটা এককালে যে এক বিলাসবহুল রাজপ্রাসাদের মতো ছিল, তার চিহ্ন এখনো টিমটিম করে জ্বলছে প্রবেশদ্বারের জং ধরা নেমপ্লেটে। শেওলা আর ধুলোর আস্তরণ সরালে আবছাভাবে পড়া যায় নামটা—‘রক্তিম তোরণ’।
আর্ভিক নিষ্পলক নেত্রে সেদিকে তাকিয়ে রইল। ওর চোখের মণি দুটো যেন কোনো এক অতীতে গিয়ে থমকে গেছে। তানভী কিছুটা এগিয়ে গিয়েও আর্ভিককে না দেখে পিছন ফিরে তাকাল। ও ধীর পায়ে আর্ভিকের পাশে এসে দাঁড়াল। আর্ভিকের দৃষ্টি অনুসরণ করে তানভী-ও দেখল সেই ধ্বংসস্তূপের দিকে। বাতাসের দীর্ঘশ্বাসের মতো আর্ভিক একটা ঠান্ডা নিশ্বাস ফেলল। তানভী জিজ্ঞেস করল

-“আর্ভিক ভাই, এটা কার বাড়ি?”
আর্ভিক তানভীর দিকে তাকাল। ওর চোখে তখন এক গভীর শূন্যতা আর অব্যক্ত কিছু যন্ত্রণার ছাপ। আর্ভিক ঠোঁট নাড়িয়ে কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল, ঠিক সেই মুহূর্তেই নিস্তব্ধতা খানখান করে দূর থেকে একঝাঁক কোলাহল ধেয়ে এল।
-“কিরে! তোরা এখানে? আমাদের কাউকে না বলে ভোরবেলা কোথায় উধাও হয়ে গেলি!”
রিকি, তৃষাণ, নীলাদ্রি,ঋষি, মেঘাদ্রি, আর সোহাগ-প্রেম সবাই দৌড়াতে দৌড়াতে ওদের কাছে এসে হাজির হলো। পুরো দলটা যেন এক লহমায় গাম্ভীর্যের মেঘ সরিয়ে রোদের ঝিলিক নিয়ে এল। সবাই হাসাহাসি করে বাড়ির দিকে হাঁটা দিল, রিকি ঠিকই সুযোগ বুঝে তানভীকে টিপ্পনী কাটল

ব্যাকুল হৃদয়ের প্রনয়িনী পর্ব ৩৯+৪০

-“তানভী, ভুলে যাসনি তো? দুপুরে কিন্তু তোর হাতের সেই ঐতিহাসিক রান্নার অপেক্ষায় আমরা চাতক পাখির মতো বসে আছি। শর্ত মনে আছে তো?”
আর্ভিক এবার ভ্রু কুঁচকে কটমট করে রিকির দিকে তাকাল। সেই তীক্ষ্ণ চাহনি দেখে রিকি তৎক্ষণাৎ জিভ কেটে চুপ হয়ে গেল। ও বুঝল, বাঘের সামনে বিড়ালের ডাক দিলে আজ আর রক্ষে নেই। তবে আর্ভিকের মনের ভেতর তখনো ‘রক্তিম তোরণ’-এর সেই ভাঙা ইঁটগুলো যেন কোনো গোপন কাহিনীর আর্তনাদ করছিল, যা তানভীর অগোচরেই রয়ে গেল।

ব্যাকুল হৃদয়ের প্রনয়িনী পর্ব ৪৩+৪৪