ব্যাকুল হৃদয়ের প্রনয়িনী পর্ব ৫৩
তানিশা ভট্টাচার্য্য
গাড়ির চাকা ব্যানার্জী মেনশনের সামনে থামল, রুদ্র বাবুর চোয়াল শক্ত, কপালে ধমনীগুলো রাগে ফুলে উঠেছে। গাড়ির দরজাটা সশব্দে খুলে তিনি একপ্রকার টেনে নামালেন তানভীকে। মেয়েটা তখন যেন একখণ্ড পাষাণের মতো নিশ্চুপ, চোখ দুটো জলে ভেজা কিন্তু দৃষ্টি মাটির দিকে স্থির। তাকে আগলে ধরে বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করতেই একটা থমথমে নীরবতা গ্রাস করল চারপাশকে।
বসার ঘরের সোফায় বসেছিলেন দোয়েল ব্যানার্জী। রুদ্র বাবুর এভাবে ঝড়ের বেগে মেয়েকে নিয়ে প্রবেশ করা দেখে তিনি হকচকিয়ে গেলেন। রুদ্র বাবুর উত্তপ্ত শ্বাস আর তানভীর বিধ্বস্ত চেহারা দেখে দোয়েল ব্যানার্জীর বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল। তিনি বিচলিত কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করলেন:
-“কী হয়েছে? আর এভাবে ওকে কেন টেনে আনছ?”
রুদ্র বাবুর কণ্ঠস্বর তখন সপ্তমে। ক্রোধের সেই আগ্নেয়গিরি ফেটে পড়তে দেরি হলো না। ওনার রাগান্বিত কণ্ঠস্বর বাড়ির দেয়াল ছাপিয়ে দোতলার সিঁড়ি পর্যন্ত পৌঁছে গেল। সেই শব্দ শুনেই রুম থেকে বেরিয়ে এল তৃষাণ। পরিস্থিতি বুঝে নিতে তার দেরি হলো না; বাবার আগ্নেয় মূর্তির সামনে সে এক মুহূর্ত থমকে দাঁড়াল।
রুদ্র বাবু নিজেকে আর ধরে রাখতে পারলেন না। ক্রোধের প্রতিটি শব্দ যেন চাবুকের মতো আছড়ে পড়ছিল দোয়েল ব্যানার্জীর কানে। তিনি এক নিঃশ্বাসে বলে চললেন সমস্ত ঘটনা। দোয়েল ব্যানার্জী পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে রইলেন, ওনার চোখে জল এলেও মুখে কথা ফুটল না।
এক পর্যায়ে রুদ্র বাবু তানভীর দিকে তাকিয়ে কঠোর স্বরে বললেন
-“মামণি, এখনই নিজের রুমে যাও!”
তানভী চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল,রুদ্র বাবু এবার তৃষাণের দিকে তাকিয়ে বললেন
-“তোজো, দিভাইকে নিয়ে রুমে যাও।”
তৃষাণ জানত, এই মুহূর্তে কোনো যুক্তিতর্ক বা সান্ত্বনা কাজ করবে না। সে নিঃশব্দে তানভীর হাত ধরে তাকে উপরে নিয়ে গেল। বাড়ির বড় বড় ঘরগুলো তখন এক অসহ্য নিঃস্তব্ধতায় ডুবে গেছে।
বসার ঘরের বদ্ধ বাতাস যেন রুদ্র বাবুর দম আটকে দিচ্ছিল। নিজের ভেতরে জ্বলতে থাকা রাগের দাবানল কিছুটা শান্ত করার জন্য তিনি বাড়ির সামনের প্রশস্ত উঠোনে বেরিয়ে এলেন। সন্ধ্যার অন্ধকার তখন গাঢ় হয়ে নেমেছে।
উঠোনের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে রুদ্র বাবু পায়চারি করতে শুরু করলেন। তাঁর জুতোর শব্দ নিস্তব্ধ রাতে এক অদ্ভুত ছন্দ তৈরি করছিল। আকাশের দিকে তাকিয়ে তিনি এক দীর্ঘশ্বাস ফেললেন, কিন্তু সেই তপ্ত নিশ্বাসও ওনার ভেতরের জ্বালা মেটাতে পারল না।
রাস্তার পিচ যেন আর্ভিকের গাড়ির চাকার ঘর্ষণে হাহাকার করে উঠছিল। উন্মত্ত গতিতে গাড়ি ছুটিয়ে সে এগিয়ে চলেছে; ট্র্যাফিক আইন কিম্বা জীবনের ঝুঁকি, সবই আজ তার কাছে গৌণ। তার ফোন অনবরত বেজে চলেছে, কিন্তু আর্ভিকের সেদিকে ভ্রূক্ষেপ নেই। তার প্রতিটি স্নায়ু তখন কেবল একটিই গন্তব্য চেনে, রুদ্রবাবুর বাড়ি।
মিনিট কয়েকের মধ্যেই আর্ভিকের গাড়িটা রুদ্র বাবুদের বিশাল সিংহদুয়ারের সামনে এসে সশব্দে থামল। সামনেই রাজকীয় ফটক, যেখানে সিকিউরিটি গার্ডরা পাহারায় নিয়োজিত। গেট পেরিয়ে ভেতরে প্রবেশ করলে চোখে পড়ে এক বিশাল উঠান আর সুবিন্যস্ত বাগান, যার মাঝখান দিয়ে চলে গেছে সুদীর্ঘ এক পথ। হেঁটে গেলে অন্তত মিনিট পাঁচেক সময় লাগে মূল ভবনের সদর দরজায় পৌঁছাতে। আর্ভিক গাড়ি থেকে নেমে সবেমাত্র সেই রাজকীয় আঙিনায় পা রেখেছে, অমনি নিস্তব্ধতা চিরে এক বজ্রনির্ঘোষ শোনা গেল
-“দাঁড়াও আর্ভিক! আর এক কদমও এগোবে না!”
উঠোনে পায়চারি করতে থাকা রুদ্র বাবু সিংহের মতো হুঙ্কার দিয়ে উঠলেন। ওনার দৃষ্টিতে তখন ঘৃণা আর ক্ষোভের আগ্নেয়গিরি। তিনি দ্রুত পায়ে এগিয়ে এসে আর্ভিকের পথ রোধ করে দাঁড়ালেন। কণ্ঠস্বর খাদে নামিয়ে অত্যন্ত কঠোরভাবে বললেন
-“কোনো বিশ্বাসঘাতকের ছায়াকেও আমার এই পবিত্র ভিটেয় পড়তে দেবো না। বেরিয়ে যাও এখান থেকে।”
দৃঢ়চেতা আর্ভিক মুহূর্তেই যেন খড়কুটোর মতো ভেঙে পড়ল। রুদ্র বাবুর পায়ের কাছে আছড়ে পড়ে সে আকুল হয়ে বলতে লাগল
-“আঙ্কেল, প্লিজ তানভী কে ফিরিয়ে দিন প্লিজ। আমি তানভীকে ছাড়া বাঁচব না। ওকে ছাড়া আমার পৃথিবী শূন্য, আঙ্কেল!”
আর্ভিকের এই আকুতি পাথরে মাথা কোটার মতো শোনাল। রুদ্র বাবু কোনো উত্তর দিলেন না। তিনি কেবল মুখ ঘুরিয়ে শূন্যের দিকে তাকিয়ে রইলেন এক জীবন্ত পাষাণ মূর্তির মতো, যার হৃদয়ে দয়া বা ক্ষমার কোনো স্থান নেই।
এদিকে বাড়ির ভেতরে, নিজের রুমের এক কোণে হাঁটুতে মুখ গুঁজে কান্নায় ভেঙে ছিল তানভী। বিছানার চাদরটা তার চোখের জলে ভিজে সিক্ত। পাশে বসে থাকা তৃষাণ দিদির এই নিঃশব্দ যন্ত্রণা সহ্য করতে পারছিল না। বাইরে হট্টগোল শুনে তৃষাণ জানালার পর্দাটা সরিয়ে বাইরে উঁকি দিল। নিচে যা দেখল, তাতে তার চোখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। সে উত্তেজনায় বলে উঠল
-“দিভাই! আর্ভিক ভাইয়া এসেছে!”
‘আর্ভিক’ নামটা শোনা মাত্রই তানভীর শরীরে যেন বিদ্যুৎ খেলে গেল। দ্রুত চোখের জল মুছে সে এক লাফে বিছানা ছেড়ে জানালার ধারে এসে দাঁড়াল। তৃষাণ সরে গিয়ে জায়গা করে দিল। নিচে ধুলোর ওপর আর্ভিককে ওভাবে ভেঙে পড়তে দেখে তানভীর হৃদপিণ্ড যেন পাঁজরের দেয়াল ভেঙে বেরিয়ে আসতে চাইল।
সময় নষ্ট করার মতো ধৈর্য তখন তানভীর ছিল না। সে ঝড়ের বেগে রুম থেকে বেরিয়ে এল। সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় তার পায়ের শব্দে সারা বাড়ি মুখরিত হয়ে উঠল। বসার ঘরে দাঁড়িয়ে দোয়েল ব্যানার্জী মেয়ের এই পাগলামি দেখছিলেন। মা হিসেবে তিনি মেয়ের চোখের খুশিতেই নিজের খুশি খুঁজে পান। তিনি কেবল মৃদু স্বরে সতর্ক করলেন
-“সাবধানে যা! নইলে পড়ে যাবি তো!”
কিন্তু তানভী তখন সব বাধার ঊর্ধ্বে সে দৌড়ে চলল উঠোনের দিকে, যেখানে তার পৃথিবী একাকার হয়ে মিশে আছে অপমানের ধুলোয়।
রুদ্র বাবুর প্রতিটি কথা যেন তপ্ত সিসার মতো আর্ভিকের কানে বিঁধছিল। উঠোনের ধুলোয় হাঁটু গেড়ে বসে থাকা আর্ভিকের দিকে তাকিয়ে তিনি অত্যন্ত ঘৃণা মেশানো কণ্ঠে বললেন
-“শোনো আর্ভিক, যদি সত্যিই নিজের ভালোবাসার প্রতি বিন্দুমাত্র সম্মান তোমার থাকে, তবে এই মুহূর্তে এখান থেকে চলে যাও। যদি আর এক কদম এই বাড়ির দিকে এগোও, তবে জেনে রেখো, আজই তানভীর মরা মুখ দেখবে তুমি। আমি ওকে নিজের হাতে শেষ করে দেব, তবুও কোনো বিশ্বাসঘাতকের হাতে তুলে দেব না।”
এক তীব্র হাহাকার আর্ভিকের বুক ফুঁড়ে বেরিয়ে এল। সে মাটির ওপর বসে পড়ে দুই হাত দিয়ে নিজের মুখ ঢেকে চিৎকার করে আর্তনাদ করে উঠল। সেই কান্নায় কোনো ছন্দ ছিল না, ছিল কেবল এক বুকভরা বিচ্ছেদ আর অপমানের যন্ত্রণা। রুদ্র বাবু পাথরের মতো দাঁড়িয়ে রইলেন। কিছুক্ষণ পর আর্ভিক ধীরলয়ে ধুলো ঝাড়তে ঝাড়তে উঠে দাঁড়াল। তার চোখে তখন শ্রাবণের ধারা, কিন্তু শরীরে এক অদ্ভুত জড়তা। সে রুদ্র বাবুর দিকে তাকিয়ে ক্ষীণ স্বরে বলল
-“আমার তানভীকে ভালো রাখবেন আঙ্কেল, কোনো কষ্ট দেবেন না… তানভীকে আমি নিজের চেয়েও বেশি ভালোবাসি।”
আর্ভিক ধীরপায়ে ফটকের দিকে হাঁটতে শুরু করল। তার প্রতিটি পদক্ষেপ যেন এক একটি যুগের সমান ভারী। হঠাৎ করেই নিস্তব্ধতা চিরে তার গলায় সুর ফুটে উঠল। জীবনের চরম পরাজয়ের মুহূর্তে সে গেয়ে উঠল
“Duniya mein kitni hain nafratein
Phir bhi dilon mein hai chahtein…”
সুরটা বাতাসের সাথে মিশে গেল। আর্ভিকের গানের মাঝেই তানভীর কাঁপা কাঁপা গলায় প্রতিধ্বনি হয়ে ফিরে এল উত্তরের কলি
“Mar bhi jaayein pyaar waale
Mit bhi jaayein yaar waale
Zinda rehti hain unki mohabbatein
Zinda rehti hain unki mohabbatein…”
হঠাৎ তানভীর কণ্ঠস্বর শুনে আর্ভিক থমকে দাঁড়াল। সে পেছন ফিরে তাকাল। দেখল, তার প্রাণের তানভী দুই হাত বাড়িয়ে পাগলের মতো তার দিকে ছুটে আসছে। তানভীর দুচোখ ছাপিয়ে জল পড়ছে, তার কোমর পর্যন্ত এলোমেলো চুল হাওয়ায় উড়ছে। আর্ভিক যেন একরকম ঘোরে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার দুচোখ ভরে জল এল; সে-ও এক হাত বাড়িয়ে দিল তার প্রিয়তমার দিকে। মনে হচ্ছিল, আর মাত্র কয়েক সেকেন্ড, তারপরই পৃথিবীর সব ঘৃণা মুছে গিয়ে দুটো আত্মা এক হয়ে যাবে।
কিন্তু নিয়তি ছিল অন্যরকম। তানভী যখন আর্ভিকের প্রায় হাতের নাগালে, ঠিক তখনই রুদ্র বাবুর লোহার মতো শক্ত হাত তানভীর কবজি চেপে ধরল। এক লহমায় দুজনের ভালোবাসার মায়াবী ঘোরটা কাঁচের মতো চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে গেল। তানভী আর্তনাদ করে উঠল
-“বাবা! ছেড়ে দাও! প্লিজ ছেড়ে দাও আমাকে! আমি আর্ভিকের কাছে যাব বাবা, প্লিজ!”
রুদ্র বাবু কোনো কথা বললেন না। ওনার চেহারায় তখন এক কঠোর জেদ। তিনি মেয়ের কবজি এমনভাবে চেপে ধরেছেন যেন কোনো অপরাধীকে ধরে রেখেছেন। তানভী ছটফট করতে লাগল, তার বাবার হাত থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করতে লাগল, কিন্তু বিফল। রুদ্র বাবু আর্ভিকের দিকে ঘৃণার দৃষ্টি হেনে সিকিউরিটি গার্ডদের দিকে তাকিয়ে হুঙ্কার দিয়ে উঠলেন
-“তাড়াতাড়ি গেটটা বন্ধ করো! আর সাবধান, ভবিষ্যতে যার তার জন্য এই গেট যেন আর না খোলা হয়!”
কথাগুলো তিনি সরাসরি আর্ভিকের চোখে চোখ রেখে বললেন। তারপর একপ্রকার অমানুষিক টানে তানভীকে মাটির ওপর দিয়ে হিঁচড়ে বাড়ির ভেতরের দিকে নিয়ে যেতে লাগলেন। তানভী তখনও পেছনের দিকে ফিরে আর্ভিকের দিকে হাত বাড়িয়ে আকুতি জানাচ্ছিল।
আর্ভিক দিশেহারা হয়ে দৌড়ে গিয়ে বিশাল লোহার গেটটা দুহাতে খামচে ধরল। তার পৃথিবী তখন ওপারে বন্দি হয়ে যাচ্ছে। লোহার শিকের ফাঁক দিয়ে সে চিৎকার করে বলতে লাগল
-“তানভী! আমাকে এভাবে একা ফেলে যাস না! আমি বাঁচব না তানভী, প্লিজ যাস না!”
ভারী লোহার গেটটা এক কর্কশ শব্দে বন্ধ হয়ে গেল। মাঝখানে পড়ে রইল এক দুর্ভেদ্য দেয়াল। আর্ভিক গেটের ওপারে দাঁড়িয়ে দেখল, তানভীর সেই বাড়িয়ে দেওয়া হাতটা ক্রমশ ঝাপসা হয়ে বাড়ির অন্ধকারে মিলিয়ে যাচ্ছে। নিস্তব্ধ রাতে কেবল শোনা যাচ্ছিল আর্ভিকের গুমরে মরা কান্নার শব্দ আর বন্ধ গেটের ওপার থেকে তানভীর ক্ষীণ হয়ে আসা আর্তনাদ
-“আর্ভিক…”
রুদ্র বাবুর ক্রোধ তখন সংহারী রূপ ধারণ করেছে। কোনো মিনতি, কোনো অশ্রু আজ তাঁর কঠোর সংকল্পে ফাটল ধরাতে পারল না। তিনি তানভীকে একপ্রকার হিঁচড়ে টেনে নিয়ে গেলেন তার শয়নকক্ষের দিকে। কক্ষে প্রবেশ করিয়েই রুদ্র বাবু সজোরে দরজাটা বন্ধ করে দিলেন। পরক্ষণেই বাইরে থেকে দরজায় তালা ঝুলিয়ে দিলেন।
-“বাবা! দয়া করো বাবা! দরজাটা খোলো! আমি আর্ভিকের কাছে যাব!”
তানভী রুদ্ধ দ্বারে করাঘাত করতে লাগল। তার নখের আঁচড়ে কাঠের দরজায় যেন ক্ষতের সৃষ্টি হচ্ছিল, কিন্তু ওপাশে থাকা মানুষটির হৃদয় আজ অরণ্যের চেয়েও দুর্ভেদ্য। রুদ্র বাবু একবার স্থির দৃষ্টিতে ওনার স্ত্রী দোয়েল ব্যানার্জী এবং ছেলে তৃষাণের দিকে তাকালেন। সেই চাউনিতে ছিল এক চরম হুঁশিয়ারি। গম্ভীর ও বরফশীতল কণ্ঠে তিনি বললেন
-“আমি না বলা পর্যন্ত এই দরজা যেন না খোলা হয়। আমার কথার অন্যথা হলে পরিণাম ভালো হবে না।”
এইটুকু বলে তিনি আর পেছনের দিকে তাকালেন না। গটগট করে হেঁটে নিজের রুমে চলে গেলেন।
নিস্তব্ধ রাতের বুক চিরে তানভীর আর্তনাদ তখন দেয়ালে দেয়ালে ধাক্কা খেয়ে ফিরে আসছে। ঘরের প্রতিটি কোণ যেন তাকে বিদ্রূপ করছিল। আর্ভিকের কাছে তাকে যেতেই হবে, এই জেদ এখন তার রক্তে মিশে গেছে। কিন্তু বের হওয়ার পথ কোথায়? বাবা বাইরের থেকে দরজায় ভারী তালা ঝুলিয়ে দিয়েছে, যেন তানভী কোনো অপরাধী, কোনো খাঁচাবন্দি পাখি।
গুমোট অন্ধকার ঘরে তানভীর মস্তিষ্ক তখন ঝড়ের গতিতে কাজ করছিল। হঠাৎ তার মনে পড়ল থ্রিলার উপন্যাস আর সিনেমার সেই দৃশ্যগুলো। পালানোর ধ্রুপদী পথ ব্যালকনি। সে টলমল পায়ে ব্যালকনির স্লাইডিং ডোরটা সরালো। ওপর থেকে নিচে তাকাতেই বুকটা ছ্যাঁত করে উঠল তার; অনেকটা উঁচুতে সে। কিন্তু হৃদয়ের টান কি আর উচ্চতার ভয় মানে?
তানভী দ্রুত হাতে জানালা আর দরজা থেকে পর্দাগুলো খুলে নিল। মখমল আর সুতির কাপড়গুলো এখন তার মুক্তির সোপান। প্রতিটি পর্দা সে শক্ত গিঁট দিয়ে একে অপরের সাথে জুড়তে লাগল। ঘাম আর চোখের জলে তার দৃষ্টি ঝাপসা, কিন্তু আঙুলগুলো চলল নিখুঁতভাবে। ব্যালকনির রেলিং এর সাথে সেই কাপড়ের দড়ির এক প্রান্ত এমনভাবে বাঁধল যাতে একচুলও না নড়ে। এরপর নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সে ঝুলে পড়ল সেই কাপড়ের দড়িতে।
নিচে নামার সময় ঘর্ষণে হাতের তালু জ্বলে যাচ্ছিল। মাঝপথে এসে ভারসাম্য হারিয়ে ফেলল তানভী। একটা আর্তনাদ গলার কাছে এসেও আটকে গেল। হড়কে গিয়ে সোজা নিচে আছড়ে পড়ল সে। পিনপতন নিস্তব্ধতায় তার পতনের শব্দটা যেন বোমার মতো শোনাল। বাঁ পা-টা বিশ্রীভাবে মচকে গেছে। ব্যথায় দাঁতে দাঁত চেপে সে উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করল। ফিসফিসিয়ে নিজেকেই বলল
-“যতটা সোজা ভেবেছিলাম, এটা আসলে ততটা সোজা নয়।”
খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে সে এগোতে লাগল। সদর দরজার দিকে যাওয়ার সাহস নেই, সেখানে কড়া পাহারাদার। তার মনে পড়ল পেছনের ছোট দরজাটার কথা।
পেছনের দরজার কাছে পৌঁছে তানভীর ঠোঁটের কোণে একটা বাঁকা হাসি ফুটে উঠল। তার জানা ছিল, পাহারাদাররা এই পুরনো মরচে ধরা দরজাটায় তালা দিতে প্রায়ই ভুলে যায়। আজো তার ব্যতিক্রম হয়নি। ভাগ্য যেন আজ তার পক্ষেই ছিল। নিঃশব্দে কপাট ঠেলে সে বেরিয়ে পড়ল বাইরের পৃথিবীতে।
তানভীদের বাড়িটা শহর থেকে বেশ দূরে, এক নির্জন প্রান্তরে। যেদিকে চোখ যায় শুধু ধূ ধূ প্রান্তর আর দীর্ঘ ছায়া ফেলা গাছপালা। অন্তত কুড়ি মিনিটের দ্রুত হাঁটা পথ পার হলে তবেই লোকালয়ের দেখা মিলবে। মচকানো পা নিয়ে সেই পিচঢালা অন্ধকার রাস্তায় দৌড়ানো ছিল তানভীর কাছে এক দুঃসাধ্য লড়াই। ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক আর নিজের হাপরের মতো চলা নিঃশ্বাসের শব্দ ছাড়া আর কিছুই শোনা যাচ্ছিল না।
হঠাৎ, সেই অন্ধকার চিরে ধেয়ে এল তীব্র আলোর ঝিলিক। পেছন থেকে নয়, তানভীর ঠিক সামনে চার-চারটে বিশালকায় কালো এসইউভি এসে ব্রেক কষল। টায়ারের ঘর্ষণে উত্তপ্ত রাবারের গন্ধে বাতাস ভারী হয়ে উঠল। তানভীর থমকে দাঁড়াল। তার হৃদপিণ্ড তখন গলার কাছে আছড়ে পড়ছে। পালাতে চেয়েছিল সে ভালোবাসার টানে, কিন্তু এ কোন মরণফাঁদে এসে পা দিল?
গাড়িগুলো চারপাশ থেকে তানভীকে ঘিরে ধরল। এরপর গাড়ির দরজাগুলো একই সাথে খুলে গেল। একেকটা যমদূতের মতো কালো পোশাকধারী দীর্ঘকায় কিছু মানুষ নেমে এল। তাদের চোখেমুখে কোনো আবেগ নেই, শুধু যান্ত্রিক নিষ্ঠুরতা। তানভী কিছু বুঝে ওঠার আগেই তারা তাকে ঘিরে ধরল।
-“কে আপনারা? কী চান আমার কাছে? ছাড়ুন আমাকে!”
তানভী চিৎকার করে উঠল। তার আর্তনাদ সেই নির্জন প্রান্তরের বাতাসে মিলিয়ে গেল। কোনো কথা নেই, কোনো কৈফিয়ত নেই,লোকগুলো দানবীয় শক্তিতে তানভীকে টেনে তুলে নিল মাঝখানের গাড়িটাতে। তানভী সর্বশক্তি দিয়ে ছটফট করতে লাগল, হাত-পা ছুঁড়ল, কিন্তু ওই লোহার মতো কঠিন হাতগুলোর কাছে তার প্রতিরোধ ছিল খড়কুটোর মতো।
ব্যাকুল হৃদয়ের প্রনয়িনী পর্ব ৫২
গাড়িগুলো স্টার্ট নিল। সেকেন্ডের ব্যবধানে হেডলাইটের আলো মিলিয়ে গিয়ে রাস্তাটাকে আবার সেই আদিম অন্ধকারে ডুবিয়ে দিয়ে তারা অদৃশ্য হয়ে গেল। পেছনে পড়ে রইল শুধু তানভীর পড়ে যাওয়া একপাটি জুতো আর একরাশ রহস্য।
