Home ভাব তরঙ্গ ভাব তরঙ্গ পর্ব ২২

ভাব তরঙ্গ পর্ব ২২

ভাব তরঙ্গ পর্ব ২২
বেলা শেখ

মাঝ রাত থেকেই মুষলধারায় বৃষ্টি। মাঝে মাঝে বিদ্যুৎ চমকায়, বজ্রপাতের বিকট শব্দে কানে ঝি ঝি ধরিয়ে দেয়। কখনো ঝড়োয়া হাওয়া গায়ে কাঁপন এনে দিচ্ছে। বৃষ্টির পানির হিমশীতল স্পর্শে গায়ের রোমকূপ জেগে ওঠে। সাদা কালো চেক শার্টের সবগুলো বোতাম খোলা! ভেতরের কালো টিশার্ট বুকের সাথে সেঁটে। কপালে আঁছড়ে পড়া ছন্নছাড়া চুলগুলো চুঁইয়ে চুঁইয়ে পানি পড়ছে। ভাসা ভাসা চোখ দুটো রক্তিম। চোখের ঘন পাপড়ি নত হয়ে পলক ঝাপটায়। চোখ ছাপিয়ে গড়িয়ে পড়া উষ্ণ বারিধারা বৃষ্টির হিম ফোঁটার মিলে মিশে একাকার। অরুণাভ সরকার বদ্ধ জানালার দিকে তাকায়। সেখানে বসে এক অবুঝ প্রাণী। মালিককে পাহারা দিচ্ছে। মাঝেমধ্যে লেজ নাড়িয়ে মিউ মিউ করে ডাকছে। ঝাপসা কাঁচে ছোট্ট থাবা দিয়ে বারবার আঁচড় কাটে।

প্রহরের লাল টুকটুকে অধরজোড়ায় মুচকি হাসি দেখা দিলো। বদ্ধ চোখ জোড়া কাঁপছে মৃদুমন্দ। চোখ মেলে তাকালো সে। আড়মোড়া ভেঙে পাশ ফিরে সে। মাথার নিচে দুই হাত দিয়ে বোনের দিকে তাকায়। গালে হাত রেখে ডাকলো, “আপুনি গুড মর্নিং হয়ে গেছে! উঠবে না?”
অরুণিতা নড়েচড়ে উঠলো। অল্প চোখ খুলে দেখলো প্রহরকে। পাশ ফিরে শুয়ে আবারও চোখ বন্ধ করে নিলো। প্রহর মিটিমিটি হেসে মুখ বাড়িয়ে বোনের গালে চুমু দিয়ে মিহি স্বরে বলল,
“গুড মর্নিং আপুনি!”
অরুণিতার কপালে বিরক্তের ভাঁজ খেলে যায়। গাল মুছে প্রহরের দিকে ফিরলো। প্রহরের অধরজুরে রৌদ্দুরেরা এক্কাদোক্কা খেলছে।

“হাসছো কেন তুমি?”
“আমি আজ স্বপ্ন দেখেছি।”
“ওহ্ আচ্ছা।”
“জানো কাকে স্বপ্ন দেখেছি?”
অরুণিতা জানতে চায় না। কিন্তু প্রহর জানাতে চায়। সে চঞ্চলা কন্ঠে বলল, “আজ আমার স্বপ্নে কালো ভাল্লুক এসেছিল।”
“রিয়েলি?” অরুণিতা আগ্রহ প্রকাশ করে। প্রহর মিটিমিটি হেসে বলল, “হ্যাঁ, তুমি কালো ভাল্লুকের হাত ধরে ছিলে।”
“আমি?” অরুণিতার ঘুম জড়ানো চোখ দুটো বড় বড় হয়ে আসে। প্রহর উপরনিচ মাথা নেড়ে বলল, “পাপাও ছিলো ওখানে! অনেক রেগে ছিলো। তারপর আর মনে নেই!”
অরুণিতার চোখ ছোট ছোট হয়ে আসে। প্রহর মনে করার চেষ্টা করে কিন্তু মনে করতে পারে না। অরুণিতা হামি তুলে। কম্ফোর্টার টেনে আপাদমস্তক ঢেকে পুনরায় ঘুমানোর প্রস্তুতি নেয়। বিড়বিড় করে বলে, “এদের মধ্যে কানেকশনটা কি? একজন মিস করে, আরেকজন স্বপ্ন দেখে!”
ইউরিনের উটকো গন্ধে খুব বেশিক্ষণ কম্ফোর্টারে থাকতে পারে না অরুণিতা। কম্ফোর্টার সরিয়ে বিরক্ত মুখে উঠে বসে। রাগী গলায় বলে, “আবার বিছানা ভিজিয়েছো তুমি?”
প্রহর ভীতু চিত্তে বোনের দিকে তাকালো। কালো মুখে বলল, “আমি তো ওয়াশরুমেই শিশি দিয়েছিলাম। ওয়াশ রুম বিছানা হয়ে গেলে আমার কি দোষ?”

“মাম্মাম” বলে চেঁচিয়ে ওঠে অরুণিতা। প্রহর কানে হাত চেপে বলে, “তেলাপোকা দেখেছো?”
অরুণিতা দাঁত কটমট করে বলল, “কই তেলাপোকা?”
“তাহলে চেঁচাচ্ছো কেন?”
“যাস্ট শাট আপ, ওলাফ।”
প্রহর মুখে আঙুল দিয়ে লক করে নিলো। অরুণিতা দরজার দিকে আঙুল তুলে চেঁচিয়ে বলল, “গেট আউট ফ্রম মায় রুম!”
“মায় রুম না, বলতে হয় আওয়ার রুম!” প্রহর বোনের কথা শুধরে দিতে চায়। অরুণিতা রাগতে নিয়েও সন্দেহ বশত ভ্রু কুচকালো, “আওয়ার রুম মানে?”
“আওয়ার রুম মানে আমাদের রুম! তুমি এটাও জানো না?” প্রহর কপাল চাপড়ে বলল।
অরুণিতা দাঁত কটমট করে বলে, “ওলাফ, এটা আমার রুম। আমাদের না, বুঝলে?”
প্রহর স্বভাবসুলভ হাসলো। নিজ ধীর স্বভাব প্রকাশ করে বলল, “মাম্মাম বলেছে, এটা আমারও রুম। নিউ বেইবি এসে গেলে আমি তোমার সাথেই থাকবো। তখন খুব মজা হবে!”
ব্যস অরুণিতা চেঁচিয়ে পুরো বাড়ি মাথায় তুলে নেয়। তাঁর চেঁচামেচিতে বিরক্ত হয়ে ছুটে আসে পাতা। মেয়ের উপর খেকিয়ে উঠলো নিমিষেই, “ডাকাত পড়েছে? গলা ফাড়ছিস কেন বেয়াদব?”
অরুণিতা বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো। বলল, “তোমার আদরের ছেলে যা বলছে তা কি সত্যি?”
পাতা প্রহরের দিকে তাকিয়ে বলল, “আমার আদরের ছেলে কখনও মিথ্যা বলে না। তার মানে যা বলেছে তা সত্যিই।”

অরুণিতার পা থেকে মাথা অবদি জ্বলে পুড়ে ছারখার। সে কর্কশ কণ্ঠে বলল, “লেট মি ক্লিয়ার মায়সেল্ফ! আই উইল নেভার শেয়ার মাই রুম উইথ এনিওয়ান…নো ওয়ে।”
মেয়ের কথার মানে বুঝতে পাতা কতক্ষণ সময় নিলো। খানিকটা আহ্লাদিত সুরে বলল, “আম্মু তুই না আমার সোনা মেয়ে! প্রহর ছোট না বল? একলা রুমে থাকতে পারবে না। তারচেয়ে ভালো দুই ভাইবোন গলাগাটি ধরে ঘুমাবি!”
“পাম দিয়ে কাজ হবে না। আমিও ছোটই ছিলাম। একলা থাকতে ভয় পেতাম। কই তখন তো আমাকে ভাইয়ার রুমে থাকতে বলো নি? আমি একা থেকেছি, ও-ও থাকবে। আমি আমার রুম শেয়ার করছি না। নো মোর আরগিউ।”
অরুণিতা নিজ সীদ্ধান্ত জানান দিয়ে ওয়াশ রুমে চলে যায়। পাতা ছেলের দিকে তাকিয়ে বলল, “পেটে কথা থাকে না তোমার?”
প্রহর চোখ পিটপিট করে তাকালো। আপুনি এতো রাগী কেন? পাতা এগিয়ে আসে। বিছানা ভেজা দেখে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “এই রোগ কবে সারবে আল্লাহ মালুম! তোমার পাপাকে বলবো প্যাম্পাস আনতে। কাল থেকে প্যাম্পাস পরে ঘুমাতে যাবে।”

প্রহর কাঁদো কাঁদো মুখে বলে, “আমি কি ছোট বেবি? সবাই হা হা করে হাসবে!”
“কেউ হাসবে না ছোট আব্বা! এখন জলদি ওঠো।”
প্রহরকে গোসল করাতে সাহায্য করে পাতা। ভেজা গা গতর মুছিয়ে গায়ে লোশন মাখে। জামা কাপড় পরিয়ে বলে, “এতদিন সবার ছোট ছিলে তাই আদরে সোহাগে মুড়িয়ে রেখেছিলাম। এখন তোমার থেকেও ছোট কেউ আসবে। তোমাকে ভাইয়ু ডাকবে। বড় হয়ে যাবে তুমি। আর বড়রা কি করে মনে আছে?”
“আছে তো! বড় হয়ে গেলে আর পাপা মাম্মামের সাথে ঘুমানো যাবে না, একা একাই খেতে হয়, একা একাই কাপড় পরতে হয়, একা একাই গোসল করতে হয়। হিংসে করতে হয় না। বাবুকে অনেক অনেক ভালোবাসা দিতে হয়। যেমন ভাইটুস দেয় আমাকে আর আপুনিকে।”
পাতা মুচকি হাসলো! প্রহর গালে হাত বুলিয়ে সেই হাতটায় ঠোঁট ছুঁইয়ে চুমু খায়, “আমার সোনা ছেলে!”
“মাম্মাম?” অরুণিতা দরজায় দাঁড়িয়ে। পাতা কপাল কুঁচকে বলল, “কি হয়েছে, আম্মু?”
“কিচেনে কে?”

পাতার কপালের ভাঁজ শিথিল হয়। থমথমে মুখে বলে, “তোর পাপা!”
“সাথে ওই মেয়েটা কে? কাজের মহিলা রেখেছে নাকি!”
“কি জানি!”
“তাঁর গায়ে আমার ড্রেস কেন? আমার অনুমতি ছাড়া আলমারিতে কেন হাত দেওয়া হয়েছে?”
অরুণিতার কণ্ঠে আকাশছোঁয়া রাগ। তাঁর পছন্দের ড্রেসটা! পাতা জবাব দিলো না। মেয়েকে বিছানায় বসিয়ে ভেজা চুল গুলো সযত্নে মুছে দিলো। মুখে বেবি লোশন মাখেলো। অরুণিতা নাক মুখ কুঁচকে বিরক্তিকর ভাব ফুটিয়ে তোলে। সে কি বাচ্চা নাকি! সে বিরক্ত প্রকাশ করবে হঠাৎ মায়ের চোখে চোখ পরে। থমকে যায় সে। অবাক হয়ে শুধালো,
“হোয়াট হ্যাপেন মাম্মাম?”

পাতা চোখের পানি লুকানোর চেষ্টা করে। নিজেকে স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করে বলে, “ছেলেটা সেই রাত থেকে বাইরে। ঝড় বৃষ্টি ওর মাথার উপর দিয়েই বয়ে গেলো। আমি গিয়েও আনতে পারিনি। জেদি বাপের জেদি ছেলে কি-না! একটু গিয়ে নিয়ে আয় না সোনা মা? গার্ডেনেই দাঁড়িয়ে আছে।”
অরুণিতার চোখ জোড়া ছোট ছোট হয়ে আসে, “হয়েছে টা কি?”
ভেজা চোখের পাতা আবারও ভিজে যায়।‌ টলমলে দিঘীর জল ফোঁটায় ফোঁটায় গড়িয়ে পড়ে। হাতের উল্টোপিঠে ঘনঘন চোখ মুছে পাতা বলে, “মেরেছে ছেলেটাকে!”
ঠোঁট দুটো কেঁপে কেঁপে উঠছে। আরো কিছু বলার থাকলেও গলা দিয়ে শব্দ বেরোয় না পাতার। অরুণিতার অবাক হবার পালা। মায়ের চোখের পানি গাল বেয়ে টপটপ করে তার হাতের উপর পড়ছে। তাঁর মাম্মামের মনটা শিমুল তুলোর চেয়েও বেশি পেলব।
“পাপা ভাইকে মেরেছে?”
সর্দিতে নাক বন্ধ হয়ে গেছে। পাতা হা হা করে শ্বাস টেনে কান্না থামানোর চেষ্টা করে। অরুণিতা মাকে জড়িয়ে ধরতেই পাতা নিজেকে ধরে রাখতে পারে না। মেয়েকে জড়িয়ে হুঁ হুঁ করে কেঁদে ওঠে। থেমে থেমে বলে, “ওই লোকের গায়ে একটুও দয়া মায়া নেই রে অরু। আমারই চোখের সামনে কিভাবে মারলো আমার ছেলেটাকে! ওই শক্ত ব্যাট…”
পাতার কান্নার মাত্রা বেড়ে কয়েকগুণ। প্রহরের মুখটা চুপসে আছে। অরুণিতার মাথা ফাঁকা ফাঁকা লাগে। হঠাৎ কি হলো?

“আম্মু ভোর ন্যাশনাল টিমের হয়ে খেলবে। ক্যারিয়ার সেটেল হয়ে গেছে। ওর ভবিষ্যত এনার্জি বাল্পের মতো চকচক করছে। তারপরও তোমার কিসের সমস্যা বলবে শুনি?”
রুবি মেয়ের ঘরের বিছানা গোছাতে গোছাতে জবাবে বলল, “ন্যাশনাল টিমে সিলেক্ট হলেই ক্যারিয়ার সেট, এটা তোমাকে কে বলেছে?”
“আম্মু…”
“আনিকা, আমাদের সমস্যা ভোরকে ঘিরে। ওঁর ক্যারিয়ার নিয়ে ছিলো না। বাংলা কথা বোঝো না কেন তুমি? ভোর আর তোমার সংসার যদি হয়েও যায়, তবুও তোমরা হ্যাপিলি ম্যারিড লাইভ লিড করতে পারবে না।”
“সত্যিই পারবো না। কারণ ভোর তোমার মতো ঘারত্যাড়া শ্বাশুড়ি পাবে। যে উঠতে বসতে মেয়ে জামাইয়ের খুঁত ধরবে, খোঁচাবে। সংসারে ঝামেলা সৃষ্টি করবে।”

আনিকা বলতে বিন্দুমাত্র দ্বিধাবোধ করলো না। রুবি ধমকে উঠলো মেয়েকে। আনিকা তাঁর ধমকে ভ্রুক্ষেপ করলো না। পার্স আর ফোনটা নিয়ে বেরিয়ে এলো। ভোর তাঁর ফোনকল রিসিভ করছে না, ম্যাসেজ দেখছে না। নিচে নামতেই বাবার সাথে দেখা। ভদ্রলোক খবরের কাগজে ভাতিজাকে খুঁজে চলেছেন।
“আব্বু, আমি চাচ্চুদের ওখানে যাচ্ছি। ভোরকে কনগ্র্যাচুলেট করতে। তুমি কি যাবে?”
আরিয়ানের যাওয়ার ইচ্ছা তো হয়। তবে ভাইয়ের উপর অভিমান একটু বেশিই।‌ এভাবে হুট করে বাড়ি ছাড়ায় সে খুব কষ্ট পেয়েছে। তাছাড়াও শুধু বাড়ি ছাড়ে নি, যোগাযোগটাও বন্ধ রেখেছে। সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “না, আমার হয়ে ভোরকে কনগ্র্যাচুলেশন জানিও! আর এটা ভোরকে দিও!”
আনিকা গিফট বক্স হাতে নেয়, “কি আছে এতে?”
“স্পোর্টস শু”
“আমারও কিছু দেওয়া উচিত, তাই না?”
আরিয়ান বাঁকা চোখে চেয়ে বলল, “এটাই তোমার নামে দিও। আর জলদি ফিরে এসো।”
“ওকে আব্বু!” আনিকা চলে যাচ্ছিলো আরিয়ান মেয়েকে ডাকলো। খবরের কাগজ ভাঁজ করতে করতে বলল, “কালকে ভাইয়ের কথার ধরন খেয়াল করেছিলে?”

আনিকার মুখটা কালো হয়ে গেলো। খেয়াল করে নি আবার? আরিয়ান কোমল স্বরে বলল, “কনগ্র্যাচুলেট হিম লাইক আ কাজিন। আমি আগেও ভোরের সাথে তোমার রিলেশনের বিরুদ্ধে ছিলাম, এখনও আছি। তোমার আর ভোরের সম্পর্ক আমাদের পরিবারের সম্পর্ক গুলোকে ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়েছে। আমাদের হাসিখুশি পরিবারটা আলাদা হয়ে গেছে আনিকা। এখন তো শুধু আলাদা হয়েছে— সম্পর্ক যদি পাকাপোক্ত হতো আমি সুনিশ্চিত তিক্ততা আরও বাড়বে। তাই বাবা হিসেবে আমি তোমার কাছে দুই হাত জুড়ে অনুরোধ করছি এসবে আর জড়িও না। আমি যতদূর জানি তোমাদের মধ্যেও সব শেষের পথেই। এর থেকেই শিক্ষা নাও, তোমাদের আন্ডারস্ট্যান্ডিং লেভেল কতটা লো। নতুন করে শুরু করিও না কিছু। কালকে তোমার চাচ্চুর দেওয়া খোঁচার পর তো আরও না। ইটস মায় হাম্বেল রিকুয়েস্ট আনিকা।”
“আব্বু, আই লাভ ভোর!” আনিকার চোখে জল চিকচিক করছে। সেথায় ফুটে ওঠে আকুতি মিনতি আর বুক ভরা আশা। আরিয়ান তপ্ত শ্বাস ফেলে বলল, “ইটস্ নট লাভ আনিবুড়ি। যাস্ট ইনফ্যাচুয়েশন! সময়ের সাথে সাথে মলিন হয়ে যাবে।‌ কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না, মিলিয়ে নিও।”
আনিকার ভেতরটা চূর্ণ বিচূর্ণ হয়ে গেলো। সবাই তাঁর আর ভোরের ভালোবাসার বিরুদ্ধে কেন অবস্থান করছে? সে আর ভোর মিলে গেলে কি ধরনী ফেটে পাতালপুরী বেরিয়ে আসবে? নাকি আকাশ চিড়ে ফেরেশতারা বেরিয়ে আসবে? কেন সবাই বিশ্বাস করে না—সে আর ভোর মিলে একটা সুখের সংসার গড়ে তুলতে পারে। আনিকা মনে মনে অনেক বড় সিদ্ধান্তে উপনীত হয়। অনেক হয়েছে বোঝাপড়া, মন আর পরিবারের বিরুদ্ধে লড়াই— এখন একটা পরিণতিতে আসা দরকার! ফোর টোয়েন্টির সাথে কথা বলা দরকার।

‘ছাইয়া ছেড় দেভে, নানান্দ চুটকি লেভে,
সাসুরাল গেন্দা ফুল!
সাস গাড়ি দেভে, দেবার জি সামঝা লেভে,
সাসুরাল গেন্দা ফুল!
ছাইয়া হেয় বেপারি, চালে হেয় পারদেশ।
সুরাতিয়া নিহারু, জিয়ারা ভারি হোভে
সাসুরাল গেন্দা ফুল….’
মেয়েলী সুরেলা কণ্ঠ ধীরে ধীরে থেমে গেলো। অরুণ সরকার ঘাড় ঘুরিয়ে আবারও হুকুম করে, “হেই গুগল, রিপিট দিস সং অন স্পটিফাই।”
গান আবারও বাজতে শুরু করলো। অরুণ এবার গানের তালে তাল মেলায়। গুনগুনিয়ে আপন ছন্দে পরোটা বেলে যায়। আড়চোখে রান্নাঘরের এক কোণে বসে থাকা বোবা প্রাণিটিকে দেখে নিয়ে বলল,
“পত্রলেখা মুবিন পাঠান, ঠিক বললাম নাকি ভুল?”

আচানক নিজ নাম শুনে অষ্টাদশী হকচকিয়ে গেল। হাত থেকে তাজা রুই মাছ পিছলে গেলো। জল প্রাণীটি মেঝেতে ছটফট করছে। অরুণ সরকার জবাবের অপেক্ষায় চেয়ে। পত্রলেখা অস্বস্তির ভারে নুইয়ে আছে। এহেন পরিস্থিতিতে গান? তাঐ আবার ‘সাসুরাল গেন্দা ফুল’! লজ্জায় সুশ্রী মুখ খানা রক্তিম হয়ে ফুটেছে। সে কোনোরকম মাথা নাড়লো।
অরুণ ভ্রু উঁচিয়ে বলল, “আফগানি আপনি?”
পত্রলেখা বিভ্রান্তিতে পড়ে যায়। আফগানিস্তানে জন্ম! বাবা মারা যাবার পর মায়ের সাথে বাংলাদেশে পারি জমিয়েছে। তারপর বাংলাদেশেই তাঁর ঠায়। বাঙালীয়ানা রপ্ত করলেও নিজ জন্মভূমির প্রতি টান এখনও মনের কোণে জিইয়ে রেখেছে। সে মাথা নাড়লো।
অরুণ দ্বিধায় তাকিয়ে রইলো, হ্যাঁ বলল নাকি না? একটু পর ভ্রু কুঁচকে বলল, “পড়াশোনা কতদূর?”
জড়সড় পত্রলেখা আরও গুটিয়ে যায়। কি বলবে? ফাইফ পাশটাও হয় নি! দুটো পরীক্ষা দিতে পারে নি। সহপাঠীরা তাঁর ইশারা ইঙ্গিতে বলা কথাকে বিকৃত করে হরহামেশা মজা নিতো। রাগে একটা মেয়ের মাথা ফাটিয়েছিল। হেট মাস্টার মা’কে ডেকে হাতে টিসি ধরিয়ে দিলো। সাথে ফ্রিতে সাজেশন দিয়েছিলো— প্রতিবন্ধী স্কুল। তারপর আর স্কুলের ত্রিসীমানায় ঘেঁষে নি সে।
“কোন ক্লাসে পড়েন? আই গেস টুয়েলভ!”

পত্রলেখা না বোধক মাথা নাড়লো। হাতের পাঁচ আঙুল দেখিয়ে, সাথে সাথে হাতের চার আঙুল ভাঁজ করে বৃদ্ধাঙ্গুল নিচের দিকে নামি নামিয়ে নিলো। অরুণ কিছু বুঝলো, কিছু বুঝলো না। সে পড়াশোনা নিয়ে মাথা ঘামালো না। ছেলে তাঁর বিদ্যাসাগর কি-না! সে বলল, “মুবিন খুবই নরম মনের মানুষ ছিল, একদম সহজ-সরল। অথচ আপনাকে দেখে আমার ধুরন্ধর মনে হয়।”
বাবার কথায় পত্রলেখার কান খাঁড়া হলেও শেষ কথায় মুখ চুপসে গেল।‌ তাঁকে ধুরন্ধর লাগে? অরুণ একদৃষ্টে চেয়ে আছে। মুহুর্তের মধ্যে স্বাভাবিক মুখটায় গাম্ভীর্যের প্রাদুর্ভাব দেখা যায়। ভরাট গলায় বলে, “আমার ছেলে, আমার কলিজা। আর সেই কলিজার পাশে আপনার নাম লিখিয়েছি। আশা করি এমন কিছু করবেন না যার দরুন আমার কলিজার বিন্দুমাত্র কষ্ট হয়। করলে আগে আপনাগে শ্বাসরোধ করে মেরে, প্যাকেটজাত করে বুড়িগঙ্গায় ফেলে আসবো।”
মেরুদন্ড বরাবর শীতল স্রোত বয়ে বেড়ায় পত্রলেখার। অস্থিমজ্জায় ভয় ছড়িয়ে কাঁপন সৃষ্টি করে। ভীতু চোখ দুটো টলমল করে ওঠে। নত হয় মস্তক নত। বিয়ের পরবর্তী প্রহরেই সোজা মেরে ফেলার হুমকি? এ কোথায় ফেঁসে গেলো সে!
অরুণ সরকার পূর্বের চেয়েও কঠিন স্বরে বলল, “আজকালকার মেয়েদের মতো ছেলের কাছ থেকে তাঁর বাবা-মা ভাই-বোনদের আলাদা করার বিন্দুমাত্র চেষ্টা করলে ভেবে নিন দিস ইজ দ্য এন্ড! আর আলাদা সংসারের কথা তো ভাবাও পাপ।”

অরুণ সরকার মুচকি হাসলেও তাঁর হাসিটা ভয়ংকর। যেখানে সম্পর্কটাই অনিশ্চিত সেখানে এমন হুমকি ভিত্তিহীন। পত্রলেখার মস্তিষ্ক বিভ্রান্তিতে! এমন হুমকি সচরাচর শ্বাশুড়ি দিয়ে থাকে না? নানুর প্রিয় সিরিয়ালে তো শ্বাশুড়িই স্বরযন্ত্র রচয়িতা। কিন্তু এখানে পাশা উল্টে গেলো!
“আপনার শ্বাশুড়ি কিন্তু হেব্বি কড়া। বাড়িতে একটা কাজের লোক নেই। পুরুষ মানুষ হয়েও রান্নাঘরে পরোটা বেলছি। বাকিটা বুঝে নেওয়ার কথা। ননদ আবার রাই বাঘিনী, নাখরা ষোলো আনা। দেবরের কথা আর নাই বা বললাম। আর যার সাথে পথচলা, সে ফোর টোয়েন্টি। কখন কি করে ঠিকঠিকানা নেই। একটু বুঝে শুনেই চলবেন এ সংসারে।”
পত্রলেখা ভয়ে কুঁকড়ে যায়। বিনা বিজ্ঞপ্তিতে হুট করে জীবনে স্বামী সংসার, শ্বশুর-শ্বাশুড়ি, ননদ-দেবরের আগমণ ঘটলে ডরাবে না নাজুক মন? নিজেকে কূলকিনারা বিহীন নৌকার মাঝি অনুভূত হচ্ছে। কোন দিকে যাবে দিশা খুঁজে পাওয়া গেলো না। সে ভীতু চিত্তে কোনোরকম মাথা নাড়লো। অরুণ সরকার অগোচরে হাসলো ক্ষণ। গম্ভীর মুখে বলল,

“যাইহোক মাছগুলো কুটে ধুয়ে নিন। আপনার শ্বাশুড়ির রুই মাছ খাওয়ার ইচ্ছা জেগেছে।”
মনের ডায়েরিতে শ্বাশুড়ি নামটা টুকে নেয় পত্রলেখা। তারপর মাছে মনোযোগ দেয়। মাথা ফাঁকা ফাঁকা লাগে। আচ্ছা মা কি এখনও খবর পায় নি—তার অপ্রয়োজনীয় মেয়েকে ভাগ্য এক অজানা দরিয়ায় ফেলে গেছে! কিভাবে নদী পার হবে সে? জলভরা ঝাপসা চোখে মাছের মস্তক ধরে পত্রলেখা।
অরুণ গমগমে সুরে বলল, “ফিশ স্কেলার লাগবে?”
পত্রলেখা সঙ্গে সঙ্গে মাথা নাড়লো। অরুণ ফিশ স্কেলার বের করে দিলো। পত্রলেখা মাছের আঁশ ছাড়িয়ে একে একে সবগুলো মাছ কেটে স্বস্তির শ্বাস ফেলতে না ফেলতেই অরুণ বলল, “ধুয়ে নিন‌ ঝটপট।”
পত্রলেখা রগড়ে রগড়ে মাছ ধুচ্ছিলো। অরুণ সরকার লবণের কৌটা দিয়ে গেলে সে লবণ মাখিয়ে মাছ ধুয়ে নেয়। এরই মাঝে ড্রয়িং রুম থেকে হট্টগোলের শব্দ ভেসে আসলো। গতরাতের দৃশ্যটুকু মননে নাড়াচাড়া দেয় পত্রলেখার। অন্তরাত্মা কেঁপে ওঠে আবারও। অরুণ সরকার গ্যাসের পাওয়ার অফ করে এগিয়ে যায়।
“আবার কিসের নাটক চলছে শুনি?”

পাতা চাইলো অরুণ সরকারের দিকে। জলভরা চোখে প্রিয় মানুষটার হারানোর ভয় ছেয়ে আছে। অরুণ সরকারের ছেলের দিকে তাকায়। স্পোর্টস ব্যাগ ধরা হাতের মুঠো শক্ত। রক্তিম মুখপানে তাকিয়ে থাকা যাচ্ছে না। বুকে কাঁদতে থাকা পাতাকে ঠেলে সরিয়ে দিতে চাইছে প্রাণপণে। অরুণ মুহূর্তেই ছেলের মননে চলা ভাব বুঝে নিলো।
অরুণাভ মমতাময়ীর স্নেহের বাঁধন ছিন্ন করে। কাঠ কাঠ স্বরে বলে, “ভুলে যেও ভোর নামক কোনো নোংরা বস্তু তোমাদের জীবনে ছিলো।”
পাতা কম্পমান সুরে ধমকালো, “মারবো কিন্তু? ঘরে চলো ভেজা কাপড় বদলে নিবে।”
অরুণাভ মায়ের কথা গ্র্যাহ্য করলো না। পাশ কাটিয়ে চলে যেতে উদ্যত হয়। পাতা আবারও টেনে ধরে। অরুণ সরকার পাতার উদ্দেশ্যে বলল, “এখন মুখ দেখাতে লজ্জা লাগছে নবাব পুত্তুরের? আমার মান সম্মান তো শেষ করেই ছেড়েছে। বাকি যা আছে তা বাড়ি ছেড়ে নিলামে উঠানোর ধান্দা! চুপচাপ ঘরে যাও নাহলে আমার চেয়ে খারাপ কেউ হবে না। রাতের কথা ভুলো নি নিশ্চয়ই!”
“কিছুই ভুলি নি। তুমিও ভুলে যেও না যে আমি আর বাচ্চা ছেলে নেই। কাঠ পুতুলের মতো নাচাবে, আর আমি নাচবো। এডাল্ট আমি, আমার সিদ্ধান্ত আমি নিজেই নিতে জানি। জোর করার কোনো রাইট নেই তোমার।”

পাতা ছেলেকে টেনে নিয়ে যেতে চায়। লোকটাকে কোনো ভরসা নেই তার। কখন হায়েনার মতো হামলে পড়ে। অরুণ চোখ জ্বলে উঠলো। দাঁতে দাঁত চেপে বলল, “ এতোটা অধঃপতন হয়েছে ভাবতেও পারিনি। কোন মুখ নিয়ে বড় বড় কথা বলছো, লজ্জা করে না তোমার?”
অরুণাভ ত্যাড়া গলায় বলল, “না, করে না লজ্জা।”
অরুণ সরকার পাতার দিকে তাকায়। ব্যঙ্গাত্মক স্বরে বলে, “তোমার ছেলের লজ্জা করে না। অথচ আমার বলতেও লজ্জা লাগছে তোমার গুনধর ছেলের কীর্তিকলাপ।”
পাতা জলন্ত চোখে চায় অরুণের দিকে। কান্না দমিয়ে বলে, “আমি আমার ছেলেকে হাতে কলমে ভালো মন্দের ফারাক শিখিয়েছি। আমার পূর্ণ বিশ্বাস আছে আমার ছেলে কোনো অনৈতিক কাজে জড়ায় নি। সম্পূর্ণটাই ভুল বোঝাবুঝি।”

অরুণ ছেলের উদ্দেশ্যে ঠেস মেরে প্রশ্ন করলো, “ভুল বোঝাবোঝি?”
অরুণাভ জবাব দিলো না। মুখটা বড্ডো কঠিন। পাতা পূর্ণ বিশ্বাসের সাথে ছেলের হয়ে জবাব দিলো, “হ্যাঁ ভুল বোঝাবুঝি। পার্টিতে উপস্থিত ছিলো মানেই এই না সেও মদপানি, মেয়ে…”
ছোট্ট প্রহর আর কিশোরী অরুণিতার সামনে নিজ লাফজ সংযত করছ পাতা। বড় ভাইটির প্রতি সামান্য বিদ্রুপ ভাব সৃষ্টি না হয় তাদের কোমল মনে। অরুণ সরকার মেয়ের উদ্দেশ্যে বলল, “অরুণিতা, প্রহরকে নিয়ে উপরে যাও। বড়দের কথা শুনতে নেই।”
অরুণিতা কতক্ষণ স্থবির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। পাপা কতদিন পর তাঁর নামটি উচ্চারণ করলো। গাম্ভীর্যে ঠাসা চোখ দুটোয় অশ্রুরা চমকাতে চায়। অরুণ সরকার আবারও হুকুম করে, “অরুণিতা যাও?”
অরুণিতার চোখ মুখ আবারও শক্ত হয়ে আসে। খুব সুক্ষ্মতার সাথে নিজেকে সামলায়। প্রহরের হাত ধরে টেনে নিয়ে যায়। প্রহর চোখ পিটপিট করে রান্নাঘরের দিকে তাকিয়ে আছে। ওটা কি তার সেই বোবা বউ ছিলো? কিন্তু বউ তাদের বাড়িতে কিভাবে এলো? কখন এলো? তাঁকে কেন কেউ জানালো না? আপুনির ড্রেস কেন পরে আছে? প্রহর নাম্বার কেটে একে একে প্রশ্ন জমা করে।
ড্রয়িংরুমের পরিবেশ থমথমে। পাতা দুহাতে ছেলের বাহু জড়িয়ে কাঁদছে। কোথাও যেতে দিবে না। অরুণাভ চুপচাপ দাঁড়িয়ে, চোখের চাহনি অস্থির। সফেদ বিড়াল শাবক তাঁর পায়ের শু লেস টানাটানি করে। সেও কি মালিককে যেতে দিতে চাচ্ছে না?
অরুণ সরকার মা-ছেলের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে। আরেক বোবা প্রাণী পত্রলেখা। রান্নাঘরের দরজায় জড়োসড়ো হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। অরুণিতা দোতলায় গিয়ে ঘরের দরজা লাগাতেই অরুণ সরকার পাতার উদ্দেশ্যে বলল,

“তো কি বলছিলে পাতাবাহার?”
পাতা বলতে নেয়, “আপনার ভুল হচ্ছে…”
“এখানে ভুল হওয়ার কোনো চান্স নেই পাতাবাহার। নিজের চোখে দেখেছি সব। পুলিশ সার্জেন আমার পরিচিত ছিলো বলেই না রক্ষা। নাহলে তোমার ছেলের নাম এতক্ষণ প্রতিটি নিউজ চ্যানেলের হেডলাইনে।”
“ভোর এসব জানতো না। জানলে ওই নোংরা পার্টিতে পা রাখতো না।”
পাতা জোর গলার পৃষ্ঠে অরুণ ছেলের দিকে তাকায়, “জানতে না তুমি?”
অরুণাভ সরকার নীরব। সে এসব বিষয়ে পূর্বের থেকেই জ্ঞাত ছিলো। শুধু মেয়েলী ব্যপারটা জানতো না, অধিকাংশই জানতো না। এক বন্ধু মেয়ে গুলোকে নিজের ফ্রেন্ড বলে পরিচয় করিয়েছিল। যাইহোক পার্টিটা তাদের নতুন এক্সপেরিমেন্টের অংশ ছিলো। এক টুকরো কৌতুহল! এমন শ’ খানেক কৌতুহল লাইক বাইক রেসিং, বেটিং,এর আগেও মিটিয়েছে তাঁরা বন্ধুরা মিলে। সবই বন্ধুর ফ্ল্যাটের চারদেয়ালে সীমাবদ্ধ ছিলো। হুট করে জন সাধারণের নজরে আসবে তাঁরা ভাবেও নি।
অরুণ কপাল ঘঁষে। কপালের নীলচে শিরা উপশিরা জাগ্রত। পকেট থেকে বিসিবি প্রেরিত খামটা বের করে ছেলের মুখের উপর ছুঁড়ে মেরে বলল, “আমি কতো খুশি ছিলাম! অহংকার করেছিলাম তোমাকে নিয়ে। আমার অহংকার আধঘণ্টাও টিকতে দিলে না। রুবি, আরিয়ান ওঁরা ঠিক ছিলো। কোনো মা-বাবাই তাদের মেয়েকে এরকম একটা ছেলের হাতে তুলে দিতে চাইবে না। তাই তো আমি ভাবি আরিয়ান কেন প্রস্তাব ফিরিয়ে দিলো।”

নির্লিপ্ত অরুণাভ মেঝেতে পড়ে থাকা খামটার দিকে তাকায়। রয়েল বেঙ্গল টাইগারের লোগো জ্বল জ্বল করছে। কি আছে খামে? জয়েনিং লেটার? সে কি টিমে সিলেক্ট হয়েছে? কই তাঁর কাছে সেরকম বার্তা আসে নি।
পাতা বলার মতো ভাষাও খুঁজে পেলো না। ছেলের দিকে তাকিয়ে রইলো আশা নিয়ে। কিছু তো বলুক, আর লোকটার মুখ বন্ধ করে দিক। অরুণাভ এ যাত্রাও চুপ থাকাই শ্রেয় মনে করলো। খামটা তুলে নিলো আলগোছে। খুলে চোখ বুলিয়ে নিলো। অচিরেই ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি ফুটে। তবে তাঁর সময়কাল ক্ষীণ। খামটা ব্যাগে ভরে মায়ের উদ্দেশ্যে বলল, “আসছি!”
পাতা হাতের বাঁধন শক্ত করে চোখ রাঙিয়ে বলল, “আসছি মানে কি হ্যাঁ? থাপড়ে গাল লাল করে দিবো ভোর।”

“সে দাও, তবে আটকিও না‌।” অরুণাভ বলে মায়ের হাত ছাড়িয়ে নিতে চায়। পাতা ছাড়ে না। অরুণ বলল, “জবাব নেই তাই পালাতে চাইছে নবাব পুত্তুর। যেতে দাও, দেখি কতদিন টিকতে পারে। অভাব ছুঁতে দেই নি, চাওয়ার আগেই সব দিয়েছি। অ্যাকাউন্টে টাকা কখনো লাখের নিচে নামতে দিই না। কোথায় কি খরচ করে কখনো হিসেব চেয়েছি? সে রাতভর পার্টি করে বেড়ায়। আর আমাদের চোখে ধুলো দিতো টুটুলের বাড়িতে আছে। আর ওই টুটুল আরেক ফোর টোয়েন্টি। নেশা করে হুঁশ হারিয়ে পড়েছিল পার্টিতে। শুধু বিয়ার না, ওদের কাছ থেকে গাঁজা সহ আরও নানান ব্রান্ডের মদের বোতল উদ্ধার করেছে, তাও ইনটেক। এমনকি নোংরা মেয়েও উপস্থিত ছিলো সেখানে। লজ্জায় আমার মাথা হেঁট হয়ে গেছে। সার্জেন বারবার বলছিলো—অরুণ ভাই আমি ভাবিও নি আপনার ছেলেকে এই অবস্থায় পাবো।”
অরুণাভ মায়ের দিকে ফিরে বললো, “মেয়ে তিনটাকে নাহিদ এনেছিলো। আমাদের বলেছিল ওঁর বন্ধু। তাই আমরা আর ঘাঁটি নি।”
পাতার হাতের বাঁধন ঢিলে হয়ে আসে। অনুভূতিহীন কণ্ঠে বলে, “তুমি ওসব বাজে জিনিস খাও?”
অরুণাভ কিছুটা সময় নিয়ে বলল, “সবাই খায়…”
“সবাই খায় বলে তোমাকে খেতে হবে?”
অরুণাভ বাবার দিকে চেয়ে বলল, “আব্বুও খায়।”
পাতা অবাক চিত্তে তাকায় অরুণের দিকে। অরুণ সরকার ভাবেও নি এভাবে ধরা পড়বে। অবাক করা বিষয় ছেলে কিভাবে জানলো?জানলেও এভাবে হাঁটে হাঁড়ি ভাঙা উচিত হলো? তাছাড়াও সে অনেক আগেই ছেড়েছে এসব। আগে বন্ধুরা খুব জোর করলে হয়তো চেখে দেখতো। যুগ হয়ে গেছে সে ওসবে আর মুখ লাগায় নি। আর এখন ছেলে তাঁর দোহাই দিয়ে নিজেকে শুদ্ধি করতে চাইছে। একেই বুঝি বলে, পাপ বাপকেও ছাড়ে না। সে আত্মসমর্পণ করে বলে,

“সে অনেক আগেই ছেড়েছি আম…”
“চুপ করুন ভোরের বাবা। দোষী তো আপনি নিজে। আপনি নিজে খান, সেখানে ভোর খেলে কি সমস্যা?”
পাতা অরুণকে থামিয়ে শান্ত গলায় বলে। পরে ছেলের দিকে তাকিয়ে ম্লান হেসে বলে, “বাবা খায়, তাই তোমারও খাওয়া উচিত। আর লুকিয়ে চুড়িয়ে খাওয়ার দরকার নেই। বাবা ছেলে বাড়িতে একসাথে চিয়ার্স করে খেও। আমি অনুমতি দিলাম। আর সমস্যা থাকার কথা না, এখন ব্যাগ পত্র নিয়ে ঘরে যাও। যাও?”
হুট করেই ধমকে ওঠে পাতা। মুখটা মুহুর্তেই রং বদলেছে। রীতিমতো ফুঁসছে। অরুণাভ নড়লো না অবদি। অরুণ সরকার দীর্ঘশ্বাস ফেলে এগিয়ে আসে। পাতার হাত ধরে নরম হয়ে বলে,
“পাতাবাহার, শান্ত হও…”
পাতা ঝটকায় হাত ছাড়িয়ে নেয়। তাতেই ক্ষান্ত হয়নি, সর্বশক্তি দিয়ে ধাক্কা দেয় বলিষ্ঠ দেহী অরুণকে। অরুণ কয়েক কদম পিছিয়ে যায়। আবারও এগিয়ে আসবে পাতা চেঁচিয়ে উঠলো, “খবরদার ছুঁবেন না আমায়। আপনারা বাপ ছেলে সবসময় নিজ মর্জি মোতাবেক চলেন। অথচ ভাব দেখান পাতাই সব। শুধু মদপানি কেন? যা খুশি খান দুজন। আমার যেদিক চোখ যায় চলে যাবো। “
পাতার ফর্সা মুখ লাল হয়ে এসেছে। রীতিমতো হাপাচ্ছে। অরুণ পরিস্থিতি বেগতিক দেখে পাতাকে শান্ত হতে বলে, “রিল্যাক্সড পাতাবাহার। শরীর খারাপ লাগছে? আমরা এ বিষয়ে পরে কথা বলবো! দেখি শান্ত হও। এত ঘামছো কেন? এ্যাই মেয়ে, আবার কাঁদে?”

ততক্ষণে পানির গ্লাস হাতে পত্রলেখা হাজির। তার উপস্থিতিতে অরুণাভের শান্ত মেজাজ আবারও বিগড়ে গেলো। দাঁতে দাঁত চেপে কঠিন চাহনি নিক্ষেপ করলো তাঁর দিকে। পত্রলেখা আর সাহস পেলো না পানি দেওয়ার। পাতা কিছু বলতে নিয়েও থেমে যায়। কিই বা বলবে! দুই হাতে চোখ মুখ মুছে লম্বা শ্বাস টেনে নেয়। তারপর খুবই স্বাভাবিক ভঙ্গিতে নিজের ঘরের দিকে চলে গেলো। যার যা খুশি করুক, তাঁর কি! অরুণ কয়েকবার ডাকলো, শুনলো না।
“ছেলে বড় হলে নাকি বাপের ঝামেলা ফুরোয়। আর তুমি যত বড় হচ্ছো আমার ঝামেলার পরিসরও তত বাড়ছে। একটা শেষ হতে পারে না আরেকটা শুরু। আমাকে মেরে তবেই ক্ষান্ত হবে তুমি।”
অরুণাভ বাবার দিকে তাকিয়ে গম্ভীর গলায় বলে, “না থাকবে বাঁশ না বাজবে বাশুরি! চলে যাচ্ছি। এখন শান্তিতে থেকো!”
অরুণ সরকার মেজাজ খুইয়ে বলে, “চলে যাবে? আচ্ছা যাও! দেখি বাপকে ছাড়া… লেট মি কারেক্ট মায়সেল্ফ, বাপের টাকা ছাড়া কতদিন চলতে পারো!”
টাকার খোটা ব্যক্তিত্বে আঘাত হানে। অরুণাভ টু শব্দটি না করে বেরিয়ে যেতে উদ্যত হয়। অরুণ সরকার পিছু ডেকে বলে, “বড় সরকার, আপনি কিছু ফেলে যাচ্ছেন!”
অরুণাভের কপালে ভাঁজ পড়ে। অরুণ পত্রলেখাকে ইঙ্গিত করে বলে, “আপনার পথ চলার সঙ্গীকে রেখে যাচ্ছেন যে!”

অরুণাভ পত্রলেখার দিকে দাঁত কটমট করে বলল, “সঙ্গী মায় ফুট! ও একটা ডাঈনী। যা হয়েছে সব ওঁর জন্য হয়েছে। আস্ত কুফা এই মেয়ে।”
অরুণ সরকার কপাল কুঁচকালো, “সে তোমার স্ত্রী! এখন থেকে তুমিই তাঁর অভিভাবক। তাঁর সব দায়দায়িত্ব তোমার।”
“ঠ্যাকা পড়ে নাই।”

ভাব তরঙ্গ পর্ব ২১ (২)

অরুণাভ পত্রলেখাকে প্রত্যাখ্যান করে যেই না বাড়ির বাইরে পা রাখে মুখোমুখি হয় আনিকা সরকারের। মুহুর্তের জন্য থমকায়। সমস্ত রাগ-গোস্বা নিমিষেই ফিকে পড়ে যায় ওই টলমলে চাহনিতে। বুকের বা পাশে চিনচিনে ব্যথার উদ্রেক হয়। তাঁকে পাওয়ার ক্ষীণ আশার প্রদীপও দমকা হাওয়ায় নিভে গেলো!
“Congratulations on your first heartbreak, Arunnava. Some hearts break only once… and never truly heal. It’s all over.”

ভাব তরঙ্গ পর্ব ২৩

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here