Home ভালোবাসার সীমানা পেরিয়ে ভালোবাসার সীমানা পেরিয়ে পর্ব ৯২

ভালোবাসার সীমানা পেরিয়ে পর্ব ৯২

ভালোবাসার সীমানা পেরিয়ে পর্ব ৯২
প্রিয়স্মিতা তেহজীব রাই

তপ্ত দুপুর, বাইরে লু হাওয়া বইছে। বাড়িতে প্রণয় নেই, সকালের নাস্তাটা কোনোমতে গিলে অফিসের তাড়া মাথায় নিয়ে বেরিয়ে গেছে।
যদিও তার বউয়ের সাথে লেগে থাকার ইচ্ছা ছিল, কিন্তু জাভেদ ফোনের জ্বালায় থাকতে পারেনি। রাগে দাঁত কিড়মিড় করতে করতে বেরিয়ে গেছে, উদ্দেশ্য একটাই— জাভেদের গোষ্ঠীর ষষ্ঠী পূজা করা।
গরম কাল পড়াতে অস্থিরতা বেড়ে গেছে প্রিয়তার। অন্যান্য বারের তুলনায় এবার গরমের দাপট একটু বেশি, বাহিরে তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি ছাড়িয়েছে। এতটুকুতেই অবস্থা খারাপ হয়ে গেছে প্রিয়তার।
বার বার গা গুলিয়ে বমি পাচ্ছে, টক খাওয়ার জন্য প্রাণটা আকুপাকু করছে মেয়েটার। প্রিয়তার হাঁসফাঁস করতে করতে রান্নাঘরের দিকে ছুটলো। রান্নাঘরে এসে ফ্রিজ খুলে ভেতরে উঁকি দিলো প্রিয়তা।
ফ্রিজ খুলতেই চোখে পড়ল সেই মহার্ঘ্য বস্তু।
ফল, মিষ্টি, কোল্ড ড্রিংকস— এসবের পাশাপাশি ফ্রিজের কোনার দিকে বড় এক হাঁড়ি মিষ্টি দই রাখা।
দই হাঁড়ি দেখেই খুশি হয়ে যায় প্রিয়তা, সুন্দর মুখের উজ্জ্বলতা বেড়ে যায় কয়েক গুণ।

— “দেখছিস কি? খা, এটা তোর ভাই তোর জন্যই এনেছে।”
ফ্রিজ থেকে ঠাণ্ডা পানির বোতল বের করতে করতে বলে ইনায়া।
— “সত্যি?”
— “হুম, কাল এনে বলেছে এটাতে যেন কেউ হাত না দেয়, তাই তো অক্ষত আছে। নাহলে তোর কি মনে হয় এতক্ষণে আমি একটা রাখতাম?”
মুখ বাঁকালো প্রিয়তা, হাঁড়িটা বের করে নিতে নিতে ভেঙিয়ে বলে— “রাক্ষুসী!”
প্রিয়তা হাঁড়ির ঢাকনা খুলে হালকা বাদামি এক চামচ তুলে মুখে দেয়। ঠাণ্ডা ঠাণ্ডা দই মুখে পড়তেই প্রিয়তার মনে হয় হাজার বছরের শুষ্ক মরুভূমিতে যেনো এক পশলা বৃষ্টি নামে। তৃপ্তিতে চোখ বুঝে আসে প্রিয়তার, গরমে প্রাণ জুড়িয়ে যায়।

— “কেমন?”
— “ফাটাফাটি!”
প্রিয়তা কয়েক মিনিটেই চার ভাগের এক ভাগ খতম করে দেয়। তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলে আরেক চামচ খেতে গিয়েও থেমে যায়। চোখ তুলে ভ্রু কুঁচকে তাকায় ইনযার দিকে। ইনায়া লোলুপ দৃষ্টিতে হাঁড়ির দিকে তাকিয়ে আছে।
দাঁত কেলিয়ে হাসে প্রিয়তা, ভ্রু নাচিয়ে শুধায়— “খাবি?”
ইনায়া যেনো এতক্ষণ এটারি অপেক্ষা করছিল। প্রিয়তার বলতে দেরি, কিন্তু ফট করে হাত থেকে হাঁড়ি আর চামচটা কেড়ে নিতে দেরি হলো নাহ্ ইনায়ার। বান্ধবীর কাছে আবার কিসের লজ্জা শরম?
প্রিয়তা পানির বোতলটা থেকে ঢক ঢক করে পানি পান করতে করতে ভেংচি কেটে বললো— “আমার ভাইটাকে তো অনেক আগেই গিলে খেয়েছিস, এটা আর এমন কি?”
— “তুইও তো আমার সিধা-সাধা আলভোলার ভাসুরকে গিলে খেয়েছিস, সেই বেলায় আমি কিছু বলেছি?”
চোখ বড় বড় করে ফেলে প্রিয়তা, চোয়াল ঝুলিয়ে বলে— “কে আলভোলা?”

— “আমার ভাসুর।”
ঢোক গিললো প্রিয়তা, মনে মনে পড়লো, “আস্তাগফিরুল্লাহ”।
ঊষাও চলে এলো ভাগ বসাতে।
ওদের গল্পের মধ্যেই রান্নাঘরে তরতর করে ঢুকে পড়লো তন্ময়। পরনে সেই এককালের পুরনো হাফ প্যান্ট, আর একটা পাতলা স্যান্ডো গেঞ্জি, আর চকচকে একটা বেলের মতো ন্যাড়া মাথা। তন্ময় এসে উপরে নিচে হন্যে হয়ে কিছু খোঁজতে লাগলো।
ওর হুটোপুটি দেখে কপাল কুঁচকালো প্রিয়তা। হাত টেনে ধরে কাছে নিয়ে এলো। টাকলা মাথায় তবলা বাজানোর মতো করে বললো—
“কী রে, তোর ভুঁড়ি তো আগে থেকেই ছিল, এখন দেখি মাথায় একটা চকচকে সাহারা মরুভূমি বসিয়ে নিলি! লুকিং লাইক এ টাক্কু মুরাদ! এই সুন্দর শিল্পকর্ম কার দান?”
তন্ময় আপুর অপমান গায়ে মাখলো না। দইয়ের হাঁড়িতে হাত ঢুকিয়ে খাবলে নিলো অর্ধেকটা, মুখে পুরে নিয়ে ডোন্ট কেয়ার ভাব নিয়ে বললো—
“বড় দাদান চুল কেটে দিয়েছে। বলেছে গরমকালে টাক করে ফেললে গরম কম লাগে। দেখো, এখন কী আমার গরম লাগছে!”

প্রিয়তা বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেলো। ভাইয়ের টাক মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে কাঁদো কাঁদো মুখ করে বললো—
“উনি তোকে বললেন আর তুইও হাবলার মতো বিশ্বাস করে নিলি? তোর জ্ঞান হওয়ার পর উনাকে কোনোদিন টাকলা দেখেছিস? আমি তো দেখিনি, বাপু।”
আপুর কথা শুনে কনফিডেন্স একটু দুর্বল হয়ে গেল তন্ময়ের। গভীর চিন্তায় পড়ে গেল।
তবে বড় দাদানকে অবিশ্বাস করলো নাহ্, উল্টো ধরে নিল তার আপু তাকে গুলিয়ে দিতে চাচ্ছে। সাথে সাথে মুখ গম্ভীর করে ফেললো তন্ময়। কণ্ঠে ভারী মাত্রার গম্ভীরতা টানার চেষ্টা করে বললো—
“আমাদের ভাইয়ে ভাইয়ে ঝামেলা লাগানোর চেষ্টা করছো?”
ইনায়া আর ঊষা চোখ বড়ো বড়ো করে শুনছে।
— “ওরি বাবা!”
ভেংচি কাটলো তন্ময়।
“দেখি, ছাড়ো, ছাড়ো আমাকে। একটা ঝুঁড়ি দাও।”
— “কেন?”
— “আমি আর আমার পার্টনার আম পেড়ে মাখা করবো, তাই পার্টনার ঝুঁড়ি নিতে পাঠিয়েছে।”
— “আম মাখা!”

কথাটা শুনতেই একসাথে চোখ চকচক করে উঠলো প্রিয়তা, ইনায়া আর উষার।
প্রিয়তা ফুলকো গাল টেনে টেনে নরম গলায় বললো— “আমিও খাবো।”
পাশ থেকে ইনায়া আর উষাও বললো— “আমরাও খাবো।”
তন্ময় শিকদার আবার ব্যবসাতে খুব পাকা। সে খুব ভালো মতো জানে প্রিয়তার হাতের মাখা কতটা টেস্ট হয়, তাই তো কায়দা করে আপুকে নিতে এসেছে। সরাসরি বললে ধনাই পানাই জুড়ে দেবে।
মনে মনে বাঁকা হাসলো তন্ময়। মুখ ঘুরিয়ে ভাব নিয়ে বললো—
“নাহ নাহ, ভেজাইল্লা মহিলা মহল যোগ করার কোনো দরকার নেই, আমরা আমরাই ঠিক আছি।”
কিন্তু ওরা তিনজনও নাছোড়বান্দা। তন্ময় শেষে এমন ভাব ধরলো, যেন সে এক প্রকার বাধ্য হয়েই সাথে নিতে রাজি হয়েছে তাদের।
শিকদার বাড়ির পেছন দিকে দক্ষিণের বারান্দা পেরিয়ে বিশাল আম বাগান। জুন-জুলাই মাসে বাগান ভরে থাকে আমে।

সবুজ সবুজ আমের ভারে ছোট গাছের ডালগুলো নুইয়ে পড়েছে। বড় গাছগুলোও ভর্তি হয়ে আছে কাঁচা-পাকা আমে।
প্রিয়তা, ইনায়া, উষা আর তন্ময় দক্ষিণের বারান্দা পেরিয়ে আম বাগানে পৌঁছে গেলো। ওখানে আগে থেকেই দাঁড়িয়ে ছিল অরণ্য। তন্ময় আর অরণ্য চোখাচোখি করে বিশ্ব জয়ের হাসি দিলো।
উষার হাতে বড় একটা গামলা, তাতে নুন, শুকনা মরিচ, কাঁচা মরিচ, রসুন পোড়া, ধনে পাতা, সরষের তেল— আম মাখাতে আর যা যা লাগে। ইনায়ার হাতে বড় সবজি কাটার দা, প্রিয়তার হাতে ঝুঁড়ি।
সবাই আসতেই অরণ্য গাছে উঠে গুনে গুনে বেশ কয়েকটা বড় দেখে কাঁচা আম পাড়লো। সেগুলো কাটলো ঊষা। মাখা করতে শুরু করলো প্রিয়তা। তবে কাঁচা মরিচ, শুকনা মরিচ, গুঁড়ো মরিচ, বোম্বাই মরিচ, রসুন, ধনেপাতা— সব কিছুর মিশ্রণে যখন ঢলা দিলো, মরিচের ঝাঁঝে বাতাসের গন্ধটাই যেনো বদলে গেলো।
—মরিচের পরিমাণ দেখে যে কেউ পড়বে আস্তাগফিরুল্লাহ। তাদের হইহৈয়ের শব্দ শুনে সমুদ্র রাজ, পূর্ণতা, থিরা, তরী আর প্রিয়স্মিতাও এলো।
প্রিয়তা কলাপাতায় সবাইকে দিলো। সবাই কম বেশি ঝাল খায়, কিন্তু প্রিয়স্মিতা আর তরী একদম ঝাল খেতে পারে না। একটুখানি আম তুলে জিভে ছুঁয়াতেই ব্রহ্মতালু অবধি জ্বলে উঠলো প্রিয়স্মিতার। চোখ মুখ লাল হয়ে পানি চলে এলো মুহূর্তেই।
প্রিয়তা নরম কণ্ঠে শুধালো— “আপু, তুমি ঠিক আছো?”
চিনির বাটি এগিয়ে দিলো প্রিয়তা।
প্রিয়স্মিতার কান দিয়ে ধোঁয়া বেরোচ্ছে, তবে একের পর এক খেয়ে চলেছে প্রিয়তা। টক খাওয়ার জন্য তার প্রাণটা যেনো লটকে ছিলো।
আবার বমি পাচ্ছে প্রিয়তার, তবে হাত থামছে নাহ্। তার মনে হচ্ছে সে স্বর্গে ভাসছে! কই, আগেও তো কত আম মাখা খেয়েছে, কিন্তু এতো মজা তো লাগেনি!
এমনটা নয় যে প্রিয়তার চোখ দিয়ে পানি পড়ছে না—প্রিয়তা সহ সবার নাক মুখ দিয়ে ঝালের পানি পড়ছে। সবাই ঝালে কাবু, কিন্তু হাত থামানো যাবে না।

— “আরে হায় হায় হায়! কি সর্বনাশ! পুয়াতি মেয়ে মানুষ এমনে ঝাল টক খাইলে তোরা কি বেঁচে থাকবি? ফালা চেমড়ি! ওগুলো হাত থেইক্যা ফালা।
আর এই তোরা যে এই কুত্তা মারা গরমে গেদা গুদা চাউ পুনা সব জমাইয়া এমনে আম গিলছিস, তোরা তো হাগতে হাগতে মরবি রে!”
কারো কণ্ঠে হায় হায় শুনে সবাই একসাথে তাকালো। কিছুটা দূরে বারান্দা থেকে গুলবাহার বানু লাঠি ভর দিয়ে দিয়ে এদিকেই আসছেন। ওরা সকলে বসে ছিল আমতলায়। হাগার কথা শুনে সকলের খাওয়ার মুডটাই চটকে গেলো।
গুলবাহার বানু খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে এসে সামনে দাঁড়ালেন। ওদের ঝালের তোড়ে লাল হয়ে যাওয়া নাক মুখ গুলো দেখে চোখ বড় বড় করে উনার মেয়েদের হাঁক ছাড়লেন— “অনু, তনু, অনন্যা, অর্থি লো দেখে যা, তোগো পোলা, পোলাবউদের কান্ড। এই গরমে কি ঘটাচ্ছে!”
বুড়ির কাণ্ড দেখে আতঙ্কে লাফিয়ে উঠলো ওরা সকলে। এখন জন্মদাত্রীরা যদি ছুটে আসে আর তাদের এভাবে দেখতে পায়, তবে ইন্না লিল্লাহ করে ছেড়ে দেবে। প্রিয়তা আতকে উঠে উনাকে ধরতে চাইলেই এক লাফে সরে গেলেন তিনি, নাক মুখ শিটকে বললেন—

“মরিচ মাইখা ওই হাতে একদম আমায় ধরবি না চেমড়ি! তুই না শুনলাম পুয়াতি, তাহলে এই গু খাচ্ছিস কেনো?”
প্রিয়তা বোকা বোকা হাসলো—
“অনেক মজা হয়েছে নানি, তুমি খাবে?”
তড়িৎ বেগে আপত্তি জানালেন বৃদ্ধা—
“আমি পুয়াতি না লো বইন, তুই খা।”
“ওলা আমরাই খামু, তুমি তোমার মাইয়াগোরে দিয়া আমাগো রে ধোলাই খাওয়াইও না।”
“অনেক খাইছত, এখন যা, উঠ! এই সময় এতো টক খাওয়া ভালো না। উঠ যা, নাইলে তোর মা আর শাউড়ি রে ডাইকা আনমু।”
প্রিয়তা ভেংচি করলো, কিন্তু আর কিছু বললো না। এতো মজার আম ফেলে উঠে যেতে হলো তাকে। প্রিয়তা মন খারাপ করে একবার আমের গামলার দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে ভেতরে চলে গেলো, পিছু পিছু প্রিয়স্মিতাও গেলো।

— “এবার তোরা যত ইচ্ছা খা, খাইতে খাইতে এখানেই হাইগা দে। তয় আমার নাতিনরে এসবে ডাকবি নাহ্।
আর এই যে মেজো বউ, কয়দিন আগে না তোর পোলাপান হইলো, বাচ্চারে দুধ খাওয়াস নাহ্? তাহলে এগুলা খাচ্ছিস কেন! পোলাপানের শরীল তো খারাপ করবো। তোমরা আজকাইলকার বউরা যা উঠ!”
ইনায়া নানি শাশুড়িকে সম্মান দেখিয়ে উঠে গেলো, তবে অন্যরা নিজের হাতের কাজ ঠিকই অব্যাহত রাখলো।
প্রিয়তা তাড়াহুড়ো করে রান্নাঘরের বেসিনে ভালোমতো বরফ ডলে ডলে মরিচ মাখানো হাতটা ধুতে লাগল। হাতটা জ্বালা করা শুরু করে দিয়েছে ইতিমধ্যে।
“প্রিয়, শোন।”
প্রিয়তা পেছন ফিরে চাইল না, হাতের বরফ ডলায় মনোযোগ দিয়ে ছোট করে বলল, “হুম।”
“আমি বলছিলাম কি…”
কথাগুলো বলতে প্রিয়স্মিতার কেমন আনইজি লাগছে।
“হুম, বলো কি বলবে? আমি শুনছি।”
প্রিয়স্মিতা অহেতুক উত্তেজিত হওয়ার কোনো কারণ দেখল না, তাই স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করে বলল, “তুই তো এখন সব জানিস নিশ্চয়ই, এখন তো আর কোনো কিছুতে কোনো আড়াল নেই, তো এখন কি করবি বলে ঠিক করলি?”

প্রিয়স্মিতার কথায় হাত থেমে গেল প্রিয়তার। দুই ভ্রুর মাঝে চিকন রেখার উৎপত্তি হলো। পেছন ফিরে ঠান্ডা চোখে তাকাল প্রিয়স্মিতার পানে। কেমন হিমেল কণ্ঠস্বর তার!
“কি বলতে চাও?”
চোখ দেখে সামান্য ভড়কে গেল প্রিয়স্মিতা। মনে মনে ভাবনা এল—মেয়েটা এমন রিঅ্যাকশনও দিতে জানে!
“আমি কি বলতে চাচ্ছি তুই খুব ভালো মতোই বুঝতে পারছিস। আর তুই নিশ্চয়ই চোখ থাকতেও অন্ধ হয়ে থাকবি না। তুই যেহেতু সবটা জেনে গেছিস, তখন নিশ্চয়ই নিজের অপরাধী স্বামীকে আঁচলের তলে লুকিয়ে রাখবি না, নিশ্চয়ই চাইবি অপরাধী তার অপরাধের যথা যোগ্য শাস্তি পাক।”
প্রিয়তার চোখ মুখ শক্ত হলো। খুব কঠিন কণ্ঠে বলল—

“এটা আমার জীবন, আপু—আমার সিদ্ধান্ত। আমার স্বামী, আমি কি করব না করব সেটাও আমার সিদ্ধান্ত। আমি আজ তোমাকে একটা খুব স্পষ্ট করে বলতে চাই—আমার স্বামীর সম্বন্ধে আমি কারো কাছ থেকে কোনো উপদেশ শুনব না—এমনকি তোমার কাছ থেকেও নয়। তুমি কে আমি জানি না, তবে তোমার যে এখানে আসার পেছনে বিরাট একটা উদ্দেশ্য আছে সেটা আমি পরিষ্কার জানি। তবে আমি তোমাকে আমার আপন হিসেবেই দেখি, তোমার উদ্দেশ্যের সাথে আমার কোনো মাসলা নেই। আশা করব, আমার আর আমার স্বামীর সাথেও তোমার কোনো মাসলা থাকে না।
তুমি আমার আপন, কিন্তু পৃথিবীতে আমি ভালো কেবল এক জনকেই বাসি। বাকি অন্যকেউ না হলেও চলবে।”
বলেই হনহন করে রান্নাঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেলো প্রিয়তা।

করিডোর দিয়ে আপন মনে হাঁটাহাঁটি করছে প্রিয়তা। বারবার তার মুখাবয়ব পরিবর্তন হচ্ছে।
এক্সপ্রেশনের এতো দ্রুত পরিবর্তন বলছে, মাথায় বড়ো কিছু চলছে।
হাতের তর্জনী উড়না পেঁচাতে পেঁচাতে আচমকা দাঁড়িয়ে পড়লো প্রিয়তা। হঠাৎ ব্রেনের বাত্তি জ্বলে উঠলো।
চিন্তা করতে করতে মাথা মগজের খিচুড়ি বানানোর পর সে খুব সূক্ষ্ম একটা রাস্তা পেয়েছে, যার মাধ্যমে সে গাছের একদম শিকড় অবধি পৌঁছাতে পারবে। তবে রাস্তাটা সামান্য রিস্কি।
তবে রিস্ক তো নিতেই হবে।
প্রিয়তা হাঁটতে হাঁটতে একদম রেলিং ঘেঁষে দাঁড়ালো। মাথা ঝুঁকিয়ে চাইল একবার ২ তলার দিকে। সাথে সাথেই ওষ্ঠপুটে খেলে গেল এক চমৎকার বাঁকা হাসি। সেই স্থানে দাঁড়িয়ে চোখ ছোট ছোট করে দুই সেকেন্ড ভাবল প্রিয়তা।
অতঃপর ধপাধপ পা ফেলে নিজের ঘরে চলে গেল। বাড়িতে তেমন কেউ নেই, গিন্নিরা ঘুমাচ্ছেন, অরণ্য-সমুদ্রসহ বাকিরা সবাই বাগানে। এই তো সুযোগ!

প্রিয়তা ঘরে এসে ড্রেসিং টেবিলের সামনে থেকে বড় ট্রান্সপারেন্ট ক্লাচারটা নিল। লুজ হয়ে যাওয়া চুলের খোঁপাটা খুলে আবার হাতের সাহায্যে পেঁচিয়ে খুব শক্ত করে বাঁধল, যাতে টানাহেঁচড়াতে কোনোভাবেই খুলে না যায়।
অতঃপর বেডসাইড ড্রয়ার খুলে প্রণয়ের রিভলভারটা বের করে হাতে নিল। চোখের সামনে মেলে ধরতেই ব্ল্যাক মেটাল রিভলভারটা ঝিলিক দিয়ে উঠল। এই অস্ত্রটা প্রায় প্রতিটা ক্ষেত্রেই ব্যবহার করে প্রণয়। বেশ ভারী।
প্রিয়তা পৈশাচিক দৃষ্টিতে সেটার দিকে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ। রিভলভারের ট্রিগারে আঙুল ঢুকিয়ে উল্টে পাল্টে দেখল, পরখ করল বন্দুকটা। অস্ত্রটার সামনের নল থেকে বারুদের হালকা গন্ধ এসে নাকে লাগছে। মনে মনে ক্রূর হাসল প্রিয়তা—সময় এসে গেছে কাউকে নিজের সরূপ দেখানোর।
সময় এসে গেছে কাউকে বোঝানোর যে, তনয়া শিকদার প্রিয়তা দুর্বল নয়, কেবল নিজের প্রণয় ভাইয়ের ওপর একটু বেশি নির্ভরশীল।
এই দুটোর ফারাক আজ খুব ভালো মতো কাউকে টের পাইয়ে দেবে প্রিয়তা। ভালোবেসেছে বলেই বংশের ঐতিহ্য ভুলে যায়নি।
আফটার অল, সাপের বংশে তো সাপই জন্ম নেবে!

“ছোটোবেলায় শুনেছিলাম, চোরে চোরে মাসতুত ভাই হয়, এবার সাপে সাপে চাচাতো বোন হবে!”
প্রিয়তা ওখানে দাঁড়িয়ে বেশিক্ষণ সময় নষ্ট করল না। রিভলভারটা নিয়ে ধুপধাপ পা ফেলে বেরিয়ে গেল রুম থেকে।
প্রিয়স্মিতা এক মনে কিছু একটা ভাবতে ভাবতে চার তলা থেকে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামছিল। এই বাড়ি সম্বন্ধে, ASR সম্বন্ধে মোটামুটি তার সবটাই জানা হয়ে গেছে, তবে বাকি রয়ে গেছে এই বিশাল শয়তান বৃক্ষের আসল শিকড়টা। সব কিছু খুঁজে পেলেও ওই শিকড়ের সন্ধান পাচ্ছে না প্রিয়স্মিতা। আবরার শিকদার প্রণয়ের মতো উন্মাদ প্রেমিকদের পক্ষে কেবল পূর্বপুরুষের ঐতিহ্য বজায় রাখার জন্য নিজেকেও জেনেবুঝে এতোটা নিচে নামাবে—ব্যাপারটা আসলে যৌক্তিক না। তাহলে ব্যাপারটা আসলে কী?
এসব ভাবতে বসলেই প্রিয়স্মিতার মাথা হ্যাং হয়ে যায়। সেকেন্ড ফ্লোরের লাস্ট সিঁড়িতে পা রাখতেই ভ্রু কুঁচকে দাঁড়িয়ে পড়ল প্রিয়স্মিতা। সন্দেহভাজন ক্রিয়াকলাপ নজরে আসতেই সতর্ক হয়ে যায়। লাফিয়ে পাশের বড় পিলারের আড়ালে লুকিয়ে পড়ে।
প্রিয়তা চোরের মতো এদিক-ওদিক দেখতে দেখতে তরতর করে নেমে যাচ্ছে ফার্স্ট ফ্লোরের দিকে। সে লুকিয়ে ফেলেছে ভাবলে কী হবে, প্রিয়স্মিতার জহুরী চোখ অনেকটা দূরে দাঁড়িয়ে ও ওড়নার আড়ালের রিভলভারটা স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে, যদিও আংশিক। তবে মেহরিমা শিকদার প্রিয়স্মিতাকে নিশ্চয় রিভলভার চেনাতে হবে না।
ব্যাপারটা কী হচ্ছে দেখতে চুপি চুপি প্রিয়তার পিছু নিল প্রিয়স্মিতা। প্রিয়তা ফার্স্ট ফ্লোরে এসে বাঁদিকের ৬ নম্বর রুমটাতে ঢুকে পড়ল।

দূরে দাঁড়িয়ে বেশ অবাক হলো প্রিয়স্মিতা। ওটা যার ঘর, তার সাথে প্রিয়তার কী কাজ থাকতে পারে—বুঝল না। দুজনের সম্পর্ক তো ভেতর ভেতর সাপ আর বেজির মতো!
“উঁহু, ব্যাপারটা দেখতে হচ্ছে তো!”
প্রিয়স্মিতা পা টিপে টিপে গিয়ে দরজার কোণায় দাঁড়াল। কাঠের দরজাটা সামান্য ফাঁক, ভেতরের উত্তর দিকের কোণটা দেখা যাচ্ছে কেবল, কিন্তু ওদের দুজনকে দেখা যাচ্ছে না।
দরজাটা খোলার উদ্দেশ্যে দরজার ওপর হাত রেখেও হাত সরিয়ে নিল প্রিয়স্মিতা। বদলে একদম দরজার সাথে লেগে কান পেতে দাঁড়াল।
“একী! তুই আমার ঘরে কী করছিস?”
সাথে সাথেই একটা বিকট চিৎকারে ধড়ফড়িয়ে উঠল প্রিয়স্মিতার। কানে তালা পড়ে যাওয়ার উপক্রম হলো! বুকে থুথু ছিটিয়ে সাথে সাথে নিজেকে পুনরায় ধাতস্থ করল।
সতীনে সতীনে আলাপ এমন তো হবেই—বলে নিজেকে বোঝ দিলো প্রিয়স্মিতা। আবারো সন্তর্পণে দেওয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়াল। আরো ভালো মতো কান পাতল দরজায়।

প্রহেলিকা রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে অগ্নি চোখে তাকিয়ে আছে প্রিয়তার দিকে, যেন দৃষ্টিতেই ভস্ম করে দেবে।
তবে প্রিয়তার চোখে-মুখে আগের সেই কাঙ্ক্ষিত বেচারি অবলা নারী ভাবটা মোটেও নেই। বদলে চোখ-মুখে ফুটে আছে এক নিশব্দ দৃঢ়তা, ঠোঁটের কোণে লেগে আছে চমৎকার বাকা হাসি।
প্রিয়তা ঠোঁটে সেই চিকন হাসির রেশটুকু টেনে প্রহেলিকার সাথে ঘেঁষে দাঁড়ালো, কুটিল হেসে বললো—
“কুল বড় আপা! এত হাইপার হওয়ার কী আছে? আমরা আমরাই তো। আমি তো তোমার ছোট্ট বোন, বলো? আমি কী তোমার ঘরে আসতে পারি নাহ্?”
মুখটা এইটুকু করে ভান ধরে বললো প্রিয়তা।
“তুই আমার চোখের সামনে থেকে দূর হয়ে যা।”
“আহ্হা বড়ো আপা, ছোট বোনের সাথে কেউ এমন ব্যবহার করে? আচ্ছা, যাও, চলে যাবো তবে?”
“তবে কী?”
প্রিয়তা চওড়া হাসলো—

“আমার তোমার সাথে কিছু কথা আছে। এবার তুমি যদি সেটা ভালোয় ভালোয় বলো, তাহলে তো ভালোই, আমি এক্ষুনি চলে যাচ্ছি। আর নাহলে…”
বিছানায় আধশোয়া ছিল প্রহেলিকা। প্রিয়তার অস্বাভাবিক দুঃসাহস দেখে চোখ কপালে উঠে গেলো। এমনিতেই মেয়েটাকে দুচক্ষে সহ্য হয় না, তার ওপর অপদ ঘরে এসে হুমকি দিচ্ছে।
বেজায় খেপে গেল প্রহেলিকা। তেড়ে গেল প্রিয়তার দিকে, দাঁতে দাঁত পিষে বলল—
“নাহলে কী করবি তুই?”
“কী করব?”
“দেখ প্রিয়তা, চুপচাপ আমার ঘর থেকে বেরিয়ে যা। তোকে জাস্ট আমার সহ্য হয় না। দেখলে মাথায় খুন চেপে যায়। মনে পড়ে যায়, তুই আমার প্রণয় কে কেড়ে নিয়েছিস।”
“হুঁ হুঁ, যাব। যাব। আমারও তোমার পানাপুকুরের মুখটা দেখার বিন্দুমাত্র শখ নেই। তুমি আমার প্রশ্নের যথোপযুক্ত সঠিক উত্তর দাও, আমি এখুনি চলে যাচ্ছি। বড় আপা আছো, বড় আপার সম্মানটা ধরে রাখো।”
কপালের ভাঁজগুলো দৃঢ় হলো প্রহেলিকার।

“কিসের উত্তর?”
“নাটক কেন করলে?”
সোজা সাপটা প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলো প্রিয়তা।
কিঞ্চিৎ ভ্রু বাকালো প্রহেলিকা, কথার হেতু বুঝতে না পেরে শুধাল—
“কিসের নাটক?”
পুরনো কথাগুলো ভাবতেই চোয়াল শক্ত হয়ে গেল প্রিয়তার। ফর্সা শরীরে সবুজ শিরাগুলো ফুটতে লাগল।
“আমার প্রণয় ভাইয়ের সাথে বিয়ের নাটক কেন করলে?”
জবাব শুনে কপালের ভাঁজ মিলিয়ে গেল প্রহেলিকার। ওষ্ঠ কোণে বক্র হাসির দেখা মিলল। গা টানটান করে ফের বিছানায় বসে পড়ল প্রহেলিকা, হাই তুলে বলল—
“নাটক কেন হতে যাবে কেনো? আমরা তো সত্যি জামাই-বউ ছিলাম। দেখিসনি প্রণয় আমায় কত ভালোবেসেছে, কত আদর করেছে? তোর চোখের সামনেই তো করল। চোখে হারতো আমায় রীতিমতো।”
হাতের মুঠো শক্ত হয়ে গেল প্রিয়তার। কণ্ঠটা ভীষণ দৃঢ় শোনাল—
“পাগলের সুখ মনে মনে। দেখো বড়ো আপু, আমাকে একদম রাগিয়ে দেবে না। যেটা জিজ্ঞেস করছি, সেটার উত্তর দাও। সবার সামনে এই লোক দেখানো নাটক কেন করেছো? আমার প্রণয় ভাই কোনোদিন তোমায় ভালোই বাসেনি, তাহলে এত নাটক কেন?”

“উমম, ভাবছি।”
তুথনিতে তর্জনী রেখে ভাবার অভিনয় করলো প্রহেলিকা।
“কী?”
প্রহেলিকা আরেকটু ভাবার অভিনয় করে বলল—
“ভাবছি তোকে ইতিহাসের সব থেকে বড় সিক্রেটটা কি জানিয়ে দেবো?”
“মানে?”
বসা থেকে ফট করে দাঁড়িয়ে পড়ল প্রহেলিকা। বাঁকা হেসে প্রিয়তার চার পাশে চক্কর কাটতে কাটতে ভাবুক কণ্ঠে বলল—
“মানে এটাই, তুই তো আমাদের সব থেকে বড় সিক্রেটটায় হাত দিচ্ছিস। এটা তোকে বলে দিলে, তুই তো আমার রাতের ঘুম হারাম করে দিবি। প্রণয়কে আর এক মুহূর্ত ছাড়বি না।”
মুখ বাঁকাল প্রিয়তা, তাচ্ছিল্য করে বলল—
“প্রণয়কে আমি এমনিতেও ছাড়ব না। প্রণয় আমার। এই তনয়া শিকদার প্রিয়তার ছিল, আছে, থাকবে।”
“তোর খুব গৌরব, তাই না? প্রণয় তোকে ভালোবাসে?”
“খুউব।”
প্রিয়তার কণ্ঠস্বরে এক ধাতব দৃঢ়তা।
“বেশ! তাহলে প্রণয়ের কাছেই রহস্যের সমাধান খোঁজ। আমি কিছুই বলব না।”
“কিন্তু আমি তো তোমার মুখ থেকেই শুনব। কারণ আমি এতটুকু তো ঠিক বুঝেছি, প্রণয় ভাই এমনি এমনি এসব নাটক করেনি। তার পেছনে অবশ্যই তুমি ছিলে। তুমি বাধ্য করেছিলে।”
অট্টহাসিতে ফেঁটে পড়লো প্রহেলিকা—
“ব্রেভ গার্ল! ঠিক বুঝেছিস, সব কিছুর মাস্টারমাইন্ড আমি, প্রহেলিকা শিকদার। কিন্তু তোকে কিছুই বলব না।”
ঠোঁট ঠেলে হাসল প্রিয়তা। প্রহেলিকার দিকে দু’পা এগিয়ে এসে চোখে চোখ রাখল। এক অদ্ভুত শীতল, রহস্যময় কণ্ঠে বলল—
“শিওর?”
হঠাৎ এমন হওয়াতে সামান্য হকচকিয়ে গেল প্রহেলিকা। তৎক্ষণাৎ পিছিয়ে গেল দুই কদম।
কপাল কুঁচকে সন্দিহান কণ্ঠে বলল—
“কী করছিস?”

প্রিয়তা মুখে কিছু বলল না। তার চোখ দুটো অস্বাভাবিক স্থির। প্রহেলিকা ভ্রু কুঁচকে ফের কিছু বলতে নিল, তবে শব্দগুচ্ছ জিভের ডগায় এসে আটকে গেল।
শীতল বন্দুকের নলটা ঠিক কপাল বরাবর ঠেকে আছে। প্রিয়তার হাত সামান্যতমও কাঁপছে না। নিশানা একদম স্থির। হাতের তর্জনী ধরে আছে ট্রিগারের ওপর। নীল চোখের গভীরে কোনো অনুভূতি নেই—কেবল স্থিরতা। কোনো উচ্চবাচ্য নেই।
বলা চলে, প্রহেলিকার প্রাণটা লেগে আছে ওই ট্রিগারের ওপর; সামান্য চাপ, তারপর সব শেষ।
প্রণয়ের সিগনেচার রিভলভারটা প্রিয়তার হাতে দেখে বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল প্রহেলিকার, আতঙ্কে বুকের রক্ত জমে হিম হয়ে গেলো মুহূর্তেই। তবে অন্ধকার সাম্রাজ্যের রানী প্রহেলিকা শিকদার এতটুকুতে দমে যাওয়ার পাত্রী নয়, তবে তার ভয় হচ্ছে প্রিয়তা অদক্ষ হাতে কখন গুলি ছুড়ে দেবে। কৌশল অবলম্বন করল প্রহেলিকা।
ভেতরের ভীতি চেপে মুখে পৈশাচিক হাসি ফুটিয়ে তুলল, প্রিয়তার মুখের ওপর ঝুঁকে এসে ঠোঁট দিয়ে চুক চুক শব্দ তুলে ব্যঙ্গ করে বলল—

“মাই লিটল সিস্টার, ওটা বাচ্চাদের খেলনা নয়। ওটা বড়দের। ওটা নিচে নামাও। ওটা ধরার যোগ্যতা তোমার নেই।”
“আমি যার ঘরণী, তার থেকে বেশি এটা ধরার যোগ্যতা কারো নেই। আর তার ঘরণী হয়ে এতটুকু না জানলে তো আমার স্বামীর সম্মান থাকবে নাহ্। কী বলো বড় আপা? প্রমাণ দেখবে নাকি?”
প্রহেলিকা কম্পিত চোখে একবার তাকালো প্রিয়তার হাতে ধরা রিভলবারটার দিকে।
প্রহেলিকা আচমকা সেটা কেড়ে নিতে তেড়ে আসতেই তার পায়ের ফাঁকে পা ঢুকিয়ে লেং মারলো প্রিয়তা। এমন আচানক আক্রমণের জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিল না প্রহেলিকা, বিধায় তাল সামলাতে না পেরে মুখ থুবড়ে পড়ল প্রিয়তার পায়ের ওপর।
শক্ত মেঝেতে পড়ে হাতের হাড়টা মট মট শব্দ করে উঠল।
ব্যথা চোখ-মুখে খিঁচে ফেলল প্রহেলিকা।
ব্যথা গিলার প্রচেষ্টায় চোখ বুজে ভারী ভারী নিঃশ্বাস ফেলতে লাগল। সুযোগের একদম উপযুক্ত ব্যবহার করল প্রিয়তা, নিজের গায়ের ওড়না খুলে প্রহেলিকার দুই হাত টেনে ধরে বাঁধতে লাগল।
চোখ খুলে চমকে উঠল প্রহেলিকা। ছিটকে সরে যেতে চাইলে চুলের মুঠি শক্ত করে পেঁচিয়ে টেনে ধরল প্রিয়তা।

— “আআআহ্!”
আর্তনাদ করে উঠল প্রহেলিকা, মাথাটা হেলে পড়লো পেছন দিকে। মোটামুটি শক্ত করে প্রহেলিকার হাত বেঁধে ফেলল প্রিয়তা।
প্রহেলিকা কপাল থেকে গাল পর্যন্ত স্লাইড করে ঠোঁট দিয়ে চুক চুক শব্দ তুলে বলল—
“বিষ দাঁত কি শুধু তোমার একার আছে বড় আপা? ভুলে গেলে আমরা একই প্রজাতির। এবার দেখো আমি কী করি।”
বলে প্রহেলিকার গায়ের ওড়না দিয়ে শক্ত করে পা বাঁধল প্রিয়তা।
প্রহেলিকা চেঁচিয়ে উঠলো—
“তুই আমায় বাঁধছিস কেন? ছাড় আমায়। খুলে দে আমার হাত-পা, আহ লাগছে আমার প্রিয়!”
হাত-পায়ের বাঁধন ঘষতে ঘষতে বলল প্রহেলিকা।
প্রহেলিকা চিল্লাচিল্লিকে দু আনার পাত্তা দিল না প্রিয়তা। বাঁধা শেষ করে উঠে দাঁড়াল। এই মহিলার সাথে কুস্তি করে ঘেমে গেছে সে রীতিমতো। হাঁ করে নিঃশ্বাস ছাড়ল প্রিয়তা। পাশ থেকে টুল টেনে বসে পড়ল প্রহেলিকার সম্মুখে, ঠোঁটে ব্যঙ্গাত্মক হাসি ঝুলিয়ে বলল—
— “চুচ চুচ চুচ চুচ, মাত্র ৩১ বছরেই! বুড়ো হয়ে গেল আপামণি? এতো তাড়াতাড়ি যৌবন ফুরিয়ে গেল?”
— “শাট আপ! তুই চাচ্ছিসটা কী? ছাড় আমায় প্রিয়। তুই কাজটা কিন্তু মোটেও ভালো করছিস না। তুই চিনিস নাহ্ আমায়।”
— “খুব ভালোমতই চিনি তোমায়। যে যেমন ভাষা বোঝে আরকি! ভালো মুখে বললাম, তুমি তো শুনলে না। তাই এই ব্যাবস্থা। ওই যে একটা প্রবাদ আছে নাহ্— কুত্তার লেজ কখনো ঘী দিয়ে মালিশ করতে হয় নাহ্, ঝাঁটা দিয়ে মালিশ করতে হয়।”

— “প্রিয়…”
— “শশশশ, আওয়াজ নিচে। এবার বলো, ছয় বছর আগে কী এমন খিচুড়ি পাকিয়েছিলে যে আমার প্রণয় ভাই এমন করতে বাধ্য হলো?”
ক্ষোভে ফেটে পড়ল প্রহেলিকা। গর্জে উঠে বললো—
— “বলব না—”
কথাটা মুখ থেকে সম্পূর্ণ বের করতে পারল না সে।
— “ঠাসসস!”
বিকট চড়ের শব্দে দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে কেঁপে উঠল প্রিয়স্মিতা, আপনাপানি হাত চলে গেলো গালে। তার বুকটাও কেমন ধুকপুক করছে।
থাপ্পড় খেয়ে বিস্ময়ে কিংকর্তব্যবিমূঢ় চোখে তাকিয়ে রইল প্রহেলিকা। সে মোটেও আশা করেনি প্রিয়তার মতো মেয়ে এই কাজটা কখনো করতে পারে। তাকে আরেক ধাপ চমকে দিয়ে এবার ডান হাতে গলা চেপে ধরল প্রিয়তা, চোখ লাল করে রাগে কাঁপতে কাঁপতে বলল—

— “বলবি, নাকি জানে মেরে ফেলব?”
শ্বাসনালীতে অমানবিক চাপ লাগাতে খুক খুক করে কেশে উঠল প্রহেলিকা, দুচোখ লাল হয়ে গেল মুহূর্তেই।
— “বল! নাহলে এখানেই মেরে পুতে রেখে যাব। আমাকে এতোটাও হালকা ভাবে নিস না। দুটো খুন আমার অলরেডি হয়ে গেছে, আর তোর ওপর বিষ তো আমার বহুত পুরনো। তোকে মারতে আমার একটুও হাত কাঁপবে না, আল্লাহর কসম।”
— “উমমমম…”
— “বল!”
দম ফুরিয়ে চোখ উল্টে আসছে প্রহেলিকার, অস্ফুটে গোঙগিয়ে বলল—
— “ব-ব-বলছি!”
ছটফট করতে করতে চোখের ইশারায় গলা থেকে হাত সরাতে ইশারা দিল প্রহেলিকা।
প্রিয়তাও শান্ত হয়ে গেল। আস্তে করে হাত সরিয়ে নিল প্রহেলিকার শ্বাসনালী থেকে, ভ্রু বাঁকিয়ে বলল—
— “এবার এই, ওই, ওটা, সেটা বলে একটাও শব্দের অপচয় করবি না। সোজা মেইন টপিকে আয়। বল, আমায় কী হয়েছিল? অতীতে কী এমন আছে যেটা আমি জানি না? মিথ্যে বলার যদি এতোটুকুও চেষ্টা করিস, তাহলে দেখছিস তো— পর পর দুটো বুলেট তোর মগজে ঢুকিয়ে দিতে আমার দুই সেকেন্ডও লাগবে না।”
গলা মুক্ত হতেই উল্টে যাওয়া চোখ দুটো স্বাভাবিক হলো প্রহেলিকার। জল ছাড়া মাছের মতো ফ্লোরে পড়ে ছটফট করতে লাগল, কাশতে কাশতে তার মুখ দিয়ে রক্ত উঠে আসার উপক্রম।

— “স্পিক আপ!”
চেঁচিয়ে উঠল প্রিয়তা।
চমকে উঠল প্রহেলিকা।
— “ব-বলছি…”
প্রিয়তার দুই চোখ ভরে আছে অজানা কিছু জানার অদম্য কৌতূহলে।
— “আজ থেকে ৯ বছর আগে দাদার মৃত্যুবার্ষিকীতে…”

— “স্যার, আজকের দিনে কি মানুষ মারা ঠিক হলো?”
— “ওটা জানোয়ার ছিলো। আজকের দিনেই তো আল্লাহর নামে শিরনি দিতে হয়! আজ একটা সওয়াবের রাত, তাই আজকের এই পবিত্র দিনে আরেকটা দুই পায়ের চলমান শয়তানকে নরকে পাঠিয়ে দিলাম।”
হাতের রক্তমাখা রিভলবারটা জাভেদের দিকে ছুড়ে মেরে শান্ত কণ্ঠে কথাগুলো বলল প্রণয়।
বাম হাত পাশে বাড়াতেই টিস্যু বক্স তুলে ধরল আফ্রিকান গার্ড মার্কো। প্রণয় দুটো টিস্যু নিয়ে হাতের রক্ত পরিষ্কার করতে করতে কালো বিএমডাব্লিউতে উঠে পড়ল, পাশে বসল জাভেদ। ব্যস্ত নগরীতে গাড়ি চলতে লাগল।
জাভেদ ভেতরে ভেতরে ফুটছে। আজ তার বউ আনিকার সাথে প্রথম ডেটের তৃতীয় অ্যানিভার্সারি।
আজ তার বউ লজ্জা লজ্জা মুখে বেশ মিষ্টি করে বলেছিল,
“শুনছেন, আজকে কোথাও যাবেন না।”
জাভেদও খুশিতে বাকবাকুম হয়ে বউকে জড়িয়ে ধরে বলেছিল,
“উহু উহু! দুনিয়ায় সুনামি আসলেও যাব না।”
জাভেদের মনের আকাশে বেলুন উড়ছিল। কথা শেষ করে কেবল চুমু খেতে যাচ্ছিল জাভেদ, ঠিক তক্ষুনি ঘর কাঁপিয়ে ফোনটা চিৎকার করে উঠেছিল—
“হিটলার বস ইজ কলিং!”

শেষ, মনের আকাশে উড়তে থাকা রঙিন বেলুনগুলো সেকেন্ডের ব্যবধানে ঠাস ঠাস করে ফেটে নিচে পড়ে যায়। জাভেদ এখনো কেবল “আল্লাহ আল্লাহ” করছে, কারণ ভালোয় ভালোয় এবার বাড়ি যেতে পারলেই বাঁচে। আবার মনে মনে হাতুড়ি পেটাচ্ছে— না জানি, সব আশায় পানি ঢেলে এই বেটা আবার কী বলে বসে!
— “এখন তোমার বাড়ি যাওয়া হচ্ছে নাহ্, জাভেদ। এখন তুমি ডিকে-র বডি পার্টসগুলো নিজে দাঁড়িয়ে থেকে শহরের বেস্ট কুককে দিয়ে রান্না করাবে, তারপর নিজে হাতে রাস্তার কুকুরকে খাওয়াবে। অ্যান্ড ইটস মাই অর্ডার।”
এবারও ভাবনা শেষ করতে পারল না জাভেদ, তার আগেই বজ্রের মতো কথাগুলো ছুটে এসে কানে লাগল। শেষ, আজ রাতের মতো বউয়ের কাছে যাওয়ার সপ্ন নিষ্ঠুর বস বলি চাপা দিয়ে দিলো! বিষয়টা ভাবতেই চোখ ছলছল করে উঠল জাভেদের। প্রণয়ের পাশে বসেই “বেঁ” করে কেঁদে উঠলো।
এক পলক জাভেদের দিকে তাকিয়ে মুখ বিকৃত করল প্রণয়। কণ্ঠে এক রাশ বিতৃষ্ণা ঢেলে মুখ ঘুরিয়ে বলল—
“ডিসগাস্টিং।”

বাড়ি ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যা গড়িয়ে যায়। প্রণয়ের কালো রঙের বিএমডাব্লিউটা এসে থামে শিকদার বাড়ির পার্কিং এরিয়াতে। গাড়ি থেকে নেমে আসে প্রণয়। আজ ভেতরটা ভীষণ হালকা লাগছে। একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস বেরিয়ে আসে বুক চিরে। দীর্ঘ ১০ বছরের আতংকের আজ অবসান। কাঁধ থেকে মনে হচ্ছে হিমালয় নেমে গেছে।
প্রণয় বাড়ির গার্ডেন এরিয়া দিয়ে আসতে আসতে এক চোট হাসির কলকাকলিতে থমকে দাঁড়ায়। নজর পড়ে বাগানের দিকে। সামনের দৃশ্যটা ভীষণ মনোরম দেখতেই প্রণয়ের ঠোঁটে হাসি চলে আসে।
অরণ্য, সমুদ্র, অবিরাজ, তন্ময়, অবনী, থিরা, তরী— সবাই বাগান জুড়ে ফেয়ারি লাইট লাগাচ্ছে। আর একজন আরেকজনের কথায় হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়ছে। তাদের হাস্যোজ্জ্বল মুখগুলো চকচক করছে খুশিতে। ওদের মতো একটা শান্তিপূর্ণ নিশ্চিন্ত জীবন বাঁচতে প্রণয়ের ও ইচ্ছা হয়।
হাতের লাল রংটা ধুয়ে মুছে ফেলতে মন চায়। কিন্তু চাইলেই কী আর সব হয়। প্রণয় চারপাশে চোখ ঘুরিয়ে দেখে— ওরা প্রণয় কুঞ্জর চেহারাটাই বদলে দিয়েছে। রাস্তার দুই পাশ থেকে শুরু করে বাড়ির সদর দরজা পর্যন্ত সারি সারি মাটির প্রদীপ।

তেলের প্রদীপ গুলো টিমটিম করে জ্বলছে।
ঝড়ো বাতাসে দুলে উঠছে আগুনের শিখা গুলো।
বাড়িতে আজ তেমন কোনো কৃত্রিম আলোকসজ্জা নেই। কেবল প্রদিপ আর মোমবাতির আলোয় আলোকিত। আজ ২০৩০-এর শবে বরাতের রাত। এই তো সেদিন ঈদ গেল, কিন্তু দেখতে দেখতে আবারও একটা বছর পেরিয়ে গেছে।
দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে কিসের যেন একটা তাড়না অনুভব করল প্রণয়। আকুলতা প্রাণে চাপতেই আর দাঁড়াতে পারল না প্রণয়। দৌড়ে বাড়ির ভেতর ঢুকে গেল।
অনুশ্রী বেগম বড়ো ছেলেকে দেখে পিছু ডাকলেন—
“বাবা”

প্রণয় যেনো সেই ডাক শুনতেই পেলো নাহ্। দ্রুত সিঁড়ি ভেঙে পৌঁছে গেল তিন তলায়। প্রিয় আদুরে মুখটা দেখার তৃষ্ণায় ভেতরটা বড়ো জ্বলসে যাচ্ছে।
ছাদ পেরিয়ে ঘরের সামনের সিঁড়িতে পা রাখতেই আকস্মিক থমকে গেলো প্রণয়। এতক্ষণের হাসি হাসি মুখটা মলিন হয়ে গেল অচিরেই, ভেতরটা ধক করে উঠল অজানা আশঙ্কায়। পদযুগল সেটে গেলো মেঝের সাথে।
প্রণয় বাহিরে দাড়িয়ে থেকেই ভীষণ স্পষ্ট শুনতে পেল ভেতরের চাপা কিন্তু তীব্র ব্যাথাতুর কণ্ঠস্বর।
আর্তনাদ গুলো স্পষ্ট নয়, তবে কণ্ঠের তীব্রতা বেশ জুড়ালো।
কণ্ঠটা ভীষণ পরিচিত প্রণয়ের।
“যাওয়ার সময় ও তো কতো হাসিখুশি ছিলো, তাহলে?”
আলোকসজ্জায় ঝলমলে সারাবাড়ির চারদিকে আনন্দের ফোয়ারা, বাচ্চাদের কোলাহল—উল্লাসের আবহে ভেসে যাচ্ছে। কেবল এই দিকটাই ভিন্ন, বিষণ্ণতার এক নিকষ কালো চাদরে আচ্ছাদিত।
প্রণয় আর কিছু ভাবতে পারল না। তার প্রিয় কণ্ঠে বিষাদের সুর। এই ঘুমড়ে উঠা আর্তনাদ আর সহ্য হলো নাহ্। শক্তিশালী দুই হাতের দানবীয় ধাক্কায়—ধারাম শব্দে দরজার পাল্লা দুটো দুদিকে মেলে গেল। ঝড়ের বেগে ছুটে ঘরে প্রবেশ করল প্রণয়।
অজানা আশঙ্কায় তার বুকটা ঢিপঢিপ করছে। আতঙ্কিত দৃষ্টি যোগল সামনে পতিত হতেই চোখের মণি দুটো স্থির হয়ে গেল প্রণয়ের। বুকের বাম পাশে বইতে থাকা প্রলয়ংকরী ঝড়টা যেন শান্ত হয়ে গেল মুহূর্তেই।
চোখের পাতা ভারী হলো।

পুরো ঘরে জমাট বাঁধা অন্ধকার। কেবল দক্ষিণের খোলা জানালার পর্দা উড়িয়ে এক ফালি চাঁদের নরম আলো এসে পড়ছে ঘরের মেঝেতে। বাতাসের সুরে ভেসে বেড়াচ্ছে সুগন্ধি ধূপের কড়া ঘ্রাণ। ঘরের সব আলো নেভানো, কেবল পশ্চিম কোণে বড় বড় দুইটা সাদা ক্যান্ডেল জ্বলছে।
পাশের জায়নামাজে মাথা ঠেকিয়ে পড়ে আছে প্রিয়তা। দুই হাতের উল্টো পিঠে কপাল রেখে গুনগুনিয়ে কাঁদছে। কান্নার তালে তালে তনু শরীরখানা কেপে কেপে উঠছে।
নীলাভ চোখের কোণ বেয়ে জায়নামাজে টপটপ করে গড়িয়ে পড়ছে নোনা পানি। বিড়বিড় করে মহান রবের নিকট হয়তো কিছু একটা বলছে, যেটা স্পষ্ট নয় প্রণয়ের কাছে।
প্রিয়তমার এমন অবস্থা দেখে কলিজার ভেতর মুচড় দিয়ে উঠলো প্রণয়ের।
“আমার বাবুই পাখিটার কিসের এত কষ্ট?”
তবে এই হৃদয় নিংড়ানো হাহাকার আর এক মুহূর্তও সহ্য হলো নাহ্। প্রণয় স্থির থাকতে পারলো নাহ্। ছেলেটা ছুটে চলে গেল প্রিয়তমার নিকট। হাঁটু মুড়ে বসে পড়ল রমনীর কোল ঘেঁষে।

কাল বিলম্ব নাহ্ করে হাত ধরে টেনে তুলল। প্রিয় পানপাতা মুখটা দুই হাতের অঞ্জলিতে তুলে অস্থির কণ্ঠে শুধাল—
“কী হয়েছে আমার ময়না পাখির? এভাবে কাঁদছ কেন আমার পাখিটা? কেউ কী কিছু বলেছে? কেউ কী আবার কষ্ট দিয়েছে? প্রহেলিকা কিছু বলেছে? বলো আমায় জান।”
বৃদ্ধাঙ্গুলের সাহায্যে নরম দুগালে লেগে থাকা অশ্রু সযত্নে মুছিয়ে দিলো প্রণয়।
তবে এতে বিশেষ লাভ হলো নাহ্। শিক্ত নয়ন জোড়া পুনরায় ভরে উঠলো নতুন উদ্যমে। চোখের পলকেই গাল বেয়ে গড়িয়ে নামলো তপ্ত অশ্রু।
দীর্ঘক্ষণ কান্নার ফলে চোখের চারপাশ ফুলে উঠেছে মেয়েটার। নীলাভ চোখের সাদা অংশ এতটাই রক্তিম, যেন পলক ঝাপটালেই উষ্ণ রঞ্জিত তরল গড়িয়ে পড়বে গাল বেয়ে। প্রিয় মুখটার এমন বেহাল অবস্থা দেখে কলিজাটা মুচড়ে উঠল প্রণয়ের। বুক পাঁজরে ভীষণ পীড়া অনুভব করল।

“এই জান ব—”
উক্ত কথাটুকু সম্পন্ন করার সুযোগ পেল না প্রণয়। পূর্বেই নরম অস্তিত্বটা কালবৈশাখী ন্যায় আছড়ে পড়ল পুরুষালি দেহে।
দুই হাতে পিঠের শার্ট খামচে ধরে ঝড়ের বেগে মুখ লুকালো বক্ষ পাঁজরে। এমন পাগলামো দেখে কিছুটা আশ্চর্য হলো প্রণয়। ধীরে মাথায় হাত রাখলো, নিম্ন স্বরে ডাকলো—
“রক্তজবা।”
প্রণয়কে হতভম্ব করে দিয়ে এবার শব্দ করে কেঁদে উঠল প্রিয়তা। লৌহের ন্যায় শক্ত দেহখানিতে নিজের অস্তিত্ব লুটিয়ে দিল। কাঁদতে কাঁদতে কাতর কণ্ঠে অভিযোগ করলো—
“আপনি কী মানুষ? কোনো মানুষের পক্ষে কী সম্ভব কাউকে এতো ভালোবাসা? কিভাবে পারলেন নিজের সাথে এমন চরম অন্যায় করতে?
ভয় করলো নাহ্?”
বিস্ময়ের চূড়ায় পৌঁছে গেলো প্রণয়। কথার সারমর্ম উদ্ধারে ব্যর্থ হয়ে বলল—
“কী বলছিস তুই জান?”
“অসভ্য লোক, একদম অভিনয় করবেন নাহ্। কতোটা খারাপ আপনি? কিভাবে আমার প্রণয় ভাইয়ের সাথে এমন অন্যায় করতে করলেন?”
কপালের ভাঁজ দৃঢ় হলো প্রণয়ের। কিছু একটা সন্দেহ হতেই চোখ বড়ো বড়ো হয়ে গেলো।
“ওহ্ শিট!”

প্রিয়তা সবটা জেনে গেছে—ব্যাপারটা হজম হচ্ছে নাহ্ প্রণয়ের। এই কাজ প্রহেলিকা ছাড়া কারো নাহ্। প্রহেলিকার উপর প্রচন্ড মেজাজ খারাপ হলো প্রণয়ের।
“আমার জন্য কেনো এত কষ্ট সহ্য করলেন প্রণয় ভাই? কেন এত বলিদান দিলেন? মরতে দিতেন আমাকে। এতো ভালোবাসার তো কিছু ছিলো নাহ্?”
“নিজের প্রাণকেই মরতে দিতাম? এই নিষ্ঠুর বাক্যটা তোমার মুখ দিয়ে আসলো, রক্তজবা? মায়া হলো নাহ্ আমার জন্য?”
প্রিয়তা কেঁদে উঠে একান্ত পুরুষকে আরও শক্ত করে আঁকড়ে ধরল। ভেঙে চুরে গুড়িয়ে গেল তার বুকে, যেনো ছেড়ে দিলেই হারিয়ে যাবে প্রণয়! হেঁচকি তুলে বলল—
“আমি আপনাকে কতোটা কষ্ট দিলাম, কতো খারাপ খারাপ কথা শুনালাম—সবটা মুখ বুজে শুনে গেলেন?
একবার ও কেন আমায় সত্যিটা বললেন না? কেন একা একা সবটা সহ্য করলেন, প্রণয় ভাই?”
“আমি তোর সরলতা কাড়তে চাইনি। আর তুই আমাকে যা খুশি বল, যতো ইচ্ছা আঘাত কর—আমি কী তোকে কষ্ট দেবো নাকি?”
“প্রণয় ভাই…”
নরম ত্বকে অধর চেপে ধরলো প্রণয়।
বিশাল দুই হাতের বেষ্টনীতে ছোট মোমের শরীরটা বুকে পিষে ফেললো। চরম আসক্তি মিশ্রিত কন্ঠে ফিসফিসিয়ে বললো—
“তুই আমার অস্তিত্বের একাংশ। তোর সামান্য কিছু হলে আমার পুরো শরীর মরণ ব্যাথায় নীল বর্ণ ধারণ করে। কী করবো আমি, অসহায় যে!”
“আপনার এই ঋণ আমি কী করে শোধ করব, প্রণয় ভাই? কিভাবে, কতটা ভালোবাসলে আমি আপনার সমান হতে পারবো?”

“এভাবেই বুকের সাথে লেগে থাক।”
“এটুকু যথেষ্ঠ নয়?”
“তাহলে তোর বুকে নে!”
প্রিয়তা সোজা হয়ে বসে প্রণয়ের ভারী মাথাটা নিজের নরম বুকে চেপে ধরলো। ভারী দুটো হাত তাকে পেঁচিয়ে ধরলো শক্ত করে।
নারী শরীরের মাধুর্যপূর্ণ গন্ধটা নাসিকা গ্রন্থিতে প্রবেশ করতেই সারাদিনের ক্লান্ত শরীরটা ডুবে গেলো আরামের নেশায়।
প্রশান্তিতে মস্তিষ্ক শিথিল হয়ে আসলো।

এ যেনো এক অদ্ভুদ শুদ্ধিকরণ—শরীরের যত্রতত্র লেগে থাকা সকল পাপ ধুয়ে মুছে সাফ হয়ে গেলো।
সকল কাঠিন্যতার খুলোস ঝেড়ে ফেলে নিজের অসহায় রূপটা মেলে ধরলো।
নরম চুলের ভাঁজে হাত রাখলো প্রিয়তা। মাথা নিচু করে ফের ফুপিয়ে উঠলো—
“আমি ভাবতাম আমি জীবনে কতটা দুঃখী, কিন্তু আজ জানছি আপনার যন্ত্রণার নিকট আমার যন্ত্রণার অস্তিত্বটুকুই নেই। এত ভালো কি কেউ কাউকে বাসে? ভালোবাসার জন্য কেউ এতটা করে? আমি কি এটাকে সৌভাগ্য ধরব, নাকি আপনার সুন্দর জীবনটা ধ্বংস করে দেওয়ার জন্য নিজেকে অপয়া অলক্ষ্মী ভাবব? আপনার এত ভালোবাসা পাওয়ার জন্য আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করব, নাকি আমার ভালোবাসার পুরুষটার এতো কষ্ট পাওয়ার জন্য ফরিয়াদ জানাব? বলুন না প্রণয় ভাই, কী করব আমি? আমি আপনার জীবনটা নষ্ট করে দিলাম।”
“চুপ কর পাখি, কিসব উল্টাপাল্টা বলছিস? এসব আজগুবি কথা তোকে কে বলেছে?”
“জায়নামাজে বসে মিথ্যা বলবেন না, প্রণয় ভাই। আমি আপনার জীবন নষ্ট করে দিলাম।”
“একদম চুপ। তুই আমার জীবন—তোকে ছাড়া কোনো অস্তিত্ব নেই আমার। আমি শুধু নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছি। কারো জন্য করিনি, যা করেছি নিজের জন্য করেছি।”

“প্রণয় ভাই…”
“হ্যাঁ, বাবুই পাখি। আমি তোকে হারিয়ে এই নরকে অনন্তকাল বাঁচতে চাই না। বিনিময়ে তোকে বুকে নিয়ে কয়েক মুহূর্ত বাঁচব—তাতেই হবে।”
মাথা নিচু করে নিলো প্রিয়তা। টলটলে রক্তিম চোখ উপচে টুপ করে একটা ফোঁটা লালচে পানি গড়িয়ে পড়লো প্রণয়ের গালে।
বুকচিরে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো প্রণয়ের। মাথা তুলে সোজা হয়ে বসলো। আবারো চোখের পানি মুছিয়ে দিয়ে অসহায় কন্ঠে বলল—
“উফফফ, এতো কাঁদলে মাথা ব্যাথা করবে তো? মাথা ব্যাথা ধরে গেছে নিশ্চই। দাঁড়া, আসছি।”
বলে উঠে যে যেতে চাইলো প্রণয়, বহু আকড়ে ধরলো প্রিয়তা। করুন কন্ঠে বললো—
“প্লিজ, যাবেন নাহ্।”

“তাহলে আর একটু ও কাঁদবি নাহ্, তোর চোখের পানিতে এবার শহরে বন্যা নামবে!”
প্যন্ত্রণায় আর অনুশোচনায় দম বন্ধ হয়ে আসছে প্রিয়তার!
ধীরে চোখ তুলে প্রণয় মুখটার দিকে তাকালো প্রিয়তা, খোঁচা খোঁচা দাড়িযুক্ত গাল দুটো কী আদুরে, প্রিয়তা হাত বাড়িয়ে ছুঁয়ে দিলো, নেশাতুর বাদামী চোখ দুটো হয়তো প্রশান্ত মহাসাগরের থেকে ও গভীর।
কত নিষ্পাপ একটা মুখ! প্রণয়ের হাত দুটো তুলে নিজের চোখের সামনে মেলে ধরল প্রিয়তা। কাতর দৃষ্টিতে দেখলো, বড়ো বড়ো পবিত্র হাত দুটো আজ তার জন্য কত শত নিরপরাধের রক্তে রাঙানো। এদের সবার প্রকৃত খুনি তো সে নিজেই। শুধু মাত্র তার একটা জীবন রক্ষা করার জন্য কতো শত নিষ্পাপ জীবন উজাড় হয়ে গেছে। প্রিয়তা কী ক্ষমা করতে পারবে নিজেকে?
প্রণয় দুই হাত নিজের গালে রেখে ডুকরে কেঁদে উঠল প্রিয়তা। মাথা নিচু করে ক্রন্দনরত গলায় অস্ফুটে বলল— “কিন্তু আমি তো নিজেকে ক্ষমা করতে পারছি না জান, তুমি আমার জন্য, আমার জন্য আজ, শুধু মাত্র আমার জন্য।”
আবারও বুকে জাপটে ধরল প্রণয়, মসৃণ ললাটে রক্তিম ওষ্ঠ যুগল আলতো স্পর্শে চেপে ধরল। খুব ধীরে লয়ে শান্ত করার ভঙ্গিতে বলল— “শশশ… শশশ… কিছু তোর জন্য নয়।”
“আমাকে একটু কম ভালোবাসলে কি হতো নাহ্ প্রণয় ভাই? এতো গুলো জীবন বেঁচে যেতো! আপনার জীবনটা ও বেঁচে যেত। বড়ো আপু ঠিকই বলে আমি অপয়া অলক্ষ্মী? মরতে দিতেন আমায়।”
“শাট আপ!”

বজ্র কণ্ঠে ধমকে উঠল প্রণয়। “তোকে বলতে দিচ্ছি মানে যা কিছু বলবি?”
ধমকের সাথে কেঁপে উঠল প্রিয়তা, আরও শক্ত করে আঁকড়ে ধরল। ব্যাথাতুর কন্ঠে বলল— “আমার খুব ভয় করছে, এবার কী হবে প্রণয় ভাই? সারা দুনিয়া যেভাবে আপনার পিছে পড়ে আছে, আমি এখন কী করব? কী করে বাঁচাব আপনাকে?”
“তোর কিছু করতে হবে না, তুই শুধু আমার বুকে ঘাপটি মেরে থাক, দুনিয়া সামলানোর দায়িত্ব আমার।”
“ন–না… না… আপনি আর কোনো অন্যায় করবেন না প্রণয় ভাই, আমার প্রণয় ভাই নিষ্ঠুর নয়। এই নারকীয় নিষ্ঠুরতা আপনার জন্য নয়। আর কারো অনিষ্ট করবেন না। যা হওয়ার হয়ে গেছে, আল্লাহ তো মহান দয়াশীল পরম করুণাময়, উনি কাউকেই খালি হাতে ফেরান নাহ্।

আপনি ক্ষমা চেয়ে আল্লাহর পথে ফিরে আসুন, তওবা করুন। দেখবেন আমরা অনেক সুখী হবো। আমি আপনাকে শুধু দুনিয়াতে নয়, আখেরাতেও স্বামী হিসেবে চাই প্রণয় ভাই। আমি চাই আমাদের সংসার দুনিয়ার পর জান্নাতেও চিরস্থায়ী হোক। এই নশ্বর পৃথিবীতে এতো সংগ্রামের পর দুদিন আপনাকে পেয়ে আবার চিরতোরে জন্ম জন্মান্তরের মত হারিয়ে ফেলতে চাই নাহ্ আমি। আপনার সাথে আমি এক অনন্ত জীবন পাড়ি দিয়ে চাই।
আজ আমাকে ছুঁয়ে কথা দিন, আপনি এসব ছেড়ে দেবেন, সন্ত্রাসী ASR নয়, আমার প্রণয় ভাই হয়ে বাঁচবেন। কথা দিন আমায়।”
প্রণয় চোখ বুজে নিল, বুকে থাকা ছোট সত্তাটা পরম মমতায় আরো শক্ত করে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরল। ভেতরের ছাই চাপা আগুনটা বুঝি আবারও দক করে জ্বলে উঠল, মেয়েটা কী বুঝল? সে কী চাইছে? তার কী কোনো ধারণা আছে আন্ডারওয়ার্ল্ড সম্বন্ধে? সে কি জানে ওই জগতে স্বেচ্ছায় প্রবেশের দরজা আছে কিন্তু ফেরার কোনো দরজা নেই?
“বলুন না…”

প্রণয় কে নির্লিপ্ত থাকতে দেখে পিঠ ঝাঁকিয়ে ডাকলো প্রিয়তা।
“তুমি কী ভেবে বলছ প্রাণপাখি, পরে আফসোস করবে নাহ্ তো?” প্রণয়ের কণ্ঠস্বরে কাতরতা স্পষ্ট।
প্রিয়তা অবুঝের ন্যায় মাথা নাড়লো— “হ্যাঁ হ্যাঁ ভেবেই বলছি। আমি জেনে শুনে আপনাকে আর অন্যায় করতে দিতে পারব না। এই রক্তের খেলা আর খেলতে দিতে করবো নাহ্। আপনি তওবা করুন আপনার সকল অসৎ কর্মের জন্য আবারো আগের প্রণয় ভাই হয়ে ফিরে আসুন আমার কাছে, আমরা আবার শুরু থেকে সব শুরু করবো। এসব ছেড়ে দিন, আমরা দূর অজানায় হারিয়ে যাব, শুধু আপনি আর আমি থাকবো, কেউ কখনো খুঁজে পাবে না আমাদের।”
প্রণয়টা ভেতরটা নীরবে আর্তনাদ করে উঠল, রক্তিম ঠোঁটে ফুটে উঠলো একফালি বিষাদমাখা মলিন হাসি। প্রেমে পাগল আসক্ত মনটা চিল্লিয়ে বলে উঠলো— “কোথায় পালাবি রে পাখি আমায় নিয়ে? এই ত্রিভুবনের কোথাও এমন স্থান নেই যেখানে তুই এই অভিশপ্ত মানুষটাকে নিয়ে ঘর বাঁধবি। আমার নিয়ন্ত্রণ এবার ছুটে গেলে পরিস্থিতি সামলানোর সাধ্য আর আমার থাকবে নাহ্, তুই কী আর আমায় ধরে রাখতে পারবি।

এই জগতে যাওয়ার পথ আছে, কিন্তু ফিরে আসার যে কোনো পথ নেই। যে একবার জড়িয়ে যায় সে আর আমৃত্যু মুক্তি পায় না, মাঝপথে ছেড়ে আসতে পারে না। ব্যাক্তি অন্ধকার জগত ছাড়তে চাইলে ও অন্ধকার জগৎ তাকে ছাড়ে নাহ্। একবার জড়িয়ে গেলে মুক্তি কেবল মৃত্যুতেই। সাম্রাজ্য ধসে পড়ার সাথে সাথে তার সম্রাটকেও নিঃশেষ হয়ে যেতে হয়। তাহলে আমার জান পাখিটাকে কি আমি আর বেশি দিন দেখতে পাব না?”
কিন্তু প্রণয় ও অনুভব করলো সবকিছু সমাপ্ত করার তাগিদ, তার পাপের ঘড়া পূর্ণ হয়েছে। নিজের স্বার্থে এই নিষ্ঠুরতা কী সে অনন্তকাল চালিয়ে যাবে?
প্রিয়তার চিরন্তন একসাথে থাকার যে লোভটা দেখালো, তাতে সত্যি সত্যি প্রভাবিত হলো প্রণয়। মৃত্যুর ওপারে আর কোনো মৃত্যু নেই, কোনো বিচ্ছেদ নেই, কেবল নিশ্চিন্ত একীভূত। প্রিয়তমা কে ছেড়ে নরকে সেও পচতে চায় নাহ্।
কিন্তু নিশ্চিত ভবিষ্যৎগুলো কল্পনা করলে বুকটা কেমন ব্যাথায় অবশ হয়ে যায়। সে মরতে ভয় পায় না, ভয় পায় এই পাখিটাকে চিরতরে হারানোর। তাকে মেরে ফেললে তো আর কোনোদিন ওই পাখিটার নরম বুকে মাথা রেখে পারবে না। ওই বুকের শান্তি আর ছুঁয়ে যাবে নাহ্ তার পাপী সত্ত্বাটাকে। ওই মায়াবী মুখটা সে আর দেখতে পাবে নাহ্। কাফনের কাপড়ে তার মুখ ঢেকে দেওয়া হবে চিরতরে। এসব বেশিদূর ভাবতে পারে নাহ্ প্রণয়, শ্বাসকষ্ট শুরু হয়।

“আপনি কথা দেবেন না প্রণয় ভাই?”
ব্যাথাতুর মলিন হাসল প্রণয়, রমণীর পেলব গালে গাঢ় চুম্বন এঁকে এঁকে নেশাতুর কণ্ঠে আওড়াল— “তোমাকে অদেও আমার কাছে কী আছে জান? তোমার সকল আরজি মঞ্জুর, বান্দার এত সাহস কোথায় সে তোমার ইচ্ছাকে অগ্রাহ্য করবে?

ভালোবাসার সীমানা পেরিয়ে পর্ব ৯১ (২)

আমি আবরার সিকদার প্রণয়, তোমাকে ছুঁয়ে কথা দিলাম, আমি আজ এই মুহূর্ত থেকে আমার অন্ধকার অতীতের শেষ পাতাটা ছিঁড়ে ফেললাম। তোমার চোখের দিকে চেয়ে কথা দিলাম, এই হাত আর কোনোদিন রক্তে রাঙানো হবে না। আমার সমস্ত ক্ষমতা, সমস্ত দাপট—সবকিছুর বিনিময়ে আমি শুধু তোমার ‘প্রণয়’ হয়ে বেঁচে থাকব। আমার পৃথিবী আজ থেকে কেবল শুধু তুমিময়।”

ভালোবাসার সীমানা পেরিয়ে পর্ব ৯৩

6 COMMENTS

  1. এখানে এন্ডিং করলে হতো না,,,,
    প্লিজ প্লিজ
    সেড এন্ডিং দিয়েন না

  2. Apu please please please pore part ta Tara tari din please please 🥺🥺🥺😞🥺😞🥺😞

  3. আপু next কবে দিবেন???? আর ধৈর্য ধরতে পারতেছি না

Comments are closed.