ভালোবাসার সীমানা পেরিয়ে পর্ব ৭৭
প্রিয়স্মিতা তেহজীব রাই
প্রিয় এই প্রিয় বনুউউউউ আব্বে এই ঘুমকুমারী। অনেকক্ষণ যাবৎ কারো চাপা কণ্ঠে ডাকা-ডাকিতে ঘুমের মধ্যেই নড়ে উঠলো। প্রিয়তা ডাক কানে পৌঁছাচ্ছে ঠিকই, কিন্তু শরীর এই সুখশয্যা ছেড়ে উঠে যেতে রাজি নয়। এখন রাত না সকাল, সেটাও জানে না প্রিয়তা।
প্রণয়ের বুকের ওপর মুখ থুবড়ে পড়ে মরার মতো ঘুমাচ্ছে, কিন্তু এভাবে বেশিক্ষণ পড়ে থাকতে পারলো না প্রিয়তা। আরো দুই-একটা ডাকের সাথে পুরোপুরি জেগে গেলো।
“এই প্রিয়, উঠ না গাধা। বেরিয়ে আয়, কথা আছে।”
প্রিয়তা চোখ ডলে উঠে বসার চেষ্টা করে—ওহ, ব্যর্থ হলো। হাই তুলে চোখ পিটপিট করে তাকিয়ে দেখলো, প্রণয় ঘুমের মধ্যেই তার পিঠ জড়িয়ে রেখেছে। মিষ্টি হাসলো প্রিয়তা।
নিজের অবস্থানের দিকে তাকিয়ে দেখলো, সে লেপ্টে আছে প্রণয়ের বুকে। লজ্জায় গাল গরম হয়ে উঠলো প্রিয়তার। লজ্জা গিলে নিয়ে প্রণয়ের মুখের দিকে তাকালো। একদম শান্ত হয়ে আছে মানুষটা। বাচ্চাদের মতো কত নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছে। সকাল-সকাল প্রাণটা জুড়িয়ে গেলো প্রিয়তার।
আলতো স্পর্শে হাত রাখলো প্রণয়ের গালে। আলগোছে কপালের চুল সরিয়ে গাঢ় চুম্বন খেয়ে বললো,
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
“কত নিষ্পাপ একটা মুখ। দেখলেই আদর করে দিতে মন চায়। এই যে চুপটি করে ঘুমিয়ে আছেন, কত ভালো লাগছে দেখতে। জেগে থাকলে এমন শান্ত থাকতে পারেন না। সব সময় প্রিয়তাকে ধমকা-ধমকি, চমকা-চমকি। বাজে লোক।”
একটা চুম্বন খেতে গিয়ে হঠাৎ থেমে গেলো প্রিয়তা। চমকে তাকালো বন্ধ দরজার দিকে। সে তো ভুলেই গিয়েছিল—কেউ তাকে ডাকছে।
“তুই বের হবি নাকি এবার চিৎকার দিয়ে ডাকবো?”
প্রিয়তা আস্তে করে প্রণয়ের কাছ থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিলো। প্রণয় ঘুমিয়ে থাকায় কাজটা করতে বেশি বেগ পেতে হলো না।
কমফোর্টার সরিয়ে মেঝেতে পা রাখতেই প্রচণ্ড ঠান্ডায় লাফিয়ে উঠলো। দ্রুত AC–এর রিমোট নিয়ে হিট মুড অন করে দিলো। প্রণয়ের সারা গায়ে ভালো করে কমফোর্টার জড়িয়ে দিয়ে পা টিপে টিপে দরজা খুলে বেরিয়ে গেলো।
বাইরে এসে হাই তুলে সামনে তাকাতেই টাস্কি খেয়ে গেলো প্রিয়তা। হাঁ করা মুখটা হাই অবস্থাতেই রয়ে গেলো। প্রিয়স্মিতা বোনের এক্সপ্রেশন দেখে বিরক্ত হলো। মুখের ওপর তুড়ি বাজিয়ে বললো,
“এমন হাবলার মতো কী দেখছিস তো? কখন থেকে ডাকছি। ডাকতে ডাকতে আমার গলার কুয়ো শুকিয়ে গেলো।”
ধমক খেয়ে ফট করে মুখ বন্ধ করলো প্রিয়তা। চোখ বড় করে বোনের মাথা থেকে পা পর্যন্ত স্ক্যান করে বললো,
“এগুলো কী পরেছিস?”
কপাল কুঁচকালো প্রিয়স্মিতা। নিজের দিকে তাকিয়ে বললো,
“কী পরলাম? শার্ট, প্যান্ট আর হুডি। ঠিকই তো আছে।”
প্রিয়তা আবার হাই তুললো। অলস কণ্ঠে বললো,
“সে যা ইচ্ছা পরো। কিন্তু এত সকাল-সকাল আমার আরামের ঘুমটা চটকে দিলে কেন? এখন তো ঠিক মতো সকালও হয় নি।”
প্রিয়স্মিতা রহস্যময় হাসি দিলো। সতর্ক নজরে তাকালো।
প্রিয়তা সন্দিহান কণ্ঠে বললো,
“কী চলছে মাথায়?”
“গ্রিল চিকেন খাবি?”
আচমকা বলে উঠলো প্রিয়স্মিতা।
উত্তর শুনে বেকুব বনে গেলো প্রিয়তা।
“এ্য্যহ!”
“হ্যাঁ। একটু আগে শুয়ে শুয়ে ক্র্যাভিং হচ্ছিল। তাই তোকে ডাকতে এলাম। চল, একসাথে মুরগি পুড়িয়ে খাবো।”
প্রিয়তা হাসবে না কাঁদবে বুঝতে পারলো না। কোন মাটি দিয়ে আল্লাহ এই মহিলাকে বানাইছে কে জানে। নীরস কণ্ঠে বললো,
“এখন ভোর চারটা বাজে। তোমার মনে হয় এখন মাংস কোথায় পাবো? চল, ফ্রিজে গিয়ে দেখি।”
বলেই যেতে ধরলো প্রিয়তা। সাথে সাথে পথ আগলালো প্রিয়স্মিতা।
“ঐ ফ্রিজের ঠান্ডা মাংসে মজা নেই।”
“সরি আপু। এই ভোর রাতে আমার বা তোমার কারো জামাই বাজার খুলে বসে নাই। তাই চলো গিয়ে ঘুমিয়ে পড়ি। হাহ হা। বিরাট ঘুম পাচ্ছে।”
হাই তুলে বললো প্রিয়তা।
প্রিয়স্মিতা কোমরে হাত দিয়ে ভ্রু নাচিয়ে বললো,
“ঢং করিস আমার সাথে। সত্যি বল, তোরও জিভে পানি এসেছে। মিথ্যে বলবি না। আমি দেখেছি।”
প্রিয়তা মাথা চুলকে বললো,
“হ্যাঁ, ইচ্ছে তো আমারও করছে। কিন্তু মাংস কোথায় পাবো?”
“আরে তোর বোন আছে। আমার বোন খেতে চাইছে আর আমি খাওয়াবো। এমন নালায়ক এই প্রিয়স্মিতা নয়।”
প্রিয়তা মুখ বাঁকিয়ে বললো,
“উহহ! ঢং দেখে বাঁচি না। নিজে সাড়ে ষোল আনা খেতে আর আমার নামে দোষ দিচ্ছে। ওই যে একটা প্রবাদ আছে না—জামাইয়ের নামে মেরে হাঁস, গুষ্টি-সুদ্ধ খায় মাস।”
“তুই কি কোনোভাবে আমায় অপমান করলি?”
“সরাসরি করলাম।”
“তুই কি ভাবলি তোর অপমান আমি গায়ে মাখবো? হাহ! ছোটদের কথা আমি গায়ে মাখি না। যাই হোক, আমি তোর বড় বোন।”
চোখ সরু করে তাকালো প্রিয়তা।
“ছোট?”
“হ্যাঁ। তা ছাড়া আবার কী! তুই আমার পাক্কা দুই মিনিট ঊনত্রিশ সেকেন্ডের ছোট, যাহ। ছোট ভেবে তোকে মাফ করে দিলাম।”
“ভাব দেখে বাঁচি না। এখন পটর-পটর না করে বলো—মাংস কোথায় পাবো?”
প্রিয়স্মিতা থুতনি চুলকে কিছুক্ষণ ভাবলো। তারপর চোরা চোখে আশপাশে তাকিয়ে বললো,
“I have a plan.”
“কি?”
“আগে এটা ভালো মতো গায়ে পেঁচা।”
বলে নিজের শালটা প্রিয়তার দিকে ছুঁড়ে মারলো প্রিয়স্মিতা। প্রিয়তা চাদরটা ভালো করে শরীরে জড়িয়ে নিলো।
“ওকে, পারফেক্ট। চল।”
“কোথায়?”
“আরে চল না। খেতে হলে সংগ্রাম করে খেতে হবে।”
“হ্যাঁ ধুর, চল।”
প্রিয়স্মিতা আর প্রিয়তা পা টিপে টিপে চুরির মতো বাড়ির সদর দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে গেলো।
রাতের অন্ধকার ছাড়িয়ে দিবাকরের প্রথম সূর্য কিরণ স্পর্শ করেছে ধরণীকে। তবে তাতে বিশেষ সুবিধা হলো না। চারদিক ঘন মোটা কুয়াশার আস্তরণে ঢাকা। হয়তো কয়েক হাত দূরত্বের মানুষটাকেও ভালো মতো দেখা যাবে না।
ঠান্ডায় প্রিয়তার দাঁতে দাঁত লেগে যাচ্ছে। সে কাঁপতে কাঁপতে প্রিয়স্মিতার উদ্দেশ্যে বললো,
“মুরগি খাওয়ানোর নাম করে ঠাণ্ডা দিয়ে মার্ডার করতে এনেছো আপু।”
বিরক্ত হলো প্রিয়স্মিতা। পুকুর পাড় ছাড়িয়ে পাঁচিলের দিকে যেতে যেতে বললো,
“ভাঁত না বলে চুপচাপ আয়। ওদিকে তো রাস্তা নেই।”
“আপু গেট তো এদিকে।”
“জানি। কিন্তু ওকে পেট মোটা মোটা গোঁফওয়ালা তোর জামাই পাহারা দিচ্ছে। বেরোতে দেখলে হাঁদে অফিসে কমপ্লেইন করে দেবে। তাহলে এদিকে যাবো কিভাবে।”
বলতে বলতে দুজনে সেই বিখ্যাত পেয়ারা গাছের সামনে এসে দাঁড়ালো।
প্রিয়তা কংক্রিটের উঁচু পাঁচিল তার দিকে তাকিয়ে বললো,
“মই তো নেই আপু।”
প্রিয়স্মিতা পেয়ারা গাছটা পরখ করতে করতে বললো,
“লাগবে না।”
“তাহলে কিভাবে যাবো।”
“পাঁচিল টপকে।”
বিস্ময়ে চিৎকার বেরিয়ে গেলো প্রিয়তার,
“কি!”
“হ্যাঁ। পাঁচিল টপকেই ওপারে যাবো। এমন রিয়াকশন দেওয়ার কি আছে।”
প্রিয়তা বিস্ময়ে ছুঁড়ে ফেলে ঘুরে আপত্তি জানিয়ে বললো,
“অসম্ভব। তোমাকে আমি পাঁচিল টপকাতে দেবো না এই অবস্থায়।”
“ধুর। কিছুই হবে না।”
জাস্ট ৫ উইক আপু।আমার গ্রিল চিকেন খাওয়া লাগবে না। বাড়ি চলো।”
“আরে কেঁচাল করিস না তো আমার অভ্যাস আছে।”
“কিন্তু আমার নেই।”
“আমি আছি। শিখিয়ে দেবো।”
অনেক না নিষেধ করে ও প্রিয়স্মিতাকে রাজি করাতে পারলো না প্রিয়তা।
প্রিয়স্মিতা হাতের সাহায্যে গাছের জমে থাকা কুয়াশা সরিয়ে দিয়ে বললো,
“সাবধানে দেখিস। পা পিছলে পরে যাবি।”
প্রিয়তার ভয় লাগছে গাছে উঠতে। তবুও ও জামা সামলে সাবধানে পেয়ারা গাছে পা রাখলো।
“হ্যাঁ। ঐ দিকের ডালটা শক্ত করে চেপে ধরে। নিচের ডালটাতে পা রাখ।”
প্রিয়তা ঢোক গিলে বললো,
“ভয় লাগছে আপু।”
“তুই না আমার বোন।”
“গ্রেট প্রিয়স্মিতার বোন।”
“হ্যাঁ। এর পর ওপরে ডালে পা রাখ।”
প্রিয়স্মিতার কথা মতো পাঁচিলে উঠে গেলো প্রিয়তা। ওপর থেকে নিচে তাকিয়ে বিশাল এক চিৎকার দিলো,
“আআআআআ।”
“চুপ। চেঁচাস কেন।”
প্রিয়তা ঠোঁট উল্টে বললো,
“আআআ আপু। অনেক উঁচু। এখান থেকে লাফ দিলে প্রিয়তা সোজা পটল তুলবে।”
প্রিয়তা কথা শেষ করতে পারলো না। তার পূর্বেই টপাটপ গাছ বেয়ে পাঁচিলে উঠে পড়লো প্রিয়স্মিতা। আপ আর কিছু বলার আগেই প্রিয়তার হাত চেপে ধরে লাফ দিলো।
দুই বোন একসাথে মুখ থুবড়ে পড়লো পিচঢালা রাস্তায়। দুজনেই ব্যথায় চোখ মুখ খিঁচে বন্ধ করে নিলো। হাঁটু আর হাতের কনুইতে ব্যথা পেয়েছে দুজনেই।
প্রিয়তা জামা ঝাড়তে ঝাড়তে উঠে দাঁড়ালো। প্রিয়স্মিতার হাত ধরে বললো,
“ব্যথা পেয়েছো আপু।”
প্রিয়স্মিতা ঝটপট উঠে দাঁড়িয়ে বললো,
“তোর দুলাভাই ব্যতীত আমাকে ব্যথা দেওয়ার সামর্থ্য অন্য কেউ রাখে না।”
“হ্যাঁ চল। তুই বুঝবি না।”
প্রিয়তা হাঁটতে হাঁটতে জিজ্ঞেস করলো,
“আমরা এখন কোথায় যাচ্ছি।”
“এখান থেকে ১ কিলোমিটার দক্ষিণে এক বেটার বিশাল মুরগের ফার্ম আছে। তো তো আর কি যাবো। আর একটা তুলে আনবো।”
“হ্যাঁ। কি সুন্দর কথা। আমরা চিবো আর আমাদের দিয়ে দেবে।”
প্রিয়স্মিতা বাঁকা হাসলো।
“দেবে না তো জানি। তাই তো ঝেঁপে নিয়ে আসবো।”
কথা শুনে সাথে সাথে দাঁড়িয়ে পড়লো প্রিয়তা। চোখ বড় বড় করে বোনের দিকে তাকিয়ে বললো,
“ঝেঁপে নিয়ে আসবো মানে চুরি।”
“আরে ধুর। এটাকে চুরি বলে না। এটাকে বলে হাতের কাজ।”
প্রিয়তা উল্টো ঘুরে দ্রুত দৌড় দিতে নিয়ে বললো,
“অসম্ভব। এসব চুরি চেঁচরামিতে আমি নাই। প্রণয় ভাই জানতে পারলে ভীষণ মারবে।”
দৌড় দিতে গিয়ে “আহ” বলে বেনী ধরে আর্তনাদ করে উঠলো প্রিয়তা।
প্রিয়স্মিতা ওর বেনী পেঁচিয়ে ধরে বললো,
“আমার সাথে জিদ্দেছিস। আমার সাথে চুরিতে যোগদান না করে আমি তোকে মেরে তক্তা বানিয়ে দেবো।”
প্রিয়তা অসহায় চোখে তাকালো। প্রিয়স্মিতা পাত্তা দিলো না। অগত্যা ভয়ে প্রিয়তা চললো চুরির উদ্দেশ্যে।
২০ মিনিট হেঁটে ওরা এসে পৌঁছালো মোনাফ মিয়ার মুরগির খামারে। চারদিক ধুধু কুয়াশা। আশপাশে জনমানবের চিহ্ন পর্যন্ত নেই।
খামারের পেছনে কলা গাছের আড়ালে দাঁড়িয়ে আছে দুজন। ভয়ে প্রিয়তার হাঁটু রীতিমতো কাঁপাকাঁপি শুরু করে দিয়েছে।
প্রিয়স্মিতা সতর্ক নজরে আশপাশে দৃষ্টি ঘোরালো। অতঃপর প্রিয়তার দিকে একটা মাঙ্কি টুপি দিয়ে বললো,
“এটা পরে নে।”
ঝটপট বলে নিজেও লাল একটা মাঙ্কি টুপি পরে নিলো।
“এবার পাক্কা চোর লাগছে।”
প্রিয়স্মিতার চেহারা দেখে ভয়ের মধ্যে ও ফিক করে হেসে দিলো প্রিয়তা।
“দাঁত না কেলিয়ে তাড়াতাড়ি পর। না হলে ধরা পড়লে একটা মারও বাইরে পড়বে না।”
প্রিয়তা ও হাসি থামিয়ে টুপিটা পরে নিলো।
দুজনেরই চোখ ছাড়া কিছু দেখা যাচ্ছে না। ওরা পা টিপে টিপে আড়াল থেকে বেরিয়ে এলো। আশপাশ দেখতে দেখতে খামারের দরজার সামনে এসে পৌঁছালো। কিন্তু দরজায় ইয়া বড় বিশাল তালা ঝুলছে।
প্রিয়তা নিরাশ হয়ে বললো,
“এটাতে তো তালা ঝুলছে আপু।”
“হ্যাঁ। তো কি আমাদের জন্য খুলে রাখবে।”
বলতে বলতে পকেট থেকে একটা চাবি বের করলো প্রিয়স্মিতা।
প্রিয়তা অবাক হয়ে বললো,
“এই তালার চাবি তুমি কোথায় পেলে।”
“এটা এই তালার চাবি না। সব তালার চাবি, মাস্টার কি।”
এটা বলতে বলতে তালা খুলে ফেললো প্রিয়স্মিতা।
প্রিয়তা শুধু চোখ গোল গোল করে দেখলো। সে কখনো দোস্বপ্নেও কল্পনা করতে পারেনি। তাকে কখনো এসবও করতে হবে। কিন্তু কি আর করার, বিধি বাম।
ওরা দুজন চারপাশ দেখে ফুরুত করে খামারের মধ্যে ঢুকে পড়লো। সাথে সাথেই ভেতরের ভেপসা দুর্গন্ধে পেটের নাড়িভুঁড়ি পাক দিয়ে উঠলো। প্রিয়তা ওড়না দিয়ে দ্রুত নাক চেপে ধরলো।
প্রিয়স্মিতা ওর অবস্থা দেখে চাপা গলায় ধমকে উঠলো,
“একদম এখানে বমি করবি না। সামান্য মুরগির গু এর গন্ধ।”
প্রিয়তার মুখ খুলতেই বমি পাচ্ছে। সে শ্বাস টেনে বললো,
“চুরি করে মুরগি খাওয়ার এক্সপেরিয়েন্স তোমার থাকলেও আমার নাই। এখন ঝটপট যা করবার করো, না হলে আমি এখানেই জ্ঞান হারাবো।”
“ঠিক আছে, ঠিক আছে। দেখছি, দেখছি।”
প্রিয়স্মিতা এক সিরিয়ালে বেশ কয়েকটা ঘর দেখলো, যার মধ্যে সাইজ অনুযায়ী ছোট বড় মুরগি রাখা। সবই পোল্ট্রি মুরগি।
প্রিয়স্মিতা ধিমি পায়ে এগিয়ে গিয়ে খপ করে একটা ৪ কেজি ওজনের মুরগি তুলে নিলো।
প্রিয়তার চোখ কুতুর ছেড়ে বেরিয়ে এলো। মুরগি দেখে বিস্ময় নিয়ে বললো,
“এতো বড়।”
“চুপ কর দাও। যখন মারবো, তখন ছোটখাটো কেন মারবো। বড়সড়ই মারি।”
“ঠিক আছে, চলো পালাই।”
কথা শেষ করতে পারলো না প্রিয়তা। তার পূর্বেই এই সকাল সকাল
“কিডা রে খামারের মধ্যে”
কর্কশ আওয়াজটা শুনে বুকের ভেতর ছলাত করে উঠলো।
প্রিয়তার ভয়ে মুখও চোখে তাকালো প্রিয়স্মিতার দিকে। আপু এবারও মুখের কথা মুখেই রয়ে গেলো।
তার পূর্বেই প্রিয়স্মিতা প্রিয়তাকে চেপে ধরে দরজার আড়ালে লুকিয়ে পড়লো। লোকটা চেঁচাতে চেঁচাতে দরজা গলিয়ে ভেতরে প্রবেশ করতেই অতর্কিতে শরীরের সর্বশক্তি দিয়ে ধাক্কা দিলো।
প্রিয়স্মিতা মাত্র এক হাতের ধাক্কায় সামলাতে পারলো না। লোকটা মুখ থুবড়ে পড়লো।
প্রিয়স্মিতা চেঁচিয়ে বললো,
“পালা বোন।”
ভয়ে প্রিয়তার কলিজা লাফাচ্ছে। দুই বোন ছুটে খামার থেকে বেরিয়ে গেলো। এক হাতে ঝুলছে ইয়া বড় একটা মুরগি।
লোকটা চেঁচিয়ে উঠলো,
“ঐ কে, কোথায় আছিস। চোর পালালো। ধর।”
ওদের চিৎকার শুনে লোকটার ছেলেরা দৌড়ে এলো।
“আব্বা আব্বা, কোথায় চোর।”
লোকটা তেতে উঠে বললো,
“বাঁন্দির পুত চোর, আমার মাথার ঐ দিকে পালালো।”
কিন্তু ততক্ষণে প্রিয়তা আর প্রিয়স্মিতা হাওয়া।
মোবাইল ফোনের ঝংকার তোলা শব্দে সকাল সকাল ঘুমটা চটকে গেল প্রণয়ের। চরম মাত্রার বিরক্তি হলো, সে কপাল কুঁচকে বালিশে মুখ গুঁজে পড়ে রইলো ফোনটা কেটে যাওয়ার অপেক্ষায়। কিন্তু সে গুড়ে বালি। প্রণয়ের ভাবনায় জল ঢেলে কল কাটার সাথে সাথেই আবারো অসভ্য যন্ত্রটা দ্বিগুণ শব্দে কানের পাশে ভেজে।
আর চুপ করে শুয়ে থাকতে পারলো না প্রণয়। এক প্রকার বাধ্য হয়ে ফোন রিসিভ করে কানে ধরলো।
“হ্যালো! …”
“ওয়াট!”
“আহা, লা জবাব! সুভা সুভা কিয়া বানায়া বেহনা! দিল খুশ করদিয়া।”
চিকেনের লেগ পিসে কামড় দিয়ে রসিয়ে রসিয়ে কথাটা বললো অরণ্য। ড্রইং রুমের গোল টেবিলের চারপাশের সোফাগুলো গোল করে তাতে জাঁকিয়ে বসেছে অরণ্য, সমুদ্র, রাজ, প্রেম, তন্ময়, প্রিয়তা, প্রিয়স্মিতা, থিরা, থোরি, ওভিরাজ। সবার হাতেই চিকেনের বড় বড় পিস।
আর সামনে টেবিলে ভর্তি করে রাখা হিউজ ৩ বোল বারবিকিউ চিকেন। সাথে টমেটো সস, চিলি সস, মেয়নিজ সহ বেশ কয়েক প্রকার কোল্ড ড্রিংকস। তাদের এক একজনের মুরগি খাওয়ার স্পিড দেখে যে কেউ নিঃসন্দেহে বলে দেবে, এরা শিয়াল ফ্যামিলি থেকে বিলং করে।
তাদের থেকে কিছুটা দূরে আলাদা চেয়ার-টেবিলে বসে সকালের চা পান করছেন কর্ত্রী-গিন্নীরা। শিখদার বাড়িতে পুনরায় আগমন ঘটেছে প্রণয়-প্রিয়তাদের নানি গুলবাহার বানুর। তিনি দূরে বসে বসে প্রাণ ভরে নাতি-নাতনিদের দেখছেন।
প্রিয়তা ককের গ্লাসে চুমুক দিয়ে বললো,
“শিয়ালের মতো শুধু মুরগি ভক্ষণ করলে হবে? কেমন রেধেছি বলতে হবে না? আমার ফিডব্যাক চাই।”
সমুদ্র নিজের চিকেনটা প্রিয়তার মুখের সামনে ধরে বললো,
“খা, তোর ফিডব্যাক।”
প্রিয়তা বিনা বাক্যে নিয়ে নিলো।
থিরা মুখ লটকে বললো,
“ঠান্ডার মধ্যে আপুরা গরম গরম বারবিকিউ বানিয়ে দিয়েছে খাচ্ছি। কিন্তু কী যেন একটা খালি খালি লাগছে।”
থিরার কথায় তন্ময় তাল দিয়ে বললো,
“হুম, ঠিক ভাইব জমছে না। একটা গান হলে হতো।”
“কেমন গান শুনবি?” ভ্রু নাচিয়ে শুধালো প্রেম।
তন্ময় উৎসাহিত হয়ে বললো,
“এমন একটা গান যেটাতে ঠান্ডা ঠান্ডা ব্যাপার থাকবে।”
প্রেম বললো,
“ঠান্ডায় দাঁতে দাঁত লেগে যাচ্ছে আর তুই কোল্ড গান শুনতে চাস? বাহিরের পিলারে ৫ মিনিটের জন্য বেঁধে রাখলে বরফের মমি হয়ে যাবি।”
প্রিয়স্মিতা তন্ময়ের পক্ষ নিয়ে বললো,
“হ্যাঁ, একটা জোস গান হলে মন্দ হয় না।”
অরণ্য সবার মতিগতি দেখে হাত তুলে বললো,
“ওকে ভাইলোগ, কাম ডাউন। ম্যায় হুঁ না। গান আমি গাইবো।”
এক বাক্যে উপস্থিত সকলের মুখ শুকিয়ে চুন হয়ে গেল।
প্রিয়তা দুই পাশে মাথা নাড়িয়ে ইশারায় বুঝালো,
“না প্লিজ! সকাল সকাল এই অত্যাচারটা নিতে পারবো না।”
প্রেম বোনকে চোখের ইশারায় আশ্বাস দিয়ে সকলের উদ্দেশ্যে বললো,
“থাক, থাক। এই সকালে আর গান শুনতে হবে না।”
তন্ময়ও দাঁত কেলিয়ে বললো,
“হে হে! কী দরকার সকাল সকাল গান শোনার? আমরা বরং দুপুরে শুনবো।”
পাশ থেকে থিরা বললো,
“সহমত।”
অরণ্য ভ্রু কুঁচকে ভাই-বোনদের দিকে চাইলো। এরা কি কোনোভাবে তার প্রতিভাকে অপমান করেছে? না! এগুলো আর শিল্পীর কদর করা শিখলো না।
প্রিয়স্মিতা সকলের পাল্টি নেওয়া দেখে বললো,
“কেন ভাইয়া! গান গাইলে কি সমস্যা? ভাইয়া তুমি গাও তো। আমি শুনবো।”
মুখ চোখ চকচক করে উঠলো অরণ্যর। বোনের কথা শুনে মোটিভেটেড হয়ে গেল।
প্রিয়স্মিতার গাল টেনে দিয়ে বললো,
“দিল খুশ কর দিয়া বেহনা! তুই আমার আসল বোন।”
পাশ থেকে প্রিয়তা তেঁতে উঠলো,
“তাহলে আমি কী?”
অরণ্য হাই তুললো ভাবলেশহীন ভঙ্গিতে, বললো,
“সেজ চাচ্চু আমার চোখের সামনে তোকে ড্রেন থেকে তুলে এনেছে।”
“ভাইয়া!” অরণ্য পাত্তা দিলো না। থিরাকে বললো,
“যা তো ভুটকি, আমার ঘর থেকে গীটারটা নিয়ে আয়।”
থোরি মাথা দুলিয়ে বসা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে বললো,
“আচ্ছা, ছোট ভাইয়া।”
প্রিয়তা প্রিয়স্মিতার কানের কাছে ঝুঁকে গিয়ে ফিসফিসিয়ে বললো,
“আমাদের পিছনে এই বাঁশটা না দিলেও চলতো।”
“কেন?”
“একটু অপেক্ষা করো, নিজেই বুঝে যাবে।”
অনেকক্ষণ যাবত শুকনো মুখে বসে আছে রাজ। সমুদ্র ব্যাপারটা লক্ষ্য করে বললো,
“কী ব্যাপার সেজদা! দিন দুনিয়ার মায়া কাটিয়ে কোন অপ্সরার খেয়ালে ডুবে আছো?”
সমুদ্রের কথায় সকলে সরু চোখে চাইলো রাজের দিকে।
প্রশ্ন শুনে আরো ভাবনার অতলে তলিয়ে গেল রাজ। চিন্তিত কন্ঠে বললো,
“জটিল সমস্যায় ফেঁসে গেছি। আজ ভোর রাতে ডেকে তুলে তোদের ভাবি বলছে সে নাকি দিন দিন নির্লজ্জ হয়ে যাচ্ছে।”
“অথচ সে লজ্জাবতী গাছ কবে ছিল তা ভেবে ভেবে ৫ ঘন্টা যাবত ডিপ্রেশনে চলে যাচ্ছি।”
তন্ময় গালে হাত দিয়ে গম্ভীর গলায় বললো,
“সেজদার অবস্থা দেখে মাঝে মাঝে মনে হয় আজীবন আইবুড়োই থেকে চাই।”
“আবার মেজদা আর ছোটদার অবস্থা দেখলে মন চায় ভিক্ষা করে হলেও বউ একখান আনি।”
“হুম, ধর্মসংকট।” পাশ থেকে তাল মিলিয়ে বললো অরণ্য।
“এই নাও ভাইয়া!” বলে কালো গীটারটা এনে অরণ্যর হাতে তুলে দিলো থোরি। সকলের মুখ দেখে মনে হচ্ছে কেউ তাদের জোরজবরদস্তি নিম পাতা খাইয়ে দিয়েছে।
অরণ্য চোখ বুঁজে গীটারের তারে টুং টাং আওয়াজ তুলে গাইতে শুরু করলো,
“লাল লালা লালু লুলু লু লালু লুলু লুলু লালু। আহা হা হা হো! যদি প্রতি রাতে একা খাটে ঠান্ডা লেগে যায়, তবে বউটা কোথায় কাজ করে না মাথায়? যদি প্রতি রাতে একা একা গান গাইতে হয়, তবে গায়িকা কোথায়? আমার নায়িকা কোথায়? যদি ঠান্ডা হয়ে যায় সব কম্বল আর কাঁথা, তাইলে বারে বারে মনে পড়ে বিয়ের কথা। যদি মাঝ রাতে টাশ করে ঘুম ভেঙে যায়, তখন একা সিৎ কাঁপাকাঁপি করি। আয় হায়! তোমরা বুঝো না কেন বেচারাটা কত অসহায়!”
“তাই বুঝি তোর বউ লাগবে?” পিছন থেকে ভেসে আসা গুরুগম্ভীর আওয়াজে ততক্ষণে অরণ্যর গানে ফুল স্টপ লেগে গেল। হাফ ছেড়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো সকলে।
বেচারাদের কান দিয়ে রক্ত উঠে আসার উপক্রম। শব্দ শুনে সকলে একত্রে পিছন ফিরে চাইলো। শান্ত ভঙ্গিতে সিঁড়ি বেয়ে নেমে আসছে প্রণয়।
দৃষ্টিতে মাত্রাতিরিক্ত শীতলতা। অন্যদের নজর টানলো কি না জানা নেই, তবে প্রিয়তার চোখ সবার আগে আটকালো হাতের চিকন লাঠিটার দিকে। আতঙ্কে ভেতর ভেতর গুটিয়ে গেল প্রিয়তা। মনে মনে বিড়বিড় করে বললো,
‘কী ব্যাপার! এই শয়তান ব্যাটা হাতে লাঠি নিয়ে আসছে কেন? কিছু আবার জানতে পারলো না কি?’
প্রণয় ওদের সম্মুখে এসে দাঁড়ালো। টেবিলের পানে তাকিয়ে দেখলো এখনো প্লেট ভর্তি মাংস।
প্রিয়তা চোরা চোখে তাকালো প্রণয়ের দিকে, যে চোখ মুখ শক্ত করে ওকে দেখে যাচ্ছে। কাঙ্ক্ষিত আশঙ্কায় কলিজাটা লাফ দিয়ে উঠলো প্রিয়তার।
ততক্ষণে কানে বিকট টান অনুভূত হলো। শব্দ করে “আহ” করে উঠলো প্রিয়তা। প্রণয় কান টেনে বসা থেকে দাঁড় করিয়ে দিলো। ভয়ে গুটিয়ে গেল প্রিয়তা। শরীরের জোড়ায় জোড়ায় মৃদু কাঁপন ধরলো।
প্রণয় দুই সেকেন্ড শান্ত চোখে দেখলো ওর কাঁপা কাঁপি। অতঃপর দুই হাত বুকে ভাঁজ করে ক্যাট ক্যাট কন্ঠে বললো,
“আমার চোখ ফাঁকি দিয়ে সকাল সকাল কই গিয়েছিলি তুই?”
চমকে উঠলো প্রিয়তা।
প্রিয়স্মিতা কপাল কুঁচকে তাকালো প্রণয়ের দিকে।
আচমকা বজ্র কন্ঠে ধমকে উঠলো প্রণয়,
“কানে বয়রা হয়ে গেছিস কি? কী বলছি শুনতে পাশ না? সকাল সকাল আমার পাশ থেকে উঠে চুপি চুপি কোথায় গিয়েছিলি?”
পুরুষালী এক হুঙ্কারে কেঁপে উঠলো উপস্থিত বড় ছোট প্রত্যেকে। বড়রা অন্যপাশ থেকে এপাশে চলে এলো।
প্রিয়তা কিছু বলবে তার পূর্বে গুলবাহার বানু কথার মাঝে হাত ঢুকিয়ে বললেন,
“এটা কেমন অনাছিষ্টি মার্কা কথা বাচা। একজন প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ মানুষ হয়ে একটা যুবতী মেয়ের সাথে বিয়ে ছাড়া এক ঘরে রাত কাটিয়েছো তোমরা? ছিঃ ছিঃ!”
গুলবাহার বানুর কথায় টনক নড়লো সকলের। আবারো অনেকগুলো বিস্মিত দৃষ্টি পতিত হলো তাদের ওপর। তবে সেসবের পাত্তা দিলো না প্রণয়।
প্রিয়তাকে ধমকে বললো,
“কী হলো? উত্তর দে। সকাল সকাল কই গিয়েছিলি তুই?”
চিৎকার শুনে ভয়ে কান্না করে দিলো প্রিয়তা। কোনো কথাবার্তা ছাড়াই সর্বসম্মুখে ঝাঁপিয়ে পড়লো প্রণয়ের বক্ষে বুকে মুখ গুঁজে নাক টেনে বললো,
“অনেক বড় ভুল করে ফেলেছি প্রণয় ভাই। আমি ইচ্ছে করে করিনি। আমাকে মাফ করে দিন। আমি এমনটা আর কোনোদিনও করবো না। প্লিজ আমার ওপর রাগ করবেন না।”
বলতে বলতে ফুপিয়ে উঠলো প্রিয়তা।
প্রিয়তার বড় বড় চোখে পানি দেখে নিমেষে রাগ গলে পানি হয়ে গেল প্রণয়ের। দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে বুকে মিশিয়ে নিলো নিজের প্রাণ পাখিকে। মাথায় হাত রেখে তুলনামূলক নরম গলায় বললো,
“এটা তোর প্রথম ভুল, আর এটা তোর শেষ ভুল ভেবে মাফ করে দিলাম। এমন যেন আর কখনো হতে না দেখি। তোর যা লাগবে তুই আমাকে বলবি। প্রয়োজনে প্রণয় শিখদার কলিজাটা বের করে তোর হাতে দেবে, তবুও অন্যের জিনিসে না বলে হাত দিবি না।”
“হুম।”
বুকে মুখ লুকিয়ে বললো প্রিয়তা।
“ছুঁয়ে কথা দে আমায়।”
“হুম, আপনাকে ছুঁয়ে কথা দিলাম।”
হাসলো প্রণয়।
ঘটনার আগামাথা কিছুই বুঝলো উপস্থিত কেউ। তবে তাদের এই সর্বসম্মুখে ঘনিষ্ঠতাটা দৃষ্টিকটু লাগলো সকলের।
গুলবাহার বানু অভিজ্ঞ ব্যক্তি। ওনার চুলগুলো তো আর বয়সে পাকেনি, পেকেছে অভিজ্ঞতায়। তিনি চোখ দেখেই এদের ভেতরের সম্পর্ক বুঝে নিলেন। কিন্তু হারাম-হালালের তো একটা ব্যাপার আছে! পরিস্থিতি লজ্জাজনক। হালকা কাশলেন সাদমান শিখদার।
তবুও প্রণয়ের বক্ষ থেকে মুখ তুললো না প্রিয়তা। আরো গভীরে ঢুকতে চাইলো। খালিদ শিখদার মুখ বাঁকিয়ে বললেন, “ছিঃ ছিঃ! কী বেলেল্লাপনা! বড়-ছোট হুঁশ নেই! যতসব নাজায়েজ কাজকর্ম। বিয়ে ছাড়াই নাকি এক ঘরে! ছিঃ ছিঃ! এই বাড়িটা দিন দিন…”
এটুকু বলে থেমে গেলেন খালিদ শিখদার। প্রণয়ের রক্তিম চোখ দেখে বাকীটুকু বলার আর সাহস দেখালেন না।
প্রণয় সরাসরি সাদমান শিখদারের দিকে চেয়ে বললো, “আমাদের ব্যাপারে আপনাদের এতো দুশ্চিন্তা না দেখালেও চলবে। ভালোবাসি, তাই বিয়ে করে নিয়েছি। ও আমার বউ। আর এই পৃথিবীতে শেষ আপনজন। ওকে কথা-বার্তা বলতে সাবধানে বলবেন। জানেন তো? ও ছাড়া আমার আর হারানোর কিছু নেই।”
বলে দ্রুত পায়ে চলে গেল প্রণয়। পিছনে ফেলে দিল হতভম্ব হয়ে চেয়ে থাকা গোটা পরিবার। তারা দেখলো, শুনলো, তবে বিপক্ষে কেউ একটা কথাও বললো না। নিজের রক্তের হলেও এই ছেলেকে ভয় করে না এই পরিবারে এমন কেউ নেই। সত্যি, এই মেয়েটা তার! সে যা ইচ্ছা তাই করতে পারে, আর কেউ কিছু বলার অধিকার রাখে না। আসলে তাদের তাকিয়ে তাকিয়ে দেখা ছাড়া কিছুই করার নেই, প্রাণের মায়া সবারই আছে।
গুলবাহার বানু মুচকি মুচকি হেসে চাইলেন প্রিয়তার দিকে। কানে কানে বললেন,
“তোর কপাল তো সবার থেকে বেশি চওড়া নাতনি। আমার ৮৩ বছরের জীবনে এমন ভালোবাসা আমি আর দ্বিতীয় কোনো পুরুষের চোখে দেখিনি। কিন্তু সামলে! এমন পুরুষেরা সোহাগ করার সময়…”
বলে থেমে গেলেন গুলবাহার বানু।
নানীর কথা শুনে সারা শরীরে পশম দাঁড়িয়ে গেল প্রিয়তার। চোখ বড় বড় করে তাকালো গুলবাহার বানুর দিকে। গুলবাহার বানু মিটি মিটি হাসছেন। লজ্জায় দৃষ্টি নত করে নিলো প্রিয়তা। ফর্সা গাল দুটো টসটসে পাকা টমেটোর মতো লাল বর্ণ ধারণ করলো।
সকলেই অবাক দৃষ্টিতে চেয়ে আছে প্রিয়তার দিকে।
প্রিয়তা লজ্জা শরম দাবিয়ে রেখে গুলবাহার বানুর হাত চেপে ধরলো।
গুলবাহার বানু মুচকি হেসে বললেন,
“উপদেশ চাই নাতনি?”
প্রিয়তা অসহায় মুখে মাথা ওপর নিচ ঝাঁকালো।
গুলবাহার বানু এবার উচ্চ শব্দে হেসে উঠলেন। প্রিয়তার হাত চেপে ধরে যেতে যেতে বললেন,
“চল, তোকে আজ এমন টোটকা সেখাবো যে এক বাড়িতেই বিড়াল মরে যাবে।”
প্রিয়তার সুন্দর সতেজ মুখখানা আশারে কালো মেঘে ছেয়ে গেল। ছোট্ট একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে নিরাশ কন্ঠে বললো,
“তোমার নাতির মতো খচ্চর ব্যাটা দুনিয়াতে দুটো নেই জানো নানী? কতো কিছু করি শুধু একটু দেখবে বলে। কিন্তু কী! নাকের ডগায় কী ভাব নিয়ে চলে যাবো। না জানি কোনো প্রিন্স চার্মিং!”
গুলবাহার বানু নাতনির মাথায় গাট্টা মেরে বললেন,
“ওরে চেমরী! পুরুষ মানুষকে কি ওভাবে বশ করা যায়? অন্যভাবে করতে হয়।”
“আউচ!”
মাথা ডলতে ডলতে অসহায় চোখে তাকালো প্রিয়তা। নেকা কান্না করে বললো,
“সব বশ করে দেখেছি। কোনো কিছুতেই কোনো লাভ হয়নি।”
গুলবাহার বানু ভাব নিয়ে বললেন,
“তোদের নানারও এমন ভাব ছিলো। কিন্তু আমি একদম সোজা করে দিয়েছিলাম। শোন, তুই যদি আমার কথা মতো চলিস, তাহলে তোর জামাই তোর কথায় উঠবে বসবে।”
চোখ চকচক করে উঠলো প্রিয়তার। অধৈর্য হয়ে বললো,
“কীভাবে?”
গুলবাহার বানু কানে কানে কি যেন শিখিয়ে দিলেন।
ইনায়া বিছানায় পা ছড়িয়ে বসে ঘাউশ ঘুপুশ করে ফল খাচ্ছে। ভালো মতো হাঁটাচলা করতে পারে না। পা দুটোতে পানি জমে কলাগাছ। দুই-একদিনের মধ্যেই হয়তো নতুন অতিথির আগমন ঘটবে শিখদার বাড়িতে।
“ইনু, আসবো?” বাহিরে দাঁড়িয়ে দরজায় নক করলো প্রিয়তা।
ইনায়া উঁকি মেরে বললো, “বাহ বাহ! তুই এতো ভদ্র কবে থেকে হলি? আয়।”
প্রিয়তা লাফিয়ে ঘরে ঢুকে পড়লো। ইনায়া ফলের বাটি এগিয়ে দিয়ে বললো, “টুশ।”
প্রিয়তা বসে পড়লো ইনায়ার পাশে। ফলের বাটি থেকে এক টুকরো আপেল নিয়ে মুখে পুরে দিলো।
ইনায়ার মাথা থেকে পা পর্যন্ত চোখ ঘুরিয়ে বললো, “আমার ভাই একদম সত্যি চিনেছিল তোকে।”
“তুই কি ভুল চিনেছিলি?”
“আলবাত! আমি ভাবতাম তুই মুটকি, কিন্তু তুই আসলে কিউট পিউট গুলুমুলু একটা রসগোল্লা।”
“ঢং”
“সত্যি”
সন্দেহে কপালে ভাঁজ পড়লো ইনায়ার। ভ্রু নাচিয়ে শুধালো, “কী মতলব?”
প্রিয়তা মুখ কাঁদো কাঁদো করে বললো, “ছিঃ ইনু, ছিঃ! তুই ভাবিস আমি শুধু মতলবেই তোর কাছে আসি?”
“সেন্টি খাওয়া বন্ধ কর।” প্রিয়তা গাল ফুলালো।
ইনায়া উঁচু পেটে হাত বুলিয়ে বললো, “দেখছিস বাবু, তোর মা তোর ফুপ্পিকে কীভাবে অপমান করছে? এক নাম্বারের কুটনী মহিলা।”
ইনায়া ওর ভাবসাব দেখে বাঁকা হেসে বললো, “তোমার পেটেও খুব তাড়াতাড়ি একটা ইঁদুরের বাচ্চা চলে আসবে বান্ধবী। সবুর করো। আমি কিন্তু সব জানি।”
প্রিয়তা ফোস করে নিঃশ্বাস ছাড়লো। নিরাশ কন্ঠে বললো, “আমি সেসবের সম্ভাবনা দেখি না।”
“হবে, হবে। তবে আমাকে কী কথা দিয়েছিলে মনে আছে তো?”
“কী?”
“এই যে আজ থেকে ঠিক ১৩ বছর ৭ মাস আগে ক্লাস ২ তে থাকা থাকাকালীন তুই কথা দিয়েছিলে আমার ছেলের সাথে তোর মেয়ের বিয়ে দিবি। আমার ছেলে কিন্তু হয়ে গেছে।”
প্রিয়তা বিরক্ত হয়ে উঠে পড়লো।
ইনায়া ওয়ারড্রোব খুলে একটা সিঁদুর রঙা শাড়ী বের করে বললো, “গাছে কাঁঠাল, গোঁফে তেল! তোর ছেলের শ্বশুর শাশুড়ির এখনো বাসর হলো না আর তুই ছেলের বউয়ের স্বপ্ন দেখিস!”
“ছিঃ! এখনো বাসর করতে পারলি না?”
“আমার মতো জামাই তো তোমার জোটে নাই, তাই তুমি বুঝবে না।” বলে দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে ওয়াশরুমে ঢুকে পড়লো প্রিয়তা।
ইনায়া মনে মনে বাঁকা হেসে বললো, ‘বাসর করার খুব শখ তোমার ননদিনী। নিশিথ রজনীতে পীড়া মিশ্রিত সুখদহনে যখন পৃষ্ঠ হবে তখন বুঝবে কতো গমে কতো ময়দা।’
ইনায়া ভাবনা শেষ করার পূর্বেই ওয়াশরুমের দরজা খুলে গেল। শাড়ীর আঁচল ঠিক করতে করতে বেরিয়ে এলো প্রিয়তা। এলো চুলে লাল শাড়ীতে যেন একদম লাল টকটকে পুতুল বউ লাগছে মেয়েটাকে। হাঁটার তালে তালে উন্মুক্ত লোটানো কেশ গুচ্ছ দুল খাচ্ছে বাঁকানো কোমরের নিম্নাংশে। হালকা আঁচল সরে গিয়ে দৃশ্যমান হয়ে আছে ফর্সা উদরের কিছু অংশ।
চোখ ধাঁধানো আগুন রূপে থমকে গেল ইনায়া। নিজের অজান্তেই মুখ থেকে বেরিয়ে এলো, “মাশাল্লাহ! মেয়ে হয়ে চোখ ফেরাতে ব্যর্থ হচ্ছে সে।”
প্রিয়তা হেলে দুলে সামনে এসে দাঁড়ালো। ঢং করে বললো, “কিরে মুটকি, কেমন লাগছে আমাকে?”
ইনায়া বাঁকা হেসে প্রিয়তার মসৃণ পেটে স্লাইড করে বললো, “ইসস! পুরো রসমালাই। আয়, তোকে একটু জড়িয়ে ধরে ফিল নেই। এমন খাসা মাল চোখে দেখলেও শান্তি। শালা, আমার ভাসুরের স্যাটা ভাঙা কপাল যেই ফিল পাবে না উফ।”
চোখ বড় বড় করে লাফিয়ে দূরে সরে গেল প্রিয়তা। নাক মুখ কুঁচকে বললো, “ছিঃ! তোর নজর এতো খারাপ! চোখ দিয়েই ধ*র্ষ*ণ করে দিলি।”
ইনায়া হেসে ফেললো।
“তবে যাই বলিস বান্ধবী, তোকে কিন্তু কড়া লাগছে। এমন ফিগার যদি আমার হতো, তাহলে পুরো দেশের ছেলে পটিয়ে নিতাম।”
প্রিয়তা নাক ওপরে তুলে ভেংচি কাটলো।
“এইজন্যই তো তুই গুল আলুর মতো। না হলে আমার ভাই তোমাকে কন্ট্রোল করতে পারতো না। বাই দ্য রাস্তা, তোর মেরুন লিপস্টিকটা কই?”
ইনায়া ৪ নাম্বার ড্রয়ারের দিকে ইশারা করে বললো, “ওটাতে দেখ।”
প্রিয়তা ওর কথা মতো ড্রয়ার খুলে অনেকগুলো লিপস্টিকের মধ্য থেকে কাঙ্ক্ষিত লিপস্টিকটা খুঁজে বের করলো।
ইনায়া ভ্রু কুঁচকে বললো, “এটা তো স্ম্যাচ প্রুফ। একটু বেশি হার্ড। একবার ঠোঁটে দিলে রিমুভার ছাড়া উঠবে না।”
প্রিয়তা বাঁকা হাসলো। একটা মেরুন লিপলাইনার দিয়ে ঠোঁট দুটো আঁকতে আঁকতে বললো, “এইটাই তো চাই বান্ধবী।”
ইনায়াও বাঁকা হেসে বললো, “ওকে। কাল সকালেই যেন সুখবর পেয়ে যাই।”
প্রিয়তা জবাব দিলো না।
ডার্ক মেরুন লিপস্টিক দিয়ে ফ্লাফি ঠোঁট দুটো গাড় লাল গোলাপের পাপড়ির মতো করে নিলো। লাল শাড়ীর সাথে লাল লিপস্টিকটা দুর্দান্ত মানিয়েছে।
প্রিয়তা ইনায়ার থেকে চেয়ে ইনায়ার বিয়ের সময়কার কয়েকটা মোটা মোটা স্বর্ণের বালা কোমল দুই হাতে পরে নিলো।
“পাশের ড্রয়ারে দেখ, দুটো মাঝারী স্বর্ণের ঝুমকো আছে। ওগুলো বের করে পর। তোর সাথে জোস মানাবে।”
প্রিয়তা তাই করলো।
ইনায়ার কথা মতো ঝুমকো দুটো বের করে কানে পরে নিলো। এমন স্নিগ্ধ একখানা চেহারা দেখে অন্তর জুড়ে গেল ইনায়ার। চোখের ইশারায় কাছে ডাকলো। প্রিয়তা গিয়ে বসে পড়লো ইনায়ার পাশে।
ইনায়া চোখের পাতা থেকে একটু কাজল নিয়ে প্রিয়তার কানের পাশে লাগিয়ে দিলো। মুগ্ধ চোখে চেয়ে বললো, “তুই অনেক সুখী হ বন্ধু। এই এক পুরুষের জন্য জীবনে যতো কষ্ট সয়েছিস তার কোনো তুলনা হয় না। এখন থেকে সারাজীবন এভাবেই হাসিখুশি থাকিস।”
হাসলো প্রিয়তা। টুক করে ইনায়ার গালে একটা চুমু খেয়ে বললো, “ধন্যবাদ। এখন যাই আমি।”
চোখে হাসলো ইনায়া। বাঁ চোখ টিপ দিয়ে বললো, “অল দ্য বেস্ট।”
জমাট বাঁধা মেঘলা আকাশে বিষন্নতার ছাপ। বাইরে থেমে থেমে ঝিরিঝিরি শব্দে বৃষ্টি পড়ছে। সিক্ত বারান্দার কোন ঘেসে দাঁড়িয়ে এক ধ্যানে স্মোকিং করছে প্রণয়। শিরায় শিরায় ছুটে চলেছে অদম্য অনুভূতির জোয়ার। লাল শাড়ি পরিহিত রমণিকে এক পলক দেখে পাগল পাগল লাগছে, তার ভয়াবহ ক্রেভিং হচ্ছে মনে।
প্রণয় রেলিংয়ে হাত চেপে ধরে চোখ বুঝলো। সে বেশ বুঝতে পারছে কুচক্রী নারী তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছে। মনকে সংযত রাখতে দিচ্ছে না। ইচ্ছে তো করছে পুচকে মেয়েটাকে মাথার উপর থেকে তুলে একটা আছাড় মারতে, কিন্তু হৃদয়ের কাছে অসহায় সে, সেটাও করতে পারছে না। দাঁতে দাঁত পিষলো প্রণয়।
না চাইতেও চোখের সামনে ভেসে উঠছে কাজল টানা নীলাভ্র বড় বড় চোখ দুটো, হাতের চুড়ি, কানের ঝুমকা। কিছুই ভুলতে পারছে না প্রণয়। অভাবে কেউ সাজে একদম ঘায়েল করে ফেলেছে হৃদয়টাকে। প্রণয় ঘাড় চেপে ধরে তপ্ত নিঃশ্বাস ফেলল।
নষ্ট মনের অবাধ্য অনুভূতিগুলো বেহায়া হয়েছে বড়ই। ওই এলোকেশী রমণীকে একান্তে পাওয়ার জন্য বিদ্রোহ জারি করেছে নিজেদের মধ্যে। এরা কী ভেবেছে নিজেদের? প্রণয় শিকদারের শরীরে বাস করে অন্য নারীর জন্য বেহায়াপনা করে! বেয়াদবগুলো! হাতের কাছে পেলে এগুলো কেই সবার আগে গুলি করত প্রণয়।
উফ, কি যন্ত্রণা। এই ঘরের সর্বত্র যেন মরণ বিষের ছড়াছড়ি। কোথাও একটু শান্তি পায় না প্রণয়। পায়ের পাপোশ থেকে শুরু করে বিছানার চাদর—সবকিছুতেই ওই নারী নিজের গন্ধ মাখিয়ে রেখেছে। নিজের ঘরেই নিজেকে পাগল মনে হয় তার।
নিজের অবস্থা দেখে নিজেই হাসলো প্রণয়। তর্জনীর সাহায্যে টুকা দিয়ে সিগারেটের ফিল্টার ঝেড়ে বলল,
“আমার সাথে এক ঘরে দরজা বন্ধ করে থাকলে আমার অজান্তেই তোমার পেটে আমার অংশ, আমার রক্ত চলে আসবে জান। আমি ঠিক সেটাই চাচ্ছি না।”
চোখ মেলে ফের সিগারেটে টান দিল প্রণয়।
“যারা বিড়ি খায়, তাদের হাত দিয়ে গন্ধ, মুখ দিয়ে গন্ধ, দাড়ি দিয়ে গন্ধ, চাদর দিয়ে গন্ধ, জামা দিয়ে গন্ধ, লেপ দিয়ে গন্ধ, টুপি দিয়ে গন্ধ, বালিশ দিয়ে গন্ধ। আমার হয় সন্দেহ, ওর বউ থাকে কেমনে রে আল্লাহ!”
ঘরের সব কিছু শুঁকতে শুঁকতে কর্কশ আওয়াজে ওয়াজ করতে শুরু করলো প্রিয়তা।
জাউরামি দেখে ফোঁস করে নিঃশ্বাস ছাড়ল প্রণয়। মনে মনে ‘বেয়াদব’ বলতে ভুল করল না। মুখে মুখে তর্ক করে আজকাল বড্ড বাচাল হয়েছে মেয়েটা। বকাতো দিতেই হবে।
এসব সাত-পাঁচ ভেবে জুথসই একটা ঝাড়ি দেওয়ার উদ্দেশ্যে ঘাড় বাকিয়ে পেছনে তাকালো,
“দেখ…”
রমণীর পানে দৃষ্টি পড়তেই কথার খেঁই হারালো প্রণয়। টানা টানা চোখের মায়া নিজেকে খুইয়ে ফেললো মুহূর্তেই। এতক্ষণের কঠিন সংযম যেন শিষ মহলের ন্যায় চোখের নিমিষে ভেঙ্গে চুরমার হয়ে গেল।
চোখের পলক ফেলছে না প্রণয়। আশানুরূপ ফল পেয়ে মনে মনে খুশিতে নেচে উঠল প্রিয়তা। টোটকা কাজে দিয়েছে নানির কথা মতো এবার।
লজ্জায় নেতিয়ে পড়ার ভান ধরলো প্রিয়তা। লাজুক হেসে দৃষ্টি নত করল। সামনের চুলগুলো কানের পিঠে গুঁজে বলল,
“ওভাবে তাকাবেন না, লজ্জা লাগে।”
হাত নাড়ানোর সাথে সাথে স্বর্ণের কাঁকনগুলো ঝনঝন শব্দ করে উঠল। প্রিয়তা চোখের পলক জাপটে বলল,
“এভাবে তাকাবেন না, প্লিজ।”
অক্ষিপটে মাদকতা ছড়ানো প্রণয়ের পলকহীন চোখে চেয়ে রইল সুন্দরী রমণীর শুভ্র মুখে।
দেখতে দেখতে সিগারেটের শেষ অংশটুকু জ্বলে হাত পুড়ে গেল প্রণয়ের।
“আউচ!”
প্রণয়ের ওষ্ঠেব্যথাতুর শব্দ শুনে লাফিয়ে উঠল প্রিয়তা। অভিনয় ঝেড়ে ফেলে ছুটে গেল প্রণয়ের নিকট। বলিষ্ঠ হাতের আঙুলগুলো মুঠোয় পুরে ব্যাথাতুর নয়নে তাকালো। চোখে পানি চলে এলো।
প্রিয়তার রাগী কন্ঠে তেজ নিয়ে বলল,
“পোড়ালেন তো আমার কলিজাটা! আপনাকে না কতদিন বারণ করেছি এসব ছাইপাশ খেতে। তারপরও কেন খান! বয়সে বড় হয়েছেন বলে কি আমার কোন কথাই শুনবেন না?”
সুরেলা কণ্ঠে চওড়া ক্ষোভের আভাস পেল প্রণয়। কিছু বলল না। কেবল একদৃষ্টিতে চেয়ে রইল নীলাভ্র চোখের গভীরে।
তার বেহায়া চোখ দুটো বারবার ঘুরে ফিরে রঞ্জিত লাল টকটকে ঠোঁটের ওপর গিয়ে স্থির হচ্ছে!
এই যে মেয়েটা ঠোঁট নাড়িয়ে নাড়িয়ে বকা দিচ্ছে, সে কি জানে—এই মুহূর্তে তাকে কতটা প্রাণঘাত লাগছে প্রণয়ের নিকট, তার ওই নিরীহ ঠোঁট দুটোকে কতটা নিষ্ঠুর শাস্তি দিতে ইচ্ছা করছে?
জিভ দিয়ে ঠোঁট ভিজালো প্রণয়।
প্রিয়তা পুনরায় কন্ঠের তেজ ঢেলে বলল,
“আপনি কি স্মোকিং করা কোনোদিন ছাড়বেন না? আপনি কি ঠিক করে নিয়েছেন আমার কথা এক কান দিয়ে ঢুকিয়ে অন্য কান দিয়ে বের করে দেবেন?”
ঠোঁট কামড়ে ধরে হাসল প্রণয়। নিঃশব্দ পায়ে একদম নিকটে চলে এলো। প্রিয়তার পুরুষালী দেহের গরম ভাব আছড়ে পড়লো প্রিয়তার নাজুক শরীরে।
সে কিছু বুঝে ওঠার আগেই তার কোমর চেপে পাশের দেওয়ালে ঠেসে ধরল। মুখের ওপর ঝুঁকে এসে গালে হাত রাখলো। কণ্ঠ খাদে নামিয়ে ফিসফিসিয়ে বলল,
“শুনব, তোমার সব কথা শুনব, রক্তজবা…
তুমি যা বলবে তাই করবো। তুমি যদি বলো তো এটাই হবে আবরার শিকদার প্রণয়ের জীবনের শেষ সিগারেট—শুধু…”
মানুষটা এতো কাছে আসাতে প্রিয়তার ছোট্ট বুকে ভূমিকম্প শুরু হয়ে গেলো। শুষ্ক ঢোক গিলে গলা ভেজানোর ব্যর্থ প্রয়াস করল।
চোখ তুলে অস্ফুটে জানতে চাইল,
“শুধু কি?”
চোখে হাসল প্রণয়। প্রিয়তার তুলতুলে নরম ঠোঁটে বৃদ্ধাঙ্গুল বুলিয়ে বলল,
“সব ছেড়ে দেবো, যদি বলো। নিঃশ্বাস নেওয়াও ছেড়ে দেবো। শুধু…”
“কি?” কন্ঠটা বোধহয় কাপলো প্রিয়তার।
“শুধু যখন-যখন আমার তৃষ্ণা পাবে, তখন-তখন আমার তোমাকে চাই। তোমার মধ্যে প্রবাহিত অমৃত সাগরে নিজের অস্তিত্ব বিলিয়ে দিতে চাই। বলো, রাজি?”
ঠোঁট কাপলো প্রিয়তার। শরীর ঝাঁকি দিয়ে উঠল। প্রণয়ের পাগল-পাগল করা চোখ দুটোর দিকে দেখে অন্তর গহীনে প্রেমান্দোলন শুরু হয়ে গেল।
মখমলে কোমরে শীতল হাতে ছুঁয়ে দিল প্রণয়। কাঁপা কাঁপা ঠোঁটগুলোর দিকে তাকিয়ে শিশুসুলভ ভঙ্গিতে বলল,
“তোর ঠোঁটগুলো অভাবে কাঁপে কেন জান? ওগুলো কিন্তু আমার তৃষ্ণা আরো বাড়িয়ে দিচ্ছে।”
“আ-আ-আ-র কাঁপবে না ভাইয়া।” নিজের কথা শুনে নিজেই বেকুব বনে গেল প্রিয়তা।
বোকা বোকা জবাব শুনে ঠোঁট চেপে চাপা হাসলো প্রণয়। আপাত মস্তাক মাথা থেকে পা পর্যন্ত দেখে বলল,
“আমি তোর ভাই লাগি?”
“না-না-না-না, মা-মা-মা-নে—”
কোমর চেপে ধরে তুলতুলে শরীরে মিশে গিয়ে বলল,
“বল, কী লাগি আমি তোর?”
“ভা-ভা-ই।”
“আচ্ছা, কোন ভাই এভাবে আদর করে?”
“মা-মা-নে—”
“তুমি তো খুব সাহসী জান। ভয় পাচ্ছো কেন? তোমার মত জাউরা এই বাড়িতে কী আর একটাও আছে? তোমাকে কি ভয় পাওয়া মানায়, বলো?”
“আমি ভয় পাচ্ছি না মানে প্রণয় ভাই।”
“তাহলে আমি কি লাগি বলো প্রণয় ভাইয়ের জান?”
প্রিয়তা হাঁসফাঁস করে উঠলো লজ্জায়। প্রণয় বুকে হাত রেখে বললো,
“আপনি কথা অন্যদিকে ঘুরাচ্ছেন।”
“উহ, আচ্ছা কী কথা?”
“এই যে আমায় কথা দিয়েছেন, আপনি আর স্মোকিং করবেন না।”
“করবো না তো, শুধু বল তুই আমার তৃষ্ণা মিটিয়ে দিবি।”
প্রিয়তা ঘাড় বেঁকিয়ে তাকালো প্রণয়ের পৌরুষ অবয়বে। প্রণয় ফের অস্থির হয়ে উঠলো। ঘাড় থেকে চুল সরিয়ে গলার নিচে ধীরে ধীরে চুম্বন করতে করতে বলল,
“বল না, জান। মিথ্যে বলছি না বিশ্বাস কর। তোর থেকে বড় নেশা ইহলোকে আর কিছু নেই। এক চুমুক তোকে পেলেই আমি শান্ত হয়ে যাবো।”
স্পর্শ কাতর নারী শরীরে পুরুষালী স্পর্শ লাগতেই বরফের ন্যায় জমে গেল প্রিয়তা।
ক্ষিন কন্ঠে ডাকলো—
“প্রণয় ভাই…”
“শশশ…” ঠোঁটে আঙুল চেপে ধরল প্রণয়। নেশা মগ্ন চোখের দিকে তাকাতে পারছে না প্রিয়তা।
শরীর অবশ হয়ে আসছে।
আদরে আহ্লাদে প্রিয়তার ছোট্ট দেহখানা ভরিয়ে তুলল প্রণয়।
আসক্তির সাগরে ডুবে গিয়ে বলল,
“জান, তুই একবার আমায় বলেছিলি—আমার ঠোঁট দুটো তোর খুব পছন্দ, তুই বারবার খেতে চাস।”
“আজকে খাবি, জান?” প্রণয়ের আকুতি মিশ্রিত আধো-আধো কণ্ঠস্বরটা খেঁচ করে বুকে লাগল প্রিয়তার। পায়ের রক্ত ছলকে উঠল মাথায়।
তুলতুলে গালে নাক ঘষতে ঘষতে প্রণয় ফের বলল,
“খাবে, পাখি? তুমি যদি আমায় তোমার নেশায় ডুবতে দাও, আমৃত্যু আমি আর অন্য কোনো নেশায় হাত দেবো না—প্রমিজ।”
অসহ্য লজ্জায় নুইয়ে পড়লো প্রিয়তা।
প্রণয় কণ্ঠনালীতে নাক ঘষতে ঘষতে আবিষ্ট কণ্ঠে বললো,
“বলো না, জান আমার।”
“এই ময়না পাখি!! এই আদুরিনী।। এই সোনা বউ।”
প্রিয়তার নিঃশ্বাস এলোমেলো হয়ে গেলো। হাঁসফাঁস করতে শুরু করলো মেয়েটা। এতগুলো আদুরে ডাক প্রিয়তার অন্তরমহলে প্রেমান্দোলনের সৃষ্টি করছে।
এতগুলো আদুরে ডাকে কী সাড়া না দিয়ে থাকতে পারে প্রিয়তা!
প্রিয়তা শক্ত করে প্রণয়ের পিঠ জড়িয়ে ধরলো। মনের অবশিষ্ট সাহসটুকু কেছেকুচে চোখ তুলে তাকালো প্রণয়ের নেশাগ্রস্ত দুই চোখে। চোখে চোখ পড়তেই কণ্ঠ কেঁপে উঠল প্রিয়তার। হালকা তোতলিয়ে বলল,
“খাবো।”
জবাব শুনে বাচ্চাদের মতো উতলা হলো প্রণয়।
তৎক্ষণাৎ নিজের পুরু ঠোঁট দুটো প্রিয়তার দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল,
“আমি তোমার রক্তজবা, সবটা তোমার।”
“চুমু খাও, রক্তজবা। আমার সিগারেটে পুড়া রুক্ষ ঠোঁটে ঠোঁট চেপে চুমু খাও। অনুভব করো আমায়। অনুভব করো আমার ভালোবাসা। দেখো, গলে যাবে সব অভিমানের দেওয়াল, মিটে যাবে সব তৃষ্ণা। চুমু খাও আমায়।”
চোখে চোখ রেখে প্রিয়তারও নেশা চড়ে গেল। দুই হাতে প্রণয়ের শার্টের কলার চেপে নিচু করে পুরুষালী ঠোঁটে ঠোঁট ডুবিয়ে দিল।
ঠোঁটে ঠোঁট পড়তেই ভেতরে দাউ দাউ করে দাবানল লেগে গেল প্রণয়ের। এক হাতে কোমর চেপে ধরে অন্য হাত রাখল গলায়। পরম তৃপ্তিতে শুষে নিতে থাকলো প্রেমসুধা।
উন্মত্ত পাগলের ন্যায় দিশেহারা হয়ে চুমু খাচ্ছে প্রিয়তা। নিঃশ্বাস ফুরিয়ে আসছে, তবুও প্রণয়কে ছাড়ছে না।
সময়ের সাথে সাথে আরো শক্ত করে আকড়ে ধরছে। দুটো অতৃপ্ত মন তাদের তৃপ্তি খুঁজে নিতে মরিয়া।
ঠাণ্ডার দিনে বৃষ্টি হওয়ার ব্যাপারটা চরম বিরক্তিকর। তবুও বর্তমান সময়ের ওয়েদারের কোনো ঠিক ঠিকানা নেই, যখন-তখন ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি হয়। বিকেলের দিকে বৃষ্টি হওয়ার সন্ধ্যার দিকে ঠাণ্ডার প্রকোপ বেড়েছে ব্যাপক হারে। পছন্দের কফি মগ হাতে উত্তরের বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে শুদ্ধ। পরনে ফিনফিনে একটা ফর্ম্যাল সাদা শার্ট। অনুভূতি শূন্য, ঘোলাটে চোখ দুটো চেয়ে আছে অদূরে। চারদিক থেকে সন্ধ্যাকালীন ঝিঁ-ঝিঁ পোকার ডাক শোনা যায়। অল্প দূরেই মেঘনা নদী। শীতের ঠাণ্ডা জড়ানো হিমেল বাতাসের ঝাপটা এসে লাগছে চোখে-মুখে। বারান্দায় দাঁড়িয়েই নদীর তীর দেখা যায়।
নির্লিপ্ত পরিবেশে একাকী দাঁড়িয়ে ধোঁয়া ওঠা কফির মগে চুমুক দিচ্ছে শুদ্ধ। নীরবে ঠোঁট কাঁপছে, চোখের পাতা ভিজে উঠছে, কিন্তু তা বোধ করি তৃতীয় কারও দেখার সাধ্য হবে না।
শুদ্ধ আকাশপানে চেয়ে ঠোঁট ফাঁক করে দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছাড়ল। হতাশার সহিত মনে মনে বিড়বিড়ি করে বলল,
“মহাবিশ্বে এতো এতো জায়গা থাকতে, ওহে বোকা কিশোরী, দুঃখ উজার করে দেওয়ার জন্য তোমার আমার হৃদয়টাই পছন্দ হলো!
কী নিষ্ঠুর আবদার ছিলো তোমার! কী নিষ্ঠুর ছিলে তুমি! আমার ভালোবাসাটা আমায় ভিক্ষা দিলে কী ক্ষতি হতো তোমার, কিন্তু নাহ্—তুমি স্বার্থপর নিজের ভালোবাসাটাই দেখলে…”
বলতে বলতে থেমে গেল শুদ্ধ। মেঘলা আকাশের পানে চেয়ে ফের মলিন হেসে বলল,
“তুমি সত্যি বলেছিলে, মায়াবতী, তোমাকে পেয়ে গেলে বিরাট সমস্যা হয়ে যেতো। সব কথা তোমাকে বলা লাগতো, মনের গোপন বাক্সে পুরে রাখার মতো আর কথাই থাকতো না। নিত্য দুপুরে হয়তো তোমারে পেতাম, কিন্তু বুক জ্বালিয়ে দেওয়ার মতো খা খা করা দুপুর পেতাম না। পরন্ত বিকেলে হয়তো তোমার লগে হাঁটা লাগতো, একাকীত্বের বিষাদময় বিকেলটা পেতাম না। সারারাত তোমার লগে ফুসফুস করে কথা বলা লাগতো, নিদ্রাহীন রাত আর আমারে পাইতো কই? তোমারে পেয়ে গেলে আর আক্ষেপ করার মতো কিছুই থাকতো না, আক্ষেপের অভাবে ফাঁকা ফাঁকা লাগতো। তোমার দিকে তাকালে তোমার চোখে ডুবে যেতাম, পিঙ্ক ফ্লুইডে আর ডুব দেওয়া হতো না আমার। তোমার ভালোবাসা পেয়ে গেলে হয়তো চায়ের কাপের ভালোবাসাটাও কম কম লাগতো। তোমাকে পেয়ে গেলে তোমাকে না পাওয়ার কষ্ট আর পাওয়া হইতো না, তখন ছোটোখাটো কষ্টগুলো শালার জ্বালায় মারতো। কাছ থেকে তোমার সৌন্দর্য দেখে ফেললে হয়তো লাল গোলাপের সৌন্দর্যও মলিন লাগতো। তোমার চুমু পেয়ে গেলে খাবার-দাবার তিতা তিতা লাগতো, চিকন শরীরে অপুষ্টিতে ভুগতাম। তোমারে পেয়ে গেলে আর কোনো কিছুরই পরোয়া করতাম না, তখন জগৎ সংসার ছারখার হয়ে যেতে পারতো। তাই তোমাকে পেয়ে গেলে আসলে শালার বিরাট সমস্যা হয়ে যেতো।
তাই হয়তো তুমি আমার হলে না।
আমি ভাগ্যবান বলো—তোমাকে পাইনি, আবার নিজের হাতেই চিরতরে খুইয়ে ফেলেলাম। তুমি আমার জন্য কল্পনার সেই নীল আকাশটাই রয়ে গেলে, যাকে দেখতে তো পাই, কিন্তু ছুঁতে পারি না। তাই এখন হার মেনে নিয়েছি। তোমাকে পাওয়ার আশাও ছেড়ে দিয়েছি। এখন শুধু চাই তুমি ভালো থাকো। তুমি তো আমার সুখ। তোমার ওই হাসি মুখটা দেখে এমন কয়েকশো দুঃখের সমুদ্র অনায়াসেই আমার বুকে জায়গা হয়ে যাবে। এ দুনিয়ায় নাইবা পেলাম তোমায়, কিন্তু আখিরাতে তুমি আমার হয়ে এসো—চিরন্তন আমার হয়ে এসো।”
কথাগুলো বলে নিঃশব্দে দুই ফোঁটা চোখের পানি ফেলল শুদ্ধ। লম্বা দম নিয়ে কফি মগটা ঠোঁটের কাছে নিতেই আচমকা কেউ কেড়ে নিল। অবাক হলো না শুদ্ধ। পকেট থেকে সিগারেট বের করে শীতল ওষ্ঠের মধ্যভাগে চেপে ধরল। লাইটার জ্বালিয়ে নিকোটিনের বিষাক্ত ধোঁয়া উড়িয়ে বলল,
“রং টাইমে রং জায়গায় এন্ট্রি নেওয়ার বাজে স্বভাব তোর আর গেলো না।”
প্রণয় পাশে দাঁড়িয়ে শান্ত চোখে চাইলো শুদ্ধর মুখপানে। দুনিয়ার সবাইকে বোকা বানানো গেলেও, আবরার শিকদার প্রণয়কে বোকা বানানো—উহু। হাসল প্রণয়। উষ্ণ কফির মগে চুমুক দিয়ে বলল,
“স্মোকিং ইজ ইঞ্জুরিয়াস টু হেলথ। ইটস কজেস ক্যান্সার। বিশ্বের নামকরা হার্টের ডক্টর হয়ে নিজের হার্টের প্রতি এতো উদাসীনতা বড্ড বেমানান।”
প্রত্যুত্তরে কেবল হাসল শুদ্ধ। সিগারেটের প্যাকেট এগিয়ে দিল প্রণয়ের দিকে। প্রণয় সিগারেটের প্যাকেটের দিকে এক পলক তাকিয়ে দৃষ্টি ফিরিয়ে নিল। কণ্ঠে তৃপ্তি নিয়ে বলল,
“নো থ্যাঙ্কস।”
প্রণয়ের চোখের তৃপ্তিময় সুখ নীরবে অন্তর পুড়িয়ে দিল শুদ্ধর। হাসল সে। নিকোটিনের বিষাক্ত ধোঁয়া হৃৎপিণ্ডে টেনে নিয়ে বলল,
“ঘরে সুন্দরী বউ রেখে বন্ধুর সাথে টাইম স্পেন্ড করলে মানুষ তোকে সন্দেহ করবে, ভাববে তোর এন্টনায় সমস্যা, সিগন্যাল কানেক্ট করতে ব্যর্থ হয়। তাই তোর হরমোনে ভেজাল থাকলেও আমার নেই। দূর হ এখান থেকে।”
প্রণয় ভ্রু কুঁচকে চাইলো,
“তুই কি কোনোভাবে আমার এবিলিটির দিকে আঙুল তুলছিস?”
টোকা মেরে সিগারেটের ফিল্টার ঝেড়ে ফেলল শুদ্ধ। দায়সারা ভাবে জবাব দিল,
“তুলছি।”
“ওকে, চল তাহলে তোকে দেখিয়ে আনি।”
“নউযুবিল্লাহ! আমি ইয়া বড় কলা গাছ দেখতে ইন্টারেস্টেড না।”
বিরক্ত হলো প্রণয়। তীক্ষ্ণ নজরে চাইলো শুদ্ধর পানে। অল্প আলোতেও লাল লাল চোখ দুটোতে চিকচিক করা পানি তার চোখ এড়ালো না। প্রণয় শক্ত হলো। ভণিতা ছেড়ে রুক্ষ গলায় কাট কাট প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়ে বলল,
“অভিনয় ছেড়ে ঝেড়ে কাশ?”
প্রশ্ন শুনে ঠোঁটের কোণে তাচ্ছিল্য খেলে গেল শুদ্ধর। নির্লিপ্ত কণ্ঠে বলল,
“ভুল-ভাল বকছিস। আমি ডক্টর, অ্যাক্টর নই।”
“তোর কি মনে হয় আমি তোর বউয়ের মতো ঘাসে মুখ দিয়ে চলি? যদিও তোর বউও ঘাসে মুখ দিয়ে চলে না।”
“তোর ক্রিমিনাল মাইন্ড বাইরে খাটা। আমার পিছনে গোয়েন্দাগিরি করিস না, সুখে থাকতে পারবি না।”
প্রণয় শান্ত চোখে চাইলো। এই ছেলেটা কি ভাবে যে তার হাসির আড়ালে লুকোনো কান্নাটা প্রণয় দেখতে পাচ্ছে না? প্রণয় ফুস করে নিঃশ্বাস ছাড়ল। কোনো ভণিতা ছাড়াই বলল,
“প্রিয়স্মিতাকে বিয়ে করলি কেনো? আবার বলিস না ভালোবাসা ছিলো। নাহলে শরীরের একটা হাড়ও হাড়ের জায়গায় রাখবো না।”
প্রশ্ন শুনেও নীরব থাকল শুদ্ধ। প্রণয় ভ্রু নাচিয়ে ফের বলল,
“তোর কাছে সুযোগ ছিলো, তারপরও তুই বিয়ে করলি না কেনো? ১২ বছর আমার সাথে যার জন্য শত্রুতা পালন করলি, প্রাপ্তির এতো কাছে এসে কেনো পিছিয়ে গেলি? সারাজীবন তো তুই এটাই চেয়েছিলি। পাওয়ার জন্য ১২টা বছর কত কিছু করলি। তাহলে শেষ সময় পাশা উল্টে দেওয়ার মানে কী?”
“পাশা উল্টে যাওয়ায় তুই খুশি হোসনি?”
“কথা ঘোরাবি না।”
“জানাটা কি খুব জরুরি?”
প্রণয় শীতল দৃষ্টিতে চাইলো।
ভালোবাসার সীমানা পেরিয়ে পর্ব ৭৬
“নদীর পাড়ে যাবি? অনেক দিন তোর সাথে বাইক রাইড করা হয় না। চল, আজ খুব একলা লাগছে জানিস।”
প্রণয় বিরোধিতা করল না। হাড়-হিম করা কনকনে ঠাণ্ডায় দু’জন বেরিয়ে পড়ল বাড়ি থেকে। মিনিট পাঁচেক এক বাইক রাইড করে পৌঁছে গেল মেঘনা নদীর তীরে।

Apu next part ta tara tari denna