Home ভালোবাসার সীমানা পেরিয়ে ভালোবাসার সীমানা পেরিয়ে পর্ব ৭৭ (২)

ভালোবাসার সীমানা পেরিয়ে পর্ব ৭৭ (২)

ভালোবাসার সীমানা পেরিয়ে পর্ব ৭৭ (২)
প্রিয়স্মিতা তেহজীব রাই

ঘন অন্ধকারে ঢাকা নদীর পাড়ে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে দু’জন। শু-শু শব্দে হিমেল বাতাস বইছে। শীতকালীন নদীটা শান্ত—ঠিক ওদের দু’জনের মতো।
বেশ কিছুক্ষণ নীরব থাকলো দু’জন। অতঃপর প্রগাঢ় নিস্তব্ধতা ভেদ করে শুদ্ধ বলে উঠলো,
“তোর মনে অনেক প্রশ্ন, তাই না?”
“থাকাটা কি স্বাভাবিক নয়?”

“হ্যাঁ, হ্যাঁ, অবশ্যই স্বাভাবিক। যাকে এতো ভালোবাসলাম, যার জন্য নিজের প্রাণের বন্ধুর সাথে বছর-এর-পর-বছর শত্রুতা পালন করলাম, খুন করতে ও দ্বিধা করিনি—তাকে তো আর মহত্ত্ব দেখাতে ভালোবাসা ছেড়ে দেবো না। আচ্ছা, তোর কি মনে হয় আমি তোর জন্য আমার ভালোবাসা স্যাক্রিফাইস করেছি?”
ঠোঁটের কোণে তাচ্ছিল্য খেলে গেলো প্রণয়ের। ব্যঙ্গ করে বললো,
“হুহ! স্যাক্রিফাইস আর তুই? স্যাক্রিফাইস শব্দটা তোর সাথে বড্ড বেমানান।”
“এইতো, একদম ঠিক চিনেছিস। আবদ্ধ চৌধুরী শুদ্ধ স্যাক্রিফাইস করতে শেখেনি। সে যা চায় তা হয় চেয়ে নেয়, নয়তো কেড়ে নেয়। শুধু আমি কেনো, স্যাক্রিফাইস ওয়ার্ডটা তোর সাথেও যায় না। তুইও তো কলে পড়ে বাধ্য হয়েছিলি।”

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

“আর তুই?”
পকেট থেকে সিগারেট বের করে ফের ওষ্ঠ ভাজে চেপে ধরলো শুদ্ধ। লাইটার জ্বালিয়ে ধোঁয়া উড়িয়ে বললো,
“আচ্ছা, তোর মনে পড়ে ছোটবেলায় তোর একটা বউ ছিলো—হয়তো এখনও আছে।”
প্রশ্ন শুনে থমকে গেলো প্রণয়। চোখ-মুখ শক্ত হয়ে এলো মুহূর্তে।
“মনে পড়ে তোর সেই বউয়ের কথা? কখনো জানতে ইচ্ছা হয় সে কেমন আছে, কোথায় আছে?”
প্রশ্ন শুনে প্রণয়ের শরীরের রক্ত ফুটছে রীতিমতো। তবুও শান্ত রইলো প্রণয়। নিরেট কণ্ঠে জবাব দিলো,
“না, মনে পড়ে না। জানতেও ইচ্ছা হয় না। কারণ ঐ বিয়েটা আমি মানি না। ঐ দিনটার কোনো অস্তিত্ব নেই আমার জীবনে। ওটা স্রেফ একটা দুঃস্বপ্ন।”
“বাপরে! এতো ঘৃণা? হুহ! হাসিও পায় বটে। আচ্ছা, তোর বউয়ের নামটা জানিস? মনে পড়ে কিভাবে তোর বিয়ে হয়েছিলো?”
প্রণয় চরম অস্বস্তিতে পড়ে গেলো। না চাইতেও চোখের সামনে জীবন্ত হয়ে উঠলো ভুলে যাওয়া সেই অভিশপ্ত দিনটা।

“আমাকে ডেকেছিলেন দাদাজান?”
চোখে চোখ রেখে কথাটা বললো প্রণয়।
বিশাল রাজকীয় কক্ষের সোফায় পায়ের উপর পা তুলে বসে আছেন শিকদার বাড়ির একচ্ছত্র অধিপতি জিহাদ শিকদার। উনার দুই পাশে দু’জন অপরিচিত ব্যক্তি।
নাতির দুঃসাহসী চেতনা নিরীক্ষণ করে হাসলেন জিহাদ শিকদার। হাতের ইশারায় কাছে ডেকে বললেন,
“হ্যাঁ, ডেকেছি। এদিকে এসো।”
প্রণয়ও দ্বিরুক্তি ছাড়াই কাছে গেলো।
“বসো।”
অপরিচিত মানুষদের দেখে কেমন খটকা লাগলো প্রণয়ের। তবুও অযথা কথা না বলে পাশে বসে পড়লো।

“শুভ জন্মদিন উত্তরাধিকারী।”
“ধন্যবাদ জমিদার সাহেব।”
“কী উপহার চাও বলো।”
“কিছুই চাই না। শুধু দোয়া করবেন দাদাজান।”
“তা তো করবোই। কিন্তু তোমার আমার কাছে কিছু না চাওয়ার থাকলেও আমার যে তোমার কাছে কিছু চাওয়ার আছে।”
প্রণয় আশ্চর্য হলো। অবাক কণ্ঠে জানতে চাইলো,
“কী?”
জিহাদ শিকদার কয়েক পল চুপ থেকে গলা ঝেড়ে বললেন,

“দেখো, আমি এতো ভণিতা জানি না, তাই সরাসরি বলছি। তোমাকে এখন একটা কাজ করতে হবে। আর মনে রাখবে—আমার বলা কথাই আমার আদেশ।”
প্রণয় ভ্রু কুঁচকালো। সন্দিহান কণ্ঠে বললো,
“কী কাজ করতে হবে?”
জিহাদ শিকদার উল্টো ঘুরিয়ে প্রশ্ন করলেন,
“তোমার বর্তমান বয়স তো ১৮, তাই না?”
“জি।”
“বাহ! আমার এই বয়সে তোমার বাপের জন্ম হয়ে গিয়েছিলো।”
“মানে?”
“মানে-টানে কিচ্ছু না। আমাদের বংশের বড়ো ছেলেদের এতো বয়স অবধি অবিবাহিত থাকার নিয়ম নেই…ঠিক আছে।

আমার বিয়ে হয়েছিলো ১৫-তে, তোমার বাপের ১৭-তে, আর তোমার তো ১৮ পেরিয়ে যাচ্ছে।”
জিহাদ শিকদারের কথা শুনে যেন মাথা চক্কর দিয়ে উঠলো প্রণয়ের। সে তৎক্ষণাৎ বিরোধিতা জানিয়ে বললো,
“অসম্ভব দাদাজান! এখন আমার পক্ষে কোনো মতেই বিয়ে করা সম্ভব নয়।”
জিহাদ শিকদার বাঁকা হেসে দেখলেন নাতির চোখে-মুখে ফুটে ওঠা অস্থিরতা। তিনি সংক্ষিপ্ত বাক্যে জানিয়ে দিলেন,
“বললাম না, বিয়ে তোমাকে করতেই হবে—আজ আর এক্ষুনি। দ্যাট ইজ মাই অর্ডার।”
তৎক্ষণাৎ বসা থেকে দাঁড়িয়ে পড়লো প্রণয়। কাট-কাট কণ্ঠে বললো,
“নো নেভার! আই’ম কমিটেড টু সামওয়ান।”
“আই ডোন’ট কেয়ার ইউ হ্যাভ কমিটেড টু সামওয়ান অর নো। বাট তোমাকে আমার পছন্দ করা মেয়েকেই বিয়ে করতে হবে—এক্ষুনি।”

প্রণয় উত্তেজিত হয়ে পড়লো। আর ভদ্রতা বজায় রাখতে পারলো না। চেঁচিয়ে বলে উঠলো,
“আমি অন্য কাউকে বিয়ে করতে পারবো না। পারবো না। পারবো না।”
এমন বেয়াদবি দেখেও উত্তেজিত হলেন না জিহাদ শিকদার। ঠাণ্ডা গলায় বললেন,
“বিয়ে তোমাকে করতেই হবে। আর যদি না করো…”
প্রণয় তেতে উঠে বললো,
“কী করবেন আপনি?”
জিহাদ শিকদার হাসলেন। ঠাণ্ডা কণ্ঠে বললেন,
“বেশি কিছু না। কেবল আমার সব থেকে সুন্দরী নাতনিটাকে আমার মেয়ের কাছে কানাডাতে পাঠিয়ে দেবো। জানোই তো, এই দেশ থেকে ঐ দেশ ঢের ভালো বাচ্চাদের জন্য।”

জিহাদ শিকদারের ঠাণ্ডা হুমকিতে দুনিয়া দুলে উঠলো প্রণয়ের। মনে হলো, খচ করে বুকের পাঁজরে কিছু একটা গেঁথে গেছে। কলিজাটা এফোঁড়-ওফোঁড় হয়ে গেছে একটা বাক্যেই।
জিহাদ শিকদার ফের বললেন,
“তোমার কাছে ভাবার জন্য দুই মিনিট দিলাম। তোমার উত্তর যদি হ্যাঁ হয়, তাহলে ঠিক আছে। আর যদি না হয়, তাহলে এক সপ্তাহের মধ্যেই আমার মেয়ের কাছে পাঠিয়ে দেবো। তুমি খুব ভালো মতোই জানো, আমি জিহাদ শিকদার—যা বলি, তাই করি।
আর বিয়েটা করছো মানেই এই না যে তোমাকে এক্ষুনি সংসার করতে হবে। তুমি তোমার ইচ্ছা মতো সময় নেবে। ততদিন নাহয় এই সব কিছু গোপন থাকবে। তোমার অনিচ্ছায় কোনো কথাই এই চার দেয়ালের বাহিরে বের হবে না।”

প্রণয় চোখে ঝাপসা দেখছে। কী করবে সে? তার জানকে—তার ছোট্ট রক্তজবাকে—এমন একজনের কাছে পাঠিয়ে দেবে যে কিনা তার থেকে তার জানকে কাড়তে চায়! প্রণয় তো এক সেকেন্ডও বাঁচবে না তার জানকে ছাড়া।
“টাইম আপ।”
কেঁপে উঠলো প্রণয়।
“ভাবার সময় শেষ। ঝটপট বলো। আর বিয়ে করতে না চাইলে ও চলে যেতে পারো।”
পানিতে ঝাপসা হয়ে এলো প্রণয়ের চোখ। সে বুকে পাথর চেপে কঠিন সিদ্ধান্ত নিলো। কেঁপে ওঠা কণ্ঠে ঘৃণা নিয়ে বললো,
“রাজি আমি।”
“দ্যাট’স মাই বয়।”
প্রণয় চুপচাপ ফের বসে পড়লো। জিহাদ শিকদার ভ্রু কুঁচকে বললেন,
“তোমার বউকে দেখবে না?”

“নট ইন্টারেস্টেড। তাড়াতাড়ি এই নাটক শেষ করুন। আমার আরো কাজ আছে।”
“ওকে। কাজি সাহেব, পাশের ঘরে কনে মেয়ে বসিয়ে রাখা হয়েছে। বিয়ে পড়িয়ে আনুন।”
মাথা নেড়ে উঠে চলে গেলেন কাজি সাহেব। অতঃপর শরিয়া মোতাবেক বিবাহ সম্পন্ন হলো।
“উকিল সাহেব।”
উকিল ফাইল থেকে কিছু পেপারস বের করে দিলো জিহাদ শিকদারের হাতে। জিহাদ শিকদার সেটা বাড়িয়ে দিলেন প্রণয়ের দিকে। প্রণয় কোনো কিছু না দেখে সাইন করে দিলো।
আর এক মুহূর্তও অপেক্ষা করলো না—হনহন করে কক্ষ ত্যাগ করে বেরিয়ে গেলো।

“কীরে।”
শুদ্ধর ডাকে ভাবনা থেকে ছিটকে পড়লো প্রণয়। চরম বিরক্তি নিয়ে তেতে উঠে বললো,
“বার বার বউ-বউ করিস না। বিরক্ত লাগে। আমার একটাই বউ, তাও বাড়িতে।”
“তাও তো বুঝলাম। কিন্তু তোর কখনো জানতে ইচ্ছা হয় না সেই মেয়েটা কেমন দেখতে, কোথায় থাকে—এসব?”
“নাহ।”
শুদ্ধ ভাবুক কণ্ঠে বললো,
“তোর বউটা খুব সুন্দর দেখতে জানিস? একদম পুতুলের মতো। নরম, কোমল, স্বচ্ছ। ভালো না বেসে থাকাই যায় না।”
প্রণয় চোখ ঘুরিয়ে তাকালো শুদ্ধর দিকে। সন্দিহান কণ্ঠে বললো,

“তুই দেখেছিস?”
“তুইও দেখেছিস।”
“কীহ!”
“একটা ঘটনা শুনবি? শোন তাহলে।”
“আজ থেকে চার বছর পূর্বে আমি অস্ট্রেলিয়া যাওয়ার আগের দিন নানার ঘরের ড্রয়ারে একটা ফাইল খুঁজে পাই। সেখানে নানা ধরনের ডকুমেন্টস আর পেপার্সের মধ্যে একটা চিঠি আর কিছু ছবি দেখতে পাই। জানিস, সেই চিঠিতে কী লেখা ছিলো?”
“কী?”
শুদ্ধ পকেট থেকে একটা ভাঁজ করা কাগজ বের করে প্রণয়ের হাতে দিয়ে বললো,
“নিজেই পড়।”

প্রণয় অদ্ভুত চোখে তাকালো ভাঁজ করা কাগজটার দিকে। বেশ পুরোনো দিনের, তাই কেমন হলদে হয়ে গেছে কাগজ। প্রণয় হাত বাড়িয়ে কাগজটা নিলো। চাপা কৌতূহল হচ্ছে মনে।
প্রণয় কাগজটা খুলতেই প্রথমে লেখা ছিলো—
“এই চিঠিটা তুমি যখন পড়ছো, তখন হয়তো আমি আর এই দুনিয়াতে নেই দাদভাই। ইদানিং শরীরটা ভীষণ খারাপ যায়। জানি তুমি আমার ওপর রাগ করে আছো, কথা বলো না আগের মতো, জানতেও চাও না আমি কেমন আছি, ওষুধ খেয়েছি কিনা। কিন্তু আমি তোমাকে অনেক ভালোবাসি দাদভাই। আমার জীবনের সবথেকে ভালো বন্ধুটা তুমি।
তুমি এখন বড়ো হচ্ছো, মাশাল্লাহ। যতো সময় যাবে, তুমি বুঝতে পারবে তুমি কাদের ভীড়ে বাস করছো। এমনকি আমরাও ভালো নই দাদভাই। তুমি ও খারাপ, আমি ও খারাপ—আমরা সবাই খারাপ। আসলে আমাদের রক্তটাই দূষিত, যা চাইলেও আমাদের ভালো থাকতে দেয় না, ভালো মানুষ হতে দেয় না। কৈশোর ছাড়িয়ে যৌবনে পদার্পন করার আগে মনের মনুষ্যত্বকে গলা টিপে হত্যা করে।

আমি তোমার ভবিষ্যৎটা খুব ভালো মতো দেখতে পাই দাদভাই, তাই ভয় হয় ভীষণ। আমি মোটেও চাই না আমার নাতি ভবিষ্যতে এতোটা কষ্ট পাক, এতোটা যন্ত্রণা পাক যতটা সে সহ্য করার ক্ষমতা রাখে না। তাই আমি যাওয়ার পূর্বে তোমাকে তোমার জীবনের সব থেকে প্রিয়, সব থেকে চাওয়ার জিনিসটা তোমার নামে করে দিয়ে গেলাম দাদভাই। এটা তোমার দাদাজানের পক্ষ থেকে তোমার উপহার। আমার ওবর্তমানে তোমার কাছ থেকে আর কেউ তাকে কখনো ছিনিয়ে নিতে পারবে না। তোমার নামে দলিল করে দিলাম।”
প্রণয়ের হাত কেঁপে উঠলো। শুদ্ধ তার চোখের সামনে একটা কোর্ট পেপার এগিয়ে দিলো। কাঁপা হাতে সেটার প্রথম পৃষ্ঠা উল্টাতেই স্তব্ধ হয়ে গেলো প্রণয়। তার নামের পাশে জ্বলজ্বল করছে আঁকাবাঁকা অক্ষরে লেখা একটা নাম—তনয়া শিকদার প্রিয়তা।

পায়ের নিচের জমিন সরে গেলো প্রণয়ের। চোখ পানিতে ঝাপসা হয়ে এলো।
শুদ্ধ হাত বাড়িয়ে কিছু ছবি আর আরো একটা চিঠি এগিয়ে দিলো। প্রণয় ছবিগুলো হাতে নিয়ে দেখলো। ছোট্ট একটা পুতুলের মতো বাচ্চা মেয়ে মাথায় লাল টুকটুকে ঘুমটা দিয়ে বসে আছে। পাশে আঞ্জুম নাহার আর কাজি সাহেব।
প্রণয় চিঠিটা খুলে দেখলো। সেখানে লেখা—
“এবার খুশি তো নাতি? আমি জানি তুমি খুশি। আমি জানি আমার নাতি মেয়েটাকে কতো ভালোবাসে। আসলে আমরা এমনই—আমাদের রক্ত খারাপ হতে পারে, বংশ খারাপ হতে পারে, কিন্তু আমাদের ভালোবাসা—ওটা নিয়ে কোন কথা হবে না।
তোমাকে তো সারপ্রাইজ দিতে চেয়েছিলাম নাতি, কিন্তু তুমি রেগে-মেগে চলে গেলে, দেখলে ও না। যাই হোক, সব জানার পর এই বুড়োর উপর রাগ রেখো না নাতি।”

এসব দেখে প্রণয়ের মস্তিষ্ক ফাঁকা হয়ে গেলো। সে তার নিজের চোখকেই বিশ্বাস করতে পারছে না। এসব সত্যি? তার রক্তজবা সত্যি সেই ছোটো কাল থেকে তার নামে হালাল হয়ে আছে?
দিশেহারা হলো প্রণয়। খুশি হবে, নাকি সেদিনকার নিজের মূর্খামির জন্য রাগ করবে—বুঝতে পারলো না।
শুদ্ধ ফের সামনের দিকে চেয়ে বললো,
“হ্যাপি অ্যানিভার্সারি, বন্ধু। আজ তোর ষোড়শ বিবাহবার্ষিকী।”
প্রণয় কথা বলার ভাষা পেলো না। তবুও তার মনের খটকা রয়েই গেলো। শুদ্ধর পানে তাকিয়ে বললো,
“এটাই একমাত্র কারণ?”
“হয়তো হ্যাঁ, নয় তো নয়। এর থেকে বেশি কিছু তোর না জানলেও চলবে। বাড়ি যা, হয়তো তোর জন্য সারপ্রাইজ আছে।”

বলে উল্টো ঘুরে অন্ধকারে হাঁটা ধরলো শুদ্ধ।
দুই চোখের অবাধ্য অশ্রু আর লুকায়িত থাকছে না। ছারখার হয়ে যাচ্ছে বুক—এগুলো কি কাউকে দেখানো যায়? শুদ্ধ শার্টের হাতায় চোখ মুছলো। বিকট শব্দে আকাশ ডেকে আবারো ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নামলো। বৃষ্টির পানির সাথে মিলেমিশে একাকার হয়ে যাচ্ছে শুদ্ধর চোখের নোনতা পানি।
হাড়-হিম করা শীতল জলও কেনো মনের আগুনের ছিঁটেফোঁটাও নিভাতে পারে না?
সব কষ্টের একদিন শেষ হয়, সব যন্ত্রণার একদিন অবসান হয়। কিন্তু তার অন্তরের গোপন অথচ এই তীব্র যন্ত্রণার কোনো অন্ত নেই, এই দগদগে জীবন্ত ঘায়ের কোন প্রলেপ নেই।
সময়ের চাকা পরিবর্তনশীল। একদিন যে জায়গায় দাঁড়িয়ে তীব্র মানসিক যন্ত্রণায় ভেঙে পড়েছিল প্রণয়, ছটফট করে মরেছিল—আজ সেই একই জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে সে।
কথায় আছে না, আল্লাহ ছাড় দিলে ও ছাড়ে দেন না। কিন্তু অতীতের ঘটনায় তো শুদ্ধর কোনো দোষ ছিল না। তাহলে আল্লাহ তাকে এমন জীবন কেন দিলেন?

প্রণয়ের বিয়েটা তো মিথ্যা ছিলো, সব পরিস্থিতিও সাজানো ছিলো—তবুও কতোটা কষ্ট পেতে হয়েছে তাকে। কিন্তু তার পরিস্থিতিটা সাজানো হলেও বিয়েটা মিথ্যা নয়। কোনো কিছুই মিথ্যা নয়।
যন্ত্রণা কখনো হারিয়ে যায় না। সময় সেটাকে একজনের ভাগ্যলিপি থেকে অন্যজনের ভাগ্যলিপিতে রিপ্লেস করে দেয়। সব দুঃখের শেষে প্রণয় সুখী হয়েছে, কিন্তু শুদ্ধ’ র জীবনে সুখের সূর্য আর কোনদিন উঠবে না। আর কখনোই সে সুখী হতে পারবে না। তাকে বাকিটা জীবন এভাবেই বাঁচতে হবে।
বৃষ্টির ছাঁটে সাদা শার্ট শরীরের সাথে ভিজে লেপটে আছে শুদ্ধর। বারবার চোখের পাতায় না চাইতেও ভেসে উঠছে নিষ্পাপ মুখের মায়াবী প্রতিচ্ছবি। শুদ্ধ বুকের বাঁ পাশটা চেপে ধরলো। চোখ বন্ধ করে আর্তনাদ করে বলল—
“এতো কেনো মনে পড়ে তোমাকে? তুমি না মনের ভেতর কুটকুট করে পিঁপড়ার মতো কামড় দাও। খালি দেখতে মন চায়। একটা গান আছে, না—

‘তুমি আমার এমন একজন, যাকে এক জনমেও ভালোবেসে ভরবে না এ মন,’
ঠিক তেমন।”
“তুমি এমন নিষ্ঠুর আবদার কেনো আমার কাছে করেছিলে, মায়াবতী? কেনো আমাকে এভাবে নিঃস্ব করে অন্যের হয়ে গেলে? আমি কি খুব খারাপ মানুষ ছিলাম? আমি তো শুধু তোমাকে ভালোবেসে ছিলাম, শুধু তোমাকে চেয়ে ছিলাম।
শুনতে পাচ্ছো মায়াবতী? শুধু তোমাকে ভালোবেসে ছিলাম।
আহ্হ্হ্হ্হ্হ্হ্!”
গলা ফাটিয়ে চিৎকার দিয়ে উঠলো শুদ্ধ। অনর্গল বৃষ্টির পানির সাথে ধুয়ে মুছে যাচ্ছে উপচে ওঠা চোখের পানি।
“আসসালামু আলাইকুম, শুদ্ধ ভাই।”

টুং করে ফোনের মেসেজ টিউনটা বেজে উঠলো শুদ্ধর।
রাতের খাবার শেষে জাস্ট ঘুমানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিলো শুদ্ধ। আজ সে সীমাহীন খুশি। অবশেষে এতো গুলো বছরের অপেক্ষার পর, এতো ঝড়-ঝাপটা অনিশ্চয়তার পর ফাইনালি তার ভালোবাসার পাখি তার হতে চলেছে।
ঘুম পাচ্ছে শুদ্ধর। সে আলস্যভঙ্গিতে হাত বাড়িয়ে বেডসাইড টেবিল থেকে ফোনটা তুলে নিলো। পাওয়ার বাটন চেপে ঢুলু ঢুলু চোখে স্ক্রিনে তাকাতেই এক ঝটকায় ঘুম পালিয়ে গেলো শুদ্ধর।
তড়াক করে লাফিয়ে উঠে বসলো শোয়া থেকে।
মেসেজটাতে ক্লিক করে রিপ্লাই করলো—

“ওয়ালাইকুম আসসালাম।”
পুনরায় টুং করে ফোন নোটিফিকেশন বেজে উঠলো।
স্ক্রিনে ভেসে উঠলো—
“আপনার সাথে একটু দেখা করতে চাই, শুদ্ধ ভাইয়া।”
“এক্ষুনি?”
“জি, এক্ষুনি।”
“একটু বেশি তাড়াহুড়ো হয়ে যাচ্ছে না? অলমোস্ট প্রায় রাতের দেড়টা বাজে।”
“সো হোয়াট! আমি এক্ষুনি আপনার সাথে দেখা করবো। আমার কথাটা বলাটা খুব জরুরি।”
“ওকে বাবা, বলো কোথায় আসবো।”
“আমি উত্তরের বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছি।”

“ঠিক আছে, তুমি ওখানেই দাঁড়াও। এক্ষুনি আসছি।”
বলে ফোনটা বন্ধ করে পকেটে ঢুকিয়ে নিলো শুদ্ধ।
পুরুষ মানুষ হওয়া সত্ত্বেও তার বুকটা কেমন ধুকপুক করছে। যতোই হোক, মেয়েটা তার সব চেয়ে বড়ো দুর্বলতা।
প্রিয়তা উত্তরের বারান্দায় দাঁড়িয়ে অস্থির চিত্তে অনবরত পায়চারি করছে। শুশ্রী চোখে-মুখে লেপটে আছে স্পষ্ট অস্থিরতার ছাপ। দুশ্চিন্তায় একটু পরপর নখ কুটছে।
ভাবনার মধ্যেই আচমকা কাঁধে কারো স্পর্শ পেয়ে লাফিয়ে উঠলো প্রিয়তা। চমকে পেছন ঘুরে তাকালো। শুদ্ধ খুব কাছাকাছি দাঁড়িয়ে আছে।
প্রিয়তা ঢোক গিলে কিছুটা দূরে সরে গেলো।
শুদ্ধ ওর ঘাবড়ে যাওয়া মুখশ্রী দেখে ভ্রু নাচিয়ে শুধালো,

“কী?”
মেসেজে নির্ভয়ে কথা বললেও সামনাসামনি কথা বলতে ভয় লাগছে প্রিয়তার। সে আমতা-আমতা করতে করতে বললো,
“না, মানে হ্যাঁ।”
“না মানে হ্যাঁ মানে কী?”
ঘামতে শুরু করলো প্রিয়তা। জিভে ঠোঁট লেগে কথা আটকে আসছে।
শুদ্ধ ভ্রু কুঁচকে ওর অবস্থা দেখলো। অতঃপর দু’পা এগিয়ে এসে প্রিয়তার কোমল হাত তুলে নিজের হাতের মুঠোয় পুরে নিলো। চোখে চোখ রেখে কোমল গলায় বললো,
“নির্ভয়ে বলো, কী বলতে চাও।”

প্রিয়তার চোখের পাপড়ি কাঁপছে। সে শুদ্ধর চোখে চোখ রেখে বলতে পারলো না। আত্মগ্লানিতে দৃষ্টি নামিয়ে নিলো।
মনের সবটুকু সাহস একত্র করে চোখ-মুখ খিঁচে বললো,
“আমি আপনাকে বিয়ে করতে চাই না, শুদ্ধ ভাই। আমি… আমি… আমি প্রণয় ভাইকে ভালোবাসি।”
শুরুতে আগ্রহ নিয়ে তাকিয়ে থাকলেও কথা শুনে আগ্রহ মিলিয়ে গেলো শুদ্ধর। শুনলো বটে, তবে ভ্রুক্ষেপ করলো না।
প্রিয়তা ফের চোখে জল নিয়ে বললো,
“আমি উনাকে অনেক ভালোবাসি, শুদ্ধ ভাই। প্লিজ, আপনি সবাইকে না করুন।”
এবারও চুপ থাকলো শুদ্ধ।
প্রিয়তা এবার ঝরঝর করে কান্না করে দিলো। শুদ্ধর শার্ট চেপে ধরে কাকুতি-মিনতি করে বললো,
“আমি উনাকে ছাড়া কাউকে স্বামী বলে মেনে নিতে পারবো না, শুদ্ধ ভাই। প্লিজ বুঝুন একটু। আমি খুব, খুব, খুব ভালোবাসি উনাকে।”

প্রিয়তার চোখের পানি দেখে হুট করে রক্তে আগুন ধরে গেলো শুদ্ধর। রাগটা মাথায় চাড়া দিয়ে উঠলো।
প্রিয়তার দুই গাল চেপে ধরে চোখ লাল করে বললো,
“তুমি কাকে ভালোবাসো না বাসো, সে সব আমি জানতে চাই না। আমি শুধু তোমাকে ভালোবাসি। আমার শুধু তোমাকে চাই, তুমি শুধুই আমার।”
প্রিয়তা দুই হাতে ঠেলে সরিয়ে দিলো শুদ্ধকে। বিতৃষ্ণা নিয়ে বললো,
“বললাম তো, আমি শুধু প্রণয় ভাইকে ভালোবাসি। আপনাকে বিয়ে করতে চাই না। আমাকে বিয়ে করে কিচ্ছু পাবেন না।”
ভিতরে আগুন জ্বলে উঠলো শুদ্ধর। ঝটকা মেরে প্রিয়তাকে ঠেসে ধরলো পাশের দেওয়ালে। পুরুষালী বাহুতে আবদ্ধ করে বললো,

“বললাম না, তুমি কাকে ভালোবাসো বা না বাসো—আমার কিচ্ছু যায় আসে না। আমি তোমাকে ভালোবাসি, আর বিয়ের পর তুমিও আমাকে ভালোবাসবে।”
ভয়ে থরথর করে কেঁপে উঠলো প্রিয়তা। তবুও কাঁপা কণ্ঠে স্পষ্ট বাক্যে বললো,
“আমার ভালোবাসার গভীরতা আপনি ধারণাও করতে পারছেন না, শুদ্ধ ভাই। আপনি যতো যাই করুন, কখনো আমাকে পাবেন না। আমাকে প্রণয় ভাই ব্যতীত অন্য কোনো পুরুষ ছুঁতে পারে না। এমনটা কখনো হতে দেবো না এই তনয়া শিকদার প্রিয়তা।

প্রয়োজনে আত্মহত্যা করবো, তবুও অন্য কারো কাছে বিলিয়ে দেবো না নিজেকে।”
শুদ্ধ নিশ্চুপ হয়ে চেয়ে রইলো প্রিয়তার নোনা জলে টলমলে দুটো চোখের পানে।
সাথে সাথেই শক্ত করে পা জড়িয়ে ধরলো প্রিয়তা। পায়ে গাল ঠেকিয়ে বললো,
“আমাকে সত্যি ভালোবাসলে আমাকে ছেড়ে দিন, শুদ্ধ ভাই। আমাকে আমার ভালোবাসার কাছে যেতে দিন। আমাকে বন্দী বানাবেন না দয়া করে। তাহলে যে তার অভাবে মৃত্যু হবে আমার। সে আমার সুখের আধার, শুদ্ধ ভাই। আমার সুখের জন্য হলে ও আমাকে ছেড়ে দিন। আমি মরে যাবো।”
গর্জন করে ওঠা আকাশের তীব্র হুঙ্কারে ঘোর কেটে গেলো শুদ্ধর। সামনে কেবল অন্ধকার। ঠোঁট এলিয়ে তাচ্ছিল্য করে হাসলো শুদ্ধ।

“তোর সুখের জন্য তোকে উড়িয়ে দিয়েছিলাম, যা তুই পাখি। তোর পছন্দ মতো নীড়ে বাসা বাঁধ। আগুন জ্বলছে—জ্বলুক আমার বুকে। তবুও তোর সুখে যেন কমতি না হয়।
তোর স্ট্রবেরি লিপ গ্লসের সুগন্ধি স্বাদ নেওয়া আমার তকদিরেই নেই। তোর সুবাসিত নরম কায়া বুকে জড়ানোর সৌভাগ্য নেই।
আহ্হ্হ্হ্হ্হ্!
এতো যন্ত্রণা আমার বুকে আর সহ্য হয় না।”
উপর থেকে ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি পড়ছে। শুদ্ধ আকাশ পানে মুখ করে গলা ছেড়ে গেয়ে উঠলো—

ভালোবাসার সীমানা পেরিয়ে পর্ব ৭৭

“চলে গেছো তাতে কী, ভালোবেসে মরেছি!
তুমি আছো হৃদয়ের আয়নায়,
চলে গেছো তাতে কী—ভালোবেসে মরেছি!
তুমি আছো হৃদয়ের আয়নায়।”

ভালোবাসার সীমানা পেরিয়ে পর্ব ৭৮