ভালোবাসার সীমানা পেরিয়ে পর্ব ৭৮
প্রিয়স্মিতা তেহজীব রাই
বানভাসী অনুভূতির তোড়ে উত্তাল হৃদয় প্রেমের প্রবল উচ্ছ্বাসে প্লাবিত হয়। প্রশ্ন জাগে মনে; মস্তিষ্ক ফাঁকা হয়ে আসে।
মনে জমা হয় নিরব অভিমান, অভিযোগের পাহাড়, কিন্তু কার প্রতি? নিজের প্রতি।
এখন মনের অভিযোগগুলো কার কাছে বলবে? সে কাকে শোনাবে যে তার জীবনের চরম ভুল হয়ে গেছে, মস্ত বড় মুর্খামি করে ফেলেছে সে। এখন কিভাবে শোধরাবে ষোল বছর আগের ভুলটা?
একটা ভুলে গোটা জীবনটা ওলটপালট হয়ে গেছে। অতীত নষ্ট হয়ে গেছে, বর্তমান জ্বলে গেছে, আর ভবিষ্যৎ মুছে গেছে।
এতো গুলোর বছরের, এতো এতো আত্মত্যাগ, এতো এতো যন্ত্রণার সব মিথ্যে হয়ে গেছে। একটা সত্যে প্রমাণিত হয়েছে যে তার সবটাই নিরর্থক ছিল?
প্রণয় নিজেই নিজের চুল খামচে ধরল। আগে-পিছে সবটাই অন্ধকার দেখছে। যেন এই উঠে আসে সত্যে। সে খুশি হতে পারছে না, কারণ এই সত্যিটা যদি তার আগে থেকে জানা থাকতো তাহলে আজকের দিনটা নিশ্চিতভাবে অন্যরকম হতে পারত । এতগুলো বছর নিজেকে এভাবে তিলে তিলে পুড়িয়ে মারতে হতো না; জীবনটা সুখের হতো।
প্রণয় চিৎকার দিয়ে উঠলো,
“যে ভালোবাসার অভাব আমাকে বছরের বছর কুড়ে কুড়ে খেলো, সে ভালোবাসা নাকি প্রথম থেকেই আমার ছিল।
তার মানে এতো কিছুর প্রয়োজনই ছিল না? তার মানে আমার জীবনটাও সহজ সরল হতে পারতো। আমার জীবনটা ও দীর্ঘ হতে পারতো।”
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
প্রণয়ের পাগল লাগছে নিজেকে। আশপাশের সব কিছু চক্রব্যূহের অনুরূপ ঠেকছে তার নিকট। আর কিছুই ভাবতে পারছে না। তাকে এক্ষুনি তার ভালোবাসাকে বুকে নিতে হবে।
প্রণয় উদ্ভ্রান্তের মতো ফিরে এলো শিকদার বাড়ি। মেইন ডোর খোলাই ছিল; বিধায় নক করতে হলো না।
প্রণয় বাড়ির ভেতর পা রাখতেই আচমকা সবটা নিখস কালো অন্ধকারে তলিয়ে গেলো। বাড়ির সকল বাতি নিভে গেল একত্রে।
ব্যাপারটাতে খানিক অবাক হলো প্রণয়। সাধারণত এমনটা কখন হয় না; বিদ্যুৎ চলে গেলে অটো জেনারেটর অন হয়ে যায় সব সময়। তাহলে আজ কি হলো? বাইরে উকি দিয়ে দেখলো।
বাইরে কালো ঝলমল করছে, সবকিছু দিনের মতই ফর্সা।
প্রণয়ের ভ্রু কুঁচকে গেলো। আপনাআপনি আন্দাজে কিছুটা এগিয়ে গিয়ে দেখলো আশেপাশে যতদূর চোখ যায় কোথাও সামান্য আলোর ছিটেফোঁটাও নেই।
এবার কপালের ভাঁজ দৃঢ় হলো। প্রণয় এর পকেট হাতড়ে দেখলো ফোন নেই। হতাশ হলো। সে তাড়াহুড়োতে হয়তো ফোনটা তখন ঘরেই ফেলে এসেছে।
প্রণয় সাবধানে আরো কয়েক পা এগিয়ে গিয়ে গলা ছেড়ে ডাকলো,
“আম্মু, আম্মু।”
তবে সাড়া দিলেন না অনুশ্রী বেগম।
প্রণয় সশব্দে হাক ছেড়ে আরো কয়েকবার ডাকলো, তবু সাড়া দিলেন না অনুশ্রী বেগম।
এবার আর আশ্চর্যের অন্ত রইল না প্রণয় এর। বাড়ি ভর্তি এতো এতো লোক কিন্তু কেউ শুনতে পেলো না। আশ্চর্য। হঠাৎ কিছু একটা মনে পড়তেই অজানা আশঙ্কায় হৃদপিণ্ড মুচড়ে উঠলো প্রণয় এর; আতঙ্কে গলা শুকিয়ে মরুভূমি হলো রীতিমত।
সবার চিন্তা ছুঁড়ে ফেলে চিৎকার দিয়ে ডাকলো,
“রক্তজবা, জান এই জান!”
পুরুষালী গভীর আওয়াজে চিৎকারের বিকট শব্দগুলো শিকদার বাড়ির সুউচ্চ দেওয়ালে দ্বিগুণ প্রতিধ্বনিত হলো।
প্রণয় উন্মাদের মতো আন্দাজে ছুটতে ছুটতে এক তলা, দুই তলা করে তৃতীয় তলায় পৌঁছে গেল।
অতিরিক্ত ভয়ে আর দুশ্চিন্তায় ইতিমধ্যে ঘামতে শুরু করেছে ছেলেটা। ঘাড়-গলা বেয়ে গড়িয়ে নামছে সূক্ষ্ম তরল ধারা।
প্রণয় ডাকতে ডাকতে তৃতীয় তলার ছাদে পা রাখতেই হুট করে সব আলো জ্বলে উঠলো। মুহূর্তের মধ্যেই রঙিন আলোয় ঝলমলিয়ে উঠলো চার পাশ।
অবাক হওয়ার সময়টুকু ও পেলনা প্রণয়। কিছু বুঝে উঠার আগেই দূর থেকে একত্রে ভেসে এলো,
“হ্যাপি বার্থডে টু ইউ, হ্যাপি বার্থডে টু ইউ, হ্যাপি বার্থডে টু ইউ বড় দাদান, হ্যাপি বার্থডে টু ইউ।”
একত্রে সকলের কণ্ঠ পেয়ে শব্দের উৎসে অর্থাৎ উত্তর দিকে তাকালো প্রণয়। সাথে সাথেই চোখ ধাঁধিয়ে গেল এক অনন্য সৌন্দর্যে।
ফেয়ারি লাইটের নিয়ন আলোয় জায়গাটা স্বর্গরাজ্যের নন্দনকানন মনে হলো।
তবে যথারীতি সেই সৌন্দর্য দৃষ্টি আকর্ষণ করতে ব্যর্থ হলে প্রণয়ের চোখ আটকালো অন্য সৌন্দর্যে—
কিছুটা দূরে অবস্থিত কালো শাড়ি পরিহিত রমণী। হাস্যোজ্জ্বল মুখে তাকিয়ে আছে তার দিকে। হাসিতে যেন মুক্ত ঝরে মেয়েটা।
রমণীর অক্ষত মুখটা দেখে বুকটা শীতল হয়ে এলো প্রণয়। উদ্বেগ কমে গেল, দৃষ্টিতে নেমে এলো নরম শীতলতা।
প্রিয়তা দৌড়ে এলো, তার বিকট বাহু জড়িয়ে ধরে উৎফুল্ল কণ্ঠে বলল,
“চলুন।”
“কোথায়?”
প্রিয়তা চোখে হাসলো।
প্রণয় প্রিয়তার পিছনে তাকিয়ে দেখলো, বাড়ির অন্য সকলে দাঁড়িয়ে আছেন।
প্রিয়তা প্রণয় কে টেনে এনে দাঁড় করালো ফুল-বেলুন দিয়ে সাজানো একটা গোলাকৃতির টেবিলের সামনে।
যার মধ্য ভাগে বড় একটা চকলেট কেক ফুলের পাপড়ির মধ্যে পরিপাটি করে সাজানো, যার উপর দুটো নাম্বার ক্যান্ডেল। প্রণয় এক পলক কেকের দিকে তাকিয়ে ফের প্রিয়তার দিকে তাকালো।
সে তো ভুলেই গেছিল, আজ ৩১ ডিসেম্বর তার জন্মদিন।
প্রিয়তা খুশিতে ডগমগো হয়ে বলল,
“সুন্দর হয়েছে না বলুন? আমি বানিয়েছি।”
বাচ্চা মেয়েটার উচ্ছাস দেখে হাসলো প্রণয়। প্রিয়তার ফুলো ফুলো গাল দুটো টেনে দিয়ে বলল,
“খুব সুন্দর।”
তন্ময় লোভাতুর চোখে কেকের দিকে তাকিয়ে তাড়াহুড়ো করে বলল,
“তাড়াতাড়ি কেকটা কাটো দাদান, আমার যে আর তর সইছে না।”
অরণ্য ওর চুচামি অবলোকন করে চুল টেনে বলল,
“মটু, সারাদিন জিম করার পরও তোর এই জন্যই মাসল হয় না।”
এর পর আসিস আমার এবস টাচ করতে তখন দিব ধরে।
তন্ময় ওর কথায় পাত্তা দিল না।
প্রিয়তা প্রণয় এর হাতটা তুলে নিজের নরম দুই হাতের মুঠোয় নিয়ে বলল,
“আপনার মাথায় হাত দিয়ে দোয়া করার যোগ্যতা আমার নেই, কিন্তু আমি আল্লাহর নিকট সব সময় আপনার জন্য দোয়া চাইবো।
আপনার জীবন সুখের হোক, আপনি হাজার বছর বেঁচে থাকুন, অনেক ভালো থাকুন, সব সময় হাসি খুশি থাকুন। আমরা যেন প্রতিবছর আপনার জন্মদিন ঠিক এভাবেই পালন করতে পারি।
আবার ভুল করে ও ভাববেন না যেন, এই দোয়া আমি আপনার জন্য করি। এই দোয়া আমি নিজের জন্য করি, নিজের সুখের জন্য করি। কারণ প্রণয় ভাই যতক্ষণ সুস্থ থাকবেন, প্রিয়তা ও ততক্ষণ ভালো থাকবে।”
প্রণয় মুগ্ধ হলো তার প্রেয়সীর কথায়।
প্রিয়তার মাথায় হাত রেখে সে ও আদুরে কণ্ঠে বলল,
“তোর প্রণয় ভাই ও তোকে কথা দিচ্ছে, তার নিশ্বাস না ফুরানো অব্দি সে তোর সাথে থাকবে, পাশে থাকবে, ভালবাসবে, আগলে রাখবে।”
ওপেন রোমান্স দেখে আপ্লুত হয়ে শিশ বাজিয়ে উঠলো অরণ্য। সাথে সাথেই সজোরে পেটে গুতা দিলো রাজ। দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
“তোর হাড়গোড় কি বেশি শক্ত হয়ে গেছে নাকি এই বুড়ো বয়সে বড় ভাইয়ের হাতে মার খাওয়ার সখ জেগেছে।”
“সহমত, আমার ভাই ভাবী রোমান্স করছে, ডিস্টার্ব করস কেন?” পাশ থেকে দাঁত কটমট করে বলে উঠলো প্রেম।
সমুদ্র নাক সিটকে চাপা কন্ঠে বলল,
“কে ভাবি? এই বাঁদরটা ছেহ। একে ভাবী ডাকতে আমার লজ্জা লাগবে লজ্জা। এর তো নাক টিপলেও দুধ বের হবে। তার উপর যে পরিমাণ বাচাল, আমাদের এমন সুদর্শন, সু ডিসিপ্লিন ভাইয়ের সাথে এমন ভাবী কোনোমতেই মানতে পারবো না।”
অরণ্য তাল মিলিয়ে বলল –
“সহমত,”
প্রেম ওর মাথায় গাট্টা মেরে বলল,
“আরেকটা বাজে কথা বললে একটা আছাড় দেবো তোকে। তুই জানিস, আমার ভাইয়ের কত সাধনার ফল এই বাচালটা।”
“কি ফুসুর ফুসুর করিস তোরা?” গম্ভীর কন্ঠে জানতে চাইলো প্রণয়।
বড় ভাইয়ের চোখ দেখেই চুপ মেরে গেল চার জন। প্রেম আমতা আমতা করে বললো,
“কিছু না, দাদান।”
কেক এর ওপর বসানো দুটো ৩ নম্বর ক্যান্ডেল থেকে একটা তুলে সরিয়ে দিল প্রিয়তা। সেই জায়গায় একটা ৪ নম্বর ক্যান্ডেল জ্বালিয়ে বসিয়ে দিল।
“আমাদের বড় দাদান আজ থেকে অফিসিয়ালি ৩৪ ইয়েএএ!” বলে পাশ থেকে চেঁচিয়ে উঠলো তন্ময়।
প্রিয়তা ছুরি এগিয়ে দিল।
প্রণয় সর্বপ্রথম কেকের টুকরোটা প্রিয়তার মুখে তুলে দিল। অতঃপর সবাইকে।
প্রিয়তা প্রফুল্ল মনে হাসছে। তার সেই মুক্তো ঝরা হাসির দিকে অপলক দৃষ্টি তে চেয়ে আছে প্রণয়।
ভালোবাসার মানুষটা হাসলে বুঝি এতোটা ভালো লাগে।
অরণ্য নিজের গলায় থাকা গিটারটা বড় ভাইয়ের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল,
“অনেক বছর তোমার গলায় গান শুনি না বড় দাদান। আজকের দিনে অন্তত না করো না।”
প্রিয়তাও চেপে ধরলো, পেটের দুই পাশে জড়িয়ে ধরে ঠোঁট উল্টাল,
“প্লিজ।”
হাসলো প্রণয়। তার নীল নয়না তার কাছে কিছু চেয়েছে আর সে দেয়নি। এমন দিন কি কখনো এসেছে?
অরণ্যের হাত থেকে গিটার নিয়ে তারের তালে সুর তুললো প্রণয়। প্রিয়তার মায়া ভরা মুখের দিকে তাকিয়ে আবেশিত কণ্ঠে গাইল,
“Khuda Jaane Mujh Mein Tu kya Dekhti Hai
Main Tujh Mein Khuda Ka Karam dekhta hoon Khushi Jab Bhi Teri”
হাসি, ঠাট্টায় রাত গভীর হলো। একে একে সকলে চলে গেলেন নিজ নিজ কক্ষে।
দাড়ি কমা ঠিক করে দিয়ে প্রণয় শান্তভাবে বলল,
“আজকের দিনটি জীবনের এক নতুন শুরু।”
কেবল সুসজ্জিত নিরিবিলি ছাদের এক কোণে একাকী দাঁড়িয়ে রইলো দুজন। কিছুক্ষণ বৃষ্টি খানিক দমলে ও আবারো পূর্ব আকাশে বিকট শব্দে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে, বিক্ষিপ্ত আলোক ছটায় দিনের আলোর ন্যায় উজ্জ্বল হয়ে উঠছে চারদিক। প্রকৃতিতে ঝড়ের পূর্বাভাস।
প্রণয় কোমল হাতটা টেনে বুকের সাথে চেপে ধরলো। চিকন নাকের ডগায় ঠোঁট চেপে চাপা কণ্ঠে হিসহিসিয়ে বললো,
“পাষাণী, তুই ছলনাময়ী। এতোটা বছর সব সত্যি জেনে ও আমাকে কষ্ট দিয়েছিস নিজের থেকে দূরে রেখেছিস। যন্ত্রণা দিয়ে মেরেছিস তিলে তিলে। হয়তো এখন আর তোর কিছু মনে নেই। কিন্তু তখন কেন আমায় সবটা বলে দিলি না?”
এমন আচানক কথা শুনে ভ্যাবাচেকা খেয়ে গেল প্রিয়তা। বোকা চোখে তাকালো,
“আমাকে কষ্ট দিয়ে মারতে খুব ভালো লাগে তোর তাই না?”
প্রিয়তা কথার আগামাথা কিছুই বুঝো না, অবুঝ গলায় বললো–
“এগুলো কি বলছেন প্রণয় ভাই আমি কখন আপনাকে কষ্ট দিলাম? আর কোন সত্যিটাই বা লুকালাম? বরং আপনি তো, আপনি তো সব জেনে শুনে আমাকে এতো কষ্ট দিয়েছেন। আপনাকে ভালোবাসি জেনে আরো বেশি অবহেলা করেছেন, আরেক মহিলার সাথে দিনের পর দিন, রাতের পর রাত থেকেছেন তাও আমাকে দেখিয়ে দেখিয়ে। তখন কতটা অসহায় লাগতো আমার জানেন?”
“হুম, জানি,” বলে চুল সরিয়ে প্রিয়তার দুই গালে হাত রাখলো প্রণয়। কপালে কপাল ঠেকিয়ে অসহনীয় কণ্ঠে বললো,
“তোকে কষ্ট দিয়েছি বলেই তুই নীরবে প্রতিশোধ নিয়েছিস, তাই না? অথচ তুই একবারও জানতে চাইলি না ঐ দিনগুলোতে তোকে কষ্ট পেতে দেখে আমার কেমন লেগেছিল।”
“আমি ভেবেছিলাম…”
প্রণয় দুই হাতে কোমর জড়িয়ে ধরল, আরো ঘনিষ্ঠতা বাড়িয়ে তুলে বলল,
“কী ভেবেছিলিস তুই?”
“যেটা আপনি দেখিয়েছিলেন…”
গলায় মুখ ডুবিয়ে দিল প্রণয়,
“আচ্ছা কি দেখিয়েছিলাম?”
আচানক স্পর্শে কেঁপে উঠলো প্রিয়তা। মনের মধ্যে সাজানো শব্দগুলো কন্ঠনালীতেই আটকা পড়লো।
প্রিয়তার সুভাষিত ত্বকে নাক ঘষতে ঘষতে বলল,
“বলনা কী দেখিয়ে ছিলাম?”
পুরনো দৃশ্যগুলো না চাইতেও মনের দেওয়ালে ভেসে উঠলো প্রিয়তার। না চাইতে ও চোখে পানিতে টলমল করে উঠলো আপনা আপনি।
প্রণয় না দেখেও বুঝতে পারছে। তার বোকা হরিণী যে তাকে অন্য কারো সাথে দেখতে পারেনা, এই ব্যাপারটা বেশ লাগে তার নিকট। ওষ্ঠ কোনে সূক্ষ্ম হাসির রেখা ফুটে উঠলো প্রণয়ের। ঠোঁটে এগিয়ে প্রিয়তার কানের লতি স্পর্শ করে ফিসফিসিয়ে বলল,
“তুই যা দেখেছিস, যা শুনেছিস, তার কোনটাই সত্যি নয়। আমি তুই ব্যতীত অন্য কোন নারীকে আমি আদর করিনি কখনো।”
প্রিয়তা তৎক্ষণাৎ চোখ তুলে তাকাল। তার দৃষ্টিতে বিস্ময়। কিছু বলতে নিলেই তার ঠোঁটে আঙ্গুল চেপে ধরল প্রণয়।
“একদম চুপ। কোন প্রশ্ন করবি না, শুধু জেনে রাখ! তুই আমার জীবনের প্রথম এবং শেষ নারী। এই আমি যদি কোন নারী দেহ স্পর্শ করে থাকি, তাহলে সেটা কেবলমাত্র তুই। যদি কারো ওষ্ঠ ভাঁজে নিজেকে হারিয়ে থাকি, সেটাও তুই। আমার কামনা লালসা চাহিদা সব কেবলমাত্র তোকে দেখলেই জেগে ওঠে। আদর করার জন্য হাত নিষফিষ করতে থাকে। আমাকে পুরোপুরি পাগল বানিয়ে রেখেছিস তুই।”
এমন লাগাম ছাড়া কথাবার্তায় প্রিয়তার সর্বকায়া শিরশিরে অনুভূতিতে ছেয়ে গেল। এই মানুষটার থেকে এ ধরনের কথাবার্তা শুনে সে অভ্যস্ত নয়। সে দুষ্টুমি করে অনেক কিছু বলে ঠিকই, কিন্তু এই মানুষটা যখন সিরিয়াস হয়ে যায়, পাগল পাগল চাহনি নিয়ে থাকায় তখন প্রাণ পাখি ফুরুত করে উড়ে যেতে চায়।
প্রণয়ের আরো কিছু সুপ্ত অনুভূতি প্রকাশ করাতে লজ্জায় কান গরম হয়ে গেল প্রিয়তার।
প্রণয় আল-গুছে শাড়ির ভেতর হাত গলিয়ে দিল। তুলতুলে নরম উদরে আঙ্গুল বুলাতে বুলাতে বলল,
“তোর ভাগ্যটা খুব ভালো জানিস। নাহলে এতো বছরে—”
“ক্ক-ক-কি?”
ঠোঁট কামড়ে হাসলো প্রণয়। প্রিয়তার ঘাড়ের কাছে মুখ নিয়ে গভীর হাস্কে টোনে বললো,
“আজ যেটা জেনেছি, সেটা যদি আরো ১৬ বছর আগে থেকে জানতাম, তাহলে এতো দিনে আমারও ঘর ভর্তি বাচ্চা কাচ্চা দৌড়া দৌড়ি করতো। ছোট ভাইদের বাচ্চা দেখে দীর্ঘশ্বাস ফেলতে হতো না।”
কথা বলার তালে তালে প্রণয়ের তপ্ত ঠোঁটের স্পর্শ লাগছে প্রিয়তার কোমল ত্বকে। বুকের ভেতর ধক ধক করছে প্রিয়তার নিঃশ্বাস ঘন হয়ে আসছে। মৃদু ছন্দে কাঁপছে তার তনু শরীর।
প্রণয় গভীর চোখে চাইলো ফুটন্ত গোলাপটার দিকে। আবছা আলো আবছা অন্ধকারে গ্লসি ঠোঁট দুটো ঝিলিক দিচ্ছে।
নিঃশ্বাস ভারী হয়ে এলো প্রণয়ের। বুকের ভেতরে পুনরায় সেই প্রলয়ংকরী ঝড় উঠলো। অজান্তে হাত চলে গেল ঠোঁটের উপর। খুব কাছ থেকে নাকে এসে ঠেকল স্ট্রবেরির হালকা একটা মিষ্টি গন্ধ।
মন বলে উঠল–
“এত নরম কিছুও কি হয়!” ঠোঁটের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে নেশা ধরে গেল প্রণয়ের। এগিয়ে গিয়ে ঠোঁটে ঠোঁট মিলিয়ে দিল।
জিভে হালকা স্ট্রবেরির স্বাদ লাগলো প্রণয়ের। কেঁপে ওঠে পুরুষালী বাহুতে, নখ দাবিয়ে দিল প্রিয়তা। তবে এই সামান্য ব্যথা প্রণয়ের অনুভূতিতে বিশেষ প্রভাব ফেলতে পারল না বরং আরো বেশি উন্মাদ হয়ে উঠলো সে।
প্রিয়তার এতো সৌন্দর্য, এতো মাধুর্য, এতো কোমলতা সহ্য হচ্ছে না তার। আসক্তি মাত্রা বাড়ছে হুহু করে। দেখলেই শুধু আদর আদর পায়। এতো মায়া লাগে কেন মেয়েটাকে? এতো জ্বালালে কি ঠিক থাকা যায়?
নরম হয়ে এলো প্রণয়। ঠোঁটের ভাজ থেকে ধীরে ঠোঁট সরিয়ে নিল। কোমল গালে ধীরে ধীরে বৃদ্ধাঙ্গুল স্লাইড করতে লাগলো। নীলাভ চোখে চোখ রেখে নেশাক্ত কণ্ঠে বলল,
“আমার কিন্তু নেশা বেড়ে যাচ্ছে জান। এত নরম কেন তুই? দিন দিন কি বালির বস্তা হচ্ছিস? যেখানে ধরতে যাই চার আঙ্গুল দেবে যায়? কেঁচো বা জুঁক ওতো এতো নরম নয়। কাল থেকে জিম করবি আমার সাথে। এক মাসের মধ্যে আমার সবকিছু শক্ত হওয়া চাই।”
চোখ পিটপিট করে পলক জাপটে তাকালো প্রিয়তা। এসব অদ্ভুত কথাবার্তা তার মাথার উপর দিয়ে যাচ্ছে।
প্রণয় ফের মাথা নাড়িয়ে বললো,
“আর হ্যাঁ, দিন দিন তুই এতো সুন্দর হয়ে যাচ্ছিস কেন? তোর এই সুন্দর্য আমাকে পাগল করে দেয়। কোথাও মন টিকাতে পারি না। সুতরাং আমার বউ এত সুন্দরী হওয়া চলবে না,?”
শাসাতে শাসাতে আবার হুট করে মুড চেঞ্জ হয়ে গেল প্রণয়ের!
ঘোর লাগা কণ্ঠে ডেকে উঠলো –
“বউ”
প্রণয়ের কণ্ঠে ঘোর মাদকতা, চোখ দুটোতে কামনার জোয়ার। ওর দ্রুত নিঃশ্বাসের ওঠা-নামা দেখে ভড়কে গেল প্রিয়তা।
প্রণয়ের কন্ঠে বউ ডাকটা বুকের কোথাও একটা ক্যাচ করে লেগে গেলো।
নিজেদের মধ্যে কার চুল পরিমাণ দূরত্বটুকুও যেন সহ্য হলো না প্রণয়ের। দূরত্ব ঘুচিয়ে একদম কাছে চলে এলে প্রিয়তার! শরীরে শরীর ঘেঁষে দাঁড়ালো — চুলের নিচ দিয়ে হাত এক ঢুকিয়ে উন্মুক্ত পিঠে রাখল, অন্য হাতটা এদিক সেদিক অবাধে বিচরণ করতে লাগলো।
পুরুষালি গভীর স্পর্শে প্রিয়তার শরীর থর থর করে কাপছে। চোখ বন্ধ করে খামচে ধরল প্রণয়ের শার্ট।
ওর অবস্থা দেখে ঠোঁট চেপে হাসলো প্রণয়। ধিমি আওয়াজে ডাকলো,
“জান পাখি!”
“জ-জ-জ্বী…”
দুষ্টু হাসলো প্রণয়। মখমলে ঘাড়ে হালকা বাইট করে শাসিয়ে বলল,
“এভাবে কাঁপছিস কেন? তোকে মারছি আমি? একদম কাঁপবি না বলে দিলাম। তোর কাঁপাকাঁপি দেখলে শরীর খারাপ লাগে আমার। সাধারণ মানুষ থেকে উন্মাদ বানিয়ে দেয়।”
প্রণয়ের পুরুষালি কণ্ঠে বিনাশের আভাস পেল প্রিয়তা। পুরুষটির কামুক চোখের নেশালো চাউনিতে তুষারের ন্যায় জমে গেল মেয়েটা।
সময় গড়ানোর সাথে সাথে আরও অধৈর্য হয়ে উঠল প্রণয়। তীব্র আফিমের নেশায় মুখ ডুবিয়ে দিল প্রিয়তার গ্রীবাদেশে। পুরুষের গভীর স্পর্শে পায়ের রক্ত চলকে মাথায় উঠে গেল প্রিয়তার। শরীরের চামড়ায় যেন আগুন লেগে গেল।
প্রণয় আচমকা কোমর চেপে ঘুরিয়ে হ্যাঁচকা টান দিল। সাথে সাথেই প্রিয়তার পিঠ আছড়ে পড়ল প্রণয়ের প্রশস্ত বুকে। মৃদু কেঁপে উঠল প্রিয়তা।
দমকা হাওয়ার দাপটে চুলগুলো উড়ে গিয়ে পড়ল প্রণয়ের মুখে। সাথে সাথে হুড়মুড় করে অনিন্দ্য সুবাসে নাসারন্ধ্র ভর্তি হয়ে গেল। ঘ্রাণে-গন্ধে উন্মাদ হয়ে উঠল প্রণয়। চরম আসক্তিতে নাক-মুখ ডুবিয়ে দিল উন্মুক্ত কেশগুচ্ছ।
লম্বা নিঃশ্বাসে ফুসফুসে ইনহেল করতে লাগল তার প্রিয় ড্রাগ। প্রাণঘাতী অনুভূতিতে বুকের বাঁ পাশ অবশ হয়ে আসছে তার। ক্রমেই কথা বলার ভাষা হারাচ্ছে। ঘন ঘন উত্তপ্ত নিঃশ্বাস এসে আছড়ে পড়ছে প্রিয়তার ঘাড়ে, কাঁধে, গলায়।
চোখ বন্ধ করে রেলিংয়ে হাত চেপে ধরল প্রিয়তা। কাঁধ ছাড়িয়ে ফর্সা পিঠে ঠোঁট বুলাতে বুলাতে ধীরে ধীরে অধৈর্য হয়ে উঠছে প্রণয়। প্রিয়তার বুকের ভেতর তোলপাড় চলছে।
কিসের যেন একটা সূক্ষ্ম ব্যথা হৃৎপিণ্ডে বিঁধছে, কিন্তু কিসের ব্যাথা বুঝতে পারছে না প্রিয়তা। কান্না পাচ্ছে ভীষণ। বারবার মনে হচ্ছে, এতো সুখ কি আদো তার কপালে সইবে?
এমন জ্বলন্ত স্পর্শে শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ খসে যাওয়ার উপক্রম প্রিয়তার।
বাহু চেপে ধরে ফের তাকে নিজের দিকে ঘুরাল প্রণয়। কানের নিচে হাত রেখে দু’গাল ধরে বলল—
“তোকে হারিয়ে ফেলে মরে গিয়েছিলাম আমি। তুই নামক সুখ পাখিটা আমার বুকের খাঁচা ভেঙে উড়াল দিয়েছিলি। কখনো ভাবিনি তুই আবার আমার বুকে ফিরে আসবি, তোকে আবার কখনোই বুকে পাবো, আবারও কখনো আদর সোহাগে জড়িয়ে নেব।”
বাক্যগুলো আওড়াতে কণ্ঠ কেঁপে উঠল প্রণয়ের। চোখ থেকে এক ফোঁটা তপ্ত অশ্রু গড়িয়ে পড়ল প্রিয়তার চকচকে গালে। প্রিয়তার অধরে কপাল ঠেকিয়ে প্রণয় ফের বলে উঠল—
“তুই আমার মরণের অসুখ জান, তুই আমার নেশা, আমার ড্রাগ। এই যে তুই আমার বুকের সাথে মিশে আছিস, আমি তোকে পাচ্ছি; এতে আমার বাঁচার ইচ্ছে বাড়ছে হুহু করে। জানিস, একসময় আমি নিজেই নিজের মৃত্যু কামনা করতাম, সুখ কে হারিয়ে কেই বা বাঁচতে চায় বল। আমার সব সুখের আধাঁর তুই।
কিন্তু এখন আর আমি মৃত্যু কামনা করি না। এখন আমি বাঁচতে চাই জান, তোকে নিয়ে বাঁচতে চাই, আরেকবার তোকে হারাতে চাই না। তোকে পাওয়ার যে বড়ো লোভ আমার, মরে গেলেই তো সব শেষ; তোকে আবারো আজন্মের মতো হারিয়ে ফেলব। চাইলে ও দেখতে পাবো না আমাকে হারাতে দিস না জান। আমাকে লুকিয়ে নে তোর মাঝে।”
প্রিয়তার নীলাভ চোখ অশ্রুতে ঝাপসা হয়ে এল। প্রণয়ের মায়া জড়ানো মুখটার দিকে তাকিয়ে অকারণেই ভীষণ কান্না পেল। কিন্তু কেন জানে না, প্রিয়তা দাঁত দিয়ে ঠোঁট চেপে নিঃশব্দে ফুঁপিঁয়ে উঠল।
ফুঁপানির শব্দ পেয়ে মৃদু হাসল প্রণয়। তার ময়না পাখি কাঁদছে। কিন্তু কি বুঝে কাঁদছে এই বোকা মেয়েটা? একে একলা ফেলে কবর ঘরে শান্তির ঘুম আসবে তো প্রণয়ের? আজরাইল ফেরেশতা যে সর্বক্ষণ তার আশেপাশে ঘুরঘুর করছেন, কখন কি হয়। আজ না হয় কাল মরতে তো তাকে হবেই, সেই ভবিতব্য কে ও সে সাদরে গ্রহণ করে নিয়েছে; কিন্তু বচ্চাটাকে এই নিষ্ঠুর পৃথিবীতে একা রেখে যেতে হবে ভাবলেই বুকে ব্যথা হয়। এই ছোট্ট সোনাটা যে তাকে ছাড়া কিছুই বোঝতে চায় না, হাতে পায়েই শুধু বড় হয়েছে; মানসিক বিকাশ নেই, ওর বোনের মতো হলেও চিন্তা ছিল না।
আচ্ছা, শেষবারের মতো তার জান পাখিকে ওরা বুকে নিতে দেবে তো? তার শেষ ইচ্ছাটা জানতে চাইবে তো? এসব ভেবেই বুক ভারি হয় প্রণয়ের।
দীর্ঘশ্বাস ফেলে পালকের ন্যায় নরম তুলতুলে শরীরটা টেনে বুকে মিশিয়ে নিল। শান্তি তো সব এখানেই।
পিঠ আঁকড়ে ধরে গুনগুনিয়ে কেঁদে উঠল প্রিয়তা। প্রশস্ত বুকে মুখ লুকিয়ে ভেজা কণ্ঠে বলল—
“আমার এতো কান্না কেন পাচ্ছে প্রণয় ভাই? মনটা কেন এতো কু গাইছে? সব তো ঠিকই আছে, তাহলে কেন মনে হচ্ছে কিছু ঠিক নেই?”
বুক চিরে পুনরায় দীর্ঘশ্বাস বের হয়ে এলো প্রণয়ের; নিজে থেকে আলাদা করে প্রিয়তাকে সামনে দাঁড় করাল। কেঁদে কুটে ফর্সা মুখটা একদম লাল টুকটুকে বানিয়ে ফেলেছে বাচ্চাটা। প্রণয় ব্যথিত হলো। এতো নরম মনের হলে কিভাবে হবে?
নীল সমুদ্র গড়িয়ে আসা অশ্রুকে মাটিতে লুটিয়ে পড়তে দিল না প্রণয়। পূর্বেই চিবুকে ওষ্ঠ চেপে ধরল, যত্ন করে শুষে নিল নোনা জলটুকু।
প্রিয়তা ফের হামলে পড়ল প্রণয়ের বুকে। পিঠ ধরে অসহায় কণ্ঠে বলল—
“আমাকে কখনো ছেড়ে যাবেন না প্রণয় ভাই, আপনাকে ছাড়া বড় অসহায় আমি। আপনি আমার জন্য কি সেটা হয়তো আপনি কোনদিনও বুঝবেন; শুধু এতোটুকুই বলবো—কষ্ট দিন তবু ও ছেড়ে যাবেন না।”
প্রণয়ের চোখের কোণে পানি চিকচিক করে উঠল, তবে ভরে ওঠার আগেই লুকিয়ে ফেলল। মসৃণ চুলে হাত বুলিয়ে আদুরে কণ্ঠে বলল—
“ইসসস! কাঁদে কেন বোকা মেয়ে? আমি তোকে ছেড়ে কোথায় যাব বল? আমি কি বাঁচতে পারবো তোকে ছাড়া? তুই তো আমার জান। তোকে বললাম না—মৃত্যু ব্যতিরেকে আমাদের কোনো বিচ্ছেদ নেই।”
প্রিয়তা প্রণয়ের বুকের উন্মুক্ত অংশে চুমু খেল। মিনমিনে গলায় বলল—
“আপনাকে খুব খুব ভালোবাসি প্রণয় ভাই।”
“সত্যি?”
“হুমমম, অনেক।”
“আচ্ছা তাই, তুই কিন্তু ছলনা করতে শিখে গেছিস।”
প্রিয়তা শার্টের উপরিভাগ থেকে আরও দুটো বোতাম খুলে দিল। চওড়া বক্ষে নাক-মুখ ঘষতে ঘষতে নেশাক্ত কণ্ঠে বলল—
“ছলনা তো আপনি করেন সব সময়। বারবার আদর করার লোভ দেখিয়েও দূরে সরে যান।”
প্রণয় ভ্রু কুঁচকে তাকাল মেয়েটার পল্টি মারা দেখে অবাক না হয় পারল না।
“আচ্ছা, তোকে আদর করি না? তাহলে একটু আগে ওগুলো কি করছিলাম?”
প্রিয়তা ঝরঝরে হাসলো, গলার দুই পাশে হাত রেখে উঁচু হয়ে চুমু দিল অ্যাডামস অ্যাপেলে। কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিসিয়ে বলল—
“ওগুলোকে আদর বলে নাকি? আমি আরও বেশি কিছু চাই। আমার প্রণয় ভাইকে চাই, পুরোটা চাই, সবটা চাই।”
ধীমি আওয়াজটা শুনে ভেতরের নিভে যাওয়া আগুনটা পুনরায় দপ করে জ্বলে উঠল প্রণয়ের। অবাধ্য অনুভূতিরা পুনরায় মাথা চাড়া দিয়ে উঠল। ঢোক গিলল প্রণয়।
প্রিয়তা ভ্রু নাচিয়ে বলল—
“আচ্ছা, সবাই আপনাকে কিছু না কিছু গিফট দিয়েছে। কই, আমার কাছে তো কিছু চাইলেন না?”
“আমি বাচ্চাদের কাছ থেকে গিফট নেই না।”
মুখ বাঁকাল প্রিয়তা। চাপা গলায় বিড়বিড় করে বলল—
“তোমাকে আমি হালি হালি বাচ্চা গিফট করে প্রমাণ করে দেব জান যে আমি বাচ্চা নই।”
প্রণয় ভ্রু বাঁকাল।
“কিছু বললি?”
কেঁপে উঠল প্রিয়তা। আমতা আমতা করে দাঁত কেলিয়ে বলল—
“এভাবে বললে কিভাবে হয়? সবাই গিফট দিয়েছে, আমি না দিলে খারাপ দেখায় না; আপনি আবার খুঁটা দিতে পারেন। এই তনয়া শিকদার প্রিয়তা খুঁটা শুনতে চায় না। আমার স্বামীর কী টাকা কম আছে যে আপনার থেকে খুঁটা শুনবো?”
“আচ্ছা, তোর স্বামী বিরাট বড়লোক; মাঝে মাঝে ১০–২০ টাকা তো আমাকে ও দিতে পারিস।”
“দেবো দেবো, গরিবদের দান করার মহোৎ শিক্ষা আমার স্বামী আমাকে দিয়েছে।”
“ভেরি গুড।”
“তাহলে শুনবেন না কি, গিফট দিব?”
“কি গিফট দিবি শুনি?”
প্রণয়ের কথা শুনে প্রিয়তার ওষ্ঠকোণে দুষ্টু হাসি খেলে গেল। সেটা বেশ ভালোই দেখতে পেল প্রণয়। ভ্রু নাচিয়ে সুধাল—
“কি সয়তানি চলে মনে?”
প্রণয়ের চোখে প্রশ্ন দেখে বাঁকা হাসল প্রিয়তা। রেলিংয়ের ওপর থেকে একটা পিঙ্ক রিবন বো নিয়ে নিজের গালে চিপকে দিল। বিস্ময়ে চোখ বড় বড় করে ফেলল প্রণয়। অজান্তেই মুখ হাঁ হয়ে এলো মেয়েটা, এতো পাকনা।
দৃষ্টি নামিয়ে নিল প্রিয়তা। লজ্জায় রাঙা হয়ে বলল—
“দ্যাটস ইয়োর গিফট।”
প্রণয় মুখ বন্ধ করে নিল। প্রিয়তার ওপর থেকে নিচ পর্যন্ত চোখ বুলিয়ে বলল—
“তুই আমার জিনিসই আমাকে গিফট করছিস? বলি, বাটপারিটা কি বাপের থেকে উত্তরাধিকারী সূত্রে পেয়েছিস?”
ঠেস শুনে লজ্জা গায়েব হয়ে গেল প্রিয়তার। মুখ তেতো হলো ভীষণ। বিরক্তি নিয়ে তাকাল প্রণয়ের মুখের দিকে।
“কি?!”
প্রিয়তার মন চাইল এক্ষুনি লোকটার গলা টিপে দিতে। প্রিয়তা আর কোনো কথা বলতে ইচ্ছা করল না। মুখ ঝামটা দিয়ে রুমে চলে গেল।
প্রিয়তাকে রেগেমেগে চলে যেতে দেখে ঠোঁট কামড়ে হাসল প্রণয়। হৃদয়হরণীর মনের সুপ্ত বাসনা সম্বন্ধে অবগত সে। তবে বোকা হরিণীকে যে রাগিয়ে দিতে বড্ড ভালো লাগে। কে জানি বলেছিল—সুন্দরীরা রেগে গেলে তাদের আরও বেশি সুন্দর লাগে। কথাটা মিথ্যে নয়।
বাঁ হাতে চুল ব্যাকব্রাশ করল প্রণয়। ধপাধপ পা ফেলে রুমে প্রবেশ করল প্রিয়তা। ঘরটা অদ্ভুত সুন্দরভাবে সাজানো। বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন, ঘরটা মোমের নরম হলদে আলোয় মায়াবী লাগছে। দমকা বাতাসের তালে তালে উড়ে যাচ্ছে সফেদ রঙের পর্দাগুলো, কেঁপে উঠছে কক্ষের প্রদীপের শিখা।
প্রিয়তা মুখ অন্ধকার করে গিয়ে সোফায় বসে পড়ল।
তার মন চাচ্ছে ঘরের সবকিছু এলোমেলো করে দিতে।
এই মানুষটা সব বুঝে ও কেন এমন অবুঝ সাজার ভান করে?
মনে মনে আবার ক্ষেপে গেল প্রিয়তা।
বিড়বিড় করে বলল,
“আপনি আদর না করলে না করবেন, এই প্রিয়তা কারো আদরের অপেক্ষায় বসে নেই।
সে নিজেই নিজের জন্য সাজবে।”
বসা থেকে উঠে পড়ল প্রিয়তা।
ফের ওয়ারড্রব থেকে একটা লাল টকটকে জামদানি শাড়ি বের করে পরে নিল।
লতানো চুলগুলো মাঝ বরাবর সিঁথি কেটে ছেড়ে রাখল।
ঠোঁটে লাল লিপস্টিক লাগিয়ে কানে বড় বড় স্বর্ণের ঝুমকা পরে নিল।
মাথায় ঘোমটা দিয়ে আয়নার দিকে তাকিয়ে দেখল—
একদম লাল পরী লাগছে।
নিজেই নিজেকে দেখে মুগ্ধ হলো প্রিয়তা।
তবে রাগটা এখনো নাকের ডগায় ঝুলছে।
মনে মনে গজগজ করতে করতে পেছনে ফিরতেই ধড়াম করে ধাক্কা খেল কারো প্রশস্ত বুকে।
চোখের সামনে প্রণয়কে দেখে রাগটা যেন এবার আকাশে উঠে গেল প্রিয়তার।
দাঁত কটমট করে কিছু বলার জন্য মুখ খুলতেই আচমকা হামলা হয়ে গেল তার নরম তুলতুলে ঠোঁট জোড়ায়।
আচমকা আক্রমণে ভড়কে গেল প্রিয়তা।
হাতে থাকা স্বর্ণের বালাটা ফস্কে পড়ে গেল মেঝেতে;
সাথে সাথে নিস্তব্ধ কক্ষে বিকট একটা ঝংকার তোলা শব্দ শোনা গেল।
তবে এতে বিশেষ প্রভাব পড়ল না প্রণয়ের উন্মাদনায়।
সে প্রিয়তাকে ঘুরিয়ে চেপে ধরল ড্রেসিং টেবিলের সাথে।
মত্ত হয়ে উঠল রমণীর ওষ্ঠের নেশায়।
কী ঘটছে তা বোঝার সময়টুকুও পেল না প্রিয়তা।
নিঃশ্বাস নেওয়ার তাগিদে সে ছটফটিয়ে উঠল।
দুই হাতে প্রণয়ের গলা ধরে ঘাড়ে নখ দাবিয়ে দিল।
পাল্টা আক্রমণে আরও বেশি তেতে উঠল প্রণয়।
এক হাত কোমরে রেখে অন্য হাত রাখল গলায়।
আয়েশী ভঙ্গিতে রয়ে-সয়ে শুষে নিতে থাকল প্রেম-সুধা।
প্রিয়তা আর না পেরে বুকে কিল-ঘুসি মারতে শুরু করল।
এবার হয়তো অক্সিজেনের অভাবে জ্ঞান হারাবে মেয়েটা।
বুঝতে পেরে ঠোঁটের ভাঁজ থেকে ঠোঁট সরিয়ে নিল প্রণয়।
সাথে সাথে মুখ হাঁ করে নিঃশ্বাস ফেলল প্রিয়তা।
চোখে পানি চলে এসেছে;
লিপস্টিক দেওয়া ঠোঁট দুটোতে হালকা ফোলা ফোলা ভাব রক্ত জমে গিয়ে মাত্রাতিরিক্ত রক্তিম দেখাচ্ছে।
প্রিয়তা প্রণয়ের বুকে হাত রেখে হাঁ করে নিঃশ্বাস ফেলছে।
প্রতিবার নিঃশ্বাসের সাথে হাফরের মতো ওঠানামা করছে প্রিয়তার আকর্ষণীয় বক্ষ বিভাজন।
এমন দৃশ্যে মাথা ঝিমঝিম করে উঠল প্রণয়ের।
নেশাক্ত দৃষ্টিতে অবলোকন করতে থাকল প্রিয়তার ক্রিয়াকলাপ।
আর সহ্য হলো না প্রণয়ের।
এক হাতের ধাক্কায় ড্রেসিং টেবিলের সব জিনিসপত্র ছড়িয়ে ফেলল মেঝেতে।
কিঞ্চিৎ পরিমাণ নিজেকে সামলে নেওয়ার সময়টুকুও পেল না প্রিয়তা,
তার পূর্বেই তাকে কোলে তুলে ড্রেসিং টেবিলের ওপর বসিয়ে দিল প্রণয়।
ঝড়ের বেগে মুখ ডুবিয়ে দিল প্রিয়তার গলায়।
অসংযত ঠোঁটের স্পর্শ আঁকতে লাগল সর্বাঙ্গে।
স্থির হয়ে বসতে পারছে না প্রিয়তা।
একেকটা সশব্দ চুম্বনে নিস্তব্ধ কক্ষ মুখরিত হচ্ছে।
টেবিল খামচে ধরে চোখ বন্ধ করে নিল প্রিয়তা;
ঠোঁট কাঁপছে থিরথির করে।
স্পর্শের তীব্রতা সহ্য করতে পারছে না সে,
শরীরটা যেন গলে পড়ছে।
প্রণয় মুখ তুলে দেখল প্রিয়তার চোখ-মুখের অভিব্যক্তি।
তার অগ্নিকন্যা তার মধ্যে গলে পড়ছে নিঃশব্দে।
ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসল প্রণয়।
প্রিয়তার তুলতুলে গালে নাক ঘষে নিচু স্বরে বলল,
“জন্মের পর থেকে আমাকে যতটা জ্বালিয়েছো,
তার সব হিসেব আমি পাই টু পাই নিব জান।
এক আনাও ছাড় দিব না।
তুমি পারবে তো আমায় সামলাতে?”
ভয়ে বুকের ভেতর খামচে উঠল প্রিয়তার।
চোখ মেলে তাকানোর সাহস পেল না।
প্রণয় আর কথা বলে সময় নষ্ট করার ধৈর্য পেল না।
হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল মেঝোতে।
এক পলক মুখের দিকে তাকিয়ে আলতো স্পর্শে চুমু খেল নরম ফর্সা পায়ের পাতায়।
মুচড়ে উঠে পা সরিয়ে নিতে চাইল প্রিয়তা—
এ কেমন সর্বনাশা খেলা!
প্রণয় ছাড়ল না।
পায়ের পাতায় অজস্র চুমু খেয়ে ধীরে ধীরে উপরে উঠে এলো।
চোখ খিঁচে বন্ধ করে নিল প্রিয়তা।
প্রণয় মুখ দিয়ে আস্তে করে পেটের ওপরের শাড়ি সরিয়ে দিল।
সাথে সাথেই উন্মুক্ত হয়ে এল ফর্সা, মেদহীন, আকর্ষণীয় উদর।
শিহরণে শরীর ছেয়ে গেল প্রিয়তার।
পা দিয়ে শক্ত করে টাইলস বসানো মেঝে চেপে ধরল।
নাভির কাছের বিউটি স্পটটা দেখে বুকের ভেতর লাভা নদী উথলে উঠল প্রণয়ের।
আরেকবার মুখ তুলে নেশাগ্রস্ত চোখে চাইল প্রিয়তার দিকে।
আজ সে তার মনের কথা শুনবে, ছুঁয়ে দেবে তার প্রিয় ফুলটাকে যতটা গভীরে ছুঁয়ে দিলে মনের আর কোনো অতৃপ্তি থাকে না।
প্রণয় দুই হাতে ঠেসে চেপে ধরল প্রিয়তার কোমর।
তার চোখ-মুখে তীব্র উন্মাদনা, তীব্র আসক্তি।
সে চরম আসক্তির তাড়নায় ঝড়ের বেগে নাক-মুখ ডুবিয়ে দিল প্রিয়তার ফর্সা উদরে।
তীব্র বৈদ্যুতিক ঝটকা খেল প্রিয়তা।
অদ্ভুত, অচেনা সব অনুভূতি শরীর জুড়ে বিচরণ করছে।
এই পুরুষের স্পর্শ সহ্য করার ক্ষমতা নেই তার একদম,আবার এই মুহূর্তে এই পুরুষের স্পর্শ না পেলে সে বাঁচবেও না—
এ কেমন বিষ!
পান করলেও মরণ, না করলেও মরণ!
প্রিয়তা অনুভূতির তাড়নায় কাবু হয়ে গেল এক মুহূর্তেই।
শক্ত করে খামচে ধরল প্রণয়ের চুল।
মুখ দিয়ে অস্ফুট স্বরে গুঙিয়ে উঠল।
প্রণয়ের চোখ-মুখ চেনাই যাচ্ছে না—
কী তীব্র নেশা চড়েছে তার!
সে বসা থেকে উঠে প্রিয়তাকে তুলে কোলে নিতে নিতে বলল,
“আজ দেখবো তুই কতটা আদর সহ্য করতে পারিস, কতটা যাতনা সইতে সক্ষম তোর এই ছোট্ট মাখনের শরীর। আমাকে তো পুরো পাগল বানিয়ে দিয়েছিস, এখন সামলা এই পাগলটাকে।”
সতর্কবাণী শুনে ভয়ে হৃৎপিণ্ড জমে গেল প্রিয়তার। প্রণয়ের বুকের শার্ট খামচে ধরে ভয়ার্ত চোখে তাকাল। প্রণয় ধীর পায়ে এগিয়ে গেল বিছানার দিকে। ফুলের পাপড়ি সরিয়ে শুইয়ে দিল আস্তে করে। চোখ বন্ধ করে রাখলো প্রিয়তা, কিন্তু অনেকক্ষণ পার হয়ে যাওয়ার পর ও কিছু অনুভব করতে পারল না
ভ্রু কুঁচকে গেলো প্রিয়তা চোখ খুলে দেখলো তার একদম মুখের উপর ঝুঁকে আছে প্রণয়।
চোখ দুটোতে সেই পাগল পাগল করা চাহুনি,
প্রিয়তা দৃষ্টি নামিয়ে নিলো।
চিবুকে হাত রাখলো প্রণয়, বাকা হেসে বলল–
” তর সইছে না বুঝি ”
লজ্জায় রক্তিম হয়ে উঠলো প্রিয়তা।
প্রণয় ফের লজ্জা দিতে বললো,
“ডু ইউ ওয়ান্ট মি মাই লাভ?”
লজ্জায় বিছানার চাদর খামচে ধরে চুপটি করে পড়ে রইল প্রিয়তার। কণ্ঠনালি দিয়ে একটা শব্দও বের করতে পারল না। প্রণয় কপালে ঠোঁট চেপে ধরে ঘোর লাগা কন্ঠে বলল,
” আনসার মি। নাহলে কিন্তু আমি চলে যাব।”
ভয় পেয়ে প্রণয়ের কোমর চেপে ধরল প্রিয়তা, অসহায় চোখে তাকাল। প্রণয় মসৃণ গালে শব্দ করে ভেজা চুমু আঁকল। মোলায়েম হতে ঠোঁট চেপে ধরে বলল,
“বলো।”
অসহনীয় লজ্জায় অতিষ্ঠ হয়ে উঠল প্রিয়তা। চোখ বন্ধ করে হ্যাঁ বোধক মাথা নাড়ল।
জবাব শুনে বোধহয় সন্তুষ্ট হলো না প্রণয়। দুই আঙুলে চেপে ধরল প্রিয়তার নরম ঠোঁট। হালকা ব্যথায় কুকিয়ে উঠল প্রিয়তা। প্রণয় মুখের কাছে মুখ নিয়ে চাপা রাগ দেখিয়ে বলল,
“মুখে বলতে বলেছি।”
এমন ধীরে ধীরে ছোঁয়াতে শরীর পুড়ে যাচ্ছে প্রিয়তার। না পেরে চোখ বন্ধ করে বলে উঠল, “হ্যাঁ হ্যাঁ আমি আপনাকে চাই প্রণয় ভাই, খুব খুব চাই। প্লিজ আমাকে আপনার করে নিন, আমি আর পারছি না।”
ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসল প্রণয়। বুকের ওপর থেকে আঁচলটা ফেলে দিল আস্তে করে। লজ্জায় চোখ নামিয়ে নিল প্রিয়তা। প্রণয় আঙুলের সাহায্যে গলা থেকে পেট পর্যন্ত সুড়সুড়ি দিচ্ছে। প্রিয়তা অতিষ্ঠ হয়ে উঠল। কাতর কণ্ঠে অনুনয় করে বলল, “প্লিজ প্রণয় ভাই।”
প্রণয় এক হাতে নিজের শার্টের বোতাম খুলতে খুলতে ভ্রু কুঁচকে বলল, “কি বললি?”
— “প্রণয় ভাই।”
— “আমি তোর ভাই লাগি? জীবন যৌবন আমার হাতে সঁপে দিয়ে ভাই ডাকছিস?”
— “ত-তাহলে কি ডাকব?”
প্রণয় শার্টটা টেনেটুনে খুলে ছুঁড়ে মারল বিছানার এক কোণে। প্রিয়তার হাতের উল্টো পিঠে চুমু দিয়ে স্বর্ণের বালা গুলো খুলতে খুলতে বলল, “তুই জানিস না কি ডাকবি?”
প্রিয়তা দুই পাশে না বোধক মাথা ঝাঁকাল। প্রণয় প্রিয়তার মধ্যে হারিয়ে যেতে যেতে ঘোর লাগা কন্ঠে বলল, “যা ইচ্ছা ডাক, শুধু নামের শেষে ভাই লাগাবি না। নাহলে এখন যেটা করছি এরপর আর কখনো ওটা করবো নাহ্।”
রাত বাড়তে থাকে। অতৃপ্ত দুটি কপোত-কপোতীর মধ্যে আজ আর কোনো দূরত্ব থাকে না—শারীরিক, মানসিক, আত্মিক সকল বাধা ছিন্ন করে হাজারো বাধাবিপত্তির শেষে অবশেষে এক হয় তারা। প্রণয় তার বহুল আকাঙ্ক্ষিত রক্তজবাকে অবশেষে আপন করে নেয়। বিচরণ করে তার দেহের প্রতিটি লোমে লোমে, আবেগের ঘূর্ণিতে।
মিলনের বিশেষ মুহূর্তে প্রিয়তার তনু শরীর বারবার কেঁপে ওঠে তার প্রেমিক পুরুষের গভীর স্পর্শে—কখনো আবেগে, কখনো ব্যথায়, কখনো সুখে, বা কখনো ভালোবাসায়। আজ কোনো নিয়ম নেই, কোনো সামাজিক বালাই নেই, নেই কোনো দূরত্ব নেই কোনো না নিষেধ—আজ শুধুই ভালোবাসার চরমতম উপলব্ধি।
দুটি মন, দুটি প্রাণ, দুটি আত্মা আজ এক বিন্দুতে মিলিত হলো। তারা একে অন্যের অস্তিত্বে পূর্ণতা খুঁজে পেলো—ভালোবাসায়, আবেগে, তীব্রতম আকাঙ্ক্ষায়।
সময়ের সাথে সাথে বদ্ধ ঘরের আবহাওয়া ভারী হয়ে উঠলো। কক্ষের চার দেয়ালে বাড়ি খেতে লাগল ভালোবাসাময় সুখমিশ্রিত সব মৃদু আর্তনাদ। কপোত-কপোতীর গভীরতম মিলনের সুখধ্বনি যেন মিশে গেল বাতাসে।
তবে প্রণয়ের সেই গভীর উন্মত্ততা বেশিক্ষণ সহ্য করতে পারল না প্রিয়তা। হঠাৎ করেই, গভীর আবেগে, ব্যথা বেদনায় সে দুহাতে মুঠো করে ধরল প্রণয়ের চুল। কান্নামিশ্রিত কাঁপা কণ্ঠে আর্তনাদ করে ফুঁপিয়ে উঠল— “খুব ব্যথা লাগছে প্রণয় ভাই।”
কিন্তু আজ আর প্রণয়ের কান পর্যন্ত পৌঁছালই না সেই ব্যাকুল কণ্ঠস্বর। সে চোখ বন্ধ করে প্রিয়তার কপালে গভীর চুম্বন এঁকে দিলো, অধৈর্য, অসহায় কণ্ঠে অজস্র ভালোবাসা মিশিয়ে আদর করে বলল— “আমার জান… আমার লক্ষ্মীসোনা…আমাকে কষ্ট দিও না পাখি।”
প্রিয়তা চুপ হয়ে গেল। আর কোনো প্রতিরোধ করল না। সে কোনো অবস্থাতেই প্রণয় ভাইকে এতটুকুও ব্যথা দিতে চায় না। প্রিয়তা ঠোঁট কামড়ে ধৈর্য ধরে নিদারুণ সব ব্যথা সহ্য করতে লাগলো। চোখের কোণায় জমে ওঠা নোনা অশ্রু অঝোর ধারায় গড়িয়ে পড়তে লাগলো নিজের মতো। যেন নিঃশব্দ এক ভালোবাসার নদী।
প্রণয়ের উন্মাদনা কমে না বরং সময়ের সাথে বেড়ে বেড়ে আরো তীব্র থেকে তীব্রতর হতে থাকে।
প্রণয় বুঝতে পারছে তার ছোট্ট জানটা কষ্ট পাচ্ছে। কিন্তু কী করবে সে সেও তো অসহায়
প্রণয় প্রিয়তার ক্ষতবিক্ষত ঠোঁটে আলতো করে চুমু খেল। আদুরে কণ্ঠে জানতে চাইলো,
“ব্যথা পাচ্ছো বাবুনি? কী করব বলো তুমি এত নরম এত আদুরে চেয়ে ও নিজেকে থামাতে পারিনা, দোষ তো তোমার?”
ব্যথায় সারা শরীর জর্জরিত তবুও শত কষ্টের মধ্যে হেসে ফেললো প্রিয়তা। প্রণয় ভ্রু কুঁচকে দুষ্টুমি করে বলল,
“তুই হাসছিস? তুই জানিস যেখানে যেখানে হাত দিচ্ছি ভেজা কাদামাটি মনে হচ্ছে। বড্ড আরাম লাগছে। আচ্ছা তুই কি কেঁচো?”
“উঁহু, প্রণয় ভাইয়ের বউ।”
“আবার ভাই ডাকছিস?”
“আমি নাম ধরে ডাকতে পারব না, অসম্ভব।”
“পিঠে দুই চার ঘা পড়লে ঠিকই পারবি।”
প্রিয়তা আর কিছু না বলে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল প্রণয়কে, যেন ছেড়ে দিলেই তার মানুষটা হারিয়ে যাবে বহুদূরে। হাসল প্রণয়। প্রিয়তার কানে কানে ফিসফিসিয়ে বলল,
“স্বামীর উপর সন্তুষ্ট তো জান? আরাম পেয়েছো?”
প্রিয়তা লজ্জায় প্রণয়ের বুকে মুখ লুকাল বুকে কিল মেরে বললো অসভ্য লোক। শব্দ করে হেসে উঠল প্রণয়।
প্রিয়তার সারা মুখে অজস্র টুকরো টুকরো চুমু খেয়ে এক চোখ টিপ দিয়ে বললো–
“This is the best birthday gift ever!”
প্রিয়তা লজ্জায় দুই হাতে মুখ ঢেকে ফেললো।
এই ব্যাটা কে সে আর কিছুতেই মুখ দেখাবে না।
তাদের ভালোবাসার রজনী যতই গভীর হতে থাকে, ততই তাদের ভালোবাসার গভীরতাও বৃদ্ধি পেতে থাকে। আর তাদের শরীরের নিচে অবহেলায় পিষ্ট হতে থাকে ভালোবাসার প্রতীক চিহ্ন লাল গোলাপের পাপড়িগুলো, যারা নিরবে সাক্ষী হয় দুজনের ভালোবাসার।
বিছানায় গা এলিয়ে একদৃষ্টিতে ল্যাপটপের দিকে তাকিয়ে আছে শুদ্ধ। চুলগুলো এলোমেলো, চোখ দুটো লাল—হয়তো বৃষ্টি ভেজার দরুন ভেতর ভেতর জ্বর এসেছে, হয়তো; তবে বাহিরটা দেখে খুব একটা কিছু বোঝা যায় না। ঘড়ির কাঁটায় তখন রাত দুটো, বাহিরে তুমুল ঝড়-বৃষ্টি।
শুদ্ধর প্রসস্ত বুকে লেপ্টে ঘুমিয়ে আছে প্রিয়স্মিতা। দু’হাতে শক্ত করে জড়িয়ে রেখেছে শুদ্ধর পিঠ। ছোট্ট একটা নিশ্বাস ফেলে ল্যাপটপ অফ করে দিল শুদ্ধ।
চোখ নামিয়ে এক পলক তাকালো প্রিয়স্মিতার পানে। দুটো মুখের মাঝে এতটুকুও অমিল নেই, কিন্তু তাদের ব্যবহার আর আচরণের অমিল আকাশ আর জমিনের।
ঠোঁটে তাচ্ছিল্য খেলে গেল শুদ্ধর। হঠাৎ করেই একটা প্রবাদ বাক্য মনে পড়ে গেল—
> “একই রকম যদিও দেখতে চিনি ও নুন, জিভে নিলেই বোঝা যায় ভিন্ন তাদের গুণ।”
শুদ্ধ দৃষ্টি ফিরিয়ে নিল। প্রিয়স্মিতার নিশ্বাসের গভীরতা আন্দাজ করে সে বুঝে নিল—এটাই সুযোগ।
আস্তে করে প্রিয়স্মিতার মাথা বুক থেকে সরিয়ে বালিশে রাখলো। নাকের কাছে আঙুল রেখে নিশ্চিত হলো, গভীর ঘুমে কি না।
অতঃপর কৌশলে নিজের কাজটা সেরে ফেললো। সাবধানে বালিশের নিচ থেকে তুলে নিল প্রিয়স্মিতার ফোন।
পাওয়ার বাটনে প্রেস করে দেখলো—নিউ প্যাটার্ন। নতুন লক দেখে অসহ্য লাগলো শুদ্ধর। বিরক্তিতে দুই ভাঁজ পড়লো ভ্রুদের মাঝবরাবর। তবে হার মেনে নেওয়ার পাত্র তো সে নয়। গত এক সপ্তাহে এই মেয়েটা কী খিচুড়ি পাকিয়েছে, সেটা তো তাকে জানতেই হবে।
শুদ্ধ ফোনটা নিয়ে বিছানা থেকে নেমে পড়লো। সাইড টেবিলের উপর থেকে নিজের ল্যাপটপ নিয়ে বসে পড়লো বারান্দায়।
বাহিরে তুমুল ঝড় বইছে, যেমন ঝড় বইছে শুদ্ধর মনে। মাথার মধ্যে কিলবিল করছে একের পর এক মাস্টার প্ল্যান। তাকে যে করেই হোক এই গেমে জিততেই হবে।
সে যদি এই গেমে ওদের নিকট পরাজিত হয় তবে হটাৎ একটা ঝড়ে এসে তছনছ করে দেবে তার স্বপ্নকুমারীর সুখের সুতোয় বোনা সকল সুখের স্বপ্ন।
কিন্তু শুদ্ধর তো তার জান থাকতে এমনটা হতে দেবে না, কারণ সে তার ভালোবাসা ব্যতীত পৃথিবীর কারো ভালোবাসারই পরোয়া করে না।
নিজের ভালোবাসাকে সুখী দেখতে সে সব কিছু করতে পারে, তার হাসির জন্য সে সর্বপ্রথম নিজের প্রাণটাই উৎসর্গ করেছে। তাহলে এরা আর এমন কী! সে তার ভালোবাসার সুখ কাউকে কেড়ে নিতে দেবে না, কাউকে না।
প্রয়োজনে শিকদার বাড়িকে শ্মশান বানিয়ে দেবে, তবুও—
শুদ্ধ হঠাৎ থামলো। বুকের ভেতর হুহু করে উঠলো, ঝড়ের দিকে তাকিয়ে বললো—
> “তোমাকে পাইনি—এই আফসোস হয়তো আমৃত্যু আমাকে ঘুমাতে দেবে না। কিন্তু তোমার ক্ষতিও আমি কাউকে করতে দেবো না। দেহের শেষ রক্তবিন্দুটাও লিখে দেবো তোমার নামে। আমি আমার ভালোবাসা হারালে ও তোমার ভালোবাসাকে আমি হারাতে দেবো না, সুইটহার্ট। ট্রাস্ট মি—তোমার অপরাধী স্বামীকে বাঁচাতে আমি সব করবো।”
কথাগুলো শেষ করে দ্রুত সিগারেট ধরলো শুদ্ধ। আজকে বুকটা একটু বেশি পুড়ছে। কারণটা হয়তো জানা শুদ্ধর, কিন্তু কী করার—ভাগ্য যার সাধ দেয় না।
শুদ্ধ সিগারেটে লম্বা টান দিয়ে ল্যাপটপ ওপেন করে পুনরায় সার্ভার হ্যাকিংয়ে লেগে পড়লো। তিন ঘণ্টার অক্লান্ত পরিশ্রমের পর অবশেষে সফল হলো ফোনের মাস্টার লক ব্রেক করতে।
সকাল সকাল ঘুমটা ভীষণ জাঁকিয়ে লেগেছে প্রিয়তার, কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে সে এপাশ থেকে ওপাশ ফিরতে পারছে না। নড়তে গেলেই তীব্র ব্যথায় কুঁকিয়ে উঠছে। হাত, পা, ঘাড়, কোমর, তলপেট—সবই অসহ্যকর ব্যথায় অবশ হয়ে আসছে, কিন্তু তবু চোখের ঘুম ছাড়াতেই পারছে না। কমফোর্টারের আড়ালে ঘাপটি মেরে পড়ে আছে শরীরে প্রণয়ের কাল রাতের সাদা শার্ট। ব্যথিত কাপড়ের কোনো সুতোও নেই, তবে বর্তমানে সে সবে ধ্যানে নেই প্রিয়তার। সে মুখ হা করে মরার মতো ঘুমাচ্ছে।
আহা, বেচারি, ঘুমাবে নাই বা কেন? ঘুমিয়েছেই তো মাত্র ঘণ্টা তিনেক, সারারাত ওমন তুমুল নির্যাতনের পর কার শরীরটা সায় দেয়। তবে তার এই সুখ শয্যা বেশিক্ষণ দীর্ঘ হতে দিল না প্রণয়।
কফি, জুস, স্যান্ডউইচসহ আরও কয়েক পদের নাস্তা ট্রেতে করে রেখে দিল সাইড টেবিলে। গ্লাসের ঝনঝন শব্দে ঘুমের মধ্যে বিরক্ত হলো প্রিয়তা। কপাল কুঁচকে আরও খানিক গুটিয়ে গেল।
প্রণয় নরম চোখে তাকালো তার ছোট্ট পুতুলটার দিকে। এক রাতে কেমন নেতিয়ে পড়েছে মেয়েটা! বারবার চোখের সামনে ভেসে উঠছে কাল রাতের সেই ক্রন্দনরত মুখখানা। তখন কোন কাকুতি মিনতি না শোনলে ও এখন বড্ড মায়া লাগছে। সে কি একটু বেশি বাড়াবাড়ি করে ফেলল তার জানটার সাথে? মনটা খানিক বিষন্ন হলো প্রণয়ের। নিজেই নিজেকে গালি দিয়ে বলল—
> “ছি, এত টুকু ও ধৈর্য নেই, কিন্তু এখন আর ভেবে কি লাভ? যা হওয়ার তো হয়েই গেছে।”
লম্বা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে বিছানায় পা ভাজ করে বসলো প্রণয়। দুই হাতে কমফোর্টার জড়িয়ে কোলে নিল নিজের ছোট্ট পুতুলটাকে। বুকের সাথে মিশিয়ে কানে কানে আস্তে করে ডাকলো—
> “জান পাখি, আমার ছোট্ট বাবু, আমার লক্ষ্মী সোনা, উঠবে না দেখো ১০ টা বাজে।”
প্রিয়তা নড়ে উঠে প্রণয় গলায় মুখ গুজে দিল। দুর্বল হাতে পিঠ আঁকড়ে ধরে ঘুমু কণ্ঠে বলল—
> “এত তাড়াতাড়ি ১০ বেজে গেল, আরেকটু ঘুমাই না, প্রণয় ভাই? আসুন, আপনি ও শুয়ে পড়ুন, আপনি কাছে থাকলে অনেক ভালো ঘুম হয়। আপনার বুকে মাথা রাখলে বুঝতেই পারি না আমি দুনিয়াতে আছি নাকি জান্নাতে। আপনার গায়ের গন্ধটা এত মিষ্টি কেন প্রণয় ভাই? আপনাকে একদম খেয়ে ফেলতে ইচ্ছে করে।”
প্রিয়তার সরল স্বীকারোক্তি শুনে ঠোঁটে উজ্জ্বল হাসি ফুটে উঠলো প্রণয়ের। মায়াবী মুখের ওপর পড়া লম্বা চুলগুলো দুই হাতে পেছনে ঠেলে দিয়ে বলল—
> “শরীরের অবস্থা তো নাজেহাল হয়ে গেছে, জান। কাল সারারাত খেয়ে ও মন ভরেনি? আচ্ছা, ব্যাপার না, পেট খালি রেখো, আজ রাতে আবার খাবে।”
এমন লাগাম ছাড়া কথা শুনে লজ্জায় কান গরম হয়ে উঠল প্রিয়তার। মাথার চুল টেনে ধরে প্রণয় এর—
> “অসভ্য লাগামহীন পুরুষ মানুষ মিথ্যা অপবাদ দিয়ে বদনাম করছেন, তাহলে সত্যি সত্যি চিবিয়ে খেয়ে নাম সার্থক করি।”
বাচ্চা বউয়ের অবুঝ পনাতে এবার শরীর দুলিয়ে হেসে উঠল প্রণয়। প্রিয়তার তুলতুলে গালে ঠেসে ঠেসে চুমু খেয়ে বলল—
> “আমার বোকা হরিণী। আমার সংক্ষিপ্ত জীবনে এত ভালোবাসা নিয়ে আসার জন্য তোমাকে অনেক ধন্যবাদ। আমার কাছে তুমি কি চাও, রক্তজবা?”
প্রথম বাক্যটা শুনেই মুখ মলিন হয়ে গেল প্রিয়তার। গালের হাসি মিলিয়ে গেল। সঙ্গে সঙ্গে নীলাভ চোখে এক সমুদ্র পানি জমা হলো। প্রণয়ের দুই গালে হাত রেখে নিরীহ কণ্ঠে বলল—
> “সংক্ষিপ্ত কেন?”
চুপ হয়ে গেল প্রণয়। সামান্য একটা কথায় তার প্রাণ পাখির চোখে পানি চলে এসেছে দেখে মনে মনে অনেকটা দুর্বল হয়ে পড়ল, তবে তা মুখে ফুটিয়ে তুলল না। প্রিয়তার নাকে নাক ঘষে দিয়ে বলল—
> “ওটা কথার কথা, তুমি বলো কি চাও আমার কাছে।”
> “শুধু তোমাকে।”
> “দুই যুগ আগে থেকে আমি তো তোরই ছিলাম, অন্য কি চাস?”
> “শুধু তোমাকে।”
> “আর কি চাস?”
> “শুধু তোমাকে।”
> “আর?”
> “শুধু তোমাকে।”
বলতে বলতে প্রণয় এর গলা জড়িয়ে ধরল প্রিয়তা। আর কথা না বাড়িয়ে দুই হাতে নিজের দুর্বলতাকে বুকে আগলে নিল প্রণয়। ছোট্ট শরীরটা সামান্য মাত্রার বেশি উত্তপ্ত, প্রণয় বুঝতে পারল হয়তো জ্বর আসছে।
দ্রুত প্রিয়তাকে ছাড়িয়ে বসা থেকে উঠে দাঁড়াল প্রণয়। ব্রাশে পেস্ট লাগিয়ে এনে দাঁত ব্রাশ করে দিল সযত্নে। প্রিয়তা ও চুপটি করে বসে রইল। প্রণয় ব্রাশ করিয়ে নিজের হাতে প্রিয়তার মুখে খাবার তুলে দিল।
প্রিয়তা স্যান্ডউইচে বিরাট একটা বাইট নিয়ে গাল ফুলিয়ে বলল—
> “আপনি এত সকাল সকাল গোসল করে সেজে গুজে কোথায় যাচ্ছেন?”
প্রণয় জুস এর গ্লাস মুখে তুলে দিয়ে বলল—
> “অফিসে যাব, একটু কাজ আছে।”
> “না গেলে হয় না,” মুখটা ইনোসেন্ট করে বলল প্রিয়তা।
> “না জান।”
> “আচ্ছা, তাড়াতাড়ি আসবেন।”
আচ্ছা বলে প্রিয়তার গালে পুনরায় একটা চুমু দিল প্রণয়। নাস্তা করিয়ে তিনটা ভিন্ন ওষুধের পাতা থেকে তিনটা পিল খুলে প্রিয়তার হাতে দিলো। পানির গ্লাস এগিয়ে দিয়ে বলল—
> “ঝটপট ওষুধগুলো খা।”
ওষুধ দেখা মাত্রই মুখ কুঁচকে নিল প্রিয়তা। নাক ছিটকে বলল—
> “ছিইই, আমি ওষুধ খাই না।”
বড় করে এক হতাশার নিঃশ্বাস ফেলল প্রণয়—
> “এই মেয়েটা বড়ই ঢঙি, ছোট থেকে ওষুধ খাওয়া নিয়ে হাড় মাস জ্বালিয়ে খেয়েছে তার। আর এখন ভালো হয়ে যাবে এটা আশা করাটাই মুর্খামি।”
প্রণয় ওষুধগুলো আবার নিজের হাতে নিয়ে নিল। পানির গ্লাস মুখের সামনে ধরে বলল—
> “হা কর।”
আচ্ছা ফ্যাসাদে পড়ে গেল প্রিয়তা।
মেডিসিন তিনটার দিকে তাকিয়ে বলল—
> “এতগুলো কিসের ঔষধ?”
প্রণয় একটা পিল মুখে দিয়ে পানি খাইয়ে বলল—
> “এটা গা ব্যথার, যাতে একটু পর আবার লাফালাফিতে নিয়মিত হতে পারিস।”
সূক্ষ্ম অপমানটা ধরতে পারল না প্রিয়তা। তাই ফের বলল—
> “আর ওই দুইটা?”
> “এটা জ্বরের আর এটা…”
এটা বলে থেমে গেল প্রণয়। চোখ ছোট ছোট করে তাকালো প্রিয়তার দিকে। প্রিয়তা আগ্রহ নিয়ে তাকিয়ে আছে। প্রণয় জবাব দিল না। মেডিসিনটা প্রিয়তার মুখে দিয়ে পানির গ্লাস ধরতেই ফোন বেজে উঠল।
প্রণয় স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে ভ্রু কুঁচকে নিল। প্রিয়তার হাতে পানির গ্লাসটা ধরিয়ে দিয়ে বলল—
> “এটা খা, আমি আসছি একটু।”
ফোন রিসিভ করে বারান্দার দিকে চলে গেল প্রণয়।
প্রণয় যেতেই মুখ থেকে ট্যাবলেটটা বের করে নিল প্রিয়তা।
> “এটা কিসের ওষুধ?”
না জেনে গিলে ফেলার মতো আবুল মাইয়া অন্তত তনয়া শিকদার প্রিয়তা নয়, তাই প্রিয়তার বিশ্বাস।
প্রিয়তা সাইড টেবিলে দেখল মেডিসিনের তিনটা পাতা রাখা, যার মধ্যে দুটো সে চিনে: একটা পেইনকিলার আর একটা নাপা। তাহলে অন্যটা কি? বেহাদ কৌতূহল জাগলো প্রিয়তার মনে।
বারান্দার দিকে উঁকি দিয়ে দেখল প্রণয় কার সাথে যেন খুবই সিরিয়াস মুখে কথা বলছে। প্রিয়তা ফটাফট ট্যাবলেটের পাতাটা তুলে দেখলো—একদম অন্যরকম, এটা আগে কখনো খেয়েছে বলে মনে পড়ে না।
মেডিসিনটার নামের জায়গায় দেখলো—
> “Alesse”
মনে মনে বলল, “এ্যাঁ, এটা আবার কোন নাম হলো?” কৌতূহল বশত গুগলে সার্চ দিলেই চোখ কপালে উঠে গেল প্রিয়তার। চোয়াল ফাক হয়ে মুখ হা হয়ে এলো—আপনা আপনি।
ফোন স্ক্রিনে স্পষ্ট জ্বলজ্বল করছে দুটো শব্দ—
> “বার্থ কন্ট্রোল বাই ওরাল কন্ট্রাসেপ্টিভ”
ব্যাপারটা বুঝা মাত্রই পিলটা ডাস্টবিনে ফেলে দিয়ে পানিটা খেয়ে নিল প্রিয়তা।
মিনিট পাঁচেকের মধ্যে ফিরে এল প্রণয়। হাতে অন্য পিলটা খাইয়ে দিয়ে বলল—
ভালোবাসার সীমানা পেরিয়ে পর্ব ৭৭ (২)
> “আগেরটা খেয়েছিস?”
লক্ষ্মী বাচ্চার মতো উপর-নিচ মাথা ঝাঁকাল প্রিয়তা।
> “ভেরি গুড।”
প্রিয়তা একটা নাদান মার্কা হাসি দিল।
প্রণয় তাকে কমফোর্টারে মুড়িয়ে কোলে তুলে ওয়াশরুমে ঢুকে পড়ল।
