মন পবনে বৃষ্টি পর্ব ১২
তাসনিয়া নুর
নিজের লুঙ্গি খুলে গেছে বুঝতে পেরে চিংলু দুদিকে হাত দিয়ে ঢেকে ফেলে । কিন্তু বেচারা বোধ হয় একটু বেশিই দেরি করে ফেলেছে। মাহির চিংলুর নিচের দিকে তাকিয়ে নাক মুখ কুঁচকে বলল,
— এহহহ কি ছোট আবার দেখো ডার্ক চকলেট ছেহহহ।
মাহিরের কথায় থতমত খেয়ে যায় চিংলু বাবা । আবইয়াজ আহির মুখ টিপে হেসে দেয় । চিংলুর সহযোগী হাকিম খ্যাক খ্যাক করে বলে উঠে,
— এই পোলা তোর উপর ঠাডা পরবো। তোর এতো বড় স্পর্ধা তুই চিংলু বাবারে এইসব কস ।
— তবে রে দাড়াঁ তুই আজকে তোর উপর ঠাডা, বজ্রপাত, আম গাছ, জাম গাছ সব ফলাবো আমি।
মাহির পাশে থাকা ফ্লাওয়ার বেজ নিয়ে হাকিম ও চিংলুর দিকে দৌড় দেয় । মাহিরকে এভাবে আসতে দেখে চিংলু দিলো লুঙ্গি ছাড়া ভূ দৌড়। তার পিছন পিছন হাকিম ও দৌড় দেয়। চিংলু হাকিম বের হয়ে যাওয়ার পর যেই মাহির ফ্লাওয়ার বেজ রাখতে যাবে সে মুহূর্তে মেহু উপর থেকে নিচে নেমে আসে। মেহুকে দেখে মাহির এক চিৎকার দিয়ে আবইয়াজের কোলে উঠে পড়ে । মাইরা চিত্রা দুজন গলা জরিয়ে চিৎকার করে উঠে। এদের চিৎকার চেঁচামেচিতে বিরক্ত হয়ে মেহু বলে উঠে,
— এই কি হয়েছে তোমাদের এভাবে ষাড়ের মতো চেঁচাচ্ছ কেনো?
মেহুকে স্বাভাবিকভাবে কথা বলতে দেখে আহির বলে উঠে,
— তোর মুখে এইসব কি?
মেহু নিজের কপাল চাপড়ে মাথা নেড়ে হতাশ কন্ঠে,
— তোমরা এতো ভিতু ছি ছি । আমিতো ফেস প্যাক লাগিয়েছিলাম । অনেক দিন ধরে দেইনা তাই দিলাম ।
— তাহলে চোখ লাল কেনো? আর ঠোঁটের এইসব কি?
আবইয়াজের প্রশ্নে মেহু খানিক হেসে বলল,
—. আরে এটা ও বোঝনা? ল্যান্স লাগিয়েছি আর ঠোঁটের পাশে একটু লিপস্টিক লাগিয়েছি । কি করব অনেক বোরিং ফিল হচ্ছিল তাই টাইম পাস করছিলাম।
— দাড়াঁ তোর টাইম পাস করাচ্ছি ।
মাহিরের রাখা ফ্লাওয়ার বেজটা নিয়ে চিত্রা মেহুর দিকে তেড়ে যায় । মেহু চিত্রার দিকে চোখ বড় করে তাকিয়ে বলে উঠে,
— মেহুরে নিজের প্রান বাঁচাতে চাইলে পালাআআ… ।
এদের দিকে তাকিয়ে আবইয়াজ বিড়বিড় করে আওড়ায়,
— এদের জন্য আরও এক রাত মার্ডার হলো আমার উউউ।
সকাল আটটা মির্জা বাড়ি নিস্তব্ধতায় মুড়িয়ে আছে । সবাই যার যার রুমে গভীর ঘুমে মগ্ন । ঠিক সে মুহূর্তে সকল নিস্তব্ধতা ভেদ করে কারো চিৎকার ভেসে আসে। হঠাৎ এতো জুড়ে চিৎকার এর শব্দে ঘুম থেকে ঠাস করে উঠে বসে আবইয়াজ, মাইরা । আবারো সে চিৎকারের শব্দ ভেসে আসতেই আবইয়াজ তরিগরি পায়ে যেদিক থেকে আওয়াজ ভেসে আসছে সেদিকে রওনা দেয়। পথি মধ্যে দেখা হয় মাহিরের সাথে যার নিচে টাওজার ও খালি গায়ে শাড়ির মতো তোয়ালে পেঁচানো । মাহির ভালোভাবে আবইয়াজকে পর্যবেক্ষণ করে আবইয়াজের পরনে টি-শার্ট ভেদ করে হাত বেরিয়ে আছে আর শার্টের হাতা বগলের নিচে পড়ে আছে ।
— চিৎকারটা চিত্রার রুম থেকে ভেসে এলো না?
আবইয়াজের প্রশ্নে মাহির ধীর স্বরে আওড়ালো,
— হ্যাঁ আমারো তাই মনে হচ্ছে ।
চিত্রার রুমে পৌঁছে মাহির ও আবইয়াজের চোখ কপালে। চিত্রা রিতিমতো বিছানায় গড়াগড়ি করে বিলাপ করছে,
— এ্য্যা এখন আমার কি হবে এ্য্যা আম্মু আমি শেষ আম্মু ।
গায়ে কারো ধাক্কা লাগতে মাহির পিছন ঘুরে তাকায় । মাইরা এসেছে তবে এর চুলের অবস্থা দেখে এই মুহূর্তে মনে হচ্ছে কাক তার বাসা তৈরি করে গিয়েছে । ঠোঁটের কাছে লালা ভরে আছে । মাহির নাক কুঁচকে মুখ ঘুরিয়ে নেয় । আবইয়াজ আরেকটু সামনে গিয়ে জিজ্ঞেস করে,
— কি হয়েছে? সাত সকালে নিজের ফাটা বাঁশ মার্কা গলা দিয়ে এভাবে চিল্লাচ্ছিস কেনো?
ভাইয়ের কন্ঠস্বর পেয়ে দৃষ্টি তুলে তাকায় চিত্রা। কিছু বলতে যাবে তার আগে উপস্থিত সকলের অবস্থা দেখে হা হয়ে রয় সে । এদের দেখে নিজের দুঃখ ভুলে গিয়েছে। চিত্রার নির্লিপ্ততা দেখে আবইয়াজ ধমক দিয়ে,
— এই মেয়ে কিছু বলছিস না কেনো?
চিত্রা বিরস মুখে ঠোঁট উল্টে বলে,
— আমার পিম্পল হয়েছে ।
আবইয়াজ চিত্রার সমস্ত মুখ পর্যবেক্ষণ করে বলে উঠে,
— কই আমিতো কিছু দেখতে পারছিনা। তোর পিম্পল তো দেখি মঙ্গলগ্রহের মামাতো ভাই যারে খালি চোখে দেখা যায় না। এই মাইরা যা তো আমার রুম থেকে দূরবীক্ষণটা নিয়ে আয় তাহলে যদি একটু দেখা যায় ।
চিত্রা রেগে একটা বালিশ আবইয়াজের মুখে ছোড়ে বলল,
— তুমি কি বুঝবা হয়েছে কখনো নিজের?
—- তোদের মতো পঁচা স্কিন না আমার বুজসোস। তাই সম্মান দিয়ে কথা বলবি ।
এদের কাহিনী দেখে মাহির বিড়বিড় করে বলে উঠে,
— কোন এক ঘরে জন্মইলাম শান্তিতে হাগতে ও দেয় না । সকাল সকাল গিয়েছিলাম বাথরুমে এদের জ্বালায় আর পারলাম কি? এদের সহ্য হয়না আমার শান্তি ।
মাহির ভেবেছিলো তার বিড়বিড় করে বলা কথা কেউ শুনতে পায়নি কিন্তু পাশে তাকিয়ে দেখে মাইরা নিজের নাক ধরে অপর হাত দিয়ে গন্ধ সরানোর মতো প্রয়াস করছে । মাহির তাকে ঘুষি দেওয়ার মতো হাত তুলে। মাইরা মুখ ভেংচি মেরে বাহিরে চলে যায় ।
বাড়ির কর্তা গিন্নিরা বাসায় ফিরে এসেছে । ঘরে ঢুকেই আনুয়ার সাহেব খেয়াল করলেন তার অতি পছন্দের ফ্লাওয়ার বেজটা ভেঙে নিচে পড়ে আছে। আনুয়ার সাহেব বড় তেজী কন্ঠে জানতে চাইলেন,
— আমার এত পছন্দের ফ্লাওয়ার বেজটা কে ভেঙেছে?
আবইয়াজ, আহির তখন সোফায় বসে মোবাইল স্ক্রোল করছিলো । কানে তেজী কন্ঠ ভেসে আসতেই আহির আস্তে করে জিভে কামড় দিয়ে,
— খাইচ্ছেড়ে শেষ আজকে সব শেষ ।
আবইয়াজ এবার নির্লিপ্ত কন্ঠে বলল,
— সকালে একটা টিকটিকিকে আশেপাশে ঘুরতে দেখেছিলাম হয়তো ওই টিকটিকি ফেলে দিয়েছে।
আনুয়ার সাহেব কঠিন চোখে ছেলেকে পরখ করে বললেন,
— একটা টিকটিকির দ্বারা এতো বড় জিনিস পড়ে ভেঙ্গে গিয়েছে এইটাও এখন আমাকে বিশ্বাস করতে হবে?
আনুয়ার সাহেবের কথায় হুট করে কেমন তেজস্বীতা দেখা গেলো আবইয়াজের মাঝে। সে প্রতিবাদি স্বরে,
— এই কথাটা আমি আপনার থেকে এক্সপেক্ট করিনি আব্বু । ছি আপনি এত বড় বৈষম্য কিভাবে করতে পারলেন? সে টিকটিকি হয়েছে তো কি হয়েছে? তাই বলে কি সে মানুষ না? তার শক্তি নেই?
আনুয়ার সাহেব ভ্রু কুঁচকে জানতে চাইলেন,
— টিকটিকি আবার মানুষ হয় কিভাবে? বেয়াদপ ছেলে ফাইজলামি করো আমার সাথে ।
আনুয়ার সাহেব স্ত্রী ফিরোজা বেগমের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করেন,
— এই নাটক বাজটাকে কোথা থেকে নিয়ে এসেছো তুমি?
— রশিদ মির্জার নাটকবাজ ছেলে আনুয়ার মির্জার কাছ থেকে এনেছি । বলি একটা ফুলদানি ভেঙেছে তার জন্য এতো হয়রানি করার কি আছে বাচ্চাদের?
স্ত্রীর কথায় থতমত খেয়ে যান আনুয়ার সাহেব । এই মহিলা একটা সুযোগ ছাড়ে না তাকে যব্দ করার । আনুয়ার সাহেবের থতমত খাওয়া চেহারা দেখে মুখ টিপে হেসে দেন সকলে । সাফিন মির্জা তার স্ত্রী মুন এর কানে ফিসফিস করে বলে উঠেন,
— বড় ভাইকে আর কেউ যব্দ করতে না পারলে ও আমাদের ভাবি এদিকে দিয়ে সেরা । ভাবির কাছে আমদের ভাইয়া মেউ । ( কথাটা বলে তিনি আবার হেসে উঠেন)
আনুয়ার সাহেব কথা না বাড়িয়ে নিজের ঘরের দিকে অগ্রসর হোন । আহির আবইয়াজের কানে কানে,
— এবারের যাত্রায় বেঁচে গেলাম ।
আবইয়াজ আহির পেটে গুতো মেরে বলে,
— বেঁচে গেসিছ না আমি বাঁচিয়ে দিয়েছি বল ।
মন পবনে বৃষ্টি পর্ব ১১
দুপুরে ডাইনিং টেবিলে বসে খাবার খাচ্ছে সকলে। খাওয়া মাঝখানে আনুয়ার সাহেব বাচ্চাদের উদ্দেশ্যে করে বলেন,
— তোমরা তো জানোই কালকে আমরা এক বন্ধুর মেয়ের বিয়েতে গিয়েছিলাম। সেখানে থাকা অবস্থায় আবইয়াজের মামা খলিল আমাকে কল দিয়ে জানিয়েছেন উনার বড় মেয়ে সাইবার বিয়ে সামনের আঠারো তারিখ । আমাদের পক্ষে যাওয়া সম্ভব না বিজনেস ফেলে তাই আমি চাচ্ছি তোমরা বাচ্চারা যাও। এমনিতে এখন তোমাদের ইউনিভার্সিটি অফ এই সময় না হয় একটু ঘুরে আসলে।
ঘুরতে যাওয়ার কথা শুনে চিত্রা, মাইরা, মেহু বেশ খুশি হয়েছে। তারা এক পায়ে রাজি যাওয়ার জন্য। চিত্রা তো শুনেই ভিষন খুশি সাইবা আপুর বিয়ে হচ্ছে । সাইবা চিত্রার পছন্দের একজন। সবাই খুশি হতে পারলে ও একমাত্র মাহির খুশি হতে পারলোনা…..
