Home মন পিঞ্জিরা মন পিঞ্জিরা পর্ব ৪+৫

মন পিঞ্জিরা পর্ব ৪+৫

মন পিঞ্জিরা পর্ব ৪+৫
শ্যামলী রহমান

বাতাসের মতো তীব্র বেগে কেটে গিয়েছে বেশ কয়েকটি দিন।আজ সোমবার।সকাল হতে দেওয়ান বাড়িতে জমজমাট আয়োজন। খাবারের গন্ধে ম ম করছে চারপাশ।দূর হতে গন্ধ পেয়ে বাড়ির আশে পাশে কুকুরের দল ঘুরঘুর করছে।মানুষের নাকেও সে ঘ্রাণ জিভে জল এনে দিচ্ছে।
প্রকৃতিতে গুমোট ভাব।একটুও বাতাস নেই।প্রচন্ড রোদ গরম।
উঁচু ডালে বসে কাক ডাকছে। জানান দিচ্ছে তার তৃষ্ণার্ত্বার। ঘরে বসে আছে।দুপুর থেকে সে ঘর থেকে বেরোয়নি।মূলত সে ইচ্ছে করে বেরোয়নি। মোহনিয়া বেগম ও রিতির মা ও বাড়ি গিয়েছেন সকাল হতেই। আজ শ্রাবনীকে দেখতে আসবে এবং বিয়ের পাঁকা কথা হবে।ছেলে পাশের গ্রামের নব নির্বাচিত চেয়ারম্যানের ছেলে।শউহরে থাকে,ভালো চাকরি করে।এজন্য সাহার দেওয়ান ও শামসের দেওয়ান সকলেই রাজি।মেয়ের বিয়ে দিতে হবে ভালো ঘর পেয়েছে তবে দেরি করে কি হবে।

মিথি যায়নি ও বাড়ি।সেখানে মেরিনা আছে তাকে দেখলে মুখশ্রী আঁধার করে রাখবে,কেউ না থাকলে কটু কথা শোনাবে।তার এসব ভালো লাগে না।মাঝে মধ্যে ভাবে মিথি, আমার অপরাধ কি ফুফুর মতো দেখতে হওয়া?’
“না ভালো লাগছে না।
বলেই মিথি ঘর থেকে বেরোলো। উঁকিঝুঁকি দিলো রিতির ঘরে। সেও নেই হয়তো ও বাড়ি গেছে।একঘেয়েমি বসে থেকে কোমরটা ছুটতে চাচ্ছে।উঠোনে বেরিয়ে গা আড়মোড়া দিলো।
“কি রে ছুড়ি বাড়িত একলা কি করিস?ওই বাড়িত যা।
সব্বাই ওখানে আছে।
আছিয়া বানুর কথা শুনে মিথি তাকালো। লাল টুকটুকে ঠোঁট খানা নড়াচ্ছে মুখে পান দিয়ে।ভাতের আগে তার পান চাই।ভাত না খেয়ে থাকলেও পান না খেয়ে থাকতে পারে না।মিথি আছিয়া বানুর প্রতিত্তোরে মুখ বাকিয়ে বলল,ও বাড়িতে নিশ্চয়ই মানুষে ভরপুর? আমার এতো মানুষ ভালো লাগে না। তুমি যাও গিয়ে পান খাও আর নতুন নাত জামাই দেখো।”

“ হ এর পরে তোরটা দেইখা মইরা যাইম।”
“বুড়ির সখ কত! আমারটা এখনি হইবো না।”
মিথির মুখ বাঁকানো কথায় আছিয়া বানু ঠোঁঠের কোনো হাঁসি
রাখলো।মাটিতে পানের পিক ফেলে বলল,
“সময় আইলে বুঝবি।পাত্র তৈরি আছে।খালি তোর পরীক্ষা টা হউক।”
আছিয়া বানু কথাটা বলেই আর থাকলো না।পান চিবোতে চিবোতে চলে গেলো। মিথি ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে রইলো দাদির দিকে।বুঝার চেষ্টা করলো,কি বলে গেলো বুড়ি?কে ঠিক করা আছে?
ধূর এসব ভাবার সময় নেই। ভালো লাগছে না।বলেই মিথি বাড়ি
থেকে বাহির হয়ে যায়।
দরজা পেরুতেই শুনতে পেলো ওই বাড়ি থেকে গোলমালের শব্দ আসছে।নিশ্চয়ই অনেক মানুষ এসেছে।মিথি অন্য পাশে যাওয়ার জন্য পা বাড়ালো।তখনই বাড়ির ছাঁদ থেকে নবনী তাকে ডাকলো, “মিথি এখানে আয়।

“না আপা ভালো লাগছে না পরে যাবো।”
বলেই হাঁটা ধরলো তার মন ভালো করার জায়গায়। যখন খুব মন খারাপ থাকে কিংবা কিছু ভালো লাগে না তখনই তার প্রিয় জায়গা পুকুর পাড়ে গিয়ে বসে থাকে। শান্ত জলের দিকে তাকিয়েথাকলেতার মন ভালো হয়ে যায়।জলে গোধূলি বেলায় ,সন্ধ্যা বেলায় পাখিরা দল বেধে নীড়ে ফিরে যায় এসবে তার আনন্দ হয়।
সোজা পুকুর পাড়ে গিয়ে মিথির পা থেমে যায়।সান বাঁধানো ঘাটে একজন বসে আছে।পরনে লুঙ্গি আর টিশার্ট।
মুখ দেখা যাচ্ছে না বিধায় চিনতে পারছে।এদিকে অচেনা পুরুষ আসবে না।হয়তো মিলন ভাই কিংবা পিয়াস ভাই হবে।এই ভেবে মিথি আরেকটু এগিয়ে গেলো। কারো পায়ের আওয়াজ শুনে প্রহর পিছনে তাকালো। মিথি সেখানেই থেমে গেলো।প্রহরের দৃষ্টি মিথচোখে পড়লো।
মনে মনে আওয়াড়লো, প্রহর ভাই এখানে?”
মিথি আর এলো না ঠাঁই দাঁড়িয়ে রইলো। প্রহর একঝলক পিছনে তাকিয়ে থেকে চোখ নামিয়ে নিলো।পুকুরের জল দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বলল,
“আয় বস।”

মিথি অনুমতি পেয়ে ধীর পায়ে এগিয়ে এলো।বসলো প্রহরের থেকে সামান্য দূরত্ব রেখে।প্রহর এবার পাশে তাকালো।মিথির নিরস মুখশ্রী নজরে পড়লো।মিথির দৃষ্টি তখন প্রহরের
পাশে রাখা একটা ডায়রি আর কলমের উপর।
শুনেছিলাম প্রহর ভাই কবিতা লিখে হয়তো তাই লিখছিলো।
এখন দুজনের দৃষ্টি পুকুরের পানিতে নিবন্ধ।মিথি কিছু বলার জন্য উসখুস করছে।প্রহর তার মুখপানে চেয়ে বুঝতে পারলো,কিছুক্ষণ নিরব থেকে জিজ্ঞেস করলো,
“কি বলবি?”
“আপনি নাকি সুন্দর কবিতা লিখেন?কই দেখি তো! ওই ডায়েরিতে লেখা আছে নিশ্চয়ই?”
মিথি ডায়েরিটা নেওয়ার জন্য হাত বাড়ালো। হাতের স্পর্শ পাওয়ার আগেই প্রহর ছোঁ মেরে নিজের হাতে নিলো। মিথি অবাক হলো এমন কান্ডে। সাথে লজ্জাও পেলো। অনুমতি না পেতেই নিতে চেয়েছিলো ভেবে। তখনই প্রহরের উত্তর আসলো,

“কবিতা লিখিনা।কিছু অনুভূতি লিখে রাখি,
কখনো কঠিন বাস্তব, কখনো প্রেম, কখনো বা অজানা ভবিষ্যৎ নিয়ে লিখি।কারো কাছে প্রেমের কবিতা, কারো কাছে বাস্তববাদী, আবার কারো কাছে বিরহের কবিতা মনে হয়।
আমার কাছে কেবল সবই মিছে মায়া মনে হয়।
দেখা যায়,ভালোবাসা যায় কিন্তু পাওয়া যায় না।
ঠিক যেমন শীতের কুয়াশা, ভোর হলে দেখা যায়,রৌদ্র নামলে মিলিয়ে যায়।”
মিথি হা হয়ে শুনলো। কি ব্যখ্যা! মনে মনে এ্যাঁও ভাবলো প্রহর ভাই কি তবে প্রেমে পড়লো?হয়তো!নয়তো বা প্রেম বিরহের কথা বলবে কেন?প্রেম যদি হয়ে থাকে তবে বিরহ কেন আসবে?কুয়াশার মতো মিলিয়ে কেন যায়?কেন পাওয়া হবে না?

এসব প্রশ্ন মনে মনে ভাবলেও দ্বিতীয় বার আর জিজ্ঞেস করে ভুল করবে না। ডায়েরি পড়তে দিলো না বলে মন খারাপ টা একটু জেঁকে বসলো।সে তো ব্যক্তিগত চিঠি পড়তে চায়নি,চেয়েছিলো কবিতা।
শার্লিন আপা বলেছিলো একদিন আর মাঝে মধ্যে আসলে দেখতো কি জানি লিখতো।
“মিথি এখানে কি করছিস?চাচি তোকে ডাকছে যা।”
পিয়াসের কথা শুনে মিথি সেদিকে তাকালো। প্রহর তাকালো না। তার দৃষ্টি পানিতেই নিবদ্ধ। মিথির ইচ্ছে না থাকা সত্বেও উঠে গেলে। রয়ে গেলো প্রহর আর পিয়াস। প্রহরের পাশে এসে দাঁড়ালো পিয়াস,বলল,
“বাড়িতে চল। দাদু খেতে ডাকছে আর মা তো খুঁজে বেড়াচ্ছে।”
“মামিমা কে গিয়ে বলিও আমি পরে খাবো।এতো মানুষ ভালো লাগে না। আর বিয়ে কি পাঁকা হলো?”
“হ্যাঁ সামনে শুক্রবার বিয়ে। এতো তাড়াতাড়ি সব কিভাবে আয়োজন হবে বুঝতে পারছে না কেউ। কিন্তু কিছু করার নেই পিছানো যাবে না। ছেলের ছুটি নেই। এক সপ্তাহের মধ্যে আবার শহরে চলে যাবে।”

“ওহ! ছেলের নাম যেন কি?”
“পাশের গ্রামের চিনিস তো। ওই যে আমাদের সিনিয়র ছিলো আসিফ।সেই পাত্র আগের চেয়ে সুন্দর হয়েছে দেখলাম। আগে কেমন রোগা-সোগা ছিলো।”
প্রহর হেঁসে উঠলো। প্রতিত্তোরে বলল,
“মানুষের টাকা মেরে খেলে পেটে চর্বি জমবেই।দেখতে সুন্দর আর হ্যানসাম হবেই।”
পিয়াস ঠিক বুঝলো না।তাই জিজ্ঞেস করলো,
“কার কথা বলছিস?”
“ চেয়ারম্যানের কথা।”

“ ওহ আচ্ছা। আজকাল কি আর যোগ্য প্রার্থী আছে? নাই। আজকাল টাকা দিয়ে ভোট কিনে নেওয়া হয়।যার টাকা বেশি সে জয়ী। সে টাকা ঠেলে হয়েছে এখন টাকা খাচ্ছে এতে তার থেকে সাধারণের দোষ বেশি। তারা টাকার লোভী। টাকা নিয়ে তাদের মতো মানুষ কে চেয়ারম্যান বানায়, পরে উপকার না পেলে সমালোচনা করে।
বইয়ের পাতায় সুনাগরিকের কথা পড়লেও,বাস্তবে কয়জন আছে সুনাগরিক?রাজনীতির কোনো নীতি থাকে না।যার নীতি থাকে সে জয়ী হতে পারে না।”
প্রহর ফিঁচেল হাঁসলো। পিয়াসের কথা গুলো ভুল নয়। যেমন কুকুর তেমন মুগুর। পিয়াস কে পিছন হতে মিলন ডাকলে সে চলে গেলো। প্রহর ডায়েরিটা হাতে নিলো। ডায়েরির গায়ে হাত বুলিয়ে নাআনমনে বলে ফেললো,
“ডায়েরির প্রতিটা ভাঁজে,শুধু তোমার নামই লেখা আছে।তীব্র ভালোবাসাময় অনুভূতি হয়ে,কখনো বা দূর আকাশের শুকতারা হয়ে,তুমি থাকো আমার হৃদয়ের সবটা জুড়ে।”

মিথি অলিন্দ নীড়ে শেষ বিকেলে যখন সবাই চলে গেলো,কোলাহল কমলো। মিথিকে শমসের দেওয়ান আর সায়েদা বানু বার বার বলেছেন যেতে।মোহনিয়া বেগম এসে রেগে বলল,
“বড়দের কথা শুনিস না কেন?এখন সবাই চলে গেছে এবার যা।”
মিথি উপায় না পেয়ে গেলো।
এতো আয়োজন খেতে ডাকছে।না গেলে শমসের দেওয়ান রাগ করবে।
মিথি গিয়ে বারান্দায় উঠতেই সামনে পড়লো মেরিনা। তাকে দেখেই যেন চোখ জ্বলে উঠলো,রাগে কিছু বলতে নিবে তখনই সেলিম উপস্থিত হলো। স্ত্রী ‘র দিকে তাকিয়ে বলল,
“ ওর উপর ক্ষোভ ঝেড়ে কি লাভ?দোষ তো আমার ভাগ্যের।আমিই ভালো নয় তাই শাস্তি পাচ্ছি। পরবর্তী থেকে যেন না দেখি ওকে কিছু বলছো।”

মেরিনা রাগান্বিত মুখখানা আঁধারে নিমজ্জিত হলো। ছলছল চোখে স্বামীর পানে চেয়ে রইলো। দৌঁড় দিলো সেখান থেকে। সেলিম মিথির সামনে আসলো, মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল,
“মিথি তোর পঁচা চাচ্চু কষ্ট দেওয়ার শাস্তি পাচ্ছে।
সে শাস্তিতে সে ধুঁকে ধুঁকে মরছে।”
মিথি চমকে উঠলো। ঠোক গিলে তাকালো। মাথা নিচু করে রাখলো।সেলিম চলে গেলো নিজ ঘরের দিকে।তিনি যেতেই মিথি চোখ তুললো।ভাবতে লাগলো, এ কথা ছোট চাচ্ছু কি করে জানলো? এ কথা তো ছোটবেলায় শুধু একজন কে-ই বলেছিলাম। তবে কি তিনি বলেছেন?

“আরেহ মিথি মনি। দাঁড়িয়ে আছিস কেন?”
মাকবুল বললো কথাটা। মিথির ছোট চাচা সে।
মিথি হেসে চললো তার চাচার সাথে। বাবার কাজ থাকাতে আসেনি এখনো।
শার্লিন নিজ ঘরে বসে পড়ছিলো। প্রহর দরজায় ঠোকা দিলো।শার্লিন ঘুরে তাকালো।প্রহর কে দেখেই বলল,
“ভাইয়া কিছু বলবেন?ভেতরে আসেন।”
প্রহর গিয়ে বসলো বিছানায়। শার্লিন চেয়ারে বসা।তার দিকে চেয়ে প্রশ্ন করলো,
“ পড়াশোনা কেমন চলছে?ঠিকঠাক?”
শার্লিন মাথা নাড়ালো।বলল,

“সব ঠিকঠাক চলছে। সামনে আর বেশি সময় নেই কয়মাস পর ফাইনাল পরীক্ষা।
“খালা মনি কবে আসবে?”
“কালই আসার কথা। আপনি এসেছেন শুনলে আগেই আসতো কিন্তু আম্না শোনোনি।
“আচ্ছা ঠিক আছে ভালো করে পড় বুঝলি। পরীক্ষায় যেন ভালো রেজাল্ট আসে।
শার্লিন আবারো মাথা নাড়ালো। প্রহর বেরিয়ে গেলো। শার্লিন তখন দরজার দিকে তাকালো দীর্ঘ শ্বাস ফেলে মনে মনে বলল,
“মানুষের সব থেকেও একা, মা বাবা না থাকলে পুরো পৃথিবী দেখায় তার বাস্তব খেলা।”

সন্ধ্যা হতেই মিথি আজ পড়তে বসেছে। পড়া যেন থামার নামই নিচ্ছে না। বিকেলে খেয়েছে বিধায় রাতে আর খাবে না বলে দিছে। আজ রিতিকে ওড়তে আসতে নেয়নি। সে আসলে গল্প বেশি হয় পড়া কম। মিথি অংক কষছে। কিন্তু একটা অংক সে কিছুতেই পারছে না। মানিক সাহেব সবে ফিরেছে। প্রথমে আসলেন মেয়ের ঘরে। টেবিলের পাশে খাটের ওপর বসলো। টেবিলের উপর রাখলো মিথির পছন্দের ঝালমুড়ি। পাশের বাজারে নামকরা এক ঝালমুড়ি ওয়ালা আছে কি যে মজাদার ঝালমুড়ি বানায়। তাই তো বাবাকে মাঝে মাঝে আনতে বলে। মিথি খুশি মনে খাবে ভাবো কিন্তু অংক পারছে না দেখে ঠোঁট উচালো।
মেয়ের ভাবমূর্তি দেখে মানিক সাহেব জিজ্ঞেস করলো,

“ কি হয়েছে আম্মা?
“এই অংকটা বুঝতে পারছি না।
মানিক সাহেব দেখলেন। তিনি ম্যাটিক পর্যন্ত পড়াশোনা করলেও এই অংক তাদের সময় ছিলো না। অপরিচিত অংক বিধায় পারলো না।
তাই বলল,“ খাওয়া শেষ করে ও বাড়ি গিয়ে পিয়াসের থেকে বুঝিয়ে নিয়ে আসিস।
মিথি মাথা ঝাকালো। তাই তো পিয়াস ভাই আছে আর আমি এতোক্ষণ চিন্তিত ছিলাম।
মানিক সাহেব মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে চলে গেলো।মিথি ঝালমুড়ি খেতে ব্যস্ত হয়ে পড়লো।
খেতে খেতে নানান চিন্তা মাথায় ভেতর জট পাকালো। মনে পড়লো প্রহর ভাইয়ের অজানা প্রেমিকার কথা। ওমন নিশ্চুপ মানুষ টাও কাউকে ভালোবাসতে পারে?অবশ্য ভালোবাসার অনুভূতি সবার মাঝে থাকে,কেউ প্রকাশ করে প্রেমে পড়ে, কেউ অপ্রকাশিত রেখে ধুঁকে ধুঁকে মরে।
মিথির খারাপ লাগলো কেন জানি। যার জীবন কষ্টে ভরা সে আবারো পাবে কষ্টের ফুয়ারা।

“ইসস যদি তারে চিনতাম তাহলে কিছু কারার চেষ্টা করতাম কিন্তু আমি তো চিনিনা।
মিথির খাওয়া শেষ হলো। খাতা আর অংক বইটা নিয়ে মোহনিয়া বেগম কে বলে বাড়ি থেকে বেরোলো।
“হাউ।
“আহহহ! মিথি ভয়ে চিৎকার করে ধড়ফড়িয়ে উঠলো। সামনে রুহেল দাঁড়িয়ে দাঁত বাহির করে হাসছে। মিথি রাগ হলো চোখ পাকিয়ে বলল,
“বেশি সম্মান দিয়ে ফেলছি? যা আজ থেকে তুই ডাকমু। বড় ভাইয়ের সম্মানের যোগ্য নয়। সারাদিন পিছে পড়ে থাকিস ভয় দেখাতে, আর কাজে ব্যেগড়া দিতে।
রুহেল মাথার চুলগুলো হাত দিয়ে নেড়ে ভাব নিয়ে বলল,
“তোর থেকে সম্মান চাই না। তোর বান্ধবী কে চাই।
তার সাথে একটু খাতির জমিয়ে দিস।
মিথি চোখ ছোট করে তাকালো। মনে করলো সেদিন স্কুলে যাওয়ার সময়ে বলা কথা। তার মানে এই ব্যাপার?

“আমার ঠেকা পড়ছে তোমার মতো ছেঁচড়ের সাথে আমার বন্ধবী’কে দিবো। ওর পিছে তোমার চেয়ে ভালো ছেলে ঘোরে।
“ আরে দে প্লিজ। আমার সাথে প্রেম করাই দিতে পারলে তোরই লাভ! ভাই দুলাভাই একসাথে পাবি,বান্ধবী কে কাছেও পাবি।
মিথির দেরি হচ্ছে সে চলে গেলো উত্তর না দিয়ে।
রুহেল হতাশ হলো।মাটিতে আঁধ বাসা হয়ে মাথায় হাত দিয়ে বলল,
“সালার কপালে না আছে প্রেম,না আছে বিয়ে,
আছে কেবল আম্মার গালি আর ঝাঁটার বারি।”
মিথি সোজা পিয়াসের ঘরের সামনে গেলো। কিন্তু ঘরে কেউ নেই। আসার সময় দেখলো সবাই আন্দন ঘরে। মিথি উপর থেকে পা বাড়ালো নিচে আসতে। নামতেই সায়েদা বানুর সঙ্গে দেখা। তিনি মিথিকে দেখেই অভিমানী হয়ে বলল,

“কি রে ছুঁড়ি এখন দেখি তোরে পাওয়াই যায় না। কই থাকিস?এদিক মাড়াস না কেন?প্রহর আইছে বলে?সে তো নিজেও তোর মতো লুকিয়ে থাকে একলা ঘরে,দোরে। তোর দাদু তোরে ডেকেও পায় না।
“না,না দাদি তেমন নয়। কাল অনেক মানুষ আসছিলো এজন্য আসিনি। এতো মানুষের ভীড় ভালো লাগে না।
“শশুড় বাড়ি গেলে তো ফাঁকা পাবি না। তোরে এমন ভরা সংসারে বিয়ে দিমু।কেমনে পালাস দেখমু।
“মিথি খাতা হাতে দাঁড়িয়ে কেন?’
সুচরিতা বেগমের কথা শুনে বলল,
“বড় আম্মা তোমার কাছেই যাচ্ছিলাম। পিয়াস ভাই কোথায়?
“কেন?কোনো দরকার? সে তো কি জানি কাজে তার বাবার সাথে বাহিরে গেলো।
মিথির মন খারাপ হলো। যা এসে কি লাভ হলো?
“একটা অংক বুঝছিলাম না সেটাই বুঝে নিতে এসেছিলাম।
“প্রহর আছে তো ওর কাছে যা। ও অংকে অনেক ভালো পিয়াসের থেকেও বেশি মার্ক পেতো।
সুচরিতা বেগম আবার রান্না ঘরে চলে গেলো।মিথি দাঁড়িয়ে রইলো যাবে?নাকি যাবে না এই চিন্তায়।
সায়েদা বানু পিছন থেকে বলল,

“প্রহর তোর দাদুর গানের ঘরে আছে যা অংক শিখে আয়।
মিথি ধীরে ধীরে সিঁড়ি বেয়ে এগিয়ে গেলো। গানের ঘরটা উপরে হলেও দাদা দাদির শোয়ার ঘর নিচে।সায়েদা বানু তার ঘরে গেলো।
মিথি গান ঘরের কাছে যেতেই পা জোড়া থেমে গেলো। পর্দার আড়ালে দাঁড়িয়ে রইলো। প্রহর ভাই গান গাইবে বলছে। দাদু জোর করছে,
“গাঁ একটা গান। তোর আম্মা কত ভালে গান গাইতো। কিন্তু…
এতটুকু বলতেই চোখে মুখে আঁধার নেমে আসলো।
প্রহর মেঝের দিকে নজর রেখেই গাইতে শুরু করলো,
পূর্ণিমা সন্ধ্যায়,তোমার রজনীগন্ধায়
রূপসাগরে পাড়ের পানে উদাসী মন ধায়,
তোমার প্রজাতির পাখা,
আমার আকাশ চাওয়া মুগ্ধ
চোখের রঙিন স্বপন মাখা,
তোমার চাঁদের আলোয়…
মিলায় আমার দুঃখ-সুখের অবসান।

প্রহর কয়েক লাইন গেয়েই থেমে গেলো। চোখ তুলে তাকাতে গিয়ে দেখতে পেলো শ্যাম বর্ণের এক জোড়া পা।পর্দার আড়াল লুকিয়ে থাকা জনকে দেখতে না পেলেও পা দেখে চিনতে অসুবিধা হলো না। শমসের দেওয়ান গান শুনে বাহবা দিলো,“চমৎকার গেয়েছিস। একদম মুগ্ধ হয়ে গেলাম।তোর মায়ের মতো মিথির ও কন্ঠ।ওর মধ্যে আমি আমার পরমার ছাঁয়া দেখি, তাই তো এতো ভালোবাসি। প্রহর শুনে হাঁসলো বললো না কিছুই।
আড়াল থেকে মিথিও শুনলো সাথে খুশিও হলো।
প্রহর উঠে দাঁড়ালো মিথি আড়াল থেকে পালানোর আগেই প্রহর তার সামনে দাঁড়ালো।মিথি সটান হয়ে দাঁড়ালো আমতাআমতা করে বলল,

“ওই আপনার কাছে বড় মা পাঠালো।আমি আঁড়ি পাতিনি।
প্রহর পকেটে হাত রেখে ভ্রু কুঁচকে তাকালো, বলল,
“আমি কি জিজ্ঞেস করেছি বা বলেছি আঁড়ি পাতছিস? চোরের মন পুলিশ পুলিশ বিষয়টা এমন হয়ে গেলো না।
মিথি চুপ করে রইলো। প্রহর হাতে খাতা কলম দেখে জিজ্ঞেস করলো,
“ হাতে খাতা কলম কেন? কি বুঝতে এসেছিস?”
“একটা অংক বুঝছিলাম না। আব্বা পিয়াস ভাইয়ের কাছে আসতে বললো কিন্তু পিয়াস ভাই বাড়িতে নেই তাই বড় মা আপনার কাছে আসতে বললো।
প্রহর তাচ্ছিল্যের হাঁসলো। সে হাঁসির কারণ অবশ্য রহস্যময়। পা চালিয়ে যেতে যেতে বলল,
“ঘরে আয়।

মিথি ও পিছনে পিছনে পা বাড়ালো। যেতে যেতে মিথি হুট করে বলল,
“প্রহর ভাই আপনি কিন্তু সুন্দর গান গাইতে পারেন।আমি বাহির থেকে শুনেছি। গানটা আমার ভীষণ প্রিয় কিন্তু এখন তো বসন্ত নয়।বর্ষার রাতে বসন্তের গান গাইছেন যে?”
প্রহর থেমে গেলো। আশে পাশে চোখ বুলিয়ে তার দিকে না তাকিয়ে উত্তর দিলো,
“কেন বর্ষায় কি বসন্তের গান গাওয়া যাবে না?গানের জন্য কি নিদিষ্ট কালের অপেক্ষায় থাকতে হবে?
একটু থেমে আবারো বলল,

মন পিঞ্জিরা পর্ব ৩

“আমার জীবনে বসন্ত আর বর্ষার মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই।
“কেন?”
প্রহর পা চালালো। মিথির জানার আকাঙ্ক্ষা দেখে মুঁচকি হাসলো। প্রতিত্তোরে বলল,
“সবার জীবনে বসন্ত রঙিন হয়ে আসলেও,আমার জীবনে বসন্ত আসে কেবল ঝরা পাতার মৌসুম নিয়ে।”
প্রহর তার ঘরের ভেতরে চলে গেলো। থমকে দাঁড়িয়ে রইলো কেবল মিথি। প্রহর ভাইয়ের হুটহাট এমন কথার অর্থ সে বোঝেনা। ঝরা পাতার মৌসুম বলতে কি বোঝালো?তার জীবনে রঙিন কিছুই নেই?”

মন পিঞ্জিরা পর্ব ৬