মহামায়া পর্ব ২৭
তুশকন্যা
“তার চেয়েও বড় কথা, তোর লজ্জা পাবার মতো আছেই বা কি?”
আনায়া বলার মতো কিছু খুঁজে পাচ্ছে না। সারাক্ষণ ভিভান ভাই ভাই করলেও, এই মূহুর্তে ইচ্ছে করছে এখান থেকে দৌড়ে পালাতে। ভিভিয়ান কিছুক্ষণ স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার সামনে এইটুকু মেয়েটা যেভাবে গুটিসুটি মেরে লজ্জা পাচ্ছে, তা দেখে রাগ হওয়া তো দূর, উল্টো তার হাসি পেল। তবে নিজের গুরুগম্ভীর ইমেজ বজায় রেখে সে একটা শুকনো কাশি দিয়ে বলল,
”শোন তারা, তোকে আমি ছোটবেলায় কয়েকবার ন্যাপি পরিয়েছি, অথচ তুই এখন লজ্জা দেখাচ্ছিস? চুপচাপ বোস এখানে। আমি বরং…”
ভিভিয়ান আর কথা না বাড়িয়ে আনায়াকে বাথটাব থেকে তুলে দাঁড় করাল। আনায়া তখনো মাথা নিচু করে নিজের ফ্রকের হাতা কামড়াচ্ছে। ভিভিয়ান অত্যন্ত সাবধানে আলতো হাতে তার নোংরা ফ্রকটা খুলে সরিয়ে দিল। একটা সাদা তোয়ালে দিয়ে তাকে পেঁচিয়ে দেয়। অচিরেই আনায়ার সব লজ্জা আর আড়ষ্টতা যেন কর্পূরের মতো উড়ে গেল।
পানির ঝাপটা গায়ে লাগতেই আনায়া তার ছোট্ট দুই হাত দিয়ে পানি ছিটিয়ে ভিভিয়ানকে ভিজিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে। ভিভিয়ান ভ্রু কুঁচকে বলল,
“হেই! শান্ত হয়ে বোস। আমি ভিজে গেলে কিন্তু তোকে এই সাবান মাখানো অবস্থাতেই ফেলে রেখে চলে যাব।”
আনায়া ফিক করে হেসে ফেলল। ভিভিয়ান বেবি সোপ নিয়ে আনায়ার পিঠে আর পেটে মাখাতে শুরু করল। ছোট ছোট নরম হাতে সাবানের ফেনা হতেই আনায়া দুই হাত ভরে ফেনা তুলে নিয়ে ভিভিয়ানের গালে আর হালকা খোঁচা খোঁচা দাড়িওয়ালা চিবুকে মেখে দিল।
ভিভিয়ান তাকে শ্যাম্পু করাতে ব্যস্ত ছিল। হঠাৎ আনায়ার এহেন সব চঞ্চলতায়, তার কপালে ভাজ পড়ল। সে আঙুলের ডগায় একদলা ফেনা নিয়ে আনায়ার মাথায় বিশাল উঁচু আকারের একটা পাহাড় সরূপ আকৃতি বানিয়ে বলল,
“এই নে, এবার তোকে একদম ওই সার্কের মতো লাগছে!”
আনায়া মাথাটা কাত করে, আয়নায় নিজের ফেনা মাখা মাথাটা দেখে হাসতে হাসতে বাথটাবের পানিতে পা ছুড়তে লাগল। পানির ছিটেফোটায় ভিভিয়ানের গা অর্ধেকের বেশি ভিজে গেছে, কিন্তু সে আজ অসীম এক ধৈর্য নিয়ে বসে আছে। সে ধীরে ধীরে আলতো করে আনায়ার চুলে শ্যাম্পু করে দিল। আনায়া চোখ শক্ত করে বন্ধ করে আওড়াল,
—“বাইয়া! চোক তো জলে!”
—“চুপচাপ বসে থাক, আমি আছি,একদম চোখ খুলবি না।”
ভিভিয়ান নিজের হাতের তালু দিয়ে আনায়ার কপালটা আড়াল করে ধরল যাতে পানি চোখের ভেতরে না যায়। অত্যন্ত যত্নে আর নিখুঁতভাবে সে আনায়ার চুলগুলো ধুয়ে দিল। গোসল শেষে বড় একটা তোয়ালে দিয়ে আনায়াকে জড়িয়ে ধরে সে কোলে তুলে নিল। মাথাটাও আরেকটি তোয়ালে দিয়ে পেঁচিয়ে দিল। সবমিলিয়ে তোয়ালের ভেতর থেকে কেবল আনায়ার গোলগাল মুখটা দেখা যাচ্ছে—একদম সদ্য ফোটানো কোনো পদ্মফুলের মতো।
ভিভিয়ান তাকে বাথরুমের কাউন্টার টপে বসিয়ে দিল। আনায়া তার ভেজা গা দেখে বলল,
—“বাইয়া, তুমিও তো ভিজে গেসো! একন তোমাকে কে গুসল করিয়ে দিবে?”
ভিভিয়ান শুকনো একটা হাসি হেসে বলল,
“আমাকে কেউ করিয়ে দেবে না, আমি একাই পারব। তুই চুপচাপ বসে থাক, আমি পাঁচ মিনিটে আসছি।”
ভিভিয়ান আনায়াকে রেখে পাশেই শাওয়ার নিশে চলে গেল। ঝাপ্সা গ্লাসের আড়ালে ভিভিয়ানের নিন্মের অংশটুকু একদমই দেখা না গেলেও, পেছন পাশ হতে তার ভিজতে থাকা উন্মুক্ত পিঠ তখন আনায়ার সামনে সম্পূর্ণ দৃশ্যমান।
আনায়া দূর হতে আনমনে কি যেন ভাবতে লাগল। যদিও উল্টো ফিরে নিজের মতো গোসল করতে ব্যস্ত ভিভিয়ানের বিশেষ কোনো অংশই গ্লাসের কারণে স্পষ্ট নয়। কিন্তু আনায়া তার সকল ভাবনাচিন্তা শেষে, হঠাৎ বিড়বিড়িয়ে আওড়াল,
“আ…তার মানে গুসল করার সময় সব্বাই নিনটু হয়ে যায়। বাইয়াও নিনটু হয়ে গেলো, হি হি।”
এ যেন আনায়ার আড়াই বছরের এই দীর্ঘ জীবনে উন্মোচন করা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জাগতিক এক রহস্য। যা উপলব্ধি করতে পেরে, আনায়া বিশ্বজয়ের হাসি হাসল।
এদিকে ভিভিয়ানের গোসল শেষ হতেই, সে একটা সাদা তোয়ালে পেঁচানো অর্ধনগ্ন রূপে আনায়ার দিকে এগিয়ে এলো। আনায়ার পাশেই দাড়িয়ে আয়নার দিকে চেয়ে, নিজের চুলগুলো তোয়ালে দিয়ে মুছতে লাগল। ভিভিয়ানের হাবভাব সম্পূর্ণ নির্লিপ্ত, পুরো দৃষ্টি আয়নায় কেবল নিজের দিকে নিবদ্ধ।
অন্যদিকে তার পাশেই কাউন্টারের উপর বসে থাকা আনায়া, চোখ পিটপিট করে তাকে দেখছে। কত বড় একটা মানুষ, অথচ সে কত ছোট। তবুও তার এই ভিভান ভাইয়াকেই ভালো লাগে।
ভিভিয়ান নিজের চুলগুলো কোনোমতে মুছে নিয়ে আনায়ার দিকে ফিরল। আনায়ার সামনে উন্মোচন হলো ভিভিয়ানের প্রশস্ত উন্মুক্ত বুক। যাতে লেপ্টে আছে সহস্র জলকণা। আনায়া চোখ পিটপিট করে তাকে একনাগাড়ে পরখ করতে লাগল। তবে হুট করে তার নজর আঁটকে গেলো, দুটো বিশেষ অংশে। ফর্সা বক্ষদেশে গাঢ় বাদামী ও হালকা গোলাপী বর্ণের সংমিশ্রণে দুটো ক্ষুদ্রাঙ্গ। কিন্তু এই দুটো আবার কি জিনিস? তা আনায়ার বোধগম্য নয়। সে দ্রুত নিজের দিকে মুখ নামিয়ে তাকাল। গা-টা ভিভিয়ান তোয়ালে দিয়ে ভালোমতো পেঁচিয়ে দিয়েছে বিধায়, যা খুঁজছিল তা আর দেখতে পেলো না।
আনায়ার এই ভাবনাচিন্তার অবসান না হতেই, ভিভিয়ান আনায়ার মাথা থেকে তোয়ালেটা খুলে ফেলল। তৎক্ষনাৎ আনায়া নড়েচড়ে বসল।
গুরুগম্ভীর ভঙ্গিতে আনায়ার চুলগুলো মুছে দিতে দিতে ভিভিয়ান আওড়াল,
“মাঝেমধ্যে তোর কি হয়,একটু বলবি?
আনায়া জবাব দেওয়ার মতো কিছু খুঁজে পায় না। সে চুপটি করে বসে থাকে। ভিভিয়ান হেয়ার ড্রায়ার দিয়ে তার চুলগুলো উল্টেপাল্টে দ্রুত শুকিয়ে দেয়। অতঃপর নিজের চুলগুলো শুকিয়ে আনায়াকে কোলে করে নিয়ে ঘরে চলে এলো। আনায়াকে বিছানায় বসিয়ে দিয়ে, নিজে ক্লোজেট থেকে কাপড়চোপড় বের করে পুনরায় ওয়াশরুমে গেল। খানিকক্ষণ বাদেই কালো টিশার্ট-প্যান্ট পড়ে রুমে এসে দেখল, আনায়া চুপচাপ তার বিছানাতেই বসে আছে।
—” তুই চুপচাপ বসে থাক, আমি এক্ষুনি ছোট মা’কে বলে তোর জন্য ড্রেস নিয়ে আসছি।”
এই রুমে আনায়ার কোনো জামাকাপড় নেই বিধায়,সে নিজেই তা আনার জন্য রুম হতে বেরিয়ে পড়ল। কিছুক্ষণ পর খুজে খুঁজে একটা লাল রঙের গাউন ও দুটি রাবার ব্যন্ড নিয়ে রুমে এলো।
আনায়াকে জামাটা পড়িয়ে দিয়ে,তাকে ড্রেসিং টেবিলের সামনে টুলে দাঁড় করিয়ে দিল। আয়নায় নিজেকে দেখে নিয়ে আনায়া বলল,
“বাইয়া আমাকে ছুন্দর দেকাচ্ছে?”
ভিভিয়ান আনমনে আওড়াল,
“হু, আস্ত একটা চেরির মতো লাগছে।”
—“ছুদু চেরি?”
—“উঁহু, চেরি ব্লা”স্ট!”
আনায়া তার গুরুগম্ভীর প্রশংসাতেও খুশিতে মুখিয়ে উঠল।
এদিকে ভিভিয়ান তার মাথার চুলগুলো ঠিকঠাক মতো চিরুনী করে,তাতে বেশ কসরত করে তালগাছের ন্যায় দুটি ঝুঁটি বেঁধে দিয়ে সব প্রস্তুতি শেষ করল। অতঃপর শেষ মূহুর্তে ইচ্ছেমতো দুজনে পারফিউম মেখে, বাড়ি হতে বেরোনোর উদ্দেশ্যে নিচে চলে গেল।
ভিভিয়ান ঘর থেকে বেরোনোর সময় সতর্কতার সাথে ফ্রিজ থেকে কেকটা বের করে বাইকের পেছনে সেট করে নিল। বাড়ির মানুষজন নিজের কাজে ব্যস্ত,তাদের দিকে নজর দেওয়া মতো সেরকম কেউ নেই।
বাইকে বসে নিজের সামনে ফুয়েল ট্যাঙ্কের ওপর আনায়াকে বসিয়ে দিয়ে ভিভিয়ান বাইক স্টার্ট দিল;মেয়েটার আনন্দ তখন আর ধরে না। সে উত্তেজনায় পা দুলিয়ে নড়াচড়া শুরু করতেই ভিভিয়ান ভ্রু কুঁচকে ধমকের সুরে বলল,
”তারা! একদম নড়বি না।”
আনায়া মুহূর্তেই সোজা হয়ে বসল, তবে তার মুখের সেই চওড়া হাসিটা মিলিয়ে গেল না। সে বিড়বিড় করে নিজের মনেই আওড়াতে লাগল,
“বাইয়ার বউ দেকতে যাবো, মুজা মুজা কেক খাবো!”
পার্কে পৌঁছানোর আগে ভিভিয়ান রাস্তার ধারের এক পরিচিত ফুলের দোকানের সামনে বাইক থামাল। মাওরার জন্য অন্তত এক তোড়া তাজা রক্ত গোলাপ না নিলে জন্মদিনের উপহারটা অপূর্ণ থেকে যায়। ভিভিয়ান দোকানির সাথে দরদাম করে বেছে বেছে সতেজ গোলাপগুলো এককাট্টা করছিল। আনায়া তখন দোকানের এক কোণে রাখা ছোট ছোট মাটির টবগুলোর দিকে এগিয়ে গেল।
সেখানে একটি ছোট্ট বেলি ফুলের চারায় কয়েকটা সাদা পাপড়ির বেলি ফুটে আছে। আনায়া সেদিকে মুখ এগিয়ে নিয়ে বারবার লম্বা শ্বাস টেনে ঘ্রাণ শুঁকতে লাগল। তার চোখমুখ এক অদ্ভুত খুশিতে উজ্জীবিত হয়ে উঠল, যেন পৃথিবীর সব শ্রেষ্ঠ ঘ্রাণ সে এই ছোট গাছটাতেই খুঁজে পেয়েছে।
কেনাকাটা শেষ করে ভিভিয়ান পেছনের দিকে না তাকিয়েই ডাক দিল,
“তারা, চল দেরি হয়ে যাচ্ছে!”
কোনো সাড়া না পেয়ে সে ঘাড় ফিরিয়ে দেখল, আনায়া বেলি ফুলের গাছের সাথে প্রায় কথা বলা শুরু করে দিয়েছে। ভিভিয়ান ভ্রুকুটি করে নিজের সহজাত গুরুগম্ভীর স্বরে জানতে চাইল,
“তারা, ওখানে কী করছিস? চল এবার, আমাদের দেরি হয়ে যাচ্ছে!”
আনায়া টলটলে চোখে উচ্ছ্বসিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে, আঙুল উঁচিয়ে গাছটা দেখিয়ে বলল,
“বাইয়া, এতা অনেক ছুন্দর, অন্নেক বাছ-না, উমমম। চলো না এতা কিনে নিয়ে যাই। চেরি গাসের সাথে বাগানে নাগিয়ে দেবো।”
ভিভিয়ান এক মুহূর্ত ভাবল। আজ দিনটাই হয়তো পাগলামির। সে আর কথা না বাড়িয়ে দোকানিকে বেলি ফুলের গাছটা ভালোমতো কাগজ আর পলিথিন দিয়ে প্যাক করে দিতে বলল। প্যাক করা গাছটা বাইকের একপাশে সযত্নে ঝুলিয়ে দিয়ে সে পুনরায় স্টার্ট দিল।
সম্মূখে আনায়ার উচ্ছ্বসিত মুখ, পেছনে চকোলেট কেক আর এক তোড়া রক্ত গোলাপ—ভিভিয়ান এবার দ্রুতগতিতে সোজা পার্কের উদ্দেশ্যে রওনা হলো।
পার্কের এক নির্জন প্রান্তে কৃষ্ণচূড়া গাছের নিচে মাওরা অধীর চিত্তে অপেক্ষা করছিল। তার পরনে ছিল লাল রঙের একটি সুতি সালোয়ার কামিজ, যা ভিভিয়ানের কথামতোই সে আজ পড়ে এসেছে। ভিভিয়ান পৌঁছাতে কিছুটা দেরি করায় তার মনে এক ধরনের অজানা সংশয় দানা বাঁধছিল। ঠিক তখনই বাইকের পরিচিত আওয়াজ শুনে সে চোখ তুলে তাকাল এবং যা দেখল, তাতে বেশ অবাকই হলো সে।
বাইক থামিয়ে ভিভিয়ান হেলমেট খুলল। মাওরা খেয়াল করে দেখল বাইকের সামনে লাল রঙের গাউন পরা এক পুতুলের মতো বাচ্চা মেয়ে বসে আছে। ভিভিয়ান অত্যন্ত নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে আনায়াকে কোলে করে নামাল,
মাওরা কয়েক পা এগিয়ে এসে অস্ফুট স্বরে বলল,
“ভিভিয়ান! এটা কে?”
ভিভিয়ান তার সেই চিরচেনা গম্ভীর্য বজায় রেখে সংক্ষেপে বলল,
“মাই ব্লা’ড—মিস চেরি ব্লা’স্ট।”
মাওরা ভ্রু কুটি করে শুধালো,
“মানে?”
ভিভিয়ান ক্ষীণ হেসে নিরেট স্বরে বলে,
“ছোট মায়ের বিচ্ছু এটা, নাম আনায়া এহসান। কিন্তু আমি ওকে তারা বলেই ডাকি। কখনো বা ব্লাড, কখনো না চেরি ব্লাস্ট, ছুঁচোমি করলে ছুঁচো কাঠবিড়ালী,আর ভালো হয়ে থাকলে লিটিল র্যাবিত!”
মাওরা তার কথায় হেসে ফেলল। আনায়া তখন মাওরার দিকে বড় বড় চোখ করে তাকিয়ে ছিল। মাওরা মন্ত্রমুগ্ধের মতো নিচু হয়ে আনায়ার মুখোমুখি বসল। সে আগে কখনো এই ছোট্ট মেয়েটিকে দেখেনি, কিন্তু তার চেহারার সারল্য মুহূর্তে মাওরার মন জয় করে নিল। মাওরা মিষ্টি হেসে বলল,
“হ্যালো বাটারফ্লাই! তুমি এত সুন্দর কেন?”
আনায়া লজ্জা পেয়ে ভিভিয়ানের প্যান্ট আঁকড়ে ধরল, কিন্তু তার কৌতূহলী মন দমে থাকল না। সে ভিভিয়ানের দিকে ইশারা করে মাওরাকে জিজ্ঞেস করল,
“তুমিই কি বাইয়ার সেই বউ?তুমিও অনেক ছুন্দর।”
মাওরা মুহূর্তেই লজ্জায় আর বিস্ময়ে লাল হয়ে গেল। সে মুখ তুলে ভিভিয়ানের দিকে তাকাল। ভিভিয়ান একটা হালকা কাশি দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করল। সে বাইকের পেছন থেকে গোলাপের তোড়াটা নিয়ে এলো।
মাওরার হাতে গোলাপের তোড়াটা ধরিয়ে দিয়ে ভিভিয়ান বলল,
“হ্যাপি বার্থডে মাওরা।”
ভিভিয়ান থেমে আবারও আওড়াল,
“উইশটা বোধহয় রাতেই করা উচিত ছিল, কিন্তু বিচ্ছুটার জন্য সম্ভব হয়নি।”
আনায়া ভিভিয়ানের কথায় কিছুটা সংকুচিত হলো। যদিও সে জানে না, সে এমন কি ভুল করেছে। তবুও আনায়া নিজেকে তটস্থ রেখে,ইতস্তত ভঙ্গিতে মাওরার উদ্দেশ্যে বলল,
“হাপি বাৎদে বাইয়ার ছুন্দর বউ! বাইয়া তোমার জুন্য কেক বানিয়েসে, আমিও ছিনাম, বাইয়াকে হেলপ কসসি।”
মাওরার চোখ দুটো অচিরেই ভিজে উঠল। ভিভিয়ানের মতো রুক্ষ মানুষের কাছ থেকে এতো কিছু আশা করেনি। এদিকে ভিভিয়ানও চায়নি আনায়ার আগ বাড়িয়ে এতো কিছু বলুক।
মাওরা আনায়ার সরু নাকটা আলতো করে টেনে দিয়ে বলল,
“থ্যাংক ইউ মিস বাটারফ্লাই! থাংক ইউ সো মাচ।”
আনায়া তখন উৎসাহ নিয়ে বলতে লাগল,
“জানো? বাইয়া আমাকে একটা সাদা সাদা ফুলের গাস কিনে দিয়েছে, অনেক সুন্দর ওতা আহ কি ছুগনদোওও।”
আনায়া শুরুতে কিছুটা সংকোচ বোধ করলেও মূহুর্তেই সে নানান প্রসঙ্গে নানান গল্প জুড়ে দিল। মাওরাও কম নয়, সে ভিভিয়ানের দিকে আর কি নজর দেবে—উল্টো দুনিয়ার সব ভুলে ঐটুকু আনায়ার সাথেই গল্প করতে লাগল।
কখনো দুজনে মিলে হাসছে, কখনো বা কিসব বাচ্চা বাচ্চা গল্প আলাপ জুড়ছে। এদিকে ভিভিয়ান অদ্ভুত দৃষ্টিতে দুজনকে দেখছে। কি পরিকল্পনা নিয়ে এলো,আর এখানে এসব চলছে! দুটো বাচ্চার মধ্যে নিজেকে এক জড়বস্তু ব্যতীত আর কিছুই মনে হচ্ছে না তার। আর এভাবেই আরো কিছু মূহুর্ত কেটে গেল।
সবচেয়ে সুন্দর মুহূর্তটি এল যখন বাইকের সিটের ওপর কেকের বক্সটা খোলা হলো। খোলা আকাশের নিচে, ঘাসের ওপর দাঁড়িয়ে ভিভিয়ান ছোট্ট একটা মোমবাতি জ্বালাল। আনায়া হাততালি দিয়ে গাইতে শুরু করল,
“হ্যাপি বাৎদে টু বাইয়া বউ!”
মাওরা কেক কাটল এবং প্রথম পিসটুকু আনায়াকে খাইয়ে দিল। আনায়া চকলেট কেকটুকু মুখে দিয়ে চোখ বন্ধ করে বলল,
“উম্মম, অনেক মুজা মুজা!”
আনায়ার পর মাওরা ভিভিয়ানকে কিছুটা কেকের অংশ খাইয়ে দিল। যদিও সে অদ্ভুত এক কারণে ইতস্তত বোধ করছিল।যা হয়তো ভিভিয়ান বারবার খেয়াল করলেও, বিশেষ গুরুত্ব দিল না। সে ভালো করেই জানে, মাওরা বর্তমান যুগের মেয়েদের মতো ততটা ফ্রি-মাইন্ডের নয়। বিশেষ করে, এসব ক্ষেত্রে একটু বেশিই সংকোচবোধ করে।
কিছুক্ষণ পর, বিকালের রোদ যখন প্রায় মিলিয়ে যাচ্ছে—আনায়া তখন কিছুটা দূরে একটা প্রজাপতির পেছনে ছুটছিল।হাতে ধরা কেকের একটুকরো অংশ, মুখে চকোলেট মেখে একাকার। পুরো কেকের অধিকাংশই বোধহয় সেই বাইকের উপর বসে বসে এতোক্ষণ ধরে খেয়ে সাফ করেছে।
এদিকে ভিভিয়ান আর মাওরা তখন বাইকের পাশে একা। পার্কের এই সাইডটাতে তেমন মানুষজনও নেই। ভিভিয়ান বাইকের সাথে গা ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে, তার হাত পেঁচানো মাওরার কোমড়ে। মাওরা গুটিয়ে তার মাঝে আবদ্ধ। মাঝেমধ্যে নজর এদিক-সেদিক ফিরিয়ে সংকোচ-সংশয়ের জানান দিচ্ছে। অথচ ভিভিয়ান সম্পূর্ণ নির্বিকার। তার দৃষ্টিতে তখন ভালোবাসার গভীর সম্মোহন।
ভিভিয়ান মাওরার উদ্দেশ্যে আনমনে আওড়াল,
“কাছে এলেই কাঁপা কাঁপি শুরু করে দাও। এই রোগের ঔষধ কি? বিয়ে?”
মাওরা হকচকিয়ে মুখ তুলে ভিভিয়ানের দিকে তাকায়। দেশী-বিদেশী এক অদ্ভুত সৌন্দর্যের সংমিশ্রণে গড়া এক সুপুরুষ। হয়তো বা যে কোনো রমণীর বুকে সহসাই ঝড় তুলে দিতে পারে—এমনই সে এক অন্ধকার জগতের রাজকুমার। তার ঐ চোখজোড়াই যে বড় রহস্যের আধার। তবুও কিছু না কিছু দ্বিধা যে রয়েই যায়। এই মানুষটাকে সে ভালোবাসে। তবে হঠাৎ এমন কি হলো যে,তার মনে হচ্ছে সে ভিভিয়ানের থেকে দূরে সরে যাচ্ছে! কই ভিভিয়ান তো তাকে দূরে ঠেলছে না, তবে সমস্যাটা কোথায়? তার নিজের মধ্যেই?
মাওরা নিজের ভাবনায় হারিয়ে গেল। ভিভিয়ান উত্তর না পেয়ে, মাওরাকে কিছুটা ঝাঁকিয়ে নিজের সাথে মিশিয়ে কোমড়ে চাপ দৃঢ় করল। মাওরার শ্বাস নেওয়া কষ্টসাধ্য হলেও,সে চুপচাপ রইল। ভিভিয়ান ভাবগম্ভীর্য নিরেট রেখে বলল,
“ছুটি তো বোধহয় শেষ হতে চলল, ঢাকায় ফিরবে কবে?”
—“আ…এখনো কিছু ঠিক করিনি তবে বেশিদিন থাকাও সম্ভব হবে না। ছুটি শেষে এক্সাম আছে।”
—“হুমমম…তবে পরশু কিংবা আর দুদিন পর?”
—“এমন কিছুই, তুমি কবে যেতে চাচ্ছো?”
—“আমার কোনো বাঁধা নিষেধ নেই, এখানে তোমার জন্যই আছি।”
মাওরা ক্ষীণ হাসল। মুখ ফিরিয়ে পাশে তাকিয়ে একবার আনায়াকে দেখল। পরক্ষণেই ভিভিয়ানের দিকে চেয়ে বলল,
“তোমার বোনটা ভারী মিষ্টি!”
—“হুমমম, দেখতে তো মিষ্টিই কিন্তু ও কি জিনিস তা বুঝতে বোধহয় আমার সারাজীবন লেগে যাবে।”
ভিভিয়ান আনমনে কথাটা আওড়িয়ে ভারী শ্বাস ফেলল। মাওরা ভ্রু কুটি করে বলল,
“কেনো? এমনিতে তো ভালোই।”
—“ভালো-মন্দের কথা বলছি না, তারা আমার কাছে যতটা স্পেশাল ততটাই মিস্ট্রিয়াস।”
—“মিস্ট্রিয়াস? কি আশ্চর্য!”
মাওরা পুনরায় আনায়ার দিকে মুখ ফিরিয়ে হাসল। আনায়া তখনও ছোট্ট একটা লাল প্রজাতির মতো ঘাসের উপর নেচে নেচে ছুটছে।
মাওরা একমনে তার দিকে তাকিয়ে থাকার পর বলল,
“ও কেমন তা তো জানিনা, কিন্তু খুব করে চাইবো—আমাদের কখনো মেয়ে হলে ওর মতোই হোক।”
মাওরা আনমনে কথাটা বললেও, ভিভিয়ান কেশে উঠল।
—“ওর মতো?”
মাওরা চোখ পিটপিট করে অবাক স্বরে বলল,
“কেনো,ভুল কি বলেছি?”
—“না, না, সব ঠিকই আছে। কিন্তু কথা তো তা নয়। ঠিকমতো আজ অব্দি চুমু খেতে দাওনি, ওর মতো বাচ্চা হবে এ আশা কিভাবে করছো? জানো বাচ্চা হতে কতোকিছু করতে হয়।”
এই বলেই সে কিছুটা গুরুগম্ভীর ভাব ধরল। মাওরা তার বুকে আলগোছে কিল দিয়ে আওড়াল,
“বাজে বকা বন্ধ করো,সবকিছুতেই তুমি এমন।”
ভিভিয়ান ক্ষীণ বিদ্রুপাত্মক হাসল। মাওরার কপালে ছড়িয়ে থাকা অবাধ্য চুলগুলো সরিয়ে দিয়ে, হঠাৎ মাওরার ঠোঁটের দিকে ঝুঁকে এল। সহসাই মাওরা হকচকিয়ে গেল। ভিভিয়ানের গুরুগম্ভীর ভাবগাম্ভীর্য বদলে গিয়েছে। আর তার হৃৎস্পন্দনের গতি ততক্ষণে বেড়েছে।
ভিভিয়ান ডান হাত বাড়িয়ে তার গাল-গলা আঁকড়ে ধরে। ধীরস্থিরে ভগ্নস্বরে আওড়ায়,
“সুইটহার্ট!”
মাওরা শুষ্ক ঢোক গেলে। ভিভিয়ান ক্রমশই যেন তার উপর নিজের সম্পূর্ণ ভার ছেড়ে দিচ্ছে। আর ঠিক সেই মাহেন্দ্রক্ষণে এক মহাবিপত্তি ঘটল।
হঠাৎ পাশ থেকে আনায়ার অদ্ভুত এক করুণ কণ্ঠস্বর ভেসে এলো,
“বাইয়া… ও বাইয়া!”
ভিভিয়ান বিরক্ত হয়ে চোখ খুলল। নিজেকে সংবরণ করে পাশে মুখ ফিরিয়ে দেখল—আনায়া দুই হাতে তার লাল রঙের গাউনটা চেপে ধরে কাঁচুমাচু হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তার মুখভঙ্গি অত্যন্ত বিচলিত। মাওরাও ততক্ষণে হুঁশে ফিরে, চিন্তিত দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে রইল। ভিভিয়ান ভ্রু কুঁচকে কর্কশ স্বরে জিজ্ঞেস করল,
“কী হয়েছে তোর? ওখানে ওভাবে দাঁড়িয়ে আছিস কেন?”
আনায়া মিনমিনে গলায় বলল,
মহামায়া পর্ব ২৬
“বাইয়া… আমার হিসু পেয়্যেছে।”
ভিভিয়ান আকাশ থেকে পড়ল। সে হতভম্ব হয়ে জিজ্ঞেস করল,
“মানে? তুই না ডায়াপার পরে আছিস?”
আনায়া তখনো নিজের গাউন আঁকড়ে ধরে অসহায়ভাবে মাথা নাড়িয়ে বলল,
“না… আমি পড়ে আসতে বুলে গিয়েছি। তুমার দুষ,তুমি আমায় দাইপার পড়াওনি। আর আমি তো দাইপার পড়তে পারি না…মা পড়িয়ে দেয়।”
