মাটির পিঞ্জর পর্ব ১৫
নূরায়েশা মাহনূর
– উজান ভাই, কখন আসলে তুমি?
স্তম্ভিত বিস্ময়ের শেষ সীমান্তে দাঁড়িয়ে কাঁপছে ইশিতার কণ্ঠ। ঘরে ফিরেছে ঘণ্টাখানেকও হয়নি, নিজ কক্ষে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা জিনিসপত্র গুছিয়ে বাইরে পা রেখেছে সবে। এমন সময় দৃশ্যপটে উদয় হলো উজান! তীব্র বিস্ময়ে আটকে গেছে তার চাহনির নড়াচড়া। কথাটি উচ্চারণের সাথে সাথেই উজানের চাহনি ফিরে এল তার দিকে। চোখে ধাতব নির্লিপ্ততা, মুখে বাক্যহীনতা। তবুও থেমে থাকেনি ইশিতা। দীর্ঘদিনের অবরুদ্ধ উচ্ছ্বাস হঠাৎই শব্দে ফেটে পড়লো,
– কতদিন পর দেখলাম তোমাকে উজান ভাই! এতদিন কোথায় ছিলে? কবে এসেছো বাড়িতে? আগে জানালে না কেন? তাহলে তো আমরাও আগেভাগেই ফিরতাম…
– কেমন আছিস ইশু?
শব্দের জবাবে শুধু একটিমাত্র প্রশ্ন। কোনো আবেগ নেই, নেই দীর্ঘদিনের দেখা না হওয়ার উষ্ণতা। ইশিতা মুহূর্তে নিজেকে সামলে নিলো। উজানের চোখে ভাসছে এক চাপা গম্ভীরতা, ঠোঁটে অনুচ্চারিত কোনো দুশ্চিন্তার রেখা। কেন যেন মনে হলো এই পুরুষটা ভেতরে ভেতরে কোনো অস্থিরতা বয়ে বেড়াচ্ছে।
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
– আমি ভালো আছি উজান ভাই। তুমি কেমন আছো ? তুমি কি… কোনো বিষয় নিয়ে চিন্তায় আছো?
উজান মাথা নাড়লো স্বরটাও নিস্তরঙ্গ।
– না তেমন কিছু না। ছোট মা কোথায়? উনি কি আসেননি?
– এসেছেন তো, আম্মু ওই পাশেই আছেন।
– উজান… এই উজান!
নাম ধরে টান টান স্বরে ডাকতে ডাকতে এগিয়ে এল তুবা। উজান ধীরভাষে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালো। তুবার চোখে খেলে যাচ্ছে অস্থির উচ্ছ্বাস। কাছে এসেই কথার তীর ছুড়ে দিলো,
– তুই এখানে? আর আমি তোকে খুঁজছি সর্বত্র! চল না কোথাও থেকে ঘুরে আসি একটু, এই আসার পর থেকে তো কোথাও যাওয়াই হলো না।
বাক্য ফুরাবার আগেই তুবার চোখ আটকে গেল একপাশে দাঁড়িয়ে থাকা ইশিতার চোখে। ইশিতা কিছু বলছে না, তবু তার দু’চোখে জমাট বৃষ্টি। ডাগর ডাগর চাহনির ভিতরে প্রশ্নবিদ্ধ নীরবতা। তুবার দিকে সে তাকিয়ে আছে, এক মৌন ভাষায়…
– ও কে, উজান?
তুবার কণ্ঠে অনাহূত কৌতূহল। উজান এবার ধীরে ফিরে তাকালো ইশিতার দিকে। চোখ একবার উপর থেকে নিচে নামিয়ে দেখে নিলো মেয়েটাকে । ইশিতার পরনে একটা নিঃসাড় কালো চুড়িদার। চুল ক্লিপে বাঁধা, সামনের দিকের কিছু বেবি হেয়ার অলসভাবে গড়িয়ে পড়ছে কপালে।ওড়নাটা ছড়িয়ে রাখা, শরীর জুড়ে অনাবিল শালীনতা। মুখখানা কোনো বাচ্চা মেয়ের মতই স্নিগ্ধ, সরল । চোখে এক উজ্জ্বল বিস্ময়, মনে হচ্ছে চকচকে দুইটি তারা নিয়ে শিশুমনের কেউ তাকিয়ে আছে।
– ও ইশিতা। ছোট চাচ্চুর মেয়ে।
বলল উজান, স্বর নরম।
– ওহ…
তুবার ঠোঁট ছুঁয়ে আসে একটিমাত্র ক্ষীণ প্রতিক্রিয়া। তবে চোখ বলছিলো ভিন্ন কথা। ইশিতাকে দেখেও খুব একটা ভালো লাগলো না তুবার কাছে । সত্য বলতে তুবা কখনোই কোনো সুন্দরী মেয়েকে সহ্য করতে পারে না। আর উজানের আশেপাশে? সেটা চুলচেরা ঈর্ষার এক অজানা ঘূর্ণি।
– ভালো আছেন আপু? আপনি কি হন উজান ভাইয়ের?
ইশিতার কণ্ঠে চিরাচরিত ভদ্রতা আর শিশুসুলভ আন্তরিকতা। তুবা সামান্য সোজা হয়ে দাঁড়ালো, ঠোঁটের কোণে এক কৃত্রিম হাসি এনে বললো,
– আমি উজানের ফ্রেন্ড।
– হুম… ভারী কিউট আপনি দেখতে। উজান ভাইয়ের বন্ধু বলে কথা, কিউট না হয়ে উপায় আছে?
কথার শেষে ইশিতা ছুড়ে দিলো এক মনোহরণ হাসি।শুধু ঠোঁটে নয়, চোখেও খেলে গেলো মুগ্ধতার দীপ্তি। উজান চোখ ছোট ছোট করে অনুভূতিহীন চাহনি নিয়ে ইশিতার দিকে তাকিয়ে আছে। তুবার চোখে লেগে গেলো ইশিতার সেই হাসির দীপ্ত আঁচ। শরীরটা সাথে সাথেই জ্বলে উঠলো।
এই মেয়েটা এতটা ন্যাকামি করে কেন? আর হেসে এমন ভাব নিচ্ছে কেনো? হাসি সুন্দর দেখেই বোধহয় ইচ্ছে করে হে হে করছে। তুবার ভেতরটা কেমন দাউ দাউ করে উঠলো। তবুও সমস্ত অসহিষ্ণুতা মুখে না টেনে শত চেষ্টায় চেহারায় একপাশে তুলে রাখলো বিষণ্ন হালকা হাসির আবরণ।
– উজান ভাই, দুপুরে খেয়েছো?
ইশিতার কণ্ঠে পরম যত্নের ছোঁয়া। উজান নিরবে নাড়িয়ে কেবল বললো,
– না।
– চলো, চলো খাবে চলো। আজ সবাই একসাথে খাবো আমরা। জানো তুমি, কতদিন পর তোমার দেখা! আমার না কি খুশি লাগছে বলেই বোঝাতে পারবো না। ইশ! এতদিনে এই বাড়িটায় প্রাণ ফিরে এসেছে। বড় মা কোথায়? নিশ্চয়ই খুশিতে একেবারে পাগল হয়ে গেছে, তাই না? তোমার জন্য উনি কত কষ্ট সয়েছেন জানো? কতবার কেঁদেছেন… আরো আগে এলে না কেন, বলো তো?
মায়ের প্রসঙ্গ আসতেই উজানের মুখটায় হালকা কুয়াশা নামলো। শিরা-উপশিরায় এক অপরাধবোধ বয়ে গেলো । অভিমানের পর্দা টেনে, নিজের মায়ের বুকেই যে কষ্টের আঁচড় ফেলেছিল… তার মূল্য যে এমন হঠাৎ করেই অনুশোচনায় ডুবিয়ে দেবে, তা হয়তো ভাবেনি। সে কিছু বললো না।
– তাড়াতাড়ি আসো উজান ভাই। আপু আপনি-ও আসুন। আর কোনো বন্ধু যদি থাকে উজান ভাইয়ের, সবাইকে নিয়ে আসুন। আমি দেখি রান্না সব রেডি কিনা।
ইশিতা কথার ঝাঁপি ফেলে তড়িগড়ি করে নেমে গেল নিচে। উজান ঠোঁটে নীরব দীর্ঘশ্বাস চেপে ধীরে ঘরের দিকে পা বাড়াল। তুবা একপাশে দাঁড়িয়ে থেকে মুহূর্তখানেক চেয়ে রইলো, তারপর বাকিদের দিকে এগিয়ে গেলো।
নিজ কক্ষের নিঃস্তব্ধতা জুড়ে দৃষ্টি ডুবে আছে বইয়ের পাতায়। শরীরের জ্বর অনেকটাই প্রশমিত, আর মনটা আগের মতো অসাড় নয়। শুয়ে শুয়ে অলস সময় নষ্ট করাকে দৃষ্টি কখনোই পছন্দ করে না। তাই নিজস্ব ভুবনে ফিরে এসেছে সে। প্রিয় বইয়ের পাতায় লুকানো শব্দেরা হয়ে উঠেছে তার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য সঙ্গী।
হঠাৎ টুং করে শব্দ উঠলো, ফোনে মেসেজ এলার্ট। ফোনটা বিছানার এক পাশে, দূরে রাখা। তবুও দৃষ্টির মনে হলো তোলার মতো কিছু নয়। আবারো ডুব দিলো পাঠ-সাগরে। কিন্তু কিছুক্ষণ পর ফের একটানা টুং টাং টুং টাং … মোবাইল এবার রণহুঙ্কারে নেমেছে। দৃষ্টি বিরক্ত হলো। চোখ কুঁচকে উঠলো।
অবশেষে উঠে গিয়ে মোবাইলটা হাতে নিলো। স্ক্রিনে চোখ পড়ে যেতেই তার সমস্ত অভিব্যক্তি মুহূর্তে স্তব্ধ। একের পর এক ঝড়ের মতো ঢুকছে ছবি। প্রেরক? “বলদ” নামে সেইভ করা একটি নাম। স্ক্রিনজুড়ে ভেসে উঠছে একটার পর একটা মিডিয়া ফাইল। ২০-এর উপর ছবি চলে এসেছে ইতিমধ্যেই, অথচ দৃষ্টি এখনো বুঝে উঠতে পারেনি ঠিক কী হচ্ছে এখানে!
মাথার ভেতর দ্বন্দ্ব দেখবে কি দেখবে না? একটা বিরক্তি, একটা কৌতূহল আর একটুখানি শঙ্কা তিনটে আবেগ একসাথে ঢেউ তুলছে দৃষ্টির ভিতরে। শেষমেশ সেই কৌতূহলটাই জয়ী হলো। চোখ রাখলো ছবিগুলোর ওপরে। আর সেখানেই আচমকা থমকে গেল সময়। ছবি… আর ছবি… সব ক’টাতে সাইফ! একের পর এক সাইফের ছবি পাঠিয়েই যাচ্ছে ইমন ।
হাতে ফুলের সমাহার চেহারায় হাসি। একবার গোলাপ, একবার গাঁদা, কখনো রজনীগন্ধা তো কখনো বেলি। প্রতিটি ছবিতে সাইফ একেক রকম ভঙ্গিমায় ফুল হাতে দাঁড়িয়ে আছে। ছবি থামতেই মেসেজ এল ঝুপ করে।
“দেখেন তো ভাবি, কোন ফুলগুলো পছন্দ হচ্ছে আপনার?”
দৃষ্টি হতবাক। ভেতরটা একরাশ অবাক ভাবনায় মোড়া। কি শুরু করে দিয়েছে এই দুই বলদ? সাইফ আর ইমন দুজন মিলে রীতিমতো নাটক নামিয়ে এনেছে স্ক্রিনে। এত কিছু করার পরেও দৃষ্টি নিরবই রইলো। একটিও শব্দ খরচ করলো না। চ্যাট থেকে বেরিয়ে এল চুপচাপ।
কিন্তু ইমন নামের এই অতিচঞ্চল প্রাণটা থেমে থাকার নয়। আবার ভেসে এল মেসেজ,
“ভাবি ভাইরে দেখতে দেখতে কি অজ্ঞান হয়ে যাচ্ছেন নাকি? তাড়াতাড়ি বলেন, ভাইরে পরে দেখিয়েন!”
এবার রাগে মাথার ভেতরটা টকটকে লাল হয়ে উঠলো দৃষ্টির। এই ছেলেটা এমনিতেই এক লাইন বেশি বোঝে তার উপর আবার এমন কথা! দৃষ্টি কোনো বাক্য ব্যয় করলো না। শুধু একটা এংরি ইমোজি ছুঁড়ে দিলো স্ক্রিনে। ভাবলো এবার নিশ্চয়ই থামবে… কিন্তু না! এইবার মেসেঞ্জারের পর্দা কাঁপিয়ে আবারো এলো ইমনের মূর্তিমান বাচালতা,
“আপনি কি সবসময় এমন রাগী মুডে থাকেন, ভাবি? মেয়েমানুষ তো ফুল দেখে খুশিতে লাফিয়ে ওঠে আর আপনি দেখি ফুল দেখে এংরি ইমুজি পাঠাচ্ছেন!”
চিন্তামগ্ন নিস্তব্ধতায় ডুবে গেলো দৃষ্টি। সত্যিই তো একটা ফুল দেখেই কি তার উল্লাসে ফেটে পড়া উচিত ছিলো? মেয়েদের অন্তর্গত হৃদয়চেতনায় ফুলের প্রতি এক অনিবার্য টান থাকে, দৃষ্টির হৃদয়েও সে মুগ্ধতা সুপ্তভাবে জেগে আছে। তবু বাকিদের মতো প্রকাশে সে অকুতোভয় নয়।
আগে অবশ্য কখনো এমন ছিলো না সে। সময় একদিন ছিল যখন ফুলের গন্ধেই চোখ বুজে হাসতো, রঙে রঙিন হয়ে উঠতো তার মুখাবয়ব। কিন্তু এক রাত অভিশপ্ত এক রাত সবকিছু নিঃশেষ করে দিয়েছে। সঙ্গে নিভিয়ে দিয়েছে তার কোমল, পাপড়ির মতো আত্মাটিকে। এখন এসব ছেলেমানুষি তাকে মানায় না, মানায় না কোনো উচ্ছ্বাস।
ছবিগুলো একবার দেখে নিলো নিস্পৃহ ভঙ্গিতে। একটি টকটকে লাল গোলাপের তোড়া, সেই ছবিটা চোখে আটকে গেলো। মনের ভেতর অজান্তেই জেগে উঠলো কোনো এক শিহরণ। ইমনকে বলে ফেলার জন্য আঙুল চলছিলো ঠিক, কিন্তু হঠাৎই বাস্তবতার খাঁচা তাকে থামিয়ে দিলো। কী করছিলো সে! ভাবতেই থেমে গেলো আঙুলের গতি। একটা দীর্ঘশ্বাস ঝরে পড়লো ঠোঁটের কোণে। মোবাইলটা ধীরে বন্ধ করে রেখে দিলো দৃষ্টি।
অন্যপ্রান্তে ~
– ভাই, ভাবি তো একেবারে চুপ। মেসেজেরও রেসপন্স নাই। একটা কল দিয়ে দেখবো নাকি?
– বৃথা চেষ্টা। ফোন অফ করে রেখেছে।
– কী! আপনি জানলেন কিভাবে?
– বিশ্বাস না হলে নিজেই কল দিয়ে দেখ।
ইমন কৌতূহল দমাতে পারলো না। ব্যাকুল আঙুলে নম্বরটা টিপে দিলো। পরমুহূর্তেই ফেটে এলো এক সুরেলা যান্ত্রিক কণ্ঠ,
“দুঃখিত, আপনি যে নাম্বারে কল করেছেন তা এই মুহূর্তে সংযোগ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। অনুগ্রহ করে কিছুক্ষণ পর চেষ্টা করুন।”
ইমন বিস্ময়ে চোখ গোল গোল করে তাকালো সাইফের দিকে। ইতোমধ্যে সাইফ দোকানির হাতে টাকা গুঁজে দিয়ে একখানি ব্যুকেট নিজের করে ফেলেছে। ইমন তাড়াতাড়ি ঝুঁকে চেয়ে দেখলো সেই ব্যুকেটের দিকে।
– ভাই, এইটা ভাবির পছন্দ হইবো? ভাবির তো হলুদ আর সাদা গোলাপ পছন্দ।
সাইফের ঠোঁটে এক রহস্যময় হাসি। তার ভেতরে এক অজানা আশ্বাস খেলে গেলো। কেনো যেনো মনে হলো সব রং ছাপিয়ে দৃষ্টি এই ব্যুকেটটাই ভালোবাসবে আজ।
– জানি… তবু এইটা নিতে ইচ্ছে হলো।
নির্লিপ্ত কণ্ঠে বলে এগিয়ে চললো সাইফ। ইমন প্রথমে দৌড়ে পিছু নিলো, আবার হঠাৎ থেমে গেলো। মনে হলো তারও কিছু রাখা দরকার। চট করে একখানা লাল গোলাপ কিনে নিলো। দ্রুত সেটাকে শার্টের ভিতর লুকিয়ে ফেললো বুকের কাছে। দাম মিটিয়ে আবার দৌড়ে চড়ে বসলো বাইকে।
দুপুরবেলা, খাবারের টেবিল উৎসবের মঞ্চ। নয়ন, আসিফ, জিদান, আফরা, তুবা সবাই জড়ো হয়েছে একসাথে। টেবিলের একপ্রান্তে ইশিতা একে একে সবার সামনে পাতে সাজিয়ে দিচ্ছে খাবারের রঙিন সম্ভার। অন্যদিকে রান্নাঘরে আমিনা, মানে উজানের ছোট মা আনন্দে ডানা মেলেছে। মরিয়মের সঙ্গে তাল মিলিয়ে কাজ করে চলেছে সে, মুখে সন্তুষ্টির আভা।
সিঁড়ির ধাপে ধাপে একসময়ে নিচে নেমে এলো অরুনা। আমিনারই অনুরোধেই এসেছে । ছোটবেলা থেকে উজান তার কাছে শুধু ভ্রাতুষ্পুত্র ছিলো না ছিলো ছেলেরও অধিক।
উজানের বাবা আর ইশিতার বাবা দুই ভাইয়ের সম্পর্ক ছিলো অবিচ্ছেদ্য। একে অপরের প্রাণ ছিলো। বড় ভাইয়ের ঘরে যখন উজানের জন্ম হয়, তখন থেকেই ছোট ভাই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলো এই শিশুই তার আলো তার আশ্রয় হবে।
ইশিতা তখনও পৃথিবীতে আসেনি। উজানের সাথে নয় বছরের ব্যবধানে জন্ম নেওয়া ইশিতার আগমনের পথটা সহজ ছিলো না। ইশিতার বাবা চাইতেন না সন্তান হোক তাদের ঘরে। ভাবতেন, সন্তান এলে হয়তো উজানের প্রতি মমতার ভাগ হয়ে যাবে।
কিন্তু অরুনা ও উজানের বাবা তারা ছিলো অন্য স্বভাবের মানুষ। তারা অনেক বুঝিয়েছিলো ইশিতার বাবাকে, আমিনাও নিশ্চুপ ছিলো না। একজন নারী হিসেবে মাতৃত্বের অধিকার তারও আছে। সেই অধিকার কেড়ে নেওয়ার শক্তি কি কারও আছে?
অবশেষে দ্বাদশ বছরের সংসারজীবনে, বহু মান-অভিমানের পরে জন্ম নেয় ইশিতা। আর সেই জন্মের পরে যে ভালোবাসা ছিলো উজানের প্রতি, তা এক বিন্দুও কমে নি। বরং, এখন দুটো হৃদয় আলাদা আলাদা তালে ভালোবাসা বয়ে আনে।
দুপুরের আহার শেষে বৈঠকখানা মুখর হয়ে উঠেছে হাস্যরসে। সবাই জড়ো হয়ে বসে আছে। নয়ন, আসিফ, জিদান, তুবা, আফরা… ঘরে একরকম প্রাণের জোয়ার। দৃষ্টি অবশ্য খেতে আসে নি তাদের সাথে। আগে সবাই একসাথেই খেতো কিন্তু এখন যেহেতু বাহিরের মানুষ আছে তাই সে আসেনি । তার খাবার তার ঘরে গিয়েই অরুনা খাইয়ে এসেছে।
বৈঠকে ইশিতা তার নিজের হাতে বানানো টক-মিষ্টি আমের আচার একে একে সবাইকে তুলে দিচ্ছে।কৌতূহলে মুখের ভাঁজে হাসি, প্রশংসায় চোখে দীপ্তি। ঠিক সেই সময়, আচমকা দরজায় ঘণ্টা বাজলো। একযোগে সবার মুখ ঘুরে গেলো দরজার দিকে। কিছুটা থমকে থাকা মুহূর্তে ইশিতাই হেসে বলে উঠলো,
– আমি দেখছি কে এসেছে।
ওড়নার প্রান্তটা মাথায় ভালো করে টেনে পায়ে পায়ে এগিয়ে গেলো ইশিতা দরজার দিকে। আস্তে করে খুলে দিলো দরজার পাট। ওপারে দাঁড়িয়ে আছে এক অপরিচিত যুবক। চোখে কৌতূহল, কণ্ঠে শালীন জিজ্ঞাসা,
– শেখ মাহেরা দৃষ্টি, কি এই বাড়িতেই থাকেন?
ইশিতা ভ্রু কুঁচকে জবাব দিলো,
– জ্বী, আপনি কে বলছেন?
ছেলেটি কিছুটা নিপাট ভঙ্গিতে বললো,
– ওনার নামে একটা পার্সেল এসেছে। কাইন্ডলি একটু ডেকে দিবেন ওনাকে?
এক চিলতে হাসি খেলে গেলো ইশিতার মুখে।
– আমার কাছেই দিন। সমস্যা নেই, আমি ওনাকে পৌঁছে দিবো।
– আচ্ছা, তাহলে এখানে একটু সাইন করে দিন।
একটা ফর্ম এগিয়ে দিলো ডেলিভারি ম্যান। ইশিতা নাম লিখে দরজা লাগিয়ে দিলো। চোখ পড়তেই ফুলের ব্যুকেটের দিকে একটা কোমল হাসি ছড়িয়ে পড়লো মুখে। বুঝে ফেললো এটা কার পাঠানো। সাইফ ছাড়া এমন অপ্রত্যাশিত প্রেরণার সাধ্য আর কার?
এই বাড়ির ঠিকানায় দৃষ্টির নামে হুটহাট এমন চমক চলে আসে মাঝেমধ্যেই। ফুলে ফুলে গড়া একতরফা অপেক্ষা। আর সেগুলো দৃষ্টির হাতে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব অলিখিতভাবে ইশিতার কাঁধেই এসে পড়ে। ফুল হাতে নিয়ে ভিতরে প্রবেশ করতেই মুখে লুকানো হাসি। সেই হাসি দেখে উজান তাকিয়ে বললো,
– কে এসেছে, ইশু?
– ডেলিভারি ম্যান, উজান ভাই। দৃষ্টি আপুর নামে পার্সেল এসেছে। সাইফ ভাই পাঠিয়েছে, বোধহয়।
সাইফের নামটুকু শুনতেই দপ করে নিভে গেলো উজানের মুখের আলো। এক মুহূর্তে ফ্যাকাশে হয়ে গেলো রক্তবর্ণ। বুকের গভীরে এক গোপন মোচড় দিলো। যার ভাষা নেই, নেই কোনো জবাব।
চোখ নামিয়ে নিলো সে। চোয়াল শক্ত করে কথার তোয়াক্কা না করেই উঠে দাঁড়ালো। নিরবে চলে গেলো সবার মধ্য থেকে। কেউ তার শূন্যতা বুঝেও কিছু বলার সাহস পেলো না। পাশ থেকে কপালে ভাঁজ ফেলে তাকালো আফরা। চোখে অবাক বিষ্ময়, কণ্ঠে স্পষ্ট প্রশ্ন,
– সাইফ? কে সাইফ?
ইশিতা চোখাচোখি না করে সহজ স্বরে জবাব দিলো,
– দৃষ্টি আপুর হাসবেন্ড। আপনারা বসুন আমি আপুকে দিয়ে আসি।
আর একটাও শব্দ না বলে সেখান থেকে সরে গেলো ইশিতা । উদ্দেশ্য দৃষ্টির ঘর।
ইশিতা যেতেই ঘর মুহূর্তে জমে উঠলো নিস্তব্ধতায়। কথারা মুখ থুবড়ে পড়লো মাঝপথে। একে একে সবার চোখে বিস্ময়, দৃষ্টি বিবাহিত!
মাটির পিঞ্জর পর্ব ১৪
চোখাচোখি হতে থাকলো, কেউ আর স্বাভাবিক থাকতে পারছে না। এতদিন এখানে থেকেও কেউ বুঝলো না দৃষ্টির নামের পাশে আরেকটা নাম জুড়ে গেছে। তবে আফরার চোখে শুধুই বিস্ময় নয় কিছুটা সন্দেহও আছে । তার ভেতরটা কেমন খচখচ করে উঠলো। মনে পড়ে গেলো সেদিনের কলেজ ফাংশনের সেই দৃশ্য। কলেজের সেই সাইফ ছেলেটাই কি… দৃষ্টির হাসবেন্ড?
