Home মির্জা সায়ান মুগ্ধ মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ২৭

মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ২৭

মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ২৭
jannatul firdaus mithila

সেইন্ট পিটার্সবার্গেরর আকাশ চিঁড়ে স্নোফল হচ্ছে! বরফের পুরু আস্তরণে ঢেকে যাচ্ছে রাস্তাঘাট। ট্রাস ব্রিজের ব্যস্ত সড়ক দিয়ে ঝড়ো বেগে ছুটে যাচ্ছে — হার্লি ডেভিডসন ব্র্যান্ডের CVO রোড গ্লাইড বাইকটি। গতিবেগ ঘন্টায় ১০০ কি.মি! এ যেন হাওয়ার সাথে পাল্লা দেবার অভিনব কৌশল। কালো রঙা স্টাইলিশ বাইকটির ওপর বসে আছে মুগ্ধ! ফিঙ্গারলেস গ্লাভস পরুয়া হাতদুটো দিয়ে থ্রাটল ঘুরিয়ে যাচ্ছে শক্ত করে। গায়ে জড়ানো একখানা পাতলা ফিনফিনে কালো রঙা শার্ট, শার্টের বেশ ক’টা বোতাম আবার অবহেলায় হা করে খুলে রাখা। তার ওপরেই জড়িয়ে আছে কালো রঙা লেদার রাইডিং জ্যাকেট! জ্যাকেটের চেইন লাগায়নি মহাশয়, গায়ে অতিরিক্ত গরম কি-না! বুকের কাছটা হা করে খুলে রেখেছে হাওয়া ঢোকাতে। মাথার ওপর চেপে আছে মডুলার হেলমেট। মুগ্ধ বাইক ছোটাচ্ছে হাওয়ার বেগে! বারেবারে বাজপাখির ন্যায় এদিক-ওদিক দৃষ্টি ফেলছে কেমন। হেলমেটের আড়ালে লুকিয়ে থাকা বাদামী চোখদুটো তার বড্ড আকুল! খুঁজে যাচ্ছে অপছন্দের মুখটা। তবু্ও পাচ্ছে না সে। এদিকে বাইকের বেশ খানিকটা পেছন পেছন ছুটে আসছে এক বহর মার্সিডিজ বেঞ্জ গাড়ি। গাড়ির গতিবেগ সর্বোচ্চ বাড়িয়েও তারা নাগাল পাচ্ছে না মনস্টারকে। তাছাড়া পাবেই বা কিভাবে? মনস্টার কি আর যেই-সেই গতিতে বাইক হাঁকাচ্ছে না-কি?

ট্রাস ব্রিজ মাত্রই অতিক্রম করল মুগ্ধের বাইক। পথ ধরল মহাসড়কের। দু’পাশ দিয়ে ছুটছে দু’টো রাস্তা। একপাশের রাস্তা দিয়ে জন-সাধারণের গাড়ি চললেও আরেকপাশ দিয়ে ছুটছে শ্যাডো মনস্টারের গাড়ির বহর। জনসাধারণ ভুলেও চোখ তুলে তাকায়নি তাদের দিকে। তাকিয়ে থোড়াই প্রাণ হারাবে তারা! বেপরোয়া গতিতে বাইক হাঁকাতে থাকা শ্যাডো মনস্টার, উদ্ভ্রান্তের ন্যায় তাকাচ্ছে এদিক-ওদিক। কিছুটা পথ এগোতেই হুট করে তার কানে ভেসে এলো এক অপরিচিত বৃদ্ধার ডাক!
“ মাহি! স্টপ দেয়ার।”

তক্ষুনি পথিমধ্যে রাফলি ব্রেক কষতে উদ্যোত হলো মুগ্ধ। হুটহাট ব্রেক না কষে, পথের ধুলো উড়িয়ে বাইকটাকে ঘুরিয়ে নিলো গোলাকার পথে। সময় নিয়ে থামল বেপরোয়া পুরুষ! ভ্রু কুঁচকে অস্থির নয়নে তাকালো সম্মুখে। ব্যস্ত রাস্তার ওপাশ থেকে গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে আসছে এক তরুণী। পরনে সফেদ রঙা লং টপ। হাত দু’খানায় ঝুলছে দুটো বাকেট। তরুণী কেমন সর্তক চোখে এদিক-ওদিক দৃষ্টি বুলিয়ে পথ অতিক্রম করছে। ওপাশের রাস্তা হয়ে এপাশের রাস্তায় পা রাখল কেবল। ওমনি এক বৃদ্ধা কেমন তড়িঘড়ি করে এগিয়ে গেল মেয়েটার নিকট। দু’হাতে মেয়েটার বাহু খামচে ধরে কানে কানে ফিসফিসিয়ে কি যেন একটা বলল মনে হচ্ছে। আর ওমনি মাথাটা ঝুঁকিয়ে নিলো তরুণী। ভীতসন্ত্রস্ত কদমে গা লুকিয়ে হাঁটতে লাগল বৃদ্ধার পিছুপিছু। এদিকে মুগ্ধ কেমন তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে বৃদ্ধা এবং মেয়েটার দিকে। তার চোখদুটো আচমকা ঘোলাটে লাগছে মনে হচ্ছে। কেন যেন বৃদ্ধাকে ভীষণ পরিচিত ঠেকছে তার নিকট। আর তার পেছনে লুকিয়ে থাকা মেয়েটা? সে কি তার সবচেয়ে অপছন্দের মানুষটা? মুগ্ধ একমুহূর্ত স্থবির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। কন্ঠে তেমন আওয়াজ নেই তার। রয়েসয়ে সে পা নামিয়ে আনলো বাইক থেকে। জোরালো পায়ে কিছুটা পথ এগিয়ে এসে মুখোমুখি হয়ে দাড়ালো বৃদ্ধার। ঘাড় বাকিয়ে বৃদ্ধার পিছনে লুকিয়ে থাকা মেয়েটার পানে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি ফেলে কঠিন গলায় বলে উঠল,

“ এ্যাই তুই আমার বান্দীর মেয়ে না?”
মুহুর্তেই থমকালো চারপাশ! বৃদ্ধার পেছনে লুকিয়ে থাকা মেয়েটা কেমন মুখ লুকিয়ে নিলো আলগোছে। বৃদ্ধাও কেমন হুট করে হেসে উঠে খিলখিলিয়ে। মুগ্ধ অবাক চোখে তাকিয়ে রইলো কেবল। পরক্ষণেই দাঁত খিঁচল বৃদ্ধার ওমন হুটহাট হাসিতে। ঝাঁঝাল কন্ঠে যেইনা কিছু বলতে যাবে ওমনি পেছন থেকে বিনম্র কন্ঠে গার্ড বলে ওঠে,
“ মনস্তার! উনার খোঁজ পাওয়া গেছে। কিছুক্ষণ আগে উনাকে মস্কোর সাদোভোদ মার্কেটের আশেপাশে দেখা গেছে।”
থমকায় মুগ্ধ! ত্বরিত বিস্ফোরিত নেত্রে ঘাড় বাকিয়ে তাকালো কেমন। কপাল খানা কুঁচকে কঠিন গলায় হুংকার ছুঁড়ে বলল,
“ হোয়াট দা হেল আর ইউ্য সেয়িং? সে তো এখানেই, আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। সেখানে সাদোভোদ মার্কেটে ওকে দেখা যাবে কিভাবে? ফাজলামো করছিস বাস্টার্ড?”
এহেন ধমকে কেঁপে ওঠেন গার্ড। মাথাটা ঠায় নুইয়ে রেখে জড়সড় ভঙ্গিমায় অস্ফুটে আওড়াল,
“ কিন্তু মনস্তার! আপনার সামনে তো…মানে কেউউ নেই।”

ভ্রু গোটায় মুগ্ধ। চোয়ালের পেশী শক্ত করে তক্ষুনি হিংস্র থাবা বসালো গার্ডের কন্ঠায়। বেচারা গার্ড কেমন হকচকিয়ে ওঠেছে এরূপ অতর্কিত আক্রমণে। চোখদুটোর ভয়ার্ত দৃষ্টি জমিনে স্থির রেখে দাঁড়িয়ে রইল ঠায়। এদিকে মুগ্ধ’র হাতের জোর বাড়ছে ক্রমশঃ। ফুলেফেঁপে থাকা মাসেলগুলো বুঝি এক্ষুণি জ্যাকেট ছিঁড়ে বেরিয়ে আসবে কোনমতে। সে কেমন দাঁত খিঁচে আওড়াল,
“ ইউ্য এসহোল! পাগল পেয়েছিস আমায়? ঐ বান্দীর মেয়ে আমার পেছনে…!”
বলতে বলতেই ঘাড় বাকিয়ে পেছনে তাকায় মুগ্ধ। আর ওমনি কন্ঠরোধ হলো যুবকের। একি! পেছনে তো কেউ নেই। এতক্ষণ না মেয়েটা আর ঐ বৃদ্ধা দাঁড়িয়ে ছিল এখানে? তাহলে এখন কোথায় গেল তারা? মুগ্ধ হতভম্ব হয়ে গেল নিজ ভাবনায়। হাতের পেশি শিথিল করতেই ছাড়া পেল গার্ড। বেচারা ভয়ে হেঁচকি তুলে সরে গেল দু-কদম। এদিকে মুগ্ধ নামক গম্ভীর পুরুষ ধীরে ধীরে ফের চোয়াল শক্ত করল নিজের। কোমরের কাছে দু’হাত রেখে দাঁতে দাঁত চেপে বিড়বিড় করল,

“ উফফ! দ্যাট ফা’কিং হ্যালুসিনেশন!”
বহুদিন পর আবারও হ্যালুসিনেশন হচ্ছে মুগ্ধের। আগে হ্যালুসিনেশন হলে সে কেবল তার মায়ের মুখ দেখত তবে আজ? আজ এ কাকে দেখল সে? ঐ বান্দীর মেয়েকে কেন দেখল? এহেন ভাবনায় নিমগ্ন মুগ্ধ! চিড়বিড় করতে করতে এগোচ্ছে বাইকের দিকে। লম্বা পা ফেলে বাইকে চড়ে থ্রাটলে হাত রেখে কেমন চিড়বিড় করতে করতে আওড়াল,
“ ঐটুকুন বান্দীর মেয়ের কতবড় সাহস, আমার ধ্যান-জ্ঞানে কব্জা করছে ধীরে ধীরে! আজ পর্যন্ত যা কেউ করতে পারেনি, তা কি-না মাত্র ১৫ দিনে একটা দেড়ব্যাটারী করে দেখাচ্ছে! হোয়াট দা…. ফা’ক!”

মস্কোর টভার্সকয় থানা! প্রবেশদ্বারে দাঁড়িয়ে আছেন দু’জন কনস্টেবল। গায়ে গাঢ় নীল রঙা ডিসিপ্লিনড পোশাক, কাঁধে ঝুলছে রাইফেল। মুখটা সে-কি গুরুগম্ভীর! থানার ভেতরকার অবস্থা বড্ড শৃঙ্খলাপূর্ণ। আশেপাশের ছোট ছোট ডেস্কে বসে আছেন এসআই। ঘাঁটছেন জরুরী ফাইল! থানার ডানদিকে বেশকিছু আসন পেতে রাখা। সেথায় বসে আছে কয়েকজন আসামি। প্রত্যেকের হাতে হাতকড়া! থানার ফ্রন্ট ডেস্কে বসে আছেন ডিউটিরত কপ। তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন সম্মুখে। ডেস্কের ওপাশে বসে আছে এক সপ্তদশী। চেহারার গঠনে মনে হচ্ছে না সে এদেশের। মেয়েটা কেমন ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে বসে আছে চেয়ারে। সারা গায়ে তার অসংখ্য আঁচড়ের দাগ! পরনের লং জামাটা বড্ড নোংরা। কাঁদায় মাখামাখি অবস্থা যাকে বলে। মাথার ঘনকালো চুলগুলো এলোমেলো! সপ্তদশী কাঁপছে ভীষণ। মুখটা কেমন ফ্যাকাশে হয়ে গেছে তার। ডানগালে স্পষ্ট মা’রের দাগ। নতমস্তকে বসে আছে তরুণী, হাতকড়া পরানো হাতদুটো কোলের ওপর এনে রাখা। তার ওপর চার্জ হয়েছে ক্ষতিপূরণ না দেওয়ার চার্জশিট। গম্ভীর মুখো ডিউটিরত কপ মেয়েটাকে আপাদমস্তক পরোখ করে, খানিক গলা খাঁকারি দিয়ে মনোযোগ টানলেন সপ্তদশীর। গমগমে গলায় বলে ওঠেন,

“ টি ইজ এতই স্ত্রানী?”
( আপনি কি এদেশের নাগরিক?)
অবোধ মাহি নাক টেনে চোখ তুলল ওপরে। তার ওমন বোকার ন্যায় তাকিয়ে থাকা দেখে ভ্রু গোটালেন অফিসার। রয়েসয়ে একহাত এগিয়ে দিয়ে গমগমে গলায় বললেন,
“ গিভ মি ইউ্যর পাসপোর্ট!”
ভীত মাহি ঢোক গিললো সামান্য। ভয়ার্ত ভাবখানা চোখেমুখে লেপ্টে নিয়ে, কাঁপা কাঁপা কন্ঠে আওড়াল,
“ আই ডোন্ট হেভ এনি পাসপোর্ট!”
মুহুর্তেই বুঝি আকাশ থেকে পড়লেন অফিসার। চোখেমুখে তার লেপ্টে গেল একরাশ হতবাকতা। তিনি কেমন কপাল গুটিয়ে শক্ত মুখে জিজ্ঞেস করে ওঠেন,
“ পাসপোর্ট ছাড়া এদেশে পা রাখলেন কিভাবে? তাও কিনা একটা মেয়ে হয়ে? সত্যি করে বলুন, আপনি কোনো গুপ্তচর কিনা। নাহলে এর ফল কিন্তু ভীষণ খারাপ হবে।”
আঁতকে ওঠে মাহি। তক্ষুনি উদ্বিগ্ন কন্ঠে ফড়ফড়িয়ে বলে ওঠে,

“ না না! আমি কোনো গুপ্তচর নই, আর না আমি নিজ ইচ্ছায় এদেশে এসেছি। আমাকে জোর করে তুলে আনা হয়েছে এখানে। জোরপূর্বক আঁটকে রাখা হয়েছিল এতোদিন।”
এহেন কথায় টনক নড়ল অফিসারের। মুখাবয়ব থেকে এতক্ষণের হতবাকতা সরে গিয়ে, সেথায় এবার ভর করল একরাশ উদ্বেগ। তিনি কেমন ভ্রু কুঁচকে জোরালো কন্ঠে জিজ্ঞেস করলেন,
“ আর ইউ্য শিওর আপনাকে এতদিন জোর করে আঁটকে রাখা হয়েছিল?”
কান্নারত সপ্তদশী নিরবে মাথা নাড়ায় ওপর নিচ। কপ বুঝি বেশ চিন্তায় পড়লেন এবার। ভিনদেশী এক মেয়ে, তাকে না-কি জোর করে তুলে আনা হয়েছে এদেশে। তাও আবার পাসপোর্ট ছাড়া! এটা কিভাবে সম্ভব? অফিসার কেমন সন্দিগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন মেয়েটার দিকে। তার মুখাবয়বে স্পষ্ট অবিশ্বাসের ছাপ। ভাব এমন — তিনি বুঝি এখনো পুরোপুরি বিশ্বাস করেননি মেয়েটাকে। তবুও গম্ভীর মুখে নিজের দায়িত্ব পালনে তৎপর অফিসার, খানিক নড়েচড়ে বসলেন নিজ আসনে। কোমরের কাছ থেকে রিভলবারটা আলগোছে খুলে এনে রাখলেন ডেস্কের ওপর। গম্ভীর মুখে খানিকটা এগিয়ে বসে, কলমদানি থেকে একখানা কলম তুলে আকঁ বসালেন এফআইআর চার্জশিটের মসৃণ পৃষ্ঠে। কপালে গোটাকতক সন্দেহের ভাঁজ টেনে গম্ভীর কন্ঠে জিজ্ঞেস করলেন,

“ আপনার ভাষ্যমতে আপনি বাংলাদেশি এবং আপনাকে এখানে জোর করে তুলে এনেছে কেউ। তাইতো?”
সপ্তদশী কাঁপা কাঁপা বদনে ঘাড় নাড়ায় ওপর নিচ। অফিসার খানিক মাথা দুলিয়ে এফআইআর টুকতে ব্যস্ত হলেন কেমন। খাতার মসৃণ পৃষ্ঠে টুকটাক কিছু লিখে ফের আওড়ালেন,
“ ফাইন! তো এবার বলুন মেডাম, যিনি আপনাকে এতোদিন আঁটকে রেখেছিলেন — তার নাম কী?”
মাহি ঢোক গিললো সামান্য। নতমস্তকে ভাঙা কন্ঠে আমতা আমতা করে জবাব দিলো —
“ মির্জা সায়ান মুগ্ধ!”
গাল বাঁকায় কপ। কিসব নাম বলছে সপ্তদশী! ঠোঁটের আগায় উচ্চারণ করতে গিয়ে দুবার হোঁচট খেতে হচ্ছে বেচারা অফিসারের। তিনি খানিকক্ষণ বিরক্ত মুখে টুকলেন সব। অতঃপর আরেকদফা খেঁকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন,
“ উনার ব্যাপারে আর কী কী জানেন? আই মিন টু সে, উনি কোথায় থাকে? কিংবা কি কাজ করে? অর এনিথিং ইউ্য নো এবাউট হিম!”

মাহি নতমুখে এদিক-ওদিক দৃষ্টি ফেলল কয়েকবার। ভয়ার্ত ঢোক গিলে মনে করতে লাগল মনস্টারের বিষয়ে। খানিকক্ষণ দোনোমোনো করে সময় নিয়ে বলতে লাগল,
“ একচুয়েলি… আই ডোন্ট নো মাচ এবাউট হিম বাট সামটাইমস আই হিয়্যারড দ্যাট পিপল কল হিম — মনস্টার! দ্যা শ্যাডো মনস্টার!”
তৎক্ষনাৎ থমকালেন সবাই! বেচারা ডিউটিরত কপ কেমন বিস্ফোরিত দৃষ্টিতে তাকালেন সপ্তদশীর পানে। হতবাকতায় হাতের ফাঁক গলিয়ে কলমখানা যে কখন মাটিতে খসে পড়ল তার কোনো ইয়ত্তা নেই জনাবের নিকট। এদিকে আশেপাশের ডেস্কে বসে থাকা অফিসারদের কানে বাজল সপ্তদশীর বলা কথাটা। মুহুর্তেই চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন সবাই। হা হয়ে তাকিয়ে রইলেন কেমন! নতমুখে বসে থাকা মাহি’র নজরে পড়ল না সকলের হতবাকতা। সে এখনো ফোঁপাচ্ছে কেমন! সম্মুখে বসে থাকা অফিসার খানিক ফাঁপা ঢোক গিলল মনে হচ্ছে! আমতা আমতা করে চাপা স্বরে মেয়েটাকে আচমকা জিজ্ঞেস করলেন,

“ ক-ক-কে?”
হতভম্ব মাহি! কপাল কুঁচকে তাকায় অফিসারের পানে। লোকটার কথাগুলো ওমন আঁটকে যাচ্ছে কেন? মাহি কেমন নাক ফুলিয়ে বলল,
“ মনস্টার!”
মুহুর্তেই এক অদৃশ্য বজ্রপাত ঘটল সম্পূর্ণ থানা জুড়ে। প্রত্যেকের গা কেমন আচমকা গরম হয়ে গেল এহেন শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত আবহাওয়াতে। অফিসার তক্ষুনি এক ঝটকায় চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন কোনমতে। ঘটনার আকস্মিকতায় অবহেলিত চেয়ার খানা ছিটকে পড়ে গেল পেছনের দিকে। সেদিকে অবশ্য বিন্দুমাত্র উদ্বেগ নেই অফিসারের। তিনি উল্টো ভয়ার্ত কন্ঠে সবার উদ্দেশ্যে বলে ওঠেন,
“ এই! তারাতাড়ি হেডকোয়ার্টারে কল দে। এই মেডামকে এক্ষুণি ভিআইপি লাউঞ্জে নিয়ে যা। এই কনস্টেবল! তারাতাড়ি চাবি নিয়ে আয়, মেডামের হাতকড়া খোল।”

বেচারা কনস্টেবল কেমন থরথরিয়ে কাঁপছেন দেখো! একটুখানি পথ এগোতেই হোঁচট খাচ্ছেন বারকয়েক। কোনমতে এগিয়ে এসে কাঁপা কাঁপা হাতে মাহি’র হাতকড়ায় চাবি ঢোকাতে গিয়েও পড়ল আরেক বিপত্তিতে। বেচারার হাতদুটো যা কাঁপছে না! চাবির ডগা তালায় প্রবেশ করতে গিয়েও বুঝি হোঁচট খাচ্ছে বেশ। পাশ থেকে অফিসার ভীষণ রাগান্বিত হলেন এরূপ কান্ডে। তক্ষুনি শক্ত হাতে কনস্টেবলের ঘাড় বরাবর এক চপাট বসিয়ে চিড়বিড়িয়ে বলল,
“ একটা কাজও সময় মতো করতে পারছিস না রাস্কেল!দে চাবি আমার হাতে, তোর খুলতে হবে না।”
বলেই এক খামচে কনস্টেবলের হাত থেকে চাবির গোছা ছিনিয়ে নেয় অফিসার। নিজে থেকে মাহি’র সম্মুখে দু-হাটুঁ গেঁড়ে মেঝেতে বসলেন ওতো ক্ষমতাবান পুরুষ। মাহি কেমন হতবাক চোখে দেখছে সব। হুট করে মানুষগুলোর আচারে ব্যবহারে এতো পরিবর্তন হলো কেন, তাই হয়তো ভেবে ভেবে অসার মেয়েটা। সম্মুখের অফিসার তখন কাঁপা কাঁপা হাতে মাহি’র হাতকড়া খুলছে। ভয়ার্ত কন্ঠে ঢোক গিলে আওড়াচ্ছে,
“ আ’ম এক্সট্রিমলি সরি মেডাম। আমি জানতাম না আপনি-ই সে-ই মেয়ে যাকে সকাল থেকে পুরো রাশিয়ায় হন্যে হয়ে খোঁজা হচ্ছে! আমায় মাফ করে দিন ম্যাম, আমি আসলে…”

বাকিটুকু জিভের ডগায় এসেও আঁটকে গেল অফিসারের। যে-ই না কর্ণকুহরে পৌঁছাল হেলিকপ্টারের তেজী শব্দ! তৎক্ষনাৎ শীরঁদাড়া সোজা হয়ে গেল সকলের। ভয়ে তটস্থ হয়ে গেল তনমন। প্রত্যেকের চোখেমুখে লেপ্টে গেল ভয়াতুর ছাপ। অদূর থেকে ধেয়ে আসছে এক বহর গাড়ির শব্দ! অগণিত বাইকের হর্ণে মুখরিত চারপাশ। আকাশভাগ কাঁপিয়ে নামছে হেলিকপ্টার। হেলিপোর্টে বোধহয় এক্ষুণি নামবে তা! থানার প্রবেশদ্বার থেকে তক্ষুনি কনস্টেবল মহাশয় হন্তদন্ত পায়ে দৌড়ে এসে বললেন,
“ স্যার! বাইরে…..”
“ মনস্টার!”
কনস্টেবলের কথাখানা মাঝপথে আঁটকে দিয়ে নিজেই বাকিটুকু বলে উঠলেন অফিসার। ভয়ে কন্ঠা শুকিয়ে কাঠ তার! হাত-পা অবশ হয়ে গেছে যেন। এতো ঠান্ডার মাঝেও ঘামছেন তিনি। থরথর করে কাঁপছে তার হাঁটু!

বাতাস কাঁপাচ্ছে হেলিকপ্টারের জোরালো ব্লেডের ঘূর্ণন। যার বিকট শব্দে কান ধরে যাবার যোগাড়! হেলিকপ্টারের ল্যান্ডিং গিয়ার মাত্রই হেলিপোর্টের মাটি স্পর্শ করেছে। ব্লেডগুলো এখনো ঘুর্নায়মান! আশেপাশের গাছপালা গুলো বুঝি এক্ষুণি উপড়ে যাবে মনে হচ্ছে। হেলিকপ্টারের ইঞ্জিন চালু থাকা অবস্থাতেই স্কিডের ওপর এক খানা কালো রঙা ব্যুট পরিহিত পা এসে দাঁড়ালো। রয়েসয়ে ভেতর থেকে বেরিয়ে এলেন পায়ের মালিক। গায়ে সম্পূর্ণ কালো রঙা ভারী ক্লোক, মাথায় গোলাকার টুপি! ডানহাতে ঝুলছে শ্যাডো মনস্টারের সিগনেচার ব্রেসলেট। মুখ ঢাকা পাতলা ফিনফিনে কালো রঙা ফুল মাস্কে। মনস্টার নিজের চিরচেনা গেটআপে এসেছে আজও। ধীরেসুস্থে বেরিয়ে এলো হেলিকপ্টার থেকে। তৎক্ষনাৎ নিজ নিজ মাথা নুইয়ে নিলো সবাই। মনস্টার তখন আলগোছে নিজের পকেট থেকে একখানা সিগার বের করে এনে মাস্কের আড়ালেই ঠোঁটের ফাঁকে গুঁজল। পাশ থেকে তড়িঘড়ি করে একজন গার্ড এসে কাঁপা কাঁপা হাতে লাইটার ধরিয়ে দিল সিগারের শেষভাগে। গার্ড বেচারা মাথা নুইয়ে রেখেছে ঠায়! তবুও কি সুন্দর দক্ষতার সাথে লাইটার ধরে আছেন মহাশয়। খানিকক্ষণ বাদে সিগারের শেষভাগে আগুন জ্বালানো শেষে গার্ড তড়িঘড়ি করে সরে গেলেন অন্যত্র। মনস্টার মানব তখন একহাতে সিগার ধরে রেখে লম্বা এক টান বসিয়ে কঠিন গলায় হুংকার ছুঁড়ে বলল,

“ নিয়ে আয় ওকে!”
তৎক্ষনাৎ জোরালো পায়ে থানার দিকে ছুটলেন গোটাকতক কমব্যাটস। এদিকে হুটহাট এহেন সশস্ত্র বাহিনীর লোকদের ওমন হড়বড়িয়ে থানায় প্রবেশ করতে দেখে আঁতকে ওঠেন সবাই। অফিসার কেমন ধড়ফড়িয়ে এগোলেন মাহি’র দিকে। কাঁপা কাঁপা ভয়ার্ত কন্ঠে অনুনয় করে আওড়ালেন,
“ মেডাম, চলে যান প্লিজ! মনস্তার নিজে আসছে।”
কাঁদছে সপ্তদশী! তার বুকটা কেমন ভেঙে যাচ্ছে কষ্টে। এতো কষ্ট করে প্যালেস থেকে পালিয়ে এলো, শেষে কি-না এভাবে ধরা পড়ে যাওয়ার জন্য? মাহি গো ধরল এবার। লাল হয়ে যাওয়া মুখখানা শক্ত করে রেখে, কঠিন গলায় বলল,

“ না যাব না আমি!”
ভড়কায় অফিসারসহ বাকিরা! প্রত্যেকে কেমন উদ্বেগ নিয়ে তাকিয়ে আছে মেয়েটার পানে। অফিসার ঘাবড়ে গিয়ে ফের অনুনয় জুড়লেন মেয়েটার নিকট!
“ মেডাম প্লিজ ফর গড স্যাক! চলে যান আপনি। আপনি না গেলে মনস্তার আমাদের সবাইকে মে’রে ফেলবে।”
শুনলো না মাহি। একপ্রকার দূরছাই করল অফিসারের কথাটা। চোয়াল শক্ত করে গিয়ে বসল চেয়ারে। দু’হাত বুকের কাছে ভাঁজ করে আওড়াল,
“ যাব না আমি, বলেছি না? তারপরও জোর করছেন কেনো? আপনারা পুলিশ হওয়া স্বত্বেও একজন আসামিকে ভয় পাচ্ছেন? সিরিয়াসলি?”

হাঁটু কাঁপছে সবার! মেয়েটা কি আদৌও জানে সে কি বলছে? জানলে থোড়াই পটপট করত এতকিছু! অফিসার হাত উঠিয়ে আলগোছে নিজের ঘর্মাক্ত কপালখানা মুছে নিলেন কোনমতে। শুকনো ঢোক গিলে সামনে এগুতেই ঘটল আরেক কান্ড! কমব্যাট সবাই তক্ষুনি কিছু একটার কমান্ড পেলেন বুঝি! কানের এয়ারপোড থেকে হাত সরিয়ে সঙ্গে সঙ্গে রাইফেল তাক করলেন সবার মাথা বরাবর। এহেন কান্ডে তটস্থ সবাই! নিশ্বাস ফেলতে ভুলে গেলেন যেন। বেচারা অফিসারের মাথা বরাবরও বসেছে রাইফেলের নল। একটু এদিক-সেদিক হলেই গুলি বেরুবে খুলির এফোড় ছেড়ে ওফোড়! কমব্যাট কেমন গুরুগম্ভীর কন্ঠে সময় নিয়ে আওড়ালেন,
“ উনি আর পাঁচ মিনিটের মধ্যে আমাদের সাথে না গেলে, তোদের খুলি উড়িয়ে দেবার কমান্ড এসেছে! সো ক্যারি অন।”

কথাটা শুনতেই ভয়ে দেহ ছেড়ে আত্মা উড়ে যাবার যোগাড় সবার। কেউ কেউ নিশ্বাস আঁটকে ফেলেছে ইতোমধ্যে। অফিসার তখন আচমকা হাতপা ছড়িয়ে উবু হয়ে শুয়ে পড়লেন মাহির পায়ের নিকট। এহেন কান্ডে হকচকায় মাহি, তক্ষুনি গুটিয়ে নেয় পাদু’টো। ওদিকে অফিসার এবার আর্তনাদ জুড়েছেন। আহাজারি করতে করতে বলতে লাগলেন,
“ দয়া করুন মেডাম! একটু দয়া করুন। আপনি এক্ষুনি বাইরে না গেলে মনস্তার আমাদের গর্দান নিবে। প্লিজ মেডাম চলে যান! আমার একটা সংসার আছে! ছোট ছোট ছোট দুটো মেয়ে আছে।”
অসহায় মানবীর বুকটা বুঝি দুলে উঠল খানিক। মুখ থেকে তৎক্ষনাৎ সরে গেল শক্ত ভাবসাব। ঠোঁট দুটো ভেঙে ফুপিয়ে উঠল ফের। মুখখানা দু’হাতের আঁজলায় ঢেকে নিয়ে কাঁদতে কাঁদতে হেঁচকি তুলে বিড়বিড়ালো,
“ আমি যাবো না! আমি রাক্ষসটার সে নিশ্চিত আমায় মে’রে ফেলবে। আমায় আবারও মা’রবে।”
বিড়বিড়িয়ে বলা কথাটুকু আদৌও কেউ শুনল কি-না কে জানে! তাছাড়া শুনলেই বা কী? কেউ কি আর আঁটকাতে পারবে মনস্টারকে?

সারিবদ্ধভাবে দু-লাইনে এগোচ্ছে কমব্যাট। মাঝখানে গুনে গুনে পা ফেলে এগোচ্ছে মাহি। মাথাটা নুইয়ে রাখা তার! কাঁদতে কাঁদতে নাক-গাল ফুলিয়েছে বেশ। অদূরে দাঁড়িয়ে থেকে একজোড়া বাদামী চোখ ক্রুর চাহনিতে দেখছে মেয়েটাকে। মাহি’র সেদিকে থোড়াই খেয়াল আছে! মেয়েটা যত এগোচ্ছে ততই কটমটানো বাড়ছে মুগ্ধের। হাতের তালুতে জ্বলন্ত সিগারটা পিষে যাচ্ছে নির্দয় মানব। চোখদুটোতে লেপ্টে আছে আগুন।হাতদুটো বুঝি নিশপিশ করছে মেয়েটাকে দেখে। তার চোখের আগুনেই বুঝি এক্ষুণি জ্বলসে দিবে মাহি’কে। মেয়েটা বোধহয় দু’হাত দুরত্বে এসে দাঁড়ালো মুগ্ধের। আর ওমনি মুগ্ধের আগুন দৃষ্টি গিয়ে আটকালো মাহির ফর্সা মসৃণ গালে।

মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ২৬

সপ্তদশীর ফর্সা নরম গালটায় পাঁচ আঙুলের ছাপ স্পষ্ট! তা চোখ এড়ায়নি রাগী মানবের। মুহুর্তেই মুখাবয়বে পরিবর্তন ঘটল তার। সেথায় লেপ্টে গেল একরাশ জেদ! সে কেমন চটজলদি তেড়েফুঁড়ে এসে আচানক শক্ত হাতে চেপে ধরে মাহি’র নরম চোয়াল। এরূপ অতর্কিত আক্রমণে চোখ খিঁচে বন্ধ করে নিলো মাহি। চোয়ালের ব্যথায় ককিয়ে উঠল খানিক। ওদিকে হাতের জোর বাড়িয়েছে মুগ্ধ! মেয়েটার নরম তুলতুলে মুখখানা খানিক উঁচিয়ে খেয়াল করল গালটা। অতঃপর দৃষ্টিতে এক পশলা আগুন জ্বালিয়ে দাঁত কিড়মিড় করে হুংকার ছুঁড়ে বলল,
“ হু দা ফা’ক ডেয়ারড টু টাচ ইউ চাশমিস? জাস্ট টেল মি দা মাদারফা*কার’স নেইম!”

মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ২৮

4 COMMENTS

  1. Apu apnr golpota to anek sundor,,, daily part den porte aro besi Valo lage,,eivabei daily part diben apu..

Comments are closed.