Home মির্জা সায়ান মুগ্ধ মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ৩৫

মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ৩৫

মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ৩৫
jannatul firdaus mithila

মাথার ওপর খোলা আকাশ! যার বুকেতে জমে আছে থোকায় থোকায় কালো মেঘ। দূর আকাশপটের বোধহয় মন খারাপ আজ। যেন যেকোনো সময় নিজেকে উজার করে দিয়ে ধরণীর বুকে কান্না ঝরাবে! রাশিয়ার বালাশিখা শহরের মধ্যাঞ্চলে অবস্থিত গ্র্যান্ড ভ্যালি প্যালেস। প্রাসাদসম বাড়িটির হর্তাকর্তা নিকোলাস মারগ্রেট, রাশিয়ান ড্রাগ’স ডিলিং সাইডের অন্যতম গ্যাংস্টার।

প্রাসাদসম গ্র্যান্ড ভ্যালির ব্যাক ইয়ার্ডের সম্পূর্ণটা জুড়ে মস্তবড়ো এক সুইমিংপুল বিস্তৃত। খোলা আকাশের নিচে সুইমিংপুলের নিলাভ পানিতে শরীর ডুবিয়ে দাঁড়িয়ে আছে ত্রিশ বছরের সুদর্শন — নিক এবং তার প্রেয়সীরা! সুইমিংস্যুটে একেকজন বিদেশীনীরা সে-কি আবেদনময়ী ভাব ধরেছে! কেউ কেউ নিজ উদ্যোগে হাত বোলাচ্ছেে সুদর্শনের গায়ে, তো আবার কেউ কেউ এক ধাপ এগিয়ে খাবার তুলে দিচ্ছে যুবকের মুখে। যুবকের মুখাবয়বে লালসা স্পষ্ট! লম্বাটে দু’হাতে আগলে রেখেছে নিজ প্রেয়সীদের। মাঝেমধ্যে টুকটাক বাক্যে টিজ করে যাচ্ছে তাদের, এতেই যেন হাতে চাঁদ পেয়ে যাবার মতো খুশী একেকজন! আর পাঁচটা গ্যাংস্টারের তুলনায় নিকের আবার বড্ড নারীর শখ! বিছানায় রোজ নিত্যনতুন সুন্দরী না পেলে তার যেন চলেই না। নারীলিপ্সুক সুদর্শন লোভাতুর দৃষ্টে তাকিয়ে আছে সম্মুখে। অদূরেই স্নানে মত্ত অস্ট্রেলিয়ান সুন্দরী লিন্ডা, যিনি ক’দিন আগ অব্ধি ছিলেন আলেকজান্ডার নামক অস্ট্রেলিয়ান গ্যাংস্টারের সহধর্মিণী!

অথচ দূর্ভাগ্যক্রমে নিক নামক নারীলিপ্সুকের নজরে এসে সে আজ হয়েছে তার বিছানার সৌন্দর্যবর্ধনকারীণী! নিক মুচকি হাসলো। দু’হাতে আগলে রাখা রমণীদের আলগোছে ছেড়ে দিয়ে, নীলাভ পানিতে ঢেউ তুলে এগোয় সম্মুখে। অতঃপর কোনরূপ আগাম সতর্কসংকেত ছাড়াই একহাতে চট করে আকড়েঁ ধরে লিন্ডার উম্মুক্ত মেদহীন পাতলা কোমর। এহেন হুটহাট কান্ডে ভড়কায় লিন্ডা। তড়িঘড়ি করে শরীর ঘুরিয়ে পেছনে ফিরতেই নিকের লাগামহীন অধরযুগল এক ভিন্ন আধিপত্য ফলিয়ে আঁকড়ে ধরে যুবতীর নরম তুলতুলে ওষ্ঠপুট! লিন্ডা বিরক্ত! দেহের সর্বশক্তি প্রয়োগ করে দু’হাতে ঠেলে দিচ্ছে যুবকের উম্মুক্ত লোমহীন বুক। অথচ কান্ড দেখো! তার ওমন ব্যর্থ প্রয়াসে যুবক তো টললোই না উল্টো নিজ ওষ্ঠপুটের কাজ বহাল রেখে, এক হেঁচকা টানে যুবতীকে তুলে নিলো নিজ কোলে। লিন্ডা ছটফটাচ্ছে বেশ! রাগ-ক্ষোভে দু-চোখ দিয়ে ঝরাচ্ছে নিরব অশ্রু। নিক থামছেনা। নিজ উন্মত্ততায় মত্ত থেকে আগ্রাসী ভাব ঝরাচ্ছে যুবতীর নরম অধরযুগলে।

সময়ের কাটাঁ বহমান! প্রায় মিনিট পাঁচেক চলল নিকের লাগামহীন কান্ড। রয়েসয়ে অধর সরালো যুবক। শ্লেষাত্মক কায়দায় গৌরবর্ণা বিদেশিনীর বিড়াল চোখদুটোতে নজর ঠেকিয়ে ঠোঁট কামড়ে হাসলো একটুখানি। মুহুর্তেই এক আকাশসম ঘৃণায় লাল হয়ে গেল রমণীর মুখ। দাঁতে দাঁত চেপে সে তক্ষুনি করে বসল আরেক কান্ড। আচমকা মুখ থেকে একদলা থুতু নিক্ষেপ ক’রল সুদর্শনের ফর্সা মুখ বরাবর। তৎক্ষনাৎ নাক- মুখ কুঁচকে নেয় নিক। দাঁতে দাঁত চেপে কটমট শব্দ তুলে, আলগোছে হাত উঠিয়ে মুছে নেয় নিজ মুখ। ধীরেসুস্থে অক্ষিপুটের শক্ত চাহনি সরাসরি সম্মুখে নিক্ষেপ করে, আচানক এক হিং স্র থাবায় আঁকড়ে ধরে যুবতীর ঘাড়। ককিয়ে ওঠে রমণী! হাত উঁচিয়ে নিজেকে ছাড়ানোর বৃথা প্রয়াসে মত্ত থাকা অবস্থাতেই শুনল — নিকের কটমট কন্ঠ!
“ সারারাত আমার ভোগ্যবস্তু হিসেবে বেড কাপিয়েছিস, আর এখন কি-না সতী সাজতে এসেছিস? ইউ্য ব্লাডি স্লা’ট! এতো তেজ কিসের তোর?”
ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদছে রমণী! ক্ষত ঠোঁটের ফাঁক গলিয়ে অস্ফুটে বেরুচ্ছে ক্রন্দন ধ্বনি। নিকের মন গললো না তাতে। তক্ষুনি যুবক গলা উঁচিয়ে নিজ পিএ — মাকসের উদ্দেশ্যে বলে ওঠে —

“ মাকস!”
ত্রস্ত পায়ে পুলের ধারে এগিয়ে এসে দাঁড়ালেন মাকস। বলিষ্ঠদেহী আফ্রিকান লোক সে, দিনের আলোতেও মুখখানা স্পষ্ট নয় তার! বাধ্যগত কর্মচারীর ন্যায় তিনি কেমন মাথা নুইয়ে বললেন,
“ ইয়েস বস।”
রাগী মানব ফুঁসছে রাগে। এক ঝটকায় রমণীর ভেজা দেহখানা পুলের কার্নিশে উঠিয়ে, কটমট করতে করতে বলে ওঠে,
“ গো এন্ড হেভ হার! আগামী দু’ঘন্টা ও তোর। যতক্ষণ অব্ধি ওর জ্ঞান না হারাবে ততক্ষণ পর্যন্ত থামবি না। নাউ টেক হার এন্ড গেট লস্ট।“
এহেন বাক্য কর্ণকুহরে পৌঁছান মাত্রই আঁতকে ওঠে লিন্ডা। ভয়ার্ত ঢোক গিলে আমতা আমতা করে অনুনয় জুড়ে বলতে থাকে —
“ নো নো নো! নো নিক। প্লিজ ডোন্ট ডু দিস। ইউ্য নো দ্যাট আ’ম প্রেগন্যান্ট। প্লিজ ডোন্ট ডু দিস টু মি।”
তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটলো যুবকের বাদামী ঠোঁটযুগলে। পরক্ষণেই পুলভর্তি পানিতে চিৎ আকারে শরীর ডুবিয়ে সাতাঁর কাটতে কাটতে গমগমে গলায় বলে ওঠে,

“ জাস্ট এবোর্ট দিস ফা’কিং ননসেন্স। মাকস…. ”
শেষ বাক্যটুকু আওড়াতেই এগিয়ে এলেন মাকস। তড়িঘড়ি করে লিন্ডাকে পাঁজা কোলে তুলে নিয়ে, গতি বাড়ালেন পায়ের। ওদিকে মেয়েটা কাঁদছে! দু’হাত জোর করে অনুনয় করছেন মাকসকে। অথচ রমণীর এহেন অনুনয় মাকসের কানে গেল কি-না কে জানে! সে কেমন মিটমিটিয়ে হাসছে দেখো!
পুলের শীতল পানি থেকে মাত্রই গা উঠালো নিক। বলিষ্ঠ টানটান দেহখানা খানিক নাড়িয়ে চাড়িয়ে, পুল লেডারে পা রাখতেই অদূর থেকে ছুটে এলেন একজন সশস্ত্র রক্ষী। লোকটা এসেই কেমন হড়বড়িয়ে আওড়ালেন,
“ বস! একজন ডক্টর আপনার সাথে দেখা করতে এসেছে। বলল — ইট’স আর্জেন্ট।”
পুল লেডার বেয়ে পাড়ে উঠে এলো নিক। ভ্রু গুটিয়ে ঘাড় বাকিয়ে আলগোছে তাকাল রক্ষীর পানে। পেছন থেকে আরেক বিদেশিনী এগিয়ে এসে, আলতো করে একখানা বাথরোব জড়িয়ে দিচ্ছে যুবকের গায়ে। যুবক নিরব কায়দায় পরছে তা। সময় নিয়ে রক্ষীর পানে একপলক তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করে পরক্ষণে পা ঘোরালো উল্টোপথে। একহাতে বিদেশীনীকে জড়িয়ে ধরে এগোতে এগোতে কর্কশ কন্ঠে বলে ওঠে,

“ বলে দে আ’ম বিজি!”
শুনলেন রক্ষী। তবে পরমুহূর্তেই বড্ড চিন্তিত গলায় পেছন থেকে শুধালেন,
“ বাট ইট’স এবাউট মনস্তার বস!”
হুট করেই পাদুটো থমকায় নিকের। মনস্টারের নাম শুনতেই শরীরখানা অজান্তেই বোধহয় ঝাঁকিয়ে উঠল তার। নিজ হতবাকতা কোনরকমে দমিয়ে রেখে যুবক তড়িঘড়ি করে পা ঘুরিয়ে চলে এলো রক্ষীর পানে। শক্তপোক্ত দু’হাতে রক্ষীর কাধঁ ঝাঁকিয়ে হড়বড়ানো কন্ঠে আওড়াল —
“ কি বললি? মনস্তারের বিষয়ে মানে? কে এসেছে দেখা করতে?”
শুকনো ঢোক গিললেন রক্ষী। শুষ্ক অধরজোড়া সিক্ত জিভের ডগা দিয়ে খানিক ভিজিয়ে নিয়ে, কাঁপা কাঁপা কন্ঠে আওড়ালেন,
“ ডক্টর দামিয়ান, দ্য ফেমাস মেডিসিন স্পেশালিষ্ট ইন টাউন।”

দূর আকাশে গর্জন তুলছে মেঘ! ঝড়ো হাওয়ায় মুখরিত চারপাশ। এই বুঝি আকাশভাগ কাঁপিয়ে নেমে আসবে বারিধারা। সপ্তদশীর চঞ্চলা মন উৎ পেতে আছে বৃষ্টি নামার অপেক্ষায়। ঝড়ো হাওয়ার ঠান্ডা পরশে কাঁপা-কাঁপি অবস্থা বদনের, তবুও তার শখ দেখো! এই অবেলার বৃষ্টিতে ভিজবার জো তুলেছে মনে মনে। চঞ্চলা হরিণীর ন্যায় দরজার কাছে পা ছোটাচ্ছে মাহি। এখনি বাইরে বের নাহলে বৃষ্টিতে ভিজবে কেমন করে? এদিকে কিউটিটাও কি সুন্দর কুটকুট শব্দ তুলে ছুটছে মনিবের পিছুপিছু। তবে সপ্তদশীর চঞ্চলা কদম হুট করেই থেমে গেল ঘরের দরজার কাছে এসে। সামনেই পথ আটকে দাঁড়িয়ে আছেন দেহরক্ষী দু’জন। তা দেখে মুখটা কেমন থমথমে হয়ে গেল সপ্তদশীর। কপাল কুঁচকে বোঝবার চেষ্টা চালালো — আজ হঠাৎ দেহরক্ষী দু’জনের ওমন হুটহাট কঠোরতার কারণ। তবে মিনিট খানেক পেরুলেও রক্ষীদের এহেন পরিবর্তনের কারণ খুঁজে পায়নি সপ্তদশী। সুশ্রী গৌরবর্ণা মুখখানায় এক পশলা মেঘ জমিয়ে, পরক্ষণেই কেমন নরম গলায় বলল,
“ পথ আটকালেন কেনো? আমি বৃষ্টিতে ভিজবো। আমায় বাইরে যেতে দিন।”
জিভহীন লোকদুটোর মুখ দিয়ে থোড়াই কথা বের হবে! বাধ্য লোক দু’টো কি এক বাধ্যতায় মাথা নুইয়ে ঠায় পথ আটকে দাঁড়িয়ে রইলেন। সপ্তদশীর রাগ হলো এবার! ললাটে পড়ল গভীর ভাঁজ। মুহুর্তেই নাকের সরু ডগাটা কেমন লাল হয়ে গেল টমেটোর ন্যায়। দু’হাত বুকের কাছে বেঁধে সপ্তদশী ফের কাঠকাঠ কন্ঠে বলল,

“ যেতে দিবেন কি-না বলুন?”
এবারেও নিরুত্তাপ লোকদুটো। সপ্তদশী হার মানলো তা দেখে। পরাজিত সৈনিকের ন্যায় ভার হয়ে গেল তার কাঁধ! হাতদুটো বুকের কাছ থেকে আলগোছে নামিয়ে, কালো মুখে সরে গেল দরজার প্রান্ত থেকে। কই একটু বৃষ্টি ভেজার শখ করেছিল সপ্তদশী, সেটাও কি-না ওমন অপূর্ণই থেকে গেল? দুঃখ ভারাক্রান্ত হৃদয়ে সপ্তদশীর ক্ষীণ কদম টুকটুক করে এগোলো জানালার দ্বারে বিছিয়ে রাখা কাউচের পানে। সেথায় নরম দেহটা খানিক এলিয়ে দিলো মাহি। কাঁদো কাঁদো মুখে জানালার বাইরে মুখ করে বসে রইলো চুপচাপ। মুহুর্ত ব্যয়েই আকাশ চিঁড়ে নেমে এলো ঝুমবৃষ্টি। মাহি আক্ষেপ নিয়ে তাকিয়ে রইল বৃষ্টির পানে। তার চোখদুটো ভরে উঠছে ক্রমশ। গালের পিঠে হাত উঠেছে আনমনেই। বৃষ্টির পানে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকতেই আচমকা তার চোখ গিয়ে আটকালো গার্ডেনের দিকে। ঝুম বৃষ্টি ভেদ করে এগোচ্ছে এক ছটাক আলো। কি তীক্ষ্ণতা সে আলোর! সপ্তদশী সবকিছু ভুলিয়ে উৎসুক দৃষ্টে তাকিয়ে রইলো সেদিকে। ধীরে ধীরে গার্ডেনের বড়বড় চেরি ব্লসম ট্রি-র আড়াল থেকে দেখা গেল একখানা কালো রঙা বাইককে। মাহি দৃষ্টি তীক্ষ্ণ করল। হাত উঁচিয়ে চোখের চশমাটা খানিক ঠিকঠাক করে নিয়ে ফের তাকালো গার্ডেনের দিকে।

সন্ধ্যে হলেও আকাশে মেঘেদের তীব্র উপস্থিতি রাত নামিয়েছে যেন। অন্ধকারে স্পষ্ট নয় বাইকে বসে থাকা মানুষটা। কায়দা করে ধীরে ধীরে এগিয়ে নিচ্ছে বাইক। তবে এরইমধ্যে বাইকের আবার হুট করে কি হলো কে জানে! ঠিক মাহি’র জানালার নিচে এসে ব্রেক কষল আচমকা। মাহি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র চোখে দেখছে সব। মাথার ওপর ঝুম বৃষ্টি নিয়ে, চেরি ব্লসম গার্ডেনের গোলাপি আভায় ছেয়ে থাকা জমিনের ওপর দাঁড়িয়ে আছে কোয়াসাকি নিনজা এইচটুআর ব্র্যান্ডের কালো চকচকে বাইকখানা। বাইকে বসে আছে একজন বলিষ্ঠ পুরুষ! গায়ে তার চিরচেনা কালো রঙা ওভার কোট, ভেতরে শার্টের উপস্থিতি নেই। ফলাফল স্বরুপ — ফর্সা লোমহীন পেটানো বক্ষখানা সহজেই চক্ষুগোচর হচ্ছে। মাথার ওপর কালো রঙা হেলমেট! সম্মুখের শাটার খুলে রাখায় পিয়ার্সিং করা বদামী চোখদুটো দৃশ্যমান। যুবক রয়েসয়ে ঘাড় উঁচিয়ে তাকায় প্যালেসের দোতলার দিকে। মুহুর্তেই তার বাদামী চোখদুটোর সনে চোখাচোখি হলো চশমা পরুয়া একজোড়া ভীতু চোখের। মাহি ভ্রু গোটায় তৎক্ষনাৎ। বিচক্ষণতার সঙ্গে মস্তিষ্ক তক্ষুনি বুঝে নেয় — লোকটা আর কেউ নয় বরং বিস্ট। সপ্তদশীর ললাটের ভাঁজ গাঢ় হলো এপর্যায়ে। জানালার কাছ থেকে তড়িঘড়ি করে খানিকটা আড়াল হয়ে বসল মানবী। তবে পরক্ষণেই তার মোটা মাথায় জুড়ে বসল আরেক চিন্তা! সে কেমন হড়বড়িয়ে জানালার বাইরে মুখ এনে মুগ্ধকে ডেকে বলল,

“ এই বিস্ট শুনুন!”
একদৃষ্টে এখনো চেয়ে আছে রূঢ় মানব। পলক আদৌও ফেলেছে কি-না কে জানে! সপ্তদশীর নরম কন্ঠের ডাক শুনে হেলমেটের আড়ালেই অধরযুগল দাতেঁর সনে খানিক পিষ্ট হলো বোধহয়। সময় নিয়ে গমগমে গলায় প্রতিত্তোরে বলল,
“ ঝেড়ে কাশ বান্দীর মেয়ে!”
মুখটা তৎক্ষনাৎ বিরক্তিতে তেঁতো হয়ে গেল সপ্তদশীর। গাল বেঁকে গেল নারাজিতে। তবুও সে মুখ খুলে কাঠকাঠ কন্ঠে আওড়াল,

“ বৃষ্টিতে ভিজবো কিন্তু আপনার গার্ডরা আমায় ঘর থেকে বেরুতে দিচ্ছে না। ওদের বলুন আমায় যেতে দিতে!”
যুবকের কপালের চামড়ায় ভাঁজ পড়ল মনে হচ্ছে। চোয়ালটাও কেমন কটমটিয়ে উঠল হেলমেটের আড়ালে। মেয়েটাকে আর বিশ্বাস হচ্ছে না নির্দয় মানবের। তাইতো রক্ষীদের আদেশ করেছে কঠোর হতে। যুবক দৃষ্টি সরু রেখে, তক্ষুনি গলা উঁচিয়ে ধমকে বলল,
“ এতো তারাতাড়ি ম’রার শখ উঠল কেনো বান্দীর মেয়ে? বেঁচে থাকতে খুব কষ্ট হচ্ছে? তাহলে বল — এতো দোনোমোনো না করে, এক্ষুনি মে’রে ফেলি।”
সপ্তদশী হতভম্ব! একটা স্বাভাবিক আবদারের পিঠে এহেন তিরস্কার শুনে ব্যথিত হলো তার দূর্বল হৃদয়। চোখেমুখে আঁধার লেপ্টে সে তক্ষুনি গা লুকিয়ে বসল জানালার কাছে। অভিমানীনী রাগ করেছে! নাকের পাটা ফুলিয়ে বসে আছে ভেতরে। যুবক বোধহয় ক্ষীণ হাসল হেলমেটের আড়ালে। আচমকা বাহাতের তর্জনী এবং মধ্যমা একযোগে উঁচিয়ে প্যালেসের দোতলার দিকে তাক করে গমগমে গলায় ডাকল —
“ হেই চাশমিস! লুক!”
তৎক্ষনাৎ ফুলো ফুলো গালে জানালার বাইরে ঘাড় বার করল মাহি। ভ্রু গুটিয়ে সন্দিগ্ধ দৃষ্টিতে যুবকের পানে তাকিয়ে থেকে কাঠকাঠ কন্ঠে জবাব দিলো —

“ কি হয়েছে?”
যুবক ক্রুর হাসলো! হেলমেটের আড়ালে তা থোড়াই নজর কাড়ল সপ্তদশীর! সে কেমন একদৃষ্টে যুবকের পানে তাকিয়ে থাকতেই দেখল — বেয়াদব মনস্টার তার দু’হাতের ইশারায় বোঝাচ্ছে, সপ্তদশীকে এনে বাইকের বসাবে তাও আবার তারই সামনে। মাহি’র কুঁচকে রাখা ভ্রু দ্বয় কুঁচকে গেল আরও। নজর আরেকটু তীক্ষ্ণ করতেই দেখল, যুবক এবার নিজ অশালীন অঙ্গ ভঙ্গিতে কোনরূপ রাখঢাক না রেখে, তাকে দেখিয়ে দেখিয়ে অশোভন কায়দায় কোমর নাড়ছে দোলায়মান ভঙ্গিতে। মাহি ভড়কায়! তীক্ষ্ণ বুদ্ধিসম্পন্না মুহুর্তেই বুঝে গেল মনস্টারের অসভ্য কান্ড কারখানার মানে। তৎক্ষনাৎ রণমুর্তি ভাবে আবির্ভূত হলো সপ্তদশী। দাঁতে দাঁত চেপে শক্ত করল চোয়াল। তা বুঝি বেশ দেখলেন অসভ্য বিস্ট। বেহায়া আঙ্গিকে কোমড় নাড়াতে নাড়াতে তক্ষুনি বাহাতের বৃদ্ধ আঙুল এবং তর্জনী একযোগে উঁচিয়ে ইশারা করল গোলাকার বৃত্তের। অতঃপর ব্যাঙ্গাত্মক ভঙ্গিমায় ডানহাতের তর্জনী উঁচিয়ে বাহাতের বৃত্তে ঘুরিয়ে তাচ্ছিল্যের সুরে গলা উঁচিয়ে বলল —

“ ফা’ক ইউ্য চাশমিস!”
কটমট করছে মাহি! চোখের কোটর ভরে গিয়েছে অপমানের অশ্রুতে। লোকটা তাকে ভাঙতে চাচ্ছে! নিত্যনতুন কায়দা খুঁজছে অপমান করার। সপ্তদশীর নারী সম্মানে বড্ড আচঁ লাগল বুঝি। অজান্তেই রাগ-ক্ষোভে তার হাতদুটো হয়েছে মুষ্টিবদ্ধ। দাঁতে দাঁত চেপে অশ্রু ঝরাতে থাকা সপ্তদশী আচানাক রাগের চোটে ঘুষি বসালো জানালার দেয়ালে। দাঁত কিড়মিড় করতে করতে শুধালো,
“ ব্লা’ডি বি’স্ট!”
ওদিকে তার ওমন ঘুষি বসানো দেখে মুহুর্তেই স্থবির হলো মুগ্ধ। চোখদুটোর খোলস থেকে এক নিমিষেই কেটে গেল এতক্ষণের শ্লেষাত্মক কটাক্ষ ভাবসাব! সেথায় এবার ভীড় জমালো অবাধ রাগ। চোয়ালের পেশি টানটান হলো মুগ্ধের। বৃষ্টির ঝড়ো বেগে শোনা যাচ্ছে না দাঁতের কটমট শব্দ। যুবক তক্ষুনি পা ঘুরিয়ে নেমে গেল বাইক থেকে। অতঃপর নিজ দাম্ভিক কদমে গটগটিয়ে এগোলো প্যালেসের দিকে। মাহি দেখল না সেসব! অপমানে বুক কাঁপছে তার। মাথার তালু জ্বলছে সেই সাথে!

গা ভিজে চুপচুপে অবস্থা! ওভারকোটের কোণ হতে টুপটুপ করে ঝরে পড়ছে পানির কণা। একহাতে ধরে রাখা হেলমেটখানা! দাম্ভিক কদমে সগৌরবে গটগটিয়ে এগোচ্ছে মুগ্ধ। দাঁতে দাঁত কিড়মিড় করছে অনবরত। এলিভেটর তিন তলায় এসে থামতেই যুবক পা রেখেছে প্রশস্ত করিডরে। ধুপধাপ পায়ে সপ্তদশী কক্ষের পানে এগোতেই দরজার কাছে দাঁড়িয়ে থাকা দেহরক্ষী দু’জন তড়িঘড়ি করে হাঁটু গেঁড়ে মাথা নুইয়ে বসলেন জমিনে। যুবক সেদিকে ভ্রুক্ষেপহীন! চোয়াল শক্ত করে ফুটিয়ে, গটগটিয়ে ঢুকলো মাহি’র কক্ষে। এক ঝটকায় হাতের হেলমেটখানা ফ্লোরে ছুঁড়ে ফেলতেই ঝনঝনিয়ে উঠল তা। সে-ই শব্দ কানে যেতেই হকচকিয়ে ওঠে মাহি। ভড়কে গিয়ে মাথা তুলে হাঁটুর ভাঁজ হতে। এদিকে মুগ্ধ ফোঁস ফোঁস করছে। দাঁতে দাঁত চেপে বলে ওঠে,

“ হাউ ডেয়ার ইউ্য?”
বোকা মাহি অবোধের ছাপ ফুটিয়েছে নিজ মুখাবয়বে। একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে যুবকের পানে। রাগের চোটে কপালের রগগুলো স্পষ্ট যুবকের, চোয়াল ফুটেছে ব্লেডের ন্যায়! হিং স্র যুবক তক্ষুনি এগিয়ে এসে আচমকা এক হেঁচকা টানে টেনে ধরে মাহি’র ডানহাত। এহেন কান্ডে হকচকানোর সময় পায়নি সপ্তদশী, তার আগেই যুবকের হেঁচকা টানে ব্যথায় মুখ কুঁচকে নেয় বেচারি। ইশশ্! হাতটা বুঝি জয়েন্ট ছেড়ে এই বুঝি খুল পড়বে!ওদিকে যুবক উম্মাদ! উদ্ভ্রান্তের ন্যায় মাহি’র ডানহাতটা উল্টেপাল্টে দেখতে দেখতে কটমটিয়ে বলে,
“ কোন জায়গায় লেগেছে বান্দীর মেয়ে? কোন জায়গায় ব্যথা লেগেছে তারাতাড়ি বল জানোয়ারের বাচ্চা।”
এহেন কথায় যারপরনাই অবাক হলো সপ্তদশী। পরমুহূর্তেই চোখভরা ঘৃণা নিয়ে তাকালো যুবকের পানে। যুবক অস্থির! ব্যাকুল চিত্তে মাহির হাত উল্টেপাল্টে দেখতেই হঠাৎ খুঁজে পেল ব্যথা পাওয়া জায়গাটা। সেথায় কেমন কালচে ভাব ধরে গিয়েছে ইতোমধ্যে! যুবকের রাগ বাড়ল বোধহয়। দৃঢ় চোয়ালখানা শক্ত হলো আরও। দাঁতের তীব্র ঘর্ষণে কটমট শব্দ তুলে আচানক এক আগ্রাসী থাবায় আঁকড়ে ধরল মাহি’র নরম তুলতুলে চোয়ালখানা। ব্যথায় ককিয়ে ওঠে মাহি! মুখ কুঁচকাতেই শুনতে পেল — মুগ্ধের দাঁত কিড়মিড় কন্ঠ!

“ মুখে উত্তর দেওয়ার সাহস নেই তোর জানোয়ারের বাচ্চা?
“ মুখে বলার সাহস নেই তোর জানোয়ারের বাচ্চা? কোন সাহসে দেয়ালে হাত ঠুকলি তুই? কে দিলো তোকে এই সাহস? কলিজা বেশি বড়ো হয়ে গেছে বান্দীর মেয়ে? আমার খেয়ে, আমার পরে আমার সামনেই আমার ব্যাক্তিগত অধিকারে আঘাত করিস — তোর দেখি মুখ থেকে পেছন অব্দি কলিজা ভরা! ইট্টুনুক একটা বিল্লোর এত্ত তেজ! কথায় না পেরে গায়ে আঘাত করে। এক্কেবারে হাত-পা কে’টে পঙ্গু বানিয়ে ঘরে বসিয়ে রাখব বান্দীর মেয়ে!”
ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদছে মাহি। ছলছল চোখজোড়ায় সে-কি মায়া। যুবক একপলক সেদিকে তাকিয়ে থেকে পরমুহূর্তেই চোখ সরালো অন্যত্র। সরু নাকের পাটাখানা ফুলিয়ে লম্বা এক নিশ্বাস টেনে, ঠোঁট গোল করে নিশ্বাস ফেলল পরক্ষণে। এক ঝটকায় মাহি’র চোয়াল ছেড়ে দিয়ে রূঢ় মানব গিয়ে দাঁড়াল দু-কদম দুরত্বে। সাপের ন্যায় ফোঁস ফোঁস করতে করতে, হাত উঁচিয়ে ঘাড় ডলছে অনবরত। তবে সেকেন্ড ত্রিশেক যেতে না যেতেই রঙ পাল্টালো যুবকের মুখ। সেথায় এবার ভর করল একরাশ রহস্যময় রূঢ়তা। সে কেমন ঘাড় বাকিয়ে ক্রন্দনরত সপ্তদশীর পানে তাকিয়ে থেকে গমগমে গলায় বলল,

“ বৃষ্টিতে ভিজবি না? চল তাহলে! তোর এই শেষ ইচ্ছেটা পূরণ করি।”
হতবিহ্বলের ন্যায় মুখ তুলে তাকায় মাহি। কানে ভুল শুনল কি-না যাচাই করতে আহাম্মকের মতো চেয়ে রইল কিয়তক্ষন। বোকার ন্যায় জিজ্ঞেস করল,
“ শেষ ইচ্ছে মানে?”
রূঢ় মানব রহস্যময় ভঙ্গিতে বাঁকা হাসলো কেমন। রয়েসয়ে এগিয়ে এসে আলতো করে হাত উঁচিয়ে রাখল মাহি’র মাথায়। সেথায় খানিকক্ষণ অল্প অল্প করে ব্যাথাহীন চাপড় বসিয়ে ভরাট কন্ঠে বলল,
“ মানুষের জীবন বড্ড ক্ষীণ চাশমিস! তাই আমাদের প্রতিটি দিন জীবনের শেষদিনের মতো কাটানো উচিৎ। বলা তো যায়না — কার মরণ ঠিক কখন হয়ে যায়।”
অবোধ মাহি বুঝলোনা যুবকের মোটা বাক্য। কান্না ভুলে কেমন অনুভূতিশূন্য চোখে তাকিয়ে রইলো কিয়তক্ষন। যুবক নজর সরায় অন্যত্র। সপ্তদশীর সামনে থেকে সরে গিয়ে দাঁড়ায় দু-কদম দুরত্বে। ভাবলেশহীন ভঙ্গিতে দু’হাত পকেটে গুঁজে গমগমে গলায় বলে,

“ যা!”
সপ্তদশী কাঁপা কাঁপা পাদু’টো সময় নিয়ে ঠেকালো ফ্লোরে। শুকনো ফাঁকা ঢোক গিলে বসা ছেড়ে দাঁড়িয়ে আরেকবার ঘুরে তাকায় রূঢ় মানবের পানে। আমতা আমতা করে মায়াবী কন্ঠে জিজ্ঞেস করল,
“ সত্যি যাবো? গেলে মা’রবেন নাতো?”
যুবক তীক্ষ্ণ দৃষ্টি তাক করল এপর্যায়ে। পিয়ার্সিং করা ঠোঁটদুটো খানিক নাড়িয়ে চাড়িয়ে রহস্যময় কন্ঠে বলল —
“ এটাই শেষ! আজকের পর থেকে আর কোনোদিন মা’রতে হবে না তোকে।”
সপ্তদশীর মনে চলছে হাজার উচাটন। তবুও বৃষ্টি ভেজার ইচ্ছে পূরণ করতেই হবে তার। শেষবার যখন বাড়িতে ছিলো, তখন মা বলেছিল — বৃষ্টি ভিজলে না-কি মনের সকল দুঃখকষ্ট বৃষ্টির পানির সাথে ধুয়েমুছে যায়। সপ্তদশীর মনভরা কষ্ট! যার ভার বয়ে চলতে বড্ড কষ্ট হচ্ছে তার। তাই তো সে চাচ্ছে এ কষ্ট কমুক। বৃষ্টিতে ভিজলে যদি কষ্ট কমে, তবে নাহয় তা-ই হোক। মাহি ফাঁকা ঢোক গিলে চুপচাপ বেরিয়ে গেল ঘর ছেড়ে। মুগ্ধ একদৃষ্টে তাকিয়ে দেখল সপ্তদশীর চলে যাওয়া। ধীরেসুস্থে হাত ঘুরিয়ে কোমরের পেছন থেকে নিজের চিরচেনা AQ7 মডেলের বন্দুকটি বার করে এনে, যুবক উল্টেপাল্টে দেখতে লাগল তা। পরক্ষণে বিড়বিড়িয়ে আওড়াল,
“ ভেবেছিলাম আর ক’টাদিন বেঁচে থাকবি চাশমিস! তবে তা আর হলো কই?”

প্রশস্ত করিডর দিয়ে হাঁটছে মিলা। পায়ের গতি এগোচ্ছে মাহি’র ঘরের দিকে। তবে মাঝপথেই ডানহাতের কব্জিতে বিশাল এক টান বসল তরুণীর। মুহুর্তেই ক্ষুদ্র শরীরখানা তার ছিটকে চলে গেল করিডরের পাশের কামরায়। এহেন অতর্কিত কান্ডে হকচকিয়ে ওঠে মিলা। ভড়কানো দৃষ্টে সামনে তাকাতেই মুখোমুখি হলো এডউইনের। তক্ষুনি কুঁচকে গেল তরুণীর ললাট। ঠোঁট নাড়িয়ে কাঠকাঠ কন্ঠে যেইনা কিছু বলতে যাবে ওমনি কোনরূপ বলাকওয়া ছাড়াই শক্ত হাতে তরুণীর কন্ঠা চেপে ধরে এডউইন। গম্ভীর মুখো যুবকের চোয়াল কাঁপছে রাগে। ভিন্ন রঙের চোখদুটোয় লেপ্টে গিয়েছে আগুন। যুবক গলায় একরাশ ঝাঁঝ ঢেলে দাঁত খিঁচে আওড়াল,

“ মুনবার্ডের কাছ থেকে দূরে থাকো গ্লুপায়া! আদারওয়াইজ, আমার হাতে তোমার মরণ নিশ্চিত।”
মুহুর্তেই পাল্টে গেল তরুণীর মুখব্যাক্তি। সেথায় এবার ভীড় জমালো একরাশ কুটিলতা। ঠোঁটের কোণে আচমকা ফুটে উঠল এক চিলতে রহস্যময় বাঁকা হাসি। মেয়েটা কেমন কাঠকাঠ কন্ঠে ত্বরিত জবাব দিলো,
“ আপনি যেটা চাচ্ছেন, সেটা আমি ম’রে গেলেও হতে দিবোনা এডউইন। ওকে আমি ওর সঠিক জায়গায় পাঠিয়েই ছাড়ব! এতে আমার মরণ হলে হোক। আমি প্রস্তুত!”
চোয়াল শক্ত হলো এডউইনের! মিলার কন্ঠায় চেপে রাখা হাতখানার জোর বাড়িয়ে সে কেমন কটমট কন্ঠে আবারও বলে ওঠে,

“ স্টে ইন ইউ্যর লিমিট গ্লুপায়া, আদারওয়াইজ আ’ল কিল ইউ্য।”
তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটলো মিলার পাতলা অধর কোণে। নিশ্বাস আঁটকে আসার যোগাড় হলেও মেয়েটা কেমন রয়েসয়ে থেমে থেমে বলল,
“ একটা কথা বলি এডউইন?”
যুবক শিথিল করল নিজ ভ্রু দ্বয়। তরুণীর পানে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতেই তরুণী ব্যাঙ্গাত্মক কন্ঠে বলল,
“ ফা’ক ইউ্য!”
মুহুর্তেই দাউদাউ করে জ্বলে উঠল এডউইনের মাথার তালু। সদা গম্ভীর ভাব ধরে রাখা যুবক আজ নিজ হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে আচমকা কষিয়ে থাপ্পড় বসালো মিলার গাল বরাবর। একের পর পর চপেটাঘাতে কুপোকাত তরুণীর নরম গাল। ঠোঁটের কোণ ফেটে গিয়ে যাচ্ছে তা-ই অবস্থা! দূর্বল তরুণী গায়ের জোর ধরে রাখতে না পেরে তক্ষুনি লুটিয়ে পড়ল মেঝেতে। এডউইন থামলো এবার। রাগে গজগজ করতে করতে খানিকটা নুইয়ে এসে তৎক্ষনাৎ মুঠোয় চেপে ধরে মিলার চুল। অতঃপর মেয়েটার কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলে,

“ স্টে এওয়ে ফ্রম মা’ই ওয়ে! আমি এবার আর কাউকে মানব না। না তোকে, না মনস্টারকে!”
কথাটা শেষ করে তক্ষুনি মিলাকে ছেড়ে দিয়ে উঠে দাঁড়ায় এডউইন। গজগজ করতে করতে পা বাড়ায় ঘরের বাইরে। এলোমেলো দৃষ্টিতে এদিক-ওদিক তাকাতেই আচমকা তার চোখাচোখি হলো অদূরে দাঁড়িয়ে থাকা মনস্টারের পানে। মুহুর্তেই স্থির হলো এডউইন। মাথাটা তৎক্ষনাৎ ঝুঁকিয়ে নিয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলো কেমন। মুগ্ধ কঠিন দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে এডউইনের পানে। একহাতে তার রিভলবার স্পষ্ট! চোয়াল শক্ত করে ফুটিয়ে যুবক গুনে গুনে পা ফেলে এগিয়ে এসে দাঁড়ালো এডউইনের পাশে। খানিকক্ষণ মৌন থেকে আচমকা কঠিন গলায় বলতে লাগল,
“ তুই যা করছিস সেটা মাঝপথেই থামিয়ে দে এডউইন!”
এই প্রথম মনস্টারের বাক্য এড়াতে উদ্যোত এডউইন। মাথাটা ঠায় নুইয়ে রেখে শান্ত অথচ রূঢ় কন্ঠে জবাব দিলো,
“ সম্ভব না মনস্তার!”

মুহুর্তেই কটমট করে উঠল মুগ্ধের চোয়াল। একহাতে তক্ষুনি রিভলবার অন করতে করতে কঠিন গলায় শুধালো,
“ তাহলে গার্ডেনে দু’টো কবর খুঁড়ে রাখ এডউইন! কেননা পরবর্তীতে নিজের কবর খোঁড়ার সময় পাবিনা হয়তো।”
কথাটা বলেই পায়ে গতি টেনেছে রুশদী কিং। চলে যাচ্ছে নিজ গন্তব্যে। এদিকে সে পাশ থেকে সরতেই আচানক হাঁটু গেঁড়ে মেঝেতে বসে পড়ে এডউইন। এতক্ষণের রূঢ় মানব এবার কেমন কাঁপছে দেখো! অস্থিরতায় শুষ্ক অধরজোড়া জিভ দিয়ে খানিক ভিজিয়ে নিয়ে আনমনে বিড়বিড় করে বলতে লাগল,

“ আমি পারবোনা মনস্তার! আমি পারবো না। আমি বেঁচে থাকতে মুনবার্ডকে আপনি মা’রতে পারবেন না। কারণ আর কেউ জানুক বা না জানুক, আমি জানি মনস্তার — ইউ্য আর ডিপলি অবসেসড উইথ হার। আমি এটাও জানি, আপনি আপনার মায়ের শেষ শত্রুকে মে’রে দিয়ে আপনি নিজেও আত্মহত্যা করবেন! কারণ আপনার বেঁচে থাকার কারণ ফুরিয়ে যাবে সেদিন! কিন্তু আপনার কিছু হয়ে গেলে এই পুরো সাম্রাজ্যের কি হবে মনস্তার? স্বয়ং রুশদী কিং না থাকলে রুশদী প্যারাডাইসের কি হবে? না না! আমি থাকতে আপনি নিজেকে শেষ করতে পারবেন না। দুনিয়া এসপারওসপার হয়ে গেলেও আমি আপনাকে বুঝিয়ে ছাড়বোই যে — ইউ্য আর ইন লাভ উইথ মুনবার্ড! আপনার বাকিটা জীবন বেঁচে থাকার কারণ হবে ঐ সাধারণ মেয়েটা। এতটুকু বোঝাতে গিয়ে আমার যদি মরণও হয়, তবে তাই সই।”

মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ৩৪

প্যালেসের বাইরে পা রেখেছে মুগ্ধ! ঝুম বৃষ্টি মাথা নিয়ে ফের হাঁটছে গার্ডেনের দিকে। হাতে তার বন্দুক! কন্ঠে চাপা ক্ষোভ। যুবক কেমন বিড়বিড়িয়ে আওড়াচ্ছে —
“ দুনিয়া এসপারওসপার হয়ে গেলেও তোর মরণ আমার হাতে নিশ্চিত বান্দীর মেয়ে! আর সেটা আজকেই।”

মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ৩৫ (২)

3 COMMENTS

  1. আপু পরের পর্ব দেন তাড়াতাড়ি 🤨😌💖💐🍁💗💗❤️❤️

Comments are closed.