মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ৪৬ (২)
jannatul firdaus mithila
“ হয়তো! তবে সে হৃদয়ে কনক্রিট জমেছে! প্রতিশোধ আর হিং স্রতার কনক্রিট!”
থমকায় রূঢ় মানব! থমকায় তার মুখো অভিব্যক্তি। বাদামী চোখদুটোয় তার মুহুর্তেই ছেয়ে গেল একরাশ গভীরতা! রুক্ষ বক্ষভাজের ঠিক বাঁপাশে ঠায় লেপ্টে আছে সপ্তদশীর নরম তুলতুলে হাতখানার পরশ! বুকের খাঁচায় লুকায়িত অঙ্গটা যেন দ্রিম দ্রিম শব্দ তুলতে ব্যস্ত। অস্থিরতায় কাবু হয়েছে মন! যুবক কেমন আলগোছে হাত উঁচিয়ে স্পর্শ করল — মাহি’র নরম মাখনের ন্যায় কপোলখানা। সপ্তদশী নিষ্পলক! বোধবুদ্ধি হারিয়ে বেহায়ার মতো তাকিয়ে আছে মানবের গাঢ় বাদামী চোখদুটোর পানে। মুগ্ধ খানিক সময় নিলো! রুক্ষ আঙুলগুলো আলতো করে বুলিয়ে দিলো মেয়েটার মসৃণ গালে। দৃষ্টি তীক্ষ্ণ রেখে ডুব দিলো মানবীর মায়াবী চোখদুটোর গহীনে। আজ যেন চোখ দিয়েই একে-অপরের মনোভাব ব্যক্ত করবে এ যুগল! সময় কতটুকু পেরুলো কে জানে! যুবক আচমকা ঠোঁটের কোণে একটুকরো আহত হাসি ঝুলিয়ে শুধালো,
“ যার চোখেতে জমাট বেঁধেছে ঘৃণার অবোধ্য বিবমিষা! সে থোড়াই বুঝবে, কনক্রিটের আস্তরণে বন্দী থাকা অন্তরের তৃষ্ণা!”
সহসা দৃষ্টি নড়বড় হলো মাহি’র! সে আজ বড়ো বুদ্ধিমতি। বিচক্ষণে বুদ্ধির ভাব নিয়ে আচানক মুখাবয়বে ফোটালো একরাশ গাম্ভীর্যের ছাপ! মানবের মুখপানে একদৃষ্টে তাকিয়ে থেকে ভারী আহত কন্ঠে আওড়াল,
“ আপনার নারী-বিদ্বেষী মন,
নীরব দহনে পুড়ে সর্বক্ষণ।
নিজ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়েও,
আমায় ডোবানোর সে-কী আয়োজন!
আমি বিষণ্ন, এগোনোর পথ হারিয়েছি বহু আগে;
দ্বিতীয়বার নিজেকে ভুলে বিস্টের মায়ায় জড়ানো—
তা কি আর আমার সাজে?”
তক্ষুনি দৃষ্টিতে অবোধের ছাপ স্পষ্ট হলো মুগ্ধের। অজানা উপলব্ধিতে কেঁপে উঠল পাহাড়সম দেহটা। সে তৎক্ষনাৎ উদ্বিগ্ন হলো। সহসা নিজের রুক্ষ আঙুলগুলো মেয়েটার চুলের ভাঁজে ঢুকিয়ে আচমকা খামচে ধরল চুলের গোছা! এহেন অতর্কিত আক্রমণে সামান্য ককিয়ে ওঠে মাহি। চোখদুটো কুঁচকে নিয়ে কামড়ে ধরে নিজ নিম্নাংশের অধর। তা দেখে যুবকের অস্থিরতা বাড়ল বোধহয়! পার হলো ধৈর্য্যের সীমানা। সে কেমন হুট করেই এক অদ্ভুত হিংসাত্মক তৎপরতায় নিজ রুক্ষ দু-আঙুল দিয়ে আঁকড়ে ধরে মেয়েটার কাপত্রয়ী নরম অধরযুগল। তক্ষুনি চোখ খুলল মাহি। বিস্ফোরিত দৃষ্টিযুগল সম্মুখে নিবদ্ধ হতেই আঁতকে উঠল খানিক। রূঢ় মানব কেমন কপাল গুটিয়ে তাকিয়ে আছে তার অধরপানে। চোয়ালের পেশি করেছে টানটান! ভড়কানো বেচারি জিভ ঠেলে কিছু আওড়াতেই যাবে ওমনি সম্মুখ থেকে ভেসে এলো যুবকের হিং স্র গর্জন!
“ খবরদার এ কাজ আর দ্বিতীয়বার করবিনা বান্দীর মেয়ে!”
বোকার ন্যায় কেবল চেয়ে রইল মাহি। শুকনো ঢোক গিলল পরপর! ঠোঁটদুটো তার এখনো আঁটকে আছে মুগ্ধের রুক্ষ দু-আঙুলে। সুশ্রী গৌরবর্ণা মুখাবয়বে অবোধের ছাপ ফুটতেই শোনা গেল যুবকের গম্ভীর সন্দিষ্ট কন্ঠ!
“ তখন যেন কি বললি তুই?”
ধীরে ধীরে নতদৃষ্টিযুগল আলতো করে উঁচিয়ে তুলে মাহি। সুদর্শনের মুখপানে একপলক তাকিয়ে পরক্ষণেই তার গা থেকে উঠে পড়ার উদ্যেগে মত্ত হলো মানবী। তবে মুগ্ধ কি আর ওতো সহজে তা হতে দেয়? মেয়েটা বুকের ওপর থেকে খানিক নড়েচড়ে উঠতেই বেপরোয়া যুবক কেমন একহাতে আলগোছে খামচে ধরল মাহি’র পাতলা বাঁকান কোমর। অতঃপর এক হেঁচকা টানে সপ্তদশীকে ফের মিশিয়ে নিলো নিজ রুক্ষ বক্ষ বিভাজিকার সনে। এহেন উদ্ভট কর্মে হতভম্ব মাহি! মুখে কপট ঝাঁঝাল প্রতিচ্ছবি ফুটিয়ে গমগমে গলায় আওড়াল,
“ কি হচ্ছেটা কী? ছাড়ুন আমায়!”
শুনল না বেয়াদব নামখ্যাত সুদর্শন! উল্টো ভ্রুক্ষেপহীন কায়দায় জোর বাড়াল হাতের। পারছেনা মেয়েটাকে নিজের সঙ্গে একপ্রকার দুমড়েমুচড়ে ফেলতে। মাহি বড্ড মোচড়াচ্ছে এপর্যায়ে। নিজেকে ছাড়ানোর বৃথা প্রয়াসে বেশ কিয়তক্ষন মত্ত থেকে পরিশেষে হার মানল বোকা মানবী। যুবকের মুখপানে গরম চোখে তাকিয়ে অতিষ্ঠ গলায় বলে ওঠে,
“ কি সমস্যা আপনার? এভাবে ধরে রেখেছেন কেনো নির্লজ্জ, বেহায়া লোক? এই আপনার মধ্যে কি একটুও লজ্জা নেই?”
রূঢ় মানব তক্ষুনি দাঁত বসালো পিয়ার্সিং করা ঠোঁটের কোণে। চোখদুটোর দৃষ্টি খানিক ক্ষীণ করে, মুখভঙ্গিতে ফোটালো একরাশ দুষ্টুমির ছাপ! কন্ঠে কপট আচ্ছন্ন ভাব ঢেলে শুধালো,
“ নির্লজ্জদের লজ্জা থাকে না বেইব! আমার মতো নির্লজ্জতায় পিএইচডি করা মানুষেরও তো আর-ও আগে থাকে না! এবার ভালোয় ভালোয় বলে দে — তখন কি বলছিলি তুই? দ্বিতীয়বার মানে? তুই কি এর আগেও আমার বিষাক্ত মায়ায় জড়িয়েছিলি?”
সহসা ঢোক গিলল মাহি। চোর ধরা পড়ে যাবার ন্যায় মুখটা করল কাচুমাচু। দৃষ্টি লুকলো এদিকওদিক। তা যেন বেশ লক্ষ্য করল মুগ্ধ। মেয়েটার কোমর বরাবর খামচে ধরে তাকে আবারও মিশিয়ে নিলো নিজের সঙ্গে! পরপরই সপ্তদশীকে ফের সন্দিহান গলায় জিজ্ঞেস করে ওঠে,
“ কি হলো কথা বল!”
মৌন মাহি! যুবকের প্রতিটি অনুমতিবিহীন স্পর্শ যেন একেকটা কাঁটার ন্যায় ফুটছে গায়ে। তার দাঁতকপাটি একে-অপরের সনে রুষ্ট চাপায় পিষ্ট হচ্ছে বেশ। তুলছে কিড়মিড় শব্দ। মুখাবয়ব থেকে এক ঝটকায় সরে গেল এতক্ষণের সকল মুগ্ধতার মোহজাল! সেথায় এবার ভর করেছে সেই চিরচেনা বিরক্তির ঝাঁঝ। মেয়েটা কেমন সাপের ন্যায় মোচড়াতে মোচড়াতে কটমট করে বলে ওঠে,
“ ছাড়ুন আমায়! আমি রুমে যাব।”
কথাটা মাছি উড়াবার ন্যায় হাওয়ায় উড়িয়ে দিলো মুগ্ধ। বুঝে গেল — সপ্তদশী এতো সহজে স্বীকার করবেনা কিছুই। তাই তো বিচক্ষণি পুরুষ পথ ধরলেন উল্টো। দুষ্টুমির ছলে আলগোছে ঘাড় কাত করে চাইলো মেয়েটার ফোলা ফোলা অধরযুগল পানে। সেথায় ছাপ বসেছে কালসিটে! কোথাও কোথাও ফেটে চৌচির অবস্থা! কোথাও আবার জমাট বেঁধেছে রক্ত। ছেলেটা কেমন ঠোঁট পিষে হাসল নিরবে। পরপরই এক ঝটকায় সপ্তদশীকে বিছানায় ছুঁড়ে ফেলে, নিজে উঠে আসে তার ওপর। মাহি হতভম্ব! নিশ্বাস ফেলবার পূর্বে ঘটে গেল সম্পূর্ণ ঘটনা। তার সুশ্রী মুখের বড্ড কাছে যুবকের সুদর্শন মুখখানা। চোখেমুখে আছড়ে পড়ছে মানবের উষ্ণ নিশ্বাস। আবেশে ইতোমধ্যেই চোখদুটো বুঁজে এসেছে মাহি’র। বুকটা করছে ধড়ফড়! এদিকে মুগ্ধ কেমন বাঁকা চোখে তাকিয়ে থেকে ধীরে ধীরে মুখ নামিয়ে আনছে আরও কাছে। মাহি স্পষ্ট টের পাচ্ছে তা! বেচারির হৃৎস্পন্দনের গতি বেড়েছে বেশ। সর্বাঙ্গ কাঁপছে মৃগী রোগীদের ন্যায়। তা টের পাওয়া মাত্রই বাঁকা হাসল রূঢ় মানব। মুখটা বেশ নামিয়ে এনে, মেয়েটার কালসিটে দাগ বসে যাওয়া নরম তুলতুলে অধরযুগলের গায়ে ভীষণ আলগাভাবে নিজ রুক্ষ অধর ছুঁইয়ে হিসহিসিয়ে আওড়াল,
“ সামান্য এক চুমুতেই এ অবস্থা হলে, হ্যাংকি-প্যাংকি’র সময় কি করবি বান্দীর মেয়ে?”
সহসা কপাল গোছালো মাহি! মুখাবয়বে হতভম্বতার রেশ ধরে আচানক চোখ খুলে শুধালো,
“ এই হ্যাংকি-প্যাংকিটা আবার কী?”
তৎক্ষনাৎ ধারালো দাঁতের রুষ্ট স্পর্শে নিজ নিম্নাংশের ঠোঁটখানা পিষ্ট করল মাফিয়া বিস্ট! গম্ভীর সুদর্শন মুখখানায় আচমকা শ্লেষাত্মক ভাবভঙ্গি ধরে রেখে, সপ্তদশীর অধরের ওপর থেকে অধর সরিয়ে, মুখ নিয়ে গেল মেয়েটার কানের কাছে। অতঃপর আগের চেয়েও দ্বিগুণ হিসহিসানো কায়দায় আওড়াল,
“ এসব বিষয় মুখে বলে বোঝানো যায় না সিগনোরা! প্র্যাক্টিক্যালি বোঝাতে হয়। সো চল আমার প্যান্থার রুমে! মা’ই হোল সেলস ইজ কলিং ইউ্য!”
তড়াক চোখ পাকায় মাহি। দু’হাতের শক্ত জোরে তক্ষুনি যুবকের বুক বরাবর ঠেলে দিলো সামান্য। অথচ বালাইষাট! পাহাড়সম মানুষটা একটুখানি নড়লও না যেন। না সরল মেয়েটার ওপর থেকে। মাহি এবার বড্ড রাগী! সরু নাকের পাটাটা সামান্য ফুলিয়ে, মুখ ঝামটি মে’রে বলে বসে,
“ অসভ্য, বেহায়া, নির্লজ্জ লোক! যা জিজ্ঞেস করেছি তার সোজাসাপটা উত্তর দিতে জাত যায় আপনার?”
সপ্তদশীর কানের কাছে মুখ রেখে মাথাটা বিছানার কোলে এলিয়ে রেখেছে মুগ্ধ! এরইমধ্যে মাহি’র ওমন কর্কশ বাক্যে অলক্ষ্যে ঠোঁট কামড়ে হাসল সে। পরপরই মেয়েটার কানের লতিতে রুষ্টতায় দাঁত বসিয়ে শুধালো,
“ উঁহু! মোটেও নয়!”
মুগ্ধের ওমন হুটহাট কামড়াকামড়িতে আজ ভীষণ তিক্ত মানবী। সামান্য ব্যথা লাগায় ককিয়ে ওঠে খানিক! মুগ্ধের কথা শেষ হওয়া মাত্রই খেঁকিয়ে বলে ওঠে,
“ তাহলে এককথায় উত্তর দিয়ে বলুন, হ্যাংকি-প্যাংকি আবার কী?”
অলক্ষ্যে মৃদু হাসল মুগ্ধ। মেয়েটার মাথার দু-পাশে ভর দিয়ে তক্ষুনি উঠে এলো সে। নিজ গায়ের সম্পূর্ণ ভর দু-হাঁটুতে ঠেকিয়ে আলগাভাবে বসল মাহি’র কোমর বরাবর। এহেন কান্ডে হতবাক মাহি! বিভ্রম নিয়ে তাকিয়ে রইল কেবল। পাহাড়সম বলিষ্ঠ পুরুষ কেমন গভীর দৃষ্টে তাাকিয়ে আছে মেয়েটার মায়াবী চোখদুটোর পানে। মাহিকে আরেকটু জ্বালাতন করতে সে কেমন আলগোছে ঝুঁকে এলো খানিক। অতঃপর রয়েসয়ে নিজ রুক্ষ ডানহাতের তর্জনী ছোঁয়াল বেচারির উদর বরাবর। আর ওমনি অস্বস্তিতে কেঁপে ওঠে মাহি। তক্ষুনি শোয়া ছেড়ে উঠে আসতে চাইলেই বাঁধ সাধল মুগ্ধ। দু-হাটুঁর জোরে আঁটকে নিলো মেয়েটাকে। মানবীর অস্বস্তি বাড়ানোর উদ্দেশ্যে তর্জনী দিয়ে উদ্ভট আঁকিবুঁকি চালালো সপ্তদশীর উদর বরাবর। অতঃপর বাঁকা কন্ঠে শুধালো,
“ তোর বাপের নিজস্ব ফ্যাক্টরীতে যেই প্রসেসের মাধ্যমে তোর মতো দেড়ব্যাটারী পৃথিবীতে এসে অক্সিজেন নষ্ট করছে, সে-ই প্রসেসের নামই — হ্যাংকি-প্যাংকি!”
থামল মুগ্ধ! মাহি’র ওপর ঝুঁকে এলো আরও কিছুটা। পরক্ষণে ফিসফাসানো কন্ঠে বলল,
“ ডু ইউ্য গেট দ্যাট বান্দীর মেয়ে? না-কি প্র্যাক্টিক্যালি বোঝাতে হবে? তুই চাইলে অবশ্য এখন, এখানেই বোঝাতে পারি। দ্যান ওয়েট…. ”
বলতে বলতেই অসভ্য মাফিয়া বিস্ট উদ্যোত হলেন নিজ বেয়াদবি কান্ডে। সহসা হাত নামিয়ে আনলেন নিজ ট্রাউজারের অভিমুখে। পিটপিট চোখে তা অবলোকন হওয়া মাত্রই আঁতকে উঠে মাহি! তৎক্ষনাৎ দু’হাতে চোখ ঢেকে মুখ কুঁচকে চেঁচিয়ে বলে ওঠে,
“ নাউজুবিল্লাহ, নাউজুবিল্লাহ! আমার দু-চোখের সামনে থেকে সরুন অসভ্য, নির্লজ্জ বেহায়া লোক!”
কথাগুলো এক কান দিয়ে ঢুকিয়ে আরেক কান দিয়ে আলগোছে বের করে দিলেন মাফিয়া বিস্ট। কন্ঠে শ্লেষাত্মক ভাব ধরে ফের আওড়ালেন,
“ সরব না! কি করবি?”
ফোঁস করে নিশ্বাস ফেলল মাহি। অতিষ্ঠ হয়ে হার মানল অবশেষে। চোখদুটোর ওপর থেকে হাত সরিয়ে, ক্ষুব্ধ দৃষ্টে তাকাল সুদর্শনের পানে। মুখে বিরক্তির ছাপ ফুটিয়ে গমগমে গলায় আওড়াল,
“ আপনি আমায় বডি ম্যাসাজ করতে ডেকেছিলেন না? তাহলে সরুন আমার ওপর থেকে। আমি ম্যাসাজ করে দিচ্ছি!”
গম্ভীর হলো মুগ্ধ। পরপরই দৃষ্টি সরু করে সন্দিহান গলায় শুধালো,
“ রিয়েলি? ইউ্য ওয়ান্না ম্যাসাজ মা’ই বডি?”
ওপর-নিচ মাথা নাড়ায় মাহি। তা দেখে বাঁকা হাসে রূঢ় মানব। সহসা সরে এলো মেয়েটার ওপর থেকে। তার ঠিক পরমুহূর্তেই মাহি করল আরেক কান্ড! ঝড়ের বেগে শোয়া ছেড়ে উঠে, দু’হাতে সজোরে ধাক্কা বসালো রূঢ় মানবের বুক পানে। এহেন অতর্কিত আক্রমণে খানিক দুলে উঠল মুগ্ধ। সহসা কোমর ছিটকে গিয়ে বসল বিছানার আরেকপ্রান্তে। ওদিকে মাহি ছুটছে! ছুটন্ত পদযুগলে বাঁচার প্রয়াসে দরজার কাছে এগোতেই মেয়েটা কেমন থতমত খেয়ে গেল। দরজাটা ভেতর থেকে লাগানো! নবে হাত ঘুরিয়েও খুলছেনা দুয়ার। মাহি অনবরত দরজার গায়ে চাপড় বসাচ্ছে! গলার স্বর উঁচিয়ে বলে উঠছে,
“ কেউ আছেন? প্লিজ দরজাটা খুলুন।”
বাঘের খাঁচায় বন্দী থেকে মানুষের কাছে সাহায্য চাইলে থোড়াই হবে! যেখানে স্বয়ং রুশদী কিং দরজা আঁটকিয়েছে, সেখানে অন্যকেউ দুয়ার কি করে খুলবে? বোকা মানবী তাও চেঁচিয়ে যাচ্ছে অনবরত। চেঁচাতে চেঁচাতে একটা সময় কেঁশে উঠে সপ্তদশী! কাশতে কাশতে চেপে ধরে কন্ঠা। ঠিক তখনি বিছানা থেকে ভেসে আসে রূঢ় মানবের গম্ভীর অথচ হিং স্র শান্ত কন্ঠ!
“ হেভ ইউ্য ডান বান্দীর মেয়ে?”
ছলছল চোখে ঘাড় বাকিয়ে তাকায় মাহি। দেখতে পায় — দ্য গ্রেট রুশদী কিং কেমন দু’হাত দু’দিকে ছড়িয়ে, বিছানার হেড বোর্ডের সনে পিঠ ঠেকিয়ে বসে আছে রাজার ন্যায়। মাহি তাকাতেই মহাশয় বাহাতের তর্জনী উঁচিয়ে ইশারায় কাছে ডাকল মেয়েটাকে। মাহি নারাজ যেতে! ভয়ে তটস্থ হয়েছে তার সর্বাঙ্গ। ভয়ে ভয়ে আরেকবার ঘাড় বাকিয়ে তাকাতেই চোখ পাকিয়ে ওঠে মুগ্ধ! তা দেখে আঁতকে উঠে মাহি। তক্ষুনি সুড়সুড় করে অগ্রসর হয় সম্মুখে। কাঁপা কাঁপা পাদু’টো তার বিছানার কাছে এসে দাঁড়াতেই মুগ্ধ ফের কটমট কন্ঠে আওড়াল,
“ কাছে আয়!”
ভয়ে শুকনো ঢোক গিলল মাহি। আরও বাড়াল দু-কদম। যুবকের কাছ থেকে এপর্যায়ে তার দুরত্ব মাত্র দু’হাতের! তাও যেন সহ্য হলোনা মুগ্ধের। বেপরোয়া যুবক তক্ষুনি নিজ শক্তপোক্ত হাতখানা বাড়িয়ে দিয়ে আলগোছে আঁকড়ে ধরল মাহি’র পাতলা বাঁকান কোমর! এক হেঁচকা টানে সপ্তদশীকে তুলোর ন্যায় উঠিয়ে বসালো নিজ বাড়িয়ে রাখা উরুর ওপর। অভ্যন্তরে হকচকায় মাহি। ঘাড়টা নুইয়ে রেখে হাত কচলাতে থাকে অনবরত। এদিকে মাফিয়া বিস্ট কেমন ক্ষুব্ধ দৃষ্টে তাকিয়ে আছে মেয়েটার পানে। মাহি’র কোমর বরাবর চেপে রাখা হাতের বাঁধনটুকু আরও খানিকটা দৃঢ় করে, বাহাতে বালিশের নিচ হাতড়ে একখানা অয়েন্টমেন্ট বের করে আনলো আলগোছে। নতমুখী সপ্তদশী দেখল না সেসব! যুবকের শক্তপোক্ত প্রশস্ত উরুতে বসে কাঁপছে সে। মুগ্ধ সেসবে পাত্তা দিলো না তেমন। সে কেমন শক্ত মুখে নিজ বাহাতের রুক্ষ তর্জনীর ডগায় খানিকটা অয়েন্টমেন্ট নিলো। অতঃপর তর্জনীটা মাহি’র ওষ্ঠ পানে বাড়াতেই অজানা ভয়ে চোখ খিঁচে নেয় মাহি। বেচারি বোধহয় ভেবেছে — তাকে ফের মা’রবে। এদিকে সপ্তদশী’র ওমন কান্ডে কিয়তক্ষন থম মে’রে বসে রইল মুগ্ধ। মেয়েটা এতো ভয় পাচ্ছে কেনো তাকে? সে-কি শুধুই মা’রে?
নিজ মনের কোণে উত্থাপিত প্রশ্নের সঠিক উত্তর পায়নি মুগ্ধ। বুক ফুলিয়ে ফোঁস করে নিশ্বাস ফেলে যুবক তর্জনী এগোলো মেয়েটার নরম তুলতুলে অধরযুগলের পানে। নিজ চিরায়ত স্বভাবের বিপরীত কান্ড ঘটাচ্ছে রূঢ় মানব। বড়ো আলতো করে মেয়েটার অধরে ছোঁয়াচ্ছে অয়েন্টমেন্ট। ওদিকে হুট করে ঠোঁটের কোণে শীতলতা অনুভব হতেই চোখদুটো মুহুর্ত ব্যয়ে খুলে নিলো মাহি। আচানক দৃষ্টিপটের সম্মুখে যুবককে ওমন ঘাড় কাত করে মলম লাগাতে দেখে এক্ষুণি বুঝি আকাশ ভেঙে পড়ল মেয়েটা! সর্বাঙ্গে ছলকে উঠে বিদ্যুৎ। খানিক নড়েচড়ে উঠতেই রূঢ় মানব নিজ কাজে মত্ত থেকে বড়ো শান্ত কন্ঠে বলে ওঠে,,
“ হুঁশশশ! ডোন্ট মুভ সিগনোরা।”
কি হলো মাহি’র? হঠাৎ যুবকের একবাক্যে তার সর্বাঙ্গ থমকে গেল কেন? অদ্ভুত প্রশান্তিতে হৃদয়টা ওমন শান্ত হলো কেনো? বোকা মানবী কেমন হা করে তাকিয়ে রইল ব্যস্ত মানবের পানে। অথচ মুগ্ধের ওসবে থোড়াই খেয়াল আছে! সে কি সুন্দর যত্ন করে মলম লাগিয়ে দিচ্ছে মেয়েটার ঠোঁটে। মাহি থমকেছে! অধরের ছেঁড়া চামড়ায় মলমের আবরণ পড়তেই কেমন জ্বলে উঠল জায়গাটা। তা সইতে না পেরে মেয়েটা অস্ফুটে ককিয়ে ওঠে সামান্য। তক্ষুনি থেমে গেল মুগ্ধ! পরপরই ব্যস্ত হয়ে অনবরত ফুঁ দিতে লাগল জায়গাটায়। মাঝে দিয়ে বড়ো অস্থির কন্ঠে আওড়াল,
“ উহঃ কষ্ট হচ্ছে? জ্বলছে? ঠিক হয়ে যাবে, একদম ঠিক হয়ে যাবে বাচ্চা! আরেকটু সহ্য কর।”
আকাশ ভেঙে পড়ল মাহি! এ কোন শ্যাডো মনস্টারকে দেখছে সে? এতো উদ্বিগ্নতা তার জন্য! কথাগুলো ভাবতে গিয়ে রূঢ় মানবের ওপর খানিকটা মুগ্ধ হতেই যাবে ওমনি সপ্তদশীর বিচক্ষণি মস্তিষ্ক আবারও থমকাল। মেয়েটা ফের সর্তক করে বলল,
“ এতো তারাতাড়ি মুগ্ধ হোস না মাহি। লোকটা একটা গিরগিটি! এই আদর করছে, আবার মাথায় ছিট দেখা দিলে — গোষ্ঠী উদ্বার করে ছাড়বে!”
মস্তিষ্কের কথাগুলো ভারী মনে ধরল মাহি’র। পরপরই মুখভঙ্গিতে ফোটালো একরাশ গাম্ভীর্যের ছাপ। খানিকক্ষণ চুপ থেকে আচানক সন্দিগ্ধ গলায় শুধালো,
“ আচ্ছা… মানুষ মা’রতে কি কি লাগে?”
তক্ষুনি থমকে গেল মুগ্ধ! গভীর দৃষ্টিযুগল একত্রে নিক্ষেপ করল মেয়েটার সুশ্রী মুখপানে। মেয়েটার উত্তরের অপেক্ষায় তাকিয়ে আছে একদৃষ্টে! যুবক হাসল! ঠোঁটের কোণে এক চিলতে রহস্যময় বাঁকা হাসির রেশ টেনে শুধালো,
“ সেটা ডিপেন্ড করে মানুষটা কে তার ওপর! যদি সাধারণ কেউ হয়, তাহলে তাকে মা-রার জন্য ধারালো অস্ত্রই যথেষ্ট। আর যদি হয় আমার মতো হিং স্র কেউ তাহলে….”
“ তাহলে?”
সপ্তদশীর উৎসুক কন্ঠ! তারচেয়েও বেশি উৎসুক তার দৃষ্টি। তা দেখে মোটেও রাগ দেখালো না মাফিয়া বিস্ট। সে উল্টো গভীর দৃষ্টে তাকাল মেয়েটার মায়াবী চোখদুটোর পানে। অতঃপর ভীষণ শান্ত কন্ঠে আওড়াল,
“ তাহলে দু’টো মায়াবী চোখই যথেষ্ট!”
একমুহূর্ত থতমত খেয়ে বসে রইল মাহি। পরক্ষণেই মেয়েটার মাথায় কোন ভূত চাপল কে জানে! সে কেমন তড়াক করে নিজ চোখদুটো এগিয়ে আনলো যুবকের মুখের কাছে। সন্দিহান গলায় জানতে চাইলো,
“ দেখুন ত! আমার চোখদুটো মায়াবী কি-না!”
হতবাক মুগ্ধ! মুহুর্তখানেক হা করে তাকিয়ে রইল বোকা মেয়েটার দিকে। এমুহূর্তে তার কি একটু হাসা উচিৎ? বেশি না একটুখানি? যুবক নিজেকে আর ধরে রাখতে পারলো না যেন। মেয়েটার বোকাসোকা কথার পিঠে উত্তর দেবার বদলে চমৎকার ভঙ্গিতে হেসে উঠল গা দুলিয়ে! এই প্রথম গম্ভীরমুখো পচাঁ লোকটাকে হাসতে দেখল মাহি। হাসির সে-কি ঝলক তার! প্রাণবন্ত হাসির জোরে সুদর্শন মুখখানা লাল হয়েছে বটে। পিয়ার্সিং করা বাদামী ঠোঁটদুটো হাসি আটকানোর প্রয়াসে বারবার স্বেচ্ছায় চলে যাচ্ছে ক্যানাইন দাঁতের নিচে। হাসি তো নয়, যেন পাহাড়ি ঝর্ণা! বোকা মানবী কেমন বিমুগ্ধ নয়নে তাকিয়ে রইল মুগ্ধের হাসির দিকে। নিজ অজান্তেই মুখ ফসকে সে বলে ওঠে,
“ আপনি হাসতেও জানেন?”
মুহুর্তেই থমকে গেল মুগ্ধ! মুক্তোঝরানো হাসি টুকু তক্ষুনি উড়ে গেল দূরে কোথাও। পরপরই মুখাবয়বে নামলো সে-ই চিরচেনা গাম্ভীর্যের ছাপ! যুবক খানিক গলা খাঁকারি দিয়ে উঠল। সে শব্দে ঘোর ভাঙল মাহি’র। মেয়েটা ত্রস্ত চোখ নামাল নিচে। খানিকক্ষণ মৌন থেকে আচানক শুধালো,
“ হাসলে হৃদয় ভালো থাকে! গাম্ভীর্যের অভিনয়ে না।”
সহসা কপাল গোছায় মুগ্ধ। ঘাড় কাত করে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করল মেয়েটার মুখপানে। ঠোঁটের কোণে তাচ্ছিল্যের হাসি টেনে গমগমে গলায় আওড়াল,
“ হুট করেই কেমন বড়ো হয়ে গেলি মনে হচ্ছে! কথারঢংয়ে ক’দিন পর যে কাউকেই মে’রে ফেলতে পারবি দেখছি!”
“ আপনাকে মা’রতে পারব কী?”
কথার পিঠে আচানক এরূপ কথা শুনতে পেয়ে দাতেঁর সনে ঠোঁট পিষল মুগ্ধ। মেয়েটার কোমর চেপে তাকে আরেকটু কাছে টেনে এনে চাপা স্বরে শুধালো,
“ আমাকে মা-রার এতো শখ জাগলো কেনো তোর সিগনোরা?”
মাহি কেবল আহত হাসল! যে হাসির কারণ তারও অজানা। সে আলগোছে চিবুক নামালো কন্ঠার কাছে। মিনমিনে স্বরে আওড়াল,
“ এমন কিছুই না!”
রূঢ় মানব শুনল! আলতো করে হাত ছোঁয়াল মেয়েটার মাথায়। সেথায় খানিকক্ষণ আদুরে পরশ বুলিয়ে গম্ভীর কন্ঠে আওড়াল,
“ বড্ড বড় হয়ে গেছিস পিচ্চি! কি সুন্দর মিথ্যে বলা শিখে গিয়েছিস!”
ক্ষীণ হাসল মাহি। নজর তুলল মুগ্ধের পানে। কি ছিলো সে-ই নজরে? যে নজরের দিকে একবার তাকিয়ে মন্ত্রমুগ্ধ বনে গেল মুগ্ধ! মেয়েটা রয়েসয়ে বলল,
“ উঁহুম! মিথ্যে নয় বরং সহ্য করতে শিখে গিয়েছি। সেই সাথে কথা লুকতেও।”
এহেন কথায় হুট করেই বুকটা কেমন ধড়াস করে উঠল মুগ্ধের। কোথায় একটা চাপা পড়ে থাকা ক্ষতটা নতুন করে জাগ্রত হলো যেন। রূঢ় মানব ফের হারালো নিজেকে। চোখাচোখি কথা বলল মেয়েটার সঙ্গে! অতঃপর মন্ত্রমুগ্ধের ন্যায় মুখ এগোলো মেয়েটার পানে। আশ্চর্য! মাহি সরছে না কেনো? চোখও কেনো অটল করে রেখেছে কে জানে! না-কি মেয়েটাও মুগ্ধতায় হারিয়েছে আজ? যুবকের বাদামী রুক্ষ অধরযুগল প্রায় ছুঁই ছুঁই মাহি’র ওষ্ঠ। আবারও নিজেদের সপে দেবার প্রয়াসে মত্ত তারা। চড়ুই যুগল একযোগে বুঁজেছে তাদের চোখ! একটু পরেই হারাবে দু’জন। মানবের রুক্ষ অধরযুগল মানবীর তিরতির করে কাপত্রয়ী নরম তুলতুলে ওষ্ঠপুট যেই না আস্বাদন করতে যাবে ওমনি তড়াক করে জ্বলে উঠল মাহি’র মস্তিষ্ক! চোখদুটোর মানসপটে আচমকা ভেসে উঠল রূঢ় মানবের করা প্রতিটি অমানবিক নির্যাতন! পুরো পরিবারের ক্রন্দনরত মুখ! অন্যদিকে রূঢ় মানবেরও একই দশা। অধর দিয়ে মেয়েটার অধর ছুঁতে গেলেই আচমকা কল্পনার মানসপটে ভেসে উঠল — তায়েফ এহসানের হিং স্র মুখ! মায়ের র ক্তা ক্ত দেহ!
অভ্যন্তরীণ বিপরীত দুটো ঘটনাপ্রবাহে ওমনি অধর সরিয়ে দু’দিকে ছিটকে গেল সদ্য আবেগতাড়িত চড়ুই যুগল। একযোগে শুকনো ঢোক গিলছে দু’জন। নিজেদের দোষাচ্ছে ব্যাপকভাবে। রূঢ় মানব তক্ষুনি একহাতে চেপে ধরেছে নিজ মাথার চুল! দাঁতের সনে দাঁত পিষে মনে মনে বলছে,
“ আবারও! আবারও খুনির মেয়ের দিকে এগোলাম আমি। হোয়াট দ্য ফা’ক ইজ দিস!”
ওদিকে মাহি যেন নিজেকেই বিশ্বাস করতে পারছে না। সে কি করে পারলো নির্দয় লোকটার দিকে নিজে থেকে এগোতে? কি করে পারলো নিজের পরিবারের কথা ভুলে যেতে? কি করে পারলো নিজের সাথে হওয়া সেই সকল অমানবিক নির্যাতনের কথা এতো সহজে ভুলে যেতে? রাগ-ক্ষোভে নিজের গালে ইচ্ছেমতো থাপ্পড় বসাতে ইচ্ছে হচ্ছে মানবীর। তবে সুযোগের অপেক্ষায় ইচ্ছেটুকুতে ভাটি পড়ল আজ। এরইমধ্যে পাশ থেকে রূঢ় মানব কেমন খেঁক খেঁক করে বলে ওঠে,
“ ঘরে যা বান্দীর মেয়ে! এন্ড মেক শিওর, নেক্সট টাইম তোর মুখ যাতে আমার দেখতে নাহয়!”
ঢাকা — গুলশান….
আলিশান এক ডুপ্লেক্স বাড়ির সুসজ্জিত লিভিং রুমে বসে আছে ডঃ রৌদ্র! ব্যাপক অস্থিরতায় করছে অপেক্ষা। বারেবারে বাহাতের কব্জি উল্টে দেখে নিচ্ছে সময়ের গতি! রাত ৯টা বেজে ৩৫ মিনিট। কাঙ্ক্ষিত ব্যক্তির আসার কথা ছিলো ৮টায় অথচ তার এখনো কোনো খোঁজ খবর নেই! শ্যামপুরুষ বড়ো ধৈর্য্যের সঙ্গে অপেক্ষা নামক পরিক্ষা দিয়ে যাচ্ছেন। বিরক্ত হলেও বসে রয়েছেন চুপচাপ! এরইমধ্যে লিভিং রুমে কদম পড়ল জনাব মাঈনুল রহমানের। যিনি বর্তমানে রিটায়ার্ড পুলিশ কর্মকর্তা! তাকে দেখামাত্রই শীরঁদাড়া সোজা করে বসা ছেড়ে উঠে দাঁড়ায় রৌদ্র! ভীষণ গাম্ভীর্যের সাথে সালাম দিয়ে ওঠে বয়স্ককে। মাঈনুল সাহেব মাথা নেড়ে সালাম নিলেন! উত্তর বোধহয় মনে মনেই দিলেন তিনি। টলতে থাকা বদনে কোনমতে এসে বসলেন সোফার নরম গদিতে। পরপরই মুখ তুলে তাকালেন শ্যাম সুদর্শনের পানে। চোখে আটাঁ মোটাফ্রেমের চশমাটা খানিক নাড়িয়ে চাড়িয়ে সন্দিহান গলায় জিজ্ঞেস করলেন,
“ তুমি কে?”
রৌদ্র ক্ষীণ হাসল। ভদ্রতাসূচক দাঁড়িয়ে থেকেই জানালো,
“ আমি ডঃ ইফতেখার এহসান রৌদ্র! ধানমন্ডি থানার ডি.সি তায়েফ এহসানের ভাতিজা।”
তায়েফ এহসানের নাম শুনতেই চোখেমুখে হাসির ঝলক দেখা গেল বয়স্কের। পরপরই তিনি কেমন ব্যস্ত হলেন রৌদ্রকে নিয়ে। নিজে থেকে হাত ধরে পাশে বসালেন ছেলেটাকে। অতঃপর সুদর্শনের কাঁধ চাপড়ে বললেন,
“ আরেহ! আগে বলবা না? আমি আরও ভাবলাম কে না কে! তা তায়েফের কি অবস্থা? শুনলাম, ওকে না-কি ডিপার্টমেন্ট থেকে সাসপেন্ড করা হয়েছে? দেখো কান্ড! এ দুনিয়ায় এখন সৎ মানুষদের কোনো মূল্যই নেই। যে মানুষটা তার জীবনের ২৫টা বছর ডিপার্টমেন্টকে দিলো, শেষে কি-না তাকেই সাসপেন্ড করা হলো? ইশশ্!”
মুখে আঁধার ছেয়ে গেল রৌদ্রের। ছেলেটা খানিক চুপ থেকে আচমকা শুধালো,
“ স্যার! আমি একটা বিশেষ প্রয়োজনে আপনার কাছে এসেছি!”
সহসা চোখ সরু করলেন মাঈনুল সাহেব। গম্ভীর হলেন বেশ! পরক্ষণে খানিকটা এগিয়ে এসে সম্মুখ টেবিল থেকে একখানা গরম ধোঁয়া ওঠা চায়ের কাপ তুলে নিলেন হাতে। গম্ভীর কন্ঠে জিজ্ঞেস করলেন,
“ কি প্রয়োজন?”
শুষ্ক ঢোক গিলল রৌদ্র। শুষ্ক অধরজোড়া জিভ ঠেলে খানিক ভিজিয়ে নিয়ে আওড়াল,
“ আমার জানামতে আজ থেকে ৩১ বছর আগে ধানমণ্ডি ডিপার্টমেন্টের ভারপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তা আপনি ছিলেন। ইন দ্যাট টাইম, আপনি আপনার জীবনের সবচেয়ে বড়ো প্রজেক্ট কমপ্লিট করেছিলেন। আচ্ছা সেই সময় কি মির্জা সায়ান….. ”
বাকিটা বলার পূর্বেই আচমকা ধোঁয়া ওঠা গরম চায়ের কাপটা হাত থেকে খসে পড়ল মাঈনুল সাহেবের। তা গিয়ে ভিজিয়ে দিলো বয়স্কের গা! বয়স্ক ব্যক্তিটি কাপঁছে ভীষণ। তা দেখে ভড়কায় রৌদ্র। তড়িঘড়ি করে এগিয়ে এসে চেপে ধরল মাঈনুল সাহেবের হাত। পালস রেট চেক করতে করতে শুধালো,
“ স্যার? স্যার? কি হয়েছে আপনার? আপনি ঠিক আছেন?”
মাঈনুল সাহেব জবাব দিতে পারছেন না! লোকটার হাত-পা কি সাংঘাতিক ভাবে কাঁপছে দেখো! চোখদুটো যেন এক্ষুণি উল্টে যাবে তার। রৌদ্র হকচকায়! উদ্বিগ্ন হয়ে ডাক দিয়ে বসে বাড়ির লোকজনদের। এরইমধ্যে আচমকা রৌদ্রের কলার চেপে ধরে মাঈনুল সাহেব। ঘটনাপ্রবাহে শ্যামপুরুষ ভড়কানোর পূর্বেই মাঈনুল সাহেব কেমন ভয়ার্ত দৃষ্টে সর্তক কন্ঠে বলে ওঠে,
“ ওর নাম মুখে নিও না ছেলে! ওকে নিয়ে ঘাটাঘাটি করো না। ঐ নামের রহস্য যে বা যারাই উদঘাটন করতে গিয়েছে, তারা কোনদিন ফিরে আসেনি। তুমি…তুমি যাও এখান থেকে।”
হতভম্ব রৌদ্র। নিজেকে কোনমতে সামলে নিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়া বৃদ্ধের দু’হাত চেপে ধরে একপ্রকার অনুনয়ের সুরে বলে ওঠে,
“ স্যার প্লিজ! দয়া করে আজ আমায় শূন্য হাতে ফেরাবেন না। আমার চাচ্চু লাইফ সাপোর্টে আছে। পুরো পরিবারের ভবিষ্যত এক অনিশ্চয়তার মধ্যে ডুবে আছে! এই নাম…এই নামের ব্যাক্তিকে যে করেই হোক, আমার খুঁজে বের করতেই হবে। প্লিজ স্যার! অন্তত আমার চাচ্চুর জন্য হলেও আমাকে একটু সহায়তা করুন।”
নিঃসন্তান মাঈনুল সাহেবের বুকটা হু হু করে উঠল যুবকের ওমন অনুনয় দেখে। নিজের অনিশ্চিত পরিণতির কথা মাথায় রেখেও তিনি অবশেষে রাজি হলেন যুবককে সহায়তা করতে। সে উদ্দেশ্যে লোকটা গলা উঁচিয়ে ডাক পারলেন নিজের বিশ্বস্ত কর্মচারীকে। মাত্র দু-ডাকেই চলে এলেন কর্মচারী। এগিয়ে এসে মাঈনুল সাহেবের পেছনে দাঁড়াতেই, মাঈনুল সাহেব দু-আঙুলের ইশারায় কি যেন একটা বললেন তাকে। আর ওমনি দক্ষ মধ্যবয়স্ক লোক, তড়িঘড়ি করে চলে গেলেন দোতলার দিকে। সকল ঘটনাটুকু নিরবে অবলোকন করে গেল রৌদ্র। গম্ভীর মুখে দাঁড়িয়ে থাকতেই মাঈনুল সাহেব দূর্বল কন্ঠে বললেন,
“ তুমি বাইরে যাও! আমার সেক্রেটারি তোমাকে তোমার কাঙ্ক্ষিত জিনিস দিয়ে দিবে।”
যথাযথ কাজে মত্ত হলেন শ্যামপুরুষ। ফের একবার সম্মানসূচক বৃদ্ধকে সালাম দিয়ে পথ ধরল উল্টো!
সময়ের কাটাঁ মিনিট বিশেক পেরুলো মাত্রই! ঠিক তখনি বাড়ির ভেতর থেকে ত্রস্ত পায়ে বেরিয়ে এলেন মাঈনুল সাহেবের সেক্রেটারি! লোকটা ঘর্মাক্ত! হাঁপাচ্ছে ভীষণ। হাতে একখানা পুরনো ফাইল তার। তিনি এসেই বিনাবাক্যে ফাইলটা ধরিয়ে দিলো রৌদ্রের হাতে। বেচারা রৌদ্র পাল্টা ধন্যবাদ জানানোর পূর্বেই অভদ্র লোকটা পিঠ দেখিয়ে চলে গেল কেমন! রৌদ্র স্রেফ হতভম্ব নজরে তাকিয়ে দেখল সবটা! পরক্ষণে ঘাড় নামিয়ে হাতের ফাইলটা এক-আধবার দেখে নিলো। বেশ পুরনো এক ফাইল! কি এমন রহস্য আছে এতে?
রাত ১২ঃ১৯….
কালো রঙা চকচকে গাড়িট মাত্রই এসে থামল হসপিটালের অভিমুখে। মিনিট দুয়েক বাদেই গাড়ি থেকে বেরিয়ে এলেন শ্যামপুরুষ। বাড়ি যাবার পূর্বে চাচ্চুকে আরেকবার দেখে যাওয়ার উদ্দেশ্য তার! গটগট পায়ে হসপিটালে প্রবেশ করতেই রিসিপশনের দেয়ালজুড়ে আঁটকে থাকা স্মার্ট টিভির পর্দায় সদ্য সম্প্রচারিত হওয়া ব্রেকিং নিউজটা কানে পৌঁছাল। আর ওমনি খানিক কৌতুহলে থেমে গেল রৌদ্রের ব্যস্ত পদযুগল। টিভির পর্দায় সম্প্রচারিত হচ্ছে লাইভ খবর — যেথায় এক ওয়েল-ড্রেসড সাংবাদিক বলে যাচ্ছেন,
“ রাত ঠিক ১২টার দিকে নিজ বাসভবনের ছাদঁ থেকে লাফ দিয়ে আ/ত্ম হত্যা করেছেন — রিটায়ার্ড পুলিশ কর্মকর্তা সৈয়দ মাঈনুল রহমান! এবং তার সেক্রেটারি, জনাব হাশেম! তিনি কেনো এমন একটা সিদ্ধান্ত নিলেন সে বিষয়ে চলছে সুষ্ঠু তদন্ত!”
মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ৪৬
মুহুর্তেই পৃথিবী দুলে উঠল রৌদ্রের। মস্তিষ্ক হয়ে গেল ফাঁকা! কি খবর দেখালো এটা? ক্ষনিকের মধ্যে কি থেকে কি হয়ে গেল? লোকটা আ/ত্ম/হত্যা.. বাকিটুকু ভাবতে গিয়ে আচমকা শ্যামপুরুষের বিচক্ষণ মস্তিষ্কে বেজে উঠল মাঈনুল সাহেবের বলা শেষ কথাটা!
“ ওর নাম মুখে নিও না ছেলে! ওকে নিয়ে ঘাটাঘাটি করো না। ঐ নামের রহস্য যে বা যারাই উদঘাটন করতে গিয়েছে, তারা কোনদিন ফিরে আসেনি।”
