Home মির্জা সায়ান মুগ্ধ মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ৬৪

মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ৬৪

মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ৬৪
jannatul firdaus mithila

“ আমার প্রথম উইশ — আমি চাই আপনি আমাকে বিয়ের জন্য প্রপোজ করুন। দ্বিতীয় উইশ — আমি চাই আগামী সাতদিন আপনি শুধু আমার থাকুন। কোনো মাফিয়া বিস্ট নয় শুধুমাত্র আমার মির্জা সায়ান মুগ্ধ হয়ে। আমি শুধু আপনাকে — চাই মির্জা সায়ান মুগ্ধ। শুধু আপনাকে। বলুন, পূরণ করবেন আমার এই উইশ দু’টো?”
থমকায় রূঢ় মানব! থমকায় তার মুখ অভিব্যক্তি। বোকা মানবীর হুটহাট চেয়ে বসা আবদার গুলো খুব একটা মনে ধরেনি তার। সুশ্রী মুখমণ্ডলে ফুটেছে চরম অসন্তোষের ছাপ! ক্ষণকাল বাদেই ললাটের চামড়ায় গোটাকতক ভাঁজ পরিলক্ষিত হলো রূঢ় মানবের। দৃঢ় চোয়ালটা তার শক্ত হয়ে গেল আরও।

তৎক্ষনাৎ মানবীর উৎসুক দৃষ্টিজোড়া হতে নজর সরিয়ে এনে তাক করল অন্যত্র। মাহি হতভম্ব তার এরূপ প্রতিক্রিয়ায়! সন্দিগ্ধ দৃষ্টিযুগল উঁচিয়ে সুদর্শনের পানে তাকিয়ে থাকতেই হঠাৎ টের পেলো — তার পাতলা কোমর বরাবর এতক্ষণ যাবত আঁকড়ে ধরে রাখা যুবকের শক্তপোক্ত হাতখানা কেমন ধীরে ধীরে আলগা হচ্ছে! ক্ষণ প্রবাহে রূঢ় মানবের হাতের জোরালো বন্ধন হতে বিচ্ছিন্ন হলো মায়াবিনীর ক্ষুদ্র বদন। রমণী হতবিহ্বল! নরম পাদু’টো তার জামার ভারে খানিক টলতে টলতে পিছিয়ে গেল একটুখানি দুরত্বে। রূঢ় মানব তক্ষুনি শক্তমুখে দু’হাত গুঁজল পকেটে। চোয়ালের পেশি টানটান করে নিয়ে, দাঁতে তুললো কটমট শব্দ! খাঁড়া, নিখুঁত নাকের ডগাটা বড্ড ফুলিয়ে, সাপের ন্যায় হিসহিসিয়ে আচমকা রমণীকে পাশ কাটিয়ে চলে যেতে উদ্যোত হলো মুগ্ধ। দাম্ভিক কদমজোড়া খানিকটা এগোতেই আচানক পেছন থেকে একজোড়া নরম তুলতুলে হাত মুহুর্তেই খাবলে ধরল তার শক্ত বাঁহাতের কব্জি। তৎক্ষনাৎ থেমে গেল রূঢ় মানবের ব্যস্ত পদযুগল। বলিষ্ঠ ঘাড়টা দাম্ভিকতার পরশে একটাবার পিছুও ফিরলো না তার। এতে বুঝি বড্ড আহত হলো সদ্য অষ্টাদশে পা রাখা মায়াবিণী। কিছুক্ষণ আগ অব্ধি উপচে পড়া খুশিতে জ্বলজ্বল করতে থাকা তার স্নিগ্ধ মুখাবয়বে হুট করেই নেমে এলো — এক রাজ্যসম অন্ধকার। টকটকে গোলাপি অধরজোড়া খানিক উল্টে মায়াবিনী তক্ষুনি ভঙ্গুর কন্ঠে আওড়াল,

“ দু’হাত ভরে পূর্ণতার সুখ এনে হঠাৎ অর্ধেকটা দিয়ে বাকিটা ছিনিয়ে নিতে চাচ্ছেন?”
প্রস্তরখণ্ডের ন্যায় দৃঢ়, রূঢ় মানব কেমন পাহাড়ের ন্যায় সটান হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। দৃষ্টিজোড়া বড্ড তীক্ষ্ণতায় আবির্ভূত। রমণীর তুলতুলে হাতদুটোর বাঁধন হতে নিজ রুক্ষ হাতখানা সরিয়ে নেবার মোটেও তাড়া নেই তার মাঝে। বরং মানবীর ওমন ভগ্ন কন্ঠে শুনেও নির্বিকার ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে রইল সে। পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা বোকা মানবী খানিক হাসফাস করে উঠল এবার। হাতদুটোর তুলতুলে বাঁধন যৎসামান্য দৃঢ় করে এগিয়ে এলো একপা। পাহাড়সম লোকটার পিঠ বরাবর অনবদ্য দৃষ্টি ঠেকিয়ে ফের আওড়াল,
“ আপনি বলেছিলেন — আমি যা চাইব, তাই দিবেন বিস্ট। বলেছিলেন আপনি আমার তিনটে উইশ পূরণ করবেন। যদি পূরণ করবার সাধ্যি নাই-বা থাকতো, তাহলে মিথ্যে আশা দেখালেন কেনো? দু-চোখ ভর্তি রূপকথার স্বপ্ন দেখিয়ে হুট করেই ভাঙিয়ে দিলেন ঘুম। তারওপর ওমন নির্দয়ের মতো পিঠ দেখিয়ে চলে যাচ্ছেন?”
এবারেও নিশ্চুপ মুগ্ধ! মুখাবয়বে দৃঢ়তা অবলম্বন করে, কন্ঠার নিখুঁত সৌন্দর্যের অধিকারী উঁচু হাড়খানা সামান্য নাড়িয়ে শক্ত ঢোক গিললো সে। পিছু দাঁড়িয়ে থাকা মায়াবিনীর চোখদুটো ছলছল। গভীর দৃষ্টে এখনো তাকিয়ে আছে রূঢ় মানবের পিঠের দিকে। আত্মোপলব্ধি জরাজীর্ণ তার কোমল হৃদয়। অবচেতন মনের কোণে কেবল উত্থাপিত হচ্ছে একটিবাক্য!

“ নির্দয়রা কি তবে সত্যিই নিজেদের খোলস পাল্টাতে অপারগ?”
শুকনো ঢোক গিললো মাহি। ধীরলয়ে এগিয়ে এলো আরও দুপা। অতঃপর জরাজীর্ণ কোমল হৃদয়ের ভগ্নতার ভারে আচমকা ক্ষুদ্র বদনখানিতে বেশ দূর্বলতা টেনে, দু’হাতে আলতো করে জড়িয়ে ধরল মুগ্ধের বলিষ্ঠ হাতটা। আলগোছে সেথায় মাথা ঠেকিয়ে ছলছল চোখজোড়া বুজঁল মাহি। সঙ্গে সঙ্গে পলকের ঝাপ্টায় মায়াবিনীর চোখের কার্নিশ বেয়ে টুপ করে গড়িয়ে পড়ল একফোঁটা নোনাজল। তা নিঃশব্দে গড়ালেও, সম্মুখের নির্দয়ের কনক্রিটের আস্তরণে ঢেকে থাকা হৃদয়টা বুঝি বেশ টের পেলো তা। কেমন অজান্তেই বুকের খাঁচায় মোচড়ে উঠল বেয়াদব অঙ্গটা। হৃদয়ের হুটহাট চিনচিনে ব্যথায় জর্জরিত রূঢ় মানব, তৎক্ষনাৎ কপাল গুছিয়ে দাঁত বসালো অধরের কোণে। তন্মধ্যে মায়াবিনী মুখ খুললো। কি করুণ তার কন্ঠ!

“ আমায়…একটু নিজেকে হারাতে দিন না মুগ্ধ। একটু ভুলতে দিন ‘ আমিটা-কে ’। একটু ভুলতে দিন আপনার- আমার মাঝে থাকা সকল বাঁধাবিপত্তিকে। ভুলতে দিন — আপনার করা সেই সকল হিং স্রতাগুলো, যা বারংবার ক্ষত-বিক্ষত করেছে আমায়। আপনি বলেছিলেন, আপনি আমায় আপনার প্রতি দূর্বল করেই ছাড়বেন। বলেছিলেন — এই আমার চোখে আপনি নিজের জন্য কাতরতা এনেই ছাড়বেন। তবে আজ আমি বলছি মুগ্ধ! নিজে থেকে বলছি, আমিও দূর্বল হতে চাই। হ্যাঁ, হ্যাঁ আমি দূর্বল হতে চাই ঐ মির্জা সায়ান মুগ্ধের প্রতি — যার সঙ্গে প্রথম দর্শনে আমি কিশোরী মনে মুগ্ধতার ছোঁয়া লেগেছিল। আমি ঐ মাফিয়া শ্যাডো মনস্টার নামক মানুষটাকে ঘৃণা করি আমি মুগ্ধ, ঘৃণা করি তার হিং স্রতা। কিন্তু .. সেই ঘৃণার একছিটেও পারছিনা মির্জা সায়ান মুগ্ধের প্রতি আনতে। আমি দূর্বল মুগ্ধ! চাচ্ছি আরও দূর্বল হতে। যতোটা দূর্বল হলে পুরো জগৎ-সংসারের সবকিছুর উর্ধ্বে গিয়ে কারো মায়ায় জড়ানো যায়, ঠিক ততোটা।

আমি খুব করে চাচ্ছি মুগ্ধ, আপনার – আমার তিক্ত অতীতটা ভুলিয়ে আবারও দ্বিতীয়বারের মতো মন থেকে আপনার প্রতি দূর্বল হতে। এবার আর কোনো ছলনা নয়, নয় কোনো মোহদ্বন্দতা। খুব করে চাচ্ছি — আপনার বেপরোয়া ভালোবাসার রঙে নিজেকে একটুখানি রাঙাতে। খুব করে চাচ্ছি — আপনার চোখদুটোতে হিং স্রতার বদলে আমার জন্য, কেবলমাত্র আমার জন্য উন্মত্ততা দেখতে। জানি তো, আজ নয়তো কাল আপনি ঠিক নিজের চিরচেনা খোলসে ফিরবেন। আমি জানি আপনি রুশদী কিং, জানি আপনি হিং স্র! কিন্তু তারপরও আমি লোভী মানুষ। খুব বেশি না, মাত্র সাতটাদিন! আমি খুব সময় চাইবো না। আপনার দীর্ঘ অপেক্ষা থেকে আমায় আর মাত্র সাতটাদিন দিয়ে দিন। আমি বিষন্ন, অন্তরের দোলাচালে না পারছি আগাতে, আর না পারছি পেছাতে। অন্তত আমাকে এহেন দোলাচল থেকে মুক্তি দিন মুগ্ধ, আগামী সাতদিন আপনার সকল হিং স্র ভুলে গিয়ে, আপনি কেবল আমার থাকুন। আমায় খুব করে আপনাকে অনুভব করবার সুযোগটুকু দিন।”

কাঁদছে মাহি! হু হু করে ভাঙছে নয়নের সকল জমানো বাঁধ। ধীরে ধীরে সিক্ত করে দিচ্ছে রূঢ় মানবের বলিষ্ঠ বাহুটা। অথচ এক অদ্ভুত প্রগাঢ়তায় নির্বিকার মুগ্ধ! মায়াবিনীর কান্নার মাঝেই আচমকা জোরপূর্বক ছাড়িয়ে নিলো নিজ বলিষ্ঠ বাহুটা। হুট করেই কান্না থেমে গেল মাহি’র। সিক্ত চোখদুটোয় তার ভর করল একরাশ শূন্যতা। ফ্যালফ্যাল দৃষ্টে সম্মুখে তাকিয়ে রইল সে। রূঢ় মানব কেমন গটগটিয়ে চলে যাচ্ছে দু’হাত পকেটে গুঁজে। তাকাচ্ছে না একটাবারও। রমণী বুক কাঁপছে এবার। অদ্ভুত এক শূন্যতা মুহুর্তেই গ্রাস করল তাকে, দূর্বল করে দিলো পাদু’টোর শক্ত হাড়! ধীরে ধীরে টলতে টলতে রমণী হুট করেই হাঁটু ভেঙে ধপ করে বসে পড়ল জমিনে। চোখদুটোতে এক আকাশসম কাতরতা ঢেলে চেয়ে রইল মাহি। লোকটা ক্রমশ দৃশ্যপটের আড়াল হচ্ছে। একপর্যায়ে পুরোপুরি আড়াল হতেই বুকভাঙা আর্তনাদে ভেঙে পড়ল মাহি। কাঁদতে কাঁদতে দু’হাতে ঢেকে নিলো নিজ ক্ষুদ্র মুখখানা। মনে মনে বিড়বিড়ালো,
“ তাহলে হিং স্রতা আর আমার মাঝে আপনি হিং স্রতাটাকেই বেছে নিলেন মুগ্ধ! আবারও ভুল প্রমাণ করলেন আমায়। আপনার প্রতি দূর্বল হতে চাওয়াটা তবে আমার গোটা এক জীবনের অপূর্ণতা। আপনাকে, কেবল মির্জা সায়ান মুগ্ধকে নিজের করে পেতে চাওয়াটা কী আমার সবচেয়ে বড়ো লোভ মুগ্ধ? এটা কী আমার খুব বড়ো লোভ?”
নিজ মনের কোণে উত্থাপিত প্রশ্নের কাঙ্ক্ষিত উত্তর অজানা মানবীর। ফোলা ফোলা ড্রেসটার ওপর ভর দিয়ে কেঁদে যাচ্ছে একমনে। পাশেই গর্জন তুলছে সায়র! মাথার ওপর টিমটিমে তাঁরাভর্তি খোলা আকাশ। দূর থেকে একনজর মায়াবিনীকে পরোখ করলে মনে হবে — এ যেন রূপকথার এক রাজকন্যা! নিজ রাজকুমারের বিরহে সৈকতের বালুর ওপর বসে বসে কাঁদছে। ক্ষণকাল কতটুকু পেরুলো কে জানে! তন্মধ্যে আচানক অদূর হতে মায়াবিনীর কর্ণকুহরে ভেসে এলো এক সুপরিচিত ভরাট কন্ঠ!

“ হেই চাশমিস!”
ত্বরিত কান্না থামালো মাহি। কোনরূপ কালবিলম্ব না করে তড়াক মুখমণ্ডল হতে সরালো হাত। বিভ্রমে জর্জরিত আখিঁদ্বয় একযোগে অদূরে তাক করতেই থমকায় সে। অভ্যন্তরে হোঁচট খেল বেশ বড়সড়। অদূরে দু’হাত কালো রঙা ঢিলেঢালা ট্রাউজারের পকেটে গুঁজে দাঁড়িয়ে আছে মুগ্ধ। পরনে তার সেই প্রথম পরিচয় কালে পরিহিত কালো রঙা টেঙ্ক-টপটা। মাথাভর্তি বাবরিছাঁটা সিল্কি চুলগুলোর একাংশ, সেদিনের মতো এখনো পেছনে রাবারের বাঁধনে আঁটকে রাখা। সুদর্শনের ফর্সা কপালটা সেদিনের মতোই ঢেকে আছে এলোমেলো চুলের বাহারে। বলিষ্ঠহাতদুটোর ফুলেফেঁপে থাকা মাসেলস, বাদামী চোখদুটোর সেই একইরকমের স্থির দৃষ্টি! আই ভ্রো-তে পিয়ার্সিং নেই, ঠোঁটের কোণে সর্বদা বসিয়ে রাখা রিংটা এখন অনুপস্থিত। অষ্টাদশীর চোখদুটো স্থির হয়ে গেল যেন। কার্নিশ ভরে উঠল ফের। সম্মুখে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটা যেন সেই মির্জা সায়ান মুগ্ধ, যাকে প্রথম দেখেছিল সে। ঠিক একই বেশভূষা, একইরকম গভীর চাহনি, একইরকম দাঁড়িয়ে থাকার ভঙ্গি! মাহি’র পলক ফেলার জো নেই। ক্ষুদ্র মুখখানায় তার অবিশ্বাসের ভাবস্রোত স্পষ্ট। ঠিক তখনি অদূরে নির্বিকার ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে থাকা সুদর্শন মুখ খুললো। রমণীর পানে গভীর দৃষ্টিদ্বয় নিষ্পলক ভঙ্গিতে তাক করে রেখে, ভারিক্কি গলায় শুধালো,

“ ফার্স্ট মিটিংয়ে আমায় দেখে ভয় পেয়ে দূরে সরে গিয়েছিলি চাশমিস। কথা অবধি বলিসনি! আজ-ও কী সেদিনের মতো আমায় দেখে ভয় পেয়ে পালাবি?”
থামলো মুগ্ধ! পরপরই হতবাক রমণীর অভিমুখে নিজ বলিষ্ঠ বাহুদ্বয় প্রশস্ত করে হাস্কি স্বরে ফের আওড়াল,
“ কাছে আয় ঘাড়ত্যাড়া! পূরণ করে নে তোর করা প্রথম উইশটা। ওঠ, ওঠ চাশমিস! একটাবার স্বেচ্ছায় জড়িয়ে ধরবি না তোর মির্জা সায়ান মুগ্ধকে?”

রূঢ় মানবের শেষ বাক্যটুকু কর্নধার হতেই থমকে গেল মায়াবিনীর সমগ্র সত্তা। চোখদুটো পলক ফেলতে ভুলে গেল যেন। অন্তঃকোণে চলছে তোলপাড়। সেই তোলপাড়ের অভিঘাতে মুষড়ে যাচ্ছে রমণী। শত ঘাত-প্রতিঘাত পেরিয়ে একটুকরো শান্তির ঝলক পেতেই সিক্ত চোখদুটো চকচক করে উঠলো তার। পরক্ষণেই আর কোনোরূপ দ্বিধায় জড়ালো না সে। সিক্ত চোখদুটো মোছার বিন্দুমাত্র প্রয়োজনীয়তা অনুভব না করেই তৎক্ষনাৎ বসা ছেড়ে উঠে দাঁড়ায় মানবী। অধরকোণে এক চিলতে প্রাপ্তির হাসি টেনে, দু’হাতে আঁকড়ে ধরল পরনের ড্রেসটা। পরপরই অশ্রুসিক্ত আঁখিজোড়া মেলে ঝড়ের বেগে ছুটলো মানবী। দিশাহীন কায়দায় ছোটালো পাদু’টো। পথিমধ্যে সম্পূর্ণ কাঁচের তৈরী জুতোজোড়া বড্ড জ্বালালো তাকে। ছোটার ফাঁকে আচানক একখানা খুলে থেকে গেল বালুময় ভূবনে। অষ্টাদশী সেদিকে তোয়াক্কা করল না। ঠিক যেন এক রূপকথার রাজকন্যার ন্যায় নিজ বহুদিনের প্রতীক্ষিত আশ্রয়ের কাছে ফিরে যাবার প্রয়াসে ছুুটছে সে।

মধ্যকার পাঁচ দুরত্বের কাঁটাতারের অপেক্ষাটুকু খানিকবাদে স্বেচ্ছায় গ্রাস করলো মাহি। জমাটবদ্ধ সমস্ত অভিমান, সমস্ত বাঁধ বিপত্তি — সবকিছু ভুলে ঝাঁপিয়ে পড়ল মুগ্ধর প্রশস্ত রুক্ষ বুকে। এক দমকা হাওয়ার বেগে একখানা তুলতুলে ক্ষুদ্র বদন নিজ বদনে পরশ ছোঁয়াতেই আর একমুহূর্তও দেরি করলো না মুগ্ধ। বলিষ্ঠ বাহুদ্বয়ের দৃঢ় বন্ধনে মুহূর্তেই আগলে নিলো তার অঘোষিত সমগ্র অস্তিত্বকে। আকস্মিক আবেগের টানে রমণীর ক্ষুদ্র বদনখানি বুকের সঙ্গে আরও নিবিড় করে টেনে নিয়ে, অনায়াসে মানবীর পাদু’টো মাটি থেকে তুলে নিলো রূঢ় মানব। সহসা শূন্যে ঝুলে রইল রমণীর তুলতলে কদম জোড়া। পরিতৃপ্তিতে ক্ষীণ এক নিঃশ্বাস বেরিয়ে এলো সুদর্শনের অধর ফুঁড়ে। ললাটে নামলো স্বস্তির পরিতুষ্টি। চোখদুটো আবেশে বুঁজে নিয়ে, হাতের বাঁধন দৃঢ় করল মুগ্ধ। সুযোগ থাকলে এক্ষুণি বোধহয় মায়াবিনীকে ঢুকিয়ে ফেলতো নিজ বক্ষপিঞ্জরের খাঁচায়। মায়াবিনীও কম যায় না! তুলতুলে দু’হাতে বলিষ্ঠের ঘাড়টা বড়ো শক্ত করে পেঁচিয়ে, মুখ গুঁজেছে কাঁধের ত্বকে। মুহুর্তেই নিজের সমস্ত ভয়, সমস্ত সংকোচগুলো এক নিমিষেই ধুলোয় মিশিয়ে দিলো মাহি। কম্পিত কণ্ঠে বড়ো জোর দিয়ে অস্ফুটে আওড়াল,

“ মুগ্ধ! আ-আমার মু-মুগ্ধ!”
সুদর্শনের ঠোঁটের কোণে সহসা ফুটে উঠল এক দুর্লভ, বিজয়ী হাসি। যেন এতদিনের অপেক্ষার পর অবশেষে নিজের সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত মুহূর্তটুকু ছুঁয়ে ফেলেছে সে। দৃঢ় বাহুবন্ধনে নিজ চাশমিসকে আগলে রেখে নত হলো তার মুখ। অধরে বাড়লো দুরত্ব! এক অদেখা অভ্যন্তরীণ যন্ত্রণা থেকে বেরিয়ে আসতে কেউ বুঝি হাতছানি দিচ্ছে তাকে। সে-ই হাতছানিটুকুকে নিবিড়ভাবে আলিঙ্গন করল মুগ্ধ। বুকের ভেতর অস্থির হৃদস্পন্দন নিয়ে রমণীকে বড্ড শক্ত করে জড়িয়ে রেখে, প্রথমবারের মতো নিজ খোলস থেকে বেরিয়ে এসে বড়ো কাতর কন্ঠে আওড়াল,
“ আ-আমায়…আমায় কখনো ছেড়ে যাস না চাশমিস! তোর বিরহ আমার সহ্য হবে না। ম’রে যাবো আমি! সত্যি… ম’রে যাবো আমি। আমার এই দুর্বিষহ জীবনের একমাত্র প্রাপ্তি তুই, আমার বেঁচে থাকার কারণও। যেদিন আমার কাছ থেকে আমার বেঁচে থাকার কারণ সরে যাবে, আমি সেদিন স্বেচ্ছায় মৃ ত্যুকে আলিঙ্গন করব।”

আঁতকে উঠে মাহি। তড়াক জোরপূর্বক রূঢ় মানবের বলিষ্ঠ বাঁধন হতে মুখ তুলে চাইলো সে। তাকালো সুদর্শনের লাল হয়ে যাওয়া মুখপানে। মুহুর্তেই বুকটা কেমন ধ্বক করে উঠল তার। অস্থিরতায় তৎক্ষনাৎ তুলতুলে দু’হাতে আঁকড়ে ধরল মুগ্ধের রুক্ষ দু-গাল। মুগ্ধ অনিমেষ দৃষ্টে তাকিয়ে রইলো মেয়েটার পানে। মাহি মৃদু হাসলো। মুখটা বড্ড এগিয়ে এনে রূঢ় মানবের ললাটতটে আলতো করে ছুঁইয়ে দিলো ঠোঁট। আবেশে চোখদুটো বুঁজে এলো মুগ্ধের। দৃঢ় হলো বাহুদ্বয়ের বেষ্টন। মায়াবিনী অধর সরালো না। সেথায় ছুঁয়ে রেখেই প্রতিজ্ঞাবদ্ধ কন্ঠে আওড়াল,
“ হুঁশশ! এসব বলতে নেই। এই যে, আমি আছি তো! আর কোনোদিন ছেড়ে যাবো না আপনাকে। কোনোদিন না। যার অস্তিত্ব মিশে যাচ্ছে আমার অন্তরে, তাকে ফেলে কোথায় যাবো আমি? এতবড় সাধ্যি আমার থোড়াই হবে।”
অধরজোড়া সামান্য ছড়ালো মুগ্ধের। চোখদুটো ধীরলয়ে সরালো নিজেদের পর্দা। হাতদুটোর নিবিড় আলিঙ্গনের বেষ্টনে মায়াবিনীকে আগলে রেখে হুট করেই ক্ষীণ কন্ঠে আওড়াল,

“ সত্যি যাবি না তো?”
মাহি অধর সরায় এবার। মুহুর্তব্যয়ে ভেজা আঁখিদ্বয় তাক করে সুদর্শনের পানে। ঠোঁটের কোণে একটুকরো মিষ্টি হাসির রেশ ঝুলিয়ে আচমকা নিজ সরু নাকের ডগাটা এগিয়ে এনে, আলতো করে ঘষে দেয় মুগ্ধের নাকের সনে। ধীর স্বরে প্রতুত্তর করে,
“ যাবো না, যাবো না, যাবো না। আমার মুগ্ধকে ছেড়ে আমি কোত্থাও যাবো না।”
এতক্ষণে প্রশান্তির সুখে অধরজোড়া বড্ড প্রশস্ত হলো মুগ্ধের। রমণীও হাসলো খানিক। ধীরলয়ে মুখ সরিয়ে এনে আলতো স্বরে ফের আওড়াল,
“ চলুন!”
মুহুর্তেই সন্দিগ্ধতা ছড়ালো মুগ্ধের কন্ঠে,

“ কোথায়?”
মায়াবিনী চটজলদি উল্টোদিকে তর্জনী তাক করলো। বড্ড উচ্ছ্বসিত কন্ঠে শুধালো,
“ একসঙ্গে রাতের আকাশ দেখতে! চলুন না।”
রসকষহীন কাঠখোট্টা মানবের এসবে মন ধরে না। তবুও তার চোখেমুখে নেই বিন্দুমাত্র বিরক্তির ছাপ। বরং মায়াবিনীর আবদার শিরোধার্যে তুলে, মেয়েটাকে কোলে নিয়েই বাড়ালো পা। খানিকটা এগিয়ে এসে বালুময় প্রান্তরে দাঁড়াতেই মাহি চেঁচিয়ে উঠল,
“ দাঁড়ান, দাঁড়ান! এখানেই নামান।”
হুট করেই পায়ে রুখ টানলো মুগ্ধ। ঘাড়টা সামান্য কাত করে চাইলো মাহি’র পানে। গম্ভীর কন্ঠে আওড়াল,
“ আমার কোলেই থাক না।”
মানবী তা মানতে নারাজ। একপ্রকার গো ধরে বলল,
“ নাহ! আমায় নিচে নামান। কোলে উঠে আকাশ দেখায় থোড়াই মজা আসবে। নামান তাড়াতাড়ি।”
মুগ্ধ উপায়হীন! মেয়েটার সম্মুখে গম্ভীরপনা চলছে না তার। তাই তো কেমন বাধ্য প্রেমিক পুরুষের ন্যায় মানবীকে নামিয়ে দিলো কোল থেকে। মাহি তক্ষুনি ছুটে গেল একপা। বড়ো আশা নিয়ে বসার জন্য একটা নির্দিষ্ট জায়গা খুঁজে পেয়ে উচ্ছ্বসিত সে, তবে পরমুহূর্তেই নিজ পরনে অতো সুন্দর দামী ড্রেসটা দেখে মুখটা কালো হয়ে গেল মাহি’র। বালুর ওপর বসলে ড্রেসটা যদি খারাপ হ’য়ে যায় তখন? মন খারাপের আবহে মায়াবিনী চিবুক নামালো কন্ঠার নিকট। ঠিক তখনি দু’টো রুক্ষ আঙুল আচমকা ছুঁয়ে দিলো মাহি’র নরম চিবুকের ত্বক। নিজস্ব জোরে মেয়েটার মুখটা খানিকটা উঁচিয়ে তুলে সন্দিগ্ধ গলায় প্রশ্ন ছুড়ঁল মুগ্ধ,

“ কি হয়েছে? মন খারাপ করলি কেনো?”
বিষন্ন মাহি! ফোঁস করে নিশ্বাস ফেলে তাকালো নিজ পরনের জামার পানে। বড্ড আফসোসের সাথে প্রতুত্তর করল,
“ ভেবেছিলাম আপনার কোলে মাথা রেখে আকাশ দেখব আর গল্প করব, তবে এই বালুতে বসলে ড্রেসটা নষ্ট হয়ে যাবে তো।”
“ সো হোয়াট?”
কথার পিঠে মুগ্ধের এহেন নির্লিপ্ত প্রতুত্তরে ভড়কায় মাহি। আমতা আমতা করে যে-ই না কিছু আওড়াতে যাবে, তার পূর্বেই কর্ণকুহরে পৌঁছাল মুগ্ধের ভরাট অথচ দাম্ভিক কন্ঠ!
“ টাকার বিছানায় ঘুমানো মানবীর, খুচরো পয়সার চিন্তা করে লাভ নেই। একটা গেলে হাজারটা আনবো! তোর কাজ শুধু যেটা ভাল্লাগবে সেটার দিকে একবার চোখ তুলে তাকানো, দ্যাট’স ইট। সো ওসব বুলশিট নিয়ে মাথা ঘামাবি না। আয়!”

বলেই হতভম্ব মাহি’র নরম হাতের কব্জিসন্ধি আঁকড়ে টান বসালো মুগ্ধ। মেয়েটাকে কোনোকিছু বলার সুযোগ না দিয়ে, নিজে গিয়ে বসলো বালুময় জমিনে। পরপরই অষ্টাদশীর কব্জিসন্ধিতে হেঁচকা টান বসিয়ে মেয়েটাকে একপ্রকার আছড়ে ফেলল নিজ রুক্ষ বক্ষের ওপর। ঘটনাপ্রবাহে হতবিহ্বল মাহি। খানিকক্ষণ লাগলো নিজেকে ধাতস্থ করতে। তন্মধ্যে মুগ্ধ কেমন ভারিক্কি গলায় বলে ওঠে,
“ তোকে আজ কেমন কেমন যেন লাগছে!”
ত্বরিত চোখদুটো তীক্ষ্ণ করল মাহি। ধীরলয়ে রূঢ় মানবের বুক থেকে সরে এসে আলতো করে মাথা রাখলো তার কোলে। অতঃপর দৃষ্টিজোড়া উঁচিয়ে সন্দিহান কন্ঠে জিজ্ঞেস করল,
“ কেমন কেমন?”
অধর কামড়ে হাসল মুগ্ধ। আলতো করে আঙুল চালালো মায়াবিনীর চুলের ভাঁজে। ধীরকন্ঠে প্রতুত্তর ছুড়ঁল,
“ স্ট্রং ভো-দকার সাথে দুই পেগ কড়া হুইস্কি সামান্য ঝাঁকিয়ে উইদ লাইম সোডা মেশালে যেমন লাগে। ঠিক তেমন! উফফ…হোয়াট আ সে*ক্সি কম্বিনেশন।”
অবোধ্যের ন্যায় তাকিয়ে রইলো মাহি। লোকটার কথায় হাসবে না মুখ কুঁচকাবে, তা নিয়ে পড়ল বড্ড সন্দিগ্ধতায়। একমুহূর্ত স্থবির থেকে পরক্ষণেই কপাল কুঁচকে আওড়াল,
“ স্বাভাবিকভাবে প্রশংসা করলে জাত যায় আপনার তাই না?”
বাঁকা হাসে মুগ্ধ। মাহি’র চুলের ভাঁজে আঙুল চালিয়ে শ্লেষাত্মক কন্ঠে প্রতুত্তরে বলে,
“ সম্ভবত ইয়েস!”

চারপাশে সায়রের মৃদু গর্জন! বড্ড দূরে সাগরপাখির ডাক আর বালুকাবেলায় ছড়িয়ে থাকা সকালের নরম স্নিগ্ধতায় প্রজ্বলিত আশপাশ। সমুদ্রের নোনা বাতাসের অভিঘাতে ধীরে ধীরে কেঁপে উঠল অষ্টাদশীর বদ্ধ আঁখিদ্বয়ের পাপড়ি। গভীর নিদ্রায় সামান্য ছেদ পরতেই কপাল কুঁচকে গেল তার। একপ্রকার টেনেহিঁচড়ে ধীরলয়ে খুললো চোখদুটো। নিবুনিবু দৃষ্টে তাকালো সমুদ্রের পানে। ঘুমন্ত মস্তিষ্ক তার সজাগ হতে মিনিট খানেক নিলো বোধহয়। এরইমধ্যে ক্ষুদ্র বদনখানায় খানিক নড়চড় হলো মানবীর। আচমকা বোধ হলো — তার মাথার নিচে বালির নরম স্পর্শ নেই। বরং তার বদলে রয়েছে উষ্ণ এবং দৃঢ় কোনো এক আশ্রয়। বিস্মিত মানবী তক্ষুনি পলক তুলে চাইলো ওপরে। মুহুর্তেই দৃষ্টিপটের সম্মুখে দৃশ্যমান হলো সুদর্শনের সুশ্রী গৌরবর্ণা মুখখানা। কেমন অপলক দৃষ্টে তাকিয়ে আছে মেয়েটার পানে। তার বাদামী চোখদুটো গাঢ় লাল বর্ণ ধারণ করেছে। ডানহাতের আঙুলগুলো এখনো চলছে মায়াবিনীর চুলের ভাঁজে। তার বদৌলতে প্রখর দিনের আলো মাহি’র মুখে এসে পড়েনি একটুও। সে যে নিজের শরীরটাকেই আলোর বিপরীতে ছায়ার প্রাচীর বানিয়ে রেখেছে।
ঘুমজড়ানো চোখে কিছুক্ষণ নির্বাক তাকিয়ে রইল মাহি। বোকার ন্যায় অস্ফুটে শুধালো,

“ কখন উঠলেন?”
সুদর্শনের মুখ অভিব্যাক্তি ধরাছোঁয়ার বাইরে। দৃষ্টিতে প্রগাঢ়তা নামিয়ে হাস্কি স্বরে আওড়াল,
“ যেখানে বন্ধ হয়নি চোখের পাতা, সেখানে নতুন করে জেগে উঠার প্রশ্ন নেহাৎ তাচ্ছিল্য বৈকি!”
আকাশ থেকে পড়ল মাহি। হতবাকতার অতল সমুদ্রে গলা অব্ধি ডুবে গিয়ে, তড়াক উঠে বসল শোয়া ছেড়ে। শরীর ঘুরিয়ে বিস্ফোরিত গলায় বলে উঠল,
“ কী বললেন? আপনি সারারাত ঘুমাননি? কেনো ঘুমালেন না আপনি?”
রূঢ় মানবের মুখাবয়বে ক্লান্তির নামমাত্র ছাপ নেই। সেথায় রয়েছে একরাশ বিমুগ্ধতা। আলগোছে একহাত বাড়িয়ে এনে, রমণীর ক্ষুদ্র মুখখানার ওপর আছড়ে পড়া অবাধ্য চুলগুলো আলতো করে কানের পিঠে গুঁজে দিতে দিতে শুধালো,
“ তোকে দেখতে দেখতে কখন সকাল হয়ে গেল, তা টের পাইনি!”
যুবকের নির্লিপ্ত উত্তর। তা শুনে হতভম্ব মাহি। কী অদ্ভুত মানুষ! কাউকে সারারাত ভরে দেখার মতো কি আছে? বোকা মানবী মুখ গোমড়া করল। মুগ্ধের হাতে ভর দিয়ে ধীরলয়ে উঠে দাঁড়ালো কোনরকমে। এরইমধ্যে মানবী টের পেলো তার পেট ডাকছে। পেটের ভেতর গুড়গুড় করছে ইঁদুরগুলো। অষ্টাদশী তৎক্ষনাৎ রূঢ় মানবের উদ্দেশ্যে ঘাড় ঘুরিয়ে পেছনে ঘুরতে চাইলো, ঠিক তখনি তার ক্ষুদ্র মুখখানা হুটহাট ধাক্কা খেলো রূঢ় মানবের ইস্পাত-দৃঢ় বক্ষের সনে। এরূপ অতর্কিত আঘাতের অভিঘাতে খানিক টলতে গেলেই মুগ্ধের বলিষ্ঠ হাতখানা আলগোছে আগলে নিলো রমণীকে। দৃষ্টিতে তীক্ষ্ণতা লেপ্টে আচমকা শুধালো,

“ কী খাবি?”
হতবিহ্বল মাহি ত্বরিত হতবুদ্ধির ন্যায় তাকালো মুগ্ধের পানে। তার মুখাবয়বে হতবাকতার ছাপ স্পষ্ট। সন্দিহান গলায় অস্ফুটে আওড়াল,
“ আপনি কি করে বুঝলেন আমার ক্ষুধা পেয়েছে?”
মুগ্ধ প্রতুত্তর করল না। বরং মায়াবিনীকে একহাতের বলিষ্ঠ জোরে কোলে তুলে নিয়ে পা বাড়ালো ক্যাসেলের দিকে। অথচ মাহি এখনো উত্তরের অপেক্ষায়। লোকটা থামছে না বলে হুট করেই টেনে ধরলো শার্টের কলার। পরপর ব্যস্ত কন্ঠে শুধালো,
“ হেই ওয়েট…আলাদীনের জিনি!”
থামলো মুগ্ধ! এক আকাশসম বিরক্তি নিয়ে কপাল কুঁচকে তাকালো মাহি’র পানে। কেমন তিক্ত কন্ঠে আওড়াল,
“ ওয়েট! হোয়াট ডিড ইউ সে? ইউ সেইড আলাদীনের জিনি? হোয়াদ্দা ফা’ক ইজ দিস দেড়ব্যাটারী? নামের অভাব পড়েছে ডাকার জন্য? কিসব উদ্ভট নাম এসব! আমার মতো হ্যান্ডসামকে দেখতে কোন জায়গা দিয়ে জিনিদের মতো লাগে?”

মাহি মুখ টিপে হাসলো। কিছুক্ষণ আগ অব্ধি ইচ্ছে ছিলো না লোকটাকে জ্বালাবার। তবে এবার তার দুষ্টু মনে উত্থাপিত হলো এক অভিনব দুষ্টুমির কৌশল। মানবী কপট ভাব টানলো মুখাবয়বে। তৎক্ষনাৎ দু’হাত উঠিয়ে আলগোছে ছুঁয়ে দিলো মুগ্ধের রুক্ষ গালদুটো। কপট নাটকীয় ভাবভঙ্গিতে বলল,
“ আশ্চর্য! ফা’ক ফা’ক করার কি আছে? যা সত্যি তা-ই তো বললাম। আপনি ইদানীং আলাদীনের জিনি হয়ে উঠেছেন আমার জন্য। আমার একমাত্র পার্সোনাল জিনি! চেরাগ না ঘষেও যার কাছে কিছু আবদার করলে তা চোখের পলকে হাজির হয়ে যায়। তো বলুন এবার? আপনি হলেন না আমার আলাদীনের জিনি?”
ফোঁস করে নিশ্বাস ফেললো মুগ্ধ। একমুহূর্ত স্থবির নয়নে রমণীর পানে তাকিয়ে থেকে পরক্ষণেই দৃষ্টি সরালো অন্যত্র। কন্ঠে ফোঁটালো এক অদ্ভুত যন্ত্রণার ছাপ।
“ উহুঁ! ভুল বললি। আলাদীনের জিনির তো ঠাঁই পাওয়ার মতো একটা চেরাগ ছিল, আমার তো তাও নেই!”
বোকা মানবীর অন্তঃকোণে আঘাত হানলো বাক্যটুকু। জোরালো উপলব্ধিতে বুঝে গেল মুগ্ধের কথার গভীরার্থ। তক্ষুনি দু’হাতের আলতো জোরে বলিষ্ঠের সুদর্শন মুখখানা নিজের দিকে ঘোরালো মাহি। ঠোঁটের কোণে এক চিলতে মুচকি হাসির রেশ ফুটিয়ে, বড্ড আস্বস্ত কন্ঠে আওড়াল,

“ কে বললো নেই? এই যে, আমি আছি না? আমি আপনার চেরাগ হবো, আর আপনি আমার রাশিয়ান দৈত্য! হয়ে গেল না একটা পারফেক্ট আলাদীনের জিনি কম্বো? তো বলুন, ইজ নট ইট কুল বিস্ট? ওপস সরি…মুগ্ধ।”
দৃষ্টিজোড়ায় প্রশান্তির ছাপ ফুটলো মুগ্ধের। ভ্রূদ্বয় কুঁচকে এলো সামান্য। অধরের কোণে দাঁত বসিয়ে, বলিষ্ঠ হাতের জোরে মেয়েটাকে আরেকটু এগিয়ে এনে কপালের সনে ঠেকালো কপাল। মাহি নিশ্চুপ! কোনরূপ তাড়া দেখালো না সরে যেতে। কয়েক মুহুর্ত নিজেদের নিশ্বাস প্রশ্বাস মাপলো তারা। পরক্ষণেই মধ্যকার নীরবতা কাটিয়ে মুগ্ধ কেমন ভরাট কন্ঠে শুধালো,
“ কতদিন রবি আমার?”
মায়াবিনী চোখ বুজঁল। ধীর কন্ঠে প্রতুত্তর করল,
“ শেষ নিশ্বাস অবধি। চলবে?”
“ উঁহু!”

মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ৬৩ (২)

দু’ধারে মাথা নাড়ায় মুগ্ধ। তা উপলব্ধ হতেই শঙ্কায় কপাল গোছায় মাহি। সন্দিহান গলায় জিজ্ঞেস করে ওঠে,
“ কেনো? এরচেয়ে বেশি যে আমার সাধ্যি তে নেই।”
এপর্যায়ে দৃষ্টি স্থির হলো মুগ্ধের। কন্ঠে নামলো দৃঢ়তা!
“ কে বলেছে নেই? পরপারেও তুই আমার থাকবি, আর আমি তোর! পৃথিবীর এটুকু সময়ের সান্নিধ্যে আমার পোষাবে না। এক্ষেত্রে আমি ভীষণ লোভী!”

মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ৬৪ (২)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here