Home মির্জা সায়ান মুগ্ধ মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ৬৪ (২)

মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ৬৪ (২)

মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ৬৪ (২)
jannatul firdaus mithila

“ কে বলেছে নেই? পরপারেও তুই আমার থাকবি, আর আমি তোর! পৃথিবীর এটুকু সময়ের সান্নিধ্যে আমার পোষাবে না। এক্ষেত্রে আমি ভীষণ লোভী!”
কী নিখাঁদ বাক্য! যেন প্রতিটি শব্দের পেছনে একেকটা তীক্ষ্ণ তীর সংযুক্ত। রমণীর কোমল হৃদয়ে যা বিদ্ধ হলো পরক্ষণেই। কর্ণকুহরে বাক্যযুগল পৌঁছাতেই স্তব্ধ হলো তার চারপাশ। স্তব্ধতার নিস্তব্ধতায় কিছুক্ষণ নির্বাক রইল তার জিভের ডগা। আবেশে আচ্ছাদিত ছলছল চোখজোড়া ধীরলয়ে নজর তাক করল সম্মুখের সুদর্শনের মুখপানে। সুদর্শন কপালে কপাল ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে চুপচাপ! আবেশের ভারে বুঁজেছে দু-চোখ। রমণী একমুহূর্ত ঠায় তাকিয়ে রইলো মুগ্ধের পানে। পরপরই তার আঁখিদ্বয়ের কার্নিশ ভরে উঠল বেহায়া আবেগের বশবর্তী হয়ে। ধীরলয়ে দৃষ্টি নামিয়ে চোখের পলক ফেলতেই যেই না চোখের কোণে জমে থাকা অশ্রুবিন্দুটি গড়িয়ে পড়ল কোটর ছাড়িয়ে, ওমনি রূঢ় মানবের রুক্ষ হাতের তালুখানা আলগোছে নিজেকে সপে দিলো মানবীর অশ্রুফোঁটার পদতলে। এহেন অতর্কিত কান্ডে ভড়কায় মাহি। বিস্ফোরিত নেত্রে ঘাড় উঁচাতেই দৃশ্যমান হলো — সুদর্শনের গম্ভীর মুখখানা। সে কেমন তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে নিজ ডানহাতের তালুতে পড়ে থাকা অশ্রুবিন্দুর দিকে। যেন খুব মনোযোগ দিয়ে কিছু একটা দেখছে সে। খানিকবাদে রমণীকে বড্ড অবাক করে দিয়ে বলিষ্ঠ ঘটালো আরেক কান্ড। আচমকা নিজ হাতের উম্মুক্ত তালুটা টেনে এনে ঘষতে লাগল নিজ রুক্ষ বক্ষভাঁজে। মুখাবয়বে চরম অসন্তোষের ছাপ ফুটিয়ে গমগমে গলায় শুধালো,

“ স্বেচ্ছায় এই কাজ আর কখনো করতে যাস না চাশমিস! তোর চোখ থেকে অশ্রু ঝরবে কেবলমাত্র আমার অসহ্য আদরের সংস্পর্শে এলে। তোর সর্বাঙ্গে আমার হুটহাট বেপরোয়া বিচরণ যখন মাত্রাতিরিক্ততা ছাড়াবে তখন কাঁদবি তুই। আমায় নিবিড়ভাবে জড়িয়ে ধরে নিজেকে পুরোপুরি রূপে সপে দিয়ে অশ্রু ঝরাবি তুই! তা বিনে অন্য কখনো চোখ দিয়ে অশ্রু ঝরানোর দুঃসাহস করিস না মেয়ে, নয়তো তোর এহেন ঔদ্ধত্যভরা দুঃসাহসের জন্য তোর চোখদুটো থেকে অশ্রু ঝরানোর কারণটাকে বিনাবাক্যে পৃথিবীর বুক থেকে উপড়ে ফেলব আমি। মাইন্ড ইট!”
ভড়কায় মাহি! বিস্ফোরিত রূপ ধরল তার চোখদুটো। হতভম্বের ন্যায় অধর নাড়িয়ে উচ্চারণ করল —
“ মুগ্ধ! আপনি আবারও শুরু করলেন আপনার হিং স্রতা? আপনি হয়তো ভুলে যাচ্ছেন,আপনি আমায় কথা দিয়েছিলেন — আগামী সাতদিন আপনি পুরোপুরি আমার হয়ে অর্থাৎ শুধুমাত্র মির্জা সায়ান মুগ্ধ হয়ে থাকবেন। কোনো মাফিয়া মনস্টার না!”

আচানক বাদামী অধরজোড়ার কোণে এক চিলতে বাঁকা হাসির রেশ ফুটলো মুগ্ধের। মানবীকে তুলে রাখা শক্তপোক্ত হাতখানায় বাড়ল জোর। বলিষ্ঠ পাদু’টোয় গতি টেনে সম্মুখে অগ্রসর হয়ে ভনিতাহীন কন্ঠে শুধালো,
“ ডোন্ট ফরগেট মিসেস অধীর রায় — আমার নাম পাল্টালেও স্বভাব, চরিত্র কিন্তু আজীবন একই থাকবে।”
নাক ফুলিয়ে সশব্দে নিশ্বাস ফেলল মাহি। গালদুটো মুহুর্তেই ফুলে হয়ে গেল পটকা মাছের মতো। এদিকে, আড়দৃষ্টে মায়াবিনীর গাল ফোলানো বড্ড উপভোগ করছে মুগ্ধ। কয়েকপল পেরুতেই আচমকা গমগমে কন্ঠে আওড়াল,
“ হাগ মি!”
তড়াক ঝাঁঝ দেখিয়ে অন্যত্র মুখ ঘোরালো মাহি। বলিষ্ঠের কোলে থেকেই হাতদুটো বুকের কাছে বেঁধে নিলো শক্ত করে। তুলতুলে গালের ভাঁজে হাওয়া ঢুকিয়ে খেঁক খেঁক করে শুধালো,
“ পারব না! যান।”
কথাটা বলতে দেরি, অথচ ঝড়ের বেগে একজোড়া রুক্ষ ওষ্ঠপুট মুহুর্তেই রমণীর তুলতুলে ডানগালে নিজেদের ডুবিয়ে দিতে দেরি করল না। এরূপ হুটহাট আক্রমণে অভ্যন্তরে ভড়কালো মাহি। তবুও বাইরে থেকে যথাসম্ভব গাল ফুলিয়ে রইলো সে। রুক্ষ অধরযুগল ক্ষণকাল বাদেই নিজেদের বিচ্ছিন্ন করল মায়াবিনীর মসৃণ কপোল হতে। ভারিক্কী কন্ঠে শুধালো,

“ হাগ মি চাশমিস! আদারওয়াইজ, খুব খারাপ কিছু হয়ে যাবে কিন্তু।”
ধীরলয়ে আড়দৃষ্টিতে তাকালো মাহি। নজর ঠেকালো মুগ্ধের গুরুগম্ভীর সুদর্শন মুখপানে। দৃষ্টিজোড়া মুহুর্তেই চৌকস করে নিয়ে সন্দিগ্ধ গলায় আওড়াল,
“ কি খারাপ করবেন শুনি? বড়জোর কয়েকটা শক্ত চুমু বাড়িয়ে দিবেন, এইতো?”
তৎক্ষনাৎ অধরকোণে দাঁত বসায় মুগ্ধ। বলিষ্ঠ ঘাড়টা বেশ ঝুঁকিয়ে, মুখটা এগিয়ে আনলো মাহি’র বড্ড কাছে। মাহি নড়লো না, না সরালো ঘাড়! ততক্ষণে মুগ্ধের তামাকে পোড়া বাদামী ঠোঁটজোড়া আলতো করে পরশ ছোঁয়ালো মাহি’র তুলতুলে নরম অধরযুগলের সনে। হিসহিসিয়ে আওড়াল,
“ উহুঁম! এবার আর গোটাকয়েক শক্ত চুমুতে কাজ হবে না আমার! কজ আ’ম হাঙ্গরি ফর ইউ। ধরলে একেবারে খেয়ে ফেলব!”
শুকনো ঢোক গিললো মাহি! মুগ্ধের ওষ্ঠপুটের গায়ে অধর ছুঁইয়ে রেখে অতিষ্ঠ কন্ঠে পরপর আওড়াল,
“ রাক্ষস একটা!”
বাঁকা হাসলো মুগ্ধ। পায়ের গতি সচল রেখে ভনিতাহীন কন্ঠে প্রতুত্তর ছুড়ঁল,
“ চিনতে বড্ড দেরি করে ফেললি রে দেড়ব্যাটারী। বড্ড দেরি!”

কাজান; রাশিয়া!
শহরের কোলাহল থেকে বহু দূরে, তুষারে ঢাকা নির্জন প্রান্তরের বুক চিরে দাঁড়িয়ে আছে কু-পরিচিত গ্যাংস্টার নিকোলাসের বিলাসবহুল “ ঘোস্ট ” মেনশন। বাড়ির চারপাশে অগণিত দেহরক্ষীরা যখন কড়া নজরদারিতে ব্যস্ত, ঠিক তখনি ম্যানশনের অত্যন্ত বিলাসী কক্ষটি এহেন দিনের আলোয় মেতে উঠেছে কিছু বিশৃঙ্খল কর্মকাণ্ডে। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত সুবিশাল কক্ষটিতে দিনের আলো অস্পষ্ট। কক্ষের প্রতিটি জানালার গায়ে ভারী মখমলের পর্দা টেনে রাখা, চারপাশে দামি সুগন্ধির তীব্র ঘ্রাণ! ওমন আবছা আলোর ভেতর কয়েকজন রমণীকে ঘিরে বসে আছেন মেনশনের অধিপতি — নিকোলাস! সে-কী উশৃংখল কর্মকাণ্ড নারীলিপ্সুকের! আশেপাশে তার চারজন ভিন্ন দেশী সুন্দরী শয্যাসঙ্গীনি, কোলে ওপর বিশৃঙ্খল কায়দায় বসিয়ে রেখেছে কমবয়সী এক অর্ধন*গ্ন তরুণীকে। তরুণীর মাখনরঙা উম্মুক্ত সর্বাঙ্গে অবাধ্যের ন্যায় বিচরণ করছে নিকের রুক্ষ, নির্দয় হাতদুটো। চোখেমুখে তার সে-কি বেপরোয়া লালসা আর বিকৃত আত্মতৃপ্তির ছাপ। নিজ হাতদুটোর বেহায়া কর্মকাণ্ড বহাল রেখে, ঘাড় বাকিয়ে তক্ষুণি পাশে বসে থাকা পারস্য সুন্দরীর টকটকে র*ক্তি*ম ওষ্ঠপুটের ওপর দখলদারিত্বে মত্ত হলো নিক। তীব্র আচ্ছন্নতায় একে একে প্রতিটি রমণীকে উশৃংখল মোহজালে আঁটকে নিলো একপর্যায়ে। সকলের অভিমুখে কোলে বসিয়ে রাখা রমণীর সুকোমল রাজহংসীর ন্যায় সুদীর্ঘ কন্ঠায় সজোরে আকঁড়ে ধরে হুংকার ছুঁড়ল,

“ পুট মি ইন, ইউ বি’চ!”
লালসার বেড়াজালে মোহিত তরুণী তৎক্ষনাৎ উদ্যোত হলো মনীবের হুকুম তামিলে। সদ্যোগে মধ্যকার দূরত্বটুকু তমসায় মিলিয়ে দিলো রমণী। খানিকবাদে নিজেদের বিশৃঙ্খল ঘনিষ্ঠতার অশালীন মুহূর্তে কক্ষের আবহ করে দিলো বড্ড ভারী! নিক অস্থির! বলিষ্ঠ দু’হাতের বন্ধনে আঁটকে থাকা ভিন্ন সুন্দরীদের বড্ড কাছে টেনে এনে, মুখ গুঁজল অন্যের তুলতুলে বক্ষে। ঠিক তখনি, আবদ্ধ কামরার দুয়ারে কড়া নাড়ানোর শব্দ হলো বেশ। ওপাশ থেকে খানিকবাদে ভেসে এলো, গ্যাব্রিয়েলের সুউচ্চ কন্ঠ!
“ বস? আই নিড টু টক টু ইউ। ইট’স ভেরি ইম্পর্ট্যান্ট!”
ঘনিষ্ঠতার কাল মুহুর্তে আবির্ভূত নিক। ভারী উষ্ণ নিশ্বাস ক্রমাগত ফেলতে ফেলতে হুট করেই গলা উচিঁয়ে বলে উঠল,
“ কাম ইন বাস্টা’র্ড! কাম ইন।”
অনুমতি পাওয়া মাত্রই সবেগে দরজার নব ঘুরিয়ে দুয়ার খুললো গ্যাব্রিয়েল। আনমনে কক্ষে প্রবেশ করতেই দৃষ্টিযুগল মালিকের পানে আঁটকে গেল তার। পরক্ষণেই কপাল গুটে গেল খানিক বিরক্তিতে। যদিও এ দৃশ্য নতুন নয় তার নিকট, তবুও মাঝেমধ্যে হিংসাপরায়ন মনটা বড্ড কু কু করে তার। আজও তাঁর ব্যাতিক্রম নয়। গ্যাব্রিয়েল তক্ষুনি নজর ঝুঁকিয়ে এগিয়ে এলো দু-কদম। খানিক গম্ভীর সুরে আওড়াল,

“ গতকাল রাতের নিউজ দেখেছেন বস?”
উত্তেজনার ভাবাবেগে দাঁতে দাঁত চাপছে নিক। দৃষ্টিযুগল উন্মত্ত তরুণীর পানে ঠেকিয়ে রেখে অস্ফুটে প্রতুত্তর করল,
“ না-হ! ওহ..কেনো, কি হয়েছে? উমম!”
“ গতকাল রাতে রুশদী কিং ওরফে মাফিয়া শ্যাডো মনস্টার প্রথমবারের মতো নিজের আকাশছোঁয়া ক্ষমতার একটুখানি শোডাউন দেখিয়েছে।”
তড়াক উত্তেজনার ভূত মাথা থেকে নেমে গেল নিকের। বিস্ফোরিত দৃষ্টিতে তাকালো গ্যাব্রিয়েলের পানে। কটমট কন্ঠে প্রশ্ন ছুড়ঁল,
“ হোয়াট ডু ইউ মিন?”

গ্যাব্রিয়েল নজর তুললো না। বরং হাতদুটো পিছমোড়া করে টেনে রেখে গম্ভীর কন্ঠে শুধালো,
“ আই মিন টু সে — গতকাল রাত ঠিক ১২টার সময় মনস্তার তার সিগনোরাকে বার্থডে উইশ করেছে, তাও কোনো যেন-তেন ওয়ে-তে নয়। বরং স্যাটেলাইট প্রজেকশনের মাধ্যমে একইসাথে ১৮টা দেশের আকাশপটে শো করিয়েছে বার্থডে উইশ। এরমানে বুঝতে পারছেন বস? মনস্তার… ”
“ হেভ আ ওয়াইফ! হোয়াদ্দা ফা’ক! মনস্তার বিয়ে করল কবে? কে এই সিগনোরা? আন্সার মি বাস্টা’র্ড!”
ঠান্ডা মাথার খু*নি গ্যাব্রিয়েল। বড্ড শান্ত দৃষ্টিতে তাকালো নিকের পানে। ধীরকন্ঠে প্রতুত্তরে বলে,
“ যেখানে আজ অব্দি মনস্তারের মুখটাই দেখা হলো না, সেখানে তার ওয়াইফকে দেখা কিংবা তার সম্বন্ধে কিছু জানা তো বিলাসিতা, বস!”

সহসা দাঁত খিঁচল নিক। এক আকাশসম রাগের তোড়ে আচমকা কোলের ওপর বসিয়ে রাখা তরুণীকে একপ্রকার টেনেহিঁচড়ে নামিয়ে দিলো নিজ কোল হতে। পরমুহূর্তেই চোয়াল শক্ত করে উঠে দাঁড়ায় নিক। তার নীলাভ চোখদুটো কেমন লাল হয়ে গিয়েছে ইতোমধ্যে! ফর্সা মুখশ্রীতে রাগের ছাপ স্পষ্ট। গজগজ করতে করতে একহাতে কোমর হতে টেনে আনলো আন্ডারওয়্যারটা। দাঁত কিড়মিড় করতে করতে শুধালো,
“ দ্যাট ব্লা’ডি এসহোল! প্রথমে দিলো গার্লফ্রেন্ডের প্যারা, এখন দিচ্ছে ওয়াইফের প্যারা। বাস্টা’র্ড একটা! গ্যাব্রিয়েল! গাড়ি বের কর।”
গম্ভীর গ্যাব্রিয়েল এখনো বেশ শান্ত। সাপের ন্যায় ফোঁস ফোঁস করতে থাকা নিক যে-ই না তাকে পাশ কাটিয়ে চলে যেতে উদ্যোত হলো, ঠিক তখনি ভরা মজলিসে বিস্ফোরিত বাক্য ছুড়ঁল গ্যাব্রিয়েল!
“ বস! ডোন্ট ইউ থিংক, কয়েকদিন আগে ড: দামিয়ান যেই মেয়ের কথা বলে গিয়েছিল, সেই বর্তমানে মনস্তারের ওয়াইফ!”
সহসা থমকে গেল নিক! থমকে গেল তার ব্যস্ত পদযুগল। বিচক্ষণ মস্তিষ্ক এবার জোর দিলো গ্যাব্রিয়েলের বাক্যে। কিছু একটা উপলব্ধ হতেই রয়েসয়ে ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসির রেশ ফুটলো নিকের। দৈবাৎ শক্তিতে ঘাড়টা বাঁকালো পরক্ষণে। হাত উঁচিয়ে গ্যাব্রিয়েলের কাঁধ চাপড়ে এক অদ্ভুত গাঢ় কন্ঠে শুধালো,
“ ইফ ইউ আর রাইট, দ্যান উই শ্যুড কংগ্রাচুলেট মনস্তার। দামিয়ান যেই স্কেচটা দিয়ে গিয়েছিল ওটা বের কর। আমি এবার আমার স্টাইলে মনস্তারকে কংগ্রাচুলেশনস জানাবো। শত হলেও তিনি রুশদী কিং! তারজন্য তো এতটুকু করাই যায়।”
বলেই অধর কোণে উত্থাপিত পৈ শা চি ক হাসিটুকু গাঢ় করল নিক। ধীরলয়ে পা বাড়ালো দুয়ারপানে। পেছন থেকে কেবল বলে গেল,
“ এতো ভালো খবর দেওয়ার জন্য থ্যাংকস গ্যাব্রিয়েল। যা, আগামী দু’ঘন্টার জন্য এখানে থাকা সবগুলো বার্ড তোর। হেভ ফুল্লি ফান উইদ দ্যাম।”

ফ্রেশ হয়ে সদ্য ঘর থেকে বেরোল মাহি। বোকা বোকা দৃষ্টিতে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখতে লাগলো চারপাশ! গতকাল রাতের আধো আলোয় প্রাইভেট আইল্যান্ডের বুকে দাঁড়িয়ে থাকা সুবিশাল ক্যাসেলটির পুরোটা ঘুরে ঘুরে দেখার সুযোগ মিলেনি তার। এখন যে দেখবে, তারও তো সুযোগ নেই! পেটের ভেতর ছোঁচা ইঁদুরগুলো যা করছে না। পারছেনা ছুটে বেরিয়ে আসতে ভেতর থেকে। ক্ষুধার্ত রমণী তৎক্ষনাৎ পা ছোটালো। দীর্ঘ করিডোর পেরিয়ে এসে দাঁড়াল প্রশস্ত গ্র্যান্ড সিঁড়িটির মাথায়। সিঁড়িটি দোতলার হলঘর থেকে সরাসরি নেমে গিয়েছে নিচতলার বিশাল লিভিং স্পেসে। চকচকে সাদা মার্বেলের ধাপ, দু’পাশে গাঢ় কাঠের কারুকার্যখচিত রেলিং আর মাঝ বরাবর ঝুলে থাকা বিশাল ক্রিস্টাল ঝাড়বাতির আলোয় প্রতিটি ধাপ মৃদু ঝিলমিল করছে।

আশপাশে এক-আধবার নজর বুলিয়ে ধীর পায়ে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামলো মাহি। অতবড় বাড়িটা কেমন খা খা করছে জনমানবহীনতায়। হুট করেই বুকের ভেতরটা ভয়ে মোচড় দিয়ে উঠল মাহি’র। ঢোক গিললো পরপর। ব্যস্ত কদমে নিচতলায় পা রাখতেই রমণীর নাসারন্ধ্রে কোত্থেকে থেকে যেন ভেসে এলো মশলা আর ভাজা মাখনের মন মাতানো গন্ধ। একে-তো ক্ষুধার তীব্রতা, তারওপর ওমন খাবারের সুগন্ধি! মুহুর্তেই পেটের ক্ষুধারা বুঝি মাথাচাড়া দিয়ে উঠল মাহি’র। অবচেতন মনের কোণে বাড়লো কৌতূহল। সুবাসের উৎস অনুসরণ করে এগোতে এগোতে একপর্যায়ে এসে থামল প্রশস্ত কিচেনের দরজার কাছে। উৎসুকতায় দুয়ারের দেয়াল টপকে নিঃশব্দে সম্মুখে উঁকি দিতেই—স্থির হয়ে গেল তার দৃষ্টিযুগল। থমকে গেল হৃৎস্পন্দন! সম্মুখে বিশাল এবং অত্যাধুনিক রান্নাঘরের দ্বীপাকৃতি কাউন্টারের সামনে দাঁড়িয়ে আছে সুদর্শন পুরুষ। উদোম ঊর্ধ্বাঙ্গে দক্ষের ন্যায় রান্নায় ব্যস্ত সে।

দৈত্যের ন্যায় দীর্ঘদেহী বলিষ্ঠ শরীরটা যেন এমুহূর্তে মাহি’র দৃষ্টিপটে কোনো এক দক্ষ কারিগরের হাতে বানানো শ্রেষ্ঠ মার্বেলের ভাস্কর্য। মানবের প্রশস্ত কাঁধ থেকে সরু কোমরের দিকে নেমে আসা মেদহীন ভি-শেপের গড়ন, কোমরের সামান্য নিচে বড্ড অহমিকায় ঝুঁলে আছে ট্রাউজারের অংশটুকু। বাবরিছাঁটা বাদামী চুলগুলো তার পেছনে টেনে ঝুঁটি বেঁধে রাখা। কয়েক গোছা অবাধ্য চুল ঘাড়ের কাছে দোল খাচ্ছে! রান্নার উষ্ণতায় কপাল আর ঘাড়ের সন্নিকটে হালকা ঘামের চিকচিকে আভা। এমুহূর্তে লোকটার সৌন্দর্যে যতটা না মোহিত অষ্টাদশী, তারচেয়েও বেশি হতবাক লোকটার দক্ষ কর্মকাণ্ডে। এক হাতে সে ফ্রাই প্যান সামলাচ্ছে, অন্য হাতে মশলা ছড়িয়ে দিচ্ছে অন্য চুলোয় জাল হতে থাকা খাবারটায়। কি সুন্দর অবলীলায় দু’হাতে রান্না করে চলেছে সে। মায়াবিনী অবাক হয়ে দেখলো লোকটাকে। প্রতিটি নড়াচড়ার সঙ্গে স্পষ্ট হয়ে উঠছে সুদর্শনের শক্ত পেশিগুলোর ওঠানামা। রমণীর নারীমন হুট করেই বড্ড আবিভূত হলো মনে হচ্ছে। বিমুগ্ধতায় ছেয়ে গেল পেলব মুখখানা। চোখের পাতা বেহায়ার ন্যায় রইলো অনড়। ক্ষনে ক্ষনে ঢোক গিলছে তার কন্ঠা! মাহি হুট করেই টের পাচ্ছে — কিচেনের উষ্ণতার চেয়েও বেশি উত্তাপ ছড়িয়ে পড়েছে তার আপন কপোলজোড়ায়। ক্ষণকাল বাদে একবার চাইলো দৃষ্টি সরিয়ে নিবে, তবে তা আর হলো কই?

রান্নার ফাঁকে মুগ্ধ এক হাতে ফ্রাই প্যান সামলে অন্য হাতে কাঠের চামচ দিয়ে খাবার নেড়ে দিল আরেকবার। চামচের তীক্ষ্ণ ধাক্কায় খাবারের ওপর থেকে বাষ্পীভূত উষ্ণ বাষ্পটুকু মুহুর্তেই এসে ছুঁয়ে দিলো রূঢ় মানবের লোমহীন উম্মুক্ত বুক। অবাধ্য চুলে লেপ্টে থাকা কপালের কাছে জমে থাকা ঘামের ক্ষুদ্র বিন্দুটি তক্ষুণি গড়িয়ে নেমে গেল কানের পাশ বেয়ে ঘাড়ের দিকে। এতটুকু দৃশ্যই যেন এক আকাশসম অস্বস্তি বাড়িয়ে দিলো রমণীর। নিজের অজান্তেই আবারও ঢোক গিলল সে। ঠিক তখনি, এক দমকা হাওয়ার ন্যায় সম্মুখ হতে ভেসে এলো রূঢ় মানবের গমগমে কন্ঠ!
“ আই নো আ’ম হ্যান্ডসাম! তাই বলে ক্ষুধার জ্বালায় আমাকেই ওভাবে চোখ দিয়ে গিলে খেতে হবে না-কি?”
মুহুর্তেই সর্বাঙ্গে ঝংকার বয়ে গেল মাহি’র। লজ্জা এবং অস্বস্তির মিশেলে ঝাঁঝিয়ে উঠল গালদুটো। ওদিকে, মুগ্ধের চামচ চালানো হাতটা থেমে গেল হঠাৎ। অদৃশ্য ইন্দ্রিয়ের টানে ধীরে ধীরে ঘাড় বাঁকায় সে। তক্ষুণি তার তীক্ষ্ণ দৃষ্টিজোড়া আচমকা গিয়ে ঠেকলো কিচেনের দরজার ফাঁকে। এরূপ দৃষ্টির সম্মুখীন হতেই লজ্জালু রমণী থমকে গেল ফের। এক অদ্ভুত অসারতায় পারলোনা চোখ সরাতে। বেহায়ার সব বাঁধন ভেঙে হা করে চেয়ে রইল লোকটার দিকে। মুগ্ধ হাসলো! ধারালো দাঁতের তলায় অধরের নিম্নাংশ টেনে বড্ড দুষ্ট ভঙ্গিতে হাসলো। রমণীর বুকের ভেতরটা আচমকাই ধ্বক করে উঠল তা দেখে। লোকটা কী তবে আগে থেকেই টের পেয়ে গিয়েছিল তার উপস্থিতি? এহেন ভাবাবেগে ভীষণ লজ্জায় পড়লো মাহি। তড়িঘড়ি করে নামিয়ে নিলো চোখ। ওদিকে, সুদর্শন যুবক আর কালবিলম্ব করল না। চুলের পেছনের ঝুঁটিটা একবার হাত দিয়ে ঠিক করে নিয়ে, অত্যন্ত স্বাভাবিক ভঙ্গিতে কড়াইয়ের আঁচ কমিয়ে দিল আলগোছে। তারপর শরীর ঘুরিয়ে কোমর ঠেকালো কাউন্টার টপের গায়ে। দু’হাত বড্ড রসিকতায় বুকের কাছে বেঁধে, গমগমে গলায় শুধালো,

“ কাছে আয়!”
ঢোক গিললো মাহি! জড়তায় আঁটকে গেল তার পাদু’টো। চেয়েও পারলোনা একচুল আগাতে। মুগ্ধ বোধহয় বুঝলো রমণীর জড়তা। তাইতো কেমন দুষ্ট ভঙ্গিতে ঘাড় কাত করে আওড়াল,
“ স্বেচ্ছায় আসবি? না-কি আমি নিজের মতো করে টেনে নিয়ে আসবো?”
এহেন ঠান্ডা হুমকিতে জমে গেল রমণীর অন্তঃকোণ। সামান্য কম্পিত বদনে কোনরকম দ্বিধায় এগোলো তার পাদু’টো। সময় নিয়ে যুবকের একহাত দুরত্বে পায়ের গতি থামাতেই আচমকা বলিষ্ঠের শক্তপোক্ত হাত এসে বিনাবাক্যে আঁকড়ে ধরল মাহি’র নরম বাঁকানো কোমর। অতঃপর জোরালো এক হেঁচকা টানে তাকে নিয়ে এলো নিজের বড্ড কাছে। রমণী ইতস্তত! লজ্জালু মুখটা ঠেকেছে মুগ্ধের উম্মুক্ত রুক্ষ বক্ষভাঁজে। পরক্ষণে কর্ণকুহরে হুট করেই ভেসে এলো মুগ্ধের দুষ্ট কন্ঠ!
“ আমাকে চোখ দিয়ে গিলে খেয়ে মজা লেগেছে, চাশমিস?”
রমণী জবাব দিলো না। লজ্জায় গালদুটো র*ক্তিম হয়ে উঠেছে তার। বেয়াদব ছেলেটা তক্ষুণি সামান্য ঝুঁকে এলো মেয়েটার মুখের দিকে। চোখেমুখে তখন নিছক দুষ্টুমি।
“ রান্না শিখবি? আমি কিন্তু একজন গুড মাস্টার!”
মাহি একবার চাইলো — মুখের ওপর না করে দিতে। কিন্তু পরমুহূর্তেই তার মনে এলো,
“ লোকটা সেই কখন থেকে একা একা কাজ করছে। খানিকটা সৌজন্যতাবোধ বলতেও তো কিছু একটা থাকে না-কি?”

এহেন ভাবাবেগে কোনোরকমে মাথা কাত করল মাহি। তা অবলোকন হওয়া মাত্রই মুগ্ধর হাসিটা এবার আরও প্রশস্ত হলো। এক ঝটকায় তুলোর সাদৃশ মানবীকে টেনে এনে দাঁড় করালো কাউন্টারের সম্মুখে। অতঃপর নিজে দাঁড়ালো তার পিছু। ছোট্ট পিচ্চি মেয়েটা তার বুক সমান। হাতদুটো বড্ড ছোট! ছ’ফুট চার ইঞ্চির দৈত্যটা বেশ ঝুঁকে এলো এবার। কিন্তু ওমাহ! তাতেও বুঝি হচ্ছে না তার। দাঁড়ানোর ভঙ্গি বেগতিক হওয়ায় তৎক্ষনাৎ কপাল গুছিয়ে তাকালো একবার আশপাশে। ওমনি খুঁজে পেলো একখানা ছোট টুল। তা পা দিয়ে টেনে এনে আচমকা রমণীকে একহাতে সামান্য তুলে টুলটার ওপর দাড়ঁ করালো রাশিয়ান দৈত্যটা। এরূপ কান্ডে অলক্ষ্যে মিটমিটিয়ে হাসছে মাহি। সাধে কী আর সে লোকটাকে রাশিয়ান দৈত্য বলে?
মুগ্ধের এবার স্বস্তি মিললো খানিক। সামান্য ঝুঁকে এসে রমণীকে বলল,
“ লেট’স স্টার্ট!”

বুঝলোনা মাহি। অবোধ্যের ন্যায় কপালের চামড়া গোটাতেই আচানক দু’হাতের ওপর পরশ পেলো প্রগাঢ়। কাঁধ হতে ধীরলয়ে নামছে দুটো খড়খড়ে রুক্ষ হাতের গোটাকতক আঙুল। প্রগাঢ় স্পর্শে ধীরে ধীরে কাপড়ের ওপর দিয়েই ছুঁয়ে দিচ্ছে রমণীর তুলতুলে হাতদুটোর মোলায়েম ত্বক। মুহুর্তেই কর্পূরের ন্যায় সকল জমাটবদ্ধ স্থিরতা হাওয়া উড়ে গেল মাহি’র। অস্থিরতায় কেঁপে উঠল তার বুক। ওদিকে যুবকের অধরকোণে বক্রহাসি স্পষ্ট! ধীরলয়ে রমণীর হাতের ওপর দিয়ে হাতদুটো গড়িয়ে এনে আচমকা মাহি’র আঙুলের ভাঁজে ঢুকিয়ে দিলো সবগুলো আঙুল। মুহুর্ত ব্যয়ে রমণীর হাতদুটো নিজের আয়ত্তে নিয়ে এসে কাউন্টার থেকে কাঠের কারুকার্যময় খুন্তিটা তুললো মুগ্ধ। মাহি’র হাত দিয়েই খুন্তিটা বাড়ালো প্যানের দিকে। ধোঁয়া ওঠা শূন্য ফ্রাই প্যানে খুন্তিটা প্রায় ছুঁই ছুঁই, ওমনি রমণীর উম্মুক্ত কাঁধের ত্বকে আচমকা অধর বসালো বেপরোয়া যুবক। মুহুর্তেই শীরঁদাড়া বেয়ে শীতল স্রোত নেমে এলো অষ্টাদশীর। লজ্জাবতী পাতার ন্যায় তড়িঘড়ি করে গুটিয়ে নিলো মুখ। মুগ্ধ থামলো না! সিক্ত অধরযুগলের অসংগত ছোঁয়ায় ভরিয়ে দিলো মেয়েটার নরম কাঁধের ত্বক। শক্তপোক্ত হাতের মুঠোয় অষ্টাদশীর হাতখানা চেপে রেখে আচমকা ছুঁইয়ে দিলো উদরের চামড়া। ফের কেঁপে ওঠে মাহি। অজানা ভয়ে ত্বরিত কুঁচকে নেয় নাক-মুখ। এতে থোড়াই কাজের কাজ হলো। মেয়েটাকে আরেকটু ভেঙে দিতে রূঢ় মানব এবার এগোলেন আরও দুপা। তৎক্ষনাৎ রমণীর কাঁধের কোমল ত্বকে ধীরলয়ে পরশ ছোঁয়ালো নিজ উষ্ণ জিহ্বার! মুহুর্তেই সর্বাঙ্গ ঝাঁকিয়ে কেঁপে ওঠে মাহি। তিরতির করে কম্পিত অধরের ফাঁক গলিয়ে অস্ফুটে আওড়াল,

“ থেমে যান, মুগ্ধ!”
এরূপ বাঁধে থামলো না মুগ্ধ! বরং সিক্ত জিভের কার্য চালালো অবাধ্য। রমণী এখন বড্ড ভঙ্গুর। পাদু’টোর শক্ত হাড়ে অসারতা নেমেছে তার। এক্ষুণি বুঝি ভেঙে বসিয়ে দিবে মাটিতে। রূঢ় মানব নিঃশব্দে টের পেলো তা। ত্বরিত দু’হাতে রমণীকে পেছন থেকে বড্ড নিবিড়ভাবে জড়িয়ে ধরে, নাকমুখ ঠেকালো মায়াবিনীর ঘাড়ের ত্বকে। মাহি’র চোখদুটো এখনো বন্ধ। নিশ্বাস ক্রমশঃ ভারী হচ্ছে তার। মুগ্ধ তখন হিসহিসিয়ে আওড়ায়,
“ ইউ আর লাইক আ বাটার বিউটি, অ্যান্ড আই’ম দ্য ফ্রাইং প্যান। যার উষ্ণতার সান্নিধ্যে এলে ক্ষনিকেই গলে যেতে বাধ্য তুই। বল এবার, আমাদের কম্বিনেশনটা জোসস না?”
না চাইতেই অধর প্রশস্ত হলো মাহি’র। একমুহূর্ত পরম স্বস্তিতে ঘাড় এলিয়ে রাখলো বলিষ্ঠের বক্ষভাঁজে। ক্ষীণস্বরে আচমকা শুধালো,
“ সম্মুখে মির্জা সায়ান মুগ্ধ হলে, আমি মানবী অগণিতবার স্বেচ্ছায় গলতে বাধ্য!”
অধরজোড়া ক্ষনিকেই প্রসারিত হলো মুগ্ধের। ধীরলয়ে মাহি’র ঘাড়ের ত্বকে আলতো করে বসালো দাঁত। মাহি ত্রস্ত মুখ কুঁচকায়, তবে মুখে টুঁ-শব্দটিও করলো না এবার। যেন স্বেচ্ছায় চাইছে লোকটার উন্মাদনা সহ্য করতে। খানিকবাদে হুট করেই তার কী হলো কে জানে! সে কেমন রসিকতার ভান ধরে আওড়াল,

“ শুনুন!”
দাঁত সরালো মুগ্ধ। ক্ষীণকন্ঠে বড্ড বাধ্যের ন্যায় প্রতুত্তর করল,
“ হুম!”
মাহি আবেশে মৃদু হাসলো। চোখদুটোর পর্দা সরিয়ে পরপর বলল,
“ আমি না, সাঁতার পারিনা! তবে সমুদ্রে নামার বড্ড শখ আমার।”
রমণীর ঘাড়ের ত্বকে নাক ঘষছে মুগ্ধ। হাতের বাঁধন বেশ জোরালো। কথার পিঠে প্রায় সঙ্গে সঙ্গে ভরাট কন্ঠে জবাব দিলো,
“ ইট’স ওকে! আমি আছি তো।”
মাহি হাসলো। চোকজোড়া খানিক নাড়াতেই আচমকা দৃষ্টি ঠেকল চুলোয় রান্না হতে খাবারের পানে। আচমকা মুখটা ভার হয়ে এলো তার। বড়ো মন খারাপের সুরে আওড়াল,

“ আমি রাঁধতেও পারিনা।”
কথাটা শেষ হবার প্রায় পরমুহূর্তেই মাহি’কে একটানে পেছনে ঘুরিয়ে আনে মুগ্ধ। এহেন অতর্কিত কান্ডে ভড়কায় রমণী। তড়িঘড়ি করে কম্পিত আঙুলে খামচে ধরে মুগ্ধের উম্মুক্ত বক্ষের চামড়া। হকচকানো দৃষ্টিতে চোখ তুলে তাকানোর পূর্বেই চিবুকে ঠেকলো বলিষ্ঠের রুক্ষ আঙুল। তার জোরে মুখটা সামান্য উঁচিয়ে সুদর্শন কেমন দৃঢ় কন্ঠে ফটাফট আওড়াল,
“ আমি বেঁচে থাকতে আমার রাণীর কষ্ট করে রাঁধতে হবে কেনো? আমি আছি না? তুই জাস্ট হুকুম করবি! রেঁধে মুখে তুলে দেবার দায়িত্ব আমার।”
মাহি’র গালভরে গেল হাসিতে। পরম স্বস্তিতে তক্ষুনি দু’পায়ের পাতায় ভর দিয়ে, আলগোছে দু’হাতে জড়িয়ে ধরল মুগ্ধের বলিষ্ঠ ঘাড়। মুগ্ধ মানবীর এহেন প্রচেষ্টা দেখে বড্ড ঝুঁকিয়েছে কাঁধ। মাহি এবার ভীষণ অধিকারবোধে ক্ষীণ কন্ঠে আওড়াল,
“ সো মা’ই আনওয়েলকাম কন্ট্র্যাক্ট হাজবেন্ড! লিসেন টু মি ভেরি কেয়ারফুলি! আমার কিন্তু হুটহাট লেট-নাইট হাঁটতে যেতে ইচ্ছে করে।”

গভীর হলো মুগ্ধের দৃষ্টি। বলিষ্ঠ হাতদুটো ঘোষণার পূর্বে আলগোছে আঁকড়ে ধরল রমণীর ধনুকের ন্যায় বাঁকানো কোমর। দৃঢ় কন্ঠে প্রতুত্তর করল,
“ ডোন্ট ওয়ারি মিসেস অধীর রায়! আমার রাত জাগার অভ্যেস আছে।”
অন্তর্মুখী আজ বড্ড উচ্ছ্বসিত। দৃষ্টিতে প্রগাঢ়তা নামিয়ে আচানক সন্দিগ্ধ গলায় শুধালো,
“ উমমম..আরেকটা কথা! আপনি যেন কার?”
এহেন কথার পরিপ্রেক্ষিতে তৎক্ষনাৎ মেয়েটাকে একহাতে পাঁজা কোলে তুলে নিলো মুগ্ধ। চোখে রাখলো চোখ। ভারিক্কি গলায় উত্তর ছুড়ঁল,
“ আমার চাশমিসের।”

প্রশান্তিতে অন্তর ছেয়ে গেল মাহি’র। খানিক হাসার মাঝে হুট করেই হাত রাখলো মুগ্ধের গালে। কপালের চামড়ায় একটুখানি ভাঁজ টেনে সন্দিষ্ট গলায় শুধালো,
“ এই যে আপনি আমায় যখন-তখন হুটহাট কাঁধে তুলে নেন, কোলে তুলে নেন! আচ্ছা, আপনার কী কষ্ট হয় না?”
বাঁকা হাসে মুগ্ধ। মুখটা রমণীর মুখের বড্ড নিকটে এগিয়ে এনে হালকা কামড় দেবার ভং ধরল সে। হাস্কি স্বরে প্রতুত্তরে বলল,

মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ৬৩

“ নিজ অস্তিত্ব এবং পৃথিবীর সমস্ত ভার এক কাঁধে বহন করার মতো শক্তি, সামর্থ্য এবং যোগ্যতা — সবটাই তুলনার চেয়ে বেশি রয়েছে মির্জা সায়ান মুগ্ধের। সো, ইউ ডোন্ট নিড টু ওয়ারি অ্যাবাউট দ্যাট বিউটি! ইন দ্যাট কেস, জাস্ট ফোকাস অন মি।”

মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ৬৫

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here