মিহি পর্ব ১৯+২০
রুপন্তী সরকার
রিদ কাজ করে যেই টাকা পাই তা দিয়ে কিছু টাকা সংসারের পেছনে খরচ করে আর কিছু টাকা সে প্রতি মাসে জমা করতো, এই কয়েকমাসে বেশ অনেক গুলো টাকা জমা হয়েছে তাই রিদ ভাবলো ওই টাকা গুলো দিয়ে ঘর সাজানোর কিছু জিনিস কিনবে! বউ পিচ্চি তাই রিদকেই দেখে শুনে কিনতে হবে বউ যদি বড় হতো তাহলে বউই সব দেখে শুনে কিনতো!
বিকেল বেলা রিদ মিহি কে নিয়ে মার্কেটে নিয়ে গেলো,
রিদ একটা চুড়ির দোকানে ঢুকলো! অনেকদিন আগে মিহি এই চুড়ির দোকানে এসে একজোড়া রূপার চুড়ি পচ্ছন্দ করেছিলো কিন্তু তখন রিদের কাছে টাকা ছিল না কিনে দেওয়ার মত, তবে সেদিন রিদ চুড়িটা খুব ভালো করে দেখে গিয়েছিলো এখন যেহেতু টাকা হয়েছে তাই ভাবলো এখনি সেই চুড়ি কিনে দেবে, রিদ দোকানদার কে জিজ্ঞেস করল
“রুপোর চুড়ি গুলো দেখান তো”
দোকানদার এক এক করে সব চুড়ি দেখাতে লাগলো
রিদ মিহি কে বললো
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
“কোনটা নেবে প্রিন্সেস?”
মিহির একটাও পছন্দ হলো না
মিহি বললো
“আমি সেদিনের টাই নিব”
কিন্তু বিপত্তি ঘটল! কারন সেদিনের সেই চুড়ি জোড়া ছিল না!
দোকানদার বলল
“ভাইয়া আপনি যে চুড়িটা চাচ্ছেন সেটা হয়তো সেল হয়ে গেছে! এখানকার মধ্যে একটা পছন্দ করুন”
মিহি বললো
“না আমি ওইতাই নিবো”
দোকানদার বলল
“আচ্ছা ভাইয়া আপনার কাছে কি চুড়িটার কোনো ছবি হবে? তাহলে সেই ডিজাইন অনুযায়ী আমরা আবার নিয়ে আনবো”
রিদ বললো
“ছবি তো নেই তবে আমি চুড়ির ছবি দিতে পারব সেইম ভাবে! কিন্তু চুরি আনতে কতদিন সময় লাগবে?”
“আচ্ছা ভাই আপনি আগে ছবি দিন আমরা আজকের মধ্যেই চেষ্টা করব আনার ”
রিদ মিহিকে একটা চেয়ারে বসিয়ে দিল এবং নিজে একটা চেয়ারে বসে পরলো,
দোকানদার রিদকে একটা পেন্সিল আর একটা খাতা দিলো,
রিদ খুব মনোযোগ সহকারে সেই রকম চুরির ডিজাইন আঁকিয়ে দিলো, রিদের হাতের কাজ এতোই নিখুঁত যে মনে হচ্ছিল যেনো রিয়েল চুড়ি!
দোকানদার অবাক হয়ে যায় রিদের আর্ট দেখে
উনি বললেন
“মাশাল্লাহ ভাই আপনি এত সুন্দর স্কেচ আঁকতে পারেন? আচ্ছা একটু অপেক্ষা করুন আমরা চুড়িটা আনাচ্ছি!
রিদ বললো
“আচ্ছা আপনি এনে রাখুন! আমি ততক্ষণে বাজার থেকে কিছু কেনাকাটা করি? আপনি আমার নাম্বারটা নিয়ে রাখুন!
এই বলেই রিদ মিহি কে নিয়ে চলে গেলো
মিহির জন্য কিছু জামা নিলো! অভ্রর জন্যও কিছু শার্ট টি-শার্ট নিল একটা পারফিউম নিলো,
রিদ ভাবল মিহির জন্য একটা শাড়ি নিবে,
রিদ মিহি কে নিয়ে একটা শাড়ির দোকানে গেলো,
সেখান থেকে একটা বাচ্চাদের শাড়ি পছন্দ করে মিহিকে কিনে দিল, শাড়ি পেয়ে মিহি অনেক খুশি,
মিহি একটা শাড়ি রিদকে দেখিয়ে বললো
” ওই শাড়িটা মিত্তি আপুর জন্য নেই পঁচালোক?”
রিদ মিহির কথায় অবাক হয়ে গেলো, কারণ রিদের মিষ্টির কথা ছিল না, ওইটুকু বাচ্চা যে মিষ্টির কথা খেয়াল করেছে এটাই অনেক!
রিদ মিহির কাছে বসে বললো
” আচ্ছা আমার ছোট্ট পাখিটা এতো ভালো কেনো?”
মিহি হিহি করে হেসে উঠলো! রিদ মিহির গালে একটা চুমু এঁকে দিলো
রিদ মিষ্টির জন্যও একটা শাড়ি নিলো,
এরপর শাড়ির দোকান থেকে বের হয়ে আসলো,
মার্কেটে হঠাৎ একটা ঘড়ির দোকানের রিদের চোখ পরলো,
রিদ মিহি কে নিয়ে ঘড়ির দোকানে ডুকলো, একটা ঘড়ি খুব পচ্ছন্দ হলো,
আরাফ রায়ান চৌধুরী এরকম টাইপের ঘড়ি পড়তে অনেক বেশি পছন্দ করে!
রিদ কোনো কথা না ভেবেই বাবার জন্য ঘড়িটা কিনে নিলো!
ঘড়িটা হাতে নিয়েই রিদের হার্টবিট ফার্স্ট হয়ে গেলো, বাবার জন্য কেনা ঘড়িটা বাবাকে দিবে কিভাবে? জীবনের প্রথম ইনকামের টাকা দিয়ে বাবাকে কিছু গিফট করবে, ভাবতেই হাত পা ঠান্ডা হয়ে আসছে, কিভাবে বাবাকে বুঝাবে যে রিদ উনাকে অনেক ভালোবাসে, এসব ভাবতে ভাবতেই মিহিকে নিয়ে চুড়ির দোকানে গেলো, চুড়ি নিয়ে ঘরের জন্য একটা ড্রেসিং টেবিল, পড়ার জন্য একটা চেয়ার টেবিল, কিছু থালাবাসন কিনলো, এরপর একটা ভ্যান ঠিক করলো, জিনিসপত্র ভ্যানে করে নিয়ে বাসায় চলে গেলো
অভ্রকে কল দিয়ে বাড়িতে ডেকে নিলো
অভ্র এসে অবাক হয়ে যাই,
“মামা এতো টাকা কই পাইছোস?”
রিদ পানি খেতে খেতে বললো
“চুরি করেছি”
অভ্র আর কিছু না বলেই টি শার্ট গুলো দেখতে লাগলো!
এইদিকে মিহি তো অনেক খুশি,
মিষ্টি ও অনেক খুশি হয় শাড়ি পেয়ে,
মিহির হঠাৎ মনে পড়লো পঁচা লোক কিছু কিনে নি! মিহি বারান্দা থেকে দৌড়ে আসে,
রিদের গালে দুইহাত দিয়ে বললো
” তোমার জন্য কি তিনেছো দেখি?”
রিদ মিহির দুইহাতে চুমু দিয়ে বললো
” এবার কিছু নেই নি নেক্সট টাইম নিবো প্রিন্সেস,”
মিহি বললো
“তুমি তেনো নাও নি তোমার জন্য? আচ্ছা দাড়াও”
এই বলেই ওর একটা জামা এনে রিদ কে দিয়ে বললো
” আমার অনেক গুলো জামা আছে এতা তোমাকে দিলাম”
রিদ মিহির কথাতে হাসবে নাকি কাঁদবে? অভ্র আর মিষ্টি তো হাসতে হাসতে শেষ
মিহি আর মিষ্টি মিলে বাড়িটা মাথায় করে রেখেছে, এতো এতো খুনসুটি ওদের মনে হচ্ছে বাড়িতে বিয়ে লেগেছে কারো! মিষ্টি এখন মিহি আর অভ্রর খুব ভালো বন্ধু তবে রিদ মিষ্টির সাথে প্রয়োজনের বাহিরে কোনো কথায় বলে না! অভ্র মিষ্টি কে সব বলে দিয়েছে যে মিহি রিদের বউ, মিষ্টি খুব অবাক হয় মিষ্টির তখন রিদের বলা ওই কথাটা মনে পড়ে! রিদ বলেছিলো ওর একটা পিঁপড়ের বাচ্চার মতো বউ আছে! তাহলে মিহি ই সেই বউ! অভ্র মিষ্টি কে বারণ করেছে কথাটা কাউকে বলতে!
রিদের মনে শান্তি নেই বাবার জন্য জীবনের প্রথম একটা উপহার কিনেছে সেটা বাবাকে না দেওয়া অব্দি শান্তি নেই,
রিদ অভ্রকে বললো
“অভ্র পাপার জন্য একটা উপহার কিনেছি বুঝলি? ভাবছি পাপা কে গিয়ে দিয়ে আসবো কিন্তু”
অভ্র জিজ্ঞেস করলো
“কিন্তু কি? চল গিয়ে দিয়ে আসি”
রিদ বললো
“আমি খুব নার্ভাস”
অভ্র হাসতে হাসতে বললো
“তুই একটা গাধা বাবাকে একটা জিনিস উপহার দিনি এতে নার্ভাস হওয়ার কি আছে?”
রিদ কিছু বললো না,
এখন বাজে রাত ৪:৩০! ওরা ঠিক করলো এখনি রায়ানকুঞ্জে যাবে, রিদ মিহি কে সুন্দর করে তৈরি করিয়ে দিলো,
মিষ্টি রিদের দিকে তাকিয়ে ছিলো, রিদ মিষ্টির উদ্দেশ্যে বললো
“আপনি যাবেন আমাদের সাথে?”
মিষ্টির যাওয়ার ইচ্ছে আছে কিন্তু ও একটা মেয়ে হয়ে দুটো ছেলের সাথে এই রাতের বেলা বেড় হবে বিষয় টা কেমন দেখায় মিষ্টির বাবা যেতে দিবে না হয়তো!
মিষ্টি কে চুপ থাকতে দেখে রিদ বললো
“আমি কি আঙ্কেলকে বলবো?”
মিষ্টি মাথা নাড়িয়ে হ্যাঁ বললো
রিদ চলে গেলো রামপ্রসাদ বাবুর ঘরের দিকে! রিদ গিয়ে দরজায় নক করলো! রামপ্রসাদ বাবু টিভি দেখছিলেন! রিদের গলার আওয়াজ পেয়ে উনি উঠে দাঁড়ালেন,
“বাবা ঘরে এসো! কোনো দরকার বাবা?”
রিদ একটু ইতস্ত বোধ করে বললো
“আমি বাসায় যাচ্ছি আসলে একটু দরকার আছে! একটু পর-ই চলে আসবো, আমরা কি মিষ্টিকে নিয়ে যাবো?”
রামপ্রসাদ বাবু কোনো কথা ছাড়াই রাজি হয়ে যায়, তিনি বললেন
“বাবা আমি তেমাকে চোখ বন্ধ করে বিশ্বাস করি নিয়ে যাও তবে তাড়াতাড়ি এসো ওর মা চিন্তা করবে”
রিদ সম্মতি পেয়ে চলে যায়!
ওরা রায়ানকুঞ্জের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়লো,
রায়ান কুঞ্জের সামনে দাঁড়াতেই মিষ্টি অবাক হয়ে গেলো, বিশাল বড়ো বাড়ি, এতো বড়ো বাড়ি থাকতে রিদ মিষ্টিদের ওই ছোট্ট বাড়িতে ভাড়া থাকে ভাবতেই মিষ্টি অবাক হচ্ছে, একটা ছেলে কতোটা নিঃস্বার্থ ভাবে ভালোবাসলে এমনটা করে,
রিদকে দেখে বাড়ির দারোয়ান গেট খুলে দিলো,
দারোয়ান রিদকে একটা সালাম দিলো, রিদ সালামের উওর দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করলো,
রিদ গিয়ে বাড়ির কলিং বেল প্রেস করতেই আরাফ রায়ান চৌধুরী গেট খুলে দিলেন,
উনি পুরাই অবাক হয়ে যাই রিদকে এই সময় দেখে
উনি সবাই কে বলে
“ভেতরে এসো সবাই”
মিহি গুটি গুটি পায়ে বাড়ির ভেতরে ঢুকে পড়লো, হেঁটে হেঁটে পুরো বাড়ি পর্যবেক্ষণ করতে থাকে, এইদিকে মিষ্টির চোখ ও কপালে, বাড়ির বাহিরে যতোটা সুন্দর বাড়ির ভেতরে তার থেকেও বেশি সুন্দর চোখ জুড়িয়ে যাচ্ছে যাচ্ছে এইখানে আসতে না পারলে হয়তো কখনো জানতেই পারতো না রিদের বাবা এতো বড়োলোক, তবে হ্যাঁ মিষ্টি রিদের চালচলন কথাবার্তা দেখেই বুঝতে পেড়েছিলো ও হয়তো ভালো ফ্যামিলি ছেলে!
ওরা সোফায় গিয়ে বসলো! আরাফ রায়ান চৌধুরী বললেন
“চা নাকি কফি?”
অভ্র বললো
“চা খাবো কফি ভালো লাগে না”
আারাফ রায়ান চৌধুরী ওদের বাড়ির হেলপিং হ্যান্ড চা বানাতে চলে গেলো
এইদিকে রিদ ঘড়ির বক্স বের করলো!
“পাপা এটা তোমার জন্য, এটা আমার রোজগারের টাকায় কেনা! আমার সামর্থ্য অনুযায়ী কিনেছি দেখো তো পছন্দ হয় কিনা?”
আরাফ রায়ান চৌধুরী অনেজ বেশি খুশি হয় উনি বক্স টা হাতে নেই,
“আমি অনেক খুশি বাবা অনেক খুশি আমার জীবনের সেরা উপহার এটা বিশ্বাস করো! তুমি শুধু আমার কাছে ফিরে আসো বাবা প্লিজ”
রিদ কিছু না বলেই হাসলো!
মিহি কে দেখে আরাফ রায়ান চৌধুরী অন্যমনস্ক হয়ে বলে ফেললো
“ওকে চেনো না জানো না! না জানি কোথা থেকে পেয়েছো! কই থেকে তুলে এনেছো তুমিই জানো! দেখো বাবা বোঝার চেষ্টা করো সোসাইটিতে আমাদের একটা সম্মান আছে। ওর জন্য তুমি আমার থেকে এতো দূরে বাবা! এই বিষয়গুলো আমাকে খুব কষ্ট দিচ্ছে!
হুট করে রিদের মাথাটা গরম হয়ে গেলো
রিদ দাঁড়িয়ে গিয়ে বললো
“সোসাইটি মাই ফুট! ও যদি অজাত ও হয় হোক তবুও আমার বউ, ওর এখন একটাই পরিচয় ও রিদ রায়ান চৌধুরীর বউ! আই রিপিট রিদ রায়ান চৌধুরীর বউ! ও আছে বলেই আপনার ছেলে আছে!ও রিদের পুরো পৃথিবী শুনেছেন আপনি?ও রিদের অস্তিত্ব! আমি ওকে নিয়েই থাকবো”
আরাফ রায়ান চৌধুরী ও উঠে দাড়িয়ে বলে
” রিদ বাবা শোনো রাগ করো না আমি সেটা মিন করি নি”
রিদ কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই মিহি কে নিয়ে বেরিয়ে গেলো, পেছন পেছন অভ্র আর মিষ্টিও গেলো!
আরাফ রায়ান চৌধুরীর চোখ ছলছল করছে
মিহি পর্ব ১৭+১৮
“আমি আবার আমার ছেলেকে হাড়িয়ে ফেললাম?”
বাহিরে এসে রিদ জোরে জোরে শ্বাস নিতে থাকে, মিহিকে খুব শক্ত করে জড়িয়ে ধরে! মিহির থুতনিতে নাক ঘষতে ঘষতে বললো
“প্রিন্সেস আমি তেমাকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ছাড়বো না!তুমি শুধু আমার হয়ে থেকো পুরো দুনিয়া আমি একাই সামলে নেবো”
