মেঘের আড়ালে রোদ পর্ব ৪২

মেঘের আড়ালে রোদ পর্ব ৪২
লেখিকা Sabihatul Sabha

একটা বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে ঠিকানাটা ভালো করে দেখে নিল মেঘলা।
ছোঁয়াঃ বাড়ি দেখে তো বেশ বড়লোক মনে হচ্ছে।
মহুয়াঃ হুম শুধু মনটা ছোট।
মেঘলা চলো যাওয়া যাক।

ছোঁয়া থেমে বলে উঠলো, ‘ বাই চান্স মহুয়া কে দেখে ও-ই লোক চিনি ফেললো তারপর কি হবে!.?’
মেঘলাঃ কিছু হবে না শুধু নিজের মুখ বন্ধ রাখ আর মহুয়া মাক্স পড়ে নাও।
মহুয়াঃ আগে ওই লোকের কথা মাথায় আসলে বোরকা পড়ে আসতাম যদি চিনে ফেলে।
ছোঁয়াঃ চিনে ফেললে আর কি কাজী ডেকে জোর করে বিয়ে করে নিবে এই শেষ বয়সে দুই পাশে দুই সুন্দরী বউ বাহ্ বাহ্ বুড়ার তো চাঁন কপাল।

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

ছোঁয়ার কথা শুনে মহুয়া রেগে তাকালো পর মুহূর্তে সবাই আবার এক সাথে হেঁসে উঠলো।
দারোয়ান প্রথম ওদের ঢুকতে দিতে চায়নি মিমের কাজিন বলে অনেক বুঝিয়ে শুনিয়ে ঢুকলো। বিশাল বড় বাড়ি, দুই পাশে কি সুন্দর ফুলের বাগান মাঝে বাড়িতে প্রবেশ করার রাস্তা।
ছোঁয়াঃ মহুয়া সুন্দরী তুই তো এই বাড়িতে রাণী হয়ে থাকতি রে কি সুন্দর।
মহুয়াঃ ছোঁয়া তোমাদের বাড়িটা এটার থেকেও বেশি সুন্দর।

ছোঁয়াঃ হুহ্ কচু এতো সুন্দর ফুল বাগান তো নেই। এক পাশে ফুল বাগান আর এখানে দুই পাশে।
মেঘলাঃ ঠিক আছে ছোঁয়া দেখি এই বাড়িতে আর একটা সুগার ডেডি পাই কিনা। পেলে তোকে আজকেই এই বাড়ির রাণী বানিয়ে দিয়ে যাব।
ছোঁয়াঃ ছিঃ ভাবি।

মেঘলাঃ হিহিহি তুমি তো বাড়ি দেখে আপসোস করতেছো।
ছোঁয়া মুখ ভেকে অন্য দিকে তাকিয়ে বললো,’ কিউট, হ্যান্ডসাম ছেলে থাকলে নিষেধ করতাম না।’
মেঘলাঃ তাহলে আমার দেবরের কি হবে শুনি.??
মহুয়াঃ দেবর,!.?

মেঘলাঃ ছাড় এখন সব কিছু নিজেদের কাজ শেষ করি আগে।
বাড়ির মেইন দরজা খুলা তিনজন একসাথে ড্রয়িং রুমে প্রবেশ করতেই একটা প্লেট এসে পড়লো মহুয়ার কপালে। ব্যাথায় আহ্ বলে কপাল চেপে ধরলো মহুয়া।
ছোঁয়া মেঘলা অবাক হয়ে সামনে তাকালো বাড়ির সব লোক ওদের দিকে তাকিয়ে আছে। কাজের লোকরা ভয়ে কাঁপছে।

মেঘলা এসে মহুয়ার কপাল দেখলো অনেকটা ফোলে গেছে রাগে সামনে তাকিয়ে কিছু বলার আগেই একজন মধ্য বয়স্ক লোক বলে উঠলো, ‘ মেয়েটাকে সোফায় বসিয়ে কপালে পানি দাও।’
মিম দৌড়ে ওদের সামনে এসে বললো,’ সোফায় বসুন আমি পানি নিয়ে আসছি। ‘
মহুয়া স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে রইলো মিমের দিকে মুখ থেকে সব কথা যেন হারিয়ে ফেলেছে।
মিমের শরীরে দামী শাড়ি,গহনা। মুখে কালচে অসংখ্য দাগ, ঠোঁটের নিচে রক্ত জমাট বেঁধে আছে।
দামী শাড়ি,গহনা কি সুখ আনতে পারে.? টাকা পয়সা কি মনের শান্তি আনতে পারে.? এই বিশাল বড় বাড়ি কি জীবনে আনন্দ দিতে পারে..?

মিম দৌড়ে পানি এনে দিতে চাইলে মহুয়া থামিয়ে বললো,’ আমি ঠিক আছি।’
কন্ঠ শুনে মিমের হাত থেকে গ্লাস নিচে পড়ে গেল। এতোক্ষন কষ্টে আঁটকে রাখা জল গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়লো।
” এটা কি করলেন আপনি!!.?? অন্যের জিনিস ভাঙতে তো গায়ে লাগবে না। জানেন এই গ্লাসের দাম কতো.? আপনার মতো দশটা মেয়েকে বিক্রি করলেও একটা গ্লাসের দাম আসবে না। ”
মেঘলা টেবিলে বসে ফুঁসতে ফুঁসতে রেগে কথাগুলো বলা ছেলেটার দিকে তাকালো।
ছোঁয়াঃ এইগুলো কেমন আচরণ!.?

মেঘলা চুপ করে পরিস্থিতি বুঝতে চাইলো। আসলে এতোক্ষন এখানে হচ্ছিল কি.? কে প্লেট ছুড়ে মারলো।?
~ মাহিন তুমি দিন দিন বেয়াদব হয়ে যাচ্ছ বাহিরের মানুষের সামনে এইগুলো কেমন আচরণ!.?
~ প্লিজ আপনি চুপ থাকুন আর আপনার বউকে বলে দিবেন আমার সামনে যেন কখনো না আসে।
~ মাহিন দাদুভাই খাবার শেষ করে রুমে যাও।
~ এই মহিলার হাতের রান্না আমি খাব ভাবলেন কিভাবে দাদু। উনি হাজার চেষ্টা করলেও আমার মায়ের জায়গা নিতে পারবে না।

মধ্য বয়স্ক লোকটা বলে উঠলো, ‘ আপনারা কে.??’
মেঘলাঃ আমরা মিমের কাজিন।
লোকটা হঠাৎ রেগে গেল, ‘ এদের ভেতরে আশার জায়গা কে দিয়েছে.? দারোয়ান কোথায়.?
ছোঁয়াঃ আস্তে দাদাভাই আমরা শুধু একটু দেখা করেই চলে যাব।
মিম ভয়ে লোকটার দিকে তাকিয়ে বলে উঠলো,’ আ..আমি কি..ছু জা জানিনা বিশ্বাস করু…ন।’
মহুয়াঃ মিম কিছু জানেনা আমরা ওর সাথে যোগাযোগ না করেই এসেছি। কেন আমার বোনকে আমি দেখতে আসতে পারি না.?

~ তুমি কে.?
~ আমি মিমের বোন।
~ পালিয়ে যাওয়া মেয়েটা।
মহুয়া চুপ করে রইলো।
মাহিনঃ যতসব ছোটলোকের কাজ কারবার।
মহুয়া দাঁড়িয়ে মিমের হাত ধরে বলে উঠলো, ‘ আজ এই মুহূর্তে আমি নিজের সাথে মিম কে নিয়ে যাচ্ছি পারলে কেউ আটকিয়ে দেখাক।’

লোকটা রেগে মহুয়ার হাত থেকে মিমের হাত ছাড়ানোর জন্য হাত বাড়াতেই মেঘলা লোকটার হাত শক্ত করে ধরে ফেললো।
মাহিন বসে বসে তাদের ড্রামা দেখছে।
উপর থেকে একটা মেয়ে চিৎকার চেচামেচি করে নামছে আর মিমের নাম নিয়ে গালি দিচ্ছে।

~ আব্বু আপনি এখানে আর আমি আমার ড্রেসটা খুঁজে পাচ্ছি না আপনার বউ কোথায় রেখেছে.?
~ ঠিক ভাবে কথা বলো তোমার আম্মু হয়।
লোকটা দারোয়ানকে কল দিয়ে বললো জলদি এদের বের করে দিতে।
মেঘলা ব্যাগ থেকে নিজের আইডি কার্ড বের করে দেখালো।
সাথে সাথে লোকটা চুপ হয়ে গেল।

মেঘলাঃ আমি একজন সিআইডি অফিসার বেশি বাড়াবাড়ি করলে….
লোকটার মেয়ে রেগে বলে উঠলো, ‘ এখানে হচ্ছেটা কি.?’
ছোঁয়া মেয়েটার দিকে তাকিয়ে বললো,’ আপনার ড্রেসআপ নিয়ে আলোচনা চলছে।’
মহুয়া মিমের হাত ধরে বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় মাহিন ছেলেটা পেছন থেকে ডাক দিলো।
~ মাক্সটা খুলুন।

মহুয়া ভ্রু কুঁচকে তাকাতেই ছেলেটা নিজের পকেট থেকে মানিব্যাগ বের করে এটার ভেতর থেকে একটা ছবি বের করে মহুয়ার সামনে রেখে বললো,’ এটা আপনি.? ‘
মহুয়া অবাক হয়ে বললো,’ আপনার মানিব্যাগে এই ছবি!.?’
মাহিনঃ আপনার.?
মহুয়া রেগে ছবিটা হাতে নিয়ে ছিড়ে ফেললো।
মাহিন হেঁসে বলে উঠলো, ‘ আরও আছে। মাক্স খুলতে বলে ছিলাম না হয় এখান থেকে এই মহিলা যাবে আপনি বের হতে পারবেন না।

মহুয়াঃ দেখা যাক কে বের হয় আর কে না হয়।
ছোঁয়া, মেঘলা বের হয়ে এসে বললো,’ চলো।’
মাহিনঃ আপনারা সবাই বের হন শুধু এই মেয়ে থাকবে।
মেঘলা ছেলেটার দিকে ভালো করে তাকালো বয়স কতো হবে.? ২৫! মিমের থেকেও বড় আর এ-ই ছেলের মা নাকি ১৭ বছরের একটা বাচ্আা মেয়ে!। টাকা থাকলে সবই সম্ভব।
ছোয়াঃ কি আজব আরেক ঝামেলা।

মহুয়ার রাগে ইচ্ছে করলো ছেলেটার চোখের সাথে সাথে হাত পা ভেঙে দিতে।
ছেলেটা হেঁসে বলে উঠলো , ‘ আচ্ছা এই মহিলাকে নিয়ে যাচ্ছেন আর কখনো যেন এই বাড়িতে না দেখি। আর আপনার সাথে খুব জলদি দেখা হবে।’
ছোঁয়া গেইট থেকে বের হয়ে বলে উঠলো, ‘ বাপ বেটা সব গাঞ্জাখোর। তাকানোর, কথা বলার স্টাইল দেখলেই ঘা জ্বলে উঠে।

মিম কে দেখেই ওর আম্মু জড়িয়ে ধরলেন বুকের সাথে। মিমও মাকে দেখেই কান্না শুরু করলো। জেনো কতো বছর পর মা মেয়ের মুখ দেখছে।
মেঘলা বললো খুব জলদি সব ঝামেলা শেষ হয়ে যাবে। মিমের ডিভোর্স করিয়ে কলেজে ভর্তি করিয়ে দিবে।
মিমঃ এতো জলদি উনি ছাড়বে না এতো সহজে নয়।

মেঘলাঃ এই বিষয় তোমার ভাবতে হবে না। তোমার পুরো জীবন সামনে পড়ে আছে উঠে নিজের পায়ে দাড়াও আমি সব ঠিক করে দিব। নিজে শক্ত হও।
এই রাতটা থেকে পরের দিন সকালে নিজেদের শহরে চলে গেল ছোঁয়া, মেঘলা।
মিম আগের সব অন্যায়ের জন্য ক্ষমা চাইলো মহুয়ার কাছে।

দিন গিয়ে রাত নামছে, রাত গিয়ে দিন দেখতে দেখতে ১৫দিন চলে গেল।
সকাল থেকেই বাড়ি সাজগোছ শুরু হলো।
মহুয়া বেশ কয়েকবার মামিকে জিজ্ঞেস করলো বাড়িতে কি কোনো অনুষ্ঠান আছে.??
মামি শুধু কথা এড়িয়ে যাচ্ছে।

বাড়িটা খুব সুন্দর করে সাজানো শেষ। পুরো বিয়ে বাড়ির মতো করে বাড়ি সাজানো হলো।
মহুয়া মোবাইলের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘ শ্বাস ফেললো একদিনও আহনাফ কল বা মেসেজ দেয়নি। এই ১৫দিন পনেরো বছরের মতো ছিল।
মিম এসে মহুয়ার পাশে বসে বলে উঠলো, ‘ আপু হাতটা দাও।’
মহুয়া হাতের বইটা রেখে মিমের দিকে তাকালো।
মিমঃ দাও না।

মহুয়াঃ আমাকে না জানিয়ে কি হচ্ছে বাড়িতে মিম!.?
মিমঃ তেমন কিছু না আগামীকাল ভাই ভাবি আসবে। ভাবি বললো বাড়িটা বিয়ে বাড়ির মতো সাজাতে। এখন দাও তোমার হাতে মেহেদী দিয়ে দেই।
মহুয়া নিষেধ করতে চাইলো কিন্তু মিমের মুখের দিকে তাকিয়ে নিষেধ করলো না। চঞ্চল মেয়েটা কেমন গম্ভীর হয়ে গেছে এই প্রথম কাছে এসে আবদার করেছে কিভাবে নিষেধ করবে!?
মহুয়া হাত বাড়িয়ে দিল খুব সুন্দর করে মিম দুই হাত ভর্তি মেহেদী দিয়ে দিল।
মিমঃ তোমাকে ভীষণ সুন্দর লাগছে আপু।
বিনিময় মহুয়া মুচকি হাসলো।

মেঘলা রাত বারো টায় বাড়িতে আসলো৷ বাড়ির দিকে তাকিয়ে অনেক অবাক হলো। আজ সকালে বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় আব্বুকে দেখেছে কিছু লোক এসেছে এতোটাও গুরুত্ব দেয়নি। এখন বাড়ি এভাবে এতো সুন্দর করে সাজানো কেন.? মেঘলা গেইট দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করে আশপাশে চোখ বুলিয়ে বাড়িতে আসলো।

মেঘের আড়ালে রোদ পর্ব ৪১

বাসায় এসে কাউকে কিছু জিজ্ঞেস না করে নিজের রুমে গেল। রুমে গিয়ে আরও অবাক হলো বিছানায় গোলাপ ছড়িয়ে আছে মেঘলা বিছানার পাশে গিয়ে ফুলগুলো হাতে নিল। ফুলের নিচে খুব সুন্দর একটা চিরকুট। চিরকুট খুলেই দেখলো লেখা ” অপেক্ষা ”

মেঘের আড়ালে রোদ পর্ব ৪৩