মেঘের ওপারে আলো দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৪৩
Tahmina Akhter
চিরচেনা পথে গাড়িটা যখন আপন গতিতে চলছে ঠিক ততটাই তীব্র গতিতে আলোর হৃদস্পন্দনের গতি বেড়ে চলছে। গাড়ি যখন ওয়্যারলেস মোড় হয়ে দক্ষিণ খুলশিতে প্রবেশ করলো তখন সিতারা বেগম আলোর মুখের দিকে তাকালো। আলোর চোখে পানি চিকচিক করছে। চোখের পলক ফেলা মাত্র টুপ করে জল গড়িয়ে পরবে আলোর কোলে। সিতারা বেগম হাত বাড়িয়ে আলোকে একপাশে জড়িয়ে ধরলেন। আলো মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে বলল,
— যেমন করে আমার সংসার, আমার মানুষটাকে রেখে গিয়েছিলাম তেমন ফিরে পাওয়ার কোনো আশা নেই আম্মা। তবুও অবাধ্য হৃদয়টা মানতে চাইছে না। আমি মেনে নিতে পারব না ডাক্তার সাহেবের পাশে কেউ আছে! আমার হাতে সাজানো সংসারটায় কারো হাত লাগুক আমি মেনে নিতে পারছি না। কিন্তু… এমন চাওয়া তো সম্ভব নয় আম্মা! এতগুলো বছরে সবকিছু বদলে গেছে। পথ বদলেছে, শহরে আধুনিকতার ছোঁয়া লেগেছে। বিল্ডিংগুলো উচ্চ হয়েছে অনেক। তাহলে তো আমার ডাক্তার সাহেবের বদলে যাওয়ার কথা? তাই না আম্মা?
কথাগুলো বলতে বলতে আলো সিতারা বেগমের কাঁধে মুখ গুজে কাঁদছে। সিতারা আলোর মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন। মেয়ের সবগুলো কথা খাটি সত্য। সব বদলে যাওয়ার কথা। কিন্তু সব বদলের কারণ মেনে নেয়া যায় না। বিশেষ করে ভালোবাসার মানুষের বদলে যাওয়ার কারণ তো অবশ্যই নয়।
— আপা আর কতদূর?
ড্রাইভার সাহেবের কথা শুনে আলো চোখের জল মুছে স্বাভাবিক কন্ঠে বলল,
— সামনের গলিতে। “জামান হাউজ” এর সামনে।
ব্যাগ থেকে টিস্যু বের করে চোখের কোলে ঘেটে যাওয়া সুরমা মুছে ফেলল। তারপর, শাড়ির আঁচল তুলে মনে মনে বারবার সৃষ্টিকর্তাকে স্মরণ করছে। সৃষ্টিকর্তার কাছে একটাই আর্জি ; সে যা নিয়ে ভাবছে তা যেন কখনোই সত্য না হয়।
“জামান হাউজ” এর সামনে এসে গাড়িটা ধীর গতিতে চলতে চলতে থেমে গেছে। গেটের সামনে দাঁড়ানো দারোয়ান দৌঁড়ে এলো। আলো দারোয়ানকে উদ্দেশ্য করে সালাম দিয়ে বলল,
— সালাম ভাই, ভালো আছেন?
দারোয়ান বেশ কিছুক্ষণ তাকিয়ে ছিল আলোর মুখের দিকে। কারণ এই মানুষটা চেনা চেনা লাগছে। পরক্ষণেই যখন মানুষটার পরিচয় বুঝতে পারল ঠিক তখন সালাম ভাই উৎসাহিত কন্ঠে বলল,
— ভাবি! আপনি এতবছর পর! কেমন আছেন? দাঁড়ান। দাঁড়ান। আমি গেইট খুলে দিয়ে আসি।
সালাম ভাই ছুটে গিয়ে বিশাল গেইট খুলে দিলো। ড্রাইভার গাড়ি নিয়ে ভেতরে প্রবেশ করলো।
গাড়ি থেমে যাওয়ার পর আলো এবং সিতারা বেগম নেমে এলো। সালাম ভাই ব্যাগ নামিয়ে বাড়ির ভেতরে নিয়ে যাওয়ার জন্য তাড়াহুড়ো করছে। আলো সালাম ভাইকে ডেকে বারণ করলো। কিন্তু সালাম ভাই শুনলে তো? সে ব্যাগ নিয়ে বাড়ির ভেতরে ছুটে গেল। আলো গাড়ির ভাড়া মিটিয়ে সিতারা বেগমের দিকে ফিরে বলল,
— আম্মা, চলো ফিরে যাই।
সিতারা বেগম চোখ রাঙিয়ে তাকালেন। আলো মিনমিন করে বলল,
— আম্মা আমার মনে হচ্ছে কিছুই ঠিক নেই। সেদিন আমি নিজেই রাগ করে বেরিয়ে গিয়েছিলাম। এতগুলো বছর পর ফিরে এসে ভুল করেছি। চলো ফিরে যাই।
— তুই একটা পুরা পাগল! তুই না আত্মসম্মানবোধ সম্পন্ন মেয়েলোক? ফিরে যেহেতু যাবি তাহলে এলি কেন? তোর যা মন চায় তুই কর। তোর বাপ মরে গিয়ে বেঁচে গেছে। আমাকে রেখে গেছে তোর আহ্লাদ সহ্য করার জন্য। আমার তো এখন নিজের ওপর রাগ লাগছে। আটবছর আগে সেদিন কেন তোর গালে দুটো ঠাটিয়ে থাপ্পড় মারলাম না? সেদিন তোকে সঙ্গে করে নিয়ে আসা আমার ভুল হয়েছিল।
সিতারা বেগম রাগ গজগজ করতে করতে সামনের দিকে তাকাতেই দেখতে পেলো আলোর মেজ জা’ ইতিকে। ইতি তাড়াহুড়ো করে আলোর সামনে এসে দাঁড়ালো। আলো হতভম্ব হয়ে যায়। মানুষটা আগের থেকে সুন্দর হয়েছে। বয়স সামান্য বেড়েছে হয়তো তবুও সৌন্দর্যে কমতি নেই। ইতি আলোকে জড়িয়ে ধরে বলল,
— এতগুলো বছর পর! এতদিনে মনে পরল এই বাড়িটাতে তোমার কেউ আছে?
আলো ইতিকে আলতো করে জড়িয়ে ধরে বলল,
— তোমাদের আমার হৃদয়ে ধারণ করেছি ভাবি। ভুলি কি করে! মান-অভিমানের খেলায় ভালোবাসা চাপা পরে গেছে।
— ভালোবাসা চাপা পরে যাওয়া জিনিস? ভালোবাসা হচ্ছে মূলবান সম্পদ৷ দুনিয়ায় অনেক অনেক দামী বস্তু আছে। সে-সব বস্তুর নিরাপত্তার ব্যবস্থা আছে অনেক। কিন্তু সে-সব দামী বস্তু চুরি হয়ে গেলে আবারও কিনে নেয়া যায়। কিন্তু, ভালোবাসা ক্ষয় হয়ে যাওয়ার আগে, বিলীন হবার আগে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা ভালোবাসাকে দিতে হয়। কারণ ভালোবাসা ফিরে পাওয়া অসম্ভব। ভালোবাসার ধরণ এবং ভালোবাসার মানুষটার কোনো ফটোকপি নেই। তাই অরিজিনাল কপি সবসময় হৃদয়ে ধারণ করতে হয়। সর্বোচ্চ নিরাপত্তা দিতে হয়।
— আমার জীবনের সবকিছু ভুলে ভরা। আমার জীবনের সঠিক এবং ভুলকে দাঁড়ি পাল্লায় মেপে দেখলে দেখবেন ভুলের ওজন বেশী।
কথাটি বলে আলো চোখের জল মুছে ফেলল। ইতি আলোর মাথায় হাত রেখে বলল,
— ভেতরে এসো। কতক্ষণ বাইরে থাকবে?
— আমি বাড়ির ভেতরে যাব না, ভাবি।
ইতি ভ্রু কুঁচকে তাকালো। সিতারা বেগম ফের কপালে হাত রেখে দাঁড়িয়ে রইলেন। মেয়েটার বোধবুদ্ধি কবে যে হবে? আলো দোতলায় দক্ষিণের বারান্দার দিকে তাকিয়ে বলল,
— ডাক্তার সাহেব কোথায় আছে, ভাবি?
সকাল থেকে তোড়জোড় চলছে। শিশিরের বিয়ে। শিশির হচ্ছে মেঘালয়ের ফুপাতো ভাই। পেশায় একজন সফটওয়্যার ইন্জিনিয়ার৷ শিশিরের যার সঙ্গে বিয়ে হবার কথা সেই মেয়েটা ভার্সিটির স্টুডেন্ট। বাবা-মায়ের খুব ছোটবেলায় বাংলাদেশ ছেড়ে চলে এসেছে পোল্যান্ডে। মেঘালয় আজ সারারাত ঘুমাতে পারেনি। কারণ, “মিসেস মেঘালয়” শব্দ দুটো তার মস্তিষ্কে সারারাত ঘুরপাক খেয়েছে। বেলীফুলের কথা শুনে প্রথমে বিশ্বাস করতে পারেনি। কিন্তু, কল লিস্ট….
মার্চের সকাল পোল্যান্ডের ক্রাকোভ শহরে এক মোহজাল নিয়ে হাজির হয়। শীত পুরোপুরি বিদায় নেয়নি, তবু বাতাসে বসন্তের হালকা উষ্ণতা টের পাওয়া যাচ্ছে। আকাশ ধূসর-নীলের মিশ্রণে ঢাকা। সূর্য যেন কুয়াশার পর্দা সরিয়ে ধীরে ধীরে উঁকি দিচ্ছে। রাস্তাগুলো ভেজা, রাতের শিশির এখনো জানালার কাচে লেগে আছে। পাতাহীন গাছের ডালে ডালে নতুন কুঁড়ি ফুলে উঠছে। ঋতু পরিবর্তনের প্রভাব চোখে পরছে।
বিছানা থেকে নেমে পোল্যান্ড এর ক্রাকোভ শহরের চমৎকার একটি বিশাল বাড়ির ছোট একটা রুমের জানালার সামনে এসে দাঁড়ালো মেঘাল। ভেতরের উষ্ণতা আর বাইরের ঠান্ডা হাওয়ার সংঘাতে তার শরীর হালকা কেঁপে উঠল। জানালার ওপারে দেখা যায় পুরোনো ইউরোপীয় স্থাপত্য, দূরে কোনো চার্চের চূড়া, আর নিরিবিলি সকালের শহর। মাঝে মাঝে দূর থেকে ভেসে আসছে গাড়ির শব্দ৷ মোবাইল হাতে নিয়ে স্ক্রীণের ওপর নজর রাখল। “মিথ্যাবতী” তাকে কল করেছে এখনও ঠিকঠাক ভাবে বিশ্বাস হচ্ছে না।
এমন সময় দরজা খুলে ঘরের ভেতরে কেউ প্রবেশ করেছে। মেঘালয় পেছনে ফিরে তাকাতেই দেখতে পেলো শিশিরকে। শিশির মেঘালয়কে দেখে মুখ গম্ভীর করে বলল,
— তোমাদের রিয়াকশন দেখে মনে হচ্ছে এই বাড়িতে আজ আমার বিয়ে হচ্ছে না। আমার চল্লিশা হবে। ও কাম অন গাইজ। লেটস ডু সামথিং স্পেশাল। আমার বিয়েতে কোনো স্পেশাল কিছুই নেই। অথচ কাজিনদের সবার বিয়েতে আমি হৈ-হুল্লোড় করেছি। আমার বেলায় সবার আনন্দ ফুরিয়ে গেছে!
— এতই আনন্দ করার শখ যেহেতু ছিল তাহলে বাংলাদেশে গিয়ে বিয়ে করতি?
— আমি তো মা’কে কতবার বললাম চলো বাংলাদেশে যাই। কিন্তু মা রাজি হলো না। ভাগ্যিস তুমি এবং মাশফি ভাই এলে আমার বিয়েতে। নয়তো, আমার নিরামিষ বিয়ে আরও পানসে লাগত!
শিশিরের কথা শুনে মেঘালয় দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
— আমার আজ রাতের ফ্লাইটে ইউকে ফিরতে হবে। ছুটি নেই।
— আর দুটো দিন থাকলে ভীষণ খুশি হতাম।
মেঘালয় শিশিরের কাঁধে হাত রেখে বলল,
— সময় নেই রে। নয়তো আমি সত্যি সত্যি থেকে যেতাম দুটো দিন। তোদের ছাড়া একা আমিটার কে আছে?
শিশির ভীষণ অবাক হয়ে যায়। জীবনে প্রথমবারের মতো মেঘালয় ভাইয়ের কাছ থেকে এমন কথা শোনা হলো। কারণ তাদের এই ভাইটা ভীষণ চাপা স্বভাবের। শিশিরের যে কি হলো মেঘালয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে সাহস করে বলেই ফেলল,
— আলো ভাবিকে এখনও ভুলতে পারছো না তুমি?
মেঘালয় মলিন হেসে ফেলল। শিশিরের কাঁধে থাপ্পড় দিয়ে বলল,
— আলো কি ভুলে যাওয়ার বস্তু? আলো আমার প্রথম অনুভূতি। আমার প্রথম ভালোবাসা।
শিশির অবাক হয়ে গেছে। সে ভেবেছিল মেঘালয় কালের পরিক্রমায় আলো ভাবিকে ভুলে গেছে। কিন্তু…
এমন সময় দরজা খুলে বর্ষা রুমের ভেতরে এসে বলল,
— মেঘালয়? তোমার ডাটা কানেকশন অফ কেন? ইতি ভাবি কল করেছিল আমার কাছে। তোমাকে বলেছে আর্জেন্ট ইতি ভাবির সঙ্গে যোগাযোগ করতে।
কথাগুলো বলতে বলতে বর্ষা মেঘালয়ের এলোমেলো বিছানা গুছিয়ে রাখছে।
মেঘালয় শিশিরকে সঙ্গে নিয়ে ঘর থেকে বের হয়ে গেল। শিশিরকে তারা বাবা ডাকছে বলে শিশির মেঘালয়ের সঙ্গে গেলো না। মেঘালয় একা একাই বাগানে চলে গেল। মোবাইল ফোন বের করে সময় দেখে নিলো। মার্চের মাঝামাঝি সময় চলছে এখন। তাই বাংলাদেশে এখন সময় দুপুর একটা। এমন সময় তো কখনোই ইতি ভাবি কল করে না। আজ কি এমন জরুরি প্রয়োজনে কল করেছে। মেঘালয় ডাটা অন করে কল করলো ইতির মেসেঞ্জারে৷
ইতি সবেমাত্র নিজের ঘরে গিয়ে বিছানায় গা এলিয়ে দিয়েছে ঠিক তখনি তার মোবাইলে কল এলো। ইতি মোবাইল হাতে নিয়ে দেখল মেঘালয় কল করেছে। ইতি কল রিসিভ করে বলল,
— কেমন আছো?
— গুড।
— জিজ্ঞেস করবে না আমরা কেমন আছি?
— আমি জানি আপনারা ভালো আছেন। রোজ রোজ এখানে সেখানে যাচ্ছেন। সুখীভাব বিরাজ করছে আপনাদের প্রতেক্যটা স্টোরি শেয়ারে।
— আমাদের দেশে ফিরিয়ে এনে নিজে গিয়ে বিদেশ পরে আছো। ব্যাপারটা কি মানা যায়?
— মেনে নিন ভাবি। বাংলাদেশে আমার মন বসে না। যেখানে মন বসে না সেখানে আমার দমবন্ধ হয়ে আসে।
মেঘালয়ের কথা শুনে ইতি দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল,
— মেঘালয়?
— জি, ভাবি?
— তোমার আলো আজ বাড়িতে এসেছিল। তোমার খোঁজ জানতে চেয়েছে আমার কাছে।
মেঘালয় চুপ হয়ে গেছে। মোবাইলের ওপরপ্রান্তে থাকা ইতি মেঘালয়ের নীরবতার মানে খুঁজে পেলো কিনা? ইতি মন খারাপের সুরে আবারও বলতে শুরু করলো,
— আলোকে ফিরিয়ে দিয়েছি আমি। ঠিক করেছি না? এতগুলো বছর পর ফিরে এসে তোমার খোঁজ চাইবে বলে যে ওকে তোমার খোঁজ দিতে হবে এটা কোন ডিকশনারিতে আছে?
মেঘালয় ইতির সম্পূর্ণ কথা শোনার আগে কল কেটে দিয়েছে।
কল কাটার শব্দ শুনে ইতি বিস্মিত হয়ে মোবাইলের স্ক্রীণের দিকে তাকিয়ে রইল বেশ কিছুক্ষণ।
ওদিকে মেঘালয় পাগলের মতো পুরো বাগানে পায়চারি করছে। তারপর, হঠাৎ করে আকাশের দিকে তাকিয়ে আনমনা হয়ে বলল,
মেঘের ওপারে আলো দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৪২
— কেন ফিরে এলে তুমি? আমার জীবনে অজানা ঝড় হয়ে একবার এসে লন্ডভন্ড করে দিয়ে চলে গেলে। সেদিন পর থেকে তোমাকে একটু একটু করে ভুলে এই আমিটাকে কোনোমতে বাঁচিয়ে রেখেছি পৃথিবীর বুকে। এবার ফিরে এসেছো কি আমার প্রাণ কেড়ে নেয়ার জন্য?
