মেজর কারদার পর্ব ১৭
ফিনারা ঝুমুর
দুপুর গড়িয়ে সময়ের কাঁটা তখন দুটো বেজে পঁয়তাল্লিশ। মেঘলা গুমোট আকাশের নিচে জিপের জানালার কাচে কপাল ঠেকিয়ে থম মেরে বসে আছে মেঘ। ওর পাশেই ড্রাইভিং সিটে বসে অত্যন্ত শক্ত হাতে স্টিয়ারিং ঘোরাচ্ছে শীর্ষ। দুজনের মুখই যেন শ্রাবণের আকাশের মতো থমথমে, থৈথৈ করছে এক অদ্ভুত নীরবতা।
“এই জোরপূর্বক আকস্মিক বিয়ের কি আদেও কোনো ভিত্তি রয়েছে, মেজর সাহেব? অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে আপনার মতো একজন মেজরের সাথে সমাজের চোখে এক কলঙ্কিনী মেয়ে জুড়ে গেল!”
মেঘের এই তিক্ত ও অবমাননাকর কথার বিপরীতে শীর্ষ একদম নিশ্চুপ। সে সামনের পিচঢালা রাস্তার দিকে তাকিয়ে ঠান্ডা মাথায় ড্রাইভ করে চলেছে, কোনো কথাই বলছে না। মেঘ এবার ঘাড় ঘুরিয়ে পূর্ণদৃষ্টি দেয় শীর্ষর পানে। মেজরের পরনে এখনও গত রাতের সেই খাকি আর্মি ড্রেসই রয়েছে, শার্টের হাতা দুটো কনুই পর্যন্ত গুটানো। তার বিপরীতে মেঘের নিজের গায়ের দিকে তাকাতেই ওর বুকটা ধড়াস করে ওঠে। ওর গায়ে এখন আর সেই ছেঁড়া কুর্তি বা মেজরের শার্ট নেই, বরং পরনে রয়েছে রামু উপজেলার চাকমা মেয়েদের হাতে বোনা আদিবাসী তাঁতের এক লাল-নীল শাড়ি আর গলায়-হাতে রূপোর হালকা কিছু অলঙ্কার।
এসবের একটাই কারণ এই নতুন সাজসজ্জার একমাত্র মালিক আজ থেকে মেজর শীর্ষ কারদার। এইতো কিছু সময় পূর্বেই ইসলামিক ভাবে ‘বিবাহ’ নামক এক অলিখিত ও পবিত্র সম্পর্কে আবদ্ধ হয়েছে ওরা দুজন। যাকে বলা হয় সম্মান খুইয়ে কট ম্যারেজ। নেই কোনো ধুমধাম, নেই কোনো পারিবারিক সাক্ষী, আর নেই কোনো পরিজন। মেঘের দিকে সমাজ থেকে ধেয়ে আসা চারিত্রিক কলঙ্ককে আজীবনের জন্য মুছে ফেলার জন্যই যেন বাধ্য হয়ে ওকে তড়িঘড়ি করে বিয়ে করেছে শীর্ষ অন্তত মেঘের সরল মন এটাই বিশ্বাস করছে। তবে ওদের বর্তমান শেষ গন্তব্য কোথায়, তা মেঘ এখনও আন্দাজ করতে পারছে না।
“তোমার কাছে এই বিয়ের মানে ঠিক কী, মেঘালয়া?”
শীর্ষর আকস্মিক ও ধারালো প্রশ্ন শুনে মনে মনে বেশ ভড়কায় মেঘ। শীর্ষর কণ্ঠস্বর এই মুহূর্তে ভীষণ গুরুগম্ভীর। সেখানে গত রাতের সেই স্নেহের কোনো কোমলতা নেই, নেই কোনো হাস্যোজ্জ্বলতা; কেবল এক অধরা একাকীত্ব ঠাঁই নিয়েছে মেজরের চোখেমুখে।মেঘ জানালার বাইরে চোখ ফিরিয়ে তাচ্ছিল্যের সুরে বলল,
“আমার কাছে এই বিয়ের কোনো মূল্য নেই। যে মেয়ে পুরুষজাতিকেই মনেপ্রাণে ঘৃণা করতে শিখে গেছে, তার কাছে এই বিয়ের সম্পর্ক বড্ড দূরের একটা অভিনয় মাত্র!”
মেঘের এমন স্পষ্ট ও জেদি কথায় শীর্ষ আবারও থ মেরে যায়। জিপের ভেতরে পুনরায় এক দমবন্ধ করা নিশ্চুপতা বিরাজ করতে থাকে। শুধু চাকার নিচে পিষে যাওয়া ভেজা রাস্তার শব্দ ছাড়া আর কিছু শোনা যায় না।
“গন্তব্যে এসে গেছি। নামো।”
শীর্ষর মেপে মেপে বলা কথায় হকচকিত হয়ে ওঠে মেঘ। সে দ্রুত ঘাড় ঘুরিয়ে চারপাশের চেনা দেয়াল আর গাছপালা লক্ষ্য করতেই বুঝতে পারে এটা ফতেখাঁরকূলের সেই ডাক্তার বাড়ি! শীর্ষ ততক্ষণে জিপের ইঞ্জিন চালু রেখেই গাড়ি থেকে নেমে পড়েছে। সে ধীরপায়ে হেঁটে মেঘের পাশের ডোরটা খুলে দিয়ে বরফশীতল গলায় বলল,
“জিপ থেকে নামো। ড. জুলান ও তোমার গ্র্যানির ফ্যামিলিরা গতকাল সন্ধ্যা থেকে তোমায় নিয়ে চরম টেন্সড।”
মেঘ একটুও সময় নষ্ট না করে দ্রুতপদে জিপ থেকে নিচে নেমে যায়। গাড়ির ডোরটা সপাটে লাগাতে লাগাতে সে শীর্ষর চোখের দিকে তাকিয়ে চূড়ান্ত চড়া গলায় বলে ওঠে,
“আমি আবারও বলছি মেজর সাহেব, এই নামমাত্র বিয়ের কোনো ভিত্তি আমার কাছে নেই আর নাই বা এই জোর খাটানো বিয়ে আমি মানি! পুরো জীবন চিরকুমারী থাকার পণ আমার। আমি ঢাকায় ব্যাক করার পর সকলের অলক্ষ্যে আপনি আমার ঠিকানায় ডিভোর্স লেটার পাঠিয়ে দেবেন, আমি এক বাক্যে সাইন করে দেব। আসি— ”
মেঘ আর মেজরের উত্তরের অপেক্ষা না করে হনহন করে ডাক্তার বাড়ির মূল ফটকের ভেতরে পা রেখেছে, ঠিক তখনই পেছন থেকে এক ঝটকায় ভেসে আসে শীর্ষর সেই বজ্রকঠিন কণ্ঠস্বর। কণ্ঠটা কিছুটা শীতল, তবে ভীষণ গম্ভীর ও আদেশসূচক,
“ডিভোর্সের সময়টা সময়ই বলে দেবে, মেঘালয়া। কিন্তু আপাতত তোমার ফ্যামিলির কেউ যদি তোমার গত রাতের মিসিং হওয়ার কথা আস্ক করে, তবে সোজা বলবে—তুমি রামু সিএমএইচ-এ অ্যাডমিট ছিলে। রিজন হিসেবে দেখাবে এক্সেসিভ ফিজিক্যাল উইকনেস। কারণ, তোমার ওপর হওয়া গতকালের সেই জঘন্যতম অ্যাটেম্পটের কথা যদি এই সমাজে একবার জানাজানি হয়, তবে তোমার হোল লাইফটা ওরা জ্যান্ত জাহান্নাম বানিয়ে দেবে। সমাজ মানেই এক চরম বিষাক্ত আস্তাকুঁড়, আর এতে শুধু বিষাক্ত কীটেরই বসবাস! গতকালের স্পটের সমস্ত প্রমাণ আর বখাটেদের অলরেডি ধামাচাপা দেওয়া হয়েছে। সো, মুখ বন্ধ রাখবে!”
শীর্ষ আর এক সেকেন্ডও সেখানে থামল না। দ্রুত পদাচরণের সাহায্যে জিপের ড্রাইভিং সিটে উঠে বসে ক্লাচ চেপে সজোরে এক্সিলারেটরে চাপ দিল সে। মুহূর্তের মধ্যেই গর্জন করে শীর্ষর টয়োটা আর্মি জিপটি ডাক্তার বাড়ির ফটক ত্যাগ করল। আষাঢ়ের বৃষ্টির ফলে পিচঢালা রাস্তায় জমা থাকা নোংরা পানি দু-পাশে সপাটে উঁচিয়ে দিয়ে রুদ্ধশ্বাসে হাইওয়ের দিকে ছুটে চলল সেই কালো রঙের গাড়িটি।
গেট ধরে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে মেঘ অপলক চোখে কেবল দেখেই গেল শীর্ষর সেই রুক্ষ ও ঝড়ের বেগে চলে যাওয়ার প্রস্থান। যতদূর ওর নেত্র যায়, যতক্ষণ না মেজরের জিপটি কুয়াশা আর মেঘের আড়ালে পুরোপুরি হারিয়ে গেল, মেঘের বুকের ভেতরটা এক অজানা হাহাকারে তোলপাড় হতে থাকল।
ডাক্তার বাড়ির সদর দরজা ঠেলে অন্দরে প্রবেশ করতেই মেঘ দেখতে পেল, ওর নানু ভাই ডাক্তার আকবর জুলান হন্তদন্ত হয়ে ব্যাগ গুছিয়ে কোথাও বের হওয়ার উপক্রম করছেন। বৃদ্ধের ফর্সা কপালে চিন্তার অজস্র ভাঁজ, ফ্যাকাশে মুখ অবয়বে যেন ভর করেছে ঘোর অমাবস্যার অন্ধকার।
“কোথায় যাচ্ছো নানু ভাই?”
দ্বারে মেঘের এই ক্লান্ত কণ্ঠস্বর শোনামাত্রই থমকে গেলেন আকবর জুলান। নিজের চোখকে যেন বিশ্বাস করতে পারছিলেন না তিনি। মেঘের চেনা বুলি কর্ণগর্ভে প্রবেশ করতেই হাতের ব্যাগটা মেঝেতে ফেলে দিয়ে দ্রুতপদে এগিয়ে এসে আদরের নাতনিকে বুকের মাঝে শক্ত করে ঝাপটে ধরলেন। আশঙ্কায় ও আতঙ্কে সত্তরোর্ধ্ব বয়োবৃদ্ধ মানুষটার সারা দেহ থরথর করে কাঁপছিল। তিনি কাঁপাকাঁপা গলায় মেঘকে জড়িয়ে রেখেই ফুঁপিয়ে বলে উঠলেন,
“নানু ভাই আমার! তুই কোথায় গেছিলি রে দিদিভাই? কাল সন্ধ্যা থেকে তোর কোনো খবর না পেয়ে আমরা যে পাগল হতে বসেছি। পুরো রামু থানায় মানুষ পাঠানো হয়েছে। কেউ কেস নেয়নি। তোর নানী ভাই তো কান্নাকাটি করতে করতে স্ট্রোক করার মতো অবস্থা হয়ে বিছানায় শয্যা নিয়েছে। ও দিদিভাই, তুই এমন করে কই হারিয়ে গিয়েছিলি?”
নানু ভাইয়ের বুকভরা আকুলতা দেখে মেঘের চোখের কোণটা অলক্ষ্যে ভিজে উঠল। সে আলতো করে নানার বুক থেকে মাথা তুলল। বৃদ্ধের মায়াময়, জলভারাক্রান্ত চোখের দিকে তাকিয়ে মেজর শীর্ষ কারদারের শিখিয়ে দেওয়া সেই মিথ্যেটুকু নিজের সমস্ত জড়তা কাটিয়ে বলে উঠল,
“তোমার এই ছোট বউয়ের কিচ্ছু হয়নি নানু ভাই, আমি একদম ঠিক আছি। আসলে কাল বিকেলে রাবার বাগানে ঘোরার সময় হুট করেই মাথা ঘুরে আমি অজ্ঞান হয়ে মাটিতে পড়ে গিয়েছিলাম। ওখানকার কয়েকজন স্থানীয় শ্রমিক আমায় উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পথে নাকি ছোট খালামনির বড় জায়ের ছেলে মেজর শীর্ষ কারদার সাহেবের সাথে দেখা হয়। উনি আমায় নিজের দায়িত্বে আর্মি জিপে তুলে নেন। কাল সারারাত আমি রামু সিএমএইচ-এই স্যালাইন আর ডাক্তারদের অবজারভেশনে চিকিৎসাধীন ছিলাম।”
নাতনির মুখে মেজরের নাম আর হাসপাতালে থাকার কথা শুনে আকবর জুলানের বুক থেকে মস্ত বড় একটা পাথরের বোঝা নেমে গেল। কিন্তু মেঘের গায়ের এই অচেনা তাঁতের শাড়ি আর ফ্যাকাশে মুখ দেখে তিনি আবারও উদ্বিগ্ন গলায় শুধালেন,
“কিন্তু তুই হুট করে অজ্ঞান হতে গেলি কেন দিদিভাই? কী হয়েছে তোর শরীরে? আর এই শাড়িই বা তোকে কে দিল?”
মেঘ নিজের ভেতরের সবটুকু ক্লান্তি নিয়ে ওর নানার বুকে আবারও মাথা ঠেকিয়ে রাখল। এই মুহূর্তে ভীষণ দুর্বল লাগছে ওর, সমস্ত শরীর যেন ভেঙে আসছে। মাথাটা কেমন জিমজিম করছে, চোখের সামনে চারপাশটা ক্রমশ ঝাপসা হয়ে আসছে, সোজা হয়ে দাঁড়াতেও বড্ড কষ্ট হচ্ছে ওর। নানার শেষ প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে ও নিজের ওষ্ঠাধর নাড়িয়ে শুধু এটুকু বলতে পারল,
“আসলে… শরীরটা অনেক দু–”
কিন্তু নিজের ভেতরের চরম ক্লান্তি আর অবসাদের কারণে বাকি কথাটুকু আর শেষ করা হলো না ওর। একে তো কাল বিকেল থেকে পেটে এক দানা অন্ন পড়েনি, তার ওপর নিজের কুমারীত্বের ওপর দিয়ে বয়ে গেছে এক প্রলয়ংকারী ঝড় সতেরো বছরের কাঁচা শরীর ও মন এই ধকল আর নিতে পারল না। জিপের ভেতরে মেজরের সাথে করা সেই বিয়ের মানসিক চাপটুকুই যেন শেষ পেরেক ঠুকে দিল। মেঘ কোনো কিছু বোঝার আগেই সম্পূর্ণ নিস্তেজ হয়ে তৃতীয় বারের মতো আবারও ধপ করে অজ্ঞান হয়ে গড়িয়ে পড়ল নানার বুকের ওপর।
“দিদিভাই! ও মেঘু! কী হলো রে তোর?”
হুট করে মেঘকে এভাবে নেতিয়ে পড়তে দেখে চরম ভয় পেয়ে গেলেন আকবর জুলান। বুড়ো মানুষ, জীবনের এই শেষ বয়সে এসে নিজের কলিজার টুকরো আদরের নাতনির এমন আশঙ্কাজনক অবস্থা তিনি কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছিলেন না। বহু কষ্টে নিজের সমস্ত শক্তি এক করে মেঘের অবশ কায়াটিকে কোলে-পিঠে করে টেনে নিয়ে ড্রয়িংরুমের নরম সোফাটায় শোয়ালেন তিনি। অত্যন্ত কাঁপাকাঁপা হাতে মেঘের ফর্সা কবজিটা চেপে ধরে ওর পালস চেক করে দেখলেন বৃদ্ধ ডাক্তার হৃৎস্পন্দনের গতি বড্ড ধীর, রক্তচাপ একদম তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে।
তিনি আর এক মুহূর্তও সময় নষ্ট না করে নিজের চেম্বার ঘরে ফিরে এলেন। আলমারি আর ড্রয়ার তন্নতন্ন করে খুঁজে প্রয়োজনীয় গ্লুকোজ স্যালাইন, ক্যাথেটার আর পুশ করার সুচ বের করে নিলেন। রামু এলাকার স্বনামধন্য প্রবীণ ডাক্তার হওয়ায় তার ঘরে জরুরি চিকিৎসার প্রয়োজনীয় সকল কিছুই সব সময় মজুত থাকে।
দ্রুত সোফার পাশে এসে তিনি মেঘের ফর্সা, ঠাণ্ডা হয়ে যাওয়া বাঁ হাতটা সোজা করলেন। অত্যন্ত নিখুঁত দক্ষতায় শিরার ভেতর সুচ ফুটিয়ে স্যালাইন পুশইন করলেন এবং পাশে থাকা একটি স্ট্যান্ডের সাহায্যে স্যালাইনের বোতলটি ঝুলিয়ে রাখলেন। ফোঁটায় ফোঁটায় সেই জীবনদায়ী তরল মেঘের শিরায় চুইয়ে পড়তে লাগল।
প্রবীণ ডাক্তার অভিজ্ঞ চোখে মেঘের মুখের দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মনে মনে হিসেব কষলেন এই স্যালাইন শেষ হতে কম করে হলেও ঘণ্টা দুয়েক সময় লাগবে। আর মেঘের অবশ মগজে চেতনার আলো তথা ওর জ্ঞানও ঠিক সে সময়ই ফিরে আসবে।
স্যালাইনের শেষ ফোঁটাটুকু মেঘের রক্তে মিশে যাওয়ার পর, মিনিট দশেক হলো ওর জ্ঞান ফিরেছে। সোফার ওপর এক কোণায় গুটিশুটি মেরে ও কেমন যেন একটা নিষ্প্রাণ জড় বস্তুর মতো বসে আছে। শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে সামনের দেয়ালে ঝোলানো পুরনো দেয়ালঘড়িটার দিকে। এতক্ষণ নিজেকে কোনোমতে শান্ত আর স্বাভাবিক রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করলেও, অবচেতন মনের সেই অবরুদ্ধ বাঁধটা এবার আর ও ধরে রাখতে পারল না। এক তীব্র মানসিক যন্ত্রণার জোয়ার আচমকা ওর ভেতর থেকে উথলে উঠতেই, ও সোফা থেকে নেমে একপ্রকার দৌড়েই ড্রয়িংরুমের পাশের ওয়াশরুমের ভেতর ঢুকে গেল। ভেতরের ছিটকিনিটা সপাটে আটকে দিয়ে, কাঁপা হাতে ঝর্ণার নবটা ঘুরিয়ে দিল ও। মাথার ওপর থেকে তীব্র বেগে শীতল পানির ধারা নামতেই, নিজের মুখটা দুই হাতে চেপে ধরে কলিজা ফাটিয়ে চিৎকার করে উঠল মেঘ।
ঝর্ণার পানির অবিরাম পতনের শব্দের সাথে মিশে যেতে থাকল ওর বুকভাঙা কান্নার আওয়াজ। কাল সন্ধ্যার পর থেকে ঘটে যাওয়া একের পর এক নারকীয় দৃশ্য, সেই পশুদের হলদেটে দাঁতের কামড়, কুৎসিত সব মন্তব্য আর ধারালো চাপাতির কোপের বীভৎস শব্দ সবকিছু যেন এই মুহূর্তে একযোগে মগজের কোষে কোষে আছড়ে পড়ে ওকে জীবন্ত ক্ষতবিক্ষত করতে লাগল।
তার ওপর বার বার কানের পর্দায় এসে বাজতে লাগল আজ সকালে মানুষ গুলোর সেউ নোংরা কথা। চরিত্রের কুৎসা। নিজের পরম মাননীয় নানু ভাই আর অসুস্থ নানী ভাইয়ের মায়াবী মুখগুলোর সামনে দাঁড়িয়ে এই প্রথম ও এত বড় একটা সত্য ধামাচাপা দিয়ে এসেছে। এই তীব্র পাপবোধ আর ট্রমা ও কিছুতেই নিতে পারছিল না।
ভেজা পিচ্ছিল মেঝের ওপর হাঁটু মুড়ে বসে ও ঝর্ণার নিচে অনবরত ভিজতে থাকল। ঠান্ডায় সারা শরীর থরথর করে কাঁপছে, ঠোঁট দুটো নীল হয়ে এসেছে, অথচ সেদিকে ওর কোনো হুশ নেই। ডুকরে কাঁদতে কাঁদতে একসময় ওর চোখের পানিও পুরোপুরি শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেল; এখন চোখ দিয়ে কেবল নোনা জলের শূন্য এক জ্বালা নির্গত হচ্ছে।সে এক চরম উন্মাদনায় নিজের দুই হাত দিয়ে শাড়ির ওপর থেকেই গায়ের চামড়া, গলা আর গাল পাগলের মতো ঘষে ঘষে ধুতে লাগল যেন ওখান থেকে ওই নরপশুদের স্পর্শের অদৃশ্য দুর্গন্ধটা ও চিরতরে মুছে ফেলতে চায়। নিজের নখের তীব্র আঁচড়ে ফর্সা চামড়া লাল হয়ে রক্তাভ হয়ে উঠল, তবুও ও থামল না। নিজের শরীরের প্রতি এক চরম বিতৃষ্ণা আর ঘৃণায় ও বার বার দেয়ালে মাথা ঠুকতে লাগল আর বিড়বিড় করে নিজেকেই অভিশাপ দিয়ে বলতে লাগল,
মেজর কারদার পর্ব ১৬
“মরে যা! মরে যা তুই মেঘালয়া! মরে গেলেই তো সব শেষ, নিস্তার পাবি এই কুৎসিত দুনিয়া থেকে! আর একটা মুহূর্তও তোর এই পাপী মুখ নিয়ে বেঁচে থাকার কোনো অধিকার নেই! মর তুই, এক্ষুণি মর! কলঙ্কিনী একটা… তুই মর!”
