মেজর কারদার পর্ব ৩০ (২)
ফিনারা ঝুমুর
“সারারাত ভর ফস্টিনস্টি মারিয়া, এখন দেহো চোরের মতো কেমন ঘুমাইতাছে! লাজ-লজ্জার কোনো নামগন্ধও নাই হেগো!”
ভিড়ের মাঝ থেকে বয়সজ্যেষ্ঠ আরেক পাহাড়িয়া নারী সাপের মতো হিসহিসিয়ে গর্জে বলে ওঠে,
“আরেহ, এসব বাজারী মেছোর মেয়েদের কারণেই তো আজ সমাজের ভালো ভালো পরিবার আর সংসার নষ্ট হয়! একবারে বেশ্যা চরিত্র! ছেলেটারে নিবিড় রাতে একা পাইছে, অমনি লুফে নিয়া বিছানায় টেনে তুলছে!”
আরেক পাহাড়িয়া নারী হাত-পা নেড়ে চেঁচিয়ে ওঠে,
“কেন? ছেলেটা কি দুধের ধোয়া তুলসী পাতা নাকি? দুইডাই সমান অপকর্মকারী! আর কথা না বাড়ায়া এদের এখনই ঘাড় ধরে কাজি ডেকে বিয়ে পড়াইয়া দাও—!”
রামুর সেই নিঝুম পাহাড়ি উপত্যকা এক লহমায় এমন জঘন্য ও বিষাক্ত চিৎকার-চেঁচামেচিতে পরিপূর্ণ হয়ে উঠল। মেঘের দুটো ডাগর চোখ অনবরত জলে ভিজে উঠতে লাগল। ও হাত দুটো জোড় করে, আকুল হয়ে কেঁদে উঠে সবার কাছে ক্ষমা চাওয়ার ভঙ্গিতে বলল,
“আল্লাহর দোহাই লাগে আপনাদের, একটু চুপ করুন! আপনারা যা যা ভাবছেন, তার কোনোটাই সত্যি নয়! ওনার সাথে আমার বিন্দুমাত্র জঘন্য কিছুই হয়নি– বিশ্বাস করুন!”
“একদম চুপ কর, বেহায়া মাইয়া! নিজের ওই নষ্ট মুখে লাগাম টান এবার!”
শীর্ষ এত বড় কটু কথা আর নিজের চরিত্রে অনবরত কাদা ছেটানো দেখেও নিশ্চুপ হয়ে সব শুনে যাচ্ছে, অথচ আশ্চর্যজনকভাবে একটা শব্দও উচ্চারণ করছে না! তবে ওর সুগভীর প্রখর গ্রে চোখে তখন এক অচেনা, গূঢ় চক্রান্তের বিজলী খেলছিল। ও মনে মনে সশব্দে হেসে আওড়ালো,
“তোমার গায়ে এমন মিথ্যে কলঙ্ক লেপ্টে হলেও যে আজ তোমায় পুরোপুরি আমার করে নেব, আমার জানপাখি!”
“এই চল, কাজীরে ডাইক্কা আনি।”
ভিড় ঠেলে কয়েকজন যুবক চলেয় যায়। কত সময় গড়াতেই
হঠাৎ পাহাড়ি যুবকদের কয়েকজন কোথা থেকে এক বয়স্ক কাজীকে ধরে টেনে নিয়ে আসে। চার-পাঁচজন পাহাড়ি নারী জোরপূর্বক মেঘের দুই হাত খামচে ধরে টেনে তোলে,
“এই মাইয়া ওঠ! শাড়ি-গয়না পইড়া কনের মতো সাজন লাগবো না নিহি?”
“আপনারা সবাই বড্ড ভুল বুঝছেন! দয়া করে আমার গলায় এমন জোর জবরদস্তির বিয়ের ফাঁসে ঝুলিয়ে দেবেন না! একটু দয়া করুন আমার ওপর!”
“মরণ! এতো সাধু সাজন লাগতোনি। পোলার লগে ধরা খাইছো। ঝামেলা তো ওইবোই। চুপ থাকো এহন।”
নারীটির কথায় মেঘ ফের কাকুতিমিনতি করতে থাকে। বার বার বোঝাত্ব থাকে তারা যা ভাবছে সব ভুল। সব!কিন্তু সেই মায়াহীন পাহাড়ি জনতা মেঘের আকুল কান্নায় বিন্দুমাত্র দয়া প্রদর্শন করল না। ওকে টেনে-হিঁচড়ে নিয়ে গেল পাশের এক নিভৃত ঝুম ঘরে। জোর করে পরিয়ে দিল পাহাড়ি তাঁতের লাল-হলুদ শাড়ি আর রূপালী ঐতিহ্যবাহী অলংকার। ফর্সা কপালে এঁকে দিল ছোট গড়নের লাল টিপ, আর কাঁপা ঠোঁটে মাখিয়ে দিল গাঢ় লাল-খয়েরী লিপস্টিক!
“ওই মাইয়া, চোখ মোছ জলদি!”
মেঘ তাও চোখ মোছে না। কান্নার জল আর ঝাপসা চোখের কোণে কাজল লেপ্টে দিয়ে পুরো সাজটাই নষ্ট করে ফেলে।
“ওই ছেড়ি, কি কইতাছি হোনোস না? চোখ মোছ।”
মেঘ তবুও মোছে না। আরো অশ্রু গড়ায়। পাহাড়ি মেয়েগুলো বিরক্ত হয়ে আর নতুন করে কাজল দিতে গেল না। ওকে ধরে এনে সটান বসিয়ে দিল শীর্ষর পাশে। শীর্ষর পরনে তখনও সেই জলপাই রঙা আর্মি প্যান্ট আর কালো ট্যাংক টপ।
কাজী সাহেব ইতিমধ্যে শীর্ষর কাছ থেকে জরুরি তথ্যগুলো সংগ্রহ করে নিয়েছেন। তিনি চশমা জোড়া নাকের ডগায় নামিয়ে নিকাহনামার দিকে দৃষ্টি রেখে মেঘের দিকে ফিরলেন। বিয়ের সকল সামাজিক ও ধর্মীয় কার্যাবলী পাঠ করে স্পষ্ট ও গম্ভীর গলায় উচ্চারণ করলেন,
“বলুন মা, কবুল!”
মেঘ মুখ খোলে না। অসহায় ও ব্যর্থ চোখে একবার পাশাপাশি বসে থাকা শীর্ষর পানে তাকায় যে কিনা মাথা নত করে চরম অপরাধীর মতো নীরবতা পালন করছে! নিজের এমন অসহায়ত্বে ঠোঁট উল্টে কান্না চলে আসে মেঘের। কাজী সাহেব ধৈর্য ধরে ফের জিজ্ঞাসা করেন,
“বলুন মা, কবুল!”
এবারও মেঘের কোনো সাড়াশব্দ নেই, ও নিথর হয়ে বসে থাকে। কাজী সাহেব অগত্যা এই এলাকার এক মান্যগণ্য প্রবীণ ব্যক্তির দিকে তাকিয়ে খটকা নিয়ে শুধালেন,
“খরিব সাব, মাইয়া তো কবুল কয় না। ঘটনা কি? জোড়জবরি নাকি?”
খরিব সাহেব তেঁতো মুখে প্রত্যুত্তর করেন,
“আর কইয়েন না মৌলভী সাব! এই মাইয়া আর এই পোলা কালকের ঝড়ের রাইতে এইখানে অনৈতিক কুকাম করছে! তাই ধইরা আইনা হাঙ্গা পড়াইতাছি, যাতে পাপের বোঝা কমায়!”
কথাটা শুনে কাজী সাহেবের ফর্সা মুখ মুহূর্তে চুন হয়ে গেল! শেষে কিনা একবারে উনিশ/বিশের চরম কেস? হায় খোদা! কাজী সাহেব এবার তীব্র তিতবিরক্ত হয়ে মেঘের দিকে তাকিয়ে কিছুটা ধমকের সুরে ফের শুধালে, থরথর করে কাঁপতে থাকা ভাঙ্গা গলায় মেঘ উচ্চারণ করল
“ক… ক… বু… ল!”
“আলহামদুলিল্লাহ!”
উপস্থিত পাহাড়ি জনতা একযোগে জোরালো কণ্ঠে ‘আলহামদুলিল্লাহ’ ধ্বনি তুলে উঠান কাঁপিয়ে দিল। সকলের চোখে মেঘ-শীর্ষ নোংরা দেহের লোকজন। কলঙ্কের ছাপ মুছতে নামমাত্র বিয়ে। কাজী সাহেব এবার পাশ ফিরে শীর্ষর দিকে তাকিয়ে একইভাবে শুধালেন,
“বলুন বাবা, কবুল!”
“কবুল!”
মাত্র এক বাক্যে ‘কবুল’ উচ্চারণ করে মেঘকে নিজের বিধিসম্মত বধূ হিসেবে হৃদমাঝারে চিরতরে ঠাঁই দিল শীর্ষ। অন্তরালে নিজের আত্মা ও হৃদয়ের কাছে পরম প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হলো জাঁদরেল মেজর—
“তোমায় শেষ নিশ্বাস অবধি আগলে রাখার গুরুদায়িত্ব আমার! স্বপ্ন পূরণের উচ্চশেখড়ে উপদিত হবে তুমি! সংসারের বেড়াজালে কোমল হিয়ার মরণ ঘটবে না! তুমি আমার বহুসাধনার পুষ্পফল! জীবন দিয়ে হলেও তোমায় রক্ষা করে যাবো। ভালোবাসায় মুড়িয়ে রেখে স্বর্গসুখ তোমার পদতলে আপদিত করবো – মাই ব্ল্যাক ব্যাট ফ্লাওয়ার!”
বিবাহ পর্ব সমাপ্ত হতেই উপস্থিত ভিড়ের মাঝ থেকে সেই অসভ্য লোকগুলো আবারও বিশ্রীভাবে মুখিয়ে ওঠে,
“ল ল! ভালোয় ভালোয় তোগো হাঙ্গা তো শেষ হইলো! রাইত ভর যতো পারছস ফষ্টিনষ্টি মারছস, এহন কাজী ডাইক্যা আইনা বিয়্যা দিয়া দিছি। এবার বনে-বাদাড়ে কিংবা যেখানে খুশি গিয়া আকাম-কুকাম কর গে!”
ভিড়ের মাঝ থেকে আরেক প্রবীণ নারী কুৎসিত মুখে বাঁকা হেসে যোগ করে,
“আরেহ, মাইয়াডা কালীনি কালকুচকুচে হইলে কি হইবো, মরদ পাইছে একখান রাজপুত্তুরের মতো! ধবধবে ফর্সা ধলার ভিত্তে একেবারে এক বিশ্রী দাগি মাইয়া!”
নিজের মেঘের ব্যাপারে মুখ থেকে আসা আর একটি কটু কথাও শীর্ষর সহ্য হলো না! সমস্ত সংযমের বাঁধ ভেঙে যেন এক হিংস্র পশুর মতো গর্জন করে উঠল ও,
“আমার ওয়াইফ পবিত্র, আমি অপবিত্র। ও শুভ্র, আমি কলঙ্ক। ও লুকায়িত হীরা, আমি কলঙ্কে মোড়ানো আঁধার।”
বিয়েতে মুখিয়ে থাকা ও বিষ ছড়ানো সকল মানুষের দিকে নিজের হিংস্র ও রক্তচক্ষু মেলে তাকাল ও। প্রতিটি ভারী ও বরফশীতল শব্দ উচ্চারণ করল প্রচণ্ড দম্ভে,
“শীর্ষ কারদার অঙ্কনের জীবনসঙ্গীনি মেঘালয়া আরণ্যি। আমি জানি, আমার স্ত্রী কেমন। তার চরিত্রে কালিমা লেপ্টানোর অধিকার আপনাদের কাউকে দেওয়া হয়নি।”
‘শীর্ষ কারদার’ নামটা শোনামাত্রই উপস্থিত পাহাড়ি জনতার চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল! ভয়ে আর আতঙ্কে তারা স্তব্ধ ও তটস্থ হয়ে পড়ল। এ তো সেই জাঁদরেল মেজর শীর্ষ কারদার, যাঁর সাহসিকতা আর দৌলতে এই পাহাড়ি উপত্যকার হাজারো মানুষের জীবনে আসল শান্তি ফিরে এসেছে! এই তো সেই দূরন্ত বর্ডার গার্ডের সেনা যাকে নিয়ে পুরো দেশ গর্ব করে!
“আমাদের মাফ কইরাদেন, মেজর সাব। আমরা বুঝবার পারি নাই।”
শীর্ষ গুরুগম্ভীরতা বজায় রেখে, পূর্বের বাজখায় গলায় গর্জন করে,
“আপনারা যা করেছেন, তা অপরাধ নয় ;অন্যায়। মনে রাখবো, চোখের দেখা ও বোঝার ভুল অধিকাংশ সময় হয়ে থাকে। আজ আপনারা না জেনে, না বুঝে যা করেছে, তার মাশুল আপনারা পেয়ে যাবেন।”
শীর্ষর কথায় সকলের মাঝে অপরাধবোধ আর ভয় আরো গাঢ় হয়। সেই অপরাধী ও ভয়ার্ত মুখশ্রীগুলোর দিকে তাকিয়ে সেদিন মেজরের মনে বিন্দুমাত্র দয়া বা অনুশোচনা জাগেনি। মেঘের হাত নিজের শক্ত মুঠোয় শক্ত করে চেপে ধরে মাথা নিচু করে নয়, বরং সমাজকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে মাথা উঁচু করেই সেখান হতে ফিরে এসেছিল।
স্মৃতি বিলাস শেষে ধীরপায়ে ঘরে ফিরে আসে শীর্ষ। ঘরের শান্ত আলোয় তার দৃষ্টি গিয়ে থামে ঠিক সামনের সুবিশাল দেয়ালটার পানে। সেখানে ঝুলছে সেদিনের সেই আকস্মিক, অপ্রত্যাশিত বিবাহের সাজে বাঁধাই করা বিশাল এক আলোকচিত্র। তার প্রিয়তমা মেঘালয়ার ছবি।
শীর্ষ এগিয়ে যায় দেয়ালে ঝুলানো সেই ছবিটার একদম কাছে। নিজের ওষ্ঠাধর ঝুঁকিয়ে গভীর অনুরাগে বেশ শব্দ করে প্রিয়তমার ছবির তপ্ত গালে এক চুমু আঁকে সে।
“ভালোবাসি, জান!”
নিঝুম নিস্তব্ধ ঘরে একা একাই শব্দ করে মেঘের প্রতি নিজের বুকচাপা ভালোবাসা জাহির করে ফেলে শীর্ষ। তারপর অপলক, মোহগ্রস্ত চোখে চেয়ে রয় সেই অপরূপা মায়াবতী মেঘের ছবির দিকে।
যেখানে ছবির কাঠের ফ্রেমের একদম নিচের অংশে নিজের নিজ হস্তে খোদাই করে সুন্দর ও নিখুঁত অক্ষরে লেখা রয়েছে,
“মায়াবতী বঁধূয়া! বক্ষমাঝার জুড়ে বিস্তৃত ঘাতিনী!”
দেখতে দেখতে দেখতে সময় কেটে গেল আরও এক দীর্ঘ মাস। কিঞ্জার বহুল প্রতীক্ষিত বিয়ের সময়টা একবারে কাছে ঘনিয়ে এসেছে, হাতে রয়েছে মোটে দিন দশেক।
বিছানায় আরাম করে শুয়ে অলস ভঙ্গিতে ঘুমাচ্ছে মেঘ। এই বিগত একমাসে দূরত্বের মাঝেও শীর্ষর সাথে ওর সম্পর্কের উন্নতি যদি হয় দশ আনা, তবে ছোটখাটো বিষয় নিয়ে মান-অভিমান জমে দাঁড়িয়েছে একবারে ষোলো আনা! কাল রাত থেকে এই জাঁদরেল মানুষটার সাথে সমস্ত কথাবার্তা বন্ধ করে দিয়েছে অভিমানী রমণী। মুখে একবারে কুলুপ এঁটে বসে আছে। ফোন স্ক্রিনে শীর্ষর নাম ভেসে উঠলে বারবার কল কেটে দিয়েছে সে, একবারও জবাব দেয় নি।
ঠিক তখনই আলেয়া বানু মেঘের ঘরে প্রবেশ করেন। দিনে-দুপুরে মেয়েকে এভাবে কুম্ভকর্ণের মতো বিছানায় লেপ্টে ঘুমাতে দেখে উনি বেজায় চটে যান। গায়ের কাঁথাটা টেনে ধরে মৃদু ধাক্কা দেন মেঘকে,
“এই মেঘ, ওঠ বলছি! কত ঘুমাবি আর?”
“আরেকটু ঘুমাতে দাও না, মা! প্রমিজ আর দশ মিনিট!”
আলেয়া বানু চটে গিয়ে মেঘের দিকে একখানা চরম কটমটে চাহনি নিক্ষেপ করেন। এবার আর মৃদু নয়, বেশ শক্তপোক্ত একখানা ধাক্কা বসিয়ে দেন মেঘের গায়ে,
“কিহ! কি হয়েছে? ভূকম্পন? বন্যা এসেছে নাকি দেশে??”
ধড়ফড়িয়ে এক ঝটকায় ঘুম থেকে উঠে বসে মেঘ! ঘুমের তীব্র ঘোরে চোখ ডলতে ডলতে আবোল-তাবোল বকতে শুরু করে সে। মেয়েকে এমন ঢং করতে দেখে আলেয়া বানুর মেজাজ আরও এক ধাপ চড়ে যায়,
“একদম বাজে বকা বন্ধ করে চুপ কর! ওপাশ থেকে জামাই বারবার কল দিচ্ছে, তোর সাথে নাকি জরুরি কথা বলবে।”
‘জামাই’ মানে মেজর শীর্ষ কারদার! সেই জাঁদরেল মানবের নাম শোনামাত্রই এক লহমায় মেঘের ফর্সা মুখশ্রী কালো মেঘে ঢেকে যায়। মুখ ভারী করে অন্যদিকে ফিরে বলে,
“ওনাকে সোজা বলে দাও আমি কোনো কথা বলব না ওনার সাথে!”
“এসব কি শুরু করেছিস তুই, হ্যাঁ? জামাই মানুষ দূর পাহাড়ে ডিউটি করছে, আর তোর এত দেমাগ? শুনলাম তুই নাকি সামান্য কথায় জামাইয়ের সাথে বিবাদ বাঁধিয়ে বসে আছিস? কল দিলে নাকি কেটে দিচ্ছিস?”
বুকে থুতনি ঠেকিয়ে অপরাধীর মতো চুপটি করে বসে থাকে মেঘ। মেঘের এই গুমোট নীরবতা দেখে আলেয়া বানু একনাগাড়ে বকবক করতে শুরু করেন,
“তোকে কি এই শিক্ষা দিয়ে আমি বড় করেছি, বল? দূর চট্টগ্রামে ছেলেটা তোর জন্য কষ্ট পাচ্ছে না? নে, চুপচাপ মোবাইলটা ধর আর কথা বল! আর একটা বার যদি তোর এই চালচলনের জন্য জামাই আমাদের ফোনে নালিশ জানায়, তো তোকে ঘাড় ধরে এই বাড়ি থেকে বের করে দেব! হতচ্ছাড়া বান্দর মেয়ে একটা!”
মেঘের কাঁপা হাতে ঠাস করে মোবাইলটা গুঁজে দিয়ে আলেয়া বানু গটগট করে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যান।ফোন কানে তুলতেই ওপাশ থেকে ভেসে আসে শীর্ষর হালকা ও সুগভীর ঠোঁট টিপে হাসার আওয়াজ,
“খুব তো মজা হচ্ছে, তাই না মেজর সাহেব?”
“আসলেই বউ! আমার শাশুড়ি আম্মা এত লক্ষ্মী আর ভালো মানুষ যে কি বলব, অথচ ওনার মেয়েটা এত কাঠখোট্টা আর পাষাণ! মন তো চায় এখন—”
“মন আপনার কি চায়, শুনি?”
হাস্কি টোনে ওপাশ হতে প্রত্যুত্তর ভেসে আসে,
“লবণ-মরিচ ছাড়া স্রেফ মিষ্টি চকোলেট দিয়ে তোমাকে একবারে চিবিয়ে খেয়ে ফেলি!”
শীর্ষর এমন প্রকাশ্য দুষ্টু ও মাদকতাময় কথায় মেঘের দুই গাল মুহূর্তেই রক্তিম লজ্জায় লাল হয়ে ওঠে! চাদর খামচে ধরে ওপাশ থেকে মুখ লুকানোর চেষ্টা করে সে। শীর্ষ যেন ওপাশের লজ্জাটাও স্পষ্ট টের পাচ্ছে, তাই মৃদু হেসে বলল,
“ফোনের ওপাশে একা একা এত লজ্জা পেয়ো না, প্রিয়া! আমি তো এখন কাছে নেই। সব লজ্জা জমা করে রাখো নিজের মাঝে— ফিরে এসে এই সমস্ত লজ্জার বাঁধন ভাঙব, আর সেই সাথে ভালোবাসায় তোমায় খুব কাঁদাবও কিন্তু!”
“ইশ! কত শখ তেনার! আইসেন তো আপনি আমার কাছে কামড়াতে, এক ঘুষি মেরে মুখের সব দাঁত একবারে ভেঙে গুঁড়ো করে দেব!”
মেঘের উত্তর শুনে শীর্ষ অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে। হাসতে হাসতে গম্ভীর ও মাদকতাময় কণ্ঠে বলে,
“বেশ তো, মেরো! তবে তোমার সেই ভালোবাসার মারটা না হয় আমি রাতের বেলা মিষ্টি এক সাজায় উসুল করে নেবো, প্রিয়া।”
শীর্ষর এমন খোলামেলা আর আবেদনময়ী কথা শুনে মেঘের ফর্সা গাল দুটো লজ্জায় লাল-নীল হতে শুরু করে! ওপাশ থেকে মেজরের তীক্ষ্ণ সেন্স যেন মেঘের সেই সুপ্ত লজ্জার রঙটা ঠিকই টের পেয়ে যায়। ও মেঘকে আরও কিছুটা লজ্জার সাগরে ডুবিয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যে ধীরেসুস্থে বলে,
“জানো, প্রিয়া…?”
“কী…?”
মেঘ বেশ ধীরস্বরে প্রশ্ন করে।
“তোমায় চোখের সামনে দেখলেই না আমার মনে কেমন যেন বাসর বাসর ফিল আসে! চলো না, দূরত্বের তোয়াক্কা না করে আজ দুজনে মিলে একাকার হয়ে করে ফেলি সেই বাসর বাসর কাজগুলো!”
কথাটা শোনামাত্রই মেঘ চমকে উঠে বুকের বাঁ পাশে হাত চেপে ধরে! আর ওপাশ থেকে শীর্ষ আবার হো হো করে হেসে ওঠে। শীর্ষর সেই দুষ্টু ও বাঁধভাঙা হাসি শুনে মেঘ নিজের মুখটা একবারে পেঁচার মতো থমথমে ও ভারি করে ফেলে। দাঁতে দাঁত চেপে বলে,
মেজর কারদার পর্ব ৩০
“একটা চরম বেলাজ, বেহায়া পুরুষ আপনি!”
“যা-ই বলো প্রিয়া, আমার যা কিছু বেলাজরূপ তা তো স্রেফ তোমারই কাছে! উফফফ, জান! তুমি দেখতে যেমন রূপসী, আমার কেন যেন মনে হয় তুমি চকোলেটের মতো অনেক টেস্টিও হবে, তাই না? আমার না সত্যিই এখন তোমায় পরম আদরে টেস্ট করতে বড্ড মন চাইছে! চলে আসি তবে রামুর এই ব্যারাক ছেড়ে সোজা তোমার ঘরে? এসে টেস্ট করি তোমায়—?”
“ইশশশ! একদম মুখ বন্ধ করে চুপ করুন তো, বেহায়া পুরুষ!”
