মেজর কারদার পর্ব ৯
ফিনারা ঝুমুর
কলেজের সবুজ মাঠে পা ছড়িয়ে গোল হয়ে বসে আছে মেঘ। সাথে রয়েছে তার তিন সাগরেদ ও প্রাণের সই—ফাতিহা, রাইসা আর তানিয়া। টিফিনের এই সময়টায় সকলের হাতে একটা করে সুস্বাদু ছানার বরফি। ওরা বেশ আয়েশ আর মজা করেই কামড় বসাচ্ছে মিষ্টিতে।
“তা তোর ঢাকার মামাবাড়ি বেড়ানো কেমন কাটল, সোনা?”
তানিয়ার চিমটি কাটা হেসহেসে গলার প্রশ্ন শুনে হো হো করে হেসে উঠল মেঘ। ঢাকায় কাটানো দিনগুলোর টুকরো গল্প, কারদার বাড়ির জৌলুস আর খুনসুটির কথা এক এক করে বন্ধুদের কাছে খুলে বলতে লাগল সে। প্রিয় সইয়ের খুশির গল্প শুনে ওরাও বেজায় খুশি আর উত্তেজিত হয়ে উঠল। বন্ধুর খুশিতে কি আর বন্ধুরা খুশি না হয়ে পারে?সব বলতে বলতে হঠাৎ মেঘ গলাটা একটু নামিয়ে বলল,
“তবে জানিস? ওই ড্যাঞ্জারাস আর্মি মেজরটা কিন্তু শেষমেশ আমায় চিনে ফেলেছে রে!”
মেঘের এই বোমা ফাটানো কথা শোনামাত্রই ওরা তিন সই একসাথে আকাশ কাঁপিয়ে চিৎকার দিয়ে উঠল,
“কীহ্!”
ওদের তীব্র যৌথ চিৎকারে মেঘের কানের পর্দায় যেন তালা লেগে যাওয়ার জোগাড় হলো। ফাতিহা আর রাইসা তো ভয়ে তোতলাইতে তোতলাইতে বলেই ফেলল,
“বলিস কী রে? তোকে… তোকে আর্মি অফিসার চিনে ফেলেছে? তোকে মারে টারে নি তো? জেলে পুরে দেয় নি?”
“আরেহ না! মারবে কী রে! আমার কিচ্ছু করেনি!”
মাছি তাড়ানোর মতো করে হাত নাড়িয়ে বেশ একটু ভাব নিয়ে বলল মেঘ।এরপর ঢাকার ছাদের ট্রুথ অর ডেয়ার খেলা, বাগানের সেই তুমুল কাদা-যুদ্ধ আর মেজরের গাল ঘষে দেওয়ার ঘটনাটা একটু লুজ মোশনে বলতেই তিন বান্ধবীর চোয়াল সোজা ঝুলে পড়ল, সবার মুখে হাত!
“বলিস কী রে মেঘালয়া! এত সব ঘটে গেছে এর মাঝে?”
তানিয়া চোখ কপালে তুলে বলল।
“হ্যাঁ!”
মেঘ মাথা নেড়ে সায় দিল।তানিয়া এবার একটু দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজের খাতাটা বুকে চেপে ধরে গদ্গদ গলায় বলল,
“তবে যাই বলিস বোন, তোর ওই মেজর স্যার কিন্তু দেখতে হেব্বি হ্যান্ডসাম! একদম সেই পপুলার চাইনিজ হিরো ইয়াং ইয়াং-এর মতো কিউট আর হট! কী বডি, কী ধারালো চোখ রে মাইরি! দেখলেই তো ক্রাশ খেতে বাধ্য!”
তানিয়ার এমন সহজ আর লালা ঝরানো ভঙ্গির কথা শুনে হুট করেই মেঘের মনের ভেতর কোথাও যেন একটা খটকা লাগল, কেন জানি সে একটুও খুশি হতে পারল না। সে খুব ভালো করেই বুঝতে পারল তানিয়া অবলীলায় শীর্ষর ওপর ফিদা হয়ে গেছে, যাকে বলে এক দেখাতেই ক্রাশের ওপর ক্রাশ! কিন্তু তানিয়ার এই প্রশংসার ব্যাপারটা মেঘের মনের গহীনে কেন জানি বড্ড খচখচ করতে লাগল। নিজের অজান্তেই সে কি মেজরের ওপর একটা অলিখিত অধিকার খাটানো শুরু করে দিয়েছে?
ঠিক তখনই, বান্ধবীদের সাথে এই মান-অভিমানের বিতর্কের মাঝেই মেঘের হাতের সস্তা অ্যান্ড্রয়েড ফোনটা মৃদু কেঁপে উঠল। স্ক্রিনে ভেসে উঠল একটা সম্পূর্ণ অচেনা নম্বর থেকে আসা মেসেজের নোটিফিকেশন।কৌতূহলী হয়ে মেঘ মেসেজটা ইনবক্সে গিয়ে খুলতেই তার চোখ দুটো চড়কগাছ হয়ে গেল। সেখানে অত্যন্ত স্পষ্ট ও রোমান্টিক ভাষায় লেখা রয়েছে,
“তোমার বুক’কে বালিশ বানিয়ে বুকে মাথা রেখে ঘুমাতে বড্ড ইচ্ছে করছে! তোমার ওই গোলাপের পাপড়ির ঠোঁটে চু\মু খাওয়ার শখ জাগছে। বউ, ও বউ!”
মেসেজটা পড়া শেষ হতেই মেঘের ফর্সা কপালে এক মুহূর্তের মধ্যে তীব্র বিরক্তি আর অপমানের রাগের ভাঁজ পড়ে গেল। সাতসকালে কোন লুইচ্চা তাকে এমন নোংরা টেক্সট পাঠানোর সাহস পায়? রাগে পুরো শরীর রি রি করে উঠল তার। সে এক্কেবারে চ্যাৎ চ্যাৎ করতে করতে, দাঁত কিড়মিড় করে নিজের পুরান ঢাকার খাঁটি লোকাল ভাষায় টাইপ করে কড়া এক রিপ্লাই পাঠিয়ে দিল,
“তোর ঘুম তোর পা\ছায় আইক্কালা বাঁশ আকারে ভ\ই’রা দিমু, জাউরা! অচেনা নাম্বারে মাইয়া মাইনষের লগে ফষ্টিনষ্টি বাইর কইরা দিমু। চেনো মোরে? তোরে হা\লা\র পো যেদিন ধরবার পারমু, তোর চল্লিশার খাওন তোরেই খামু বাঁশ গাইরা। হা\লা ধুত্তার চাও কুত্তা!”
মেঘের পাঠানো ওই চরম ড্যাঞ্জারাস আর ঝাঁঝালো রিপ্লাইটা স্ক্রিনে ভেসে উঠতেই বাগানবাড়ির এসি ঘরের সোফায় বসা শীর্ষর মুখটা হাঁ হয়ে গেল। এক সেকেন্ডের জন্য আর্মির মগজ স্তব্ধ! সে নিজের অজান্তেই একটা শুকনো ঢোক গিলে বেশ একটু জোরে শব্দ করেই আওড়ে উঠল,
“আমার কপালে শেষ অবধি এই উড়নচণ্ডী বাগেরহাটের মাইয়াই লিখলা খোদা? ও খোদা, এতো সাধারণ মাইয়া না, এক্কেরে আস্ত আগুনের উল্কা! আমি তো গেছি রে… শীর্ষ তুই শেষ! বাইরের বাঘা বাঘা অপরাধীরা ডরায় তোরে, আর তুই এখন থরথর করে ডরাস তোর ফিউচার ওনারে! কী দিন আইলো তোর মেজরিগিরির!”
শীর্ষ মাথায় হাত দিয়ে একপ্রকার হায় হায় করে উঠল। মেঘের এই মারাত্মক মেসেজটা পড়ার পর তার চোখের সামনে যেন নিজের বৈবাহিক ভবিষ্যৎ সিনেমার মতো স্পষ্ট ভেসে উঠতে লাগল। সে দিব্যচক্ষে দেখতে পেল মেঘ কোমরে হাত দিয়ে ওয়াশরুমের সামনে দাঁড়িয়ে কড়া চোখে কড়া হুকুম দিচ্ছে, আর বাংলাদেশ আর্মির ডাকসাইটে মেজর শীর্ষ কারদার বাথরুমে বসে ভেজা মুখে তাদের বাচ্চার হিসুর কাঁথা আর ল্যাংোট ধুয়ে কাচছে!
সিনেমার রিল যেন আরও একটু এগোল। এবার সে দেখল, পরনে লুঙ্গি আর টি-শার্ট পরে সে সারা ঘর কুঁজো হয়ে ঝাঁট দিচ্ছে আর ঘর মুছছে, আর মেঘ সোফায় পা তুলে বসে বরফি চিবোতে চিবোতে তার দিকে বাঁকা চোখে তাকাচ্ছে। দৃশ্যটা এখানেই শেষ হলো না, শীর্ষ আরও দেখল কোনো একটা সামান্য ভুলের জন্য মেঘ একটা বার্থডে বেলুন নিয়ে চিল-চিৎকার করতে করতে মেজরের পিঠে ধমাধম পেটাচ্ছে আর সে ‘বউ, আর করব না’ বলে প্রাণভয়ে ছুটছে!
“ইন্না লিল্লাহ…”
ভয়ে নিজের কপালে হাত দিয়ে বিড়বিড় করে উঠল শীর্ষ। নিজের এই চরম করুণ ভবিষ্যৎ কল্পনা করে সে একপ্রকার কুঁকড়ে গেল। দেশের আর্মি হয়ে যে শত্রুসেনাদের সামনে বুক চিতিয়ে দাঁড়ায়, সেই বাঘা মেজর কিনা নিজের হাঁটুর বয়সী সতেরো বছরের ওই মেঘকে এখন থেকেই যমের মতো ভয় পেতে শুরু করেছে! ভাবতেও কেমন নিজের মেজরিগিরি ইমেজে চোট লাগছে ওর।
দুপুরের রোদে একটা হুড খোলা রিকশায় চড়ে নীলক্ষেতের দিকে যাচ্ছে কিঞ্জা। সাথে রয়েছে তার বেস্ট ফ্রেন্ড নিশাত। দুজনে টুকটাক পড়াশোনা আর ক্লাসের কথা বলতে বলতে এগোলেও কিঞ্জার ডাগর চোখ দুটো মূলত ঘুরছিল ঢাকার এই ব্যস্ত ও কোলাহলপূর্ণ রাস্তায়। এই যান্ত্রিক ইট-পাথরের খাঁচায় কিঞ্জার মন কিছুতেই টিকতে চায় না। তার অশান্ত মনটা সবসময় টানে কোনো ঝঞ্জাটহীন শান্ত পাহাড়, দিগন্তজোড়া সমুদ্র না হলে কোনো গহীন অরণ্য; যেখানে আধুনিকতার নামে থাকবে না কোনো বিদ্যুতের ছোঁয়া, থাকবে না যান্ত্রিক দূষিত পরিবেশ। শুধু থাকবে নাম না জানা পাখপাখালির মিষ্টি কূজন, আর ও নিজেকে বিলীন করে দেবে প্রকৃতির একদম গভীরে।এসব সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতেই কিঞ্জার ভাবনার সুতো ছিঁড়ে গেল নিশাতের অত্যন্ত উদ্বিগ্ন আর ভয়ার্ত কণ্ঠের আওয়াজে,
“মামা! রিকশা এখানে হুট করে থামালেন কেন? সামনে যান!”
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হাজী মুহম্মদ মুহসীন হলের একদম কাছাকাছি আসতেই রিকশাওয়ালা ব্রেক চেপে থমকে দাঁড়িয়ে গেল, তার পায়ের প্যাডেল ঘোরানোর গতি এক্কেবারে স্তব্ধ। মূলত এই মুহসীন হলের রাস্তাটা টপকে এবং ভিসি চত্বরের পাশ দিয়েই ওদের নীলক্ষেত যাওয়ার শর্টকাট রুট। নিশাত আর কিঞ্জা দুজনেই ঢাকা মেডিকেল কলেজের (ঢামেক) শিক্ষার্থী, তাই এই ভরদুপুরেও দুজনের গায়েই সাদা ধবধবে এপ্রন জড়ানো রয়েছে।
রিকশাচালক পেছনের দিকে ত্যাছড়া চোখে তাকিয়ে হাত নেড়ে বেশ ভয়ার্ত গলায় বলল,
“আর সামনে যাইবার পারতাম না, মা। সামনে ওই বড় দুই গ্যাং হুসাইন আলম আর প্রহর ইবনাতের লোকগো মইধ্যে তুমুল মারামারি আর কোপাকুপি অইতাসে। পরিস্থিতি এক্কেরে গরম! তোমরা জলদি নাইম্মা যাও, আমি উল্টা পথে গাড়ি ঘুরাইয়া যাইগা।”
রিক্সা চালকের এমন কলিজা কাঁপানো কথায় নিশাতের কপালে চিন্তার আর ভয়ের ভাঁজ আরও তীব্র হয়ে উঠল। সে এক সেকেন্ডও সময় নষ্ট না করে চট করে রিকশায় টাকা ছুড়ে দিয়ে কিঞ্জার হাত শক্ত করে ধরে টেনে নামিয়ে নিল। কিন্তু কিঞ্জা? সে তো সাধারণ মেয়েদের মতো ভয় পেয়ে পালাবার পাত্রী নয়! তার চোখের সামনে ক্যাম্পাসের এই প্রকাশ্য দিবালোকে হওয়া রাজনৈতিক মারামারির দৃশ্যটা আসতেই, সে চরম কৌতুহলবশত নিশাতের হাত ছাড়িয়ে উল্টো পা বাড়িয়ে সামনের দিকে এক পা দু পা করে এগোতে লাগল।তাএর এমন পাগলামি দেখে নিশাত পেছনের দিকে ছিটকে গিয়ে চমকে উঠল। চত্বরের ঠিক মাঝখানটায় তখন এক বীভৎস তাণ্ডব চলছে। দুই দলের কয়েকশ লোক রামদা, চাপাতি, ধারালো কাস্তে আর দেশীয় অস্ত্র নিয়ে একে অপরকে কোপাচ্ছে, আর মুহুর্মুহু ককটেল বিস্ফোরণের ‘বাং বাং’ শব্দে পুরো এলাকা ধোঁয়ায় অন্ধকার হয়ে উঠছে।
নিশাত পেছন থেকে গলার রগ ফুলিয়ে চিৎকার করে ডাকল,
“কিঞ্জা! ওখানে যাস না! প্লিজ ফিরে আয়, ওরা তোকে মেরে ফেলবে!”
কিন্তু কৌতুহলের বশে কিঞ্জা যেন তখন এক ঘোরের মধ্যে, সে থামল না। আর ঠিক তখনই, সেই রণক্ষেত্রের মাঝখান থেকে ধেয়ে আসা একটা ভারী কাঠের টুকরো বা কোনো শক্ত ধাতব বস্তু ছিটকে এসে সজোরে আঘাত করল কিঞ্জার কপালে! কপালে সেই ভারী ও শক্ত আঘাতটা লাগার সাথে সাথেই কিঞ্জার মুখ থেকে এক তীব্র ব্যথার আর্তনাদ বেরিয়ে এল,
”আহ!”
মুহূর্তের মধ্যে তার মাথাটা ভোঁ ভোঁ করে ঘুরে উঠল, চারদিকের ধোঁয়াটে পরিবেশটা যেন চোখের সামনে ঝাপসা হয়ে এল। সে যখন ভারসাম্য হারিয়ে পিচঢালা তপ্ত রাস্তার ওপর নিথর হয়ে কাদার মতো ছিটকে পড়ে যেতে নিচ্ছিল, ঠিক তখনই এক অলৌকিক আশীর্বাদের মতো পেছন থেকে তাকে শূন্যেই শক্তপোক্ত এক জোড়া পুরুষালী হাত পরম শক্তিতে আগলে নিল। মাটিতে পড়তে দিল না।
অর্ধচেতন, আধো-আঁধো বুঁজে আসা চোখে কিঞ্জা শুধু এইটুকুই দেখতে পেল তাকে যে শক্ত বুকে জড়িয়ে ধরে রেখেছে, তার মুখ আর মাথায় একটা কালো রুমাল খুব শক্ত করে বাঁধা, কেবল দৃশ্যমান এক জোড়া কুচকুচে কৃষ্ণকালো, তীক্ষ্ণ ও রহস্যময় চোখ! সেই চোখের তীব্র চাহনি যেন এক পলকে কিঞ্জার অবচেতন মনকে ছুঁয়ে গেল। কিন্তু এর বেশি কিছু দেখার বা বোঝার সুযোগ আর তার ভাগ্যে জুটল না, তার চোখের পাতা দুটো এক গভীর অন্ধকারের রাজ্যে তলিয়ে গেল।
ক্লিনিক থেকে কপালে একটা ছোট্ট ব্যান্ডেজ আর প্রাথমিক ট্রিটমেন্ট করিয়ে সবেমাত্র বের হচ্ছে কিঞ্জা আর নিশাত। দুপুরের সেই উত্তাপ এখন অনেকটাই ম্লান, কিন্তু চারপাশের থমথমে ভাবটা কাটেনি। ওরা যখন মেইন রোডের দিকে যাওয়ার উদ্দেশ্যে পা বাড়াবে, ঠিক তখনই পেছন থেকে এক গমগমে, গম্ভীর আর রাশভারী কণ্ঠস্বর ভেসে এল। সেই কণ্ঠের আওয়াজে এমন এক সম্মোহনী শক্তি ছিল যে, যে কেউ থমকে দাঁড়াতে বাধ্য।
“বেখেয়ালে রাস্তায় চলাফেরা করা হতে বিরত থাকুন। যেথায় রাজনৈতিক সংঘাত ঘটিত হচ্ছে, সেথা হতে সবসময় নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখবেন। আজ কপাল ভালো ছিল বিধায় শুধু কপালে সামান্য চোট লেগেছে, অন্যথা পরিস্থিতি আরও মারাত্মক হতে পারত।”
সেই নিখাদ পুরুষালী কণ্ঠ শুনে কিঞ্জা আর নিশাত দুজনেই এক ঝটকায় পেছনে তাকাল। দেখতে পেল, ওদের থেকে প্রায় দশ হাত দূরত্বে একটা মস্ত বড় কৃষ্ণচূড়া গাছের নিচে দাঁড়িয়ে আছে এক বলিষ্ঠ, দীর্ঘকায় ও পেশিবহুল পুরুষ। পরনে কালো শার্টের হাতা কনুই অবধি গোটানো, চোখে চওড়া সানগ্লাস। মুখের সেই কালো রুমালটা এখন গলায় ঝুলছে।
এই সেই পুরুষ—নাম তার প্রহর ইবনাত! যার এক ডাকে পুরো ঢাবি ক্যাম্পাস কাঁপে, আর যে এই মুহূর্তে কিঞ্জা কারদারের মনের গহীন কোণে লুকিয়ে থাকা একমাত্র স্বপ্নের পুরুষ! বয়স তার ত্রিশের কোঠায় এসে থমকেছে। আর কটা মাস মাত্র, তারপর হয়তো জীবনের ক্যালেন্ডারে আরও এক বছর যুক্ত হয়ে একত্রিশে গিয়ে পা রাখবে। কিন্তু এই বয়সেই তার ব্যক্তিত্ব আর তীব্র পুরুষালী গাম্ভীর্য যেন যেকোনো কমবয়সী তরুণীর বুকে ঝড় তোলার জন্য যথেষ্ট।
প্রহরের সেই তীক্ষ্ণ চোখের চাউনি সরাসরি কিঞ্জার ওপর নিবদ্ধ হতেই কিঞ্জার বুকের ভেতর এক অদ্ভুত কম্পন সৃষ্টি হলো। কপালে ব্যান্ডেজের তীব্র ব্যথাটাও যেন এক নিমেষে কর্পূরের মতো উড়ে গেল। সে প্রহরের দিকে সরাসরি অপলক চোখে চেয়ে থেকে, নিজের ওড়নাটা আঙুলে পেঁচিয়ে বেশ একটু চড়া ও স্পষ্ট গলায় বলল,
“নিজের অজান্তে মস্ত বড় বিপদ ডেকে এনেও যদি এমন রাজকীয় স্বপ্নের পুরুষের সান্নিধ্য আর বাহুডোর পাওয়া যায়… তবে এমন বিপদ প্রতিদিন মাথা পেতে নিতেও প্রস্তুত, প্রহর ভাইয়া!”
প্রহরকে উদ্দেশ্য করে এমন দুঃসাহসিক, প্রেমময় আর সোজাসাপ্টা কথা ছুড়ে দিয়ে আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়িয়ে রইল না কিঞ্জা। সে নিজের লজ্জাটুকু আড়াল করতে এক চিলতে রহস্যময় হাসি ফুটিয়ে নিশাতের হাতটা খপ করে ধরল, তারপর দ্রুত পায়ে ওখান থেকে রাজপথের দিকে পাড়ি দিতে শুরু করল। নিশাত তো বান্ধবীর এমন ড্যাঞ্জারাস ডায়ালগ শুনে মুখ হাঁ করে ওর পিছু পিছু ছুটল।
মেজর কারদার পর্ব ৮ (২)
ওদিকে, মাঝরাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা অচেনা, অজানা এক মেডিকেল পড়ুয়া কিশোরীর মুখে নিজের নাম ধরে এমন অদ্ভুত আর সাহসী বাক্য শুনে প্রহর ইবনাতের চওড়া ললাটে এক জোড়া গভীর বিস্ময়ের ভাঁজ পড়ল। সে সানগ্লাসটা নাক থেকে একটু নামিয়ে দূর দিয়ে হেঁটে যাওয়া কিঞ্জার সেই শুভ্র এপ্রন পরা অবয়বটার দিকে তাকিয়ে রইল। কৌতূহল জাগলেও ক্যাম্পাসের শত শত ঝামেলার মাঝে সে আর এই সামান্য বিষয় নিয়ে মাথা ঘামাল না। তবে অলক্ষ্যেই, কিঞ্জার ওই চঞ্চল চোখ জোড়া প্রহর ইবনাতের কঠিন হৃদয়ের কোনো এক কোণে নিজের নামের প্রথম আঁচড়টা কেটে দিয়ে গেল।
