Home যে পাখি মন বোঝে না যে পাখি মন বোঝে না পর্ব ১৭

যে পাখি মন বোঝে না পর্ব ১৭

যে পাখি মন বোঝে না পর্ব ১৭
মুন্নি আক্তার প্রিয়া

ভালোবাসা নামক রোগে আক্রান্ত যেই ব্যক্তি, একমাত্র সে-ই জানে, ভালোবাসা হলো একটা ম’র’ণব্যাধি! আর সেই ম’র’ণব্যাধিই আমকে এখন পেয়ে বসেছে। আমার জীবনটা যে কখন শুধু রাহাত কেন্দ্রিক হয়ে গেছে আমি টেরও পাইনি। হয়তো পেতাম না যদি এরকম দূরত্ব না আসতো আমাদের মধ্যে। মাথার ভেতর হাজারটা প্রশ্ন। নিজেকে শেষ করে দিতে ইচ্ছে করছে।
ভোরের দিকে চোখ লেগে এসেছিল একবার। দুঃস্বপ্ন দেখে ঘুমটা ভেঙে গেছে। ঘুম ভাঙার পর থেকেই আমি রাহাতকে কল করছি, মেসেজ করছি। কিন্তু ফোন তখনো বন্ধ। সে কেন আমার সাথে এমন করছে এই প্রশ্নটাই আমাকে বারবার ভেতর থেকে দুর্বল করে দিচ্ছে।
অদিতি গতকাল থেকে আমার এই অবস্থা দেখলেও কিছু জিজ্ঞেস করেনি। সকালে উঠে পড়তে বসার সময় আগে আমার কাছে এলো। বিছানার একপাশে বসে আমার কাঁধে হাত রেখে বলল,

“সবকিছু কি ঠিক আছে?”
আমি ঝরঝর করে কেঁদে ফেললাম। মুহূর্তেই কান্না করতে করতে আমার হেঁচকি উঠে গেল। আমি ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে বলতে লাগলাম,
“কোনো কিছু ঠিক নেই অদিতি, কোনো কিছু ঠিক নেই। আমি ম’রে যাচ্ছি।”
অদিতি কণ্ঠস্বর নরম করে বলল,
“এভাবে বলে না! কী হয়েছে আমাকে বলো। কান্না থামাও আগে।”
আমি কাঁদতে কাঁদতেই বললাম,
“জানিনা কেন রাহাত আমাকে হঠাৎ ইগনোর করছে।”
“এরকম কেন মনে হলো?”
“হোস্টেলে আসার পর থেকে জাস্ট একবার কথা হয়েছিল। এরপর টোটালি কোনো খবর নেই। অনলাইনে নেই, ফোনও বন্ধ।”
“হতে পারে ব্যস্ত বা ফোনেই কিছু হয়েছে।”
“যদি তা-ই হয় তাহলে যখন বাড়িতে কল করে কথা বলতে পেরেছে তখন আমি কী দোষ করেছি? আমাকে কেন একটা কল করা গেল না?”

“দেখো প্রিয়তা, আমরা একা একা অনেক কিছু ভাবতে পারি। কিন্তু আদৌ কোনটা সত্যি আর কোনটা মিথ্যা আমরা কিন্তু তা জানিনা। শুধু নিজের পার্সপেক্টিভ থেকে কাউকে আসলে জাজ করাটাও উচিত নয়। আমি বুঝতে পারছি, তুমি ভাইয়াকে প্রচণ্ড ভালোবাসো। কিন্তু কাউকে ভালোবাসা মানে নিজেকে হারিয়ে ফেলা নয়। তুমি গতকাল থেকে নিজেকে কষ্ট দিচ্ছ। একটু অপেক্ষা করো, দেখো কী হয়। সে তোমার সাথে যোগাযোগ করে কিনা।”
“আমার কিচ্ছু ভালো লাগছে না! এমনটা তো কখনো হয়নি আগে।”
“তোমাদের মধ্যে কোনো ঝগড়া হয়েছিল?”
“না।”
“তাহলে নিশ্চয়ই কোনো কারণ আছে বা কোনো সমস্যায় আছে। অথবা ব্যস্ত। আমি বলি কি, তুমি একটু অপেক্ষা করো কেমন? এভাবে কান্নাকাটি কোরো না। অসুস্থ হয়ে যাবে। ফ্রেশ হয়ে এখন একটু খেয়ে নাও। গতকাল রাতেও তো কিচ্ছু খাওনি।”
“আমার ক্ষুধা নেই। যতক্ষণ না রাহাতের সাথে আমার কথা হচ্ছে আমি শান্তি পাব না। খাবার গলা দিয়ে নামবে না আমার।”

অদিতি আমাকে হাসানোর জন্য মজার ছলে বলল,
“হুম, কঠিন প্রেম!”
তবে সত্যি বলতে আমার একটুও হাসি পেল না। বরং এখনো অস্থিরতায় বুকের ভেতরটায় অসম্ভব ব্যথা করছে।
আমি একটু একটু করে নিজেকে আবার হারিয়ে ফেলছিলাম। ক্লাসেও যাচ্ছি না। খাওয়া-দাওয়ারও কোনো ঠিক নেই। রাহাতেরও কোনো খবর নেই।
দুদিন পর হঠাৎ ভোরে সকালে রাহাতের মেসেজ এলো হোয়াটসঅ্যাপে। আমার অসংখ্য, অগণিত মেসেজের উত্তর এলো,
“সরি বউ! ফোনে সমস্যা হয়েছিল আর ব্যস্তও ছিলাম তাই যোগাযোগ করতে পারিনি।”
আমার চোখ ভরে গেল জলে। আমি লিখলাম,

“এজন্য একটা ছোট্ট মেসেজও না?”
এরপর আর কোনো উত্তর নেই। আমি ফোন দিচ্ছি, কল যাচ্ছে কিন্তু রিসিভ করছে না। মেসেজও ডেলিভার হচ্ছে কিন্তু কোনো রেসপন্স নেই।
আমার এবার রাগে-জিদ্দে, অভিমানে কান্না পাচ্ছে। ফোন নিয়ে কতক্ষণ স্তব্ধ হয়ে বসে ছিলাম আমি জানি না। তবে অনেকক্ষণ পর রাহাতের নাম্বার থেকে কল এলো। আমি উদভ্রান্তের মতো কল রিসিভ করতেই ঐপাশ থেকে রাহাত বলল,
“রেডি হয়ে নিচে নামো।”

আমি আর কোনো প্রশ্ন করলাম না। রেডি বলতে শুধু বাসায় পরার জামা-কাপড়গুলো চেঞ্জ করেছি। নিচে নেমে দেখি রাহাত আসেনি। আমি মেইন গেইটের বাইরে বের হয়েও খুঁজলাম, সে নেই। এরপর তাকে কল দিলাম। রিং হচ্ছে কিন্তু রিসিভ করছে না। তার সমস্যাটা কী আমি সেটাই বুঝতে পারছি না। কী চাচ্ছে, কেন এমন করছে কিছুই বুঝতেও দিচ্ছে না। বারবার আমাকে কনফিউজড করে দিচ্ছে, কষ্ট দিচ্ছে।
আমি তবুও ফোন হাতে ঠায় দাঁড়িয়ে রইলাম। কিছুক্ষণ পর দেখলাম চেনা সেই গাড়িটা এদিকেই এগিয়ে আসছে। আমার সামনে এসে গাড়ি থামিয়ে রাহাত নামল। আমাকে দুর্বল করা হাসিটা দিয়ে জিজ্ঞেস করল,
“কেমন আছো প্রিয়?”
আমি তৎক্ষনাৎ কোনো কথা বলতে পারলাম না। বাচ্চাদের মতো ঠোঁট উল্টে যাচ্ছে অভিমানে। চোখে পানি এসে জড়ো হয়েছে। রাহাত তা বুঝতে পেরে ওখানে আর কথা বাড়াল না। গাড়ির দরজা খুলে দিল। শান্ত কণ্ঠে বলল,

“ওঠো।”
আমি টলমলে চোখে গাড়িতে উঠে বসলাম। সেও ড্রাইভিং সিটে বসে গাড়ি স্টার্ট দিল। আমার দুহাত তখন আমার কোলের ওপর। আচমকা সে আমার হাতের ওপর হাত রেখে বলল,
“সরি!”
আমি তার দিকে তাকাতেই সেও একবার আমার দিকে তাকাল। তার দৃষ্টিতে অনুশোচনা। আমি এবার কেঁদে ফেললাম। কাঁদতে কাঁদতে জিজ্ঞেস করলাম,
“আপনি কেন এমনটা করলেন আমার সাথে?”
তিনি এবার ফোনটা দেখিয়ে বললেন,
“এই দেখো আমার নতুন ফোন। আগেরটার ডিসপ্লে নষ্ট হয়ে গেছে। কাজের জন্য এত ব্যস্ত ছিলাম যে যোগাযোগই করতে পারিনি।”

“একটা মানুষ কখনো এতটাও ব্যস্ত থাকে না যে তার কাছে ২৪ ঘন্টায় ২৪ সেকেন্ড সময় হয় না একটা কল করার কিংবা মেসেজ করার। এসব ডিপেন্ড করে প্রায়োরিটির ওপর। আপনার কাছে আসলে আমার কোনো প্রায়োরিটি, ভালোবাসা, ভ্যালু কিচ্ছু নেই। আপনার মন ভরে গেছে আমার ওপর। তাই এখন আর ভালো লাগছে না বলেই ইগনোর করছেন।”
এটুকু বলে আমি একটু থামলাম। দম বন্ধ হয়ে আসছে আমার। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে বললাম,
“আমাকে আর ভালো না লাগলে, ছেড়ে দিতে ইচ্ছে করলে সরাসরি বলে দেবেন। আপনার জীবন থেকে আমি চলে যাব। তবুও দয়া করে এভাবে অবহেলা করবেন না প্লিজ! আমি সহ্য করতে পারি না।”
কথা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই রাহাত রাস্তার এক সাইড করে গাড়ি থামাল। কোনো কিছু বলার বা বোঝার আগেই তৎক্ষনাৎ সময় নিয়ে লম্বা চুমু খেল আমার ঠোঁটে।আমি নিজেকে ছাড়ানোর জন্য জোড়াজুড়ি করে, এক পর্যায়ে শান্ত হয়ে গিয়েছি। আশ্চর্যজনকভাবে আমার কান্নাও থেমে গেল। কিছুক্ষণ পর তিনি আমাকে ছেড়ে দিয়ে গাল ধরে বলল,
“ছেড়ে দেবো মানে কী? ছেড়ে দেওয়ার জন্য কি হাত ধরেছি? বিয়ে করেছি?”
আমি নিশ্চুপ। তিনি বললেন,

“আমি আমার ভুল বুঝতে পেরেছি, প্রিয়। আসলে তখন কাজের প্রেশারে বিষয়টা এত জোড়ালোভাবে মাথায় নিইনি। ভেবেছিলাম, ঢাকায় ফিরে তোমাকে সব বুঝিয়ে বলব। কিন্তু তুমি যে এত কষ্ট পাবে আমি সত্যিই বুঝতে পারিনি, জান। এবারের মতো মাফ করে দাও প্লিজ! আর কখনো এমন করব না প্রমিজ। আর একটা সুযোগ দাও।”
আমি এবারও কোনো কথা বললাম না। তিনি অনুনয় করে বললেন,
“প্লিজ! ভালোবাসি তো।”
আমি রাগ দেখিয়ে বললাম,
“আমি বাসি না।”
তিনি হেসে বললেন,

“আচ্ছা সমস্যা নেই। আমাকে ভালোবাসতে দিও তাহলেই হবে।”
একটু থেমে ঠোঁটে দুষ্টু হাসি ঝুলিয়ে এখন আমার দিকে তাকিয়ে আছে। আমি ভ্রু কুঁচকে বললাম,
“কী দেখছেন?”
“তুমি কি একটা জিনিস লক্ষ করেছ?”
“কী?”
“চুমু দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তোমার কান্না থেমে গেছে।”
আমি এবার একটু লজ্জা পেয়ে গেলাম। দৃষ্টি সরিয়ে বললাম,
“আশ্চর্য! আপনি এজন্য চুমু দিয়েছেন!”
“কী করব বলো! তোমার ঐ চোখে যে পানি মানায় না।”
“নাটক করবেন না একদম। এতই যদি ভাবতেন আমায় নিয়ে তাহলে কখনো আমাকে এভাবে কষ্ট দিতে পারতেন না।”

“সরি বলছি তো! তুমি দেখে নিও এরপর আর কখনো এই ভুল হবে না।”
“দেখা যাবে!”
“একটা কথা বলি?”
“হু।”
“দেখো, আমি কখনো কোনো সম্পর্কে জড়াইনি। মেয়েদেরও হয়তো এত ভালো বুঝি না। তাই তোমার অনেক খারাপ লাগাও হয়তো বুঝতে পারি না। কিন্তু বিশ্বাস করো জান, আমি ইচ্ছে করে তোমাকে কষ্ট দিতে চাই না। যেই পাখিটাকে আমি ছোটো থেকে দূর থেকেই আগলে রেখেছি, সেই পাখিটাকে আমি কীভাবে কষ্ট দেবো বলো? এই পাখিটার মধ্যেই তো আমার প্রাণ আছে।”
এরপর তিনি খুব কাতর হয়ে আমার হাত ধরে বললেন,
“আমি ভুল করলে আমাকে শাস্তি দিও, শুধরে দিও তবুও কখনো ছেড়ে যাওয়ার কথা বোলো না প্লিজ! আমি সহ্য করতে পারি না।”

আমি মুখে কিছু বললাম না। আসলে বলতে পারলাম না। তার হাতটা কেবল শক্ত করে ধরলাম। বুকের ভেতরটায় ব্যথা করছে। আমি যে তাকে অসম্ভব ভালোবাসি এটা সে জানে, কিন্তু সে যতটা জানে, আমি তাকে এরচেয়েও বেশি ভালোবাসি। তাই ছেড়ে যাওয়ার কথা বলার সময় আমার যে কেমন মৃ’ত্যুসম কষ্ট অনুভব হচ্ছিল তা কেবল আমি-ই জানি।
আমার নীরবতার মাঝে তিনি প্রশ্ন করলেন,
“আমায় কখনো ছেড়ে যাবে না তো, প্রিয়?”
আমি তার চোখের দিকে তাকিয়ে, মৃদু হেসে বললাম,
“কখনো না।”
তিনি সেই মুগ্ধ করা হাসিটা দিয়ে আমার হাতের উলটো পিঠে চুমু খেলেন। আমি লজ্জা এড়িয়ে যেতে মেকি রাগ দেখিয়ে বললাম,

“আপনি তখন আমাকে ফোন দিয়ে বললেন নিচে নামতে। অথচ নেমে দেখি আপনিই নেই। আমি তো ভেবেছিলাম…”
“কী ভেবেছিলে? মজা করছি? আসব না?”
এরপর তিনিই বললেন,
“ওয়েট।”

যে পাখি মন বোঝে না পর্ব ১৬

এরপর হাত বাড়িয়ে গাড়ির ব্যাকসিট থেকে লাল গোলাপ ও সাদা অর্কিড দিয়ে বানানো সুন্দর একটা ফুলের তোড়া এনে আমার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললেন,
“আমার ফুলের জন্য ফুল আনতে গিয়ে দেরি হয়ে গেছিল।”

যে পাখি মন বোঝে না পর্ব ১৮

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here