Home যে পাখি মন বোঝে না যে পাখি মন বোঝে না পর্ব ১৮

যে পাখি মন বোঝে না পর্ব ১৮

যে পাখি মন বোঝে না পর্ব ১৮
মুন্নি আক্তার প্রিয়া

কথায় আছে, সব ভালো যার, শেষ ভালো তার। অথচ আমার জীবনের গল্পটা যেন ঠিক তার উল্টো। না, আমার সবকিছু ভালো যাচ্ছে, আর না শেষটাও ভালো হচ্ছে। যখনই জীবনের আকাশে একটু সুখের রোদ উঁকি দেয়, তখনই দুঃখ যেন সেই আলোটুকু মুছে দেওয়ার জন্য ব্যস্ত হয়ে ওঠে। মনে হয়, সুখের দেখা পাওয়াটাই বুঝি আমার জীবনের সবচেয়ে বড়ো অপরাধ।
শুক্রবার রাহাতের সঙ্গে দেখা করতে গিয়ে জানলাম, তার চট্টগ্রামে পোস্টিং হয়ে গেছে। এখন থেকে সে ওখানেই থাকবে।

খবরটা শোনার পর থেকেই বুকের ভেতরটা কেমন ফাঁকা ফাঁকা লাগছিল। বারবার মনে হচ্ছিল, কেউ যেন আমার বুকের ওপর ভারী কোনো পাথর চাপিয়ে দিয়েছে। দম নিতে কষ্ট হচ্ছিল। এখন থেকে আর চাইলেই যখন-তখন তার কাছে ছুটে যেতে পারব না। ইচ্ছে করলেই তাকে দেখতে পারব না, তার হাতটা ধরে বসে থাকতে পারব না, এমনকি অভিমান করে তার বুকের ভেতর মুখ লুকিয়েও থাকতে পারব না।
তাকে ছুঁতে পারব না, এই ভাবনাটাই যেন আমাকে ভেতর থেকে শেষ করে দিচ্ছিল। আমি বাঁধভাঙা কান্নায় ভেঙে পড়েছিলাম। আর তিনি আমাকে নিঃশব্দে বুকে জড়িয়ে ধরে রেখেছিলেন অনেকক্ষণ। তার বুকের ভেতর মুখ লুকিয়ে তখন মনে হচ্ছিল, পৃথিবীতে এর চেয়ে নিরাপদ কোনো জায়গা হয়তো নেই। অথচ আমার সেই নিরাপদ জায়গাটাই এখন আমার থেকে এত দূরে চলে যাবে!
কিন্তু এই যে আমার শান্তির জায়গাটা, কোথায় পাব আমি? মন খারাপ হলেই কে আমাকে এভাবে বুকে জড়িয়ে নেবে? কে আমার কান্না থামানোর চেষ্টা করবে? কে আমাকে এভাবে আগলে রাখবে?
গত পাঁচটা দিন আমার কীভাবে কেটেছে, আমি জানি না। সময়গুলো কেবল ঘড়ির কাঁটায় এগিয়েছে, অথচ আমার কাছে প্রতিটি মুহূর্ত যেন দীর্ঘ একেকটা বিষণ্ণ প্রহর। সবসময়ই মন খারাপ থাকত। যখনই মনে হতো, রাহাত আমার থেকে অনেক দূরে চলে যাবে, তখনই বুকের ভেতরটা হু হু করে উঠত। চোখের কোণে কখন পানি এসে জমত, টেরই পেতাম না।

আজ ফাইনালি সেই যন্ত্রণাময় দিনটি চলে এসেছে।তিনি আমাকে রেখে চলে যাবেন। আমার এমনই দুঃখের কপাল যে, তাকে বিদায় দিতেও আমি যেতে পারব না। কারণ চাচ্চু আর চাচিমনি তাকে এগিয়ে দিতে যাবে। আমার অদৃশ্য অধিকার তো সেখানে চলবে না। আমাদের সম্পর্কের যে নাম এখনো পৃথিবীর কাছে উচ্চারিত হয়নি, সেই সম্পর্কের দাবি নিয়ে আমি কীভাবে সেখানে দাঁড়াব? এ যে কেমন যাতনা!
তিনি সকালে বের হওয়ার আগে আমাকে ভিডিয়ো কল দিয়েছিলেন। কান্নার জন্য আমি ঠিকমতো কথাই বলতে পারিনি। তার চোখও লাল ছিল। চোখের কোণে টলমল করছিল অশ্রু। তিনি পুরুষ, তাই হয়তো চাইলেও আমার মতো হাপুস নয়নে কাঁদতে পারেননি। বুকের ভেতর জমে থাকা কষ্টটুকু চোখে লুকিয়ে রেখে খুব আদর করে শুধু বলেছিলেন,

“কান্নাকাটি কোরো না, প্রিয়। তোমার চোখে পানি দেখলে আমার কষ্ট হয়, জানো না?”
আমি কাঁদতে কাঁদতে বললাম,
“কী করে থাকব আমি আপনাকে ছাড়া? আমার দম যে আটকে আসবে। কেন আমাকে রেখে চলে যাচ্ছেন?”
“কী করব বলো? কাজ তো করতে হবে। তুমি চিন্তা কোরো না। আমি ওখানে গিয়ে আগে সবকিছু গুছিয়ে নিই, তারপর তোমাকেও নিয়ে যাব।”
“একেবারের জন্য?”
তিনি মৃদু হেসে বললেন,
“পাগলি! একেবারের জন্য এখন কীভাবে নেব? তোমার কলেজ আছে না? এইচএসসি দাও আগে। তারপর ধুমধাম করে বিয়ে করে একেবারে আমার কাছে নিয়ে আসব।”
“প্রমিস?”
“প্রমিস, জান। এখন একটু হাসো তো।”

কী অদ্ভুত মানুষ তিনি! আমার চোখের পানি থামাতে গিয়ে এমন একটা কথা বললেন, অথচ সেই কথাটাই যেন আমার কান্না আরও বাড়িয়ে দিল। আমি কাঁদতে কাঁদতে বললাম,
“যাওয়ার আগে একটাবার আপনাকে জড়িয়েও ধরতে পারলাম না। এত আফসোস আমি কোথায় রাখব?”
“জমিয়ে রাখো। সময় এলে সব আফসোস মিটিয়ে দেবো। আমার যে কতটা খারাপ লাগছে, আমি কাকে বোঝাব বলো?”
শেষ সময়ে কল রাখার আগে তার কণ্ঠটা কেমন যেন ভেঙে এলো। খুব ধীরে, খুব মায়া মাখানো গলায় বললেন,
“আমার প্রিয়কে ভালো রেখো। যত্নে রেখো। যখন দেখা হবে, তখন যেন একদম ফিটফাট দেখি। আর…”
কথাটা শেষ না করে একটু থামলেন। তারপর ফোনের ওপাশ থেকেই খুব নরম করে একটা চুমু দিয়ে বললেন,
“আমার প্রিয়কে বড্ড বেশি ভালোবাসি।”
আমি কাঁদতে কাঁদতেই হেসে ফেললাম। চোখের পানি গড়িয়ে পড়ছিল গাল বেয়ে।বললাম,
“আপনার প্রিয়ও আপনাকে অনেক বেশি ভালোবাসে, অনেক বেশি!”

রাহাত চট্টগ্রাম পৌঁছেই সবার আগে আমাকে টেক্সট দিল।
আমি তখন হোস্টেলের বারান্দায় বসে ছিলাম। বিকেলের বাতাসটা চুল এলোমেলো করে দিচ্ছিল। অথচ আমার মনটা তখনও পড়ে ছিল সেই বিদায়ের মুহূর্তটায়। খুব আনমনে ফোনটা হাতে নিয়েছিলাম। স্ক্রিনে তার মেসেজটা ভেসে উঠতেই বুকের ভেতরটা কেমন যেন হালকা হয়ে গেল। তিনি লিখেছেন,
“মিস ইউ বউ।”

মাত্র তিনটি শব্দ। খুব ছোট্ট, খুব স্বাভাবিক একটা মেসেজ। অথচ ভালোবাসার মানুষটার কাছ থেকে আসা কয়েকটা শব্দও যে কখনো কখনো পুরো একটা পৃথিবীর সমান হয়ে যায়, সেটা বোধ হয় ভালো না বাসলে বোঝা যায় না। মনে হয়, ওই ছোট্ট মেসেজটার মধ্যেই জাদু মিশে আছে। মন ভালো করে দেওয়ার মতো জাদু। ভালোবাসা যে কী অদ্ভুত এক সম্মোহন, তা বোধ করি রাহাতকে ভালো না বাসলে কখনোই বুঝতে পারতাম না। এতটা উদগ্রীব হয়ে, এতটা উন্মাদের মতোও বুঝি একজন মানুষকে ভালোবাসা যায়!
নতুন জায়গায় গিয়ে রাহাত এখন আগের চেয়ে অনেকটাই ব্যস্ত। আমাদের কথা হয় খুব কম। তবুও তিনবেলা সময় করে সে আমার সমস্ত খোঁজখবর নেয়। রাতে অফিস শেষ করে বাড়িতে ফিরে ক্লান্ত শরীরটাকে একটু বিশ্রাম দেওয়ার আগেই সবার আগে আমাকে কল করবে। এরপর জানতে চাইবে,
“আজ সারাদিন কী কী করলে, বলো?”

আর আমি তখন তোতাপাখির মতো কথা বলতে থাকি। ডানা ঝাপটাতে থাকি খুশি মনে। সারাদিনের ছোটোখাটো, খুঁটিনাটি সব ঘটনা একে একে তাকে বলি। কোনটা কতটা গুরুত্বপূর্ণ, তার কোনো হিসাব থাকে না। একটা চুল উড়ে কোথায় পড়েছে, দুপুরে কী খেয়েছি, কার সঙ্গে কী কথা হয়েছে সব! সেও তখন মুগ্ধ শ্রোতা হয়ে আমার কথা শোনে। আমি মাঝে মাঝে অবাক হয়ে তাকে দেখি। এত বকবক করার পরও তার মধ্যে বিন্দুমাত্র বিরক্তির ছাপ দেখি না। বরং মনে হয়, আমার এই অবিরাম কথাগুলোই বুঝি তার সারা দিনের ক্লান্তি ভুলিয়ে দেয়।
কখনো কখনো এমনও হয়, কথা বলতে বলতেই সে ঘুমিয়ে যায়। আমি তখন আর ডাকি না। চুপচাপ ফোনটা পাশে রেখে তাকে দেখি। তার ঘুমন্ত মুখটার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে কখন যে রাত গভীর হয়ে যায়, টেরই পাই না। একদিন এমনও হয়েছে, ভোর পর্যন্ত না ঘুমিয়ে আমি শুধু তাকেই দেখেছি। সে ঘুম থেকে উঠে আমাকে জেগে থাকতে দেখে অবাক হয়ে গিয়েছিল। চোখ কচলাতে কচলাতে বলেছিল,

“তুমি আমার পাগল বউ!”
আসলেই তাই। পাগল না হলে কি আর কেউ এমন পাগলামি করে? হোক, তা না হয় হলাম তার জন্য পাগল। এক জীবনে একটা মানুষকে ভালোবেসে যদি পাগলই না হতে পারলাম, তবে সেই ভালোবাসার মানে কী? কিন্তু দুঃখজনক বিষয় হচ্ছে, সে দূরে চলে যাওয়ার পর আমার পাগলামি যেমন দিনদিন বাড়ছিল, সেই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে যেন তার কাজের ব্যস্ততাও বাড়ছিল।
প্রথম প্রথম যে মানুষটা আমার একটু অভিমানও সহ্য করতে পারত না, ধীরে ধীরে তার মধ্যেই যেন অদৃশ্য কোনো পরিবর্তন আসছিল। একটু একটু করে তা লক্ষ করছিলাম। প্রায়ই দেখতাম, তার মেজাজ খিটখিটে হয়ে থাকে। কখনো রাগ করে কলও ধরত না। অনেকবার ইচ্ছে করে, আবার কখনো অনিচ্ছাতেও আমাকে হার্ট করেছে। আর আমি? কেঁদেকেটে বুক ভাসানোর পর যখন সে ফিরে এসে ‘সরি’ বলেছে, তখনই সব অভিমান কোথায় যেন গলে গেছে। কী করব? ভালোবাসি যে! তাই তাকে বোঝার চেষ্টা করি। তার ব্যস্ততা বোঝার চেষ্টা করি। তার ক্লান্তি বোঝার চেষ্টা করি। বিশেষ করে সে যখন অনুনয়ের সুরে বলে,
“ক্ষমা করে দাও, প্রিয়। বুঝোই তো, কত কাজের প্রেশারে থাকি এখন। এখানে আসার পর থেকেই কাজের ব্যস্ততা বেড়ে গেছে। তুমি যদি আমাকে না বোঝো, তাহলে কে বুঝবে বলো? আর তুমি এভাবে কাঁদবে না, প্লিজ! আমার প্রিয় না অনেক স্ট্রং?”

এই ‘স্ট্রং’ সেজে থাকার চক্করে পড়ে কত কিছু যে হজম করে যাই, তার হিসাব নেই। ভেতরে ভেতরে শেষ হয়ে গেলেও মুখ ফুটে কিছু বলতে পারি না। কিন্তু সব সহ্য করতে পারলেও এই দূরত্বটা আর সহ্য করতে পারছিলাম না। তারমধ্যে তার অহেতুক ব্যস্ততা, কাজের বাহানা, কখনো কখনো ঠিকমতো যোগাযোগ না রাখা। দেখা করার কথা বললেই শুনতে হয়, ‘অপেক্ষা করো, আর কয়েকটা দিন।’ সেই ‘আর কয়েকটা দিন’ কেমন করে যেন দিন থেকে সপ্তাহ, সপ্তাহ থেকে মাস হয়ে গেল। এভাবে অপেক্ষা করতে করতে আজ তিনটা মাস হয়ে গেছে। আমার এখন শুধু পাগল হওয়া বাকি। আমি যে তাকে না দেখে, তার সঙ্গে কথা না বলে থাকতে পারি না, অথচ সে কীভাবে পারে? তার কি আমাকে একটুও দেখতে ইচ্ছে করে না? কখনো কি তারও বুকের ভেতরটা হাহাকার করে ওঠে না?
আমার দিনকাল কাটে এখন বি’ষের মতো। কোনো কিছুতেই মন বসে না। না কাউকে সহ্য হয়, আর না কারও সঙ্গে কথা বলতে ভালো লাগে। চারপাশে এত মানুষ, এত পরিচিত মুখ, তবুও নিজেকে কেমন নিঃসঙ্গ মনে হয়। পড়াশোনাও ঠিকঠাকমতো হচ্ছিল না। আমি কেমন যেন একা হয়ে যাচ্ছিলাম সবার থেকে, সবকিছু থেকে। এমনকি নিজের কাছ থেকেও।

বই নিয়ে চুপচাপ বিছানায় বসে ছিলাম। বইয়ের পাতায় চোখ ছিল ঠিকই, কিন্তু মনটা ছিল অন্য কোথাও। এমন সময় দেখলাম, অদিতি বড়ো একটা ব্যাগে অনেক কিছু নিয়ে রুমে ঢুকেছে। বেচারি এত কিছু একসঙ্গে নিয়ে এসেছে যে, হাঁপিয়েও গেছে দেখলাম। জিজ্ঞেস করলাম,
“এত কী নিয়ে এসেছ?”
অদিতি ঢকঢক করে পানি পান করে বলল,
“আর বোলো না! অনেক কিছু এনেছি। কেক বানাব। আমার বেস্টফ্রেন্ডের জন্মদিন আগামীকাল।”
“বাহ্! তুমি কেক বানাতে পারো?”
অদিতি মুচকি হেসে বলল,
“হ্যাঁ।”
একটু থেমে হঠাৎ উৎসাহিত হয়ে জিজ্ঞেস করল,

“এই, তোমার বার্থডে কবে?”
“আগামী সপ্তাহে। ৫ তারিখ।”
অদিতির চোখমুখ সঙ্গে সঙ্গে আনন্দে ঝলমল করে উঠল।
“সত্যিই? যাও, তোমার বার্থডে কেক আমি বানাব। একসাথে সেলিব্রেট করব।”
কিন্তু পরক্ষণেই যেন নিজের কথাটাই মনে পড়ে গেল। উৎসাহে হঠাৎ ভাঁটা পড়ে মনঃক্ষুণ্ণ গলায় বলল,
“ওহহো! তুমি তো আবার নিশ্চয়ই ভাইয়ার সঙ্গে সেলিব্রেট করবে।”
আমার বুকের ভেতর থেকে অজান্তেই একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো। ঠোঁটে মেকি হাসি এনে বললাম,
“আর বার্থডে সেলিব্রেট! সে হয়তো আসতে পারবে না।”
“কেন?”
“তখন তো তার ছুটি নেই। তবে চেষ্টা করবে বলেছে। যদিও জানি, না আসার সম্ভাবনাই বেশি।”
অদিতি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে মাথা নাড়ল। বলল,
“হুম, বুঝতে পেরেছি! তাহলে এক কাজ করো। তুমিই ভাইয়ার কাছে চলে যাও ঐদিন।”
আমি বিস্মিত হয়ে তাকিয়ে বললাম,

“কী বলো!”
“ঠিকই বলছি। তুমি গিয়ে তাকে সারপ্রাইজ দাও।”
“বার্থডে আমার, আর সারপ্রাইজও দেবো আমি?”
“হ্যাঁ, এবার না হয় ভিন্ন কিছু হলো। তুমি তো ভাইয়ার অ্যাড্রেস জানোই।”
“এক্স্যাক্ট লোকেশন জানি না তো!”
“তোমার এক কোন বান্ধবী যেন আছে? ওর ভাইয়া পুলিশ, বলছিলে।”
“হ্যাঁ, সায়রা। ওহহো! ওর বাড়িও তো চট্টগ্রামে!”
“তাহলে তো আরও ভালো হলো। ওর ভাইয়াকে বলে তোমার হাজবেন্ডের নাম্বার ট্রেস করাবে। তারপর চলে যাবে সহজেই।”

অদিতির কথাটা শুনে আমার ভেতরে যেন হঠাৎ আলো জ্বলে উঠল। রাহাতকে সারপ্রাইজ দেব! এই ভাবনাটাই বুকের ভেতর আনন্দের ছোটাছুটি শুরু করে দিল। আইডিয়াটাও আমার ভীষণ পছন্দ হলো। কিন্তু একা একা যেতে আবার সাহসও হচ্ছিল না। তাই অদিতিকে বললাম,
“তুমি যাবে আমার সঙ্গে?”
অদিতি আফসোস নিয়ে বলল,
“যেতে পারলে অবশ্যই যেতাম, পাখি। কিন্তু ছয় তারিখ থেকে আমার পরীক্ষা আছে।”
“ওহ!”
“তবে কোনো হেল্প লাগলে আমাকে বোলো।”

আমি একটু অসহায় গলায় বললাম,
“আমি কীভাবে যাব!”
“এয়ারে করে যাও। আমার কাজিন এয়ারপোর্টে জব করে। তোমাকে প্লেন অবধি পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করবে। তুমি কোনো চিন্তা কোরো না।”
আমার বুকের ভেতরটা তখন ধুকপুক করছিল। সঙ্কোচ নিয়ে বললাম,
“তাহলে কি আমি সত্যিই যাব?”
অদিতি মুচকি হেসে বলল,
“উমম… যদি তোমার প্রাণের স্বামীকে দেখতে চাও, তাহলে অবশ্যই যাওয়া উচিত।”
“চাই, চাই! ভীষণ চাই!”
অদিতি উঠে এসে আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিল। তারপর মায়াভরা গলায় বলল,
“ভাইয়া যে কত ভাগ্য করে তোমার মতো একটা মেয়েকে পেয়েছে, তা বোধ হয় সে নিজেও জানে না, প্রিয়তা! কখনো তার সঙ্গে দেখা হলে একটা কথা জিজ্ঞেস করব।”

“কী কথা?”
“এই যে, এটাই। জীবনে কী এমন পুণ্য করেছিল, যার বিনিময়ে আল্লাহ্ তোমাকে দিয়েছিলেন তার জীবনে।”
আমি অনেকদিন বাদে মন থেকেই হেসে ফেললাম। হাসিটা যেন অনেকদিন পর আমার ঠোঁটের পথ চিনে ফিরে এসেছিল। তবে এই হাসিটা বোধ হয় প্রশংসার নয়; আনন্দের। রাহাতের কাছে যাওয়ার আনন্দের!
রাতেই আমি সায়রাকে কল করে বিষয়টা জানালাম। সায়রা তখন আমাকে আরও একটু খুশি করে জানাল, ওর নিজেরও অনেকদিন বাড়ি যাওয়া হয় না। আমি যাব বিধায় এখন আমার সঙ্গে যাবে। একটা সঙ্গী পাব এইটুকুতেই যেন আমার আনন্দের আরেকটা কারণ জুটে গেল। এবার আমি আরও খুশিতে নাচতে লাগলাম। মনে হচ্ছিল, প্রতিটি মুহূর্ত যেন আমাকে ধীরে ধীরে রাহাতের কাছে নিয়ে যাচ্ছে। সেই সঙ্গে সময় গুনতে লাগলাম।শপিং করছিলাম, নিজের যত্ন নিচ্ছিলাম আর নামাজ পড়ে দোয়া করছিলাম, সবকিছু যেন শেষ পর্যন্ত ঠিকঠাক থাকে।
রাহাতও একদিন বলল,

“তোমাকে অনেকদিন পর এরকম হাসিখুশি দেখছি। সবসময় এভাবে হাসো না কেন বলো তো?”
“আপনার ভালো লাগছে?”
“ভীষণ! আমি তো এটাই চাই, আমার প্রিয় চঞ্চল পাখির মতো হেসেখেলে উড়ে বেড়াক।”
আমি মৃদু হেসে বললাম,
“হুম, আপনার বুকেই উড়তে চাই। বেশিদূরে না।”
“আমি পাগলি, জান, সোনা বউ। অনেক অনেক বেশি ভালোবাসি আমার জানটাকে।”

সবকিছু হঠাৎ করে আবার ভালো হতে লাগল। মনে হচ্ছিল, এতদিনের মন খারাপ, অভিমান, অপেক্ষা সবকিছুর ওপর দিয়ে যেন আবার একটু একটু করে সুখের আলো পড়ছে। জন্মদিনে নতুন কোন জামা কিনব, সেটাও জিজ্ঞেস করল সে। আমি বলেছি, আপাতত কিছু কিনব না। কিন্তু তার জেদ অবশ্যই বার্থডে সুন্দরভাবে সেলিব্রেট করতে হবে। সে থাকুক বা না থাকুক! অথচ সে তো জানে না, আমি তার ইচ্ছের চেয়েও সুন্দরভাবে বার্থডে সেলিব্রেট করব এবার।
সকাল থেকে রাত, আবার রাত থেকে সকাল করে করে আমার অপেক্ষার প্রহর ফুরাল। গতকাল রাতেই অদিতি ওর কাজিনকে দিয়ে অনলাইনে আমার আর সায়রার এয়ার টিকিট কেটে রেখেছে। সকালের ফ্লাইটেই আমরা চট্টগ্রাম যাচ্ছি। গন্তব্যের নাম শুধু চট্টগ্রাম নয়। আমার কাছে চট্টগ্রাম মানে এখন আমার ভালোবাসা। আমার অপেক্ষা। আমার স্বপ্ন। আমার রাহাত। চোখ বন্ধ করলেই তার মুখটা দেখতে পাচ্ছি। সেই মুগ্ধ করা হাসিটা দেখতে পাচ্ছি। মনে হচ্ছে, চোখ বন্ধ করলেই যেন তার গায়ের পরিচিত ঘ্রাণটুকুও অনুভব করতে পারছি। আর কতক্ষণ? আর কতটা পথ? অপেক্ষা করছি সেই সময়টার, যখন আবার তার সামনে দাঁড়াব। অপেক্ষা করছি সেই শান্তির জায়গাটার জন্য, যেখানে তার বুকের নিরাপদ আশ্রয়ে মাথা রেখে পৃথিবীর সমস্ত ক্লান্তি ভুলে যেতে পারব। তার বুকের ভেতর মাথা ঠেকানোর সেই স্বর্গীয় সুখের জন্য অপেক্ষা করছি। আর কিছু সময়…শুধু আর কিছু সময়…

প্রীতি এরপরের পেইজগুলো খুব আলতো হাতে উলটাতে লাগল। যেন একটু বেশি জোরে স্পর্শ করলেই বহু বছরের পুরনো স্মৃতিগুলোও কাগজের সঙ্গে ঝরে পড়বে। কারণ বেশি জোর দিয়ে ধরলে ডায়ারির পেইজগুলো খুলে খুলে পড়ে যায়। অনেক বছরের পুরনো ডায়ারি, তাই পেইজগুলোও এখন নরম হয়ে গেছে। কাগজের গায়ে সময়ের ছাপ। কোথাও কোথাও রং ফিকে হয়ে এসেছে, কোথাও কাগজের ভাঁজে জমে আছে পুরনো দিনের গন্ধ। সামান্য টান পড়লেই ছিঁড়ে যাওয়ার উপক্রম।
কিন্তু এত সাবধানে পেইজ উলটিয়েও আর কিছু পেল না প্রীতি। ডায়ারিতে আর কিছু না পেয়ে হতাশই হলো খুব। শেষ লেখা পেইজটার ডেইটটা আরেকবার দেখল। ০৫/০৭/২০১৬। তার মানে ঐদিনই প্রিয়তার জন্মদিন ছিল। আর ঐদিনই শেষ সে ডায়ারিতে লিখেছিল। তারপর? এরপর আর কেন কিছু লিখেনি প্রিয়তা? কী হয়েছিল? প্রিয়তা চট্টগ্রাম যাওয়ার পর কী ঘটেছিল?
প্রশ্নগুলো একটার পর একটা এসে প্রীতির মাথার ভেতর জট পাকাতে লাগল। অথচ উত্তর দেওয়ার মতো ডায়ারিতে লেখা আর কোনো পেইজ নেই। ঠিক তখনই পারভীন বেগম হন্তদন্ত হয়ে রুমে এসে প্রীতিকে গরম মেজাজ দেখিয়ে বললেন,

“ছেলেপক্ষ এসে বসে আছে। আর তুই এখনো পড়াশোনা করতেছিস! কী ছাইপাঁশ পড়িস সারাক্ষণ! তাড়াতাড়ি ওঠ।”
তিনি আরও মেজাজ দেখিয়ে নীল রঙের ডায়ারিটা প্রীতির হাত থেকে কেড়ে নিয়ে শব্দ করে টেবিলের ওপর ছুঁড়ে ফেললেন। মেয়ের ওপর তিনি বেজায় বিরক্ত।কোনো ছেলেকেই ওর পছন্দ হয় না। এর আগে ছয়টা বিয়ে ভেঙেছে। এবারও যদি এই বিয়ে ভাঙে, তাহলে তিনি যে প্রীতিকে এবার কী করবেন, নিজেও জানেন না!
এদিকে ডায়ারিটা ছুঁড়ে ফেলায় কয়েকটা পেইজ খুলে উড়ে পড়েছে নিচে। পারভীন বেগম চলে যাওয়ার আগে বললেন,

“একটু পর তোর ভাবি এসে তোকে নিয়ে যাবে। একদম কোনো নখরা করবি না।”
প্রীতি দীর্ঘশ্বাস ফেলল। মা চলে যাওয়ার পর ধীরে ধীরে নিচে পড়ে থাকা পেইজগুলো তুলতে লাগল। একটা একটা করে পেইজ হাতে তুলে নিচ্ছিল সে। হঠাৎ তার চোখ আটকে গেল একটা জায়গায়। একটা পেইজে খুব পুরনো, অস্পষ্ট একটা প্রিন্ট করা কাপল ছবি স্কচটেপ দিয়ে লাগানো। প্রীতি কিছুক্ষণ স্থির হয়ে ছবিটার দিকে তাকিয়ে রইল। পুরনো ডায়ারি হওয়াতে অনেকগুলো পেইজ একটা আরেকটার সঙ্গে লেগে ছিল। তাই ছবিটা আগে তার চোখে পড়েনি।

ছবিটা অস্পষ্ট। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ছবির রং ফিকে হয়ে গেছে। প্রিন্টের ওপরও পুরনো হওয়ার ছাপ স্পষ্ট। তবুও যতটুকু বোঝা যাচ্ছে, তাতেই একটা বিষয় পরিষ্কার। এটা প্রিয়তা আর রাহাতের ছবি। প্রীতির চোখ বড়ো বড়ো হয়ে গেল। সে ভীষণ অবাক হচ্ছে প্রিয়তাকে দেখে। প্রিয়তা খুব সুন্দরী। নাহ্, সুন্দরী হওয়াতে প্রীতি অবাক হয়নি। শুধু সৌন্দর্য তাকে বিস্মিত করেনি। তাকে সবচেয়ে বিস্মিত করেছে অন্য কিছু। এই অস্পষ্ট, আবছা ছবিতেও প্রিয়তাকে দেখতে ঠিক প্রীতির মতো লাগছে। মুখের গড়ন, চোখের আকৃতি, ঠোঁটের রেখা সবকিছুর মধ্যে যেন অদ্ভুত এক মিল! মনে হচ্ছে, ছবির মেয়েটা প্রিয়তা নয়, বরং বহু বছর আগের কোনো এক মুহূর্তে দাঁড়িয়ে থাকা প্রীতি-ই!

যে পাখি মন বোঝে না পর্ব ১৭

প্রীতি নিজের অজান্তেই ছবিটার আরও কাছে মুখ নিয়ে গেল। তার বুকের ভেতরটা কেমন যেন ধক করে উঠল। কী অবিশ্বাস্য! একজন মানুষকে না চিনেও তার সঙ্গে নিজের এতটা মিল কীভাবে থাকতে পারে? প্রীতি ছবিটার দিকে তাকিয়ে রইল।
তার হাতে তখনও পুরনো ডায়ারির নরম পেইজটা কাঁপছিল। আর তার মাথার ভেতর ঘুরপাক খাচ্ছিল একটাই প্রশ্ন! প্রিয়তা চট্টগ্রাম যাওয়ার পর কী হয়েছিল?

যে পাখি মন বোঝে না পর্ব ১৯

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here