Home র‌ইলো প্রেমের নিমন্ত্রণ র‌ইলো প্রেমের নিমন্ত্রণ পর্ব ৩৪

র‌ইলো প্রেমের নিমন্ত্রণ পর্ব ৩৪

র‌ইলো প্রেমের নিমন্ত্রণ পর্ব ৩৪
ইয়ুশরা রিমু

বাইকটা ধীরে ধীরে ব্যস্ত রাস্তা পেরিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে চললো। বিকেলের রোদ তখন অনেকটাই নরম হয়ে এসেছে, রাস্তার দুপাশে মানুষের ভিড় বাড়তে শুরু করেছে, আর যানবাহনের কোলাহলের মাঝেও সায়র বারবার আয়নায় তাকিয়ে পেছনে বসে থাকা বেলার মুখটা দেখছিলো। সাধারণত বাইকে উঠলেই বেলার কোনো না কোনো কথা শুরু হয়ে যায় কখনো রাস্তার পাশে কিছু দেখে প্রশ্ন করে, কখনো সায়রের গাড়ি চালানো নিয়ে অভিযোগ করে, আবার কখনো অকারণে তাকে বিরক্ত করে।কিন্তু আজ যেন সেই চেনা বকবক করা মেয়েটাই হঠাৎ করে সম্পূর্ণ নীরব হয়ে গেছে।
বেলা মুখটা একদিকে ফিরিয়ে বসে আছে। হাতে আইসক্রিম, কিন্তু তার মন যেন আইসক্রিমে নেই। রুপসার সঙ্গে সায়রের হাসিমুখে কথা বলার দৃশ্যটা বারবার তার চোখের সামনে ভেসে উঠছে, আর প্রতিবারই তার ভেতরের অভিমানটা যেন আরও একটু করে বেড়ে যাচ্ছে।সায়র কিছুক্ষণ চুপ থেকে অবশেষে বললো,

—বেলা।
কোনো উত্তর নেই।
— শুনছিস?
বেলা খুব সংক্ষিপ্তভাবে বললো,
— হুম।
সায়র আয়নায় তাকিয়ে মুচকি হাসলো।
—এতটুকুই?
বেলা আর কিছু বললো না।
— আচ্ছা, তাহলে আমি একাই কথা বলি। তুই শুধু শুনে যা।
বেলা মনে মনে বললো,
—সেটাই তো করছেন।
সায়র আবার বললো,
— রুপসাকে নিয়ে এত রাগ করার কিছু নেই। ও আমার পুরোনো বন্ধু। প্রেমিকা না।
বেলা এবারও চুপ।
— আর তুই যে এতক্ষণ রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে ছিলি, সেটা আমি ভুলে যাইনি। তাই ইচ্ছে করেই তোকে বেশি অপেক্ষা করাইনি। রুপসাকে বুঝিয়ে চলে এসেছি।
বেলা নিচু গলায় বললো,

—- অনেকক্ষণ কথা বলেছেন।
সায়র হেসে বললো,
—- ওহ্! তাহলে এতক্ষণে অভিযোগ বের হলো?
বেলা সঙ্গে সঙ্গে চুপ করে গেলো।
—- ঠিক আছে, আর কিছু বলছি না।
কয়েক সেকেন্ড নীরব থাকার পর সায়র আবার বললো,
— কিন্তু একটা কথা বলতেই হবে।
বেলা বিরক্ত হয়ে বলল,
— আবার কী?
— তুই যখন রাগ করিস, তখন একদম অন্যরকম হয়ে যাস।
— কেমন?
— খুব চুপচাপ। আর এই চুপচাপ ব্যাপারটাই বেশি ভ’য়ংকর।
বেলা মুখ ঘুরিয়ে বললো,

— ভালোই তো। সবসময় তো বলেন আমি বেশি কথা বলি।
— সেটা ঠিক। কিন্তু তাই বলে একেবারে কথা বন্ধ করে দিবি?
—আজকে বন্ধ করেছি।
— কতক্ষণ?
— জানি না।
সায়র হেসে মাথা নাড়লো।
— বাহ! শাস্তিটা বেশ কঠিন দিয়েছিস।
বেলা এবার আর কোনো উত্তর দিলো না।
সায়র কিছুক্ষণ চুপ করে বাইক চালালো। তারপর হঠাৎ বললো,
— আচ্ছা, আইসক্রিমটা কেমন হয়েছে?
বেলা একটু ভেবে বললো,
— ভালো।
— আচ্ছা।

সায়র আর কথা বাড়ালো না। দুজন নিরব থাকতে থাকতেই অবশেষে খান বাড়ির গেটের সামনে এসে বাইক থামলো। সায়র ইঞ্জিন বন্ধ করতেই বেলা দ্রুত নেমে পড়লো। হেলমেট খুলে সায়রের হাতে দিয়ে একবারও তার দিকে না তাকিয়ে বাড়ির ভেতরে হাঁটা দিলো।সায়র হেলমেট হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে রইলো।
— বাহ! নামার সময়ও কথা নেই?
বেলা পেছন ফিরে তাকিয়ে শুধু বললো,
—কী বলবো?
—কিছু না। যা, ভেতরে যা।
বেলা আর কোনো উত্তর না দিয়ে ভেতরে চলে গেলো। দিনের বেশিরভাগ সময়ই তার নিজের রুমেই থাকে সে। নিজের রুমে ঢুকে দরজা বন্ধ করার পর সে ব্যাগটা বিছানার ওপর রেখে কিছুক্ষণ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। রাগটা এখনো আছে, কিন্তু তার সঙ্গে মিশে গেছে অদ্ভুত এক অভিমান। সে নিজেকেই বোঝাতে চেষ্টা করলো যে রুপসার সঙ্গে সায়রের কথা বলায় তার কিছু যায় আসে না, অথচ যতবার সেই দৃশ্যটা মনে পড়ছে, ততবারই বুকের ভেতরটা কেমন যেন মোচড় দিয়ে উঠছে।
অন্যদিকে, নিচে দাঁড়িয়ে সায়রও বুঝতে পারছিলো, বেলার এই রাগ শুধু রাগ নয়। এর সঙ্গে বেশ খানিকটা অভিমানও মিশে আছে।সে মৃদু হেসে নিজের মনেই বললো,

— ঠিক আছে ম্যাডাম, আজকে রাগ করো। কিন্তু কাল পর্যন্ত এই রাগ টেনে নিয়ে যেতে পারবে কি না, সেটা আমি দেখবো।
আর ওপরে নিজের ঘরে বসে বেলা বালিশটা বুকে জড়িয়ে মনে মনে বললো,
— আজকে আমি কোনোভাবেই আগে গিয়ে কথা বলবো না। উনিই আগে এসে আমার রাগ ভাঙাবেন।
বাইরে তখন সন্ধ্যার আলো ধীরে ধীরে গাঢ় হয়ে আসছে, আর একই বাড়ির দুই প্রান্তে বসে দুজনেই নিজেদের অভিমানকে আঁকড়ে ধরে আছে।একজন ভাবছে কীভাবে রাগ ভাঙানো যায়, আর অন্যজন মনে মনে অপেক্ষা করছে কখন সেই মানুষটা এসে সত্যিই তাকে একটু গুরুত্ব দিয়ে তার অভিমানটা বুঝবে।

বিকেলের নরম আলো তখন ধীরে ধীরে খান বাড়ির বারান্দা আর জানালার কাঁচ পেরিয়ে ঘরের ভেতর ঢুকছে। সারাদিনের ব্যস্ততার পর বাড়িটা কিছুটা শান্ত হয়ে এলেও বেলার মনের ভেতরের অস্বস্তিটা যেন একটুও কমেনি। বর্তমানে সে সায়রের ঘরে বসে বই খুলে রেখেছিলো ঠিকই, কিন্তু পড়ায় মন বসছিলো না। বারবার রুপসার সঙ্গে সায়রের কথোপকথনের দৃশ্যটা মনে পড়ছিলো, আর সেই কারণেই তার মুখে অভিমানের ছাপ এখনো স্পষ্ট।
ঠিক সেই সময় দরজায় কোনো ধরনের শব্দ না করেই মমতাজ বেগম ঘরে ঢুকে পড়লেন। বেলা প্রথমে খেয়াল করেনি, কিন্তু মমতাজ বেগমের গম্ভীর কণ্ঠ শুনে সঙ্গে সঙ্গে মাথা তুলে তাকালো,
— রাত-বিকেল আমার ছেলেকে নিয়ে এত নাটক করিস কেন?
বেলা কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইলো। তারপর ধীরে ধীরে বইটা বন্ধ করে বললো,
— কী নাটক করেছি আমি?
মমতাজ বেগম ঠোঁট বাঁকিয়ে বললেন,

—- আবার এমন ভাব করছিস যেন কিছুই জানিস না! সকাল থেকে দেখছি, আমার ছেলে তোকে নিয়ে কলেজে যায়, তোকে নিয়ে আসে, তোর রাগ ভাঙায়, তোর বায়না শোনে এখন বুঝি তুই বোঝাতে চাস, সায়র আর নিজের মতো নেই, তোর কথাতেই চলে?
বেলা ভ্রু কুঁচকে তাকালো,
—- আমি কখন বললাম উনি আমার কথায় চলেন?
— বলতে হয় নাকি? মানুষের আচরণ দেখলেই তো বোঝা যায়। বিয়ে হয়েছে বলে আমার ছেলেটাকে একেবারে নিজের হাতের পুতুল বানিয়ে ফেলেছিস নাকি?
বেলার মুখের অভিমান এবার রাগে বদলে গেলো। সে শান্ত থাকার চেষ্টা করেও শেষ পর্যন্ত চুপ থাকতে পারলো না।
— আপনার ছেলে যদি আমার কথায় চলে, তাহলে তো আপনারই ছেলেকে জিজ্ঞেস করা উচিত কেন চলে। আমি তো কাউকে জোর করে কিছু করাই না।
মমতাজ বেগম চোখ বড় বড় করে বললেন,

— আমার ছেলের ঘরে দাঁড়িয়ে এত বড় বড় কথা বলার সাহস কোথায় পেলি?
বেলা এবার সোজা হয়ে বসে বললো,
— ভুলে যাবেন না। এখন থেকে এটা আমারো রুম। আপনি যখন আমার রুমে এসে আমাকে কথা শোনাচ্ছেন, তখন আমি চুপ করে বসে থাকবো কেন? আমি কি আপনার কাছে এসে ঝগড়া করতে গিয়েছি?
মমতাজ বেগম আরও রেগে গেলেন।
— উল্টো আমার সঙ্গেই তর্ক করছিস?
— তর্ক না, উত্তর দিচ্ছি।
— উত্তর দেওয়ারও একটা সীমা আছে।
— তাহলে আগে প্রশ্ন করারও একটা সীমা থাকা উচিত।
মমতাজ বেগম কয়েক মুহূর্ত বেলার দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর বিরক্ত গলায় বললেন,

—বিয়ে হয়েছে কয়েকদিনও হয়নি, এর মধ্যেই এত কথা শিখে গেছিস! আমার ছেলেকে নিয়ে সারাক্ষণ মান-অভিমান, রাগ, বায়না এসব করে কী প্রমাণ করতে চাস?
বেলা এবার আর নিজেকে সামলাতে পারলো না।সে বললো,
— কিছুই প্রমাণ করতে চাই না। আর একটা কথা বলি? রাত-বিকেল ছেলে আর বউমার ঘরে এভাবে ঢুকে পড়েন কেন?
মমতাজ বেগম থমকে গেলেন।
বেলা এবার আরও স্পষ্ট গলায় বললো,

—- আপনি কেমন শাশুড়ি বলেন তো? ছেলে-বউয়ের ঘরে কিভাবে আছে, কী করছে, কেন করছে সবকিছুর হিসাব নিতে হবে? নিজের ছেলে বড় হয়েছে, নিজের সংসার হয়েছে। একটু তো ব্যক্তিগত জায়গা দিতে হয়।
ঠিক সেই মুহূর্তে দরজার বাইরে এসে দাঁড়িয়েছিলো সায়র। হাতে কিছু কাগজ ছিলো। ভেতর থেকে মায়ের সঙ্গে বেলার তর্কের আওয়াজ শুনেই সে দরজার কাছে থেমে গিয়েছিলো। কয়েক সেকেন্ড পর ভেতরের কথাগুলো স্পষ্টভাবে কানে আসতেই তার মুখের অভিব্যক্তি পাল্টে গেলো।সে ধীরে ধীরে ঘরে ঢুকে বললো,
— এখানে কী হচ্ছে?
মমতাজ বেগম সঙ্গে সঙ্গে ছেলের দিকে তাকিয়ে বললেন,

—-তোর বউ আমাকে শেখাচ্ছে আমি কেমন শাশুড়ি!
সায়র চোখ বন্ধ করে এক মুহূর্ত নিঃশ্বাস ফেললো।
বেলা সঙ্গে সঙ্গে বললো,
—- আপনার আম্মু এসে আমাকে বলছিলেন, আমি নাকি আপনাকে নিয়ে নাটক করি, আপনাকে নিজের কথায় চালাই। এগুলো সে কিভাবে জানে, এজন্য বললাম রাত-বিকেল ছেলে আর বউমার ঘরে উঁকি দেওয়া এটা কেমন স্বভাব?
সায়র কপালে হাত রাখলো।
— বেলা!
মমতাজ বেগম এবার ছেলের দিকে তাকিয়ে বললেন,
—দেখেছিস? কীভাবে আমার সঙ্গে কথা বলছে?
বেলা সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠলো,
— আমি তো সত্য কথাই বলেছি!
— চুপ করো তোমরা দুজন!
সায়র দুজনের মাঝখানে দাঁড়ানোর চেষ্টা করলো।
কিন্তু ততক্ষণে মা-বউয়ের তর্ক যেন আলাদা গতিতে চলে গেছে।মমতাজ বেগম বললেন,
—আমার ছেলে তোকে বিয়ে করেছে বলেই ভাবিস না, এই বাড়িতে যা খুশি তাই বলবি!
বেলা পাল্টা বললো,

—-আর আপনি আমার স্বামীকে জন্ম দিয়েছেন বলেই ভাববেন না, উনি সারাজীবন শুধু আপনার কথাতেই চলবেন!আর আমি কিন্তু এই বাড়ির ই মেয়ে ভুলে যাবেন না।
সায়র হতভম্ব হয়ে দুজনের দিকে তাকিয়ে রইলো।
— আম্মু, বেলা, প্লিজ থামো।
কেউ তার কথা শুনলো না।
মমতাজ বেগম বললেন,
—আমার ছেলেকে আমার কাছ থেকে দূরে সরিয়ে এখন আমাকে নিয়েই কথা শোনাচ্ছে!
বেলা সঙ্গে সঙ্গে বললো,
— আমি কাউকে দূরে সরাইনি। আপনার ছেলে নিজে যেখানে থাকতে চায়, সেখানেই থাকে। তার জন্য আমাকে দোষ দেওয়ার কী আছে?
সায়র এবার সত্যিই বিপদে পড়ে গেলো। সে একবার মায়ের দিকে, একবার বেলার দিকে তাকিয়ে বললো,
— তোমরা দুজন কি আমার কথা একবারও শুনবে?
কেউ উত্তর দিলো না।
মা-বউয়ের তর্ক তখনও চলতেই থাকলো।সায়র অবশেষে হাল ছেড়ে দিয়ে ঘরের এক পাশে রাখা চেয়ারে বসে দুই হাত দিয়ে নিজের কান চেপে ধরলো।

— আল্লাহ্! আমি আর পারছি না।
বেলা একবার সায়রের দিকে তাকিয়ে আবার মমতাজ বেগমের দিকে ফিরলো।মমতাজ বেগমও ছেলের কান চেপে বসে থাকা দেখে কিছুক্ষণ থেমে গেলেন। কিন্তু বেলার সঙ্গে চোখাচোখি হতেই আবার বললেন,
—- দেখলি? তোর জন্যই আমার ছেলে আজ কান চেপে বসে আছে!
বেলা ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল,
—আমার জন্য না, আপনার ঝগড়ার জন্য উনি কান চেপে বসে আছেন!
সায়র কানের ওপর হাত রেখেই অসহায় গলায় বললো,
—-তোমরা যদি সত্যিই আমাকে ভালোবাসো, তাহলে দয়া করে পাঁচ মিনিট চুপ করো!
কয়েক মুহূর্তের জন্য ঘরটা নিস্তব্ধ হয়ে গেলো।
সায়র ধীরে ধীরে হাত নামিয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো।কিন্তু পরক্ষণেই মমতাজ বেগম বেলার দিকে তাকিয়ে বললেন,

— আমি কিন্তু এখনো কথাটা শেষ করিনি।
সায়র সঙ্গে সঙ্গে আবার দুই হাতে কান চেপে ধরলো।
—-না! আম্মু, প্লিজ!
বেলা মুখ চেপে হাসি আটকানোর চেষ্টা করলো।
মমতাজ বেগম সেটা দেখে আরও বিরক্ত হলেন।
— আবার হাসছিস?
বেলা সঙ্গে সঙ্গে মুখ গম্ভীর করে ফেললো।
আর সায়র চেয়ারে বসে মনে মনে শুধু একটাই কথা ভাবলো,
— পৃথিবীর সবচেয়ে কঠিন কাজ হয়তো নিজের মা আর বউয়ের ঝগড়া থামানো।
মমতাজ বেগম শেষ পর্যন্ত আর কিছু না বলে রাগে গজগজ করতে করতে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। দরজাটা একটু জোরেই বন্ধ হওয়ার শব্দে ঘরের ভেতর আবার নীরবতা নেমে এলো। কয়েক মুহূর্ত আগেও যে ঘরে তর্কের উ’ত্তাপ ছিলো, সেখানে এখন শুধু বেলা আর সায়র মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে।
সায়র ধীরে ধীরে চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ালো। মুখে বিরক্তির ছাপ থাকলেও তার রাগটা মায়ের ওপর নাকি বেলার ওপর, সেটা বোঝা কঠিন। কয়েক সেকেন্ড বেলার দিকে তাকিয়ে থাকার পর অবশেষে বললো,
—তোর মুখ এত চলে কেন?
বেলা কথাটা শুনে অবাক হয়ে তাকালো। তারপর অভিমান মেশানো রাগী গলায় বলল,

—তাহলে কী করবো? বোবা হয়ে থাকবো? আপনার মা এসে আমাকে যা খুশি তাই বলবে, আর আমি মুখ বুজে সব সহ্য করবো?
সায়র কিছু বললো না।
বেলা এবার আরও কষ্ট নিয়ে বললো,
—আমি কি নিজে থেকে ঝগড়া করতে গিয়েছিলাম? উনিই এসে আমাকে কথা শোনাচ্ছিলেন। আমি শুধু নিজের কথাটুকু বলেছি।
সায়র ধীর গলায় বলল,
—তুই একটু চুপ থাকলেই পারতি।
বেলা তৎক্ষণাৎ উত্তর দিলো,
— সবসময় চুপ থাকা যায় না। মানুষকে যখন বারবার আ’ঘাত করা হয়, তখন একসময় না চাইলেও মুখ দিয়ে কথা বের হয়। আমার কি কোনো আত্মসম্মান নেই?
সায়র এবার চুপ করে রইলো।
বেলা কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে থেকে হঠাৎ গলার স্বর একটু নরম করলো। কিন্তু কথার ভেতরের অভিমানটা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠলো।

— আর একটা কথা আপনার মা আমার মা-বাবাকে নিয়ে এমন করেন কেন?
সায়রের মুখ মুহূর্তেই গম্ভীর হয়ে গেলো।
বেলা থামল না। সে বললো,
— আমি অনেকবার লক্ষ্য করেছি, উনি আমার পরিবারকে নিয়ে কথা বলার সময় এমন একটা ভাব করেন, যেন আমার মা-বাবা কোনো অপরাধ করেছেন। অথচ তারা উনার কী ক্ষ’তি করেছে? কেন তাদের নিয়ে এত কথা শুনতে হয় আমাকে?
সায়র এবার চোখ সরিয়ে নিলো।
বেলা তার মুখের পরিবর্তনটা লক্ষ্য করে আরও দৃঢ় গলায় বললো,
— আপনি জানেন, তাই না?
সায়র কোনো উত্তর দিলো না।
বেলা আবারো বললো,

—নিশ্চয়ই কোনো কারণ আছে। এমনিতেই তো কেউ কারও মা-বাবাকে নিয়ে এতটা বিরূপ হয় না। আপনি জানেন কারণটা। আমাকে বলেন।
সায়র ধীরে ধীরে বেলার দিকে তাকালো। তার চোখে এবার আগের রাগ নেই, বরং এমন এক অস্বস্তি, যেন বহুদিন ধরে চাপা পড়ে থাকা কোনো বিষয়ের সামনে হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়েছে সে।বেলা আরও কাছে এসে বললো,
—আমি আপনার স্ত্রী। আমার নিজের মা-বাবাকে নিয়ে এত কিছু বলা হচ্ছে, অথচ আমি কারণটাও জানতে পারবো না? আপনি অন্তত আমাকে সত্যিটা বলতে পারেন।
সায়র কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইল। তারপর খুব সংক্ষিপ্ত গলায় বলল,
— তোকে জানতে হবে না।
বেলার চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেলো।
—কেন?
—কারণ এটা এমন একটা বিষয়, যেটা নিয়ে এখন কথা বলতে চাই না।
—কিন্তু আমি জানতে চাই।
—বেলা, বলেছি তো, তোকে জানতে হবে না।

কথাটা এবার একটু কঠিন স্বরে বলেই সায়র আর এক মুহূর্তও দাঁড়ালো না। সে দ্রুত ঘুরে বেলকনির দরজা খুলে ব চলে গেলো।
বেলা স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো।তার মনে হলো, সায়রের আচরণে যেন আজকের তর্কের চেয়েও বড় কোনো রহস্য লুকিয়ে আছে। এতক্ষণ সে মমতাজ বেগমের কথায় রাগ করছিলো, কিন্তু এখন তার রাগের জায়গাটা ধীরে ধীরে দখল করে নিচ্ছে প্রশ্ন।বেলা ধীরে ধীরে বেলকনির দিকে তাকালো।সায়র সেখানে রেলিংয়ের পাশে দাঁড়িয়ে নিচের দিকে তাকিয়ে আছে। বিকেলের বাতাসে তার চুল সামান্য এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে, অথচ তার মুখের গম্ভীরতা দেখে বোঝা যাচ্ছে, সে নিজের ভেতরেই কোনো কঠিন স্মৃতির সঙ্গে লড়ছে।বেলা নিচু গলায় নিজেকেই বললো,
— কী এমন হয়েছে, যেটা আমাকে বলা যাবে না?
অন্যদিকে বেলকনিতে দাঁড়িয়ে সায়র চোখ বন্ধ করে দীর্ঘশ্বাস ফেললো।সে জানে, সত্যিটা একদিন বেলাকে বলতেই হবে।কিন্তু আজ নয়।আজও সে প্রস্তুত নয়।
কিন্তু বেলাও নাছোড়বান্দা সেও গেল বেলকনিতে। বেলা কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে থেকে বলল,

—বলেন।
সায়র মাথা না ঘুরিয়েই বললো,
— কী?
—যা বলছিলাম। আপনার মা আমার মা-বাবাকে কেন পছন্দ করেন না, তার কারণটা বলেন।
সায়র এবার ধীরে ধীরে বেলার দিকে তাকালো। কয়েক সেকেন্ড তার মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে ঠোঁটের কোণে রহস্যময় হাসি ফুটিয়ে বললো,
–একটা শর্তে বলবো।
বেলা ভ্রু কুঁচকে বললো,

— কী শর্ত?
সায়র একটু কাছে এসে গম্ভীর মুখ করার চেষ্টা করে বলল,
— রাগ করবি না তো?
বেলা অবাক হয়ে তাকিয়ে বললো,
— মানে? কী বলবেন যে আমি রাগ করবো?
সায়র কিছুক্ষণ চুপ থেকে হালকা হাসলো।
—তোর কাছে আমার কিছু চাই।
বেলার চোখ আরও বড় হয়ে গেলো।
—কী চাই?
সায়র এবার ইচ্ছে করেই মুখটা একদম গম্ভীর করে বললো,

র‌ইলো প্রেমের নিমন্ত্রণ পর্ব ৩৩

—একজন স্বামী তার স্ত্রীর কাছে যা চায়।
কথাটা শুনে বেলা যেন মুহূর্তের জন্য সম্পূর্ণ স্তব্ধ হয়ে গেলো।তার মুখের সব কথা একসঙ্গে হারিয়ে গেলো। চোখ দুটো বিস্ময়ে বড় হয়ে রইলো, আর গলা যেন হঠাৎ শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। কী উত্তর দেবে, সেটাই বুঝতে পারলো না সে।
সায়র বেলার এমন অবস্থা দেখে আর নিজেকে গম্ভীর রাখতে পারলো না। ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি ফুটে উঠলো।

র‌ইলো প্রেমের নিমন্ত্রণ পর্ব ৩৫

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here