রাগে অনুরাগে পর্ব ৩২
সুহাসিনি ফাতেহা
“আমার নাকে কামড় দিয়েছো কেন বেয়াদব?”
ফারাজের ভ্রুজোড়া কুঁচকালো। চোখের দৃষ্টি তীক্ষ্ণ। তার গম্ভীর সুদর্শন মুখখানা দেখে বুঝার উপায় নেই সে রেগে, নাকি না! যদিও এমন ইঁদুরের দাঁতের কামড়ে তার কিছুই হচ্ছে না, যাচ্ছে না। নাক ভিজা,ভিজা লাগায় বাঁ হাত তুলে নাকের ডগায় হাত রাখল।
তিতলি ফারাজের ধমক শুনে কেঁপে উঠলেও এবার চোরা চোখে তাকালো নাকে কামড় দেওয়া জায়গাটুকুতে। সেখানটায় লাল হয়ে তার দাঁতের দাগ বসেছে। হবেই তো সে খুব জোরে দিয়েছে না।
খুব লজ্জা লাগছে তার। কাচুমাচু করে পা’দুটো উঁচু করে ফারাজের নাকে নিজের তুলতুলে ডান হাত বাড়িয়ে ছুঁতে চাইলো। কিন্তু পাহাড়সম বলিষ্ঠ পুরুষটার মুখের নাগাল পেলো না। তাই নিচু স্বরে স্বীকারোক্তি দিলো,
“আপনি সেদিন আমার গলার পেছনে কামড় দিয়েছেন। তার প্রতিশোধ নিয়েছি। হুহ!”
যুবকের বাদামী অধরযুগলে আচমকা টান বসল বাঁকা হাসির। চোখদুটোতে নামলো চিরচেনা ক্ররতা। সে তৎক্ষণাৎ পূর্বে কোনো প্রস্তুতি ছাড়াই আচমকা এক হেঁচকা টানে বউকে টেনে এনে চেপে ধরল নিজ বক্ষভাঁজের সাথে। নিজের শক্তপোক্ত দুহাত পেঁচিয়ে রাখল তিতলির চিকন কোমরের পেছনে। ছাড়া পাওয়ার কোনো উপায় রাখলো না। তিতলি কেঁপে উঠল থরথর করে। দেহের সাথে দেহের সংঘর্ষ হতেই, তিতলি মৃদু স্বরে চেঁচিয়ে উঠলো,
“এই কি..কি করছেন আপনি?”
গালের ভাঁজে জিভ ঠেলল ফারাজ। ঘাড়টা সামান্য ঝুঁকিয়ে এনে মুখ রাখল মেয়েটার কানের কাছে। তিতলির গোলাপী ঠোঁট দুটোর উপর একদৃষ্টে নজরবন্দী করলো।
অতঃপর হিসহিসিয়ে আওড়াল,
“আসো, আজকে আমি তোমাকে শেখাব একটা গুরুত্বপূর্ণ টপিক, নাম প্রতিশোধ নেওয়ার পর কীভাবে পুরস্কার নিতে হয়। আমি আজ সেটা তোমাকে প্র্যাকটিক্যালি শিখিয়ে-পরিয়ে দেব। সো মে আই?”
তিতলির কান ঝাঁকিয়ে ওঠে। ভ্রূদ্বয় উঠে গেল উঁচুতে। ঠোঁট দুটোর ভাগ হলো, বেঁফাস কথাটায়। চোখ মুখ খিঁচে নিষ্পাপ জবাব দিলো,
“আপনি আগে আমাকে কামড় দিয়েছেন! আমি পরে দিয়েছি সুদে আসলে বরবার।”
“উঁহু মোটেও বরাবর নয়।”
“মা..মানে?”
“মানে সুদে আসলে বরাবর হবে এখন!”
কথাটা বলে ফারাজ তিতলিকে কিছু বলার ফুরসত না দিয়ে তক্ষুনি এক ঝটকায় কোলে তুলে নেয়। ভয়ে গলা শুকিয়ে যাওয়ার যোগাড় বেচারির। শুকনো ঢোক গিলল সে। ফারাজ ঠোঁট কামড়ে মৃদু হাসল। দু কদম সামনে এগিয়ে সহসা বউকে কোল থেকে আলগোছে মেঝেতে ফেলে দেওয়ার ভান করল। ভয়ে তটস্থ বোকা মানবী সাথে সাথেই নরম তুলতুলে দু’হাতে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো মানবের গলা। চোখ মুখ খিঁচে বন্ধ করে বলল,
“না, না, ফেলে দিবেন না প্লিজ! আমার হাতপা ভেঙে গেলে তখন কি হবে বলুন?”
“সম্পূর্ণ কাজ শেষ না করে ফেলে দিলে হবে বউ? হাতপা ভাঙবে পরে তার আগে আমার কাজ আমি শুরু করি!”
“কি…কি করবেন আমার সাথে? আমাকে না-নামান।”
ফারাজ ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসির রেশ ফুটিয়ে বিছানার দিকে যেতে যেতে শেষাত্মক ভাব-ভঙ্গিমা ধরে রেখে বলল,
“হিসেব-নিকাশ বকেয়া সব একসাথে হবে এখন। তারপর নামানোর কথা আসবে।”
তিতলির হঠাৎ ভীষণ ভয় করছে। শুকনো ঢোক গিলে বলল,
“না, না, না আপনার সাথে আমার কোনো হিসেব নিকাশ নেই ইয়ে মানে…আমি আসলে…”
“আসল নকল খাঁটি যা ইচ্ছে বলো আমি তোমাকে ছাড়ছি না।”
তিতলি ফারাজের দিকে তাকাতে পারছে না। তার আপাতত ফারাজকে মা-তা-ল লাগছে। তার দাদু আজও কি কতগুলো বলছে তাকে শুনে সে খুব ভয়ে আছে। হাঁসফাঁস করে বলল,
“আমি ও..ওয়াশরুমে যাবো প্লিজ না-নামান..!”
“ওকে আমি নিয়ে যাচ্ছি! তুমি যেহেতু চাচ্ছো কাজটা ওয়াশরুমে করতে তাহলে….”
নিষ্পাপ রমণী ফের ইতস্ততায় আওড়াল,
“আপনি কেন যাবেন? আমার ইমার্জেন্সি যেতে হবে….”
বাকি কথা শেষ করবার পূর্বেই তিতলিকে কোলের মধ্যে নিয়েই নিজ উদ্যােগে তিতলির খোঁপা করা চুল গুলো খুলে দিয়ে সেখানে নিজের ডান হাতের সবগুলো আঙুল ঢুকিয়েছে ফারাজ। তিতলির গালে নিজের নিজের নাক ঘষল যেখানটায় তিতলি কামড় বসিয়েছে। আরেকটু ঝুঁকে এসে তিতলির থরথর করে কাঁপতে থাকা ঠোঁটের একদম মুখোমুখি নিজের পুরুষালী ঠোঁট জোড়া নিয়ে, এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে একদম নিচু গম্ভীর স্বরে বলে,
“আমারও!”
তিতলি ঢোক গিলে—–“খারাপ লোক! নামান আমায়। আমি সত্যি ওয়াশরুমে যাবো।”
ফারাজ কিয়ৎক্ষণ চোখ ছোট করে রেখে, ঠোঁট কামড়ে হাসল। পাতলা অধর নেড়েচেড়ে ভনিতাহীন বলে বসল,
যখনই আমি কিছু করতে চাইবো তখন তোমার সব বাহানা শুরু হয় হুমম? পাঁচ মিনিট সময় দিলাম! এখন দয়া করে ছেড়ে দিয়েছি বলে বেঁচে গেছো। সময় বুঝে আমি নিজের জিনিস নিজেই আদায় করবো।
বলে কোল থেকে নামিয়ে দিলো বউকে।
তিতলি তক্ষুনি ওয়াশরুমের দিকে দৌড় দিলো। আজকে আর বের হবে না। সকালে বের হবে। ওয়াশরুমের দরজার কাছে গিয়ে দরজা লাগানোর আগে ফারাজের দিকে তাকিয়ে মুখ ভেংচি কেটে বলল,
“আপনার অচেনা বউয়ের কাছে যান! ভাল্লুক কোথাকার!”
ফারাজ চোখ পাঁকিয়ে তাকাতেই তিতলি ঠাস করে দরজা লাগিয়ে দিলো।
রাতের আঁধার কেটে ভোরের স্নিগ্ধ আলো ফুটেছে।পাখিদের কিচিরমিচির শোনা যাচ্ছে। জানালার পর্দা ভেদ করে আসছে মৃদু বাতাস। দেয়াল ঘড়ির কাঁটা ঘুরছে সকাল সাতটা। তিতলি ঘুম থেকে উঠে বিছানায় নজর দিলো। তাদের মাঝখানে একটা কোলবালিশ।
পরপর নজর ঘোরালো। ফারাজ উদোম শরীরে শুয়ে। এই লোক রাতে শার্ট খুলেছে? ভাগ্যিস প্যান্ট খোলেনি। দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে চুপিচুপি বিছানা থেকে নামল। না চাইতেও চোখজোড়া চলে যাচ্ছে ফারাজের উদোম দেহ খানার দিক। উঠানামা করা প্রশস্ত বুক, পেশিবহুল হাত, স্লিম পেট ডুবে আছ। আকর্ষণীয় ফিগার! তিতলি এর আগে অবশ্য অনেকবার দেখেছে উদোম শরীরে। তখন গোসল করে আসতো বা জিম করে। সে তাকাতে পারতো না। প্রতিদিন ঘুম থেকে উঠলেই দেখতো ফারাজ রুমে নেই বা কোথায় চলে গেছে। আজকে শ্বশুর বাড়ি এসে আরামের ঘুম যায় মনে হচ্ছে। তিতলি এই প্রথম কাছ থেকে সময় নিয়ে পর্যবেক্ষণ করতে পারছে। গম্ভীর সুদর্শন মুখখানায় এখন মায়ার রাজ্যে পরিণত হয়েছে। ভ্রুজোড়ার মাঝে সূক্ষ্ম ভাজ পড়েছে। যেন ঘুমের ঘোরে ভালো কিছু দেখছে না। তার কামড়ে নাকের ডগা এখনো লাল। ঠোঁটের দিকে নজর যেতেই তিতলি ঢোক গিলল। আবার ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাতেই, সহসা চোখের সামনে ভেসে উঠল সেদিন ভুলবশত দেখে ফেলা ফারাজের বলিষ্ঠ দেহের সম্পূর্ণ নগ্ন শরীর।
তিতলি লজ্জায় লাল, নীল, গোলাপী হয়ে তক্ষুনি ওয়াশরুমে চলে গেলো।
সকালের ব্রেকফাস্ট শেষে তিতলি তার টুনাকে কোলে নিয়ে রুমে এলো। ফারাজও নাস্তা সেরে ফেলেছে। সে চলে যাবে এখন। এখন ঘড়িতে সকাল নয়টা বাজে। তিতলি টোনাকে নিয়ে দরজা ঠেলে চোরাপথে ভেতরে উঁকি দিতেই দেখলো ভাল্লুক রেডি। আয়নায় দাঁড়িয়ে চুল ঠিক করছে। তিতলি দরজা ঠেলে ভেতরে গিয়ে চুপচাপ বিছানায় গিয়ে বসল।
ফারাজ সেটা লক্ষ্য করছে আগে থেকেই। আয়নার কাছ থেকে এগিয়ে এসে তিতলির পাশে এসে বসলো। ভ্রু কুঁচকে রেখেই প্রশ্ন ছুড়লো,
.”এই খোরগোশের বাচ্চা আবার কই থেকে এলো?”
তিতলি টুনাকে বুকের সাথে আরও জড়িয়ে নিলো এবার। আদুরে হাত বুলিয়ে খুশি মনে বললো,
“এটা আমার বাচ্চা বুঝছেন, যাওয়ার সময় আমাদের সাথে নিয়ে যাবো।”
ফারাজ তৎক্ষণাৎ বসা থেকে আরেকটু এগিয়ে এসে বেয়াদব বউয়ের গা ঘেঁষে বসলো। ভ্রু নাচিয়ে শুধালো,
“আমি কেন খোরগোশের বাচ্চা জন্ম দিতে যাবো বেয়াদব!”
তিতলি বুক ফুলিয়ে বলল,
“আরেহ! আপনি দেন নাই তো! আমি জন্ম দিয়েছি।”
ফারাজ চোখ ছোট করে তাকিয়ে থাকে। পরপরই তিতলির কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে শুধালো,
“ওহ রিয়েলি? বাচ্চা জন্ম দিতে গেলে তো আমাকেই লাগবে, তাই না? আমি তো এখনো তোমাকে প্র্যাক্টিক্যালি ক্লাস দিইনি! তাহলে এই অকাম কীভাবে হলো? ব্যাপার কী?”
কপাল কুঁচকাল তিতলি ! মুখাবয়বে হতভম্বতার রেশ ধরে আচানক মুখ তুলে শুধালো,
“বাচ্চা জন্ম দিতে আবার কিছু করা লাগে নাকি? আমার বাচ্চা আল্লাহর তরফ থেকে ভেসে এসেছে।”
ফারাজ তখন তিতলির পায়ের উপর নিজের বলিষ পা তুলে দিলো। মনে হচ্ছে পায়ের জোর দিয়ে পিষে ফেলছে তিতলির নরম পায়ের উরু। এত শক্ত আর ভারি তিতলির মনে হচ্ছে কোনো বডি বিল্ডার বসেছে। সে ব্যাথা পায়। ফারাজ তখন শেষাত্মক ভাবভঙ্গি ধরে রেখে বলল,
“আল্লাহর তরফ থেকে ভেসে আসে ঠিকই কিন্তু কিছ একটা…”
তিতলি নাক মুখ কুঁচকে ফেলল। ব্যথায় আর্তনাদ করে উঠলো,
“এ্যাহ! আপনার পা সরান ব্যথা পাই! লাগছে তো!”
ফারাজ তিতলির নরম গাল শক্ত করে টেনে ধরল। গালের ব্যাথায় তিতলি ফের আর্তনাদ করে উঠতেই ফারাজ বলল,
সামান্য পায়ের লোড নিতে পারছো না? কি পারো তুমি? মুখে মুখে তর্ক করতে পারো শুধু? বলে তিতলি নরম গাল টেনে লাল করে দিয়ে ছাড়ল ফারাজ।
তিতলি ফারাজের দিকে চোখ তুলে তাকায় ভেজা নয়নে। গালে হাত দিয়ে ডলছে সে। এত্ত ব্যাথা পেয়েছে।
ফারাজকে এবার বিচলিত দেখালো। তবে মুখের ভাব-ভঙ্গিমা একটুও বদলেনি। বরং আরও গম্ভীর হলো। সে তিতলির গালে আবার হাত রেখে সেখানটায় স্লাইড করতে করতে বলল,
“আজকে চলে যাবে। রেডি হও!”
আমি থাকবো। যাবো না, সাথে আপনিও থাকবেন।
কথাটা বলে তিতলি টোনাকে নিয়ে দ্রুত দরজার দিকে দৌড় দিলো। লোকটার মতিগতি সুবিধার না। কেমন করে তাকায় মনে হয় তাকে খেয়ে ফেলবে। বেঘোরা দাঁত কেলিয়ে বলল,
“আপনি বসে বসে আমার সাথে স্বপ্নে কথা বলুন। আমি যাচ্ছি!”
ফারাজও ভ্রুদ্বয় কুঁচকে রেখে তিতলির পেছন পেছন বেরিয়ে এলো।
ফরিদা বানুর হাতে পান। এখনই খাবেন এমন ভাব। নাতজামাইকে দেখে বললেন,
“রাইতে আবার আইয়ো নাতাজামাই। নইলে নাতিনরে লই যাইতাম দিতাম নো। মনে রাইখকো।”
তিতলি মিটিমিটি হেসে উঠল। সে দাদুর পাশে বসে। ফারাজ সে কথা শুনে দাদিশাশুড়ি কে বললেন,
“রেখে দেন নাতিনকে!”
ফরিদা বানু মুখে পান দিয়ে বললেন,
“রাইখা দেওয়ার লাইগা বিয়া দিছি নে? আমি কইতাছি কয়দিন থাইকা যাইবো।”
তিতলিও তাল মিলিয়ে বলল,
“হুহ! কয়দিন না থেকে আমি এক পাও যাবো না!”
“দেইখছো নাতিন কি কইতাছে? নাতিন যা কইবো তা হইবো।”
একটু থেমে আবার নাতাজামাই কে বুঝালেন,
“হুনো নাতজামাই, সংসারে সুখশান্তি আইয়ে যদি জামাইরা বউরগো কথা হুনে। নাতিনের কথামতে চইলবা বুইঝলা?”
তিতলি দাদুর কথায় অনেক খুশি হলো। তার কথাগুলো তার দাদু বুঝিয়ে দিচ্ছে।
ফারাজ ভ্রু কুঁচকে রেখে তিতলির মুখে নজর বুলিয়ে গম্ভীর স্বরে বলল,
“বুঝলাম!”
ফারাজের কথার মাঝেই তৌসিফ শেখ রুম থেকে অফিসে যাওয়ার জন্য রেডি হয়ে ড্রয়িংরুমে এসেছেন। জামাইর মাথে টুকটাক কথা বলে
তিতলিকে আদুরেমাখা গলায় বললেন,
“তোমার কিছু লাগবে আম্মু?
“যা ইচ্ছে হয় নিয়ে আসবা আব্বু!
বলে তিতলি আড়চোখে ফারাজের দিকে তাকালো। অন্য দিকে তাকিয়ে আছে। নাক লাল হয়ে আছে। কেউ কিছু বলছে না কেন? মনে হয় সবাই ভাবছে পিপড়া কামড় দিছে। দূর!
তৌসিফ শেখ মেয়েকে বললেন,
“আসার সময় নিয়ে আসবো আম্মু।”
বলে মেয়ের জামাইর সাথে কথা বলতে সদর দরজা দিয়ে বেরিয়ে গেলেন। গেইট পর্যন্ত এসে ফারাজ নিজের বাইক নিয়ে উঠে চলে গেল। আর তৌসিফ শেখ নিজের গাড়ি নিয়ে অফিসের দিকে চলে গেলেন।
তিতলি এখনো দাদুর পাশে বসে। মনটা খারাপ হয়ে গেছে। ফারাজ চলে যাওয়ার সাথে সাথেই। একদৃষ্টিতে এখনো সদর দরজার দিকে তাকিয়ে আছে। ফরিদা বানু নাতিনকে বললেন,
“তোর নাক এহনো পুরোস নাই? আইজকা নাক পুইরা দিমু। আমার হাতে পুইরবি নাকি ডাক্তরের কাছে গিয়া?”
তিতলি ভ্রু কুঁচকে রেখে বলল,
“নাক পুরলে তো আমি ব্যাথা পাবো দাদু।”
“নাক না পুইরলে নাতজামাইর অমঙ্গল হবে। আমি চাই না নাতাজামাইর অমঙ্গল হোক।”
তিতলি অনেক ভেবে চিন্তে রাজি হলো। সে তার ফারাজের অমঙ্গল কখনো চাই না। ওনার ভালোর জন্য সে সব কিছু করবে। এটুকু কষ্ট সহ্য করবে। দাদুকে বলল,
“আচ্ছা দাদু!”
“আমি পুরি দিমু নে?”
“কোথায় কম ব্যাথা পাবো?”
“ডাক্তরের কাছে কম পাইবি। মিশিন দি পুরি দেয় মনে হয়। আমি হইলে সই দি।”
” তাহলে ডাক্তারের কাছে।”
“আইচ্ছা।”
এরপর আরো তিনদিন কেটে গেল। তিতলি জেদ ধরে যায়নি। তৌসিফ শেখ জামাইকে ও বেয়াইকে বলেছেন মেয়ে এসেছে যেহেতু আরো দুদিন থেকে যাক। তিনিও মেয়েকে যেতে দিতে চান না। মেয়ে আশেপাশে থাকলেই মনে হয় পুরো বাড়িটা আলোকিত থাকে। ফারাজ এই তিনদিন শ্বশুর বাড়িতে আর যায় নি। রেগে আছে এ বিষয় নিয়ে। আফজাল খান ও চাই আরো দুদিন থাকুক বৌমা। সেটা ফারাজকে বলছে। তো থাকুক জন্মের থাকা থেকে আসুক। আর কখনো যেতে দিবে না এমন করলে। তবে যখন তিতলি কল দেয় কথা বলে। পিচ্চি মেয়েকে বিয়ে করে এক জ্বালা চুন থেকে পান খসলেই কেঁদেকেটে ভাসিয়ে পেলে। এসবে সে বিরক্ত নাকি কি সে নিজেও জানে না।
তুষার আর অয়ন ঝিলিকদের বাড়ির পাশে একটা পার্কে বসে আছে। দিন দুপুরে নির্জন পার্ক। তেমন কোনো মানুষ জন নেই। ঝিলিক আসার কথা এখানে। আজকে কয়দিন মেয়েটাকে দেখে না। বড্ড ব্যস্ততায় দিন কেটেছে তুষারের। তুষার
“প্রিয়া না! বল..ও ঝিলিক…ঝিলিক..!”
বলে আবার বলল,
“ওই দেখ কে আসছে, ভাবি থক্কু আমার ফুপাতো বোন ঝিলিক আসতেছে! আমি গেলাম।”
তুষার পেছনে ঘুরে দেখল ঝিলিককে। দু সেকেন্ড থম মেরে তাকিয়ে থাকে সেদিকে। তার গিফট করা শাড়িটা সহ মিলিয়ে চুরি টিপ কানের দুল পড়েছে। চোখে গাঢ় কাজল। নীল শাড়িতে মেয়েটাকে এত সুন্দর লাগছে যে তুষারের চোখে নেশা ধরে এলো। সে উঠে দাঁড়ায়। লম্বা কদমে মেয়েটার সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। ঝিলিক লজ্জায় মাথা নিচু করে রেখেছে।
তুষার একদৃষ্টে তাকিয়ে থেকে হঠাৎ বলল,
“আপনাকে খুব সুন্দর লাগছে ঝিলিক। আমার কল্পনার চেয়েও বেশি সুন্দর।
ঝিলিক ধীরেধীরে চোখ তুলে তাকাতেই চোখদুটো কোটর ছেড়ে বেরিয়ে আসার যোগাড়।
“তুষার ভাই! আপনার মাথায় এটা কি?”
“কোনটা?”
“জোক!”
“জোক কোথায় থেকে আসবে?”
“আমি সত্যি বলছি মাথায় হাত দিয়ে দেখুন মাথায় কি কতগুলো…”
তুষার এবার সত্যি নিজের মাথার উপর হাত দিলো। সাথে সাথে কিছু কালোসাদা পোকা তার হাতে আসল। আর এই মেয়ে বলছে জোক। সে এদিক ওদিকে তাকিয়ে অয়নকে দেখতেই অয়ন হো হো করে হেসে উঠল। তুষারের আর বুঝতে বাকি নেই যে কাজটা অয়নের। অয়ন গলা ছেড়ে দিয়ে বলল,
“ডুবে ডুবে প্রেম কর দোস্ত!” বলে সে প্রস্থান করল একটু দূরে।
তুষার ঝিলিকের দিকে তাকিয়ে মাথাটা একটু ঝুকে নিয়ে সহসা অদ্ভুত আবদার করে বসে,
“মাথার চুল ঝেড়ে দিন একটু! এগুলো জোক না পাগল।”
ঝিলিক কি করবে কি বলবে যেন কথা বলার ভাষা খুঁজে পেলো না। তুষার তার কাছে। মাথা তুললেই দুজনের মুখের মিলন ঘটবে। সে হাঁসফাঁস করে বলল,
“আমি? আমি ঝেড়ে দিবো?”
“তো কে? আপনি আমি ছাড়া এখানে কেউ নেই ঝিলিক। বিয়ের পর গোসল করলে প্রতিদিন আমার মাথার চুল মুছে দেওয়ার দায়িত্ব আপনার।”
ঝিলিক কাঁপা হাতে বাড়িয়ে দিলো তুষারের মাথায়। তার হাত কাঁপে। তাও প্রশ্ন করে,
“বিয়ে শুধু বললেই হয়ে যায় তুষার ভাই? আপনি আমার মধ্যে কি দেখে এমন করছেন? আমি আজ সেটা জানতে চাই?”
“এত কিছু জেনে কি করবে? কিছু কথা অজনা থাকুক সঠিক সময়ে মন খুলে আপনাকে শুনাবো।
বলে তুষার আকাশের দিকে তাকিয়ে আনমনে একটা গান গেয়ে উঠল…
“বলো না কেন ওই আকাশ নেমে আসে সাগরের বুকে…
“বলোনা কেন ওই ঝর্ণা নদী ছুটে শিশিরের বুকে…”
“সব কথা বলেনা হৃদয় কিছু কথা বুঝে নিতে হয়।”
ঝিলিক অবাক,মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকে। এত সুন্দর করে গান গাইতে পারে ওনি? গানটা তার কথার সাথে মিলে গেলো যেন। মুচকি হেসে বলল,
“আপনি এত সুন্দর গান শোনাতে পারেন তুষার ভাই?”
“আপনার ভালো লেগে থাকলে তবে সত্যি আমি ভালো গান গায়! বাই দ্যা ওয়্যে আপনার ঠোঁটের পাশের তিলটা কিন্তু দারুন ঝিলিক!”
ঝিলিক লজ্জায় লাল হয়ে যায়। নিচের দিকে তাকিয়ে থাকে।
ঘড়িতে বিকেল তিনটা।
নিধি সিয়াম প্রিমা ওরা তিনজন তিতলিকে দেখতে এসেছে। এই সুযোগে তিতলি সহ ঘুরতে যাবে। তিতলি নিজের রুমে বসে আছে রেডি হয়ে। সাথে নিধি সিয়াম প্রিমা তিনজনই ওর রুমে। তিতলি মোবাইল নিয়ে ফারাজকে ফোন করলো দুবার। কিন্তু রিসিভ করছে না। নিধি আয়নার কাছ থেকে এসে বলল,
“কী রে? এখনো রিসিভ করেনি?”
তিতলি নাক ফুলিয়ে বলল,
“করছে না।”
সিয়াম তিতলির পাশে দাঁড়িয়ে কাঁধে হাত রেখে দাঁড়ালো। খোঁচা মেরে মজা করে বলল,
“ফারাজ স্যার এখন শুয়ে শুয়ে নাক ডাকতেছে। তাই কল রিসিভ করছে না। আর হয়তো মোবাইল চালাচ্ছে তোর ফোন রিসিভ করছে না।”
তিতলি এবার ভিডিও কল করলো ফারাজকে। এবার সাথে সাথেই রিসিভ হলো। তিতলি মুখ ফুলিয়ে রেখেছে। স্ক্রিনে ফারাজকে দেখা যাচ্ছে। বিছানায় বসে স্যান্ডো গেঞ্জি পরছে এখন। কিন্তু তিতলিকে এমন সেজেগুজে দেখে মুহূর্তেই নড়েচড়ে উঠে শক্ত কন্ঠে প্রশ্ন ছুড়লো,
“কোথায় যাচ্ছো?”
তিতলির সহজ স্বীকারোক্তি দিলো,
“ঘুরতে যাচ্ছি!”
ফারাজের ভ্রুজোড়া এবার মাত্রাতিরিক্ত কুঁচকে গিয়েছে। ঘুরতে যাচ্ছি সে কথার থেকেও তিতলির কাঁধে পুরুষ মানুষের হাত দেখে সন্দিগ্ধ গলায় বলল,
“তোমার কাঁধে এটা কার হাত দেখি মোবাইল ঘুরাও!”
“সিয়ামের হাত কেন? আমাকে ঘুরতে নিয়ে যাবেন আপনি আসুন! নাহলে আমি ওদের সাথে যাবো।”
ফারাজ জলন্ত চোখে তিতলির কাঁধে সিয়ামের রাখা হাতটার দিকে চেয়ে আছে। চিবুক শক্ত করে নিলো। বিছানা থেকে উঠে মেঝেতে দাঁড়াল এবার। এক অজানা কারণেই মাথার তালু গরম হচ্ছে রাগে। যুবক দাঁতে দাঁত চাপল পরক্ষণে। এক আকাশসম রাগ নিয়ে বলল,
রাগে অনুরাগে পর্ব ৩১ (২)
“সরে বসো এক্ষুনি!”
তিতলি হঠাৎ বুঝতে পারে না ফারাজের ওমন রাগের কারণ। বুঝতে না পেয়ে তাকালো এবার। চাহনিতে প্রশ্ন,
“কেন?”
” মরার খুব পাখা গজাইছে না? আমি তিনদিন আসিনি দেখে আমার পারমিশন ছাড়া ঘুরাঘুরি করার সাহস কি করে হয় তোমার?”
