Home রাজনীতির রংমহল ৩ রাজনীতির রংমহল ৩ পর্ব ৪৫

রাজনীতির রংমহল ৩ পর্ব ৪৫

রাজনীতির রংমহল ৩ পর্ব ৪৫
সিমরান মিমি

পিঠের নিচে দু দুটো নরম বালিশ দেওয়া। তার উপর হেলান দিয়ে চুপ করে আধশোয়া হয়ে রইলো স্পর্শীয়া। চোখ দুটো তার স্নিগ্ধ, ছাদের দিকে দৃষ্টিবদ্ধ। মানসপটে বারবার একই দৃশ্য ভেসে উঠছে। জ্ঞান হারানোর পুর্বের ঘটনাটুকু কোনোভাবেই ভোলা সম্ভব হচ্ছে না। রক্তাক্ত, বিধ্বস্ত পরশ নিজের দিকে লক্ষ্য না করে ছুটে এসেছিলো তার কাছে। উদগ্রীব হয়ে পড়েছিলো তাকে নিয়ে। কোথায় আঘাত লেগেছে তা দেখার জন্য। এসব ভেবে এখন ভীষণ কান্না পাচ্ছে স্পর্শীয়ার। লোকটা সত্যিই তাকে এতোটা ভালোবেসেছে ভাবতেই হতাশ লাগছে। কেনো ভালোবাসলো, কি দেখে ভালোবাসলো? সে কি আদৌ এই ভালোবাসার মূল্য দিতে পারবে? নাকি বাবার সান্নিধ্যে থাকার জন্য, বাবাকে কষ্ট না দেওয়ার জন্য সমস্তটা অগ্রাহ্য করবে! কিন্তু কিভাবে? কিভাবে মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়ে তার যত্ন নেওয়া এক পুরুষকে ফিরিয়ে দেবে? এমনকি স্পর্শীর সুরক্ষার জন্য হেলমেটটাও দিয়ে দিয়েছিলো পরশ। নাহলে কি হতো আজ? সে তো ট্রাকের নিচেই ছিলো। ভাগ্য অতিশয় ভালো থাকায় চাকার নিচে পিষে যায় নি। পিজঢালা রাস্তায় লুটিয়ে পড়েছিলো। বিশালাকৃতির ট্রাক টা তার উপর থেকেই চালিয়ে গেছে। অবস্থান দু চাকার মাঝের ফাঁকা অংশে ছিলো বলেই হয়তো বেঁচে থাকা।

পরশের অবস্থা বেশ গুরুতর! সেদিন রাতেই হস্পিটাল থেকে ফেরত দিয়েছে। এরপরই তাকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে বরিশাল শেরে বাংলা মেডিকেলে। অবস্থা অতিশয় গুরুতর দেখে ভোর রাতেই রওনা হয়েছে ঢাকা মেডিকেলের উদ্দেশ্যে। এরপর? এরপর আর কোনো খবর পাওয়া যায় নি। পরশের জ্ঞান ফিরেছে কিনা সে বিষয়েও জানে না সে। গতকালই পাভেলের ফোনে কল করেছিলো। অথচ সে রিসিভড করেনি। অনেকবার দেওয়ার পরে রাতের দিকে অবশ্য রিসিভড করেছিলো। কিন্তু তারপর? ফোন রিসিভড করে অত্যন্ত কঠোরতার সঙ্গে ভীষণ বাজে ব্যবহার করেছে পাভেল। তার ধারণা শামসুল সরদার পরশ-স্পর্শীর সম্পর্কের কথা জেনেই পরশকে মার্ডার করার জন্য এই ছক কষেছে। অতএব সম্পুর্ণ দায়বদ্ধতা স্পর্শীর। তাই কখনোই যেনো পরশ তো দূর ও বাড়ির কারো সঙ্গেই যোগাযোগ না করে। শুধুমাত্র এতটুকু বলেই সে ক্ষান্ত হয়নি। সাথে সাথে নাম্বার ব্লক করেছে। এমনকি পরশের ফোন থেকেও ব্লক করেছে।

স্পর্শীয়া বাহারকে দেখেছে। এর মানে ঘটনাটা বাবাই ঘটিয়েছে এ ব্যাপারে খুব একটা সন্দেহ নেই। অন্যদিকে পরশের এতোটা করুন দশা, পাভেলের দোষারোপ সবমিলিয়ে সে ভীষণ ক্লান্ত। ভেতরে ভেতরে বিধ্বস্ত হয়ে গেছে।
কেটে গেছে প্রায় আরো দুদিন। প্রেস মিডিয়া একটু থেমেছে। তাজা ঘটনা গুলোর রেশও কেটেছে অনেকটা। তবে পুলিশ ইনভেস্টিগেশন থামায় নি। এক্সিডেন্ট স্পটে সিসিটিভি ক্যামেরা না থাকলেও, প্রায় আধা কিলোমিটার সামনে একটা প্রতিষ্ঠানের গেটে লাগোয়া রয়েছে ক্যামেরা। আনুমানিক সময় অনুযায়ী তিনটে ট্রাককে চিহ্নিত করা হয়েছে। কিন্তু এর কোনোটাই সন্দেহজনক নয়। প্রত্যেকেই ডাকার সঙ্গে সঙ্গে হাজির হয়েছে থানায়। তবে পুলিশের সন্দেহ অনুযায়ী সেদিন কৌশলে এক্সিডেন্ট ঘটিয়ে খানিক সামনে এগিয়েছিলো ট্রাক। এরপর কাঁচা রাস্তা ধরে গ্রামের ভেতরে ঢুকে গিয়েছিলো এবং তারপর পরই হয়তো অন্য কোনো রুট ধরে সরে পড়েছে চালক। তবে পোক্ত প্রমাণ নেই। এমনকি ট্রাকটা আদৌ কোথা থেকে এসেছে তারও প্রমাণ মেলেনি।

স্পর্শীর পা ভেঙে গেছে। এমনকি ডান হাতেও বেশ ভালোভাবে হাঁড় ফেটে গেছে। এছাড়া সারা শরীরে চোট তো আছেই। সব মিলিয়ে ডাক্তার এতো তাড়াতাড়ি ছাড়ছে না। প্রায় চৌদ্দ দিন হস্পিটালে থাকার পর অতিষ্ঠ হয়ে উঠলো মেয়েটা। না ঠিকমতো ঘুমাতে পারছে, আর না তো খেতে। তার উপর পরিবেশ টাও বেশ রুক্ষ। সব মিলিয়ে বাড়িতে যাওয়ার জন্য তুমুল জেদ শুরু করলো। অবশেষে বাধ্য হয়ে শামসুল বাড়িতে নিয়ে এলো। এখনো হাঁটার শক্তি নেই। ফলস্বরূপ হুইল চেয়ার ব্যবহার করতে হলো।
আজ শেষ বিকেলের আকাশটা অত্যন্ত গম্ভীর, মেঘে ঢাকা। আসরের আজান দেওয়ার পরপরই যেনো সন্ধ্যে নেমে গেছে। চারদিকে গাঢ় অন্ধকার। মধ্যখানে বিদ্যুৎ চমকানোর আলো। প্রকৃতি দেখতে ভয়ংকর ঠেকলেও কারো কারো বিষন্নতায় তা মলিন হয়ে পড়েছে।
আকাশের বড় বড় মেঘ দেখে মনে হচ্ছে মুষলধারে বৃষ্টি নামবে। স্পর্শী হুইল চেয়ার নিয়ে জানালার পাশে গেলো। বিষন্ন হয়ে দেখতে লাগলো প্রকৃতি। হঠাৎ দরজায় খুট করে আওয়াজ হলো। ঘাড় ঘুরিয়ে পিছনে তাকিয়ে সোভামকে দেখতে পেলো। সে ধীর পায়ে মলিন মুখে রুমের ভেতরে ঢুকলো। সারাদিন সারাবাড়ি ময় ছটফট করতে থাকা তার চড়ুইটা আজ হুইলচেয়ারে। নির্জীব, নিশ্চল, গম্ভীর হয়ে দিনাতিপাত করছে। এগুলো সহ্য করা যাচ্ছে না। বুকের ভেতরটা খাঁ খাঁ করছে।
ভাইকে দেখে স্পর্শী চাকা ঘুরিয়ে খাটের কাছে এলো। সোভাম বসে পড়েছে খাটে। হঠাৎ ম্লান কন্ঠে বোনকে জিজ্ঞেস করলো,

– বিছানায় উঠবি?
আলতো মাথা ঝাকিয়ে সায় জানালো স্পর্শী। বাঁ পা দিয়ে ফ্লোরে ভর দিয়ে এক হাত বাড়িয়ে দিলো ভাইয়ের দিকে। বললো,
– একটু ধরতো আমায়।
সোভামের বুকটা হুহু করে উঠলো। তৎক্ষণাৎ বোনকে ধরে অতি সাবধানতায় বসিয়ে দিলো বিছানায়। এরপর পাশে বসে খুটিয়ে খুটিয়ে দেখতে লাগলো ক্ষতগুলো। ডান হাত এবং পায়ে মোটা করে ব্যান্ডেজ বাঁধানো। কোমড়ের কাছে গভীর ক্ষত হয়ে বাইকের ভাঙা আয়নায়। সেখানেও ব্যান্ডেজ করে দেওয়া। এছাড়া সারা শরীরে আঘাত লাগলেও ব্যান্ডেজ করা হয়নি। শুধু প্রতি ওয়াক্তে ড্রেসিং করে দেওয়া হয়। কথিত আছে, “সারা অঙ্গে ব্যথা, মলম দিবো কোথা? ” ঠিক তেমনটাই হয়েছে স্পর্শীর বেলায়। কাটাছেঁড়া স্থানগুলোতে ব্যান্ডেজ করতে গেলে পুরো শরীর মুড়িয়ে রাখতে হয়। সেজন্যই যেখানটাতে সেলাই লেগেছে, সেখানে সেখানে বাঁধা হয়েছে।
সোভাম বাঁ পায়ের কাটা চিহ্নটা ছুয়ে মিহি স্বরে জিজ্ঞেস করলো,
– ব্যথা একটুও কমেছে?
এতো তাড়াতাড়ি! স্পর্শী মৃদু হাসলো। সান্ত্বনা দিয়ে বললো,
– হ্যাঁ, কমেছে।
এরপর আবারো নিরব। প্রায় অনেকটা সময় পার হওয়ার পর সোভাম পুণরায় কথা বলে উঠলো। গম্ভীর হয়ে প্রশ্ন ছুড়লো বোনের প্রতি৷

– পরশ শিকদারের সাথে কোথায় গিয়েছিলি সেদিন?
স্পর্শী শুনলো। তবে উত্তর দিলো না। বরং উলটো প্রশ্ন করে বসলো।
– উনি কেমন আছেন এখন? কিছু কি জানিস।
– শুনেছি, গতকাল আইসিইউ থেকে বের করেছে। ভোর রাতের দিকে জ্ঞানও ফিরেছিলো। তারপর আর কিছু জানিনা।
স্পর্শীর মনটা আবারো ভারী হয়ে উঠলো। পরশ শিকদারের জ্ঞান ফিরেছে! আচ্ছা, জ্ঞান ফেরার পর কি একবারও সে স্পর্শীয়াকে খুঁজেছিলো? তার কথা কি জানতে চেয়েছিলো সকলের কাছে? নাকি কথাই বলতে পারছে না। হ্যাঁ, তাইই হবে। নাহলে এতোক্ষণে অন্তত একবার হলেও স্পর্শীকে কল করতো। সোভাম সূচালো দৃষ্টিতে বোনকে নিরীক্ষণ করলো। বললো,
– আমার প্রশ্নের উত্তর দিলি না তো। কোথায় গিয়েছিলি?
– সোনা দিঘির পার্কে।
সোভাম কপাল কুঁচকে ফেললো। আশ্চর্যের কন্ঠে বলে উঠলো,
– ওটা তো গ্রামের ভেতরে। অনেকটা নিরিবিলি জায়গা। ওখানে কেনো গেছিলি?
– ডেটে গেলে তো নিরিবিলি জায়গাতেই যেতে হয়।
সোভাম আহাম্মক হয়ে গেলো। মুহুর্তেই জোরালো আওয়াজে ধমক মারলো। চোয়াল শক্ত করে বললো,
-চুপ!!! ফালতু কথা বলে আমাকে একদম রাগানোর চেষ্টা করবি না।
স্পর্শী চমকালো না। ফোন বের করে সোভামকে পুরোপুরি অগ্রাহ্য করে স্ক্রল করতে লাগলো। এসব সহ্য হচ্ছে না একদম। সোভাম নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করলো। মৃদু আওয়াজে বললো,
– আচ্ছা, যা হওয়ার হয়েছে! কিন্তু তুই আর পরশ শিকদারের সাথে কোনো যোগাযোগ রাখবি না। কেনো রাখবি না, তা তুই নিজেই জানিস। এই দুই পরিবারের মধ্যে কোনো সম্পর্ক হতে পারে না।
– অসম্ভব ও নয়।

স্পর্শীর ফের খামখেয়ালি পূর্ণ জবাব। সোভাম উঠে দাঁড়ালো। এখানে বেশিক্ষণ থাকলে সে নিজেকে সামলাতে পারবে না। ঝামেলা হবে। আর স্পর্শী ঠিক সেটাই চায়। সেজন্যই খামখেয়ালি করে অবান্তর কথাবার্তা বলছে। তাই শেষ বারের মতো বোনকে সাবধান করে বললো,
– যেটা বললাম সেটা মাথায় রাখিস। আমি বেঁচে থাকতে তোকে কখনোই এই দুই পরিবারের বিরোধীতায় বলি হতে দেবো না। সুস্থ হলে ঢাকায় নিয়ে যাবো।
সোভাম আর এক মুহুর্তও দাঁড়ালো না। নাহলে স্পর্শীয়ার চুড়ান্ত এক রোখামি দেখে যেতে পারতো।
স্পর্শীর রুম থেকে বেরিয়ে সরাসরি শামসুল সরদারের দরজার সামনে গিয়ে থামলো। দরজাটা আধখোলা অবস্থায় রয়েছে। ভেতরে শুয়ে আছেন শামসুল সরদার। চোখ দুটো বন্ধ করে কপালের উপর হাত রেখে চুপ করে আছেন। তবে ঘুমান নি। সোভামের এ ঘরে ঢুকতে আজকাল বড্ড লজ্জা হয়। পূর্বের সেই রাগ, অভিমান, জেদ কিচ্ছু নেই। শুধু আছে খানিক অপ্রাপ্তি। বাবাকে বাবা বলতে না পারার অপ্রাপ্তি। পিপাসা আরো পনেরো দিন আগেই শুধরে দিয়েছিলো। বলেছিলো,

তোমার বাবার কাছে যাও। তাকে বাবা বলে ডাকো। যতটুকু দুরত্ব আছে, সেটুকু শুধু আমার আর তোমার বাবার মধ্যে। আমাদের মধ্যেই থাকতে দাও। তোমরা আর পরিস্থিতি জটিল করো না, তাকে কষ্টও দিয়ো না।
কিন্তু সোভাম পারেনি। রাগ, ঘৃণা চলে গেলেও কেমন অসস্তি হয় এই মানুষটার সামনে দাঁড়াতে। তাকে বাবা বলে ডাকতেও লজ্জা লাগে, আবার আপনি আপনি করে বলতেও অসস্তি হয়। সব মিলিয়ে এই মানুষটার মুখোমুখি হতেই সে অপ্রস্তুত। অথচ পরিস্থিতি আজ সরাসরি তার বাড়িতে এনে ফেলেছে। না চাইতেও বারংবার দেখা হচ্ছে, অপরিচিতের ন্যায় কথা হচ্ছে।
সোভাম মৃদু আওয়াজে দরজায় টোকা দিলো। শামসুল চোখ মেলে তাকালেন। সোভামকে দেখে বসতে বসতে বললেন,

– ভেতরে আসো।
সোভাম এগিয়ে এলো। হঠাৎ আনমনেই বাবার বিছানার এক কোনায় বসলো। মাথা নিচু করে অন্যদিকে তাকিয়ে বললো,
– আপনার কি শরীর খারাপ?
এক মুহুর্তের জন্য শামসুল চমকালো। চোখ দুটো চিকচিক করে উঠলো খুশিতে। তার ছেলে তার শরীরের খোঁজ নিচ্ছে! একথা যেনো অবিশ্বাস্য। তিনি জবাবে কি বলবেন ভেবে পেলেন না। কি বললে সোভাম তার পাশে আরেকটু বসবে, আলাদা ভাবে কেয়ার করবে! আচ্ছা, সে কি বলবে তার শরীর খুব বেশি খারাপ? হয়তো মারা যাবেন খুব তাড়াতাড়ি। ডাক্তার বলেছেন স্ত্রী – সন্তান নিয়ে একটু শান্তিতে শেষ কদিন বাঁচতে। কিন্তু ব্যাপারটা অতিরিক্ত বাড়াবাড়ি হয়ে যাবে। যদি দেখা যায়, সে আরো অনেক দিন বাঁচলো। তবে কিভাবে মুখ দেখাবেন সন্তানদের?
– হ্যাঁ, না। আমি ঠিক আছি। স্পর্শীয়া কি করছে?
স্পর্শীর নাম শুনে সোভাম আবারো গম্ভীর হলো। হঠাৎ করেই বাবার কাছে অনুমতি নেওয়ার মতো করে বললো,
চড়ুইকে ঢাকা নিয়ে যেতে চাই। আমি চাই না ও পরশ শিকদারের সাথে জড়িয়ে পড়ুক। আমার একটা মাত্র বোন। ওর বিপদ আমি সহ্য করতে পারবো না।
পরিস্থিতি ভিন্ন হলে শামসুল সরদার একশো বার আটকাতেন। তবে আজ আর পারলেন না। বরং একাত্মতা প্রকাশ করে বললেন,

– বেশ! নিয়ে যাও। আমি বাঁধা দেবো না। যদি আমার থেকে দূরে থাকলে স্পর্শীয়া নিরাপদ থাকে, তবে আমি রাজি।
বাবার সাথে আলাপ বেশ সংক্ষিপ্ত হলো সোভামের। পরপরই সে উঠে দাঁড়ালো যাওয়ার উদ্দেশ্যে। কিন্তু মন সায় দিচ্ছে না। মনের ভেতরটা খচখচ করছে। একবার বাবা বলে ডাকার ভীষণ লোভ হচ্ছে। কেনো সে স্পর্শীয়ার মতো সহজ হতে পারলো না? কেনো নিমিষেই বাবা বলে জড়িয়ে ধরতে পারছে না? কেনো? তোলপাড় হওয়া মন নিয়ে সে দরজা মেললো। হঠাৎই সমস্ত বাঁধন ছিন্ন করে বলে উঠলো,
আপনার মনে হয় জ্বর এসেছে, আব্বু। জ্বর মেপে নিবেন।
এরপর? এরপর আর এক মুহুর্তও দাঁড়ালো না। শ্বাসরুদ্ধ হয়ে বড় বড় পা ফেলে একপ্রকার পালিয়ে গেলো ছাদে। শামসুল স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে আছেন তখনো। নিজের কানকেই বিশ্বাস হচ্ছে না৷ সত্যিই কি সোভাম আব্বু বলে ডেকেছে? নাকি তিনি ভুল শুনেছেন। চোখটা জ্বলছে। শরীরটাও বেশ গরম। আচ্ছা, তাকে না ছুয়েই সোভাম কি করে বুঝলো জ্বরের কথা?

পিপাসা উদাস মনে তাকিয়ে আছে মেঘাচ্ছন্ন আকাশের দিকে। জীবনের সমীকরণ মেলাতে সে ব্যস্ত। ছোটোবেলা থেকেই প্রকৃতি তাকে আলাদা করে রেখেছে সবার থেকে। প্রথমে বাবা-মা, এরপর স্বামী। সারা জীবনটা তার লড়াই করতে করতেই কেটে গেলো। এখন এই বৃদ্ধ বয়সে পরিস্থিতি সব দিক থেকে চেপে ধরেছে। মেয়েটা এতোবছর পর বাবার কাছে এসেছে। কদিনই বা থাকবে। হয়তো বছর ঘুরতে না ঘুরতেই অন্য বাড়ি চলে যাবে। রইলো বাকি একটা ছেলে। কিন্তু তারও বা কি দোষ। সোনার চামচ মুখে নিয়ে জন্মালেও সেই চামচ ছুড়ে ফেলে রাস্তায় গিয়ে দাঁড়িয়েছিলো ছেলেকে নিয়ে। কিন্তু ভবিষ্যত? সোভামকে সে কখনোই নিজের কাছে থাকার জন্য জোর করতে পারবে না। এমনকি ছেলেটা মাকে নিয়ে থাকতে চাইলেও তো ভুল করবে। বাবা হিসেবে শামসুলের কি কোনো অধিকার নেই? কদিন পর সোভামকেও বিয়ে দিতে হবে। স্ত্রী হিসেবে সেই মেয়ে নিশ্চয়ই শশুরবাড়িতে থাকতে চাইবে। ভাসমান, ঘরবাড়ি হীন পিপাসা তো বিয়েই দিতে পারবে না বাবাহীন বটগাছের অভাবে। কিন্তু এরপর তার কি হবে? থাকলো নাহয় আরো পাঁচ থেকে দশ বছর পার্লার নিয়ে। কিন্তু তারপর? যখন গায়ে শক্তি থাকবে না, তখন কার কাছে যাবে? ছেলের কাছে ফিরবে, এই সরদার বাড়িতে? কিন্তু কিভাবে? লোকটার প্রতি আর রাগ নেই, ঘৃণা নেই, কিন্তু অভিমান তো আছে। কি করে পারলো অন্য নারীকে ছুঁয়ে তার গর্ভে সন্তান জন্ম দিতে? একবারও তার তৃষ্ণার কথা ভেবে বুক কাপলো না? শুধু কি পুরুষ মানুষ বলেই পার পেয়ে যাবে? নাহ! পিপাসা আর ফিরবে না। কখনোই এই নীড়ে ফিরবে না। স্পর্শীয়া সুস্থ হওয়ার সাথে সাথেই সে চলে যাবে ঢাকায়। সোভাম ফিরতে চাইলে বেশ কড়াভাবে শাসাবে। থাকলো তো মায়ের কাছে এতোদিন, এবার বাবার যত্ন নিক। তারও তো সন্তানের কাছে থাকার শখ আছে। প্রয়োজনে মাসে দু একবার মায়ের কাছে গিয়ে থেকে আসুক, দেখে আসুক। কিন্তু বরাবরের মতো আর ফিরতে পারবে না। বাকিটা রইলো ভবিষ্যত। চলার শক্তি না থাকলে তখন বোনের কাছে যাবে। প্রয়োজনে পিরোজপুর এসে ছেলের কাছাকাছি বাসা রাখবে। সঙ্গে দেখার জন্য লোক।
এসব ভেবে একসময় চোখ বন্ধ করে ফেললো। সঙ্গে সঙ্গে দুচোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়লো।

মারাত্মক ভাবে মস্তিষ্কে আঘাত পেয়েছে পরশ শিকদার। এক্সিডেন্টের ঘটনা ঘটেছে আজ তেইশ দিন। আই.সি.ইউ থেকে বের করার পর জ্ঞান ফিরলেই কথা বলার মতো অবস্থাতে ছিলো না। দিনের বেশিরভাগ সময়েই ডক্টর ঘুমের ওষুধ দিয়ে রাখতো মস্তিষ্কের বিশ্রামের জন্য। এরপর ধীরে ধীরে শরীরের জোর ফিরলে হাত -পা সামান্য নাড়াতে সক্ষম হয়। একুশ দিনের মাথায় তার চেতনা ফিরে আসলে প্রথমেই অস্পষ্ট শব্দে স্পর্শীয়ার কথা জানতে চায়। তবে পাভেল সেদিন রাগ দেখায়নি। বরং ঠান্ডা মাথায় ভাইকে শান্ত করার জন্য বলেছিলো,
– চড়ুই ঠিক আছে। আরো সপ্তাহ খানেক আগে বাড়িতে নিয়ে গেছে। তুই টেনশন করিস না।

রাজনীতির রংমহল ৩ পর্ব ৪৪

এরপর নিশ্চিন্ত হয় পরশ। তবুও সামান্য একটু কথা বলার তৃষ্ণা মেটে না। কিন্তু ডাক্তারের পুরোপুরি নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। এমনকি কেবিনের চড়া আলোর দিকেও তাকাতে পারে না। প্রচন্ড মাথা যন্ত্রণা হয়। এমন অবস্থাতে ফোন ইউজ করা তো অসম্ভব ব্যাপার। দিনের মধ্যে অজস্রবার দলীয় নেতাকর্মী, প্রেস-মিডিয়া এবং পরিবারের আত্মীয় – স্বজনরা আসে। তবে কাউকেই ভেতরে ঢুকতে দেওয়া হয় না। দূর থেকে দেখে চলে যায়। এতো এতো মানুষের মধ্যে পরশের চোখ দুটো শুধু স্পর্শীয়াকে খুঁজছে। মনের মধ্যে সুক্ষ্ম অভিমান জমছে – সে যদি সুস্থই থাকে, তবে কি একবার তাকে দেখতে আসতে পারতো না?

রাজনীতির রংমহল ৩ পর্ব ৪৬