Home রিদ মায়ার প্রেমগাঁথা খণ্ডাংশ রিদ মায়ার প্রেমগাঁথা খণ্ডাংশ পর্ব ১২

রিদ মায়ার প্রেমগাঁথা খণ্ডাংশ পর্ব ১২

রিদ মায়ার প্রেমগাঁথা খণ্ডাংশ পর্ব ১২
রিক্তা ইসলাম মায়া

ঘুমন্ত রিদ আতঙ্কে লাফিয়ে উঠে বসল। অস্থির, উত্তেজিত ব্যাকুলতায় গা থেকে ব্ল্যাঙ্কেট উড়িয়ে ফেলে মায়াকে ডাকল চিৎকার করে।
‘রিত? রিত? এই রিত? কই তুই?
রিদের চিৎকার দেয়াল ভেদ করার মতো ছিল। মায়া কক্ষে নেই। অতিরিক্ত উত্তেজনায় রিদের শরীর ঘামছে, হাত-পা মৃদু কাঁপছে। রিদ খালি পায়ে অস্থির ব্যাকুলতায় মায়াকে খুঁজতে দৌড়ে গেল বারান্দায়। রিদের মুখে মায়ার নামের চিৎকার তখনও বহমান। মায়া কক্ষে নেই অথচ রিদ পাগল হয়ে যাচ্ছে মায়াকে খুঁজে ব্যাপারটা কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে ঘটছে। মায়া অসময়ে ওয়াশরুমে গিয়েছিল। রিদের হুলুস্থুল চিৎকারে তাড়াহুড়ো করে কোনো রকমে ওয়াশরুমের দরজা খুলে বের হতে গিয়ে সালোয়ারের পায়ে পা বেঁধে ধুপ করে গেল ওয়াশরুমের সামনে। মায়া পড়ে ব্যথায় উফ শব্দ করার আগে রিদের ডাকের উত্তর দিল চেঁচিয়ে।

‘ এই আমি এখানে! রুমেই আছি।
মায়ার ব্যথাতুর অল্প ডাকে রিদ বিদ্যুৎ গতিতে বারান্দা থেকে দৌড়ে রুমে এল। মায়াকে সহিসালামত দেখতে পেল ওয়াশরুমের দরজার সামনে উপুড় হয়ে পড়ে কনুই ঘষছে ব্যথায়। রিদ তৎক্ষণাৎ দৌড়ে এসে মায়াকে টেনে ফ্লোরে বসে গেল উত্তেজনায়। মায়াকে দুহাতে বুকে জাপটে জড়িয়ে ধরলে মায়ার হাড় ভেঙে যাওয়ার উপক্রম হয় রিদের শক্ত বাহুর চাপে। মায়া নিশ্বাসের অভাবে গোঙাল। অথচ আতঙ্কিত রিদের জানে যেন প্রাণ ফিরেছে মায়াকে সুস্থ দেখে।
মায়া খানিকটা ছটফট করে নিশ্বাস নিতে চাইল। রিদ তখনও মায়াকে নিজের বুকে শক্ত করে চেপে ধরে কীসব বিড়বিড় করছে। হঠাৎ কিছু মনে হওয়ার মতো করে রিদ মায়াকে দ্রুত ছেড়ে মায়ার মুখ-গলা হাতিয়ে দেখতে দেখতে নিজে নিজেই বলল—
‘তোকে হারিয়ে আমি নিঃস্ব হয়ে যাব রিত। প্লিজ আমাকে ছেড়ে যাস না। তোর বিরহ আমার প্রাণে সয় না। পাগল হয়ে যাই আমি।
মায়ার রিদের অস্পষ্ট কথা গুলো বুঝেনি। পড়ে গিয়ে মায়া পায়ে ব্যথা পেয়েছে অথচ রিদ মায়ার গলা হাতড়াচ্ছে কেন তাও বুঝল না। মায়া অসন্তুষ্ট গলা বলল…

‘ কি করছেন আপনি? ছাড়ুন। আমি পায়ে ব্যথা পেয়েছি গলায় না।
মায়া ককর্শ গলায় রিদের মস্তিষ্ক সক্রিয় হয়। মায়া জীবিত সুস্থ তার সামনে আছে। এই নারীকে সে ঘুমাতে বলেছিল কিন্তু এই নারী না ঘুমিয়ে কই গিয়েছিল? রিদ রাগে তপ্ত মেজাজে রি রি করে উঠলো। মায়ার গলা হাতড়ানো রিদের হাতটা তৎক্ষনাৎ মায়ার গলা চেপে ধরে বলল…
‘কই গেছিলি তুই? মানা করেছিলাম না আমাকে না বলে কোথাও যাবি না? কেন গেলি বেয়াদবের বাচ্চা?
রিদের গলা চেপে ধরায় মায়ার কাশি উঠে যায়। গলায় রিদের হাতটা চেপে মায়া রাগান্বিত কন্ঠে বলল…
‘আজব! ওয়াশরুমেও এখন যাব না? মানুষ ওয়াশরুমে কেন যায়? আপনি কেন যান ওয়াশরুমে? আপনি যে কাজে ওয়াশরুমে যান, আমিও সেই কাজে যাই। এবার গলা টিপে মেরে ফেললেও আমি শুনব না। আমি ওয়াশরুমে যাবই।
সিরিয়াস মোমেন্টে এসেও মায়া সিরিয়াস হতে পারলো না। রিদ মায়ার কথায় গলা ছেড়ে দেয়। কিন্তু রিদের রাগ কমেনি আর না অস্থিরতা কমেছে। রিদ মায়ার হাত চেপে তৎক্ষনাৎ টেনে তুলতে তুলতে বলল…

‘ চল আমরা দেশে ফিরে যাব। শপিং করা লাগবে না। আয়।
মায়া ব্যথিত পায়ে রিদকে ধরে দাঁড়াল। রিদের কথার প্রতিবাদ করে বলল…
‘ অসম্ভব আমি শপিং না করে দেখে যাব না। আমাকে আপনি শপিংয়ের লালসা দেখিয়ে বাংলাদেশ থেকে এত দূরে এনে এখন আবার শপিং না করিয়ে খালি খালি বাংলাদেশে নিয়ে যাবেন এটা আমি মানি না। আপনি কি সিঙ্গাপুরে ঘুমানোর জন্য এসেছিলেন? এখন ঘুম শেষ তাই আবার বাংলাদেশে চলে যাবেন?
‘রিত, কথা না বাড়িয়ে আয়। মেজাজ খারাপ হচ্ছে কিন্তু।
রিদ দাঁতে দাঁত পিষে মায়ার হাত টানে রিদের সঙ্গে যেতে। মায়া রিদের থেকে ফের হাত ছাড়িয়ে নিতে চেয়ে বলল….

‘না আমি যাব না। আর দুইদিন পর আমার বিয়ে, বাংলাদেশে গিয়েও সময় পাব না শপিং করার জন্য। আমি কত শখ করে বিয়েটা করছি, আপনার জন্য আবারও আমার বউ সাজার স্বপ্নটা পূরণ হবে না। আপনি সবসময় আমার সাথে এমন মর্জি দেখান। এখন আবার ঘুম থেকে উঠে কথা নেই বার্তা নেই আমাকে টানাটানি করছেন নিয়ে বাংলাদেশে চলে যাবেন বলে। আমার কি কোনো দাম নাই আপনার কাছে। আপনার যা খুশি তাই করুন যান, আমি যাব না কোথাও আপনার সাথে। আপনি একাই বাংলাদেশে যান আর নয়তো আমাকে মেরে রাস্তায় ফেলে যান। কেউ…
ঠাস শব্দে মায়া ফ্লোরে লুটিয়ে পড়ল। রিদের শক্ত হাতের থাপ্পড় পড়েছে মায়ার গালে। রিদের থাপ্পড় খেয়ে মায়া কয়েক সেকেন্ডে মধ্যে শব্দ করে কেঁদে উঠলো অপমানে। রিদ ঘুমানোর আগেও মায়ার সাথে ভালো ছিল, ঘুম থেকে উঠে রিদ কেন মায়ার সাথে মেজাজ দেখাচ্ছে, বাংলাদেশে চলে যাওয়ার জন্য পাগলামি করছে—সেটা মায়া বুঝতে পারছে না। রাগান্বিত রিদ গত রাত ধরে মায়াকে নিয়ে দুঃস্বপ্নে অস্থির। সে ভয় পাচ্ছে মায়াকে নিয়ে শপিংয়ে গেলে যদি সত্যি কোনো বিপদ হয়, সেই চিন্তায় রিদ মায়াকে নিয়ে তৎক্ষণাৎ দেশে ফিরে যেতে চায়। মায়া তার ভালোবাসা আর দুর্বলতার জায়গা দুটোই। রিদ শত সাহসী হলেও মায়াকে নিয়ে সে কোনো চ্যালেঞ্জে যেতে চায় না। তাছাড়া মায়ার অনুপস্থিতি রিদকে দিশেহারা পাগল করে দেয়, সেখানে মায়ার মৃত্যু রিদের শত মৃত্যুর কারণ। রিদ মায়াকে থাপ্পড়টা মূলত এই কারণেই মেরেছে। রিদের দেখা স্বপ্ন আর মায়ার বলা কথা দুটো মিলে যেতে রিদ রাগে তিলমিলিয়ে উঠে থাপ্পড় বসায়। মায়ার কান্নায় রিদ জেদ দেখিয়ে রুম ছেড়ে বেরিয়ে যায়। যাওয়ার আগে দরজাটা বাইরে থেকে লক করে যায় যাতে কেউ ভেতরে ঢুকতে না পারে। রিদ কোথায় গেছে মায়া জানে না। মায়া ফ্লোর থেকে উঠে কাঁদতে কাঁদতে বিছানায় শুয়ে পড়ল ব্ল্যাঙ্কেট মুড়িয়ে। মায়া আর রিদের সঙ্গে কথা বলবে না। এবারেরটা ফাইনাল। কথা নেই বার্তা নেই অকারণে কেন মার খাবে মায়া? মায়া কি কারও সম্পত্তি? যে ইচ্ছেমতো হুকুমজারি করবে?

দুপুর গড়িয়ে বিকেল চারটে। রিদ সেই দুপুর থেকে নিখোঁজ। মায়া ঘুমে। রিদ হোটেলে ফিরল চারটারও পরে। ক্লান্ত রিদ হাতের ফোনটা সোফার টেবিলের ওপর রেখে শার্টের হাতা গুটাতে গুটাতে বিছানার পাশে দাঁড়াল। কোমর ঝুঁকে ঘুমন্ত মায়ার গায়ের ব্ল্যাঙ্কেট ছিটকে ফেলে মায়াকে কোলে তুলে ওয়াশরুমের আয়নার সামনে দাঁড় করাল। মায়া তখনও ঘুমে দুলছে। রিদ মায়ার মাথাটা বেসিনের সামনে চেপে ধরে মুখে ঠান্ডা পানি ছিটাতেই মায়া হৈ হৈ করে উঠল মেজাজে। মায়া রাগে এলোমেলো দুহাতে মুখের পানি পরিষ্কার করতে করতে তিলমিলিয়ে বলল—
‘বাল! ঘুমাইয়াও শান্তি নাই। বৃষ্টি কি ছাঁদ ভাইঙ্গা পড়ে?
মায়ার কথা শেষ হতে না হতেই রিদ ফের মায়ার মাথা চেপে ধরল বেসিনের ট্যাপের নিচে। মায়ার চোখ-মুখসহ চুল ভিজতে শুরু করল এবার। মায়া রাগে, দুঃখে নিশ্বাসের অভাবে ছটফট করে চিৎকার করে উঠল জোরে—
‘আল্লাহ গো আমি শেষ। নিশ্বাস নিতে পারছি না, ছাড়ুন অসভ্য লোক! ছাড়ুন।

রিদ মায়ার বাহু টেনে নিজের দিকে ফেরাল। মায়ার মাথা ভিজে যাওয়ায় গালে ভেজা চুল লেপটে আছে। রিদ আলতো হাতে মায়ার গাল থেকে চুল সরিয়ে দিতে চাইলে মায়া জেদ করে রিদের হাতটা গাল থেকে সরিয়ে দিয়ে পিঠ বাঁকিয়ে দাঁড়াল। রিদের সঙ্গে কথা বলবে না তাই। রিদ রাগল না। এবার শান্ত থাকল। শান্ত ভঙ্গিতে মায়ার বাহু টেনে নিজের দিকে ফেরাল। তীক্ষ্ণ গলায় মায়াকে শাসিয়ে বলল—
‘বাড়াবাড়ি করলে কিন্তু বাথটবে চুবিয়ে রাখব রিত। এমনিতেই অশান্তি লাগছে, নাটক শেষ করো।
মায়া গাল ফুলিয়ে পাশে তাকাল। চোখে অপমানের জল। কত সুন্দর করে মায়া রিদের সঙ্গে শপিংয়ে এল, অথচ অকারণে মার খেল। মায়া গাঢ় অভিমানে বলল—
‘আপনি আরেকটা বিয়ে করুন। আমি আপনার বউ না। আমার এমন জামাই লাগবে না, যান।
‘ তাই? তাহলে কেমন জামাই লাগবে আপনার শুনি ম্যাডাম?
রিদ মায়ার থুতনি চেপে নিজের দিকে ফেরাল। মায়ার চোখে চোখ রেখে কথাটা রিদ তীক্ষ্ণ গলায় বলল। মায়াও উত্তর দিল সেভাবে—
‘ভালো জামাই লাগবে যে আমায় কখনো মারবে না, সবসময় ভালোবাসবে আদর করবে—এমন লাগবে।
‘কাছে আসেন, ভালোবাসি। আমিও তো চাই বউ ভালোবাসতে। আসেন।
রিদ দুহাত প্রশস্ত করে মায়াকে জড়িয়ে ধরতে চাইলে মায়া পিছিয়ে গেল। মায়ার কোমর বেসিনে ঠেকল। মায়া রিদের বুকের পাশে হাত রেখে বাধা দিয়ে বলল—

‘ এই অসভ্য ভালোবাসা চাই না আমি। ভদ্র ভালোবাসা চাই।
রিদ বেসিনের দুপাশে দুহাত রেখে মায়ার মুখের ওপর ঝুঁকে বলল—
‘ অসভ্য মানুষের কাছে সভ্য ভালোবাসা চাইছেন? আপনার ডিমান্ডটা বাজেটের বাইরে চলে গেল না ম্যাডাম?
রিদের উষ্ণ নিশ্বাস মায়ার মুখে পড়ছে। মায়া চোখ তুলে তাকাতেই রিদের সঙ্গে চোখাচোখি হলো। মায়া আগের ন্যায় অভিমানে অভিযোগ করে প্রসঙ্গ পাল্টে বলল—
‘আপনি তখন আমাকে মারলেন কেন?
‘আমি কিন্তু বউকে শুধু মাইর না আদরও করতে জানি ম্যাডাম। দেখবেন?
রিদ খানিকটা ঝুঁকে চট করে মায়ার বাম গালে শব্দ করে চুমু খেল। এই গালটায় রিদ তখন থাপ্পড় মেরেছিল, সেজন্য সেখানে রিদ একবার নয়, দুবার নয়—পরপর বেশ কয়েকটা চুমু খেল। রিদ সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে মায়ার কোমর চেপে বুকে ঠেকাল। মায়ার ঘাড়ের পিছনে হাত রেখে মায়ার গালে রিদ নিজের নাক ঘষে আসক্ত গলায় ডাকল মায়াকে—

‘বউ?
‘হুমম।
‘তোমার অনুপস্থিতি আমায় পোড়ায়। ভীষণ পোড়ায়, প্রাণে সয় না।
রিদ এক টুকরো আবেগ সবেমাত্র মায়ার সাথে শেয়ার করল। রিদ এই প্রথম সজ্ঞানে মায়ার সঙ্গে একটা ইমোশনাল কথা বলেছে। মায়া রিদকে ইমোশন হতে দেখে বলল—
‘তাহলে আমাকে আপনি আর মারবেন না কেমন? আমি একদিন মরে গেলে তখন কী করবেন আপনি? বউ ছাড়া একা জীবনটা তো আপনারই কষ্ট হবে তাই না।
মায়ার কথা শেষ হতে না হতেই রিদ মায়াকে ধাক্কা দিয়ে নিজের থেকে সরিয়ে দিল। মায়া পড়ে যেতে গিয়েও কোনো রকমে বেসিন ধরে দাঁড়িয়েছে। রিদ তিরতির মেজাজে মায়াকে শাসিয়ে বলল—
‘তুই আসলেই মার খাওয়ার মানুষ, বেয়াদব!

রিদ ত্যাড়ামি করে ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে গেল। মায়া ভেজা জবজবে শরীরে দাঁড়িয়ে রইল। মায়া রিদকে কী এমন বলল তা তখনও বুঝল না। একটু কি স্বামীর সাথে ইমোশনাল কথা বলা যাবে না? রিদ কখনো নিজের ইমোশনাল দিকটা প্রকাশ করতে চায় না। করেও না। আজ কীভাবে যেন একটু প্রকাশ করে ফেলেছে। মায়া যদি বোকামি করে উত্তর না করত, তাহলে রিদ হয়তো ইমোশনাল হয়ে আরও কিছু বলে ফেলত। রিদ মায়াকে নিয়ে অসময়ে দেখা বাজে স্বপ্নটি নিয়ে চিন্তিত। সেই চিন্তা থেকেই রিদ মায়ার জন্য তিনজন সেলস গার্ল আর একজন ফ্যাশন ডিজাইনার কন্টাক্ট করে হোটেলের লবিতে ডেকে এনেছে। রিদ মায়ার যাবতীয় বিয়ের শপিং সেখান থেকেই করে দিবে, তারপরও রিদ মায়াকে নিয়ে হোটেলের বাইরে যাচ্ছে না রিস্ক নিয়ে। রিদের মনে হচ্ছে মায়া হয়তো সেফ না। আশেপাশে কিছু একটা হচ্ছে যেটা মায়াকে রিদের থেকে দূরে করতে চায়।
মায়া বোকার মতো ওয়াশরুমে দাঁড়িয়ে রিদের চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইল। রিদ রুমে গিয়ে চেঁচিয়ে ডাকল মায়াকে ফ্রেশ হয়ে বের হতে। রিদের ধমকে মায়া উত্তর দিয়ে বলল—
‘আমার কাপড় ভেজা। কীভাবে আসব?

‘পায়ে হেঁটে আসো।
রিদের ত্যাড়ামি উত্তরে মায়া বিরক্ত হয়ে বলল—
‘ট্রলি থেকে আমাকে একটা ড্রেস দিন। আমি ভেজা কাপড়ে বাইরে আসতে পারব না।
‘তাহলে কাপড় খুলেই আসো।
‘ছিঃ! আপনি কত খারাপ।
‘ছিঃ কী? এমনভাবে বলছ যেন জীবনে প্রথম তোমাকে দেখব? আগে দেখি নাই কিছু?
ওয়াশরুমে থেকেও রিদের ঠোঁটকাটা কথায় মায়া লজ্জা সিঁটিয়ে গেল। মায়া জেদি গলায় বলল…
‘আমি আসব না বাইরে। যান আপনি।
আজ রিদ হয়তো শপথ করেছে মায়াকে শান্তি দিবে না। রিদ একটা না একটা প্রসঙ্গ টেনে মায়াকে হেনস্ত করছে। রিদ ফের বলল…
‘রুমে না আসলে তাহলে ওয়াশরুমে কি করবে? গু খাবে?
‘ছিঃ! ওয়াক!
মায়া নাক-মুখ কুঁচকাতে কুঁচকাতে দ্রুত ওয়াশরুম থেকে বেরুল। রিদ তখন গায়ের পোশাক চেঞ্জ করে শরীরে সাদা টি-শার্ট জড়াচ্ছে। পরনে কালো ট্রাউজার। মায়াকে ভেজা কাপড়ে বের হতে দেখে রিদ আয়নার ভেতর দিয়ে মায়ার দিকে তাকিয়ে বলল—

‘সময় পাঁচ মিনিট। এর মধ্যে রেডি না হলে তোমার বিয়ে ক্যানসেল।
‘আপনি আমাকে সিঙ্গাপুরে নিয়ে এসেছেন ত্যাড়ামি করতে?
‘চার মিনিট ত্রিশ সেকেন্ড বাকি আছে।
বাধ্য হয়ে রিদের কথায় মায়া তাড়াহুড়ো করে ট্রলি থেকে কাপড় নিয়ে ওয়াশরুমে ঢুকল। রিদ চুল ব্রাশ করে বাম হাতের কবজিতে একটা রোলেক্স ঘড়ি জড়াচ্ছে, তখন রুমের দরজায় মক করলো কেউ। রিদ দরজা খুলে দিতে হোটেলের ম্যানেজার স্টাফদের দিয়ে রুমে বাঙালি খাবার নিয়ে এসেছে। এথেন্স একজন খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বী। বয়স চল্লিশের ঊর্ধ্বে। বিবাহিত পুরুষ। স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে চাকরির সুবাদে সিঙ্গাপুরে থাকে। রিদের একজন বিশ্বস্ত মানুষ এথেন্স। এর আগে রিদ যতবার সিঙ্গাপুরে এসেছে এই হোটেলেই উঠেছে। রিদের সব ধরনের সুযোগ-সুবিধার দিকটা এথেন্স নিজ দায়িত্বে দেখে। এথেন্স স্টাফদের চলে যেতে বলে রিদের উদ্দেশ্যে সে হাত বাড়িয়ে হাসিমুখে ইংরেজিতে বলল—

‘আশা করছি আর কোনো সমস্যা হবে না মিস্টার খান। আমাদের ফুল সিকিউরিটি আপনাদের নিরাপত্তা দেবে। আপনি নিশ্চিন্তে আপনার মিসেসকে নিয়ে আমার হোটেলের লবিতে শপিং করতে পারবেন। সবকিছু ম্যানেজ করা হয়েছে।
হাত মিলিয়ে গম্ভীর গলায় ছোট করে ধন্যবাদ জানাল রিদ এথেন্সকে। এথেন্স চলে যেতে রিদ কিছু একটা ভেবে নিজের ফোনটা নিয়ে বারান্দায় গেল। মায়া ততক্ষণে ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে সোফার টেবিলে খাবার সাজাল। রিদ বেশিক্ষণ না খেয়ে থাকতে পারে না। দুপুরে রাগারাগির কারণে হয়তো এখনও না খেয়ে আছে। মায়া দুটো প্লেটে খাবার তুলে নিল। রিদকে রুমে দেখা যাচ্ছে না, হয়তো বারান্দায় আছে। মায়া রিদের অপেক্ষা করতে লাগল। কয়েক মিনিটের মধ্যে রিদ মায়ার পাশাপাশি সোফায় এসে বসল। মায়া রিদের দিকে খাবারের প্লেট এগিয়ে দিয়ে বলল—
‘কিছু হয়েছে আপনার? কেমন চিন্তিত দেখাচ্ছে আপনাকে?
‘কিছু না।
রিদের ছোট উত্তর। রিদের দৃষ্টি স্থির ফোনে। খাবার খাচ্ছে না আর না খাবারের প্লেট নিচ্ছে। মায়া রিদের মতিগতি বুঝতে পারছে না। কয়েক সেকেন্ড অপেক্ষা করে মায়া রিদকে বলল—
‘আমি খাইয়ে দেয়?
বলা মাত্রই রিদ তৎক্ষণাৎ হাঁ করল খেতে। মায়া রিদের প্লেট নিজের কাছে টেনে রিদের মুখে লোকমা তুলে দেয়। রিদ বিনা বাক্যে মায়ার হাতে পুরোটা খাবার শেষ করে। প্লেটের খাবার শেষ হয়ে গেলে মায়া বলল—
‘আর নেব? খাবেন?

‘না।
মায়া হাত ধুয়ে রিদকে পানি খাইয়ে খালি গ্লাসটা হাতে নিয়ে রিদের দিকে তাকাল। রিদ পুরোটা সময় ফোনে কী যেন করেছে। কপালে সূক্ষ্ম ভাঁজ। কখনো এমন হয় না রিদ খেতে বসে ফোন হাতে নিয়েছে। আজই প্রথম মায়া রিদকে ফোন হাতে খেতে দেখল। মায়া বলল—
‘আপনার সমস্যা হলে চলুন আমরা বাংলাদেশে চলে যাই।
রিদের কোনো উত্তর নেই। রিদ পাল্টা প্রশ্ন করল তীক্ষ্ণ গলায়—
‘ তোমার এমন কিছু আছে রিত যেটা তুমি কখনো আমাকে বলোনি? আমার অজানা কিছু?
মায়া রিদের কথার প্রসঙ্গটা বুঝল না। মায়ার জীবনে এমন কোনো কিছু নেই যেটা রিদ জানে না। মায়ার সম্পর্কে রিদ সবই জানে, তাহলে মায়া আবার নতুন করে কী লুকাবে? মায়া তৎক্ষণাৎ উত্তর দিল—

‘না, এমন কিছু নেই।
‘ভেবে বলছ?
‘হ্যাঁ। কেন, কী হয়েছে?
‘কিছু না।
‘বলুন না কী হয়েছে?
‘পাঁচ মিনিটে খাবার শেষ করো, কুইক।
রিদ প্রসঙ্গ পাল্টাতে চাইল। মায়া জেদি গলায় বলল….
‘কী হয়েছে একটু বললে কী হয়? আমি তো আপনার বউই হয়, তাই না?
রিদকে তারপরও কিছু বলতে না দেখে মায়া প্লেটে খাবার তুলতে তুলতে বলল—

রিদ মায়ার প্রেমগাঁথা খণ্ডাংশ পর্ব ১১

‘আমি কিন্তু জানি আপনি আমার জন্যই চিন্তিত। আমি সব বুঝি। আচ্ছা ধরেন, আমি হুট করে গায়েব হয়ে গেলাম। আর আপনি আমাকে কোথাও খুঁজে পেলে না। এভাবেই দিন পার হয়ে বছরের পর বছর গেল, তখন আপনি কী করবেন?
মায়ার অদ্ভুত কথায় রিদও হেয়ালি উত্তর করে বলল…
‘কী করব? আরেকটা বিয়ে করব। এভাবে বছরের পর বছর একা থাকা যায় নাকি পাগল।

রিদ মায়ার প্রেমগাঁথা খণ্ডাংশ পর্ব ১৩

6 COMMENTS

  1. লেখিকা এত দেরি করে একেকটা পর্ব দেয় কেন বুঝিনা আজব

Comments are closed.