রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ২৬
সোহানা ইসলাম
জারা’র হাতের মুঠোয় ভাঁজ করে ধরা ছিল একটা চিঠি। মুখটা অদ্ভুত রকমের অস্বস্তিতে ভরা ছিল, গলার স্বরটাও যেন কেমন কেঁপে উঠছিল তার। চিঠিতে কি থাকতে পারে? সে চিঠিটা হাতে তোলার আগেই পেছন থেকে কে যেন বলল, “ওমা! চিঠি? দেখি কি লেখা আছে এতে ?”
মিম আর ফিহা—চিরচেনা দুটো মুখ, চিরচেনা দুষ্টুমি।চিঠিটা ওদের চোখে পড়তেই যেন আগুনে ঘি পড়ল। কেড়ে নিলো এক ঝটকায়। “দে দেখি, তোর জন্য কী প্রেমপত্র লিখছে না-কি আরমান ভাইয়া!” মিম হেসে উঠল।
ফিহা ততক্ষণে চিঠির একপাশ ধরে ফেলেছে। দুজনের মধ্যে দস্তাদস্তি শুরু হলো। জারা কিছু বলতে যাচ্ছিল, হাত বাড়িয়ে থামাতে চাচ্ছিল, কিন্তু সব যেন খুব দ্রুত ঘটে গেল।
চিঠিটার ভাঁজ ছিঁড়ে গেল। কিছু লেখা ছিঁড়ে পড়ে গেল মাটিতে। বাকিটা ফিহার হাতেই কুঁচকে রইল।এক মুহূর্তে যেন সময় থেমে গেল।
জারা শুধু তাকিয়ে রইল চিঠির ছেঁড়া টুকরো গুলোর দিকে। কী লেখা ছিল, কেনই বা তাকে এটা দিল—সবই এখন অজানা। সেই না-পড়া শব্দগুলো চিরতরে হারিয়ে গেল। সে কিছু বলল না। চোখে একটা ফাঁকা দৃষ্টি নিয়ে মাটির দিকে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ। তারপর নিচু হয়ে ছেঁড়া কাগজগুলো কুড়িয়ে নিল—যেন কোনো মূল্যবান স্মৃতি ধরে রাখার শেষ চেষ্টা।
মিম হেসে বলল, ” ইসস ছিঁড়ে গেছে চিঠি টা !”
ফিহা একটু কটাক্ষ করে বলল, ” ছিঁড়লেই বা কি আমি তো আগেই বলছি আরমান ভাইয়া এসে ক্ষমাও চাইল, তাই না? কাগজে হয়তো সরি লেখা ছিল সুন্দর করে। ”
জারা এবারও কিছু বলল না। কাঁধের ব্যাগটা ঠিক করে নিয়ে ধীর পায়ে হাঁটতে শুরু করল। কারো দিকে তাকায়নি, পিছনেও ফিরে দেখেনি।চিঠির ছেঁড়া টুকরোগুলো এখন তার হাতের মুঠোয়। কিন্তু সবচেয়ে মূল্যবান অংশটা সে আর কোনোদিনই জানতে পারবে না—চিঠির ভিতরের কথা, আর্মানের মনের কথা।
পথে হাঁটতে হাঁটতে তার চোখে জল এল না, কিন্তু বুকের ভিতরটা ভারী হয়ে গেল।একটা চিঠি, একটা শব্দ… একটা মুহূর্ত—এই তিনটার না-পাওয়ার আক্ষেপে তার হৃদয়ের কোনা যেন চিরকাল ছেঁড়া রয়ে যাবে।
জারা যখন কিছু না বলে চলে গেল, তার পেছনে রোদ পড়া মাঠটা যেন একেবারে নিঃস্তব্ধ হয়ে গেল। বাতাস থেমে গেল যেন। চুপচাপ কেবল তার কাঁধের দুলে ওঠা হালকা ব্যাগ টা নড়ছিল হাওয়ায়। মিম আর ফিহা তাকিয়ে রইল তার চলে যাওয়া পথের দিকে।
— মিম আস্তে করে বলে:—”জারা কিচ্ছু বলল না…”
— ফিহা নিচু গলায় বলে– “চলে গেল একদম চুপচাপ হয়ে ।”
হাসি থেমে গেছে দুজনের মুখেই। চিঠির ছেঁড়া অংশগুলো এখন তাদের চোখেও কেমন যেন অচেনা লাগছে। একটু আগেও যে বিষয়টা নিছক মজা ছিল, এখন সেটা আর কেমন ঠাট্টা মনে হচ্ছে না।
— মিম: “আমরা কি একটু বেশিই করে ফেললাম?”
— ফিহা নিঃশ্বাস ফেলে বলে –“আমার মনে হয়… হ্যাঁ। জানু খুব কষ্ট পেয়েছে। চোখে কিছু ছিল না, কিন্তু… মনে খুব কষ্ট ছিল ওর।”
দুজনে কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। চারপাশের শব্দগুলো যেন আর পৌঁছাচ্ছিল না তাদের কানে। কেবল জারার হাঁটা, চুপচাপ থাকা, ছেঁড়া চিঠি হাতে তুলে নেওয়ার মুহূর্তগুলো বারবার ফিরে আসছিল চোখে।
— মিম ধীরে বলল বলে–“ওর কাছে ওই চিঠিটা অনেক গুরুত্বপূর্ণ ছিল, তাই না?”
— ফিহা মাথা হেঁট করে বলে– “হয়তো ও অনেক কিছু জানার অপেক্ষায় ছিল। হয়তো এটাই ওর জন্য… অনেক বড় কিছু ছিল। আমরা ছিঁড়ে ফেললাম ওটা।”
হাওয়ার মাঝে ঝিরঝির শব্দ হচ্ছিল, তবুও যেন কিছু একটা অনুচ্চারিত থেকে যাচ্ছে ওদের ভিতরে। এই প্রথমবার, মিম আর ফিহার মনে একটা অপরাধবোধ বাসা বাঁধে। তারা বুঝতে পারে, মজার নাম করে তারা একটা হৃদয়ের আবেগকে তুচ্ছ করে ফেলেছে।
— মিম: ” জানু কাল কলেজে আসলে অনেক গুলো সরি বলে দিব! ”
— ফিহা: “আমিও বলব, কিন্তু জানি না..জানু মাফ করবে কিনা।”
দুজনের চোখে তখন একটা নতুন চিন্তা—ক্ষমা চাওয়ার, বন্ধুত্ব ফিরে পাওয়ার। কিন্তু তারা জানে, কিছু কিছু ক্ষত থাকে, যেগুলো ক্ষমা পেলেও দাগ রেখে যায়।
জারা মন খারাপ করে বাসায় ঢুকছিল ধীরে ধীরে। মাথায় শুধু একটাই চিন্তা ঘুরছে—চিঠিটা যদি পড়তে পারত! শব্দগুলো যদি একবার চোখে পড়ত!
কিন্তু দরজার কাছে এসে দাঁড়াতেই সে যা দেখল, তার মনখারাপ যেন এক ঝটকায় হালকা হয়ে গেল।
ঘরের ভেতর থেকে ভেসে আসছে মারজিয়া বেগমের চিৎকার, আর দৌড়ানোর শব্দ।
— “আজ তোরে আমি একেবারে বানর বানাইয়া ছাইড়া দিমু!”
আর সেই চিৎকারের মাঝে ছোট ছোট পায়ের ছপছপ শব্দে পালিয়ে বেড়াচ্ছে কেউ। জারা দরজা খুলেই দেখে—জোহান ঘরের এপ্রোন পরে, মুখে একটা কাঁচা লাউয়ের টুকরো কামড়ে, মাথায় মায়ের শাড়ি জড়িয়ে ‘রাঁধুনি’ সেজেছে। হাতে লাঠির বদলে রান্নার চামচ!
জারাকে দেখেই ওর চিৎকার বলে
— “বনু! আম্মু আমারে বিয়া দিতে চায়! বাঁচাও!”
জোহান এক দৌড়ে এসে জারার পেছনে লুকাল।
— জারা হতবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে —”এই… কি করছিস তুই?! এই আবার কেমন পাগলামি?”
ঠিক তখনই মারজিয়া বেগম ঝাড়ু হাতে এসে হাজির। চুল খোলা, ঘামে ভেজা কপাল, চোখ রাগে লাল।
— জারা ভয়ার্তভাবে বলে–: “আম্মু! কি হইছে? ওরে এইভাবে দৌড়াচ্ছেন কেন?”
মারজিয়া বেগম দাঁত চেপে বললেন_
— “তোর ভাইয়ের মাথা গেছে জারা! পিঠার মিশ্রণে ভ্যানিলা এসেন্স পড়ায়, সে মনে করছে এটা ‘জাদুর সুগন্ধি’! এখন ঘরের মধ্যে ‘শেফ ফিয়ারোসা’ নামে রান্না শো শুরু করছে। লাইভ রান্না নাকি! আমার গায়ে ডিম ছুড়ছে ‘প্রেজেন্টেশন’ বলে!!”
জারা দু’চোখ বড় বড় করে জোহানের দিকে তাকাল। সে তখনও অভিনয়ে ডুবে—মাথা ঘুরিয়ে বলল:— “ওয়েলকাম টু কিচেন কা কিঙ্গ! আজ আমরা বানামু এক্সপ্লোডিং ডিম পরোটা! যারা লাইভ দেখতেছেন, সাবস্ক্রাইব দিতে ভুলবেন না!”
জারা এবার আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। একপ্রকার হেসেই গড়াগড়ি খেয়ে পড়ে গেল সোফার উপর।— “এক্সপ্লোডিং ডিম পরোটা?! হায় রে ভাই আমার!”
মারজিয়া বেগম হাল ছেড়ে দিয়ে বললেন,
— “এই ছেলেরে আমি আর বুঝি না। তুই যদি সামলাস, তাইলে বাঁচি। না হলে আমি ইউটিউবে ‘ঝাড়ু মারার টিউটোরিয়াল’ দিয়া চ্যানেল খুলতেছি দাঁড়া! ”
জারা হেসে হেসে চোখ মুছতে লাগল। যতই মন খারাপ থাকুক, এমন ভাই আর এমন মা থাকলে দুনিয়ার সব দুঃখ একপাশে ঠেলে রাখা যায়—এই কথাটা বুঝতে আর বাকি রইল না।
রাতটা নেমেছে ধীরে, নিঃশব্দে। বাইরের পাখিরা থেমে গেছে, বাতাসও যেন একটুখানি গা ছমছমে।
ঘরের সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে। কেবল জারা নিজের ঘরে, বিছানায় বসে আলো জ্বালিয়ে রাখে। একহাতে ডায়েরি, অন্য হাতে সেই ছেঁড়া চিঠির টুকরোগুলো।
একটা একটা করে কাগজের খণ্ডগুলোর দিকে তাকায় সে। কিছু অক্ষর অস্পষ্ট, কিছু শব্দ অর্ধেক—তবু কী যেন ছিল ওগুলোর মধ্যে।
একটা লাইন স্পষ্ট দেখা যায়:
“…তোমাকে অনেক কিছু বলার ছিল…”
জারা চুপচাপ বসে থাকে।
তার চোখে জল নেই, কিন্তু বুকের ভেতরে এক অদ্ভুত ভার। যেন এই না-পড়া কথাগুলোর মধ্যে কোনো অসম্পূর্ণ গল্প লুকানো।
হঠাৎ সে ডায়েরি খুলে কলম তুলে নেয়।
চোখের সামনে সেই অর্ধেক শব্দ, ভাঙা বাক্য, আর মনে পড়ে আরমানের মুখ—লাজুক, অসহায়তা, এলোমেলো অবস্থা, কিছু বলতে গিয়েও থেমে যাওয়া সেই মুহূর্ত।
জারা লিখতে শুরু করে।
রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ২৫
“আপনি যদি কিছু বলতে চাও, আমি এখনো শুনতে চাই।হয়তো চিঠিটা ছিঁড়ে গেছে, কিন্তু আমি তা জুড়ে নিতে জানি—শব্দ দিয়ে, অনুভূতি দিয়ে।আমি অপেক্ষায় আছি, কোনো নাটক ছাড়াই, কেবল সত্যি কথাগুলোর জন্য।”
ডায়েরির পেছনে ছেঁড়া কাগজগুলো সযত্নে গুঁজে রাখে সে।
