রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ৭৩
সোহানা ইসলাম
রাত দুইটা বাজে। সারা বাসা নিঝুম। শুধু একটি রুমে আলো জ্বলছে—মিম আর রাশেদের রুম। শীতের রাত, জানালা দিয়ে হালকা বাতাস ঢুকে পর্দা দুলছে। কিন্তু মিমের চোখে কোনো ঘুম নেই। তার পেট এখন বেশ বড়, আট মাসের গর্ভবতী। শ্বাস নিতে কষ্ট হয় মাঝে মধ্যে, ঘুমের মধ্যে টান ধরে পায়ে। এই অবস্থার চাপে তার মেজাজ প্রায়ই ওঠানামা করে।
রাশেদ ঘুম থেকে আধা জেগে বলে,
—“ কী হয়েছে মিম? আবার ঘুম আসছে না?”
মিম বালিশে ঘাড় ঘুরিয়ে রাগান্বিত চোখে তাকায়,
— “আপনার মুখ দেখতে ভালো লাগছে না। একটু মেক–আপ করে আসুন। আমার মুড খারাপ লাগছে।”
রাশেদ হতভম্ব।
— “এই রাতে? মেক–আপ? মিম… তুমি সিরিয়াস?”
— “হ্যাঁ সিরিয়াস! আমার চোখে কুৎসিত লাগছে।” সুন্দর হয়ে আসুন।
রাশেদ গভীর নিঃশ্বাস ফেলে। ক্লান্ত, তবুও উঠে দাঁড়ায়। ওয়াশরুমে গিয়ে মুখ ধুয়ে কিছু ওয়াইন্টন পাউডার লাগিয়ে বের হয়। চোখে ঘুম, কিন্তু মুখে হাসি আনার চেষ্টা।
গলা নিচু করে বলে,
—“ এবার কেমন লাগছে? পছন্দ হলো?”
মিম ঠোঁট ফুলিয়ে বলে,
—“ ঠিক আছে… এতটা খারাপও না। কিন্তু আমার মাথা ব্যাথা করছে। ঘুম আসছে না তো!”
রাশেদ এসে বিছানায় বসে। আলতো করে হাত রাখে তার পেটের ওপর,
— “সোনা, তুমি শুনছো মা কি বলছে? মা নাকি বাবা আর তার মেক–আপ দেখে বিরক্ত!”
মিম কাঁদো কাঁদো স্বরে সঙ্গে সঙ্গে বলে,
— “এভাবে আমার বাচ্চাকে জড়াবেন না। সে কোনো বিচার করছে না। আমার বাচ্চা আমার মতো হয়?”
রাশেদ সরাসরি ক্ষমা চায়,
—“ আচ্ছা বাবা। কিছু বললাম না। এখন ঘুমাও। আমার বাচ্চার মা-হতে-যাওয়া রানি।”
মিম চোখে জল নিয়ে বলে,
—“ আমার ভয় লাগে রাশেদ… যদি বাচ্চা আমার মতো একগুঁয়ে হয়? যদি আমরা ওকে বুঝতে না পারি? যদি মা–বাবা হতে ব্যর্থ হই?”
রাশেদ একদম কাছে টেনে নেয়,
— “ আমরা একসঙ্গে শিখব। ভুল করব, শোধরাবো… কিন্তু কখনোই বাচ্চাকে একা অনুভব করতে দেব না। তুমি তো জানো, আমি ওর প্রথম হিরো হতে চাই আর তুমি হবে ওর প্রথম ভালোবাসা।”
মিম একটু স্থির হয়। মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়ে ধীরে ধীরে। রাশেদ তাকিয়ে থাকে। মিমের এমন খাম -খেয়ালিপনা প্রায় প্রতিদিনই হয়—হরমোনের চাপ, ব্যথা, ভয়… সব মিলিয়ে গর্ভধারন মানে শুধু আনন্দ নয়, অসহ্য মানসিক চাপও। সে এসব দেখে দেখে ক্লান্ত হয়, বিরক্ত হয় না, মিমের চোখের জল দেখলেই যেন সব ক্লান্তি মিলিয়ে যায়। একটু পর সে নিজেও ঘুমিয়ে পড়ে।
ভোর ৬টা। চারদিকে কুয়াশা। শীতের বাতাসে হাত জমে আসে। এবার দৃশ্য অন্য রকম। জিনিয়া, যার গর্ভ এখন সাত মাসের, শ্বশুরবাড়ির বারান্দায় দাঁড়িয়ে। নামাজ শেষ করে এসে দাঁড়ায়।
ওর গায়ে কোনো গরম কাপড় নেই। মুখে একধরনের ক্লান্তি, চোখে নিদ্রাহীন রাতের ছাপ। গতকাল রাতেই রোহান তাকে এখানে নিয়ে এসেছে। ওবাড়িতে বাড়ি ভালো লাগছিল না।খান ম্যানশনে আছে অনেক দিন। তাই একটু এই বাড়িতে এসেছে। রোহানেরও ভালো লাগবে। কারণ এখানে ওর মা -বাবার সৃতি জড়িয়ে আছে। তার মনে হচ্ছিল—শুধু রোহানের কাছে একটুখানি শান্তি পাওয়া যাবে। তাই সে এসেছে।
রোহানও উঠে নিচে যায়।খাবার আনতে। কাল রাতে কিছু খাননি জিনিয়া। হঠাৎ রোহান রুম থেকে বেরিয়ে এসে দেখে—জিনিয়া বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে শীতের কাঁপুনি উপেক্ষা করে।
রোহান বিরক্ত গলায় বলে,
—“ তুমি কি পাগল নাকি? এই ঠান্ডার মধ্যে দাঁড়িয়ে আছো? গায়ে কিছু নাও নি কেন !”
জিনিয়া শান্ত গলায় বলে,
— “এভাবে ভালো লাগছে।”
রোহান বিরক্ত হলেও নরম স্বরে বলে,
—“ ভালো লাগছে মানলাম… কিন্তু তোমার অবস্থা চিন্তা করো। ঠান্ডা লাগলে? সারারাত না ঘুমিয়ে এখন আরও অসুস্থ হতে চাইছো নাকি?”
জিনিয়া চোখ উত্তোলন না করেই বলে,
— “বেশি কথা বলবেন না।”একটু বিরক্তি, একটু অভিমান।
রোহান মৃদু হাসে। মাতৃত্ব মেয়েদের খুব নরমও করে আর কখনো খুব একগুঁয়েও।সে জিনিয়ার হাত ধরে রুমে নিয়ে আসতে চায়।
— “ চলো। ভিতরে চল।”
জিনিয়া বলে,
— “ বললাম তো ভালো লাগছে এখানে। এখনই যাবো না।”
রোহান এবার রাগ দেখায় না। ধীরে ধীরে কোট গায়ে জড়িয়ে দেয় তাকে।
— “তাহলে দাঁড়াও। কিন্তু গরম কাপড় পরে দাঁড়াও।”
জিনিয়া এবার নরম হয়। কিছু না বলে দাঁড়িয়ে থাকে। রাতের ক্লান্তি এবং মন–খারাপ তার চোখের পাতায় ভারী হয়ে আছে।
রোহান তার মাথার পাশে দাঁড়িয়ে বার বার তাকায়।
জিজ্ঞেস করে,
— “ কষ্ট হচ্ছে? আমার বেবি কী বেশি জালাতন করছে চাঁদ সুন্দরী? ”
জিনিয়া উত্তর দেয় না। নিঃশ্বাস একটুখানি কাঁপে।
রোহান তখন বুঝে…এটা শুধু ঠান্ডা নয়, এটা এক ধরনের মানসিক একাকীত্ব।
রোহান তাকে রুমে নিয়ে আসে। রুমে রাখা খাবার সামনে ধরে।
— “কাল রাতে খাওনি। এখন কিছু খাও। না হলে বাচ্চা দুর্বল হবে। সাথে আমার চাঁদ সুন্দরী? ”
জিনিয়া অভিমান করে বলে,
— “খেতে মন চায় না। আমার খিদে নেই।”
রোহান কড়া স্বরে —
— “ তোমার খিদে থাক বা না থাক, বাচ্চার তো খাবার দরকার। তোমার শরীরই ওর পৃথিবী। জোর করে হলেও খেতে হবে।”
জিনিয়া তাকায়। তার চোখে জল চিকচিক করে।
— “ তুমি আমার কষ্ট বোঝো না। আমি একা… হয়েগেছি? আমাকে আর আগের মতো ভালোবাসেন না।আমি কী বদলে গেছি? আগের থেকে মোটা হয়ে গেছি বলে আপনি আমার সাথে এমন করেন?”
রোহান থমকায় জিনিয়ার কথা শুনে। রোহান মৃদু স্বরে বলে,
— “তুমি বদলাওনি সোনা। পরিস্থিতি বদলেছে। শরীর বদলেছে। অনুভূতি বদলেছে। মাতৃত্ব বদলেছে। আর আমি আছি তোমার পাশে। সবসময়।আর তোমার প্রতি আমার ভালোবাসা কমার নয়। ”
জিনিয়া মুখ নামিয়ে বলে,
— “ ভয় পাই রোহান… মা হতে পারবো তো? শিশুটি যদি আমাকে অপছন্দ করে? যদি আমি ব্যর্থ হই?”
রোহান তার হাত চেপে ধরে,
— “তুমি ব্যর্থ হওয়া সম্ভবই না। তুমি প্রতিদিন আমার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর কাজটা করছো। আমার সন্তানকে বড় করছো… বুকের ভিতরে।”
এবার জিনিয়া চোখের জল সামলাতে পারলো না।
কথা জড়িয়ে যায়,
—“ আমি চাই আমার বাচ্চা তোমার মতো হোক। শান্ত, ধৈর্যশীল। আমার মতো নয়… যে এখন কথায় কথায় রাগ দেখায়!”
রোহান বলে,
— “ তোমার রাগও সুন্দর। তোমার অভিমানও আমার ভালো লাগে। কারণ এগুলো তোমার ভালোবাসার অংশ।”
তারপর সে জোর করে জিনিয়ার মুখে এক চামচ খাবার দেয়।
__“ এখন চুপচাপ খাও সোনা!”
জিনিয়া বিরক্ত ভান করে বলে,
— “ জোর করবেন না।”
— “জোর করছি। কারণ আমি আমার বাচ্চার বাবা।এখন খাবার শেষ করলে ঘুরতে নিয়ে যাবো”
দুজনেই কিছুক্ষণ চুপ থাকে।ঘুরতে যাওয়ার কথা শুনে জিনিয়া চুপচাপ সব খাবার শেষ করে।
জিনিয়ার মনে মা হওয়ার স্বপ্ন,নতুন জীবনের ভয়
আর ভালোবাসার অদ্ভুত রূপ।
খান ম্যানশনে সকাল আটটা। সাধারণত এই সময়ে ভোরের কোলাহল শোনা যায়—ফিহা জাহেদ, জিনিয়া রোহান, তাদের হাঁটাহাঁটি, হাসাহাসি, খুনসুটি। কিন্তু আজ আশ্চর্য নীরবতা। যেন বাড়িটা একটু ঘুমিয়ে আছে। কারণ—ফিহা ও জাহেদ ইসলামপুরে ওদের সাথে জেরিন ও , মিম নিচের রুমে, জিনিয়া রোহানের সঙ্গে শ্বশুর বাড়িতে।
পুরো বাসার প্রাণ তিনজন—ফিহা, জাহেদ আর জেরিন—অনুপস্থিত। ফলে ব্রেকফাস্ট টেবিল, ড্রইং রুম, বাগান—সব কিছু অস্বাভাবিকভাবে শান্ত।
আরমানের রুমে এর মধ্যেই একটা ছোটখাটো নাটক চলছে। জারা মেঝেতে কার্পেট সরিয়ে বসে আছে। ঠান্ডার দিন, মেঝে বরফের মতো। কিন্তু সে মুখ গোমড়া করে বসে আছে। তার মন খারাপের প্রধান কারণ—আরমান তাকে পাত্তা দিচ্ছে না।
আরমান অফিসের প্রস্তুতি নিচ্ছে। শার্ট পরে, টাই গুছিয়ে, ঘড়ি পরছে; মাঝে মাঝে এক চিলতে অবাক–হাসি নিয়ে জারার দিকে তাকায়। মনে মনে বলে __“ এই হাফ ইঞ্চি মেয়ে কি করে এভাবে রাগ করে?” কিন্তু সে কিছু বলে না। পাত্তা দেয় না।
জারা আর সহ্য করতে পারলো না।চিৎকার করে বলে,
—“ আপনি আমাকে পাত্তা দিচ্ছেন না কেনো?”
আরমান সোজা উত্তর,
— “আমি পাগলের সঙ্গে কথা বলি না।”
জারা হা করে তাকায়।
—“ আমি পাগল!?”
আরমান শান্ত মুখে বলে,
— “এই শীতের মধ্যে কার্পেট তুলে মেজেতে বসে আছো—এটা পাগলের কাজ না?”
জারা এবার উঠে এসে সরাসরি আরমানের পা জড়িয়ে ধরে বসে পড়ে। আরমানের মাথা ব্যথা করে।
মেয়েটার এই কান্না–হাসি–অভিমানের নাটক সে বুঝতে পারে না।
জারা ঠোঁট কাঁপিয়ে বলে,
— “ স্বামীজান, আমাকে একটা বাচ্চা দেন না? না হলে বাড়িতে নিয়ে যান!”
আরমান ভ্রু কুঁচকে বলে,
— “ আবার শুরু হলো? আমার সাথে না গিয়ে ঘুরে আসলে! ”
জারা এবার আরও নাটকীয় ভঙ্গিতে কোলে উঠে এসে গলা জড়িয়ে ধরে।
— “আচ্ছা বাড়ি যাবো না। তাহলে একটা বাচ্চা দেন। সবাই হাসে আমাকে নিয়ে। বলে—বিয়ে আগে, বেবি পরে কেনো?”
আরমান মাথা ঝাঁকায়।
— “তুমি কোন শরীরে বাচ্চা নেবে? নিজেই হাফ ইঞ্চি! হাঁটতে গেলে হাওয়ায় উড়ে যাবে। ছোট্ট বাচ্চা এখনও বাচ্চা চায়।”
জারা ঠিক এই কথায় আগুন হয়ে ওঠে।
—“ আমি চাই! ব্যাস। মিমের হবে, জিনিয়া আপুর হবে আমার কেনো নয়?”
— “ কারণ তুমি এখনো বাচ্চা।”
— “ স্বামীজান!”
— “ হ্যাঁ! সত্যি। বাচ্চার জন্য শরীর, মানসিকতা, দায়িত্ব—সব লাগে। তুমি এখনো মেঝেতে বসে কান্না করো। এটা দেখে আমি কিভাবে বলি তুমি মা হওয়ার জন্য প্রস্তুত?”
জারা ঠোঁট কামড়ে ফোঁস করে ওঠে। বসা থেকে উঠে টাই ধরে টান দেয়। আরমান চোখ গোল করে তাকায়,
— “এহ! ছাড়ো। টাই নষ্ট হবে।”
জারা গম্ভীর কণ্ঠে বলে,
—“ ঠিক আছে। আপনার শরীর তো বড়সড় তাহলে বাচ্চা দশ মাস আপনার পেটে রাখবেন। ডেলিভারির পর আমার কাছে দিবেন।তাহলে আমার কষ্ট শূন্য। বলুন বুদ্ধি টা কেমন?”
এই কথা শুনে আরমান নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসে।
সত্যি বলতে— এই মেয়ে মাঝে মাঝে এমন কথা বলে যে মানুষ বাস্তব ভুলে যায়। সে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে। তারপর হেসে ফেলে।
— “ বাহ! বুদ্ধি তো একেবারে সুপার। আমি পেটে রাখবো। ডেলিভারি করবো। আর তুমি মা হবে?”
জারা আত্মবিশ্বাসী গলায়—
—“ হ্যাঁ! আমার আইডিয়া খারাপ?”
— “ খারাপ? এটা বললে পাপ হবে আমার! একেবারে দারুণ আইডিয়া। কারণ আমার লক্ষ্মী বউ আইডিয়া দিয়েছে বলে কথা!”
জারা নিজের পিঠ নিজেই চাপড়ে।গর্বিত। খুশি। হাফ ইঞ্চি সম্রাজ্ঞী।কিন্তু তখনই— আরমান ধমক দেয়
— “ হাফ ইঞ্চি তো তাই বুদ্ধিও হাফ ইঞ্চির মতো,চুপ করে বসে থাকো। আমার অফিস আছে। নিচে নেমে নাশতা করো। ঝামেলা করোনা।”
এবং সে বেরিয়ে যায়। জারা এবার বুঝলো আরমানকে বোঝানো মানে দেয়ালে কথা বলা।
আজ সে কলেজেও যাবে না। কারণ ফিহা নেই। মনটাও ভাঙা।
নিচে এসে আরমান খেতে বসে।জারা তার পেছন পেছন। ফারিয়া বেগম নিজে আরমানের প্লেট সাজিয়ে দেন।জারা আরমানের পাশে বসে মুড খারাপ করে। ঠিক তখন তার শাশুড়ি জারাকে নিজের হাতে খাইয়ে দেয়।
—“ আমার ভবিষৎ নাতির মা কী হয়েছে?”
জারা লজ্জা পায়, আবার খুশি হয়। আরমান কাশি দিয়ে উঠে। এক পলক মায়ের দিকে তাকায়। বোঝে যায়। তার এই আলাভোলা বউয়ের মাথা কে খাচ্ছে।
রাশেদও এসে বসে। মিমকে নিচের রুমে শিফট করেছে।কারণ সিঁড়ি উঠা নামা তার পক্ষে সম্ভব নয় এখন।মিম ধীরে ধীরে সোফায় বসে।পা ফুলে আছে। পেট বড়। মুখে ক্লান্তি।
জেসমিন বেগম তার সামনে ফলের প্লেট দেন।
— “ এই নে, সম্পূর্ণ খেয়ে নিবি কোনো বাহানা নয়।”
মিম ফল দেখে নাক ছিটকায়।কারণ সে এখন খেতে পারে না ঠিক মতো। রুচি আসে না মুখে। তবুও দুই শাশুড়ীর ভয়ে চুপচাপ খেয়ে নেয়।
দুজন পুরুষ—আরমান আর রাশেদ।অফিসে চলে যায়।আরমান যাওয়ার সময় জারাকে বলে,
—“ আসছি। কোনো পাগলামী করবে না ।”
জারা কোনো উত্তর দেয় না।ঠোঁট ফুলিয়ে থাকে।
জারা খাওয়া শেষ করে মিমের পাশে এসে বসে।মিমের পেট দেখে তার চোখ জল আসে। মিম যেন হাঁটতে পারে না ঠিক মতো। জারা গলা ভারী হয়।
—“ কষ্ট হচ্ছে জানু?”
মিম হাসে।
—“ হচ্ছে। তবে যখন বাচ্চা লাথি দেয়… সব ভুলে যাই।”
এখনও কথা বলতে বলতেবাচ্চা নড়াচড়া করে উঠে।
জারা হেসে বলে,
— “ খালা মনিকে পছন্দ হয়েছে বাবা?তাই নড়াচড়া করে সাড়া দিচ্ছো?”
ফারিয়া বেগম হাঁসি চাপেন।
— “ আহা পাগলি! ও কি তোকে চেনে?”
জারা তর্ক করে,
— “অবশ্যই চেনে। আমি হবো ওর খালা মনি + কাকিয়া।”
মিমের পা ফুলে আছে।জারা পা নিজের হাঁটুতে তুলে টিপে দেয়।
—“ ব্যথা কমে যাবে জানু!”
মিম বলে,
— “ আরে থাক! ছার পা, বোকা মেয়ে।”
জারা গম্ভীর গলায়—
— “ চুপ থাক তুই । এটা আমার ডিউটি।”
ফারিয়া বেগম জেসমিন বেগম চোখাচোখি করে।
মুচকি হাসেন।
—“ সোনা মেয়ে।”
ঠিক তখনই ছায়মা বড়ির ভিতরে ঢুকে। আজ অনেকদিন পর ছায়মা আসে। ঝড়ের মতো দৌড়ে এসে জারা–মিমকে দেখে জড়িয়ে ধরে।
— “কেমন আছো মিম?”
— “ ভালো আপু। তুমি?”
ছায়মা কিছুটা ম্লান মুখে বলে,
— “ সবাই ব্যস্ত। আমিকে ভুলে গেছে সবাই, তাই ভাবলাম তোমাদের দেখে যাই এসে ।
জারা সঙ্গে সঙ্গে বলে,
— “ আমরা আছি না আপু! আমরা তো আপন।”
ছায়মার চোখ ভিজে ওঠে। জারা তার হাত ধরে।
সকলেই গল্পে মাতে।হাসাহাসি। মিমের খুঁতখুঁতানি।
জারার নাটক। ছায়মার অভিমান।বাড়িটি আবার কোলাহলে ভরে ওঠে।
কিন্তু এই হাসির আড়ালে কিছু ব্যথাও আছে।জারা—
চায় বাচ্চা।কিন্তু নিজেকে প্রমাণ করতে হবে।
অনেক রাত পেরিয়ে গিয়েছে। শহরের রাস্তা ফাঁকা, অল্প কিছু গাড়ির হর্ন মিলিয়ে গেছে কুয়াশার ভেতর। সেই ক্লান্ত রাতের শেষে আরমান এসে দাঁড়াল নিজের বাসার সামনে। ক্লান্ত শরীর শুধু বিশ্রাম চায়, একটু উষ্ণ চা, হয়তো স্ত্রীকে দেখে মন শান্ত করা। সারাদিন তার মাথা যেন ভারী হয়ে ছিল—নতুন প্রজেক্ট, ক্লায়েন্টের চাপ, —সব মিলিয়ে মনে হচ্ছিল কেউ যেন তাকে পাথর বেঁধে গভীর নদীতে ছুঁড়ে দিয়েছে। আর সেই ঘোলাটে জলে ভাসতে ভাসতে সে একটা নিরাপদ তীরে ফেরার অপেক্ষায় ছিল।
আজকের দিনটা তার জন্য আরও বেশি কঠিন হয়ে উঠেছিল কারণ সে যতবার জারাকে ফোন করেছে, ও ফোন ধরেনি। বারবার রিংটোন কানে বাজছিল, যেন উপহাস করছিল। “আপনার কলটি রিসিভ করা সম্ভব নয়”—এটা যেন আজকের দিনের ব্যর্থতার ঘোষণাই হয়ে দাঁড়িয়েছিল। আরমান সারাদিন একটা অজানা রাগ বুকের ভেতর জমিয়ে রেখেছিল। অফিসের চাপ, ক্লান্তি, আর তার ওপর স্ত্রীর এই আচরণ—সব মিলিয়ে সে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিল, যদিও তা প্রকাশ করেনি।
যখন সে ঘরের দরজা খুলল, তার প্রথম অনুভূতি হলো নীরবতা।একটা অদ্ভুত, খালি-খালি অনুভূতির নীরবতা।
সাধারণত ঘরে ঢুকেই সে জারার সুরেলা গলা শুনত—কখনো খুশি, কখনো রাগী। টেলিভিশনের শব্দ, রান্নাঘর থেকে বাসনের টুংটাং, কিংবা জারার পায়ের শব্দ—সব মিলিয়ে ঘরের একটা আপন গন্ধ ছিল। কিন্তু আজ—নীরবতা এত ভয়ংকর ঠেকল যে মনে হলো কেউ যেন তার পরিচিত পৃথিবীর সুইচ অফ করে দিয়েছে।
ড্রইং রুম ফাঁকা।রান্নাঘর ফাঁকা। আজকে ড্রইং রুমে তার জন্য কেউ জেগে নেই। আরমানের মনে তৎক্ষণাৎ বিরক্তি জেগে ওঠে।সে ভাবল —“এই মেয়ে আবার নাটক করছে? আমাকে জ্বালাতে ওর এতো ভালো লাগে কেন?”
তার কণ্ঠে রাগ নেই, কিন্তু মনে আছে। ক্লান্ত শরীর যখন অনুভূতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না, তখন রাগ হঠাৎ করে বিস্ফোরিত হয়।
সে রুমের দিকে এগোল।রুম অন্ধকার। স্বাভাবিক দিন হলে জারা ঘুমানোর আগে লাইট জ্বালিয়ে রাখত।
লাইট অন করতেই যে দৃশ্য দেখা দিল তা তার মন থেকে রাগ মুছে দিয়ে ফেলে তাকে গভীর দুশ্চিন্তায় ফেলল।শুধু একটি জিনিস—ডাইরি।
ওই ডাইরিটা।যা সে ময়মনসিংহে আসার সম কিনে দিয়েছিল। জারা আজ পর্যন্ত এই ডাইরিতে এক অক্ষর ও লেখেনি। আর আজ? ডাইরিটা হাতে নিয়ে মেলেই প্রথম পাতায় দেখে—“বাচ্চা চাই।”
তার মধ্যে এই লেখা দেখে একটা আগ্রহ জাগে। দ্বিতীয় পাতায় মেলে দেখে একই লেখা
—“বাচ্চা চাই।”
তৃতীয়—
চতুর্থ—
দশ—
বারো—
বিশ—
সব জায়গায় একই আর্তি। আরমান প্রথমে অবাক, তারপর দম বন্ধ হওয়ার মতো— কারণ এই চাওয়ার পেছনে যে চাপ, যে ভয়, যে আকুলতা থাকে—সে তা বুঝতে পারে।এটা শুধু “বাচ্চা চাই” নয়।
এই উপলব্ধি আরমানের মন থেকে রাগ কমিয়ে এনে প্রশ্ন তৈরি করল। সে ডাইরিটা ধীরে বন্ধ করল, যেন তার ভেতরের পাতাগুলো কোনো কান্নার ইতিহাস লুকিয়ে রেখেছে। ওয়াশরুম থেকে ফ্রেশ হয়ে নীরবে অপেক্ষা করল— অনেকক্ষণ।
কিন্তু জারা এল না। নীরবতা যেন আরও চেপে ধরল তাকে। ঠিক তখনই—ফোনে একটা মেসেজ।জারা লিখেছে
—“যে রুমে আমি আগে থাকতাম—সেটায় আসবেন।”
মনে হলো যেন একটা ধাক্কা।এই মেয়েটা আসলে কী করছে?নাকি… খুব সিরিয়াস কিছু?সে দরজা খুলে বের জারা কোথায় দেখার জন্য ?সে গিয়ে দরজা ঠেলে খুলল।আর তারপর—যেন পৃথিবী থেমে গেল।
জারা সাধারণত লজ্জাবতী, কিন্তু আজ তার চোখে এক ধরনের দৃঢ়তা। মেয়েটা শুধু আকর্ষণীয় দেখাচ্ছে না—ধীর, পরিণত, লালসা নয়—আবেগে ভিজে। সে আজ তার স্বপ্নকে সাজিয়ে দাঁড়িয়েছে।যেন বলতে চায়—“আজ আমি পুরোপুরি প্রস্তুত।”
রুমটা আধো অন্ধকার। বাতাস থমকে আছে।
গোলাপি পাতলা শাড়ি, মোমবাতির আলোয় জারার গায়ের রেখা গুলোকে যেন আরও তীক্ষ্ণ করে তুলেছে।মোমবাতির আলোয় আবছা অন্ধকার। নরম সুগন্ধ।শাড়ির ঝলক।আর—জারা। গোলাপি সিল্কের শাড়ি পরে দাঁড়ানো।চোখে লজ্জা,ঠোঁটে কম্পন,চুল খোলা।সে দেখেই বোঝা যায়, এই সাজ অনায়াস নয়।এটা পরিকল্পিত। এটা—প্রয়োজন থেকে জন্ম নেয়া সাহস।
দরজায় দাঁড়িয়েই আরমানের শ্বাস আটকে যায়।
সে স্তব্ধ। চোখে বিস্ময়। তারপর ধীরে ধীরে সেই বিস্ময় এক ধরণের গভীর আকাঙ্ক্ষায় রূপ নেয়।
জারা মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে। কিন্তু লজ্জা ঢাকতে নয়,বরং… প্রলুব্ধ করার ইচ্ছায়।তার চোখে একধরনের ঝড়—চ্যালেঞ্জ, আবেগ, নেশা, আর একটু শিশুসুলভ একরোখাভাব।
আরমান দরজা বন্ধ করে এগিয়ে আসে। তার জুতার শব্দে মেঝে কেঁপে ওঠে।
— “এই সাজসজ্জা কার জন্য রানী সাহেবা ?”
তার কণ্ঠ ভারী। গভীর। বিপদজনক।
জারা বাঁকা হাসি হেসে চোখ তোলে।
— “আপনার জন্য স্বামীজান।”
আরমান এগিয়ে আসে।ধীরে।প্রতিটি ধাপ যেন হুমকি—যেন শিকারি এগিয়ে আসছে শিকারের দিকে।
দুজনের দূরত্ব কমতে থাকে। অবশেষে আরমান জারার ঠিক সামনে দাঁড়ায়।
গোলাপি শাড়ির আঁচল তার কাঁধ বেয়ে নিচে নেমে এসেছে।কোমরের কাছে সিল্কের ভাঁজ— আরমানের চোখ কয়েক সেকেন্ড স্থির থাকে সেখানে। তার নিঃশ্বাস ভারী হয়ে ওঠে। শীতের রুমে হঠাৎ উত্তাপ বেড়ে যায়।
— “কেন?” এক শব্দেই অনেক প্রশ্ন লুকানো।
জারা এগিয়ে এসে ফিসফিস করে—
— “কারণ আমি আপনাকে চাই। খুব করে চাই।”
এবার আরমানের চোখে হালকা গর্জন মেশানো আকাঙ্ক্ষা। সে জারার থুতনি ধরে তুলে। আলতো না
দৃঢ়ভাবে।
— “বাচ্চা চাই বলেই?”
জারা চ্যালেঞ্জের সুরে বলে—
— “হ্যাঁ। চাই।”
এক মুহূর্তে পরিবেশ বদলে যায়। রোমান্স থেকে প্রবল তীব্রতা। আরমান ঠাণ্ডা কণ্ঠে বলে—
— “তুমি বাচ্চার অজুহাতে আমাকে উস্কানোর চেষ্টা করছো?”
জারা ঠোঁট কামড়ে ধরে। তার চোখে স্পার্ক।
— “হ্যাঁ। কারণ আমি জানি… আপনি নিজেকে থামাতে পারবেন না।”
এটা ছিল সরাসরি চ্যালেঞ্জ। আরমান এগিয়ে এসে দেয়ালের সাথে জারাকে আটকে দেয়। দুই হাত দিয়ে।
তার মুখ এত কাছে—যে তাদের নিঃশ্বাস একে অপরের ত্বকে লাগছে। জারা শিহরিত হয়।
— “আমাকে পরীক্ষা করো না।” আরমানের কণ্ঠ ভাঙা। উষ্ণ। বিপজ্জনক।
— “করবো।” জারা ফিসফিস করে। “কারণ আমি জানি আমি আপনার দুর্বলতা।”
এই কথাটা যেন আগুনে পেট্রোল ঢালে দিলো। কণ্ঠ কম্পিত। কিন্তু সিদ্ধান্ত দৃঢ়। আরমানের রাগ হঠাৎ মাথাচাড়া দিল।সে বলল
—“এসব বাজে নাটক কে শিখিয়েছে?”
কাঁপা কণ্ঠে বলল
—“আম্মু… ছোট আম্মু… মিম… ছায়মা আপু…”
বলেই ছলছল চোখে তাকায়। আরমানের চোখ নরম নয়—তীব্র। আকাঙ্ক্ষায় পূর্ণ।সে জারার কোমড়ের কাছে হাত রাখে।আলতো নয়—দখলদারের মতো।জারা অল্প বাঁক নেয়,শাড়ির পাড় সরে যায়, কোমরের ত্বক মোমের আলোয় ঝলমল করে।
আরমানের শ্বাস আটকে যায়। সে ফিসফিস করে—
— “তুমি নেশা লক্ষীবউ। এই নেশা রাগ করতে দেয় না ।”
জারাও আরমানের কাছে আসে, তার ঠোঁট আরমানের ঠোঁট ছুঁই ছুঁই। ফিসফিস করে বলে
— “এবার নেশা খাও।”
ঠোঁট…ঠোঁটের উপর পড়ে।এটা কোমল নয়।এটা দাবিদার। তীব্র। আগ্রাসী।একটা চুমু যা নিঃশ্বাস চুরি করে নেয়।জারা প্রথমে ঠেলে দেয়।পরের মুহূর্তে টেনে নেয়। এভাবে খেলা করে।উস্কানি দেয়। আরমান চুলের ভেতর আঙুল চালিয়ে তাকে আরও কাছে টেনে আনে। জারা নখ দিয়ে তার শার্ট আঁকড়ে ধরে দুজনের শ্বাস ভারী।হৃদয় দ্রুত। রাত গভীর।আলো কম। তবুও তাদের চোখ অন্ধকারে জ্বলছে।এবার জারা ফিসফিস করে—
— “একটা বাচ্চা চাই স্বামীজান।”
আরমান চুমুর মাঝেই থেমে যায়। মাথা নামিয়ে হাসে গভীর, ব্যঙ্গাত্মক, তবুও আকর্ষণীয়।
— “তোমার মাথায় বাচ্চা ছাড়া কিছু নেই?”
জারা ঠোঁট ফুলিয়ে—
— “না।”
— “তুমি জানো বাচ্চা মানে কি?”
জারা জেদী চোখে তাকায়—
— “ভালোবাসার প্রমাণ।”
— “না।”
আরমান কণ্ঠ নামিয়ে ফিসফিস করে—
— “বাচ্চা হলো দায়িত্ব। কষ্ট। ভয়। তোমার রাতের ঘুম হারাবে। এসব আমি সহ্য করতে পারব না। ”
— “তাহলে দিন।”জারা গলা চেপে ধরে। “আমি ঘুম হারাতে রাজি।”
এই কথাটায় আরমানের চোখ নরম হয়।সে জারার কপালে ঠোঁট ছোঁয়ায়—কোমল…তারপর আবার ঠোঁটে—উত্তপ্ত। দুজন নেশার মতো নিজেদের হারায়— কিন্তু এখনও সীমায়, দুজনের শরীরের তাপ,দুজনের চোখের আগুন,দুজনের শ্বাসের স্পর্শ, সব মিলিয়ে তারা মাতাল।
কোনো পানীয় ছাড়াই।তাদের নেশা হলো—একজন আরেকজন। জারা ধীরে বলে—
— “আমাকে ফেলে দিতে পারবেন?”
— “না।”
__“কেন.?”
আরমান দৃঢ় কণ্ঠে বলে—
— “কারণ তুমি আমার। পুরোপুরি আমার।যার একচুল মাটিতে পরার আগে আমার হাত ছুঁতে হবে। ”
— “আমাকে কীভাবে চান?”
আরমান গলায় মুখ রেখে বলে,
— “যেমন আগুন অক্সিজেন চায়।”
এই রাত—তাদের তর্ক, জেদ, অধিকার, রাগ আর ভালোবাসায়একই সাথে জ্বলে। দুজনই স্পর্শে, আকাঙ্ক্ষায়, দৃষ্টিতে নেশাগ্রস্ত।আরমান জারা’র কানের পিছনে চুমু দিতে দিতে বলে
__“ এতো যে বাচ্চা বাচ্চা করো.. বাচ্চা কীভাবে হয়, যানো তুমি.? ”
__“ হ্যাঁ যানি তো ! ”
__“ কীভাবে..? ”
__“ আপনি ইনপুট আর আমি আউটপুট।আপনি আমাকে ** দিবেন আমি তা গ্রহণ করব..!তর পর বেবি হবে! ”
আরমান জারা’র গারে কামড় দিয়ে বলে
__“পেকে গেছো সোনা..! ”
জারা মৃলু চেচায়। মোমবাতির কাঁপা আলোয় দুজনের নিঃশ্বাস এক হয়ে যায়। দূরত্ব গলে পড়ে, স্পর্শের উত্তাপে শিহরণ ছড়িয়ে পড়ে দেহে। রাগ, জেদ, আকর্ষণ—সব মিলেই এক অদ্ভুত আগুন তৈরি হয়। জারা আরমানের বুকে আশ্রয় খুঁজে নেয়, আরমান শক্ত করে তাকে নিজের কাছে টেনে নেয়। শেষমেশ, ক্লান্ত, তৃপ্ত, এবং সম্পূর্ণ ডুবে থাকা সেই মুহূর্তে… তারা দু’জন—এক হয়ে যায়।
কেটে গেছে বেস অনেক দিন।সন্ধ্যা নামছে খান ম্যানশনে। সারাদিনের কোলাহল কমে এসে বাড়িটা শান্ত, উষ্ণ আর আরামদায়ক লাগছে। ড্রইংরুমে গোল করে বসে আছে মিম, জারা, ফিহা, জিনিয়া আর জেরিন। মাঝে রাখা বড় বাটি—পপকর্ন, পাশে চিপস আর লেবুর শরবত। মেয়েদের দল জমজমাট গল্প–গপ্পে মেতে উঠেছে।
জারা মন খারাপ করে বলে,
__“স্বামীজান আমাকে বাচ্চা দিবে না গো। আমি ভাবছি একটা অনাথ আশ্রম থেকে বাচ্চা নিয়ে আসবো ।”
ফিহা পানির গ্লাস হাত থেকে রেখে হেসে ওঠে,
__“তুই নে…আর ওই বাচ্চা যখন দশ বছরে এসে তোকে বলে—‘আপু আপনি আমার মা না, আপনি তো আমাকে বাজার থেকে কিনছেন।আমার বাবা মার নাম কী।’ তখন কি করবি?”
জারা চোখ বড় বড় করে বলে,
__“তখন বলবো—শান্ত হও বাচ্চা! তোর বাপের নাম গুগল, আমি গুগল থেকে ডাউনলোড করছি। তবুও একটা বাচ্চা চাই। ”
মেয়েরা একচোট হো হো করে হাসে। জেরিন তো পপকর্ন মুখে নিতে না নিতে হাসতে গিয়ে শ্বাস আটকে ফেলে।
এদিকে মিম দুহাতে বেল্টের মতো পেট চেপে ধরে বসে আছে। মিমের ডেলিভারির ডেট এগিয়ে আসচ্ছে । পেট ফুলে আছে, যেন ছোট্ট একটা পাহাড়। সবাই জানে—এখন ওর শরীরে সামান্য কিছু হলেই ব্যথা লাগে, রাগ ওঠে, খিদে পায়, আবার হাসিও পায়। পুরো পরিবার এখন এই দুই হবু–মাকে আগলে রাখে। ফারিয়া বেগম আর জেসমিন বেগম পায়েস রান্না করছে। আর একটু পর পর লিভিং রুমে এসে দেখা যায় মেয়েদের কি লাগবে।
জিনিয়া পানি এগিয়ে দেয়,
__“নেও খাও। এমন করলে তো টেনশন লাগবে।”
মিম গম্ভীর হয়ে বলে,
__“আমার টেনশন লাগে না। আমার রাশেদ লাগে।”
জারা চোখ টেপে,
__“রাশেদ ভাই তো অফিসে। ফোন দিয়ে বলবি —ফাউন্ডেশন লাগাইয়া আসেন?তোর আবার রাশেদ ভিকে মেক-আপ ছাড়া ভালো লাগে না ?”
ফিহা চিৎকার করে হেসে ওঠে,
__“হা হা হা! মিমের এই সময় রাশেদ ভাইয়ের ওপর যা রাগ, মনে হয় বাচ্চা জন্মের পর প্রথম কাজ হবে—রাশেদ ভাইকে ঝাড়া।”
মিম নাক ফুলিয়ে তাকায়,
__“ঝাড়া না, গালমন্দ। সে রাতে আমার চকোলেট খাইছে,আমাকে না দিয়ে। আর বলছে—ডায়েট! তাই মেকআপ করিয়েছি। ”
জারা মুখ গম্ভীর করে বলে,
__“এটা তো বড় অপরাধ। চকোলেট খায়! শাস্তি হিসেবে… এক সপ্তাহ বাথরুম পরিষ্কার।”
হাসির ঢেউ আবার ওঠে।এদিকে মিম একটু অস্বস্তি নিয়ে কাত হয়ে বসে।জিনিয়া সেটা লক্ষ্য করে নরম গলায় বলে,
__“ব্যথা করতেছে?”
মিম ঠোঁট কামড়ে বলে,
__“না, মানে… হালকা। কেমন জানি লাগছে।”
জারা হাত নেড়ে বলে,
___“এটা নিশ্চয়ই গ্যাস। আমি জানি, এই কথাটা সবসময় কাজ করে। কারো ব্যথা—গ্যাস। কারো মাথা ব্যথা—গ্যাস। বাচ্চা নাড়াচাড়া—গ্যাস।”
ফিহা মাথায় চাপড় দেয়,
__“তুই ডাক্তার হলে পুরো পৃথিবী হার্ট অ্যাটাক করলেও বলবি—গ্যাস।”
মিম এবার গলা কাঁপিয়ে বলে,
___“না… সিরিয়াস বলছি। একটু ব্যথা হচ্ছে। বেশি না। কিন্তু… অদ্ভুত লাগছে।”
কথা শেষ হতে না হতেই পেটের ভেতর আবার এক ঢেউ। মিম মুখ বিকৃত করে শ্বাস টানে। হাঁসির মাঝেও টেনশন বাতাসে ভেসে ওঠে।
জিনিয়া তখন আর হাসে না,
__“মিম, একটু সোজা হয়ে বসো।”
মিম ঘামতে থাকে,
___“আমি ঠিক আছি। ব্যথা আসছে… যাচ্ছে… কিন্তু একটু বেশি। হয়তো… ব্র্যাক্সটন হিক্স।”
জারা ফোন তুলে বলে,
“না না, আমি স্আামীজানকে কল দেই। রাশেদ ভাইকে নিয়ে চলে আসতে।”
ফিহা হাত টেনে থামায়,
__“এখন কল করিস না। আমি আম্মুকে ডেকে আনি রান্না ঘর থেকে। ”
মিম কাঁপা গলায় বলে,
__“আমি ভয় পাচ্ছি জানু আমাকে ধর।”
জারা তার হাত ধরে। আর মিমের কণ্ঠ কেঁপে যায়।
জিনিয়া পিঠে হাত রাখে,
__“শোনো, এটা নরমাল। ব্যথা ঢেউয়ের মতো আসবে। শ্বাস নাও। ছাড়ো। ঠিক আছে।”
ফিহা দৌড়ে গিয়ে ফারিয়া বেগম কে আর জেসমিন বেগম একে ডেকে আনে। জেরিন এসব দেখতে পারে না। ওর ভয় করে। তাই একটু দূরে বসে আছে।
মিমের ব্যথা এবার আর লুকোনো যাচ্ছে না। মুখ সাদা, ঠোঁট শুকিয়ে গেছে, শ্বাস ছোট ছোট। জারা প্রথমে বুঝতে পারে পরিস্থিতি স্বাভাবিক নয়।
ফারিয়া বেগম এসে একঝলক দেখে বুঝে ফেলেন—“আর অপেক্ষা করা যাবে না। এখনই হাসপাতালে নিতে হবে।”
জেসমিন বেগম মাথা নেড়ে সম্মতি দেন
—“হ্যাঁ, এটা লেবার পেইন। ফিহা দৌড়ে যা মা। ড্রাইভার কে বল গাড়ি বের করতে।”
সিদ্ধান্ত নিতে এক সেকেন্ডও নষ্ট হয় না।ফিহা বাড়ির বাইরে চলে যায় ড্রাইভার কে বলতে।
ফারিয়া বেগম জিনিয়াকে নির্দেশ দেয়
__“জিনিয়া মা, তুমি বাসায় থাকবে। তোমার এসময় রিস্ক নেওয়া যাবে না। জেরিন, তুমি জিনিয়ার সাথে থেকো। আমরা মিমকে নিয়ে যাচ্ছি।”
জিনিয়া ভয়ভরা গলায়
—“আমি যাবো…”
জেসমিন বেগম তার হাত ধরে
—“না মা, তোমার শরীরও এখন ঝুঁকিপূর্ণ। তুমি থাকো। চিন্তা কোরো না।”
জিনিয়ার চোখ কাঁপে। ভয়, দুশ্চিন্তা, অসহায়তা—সব মিলিয়ে চেপে থাকে।সে ধীরে মাথা নাড়ে।
ব্যথা আবার চেপে ধরে মিমকে। এবার সে কাঁদো কাঁদো গলায়—
__“আমি… আমি ভয় পাচ্ছি…বড় আম্মু! ”
ফারিয়া বেগম মিমকে বাহুতে ধরে
—“কিছু হবে না। আমরা আছি। শ্বাস নাও… ধীরে…”
জারা মিমকে দাঁড় করাতে সাহায্য করে। ফিহা বাড়ির ভিতরে এসে দৌড়ে গিয়ে মিমের ব্যাগ, ডকুমেন্টস, ওষুধ—সব জোগাড় করে আনে।
মিম একপা সামনে ফেলতেই ব্যথা আবার তীব্র হয়।সে থেমে যায়। দুই হাতে পেট চেপে ধরে। জারা শক্ত গলায় বলে
—“জানু ভেঙে পড়বি না। তোকে সাহসী হয়ে থাকতে হবে।”
ফারিয়া দরজা পর্যন্ত এগোতে সাহায্য করে।তার মুখ উদ্বেগে ধারাল,গাড়ির দরজা খোলা হয়। ফারিয়া বেগম এবং জেসমিন বেগম দুই পাশে মিমকে ধরে।
জারা সামনে বসে। ফিহা পিছনে বসে ।
গাড়ি বের হবার আগে ফিহা ফোন বের করে।হাত কাঁপছে, কিন্তু কাজ থামে না।রাশেদকে কল দেয়।
রাশেদের সাথে কথা ফিহা ফোন বন্ধ করে।গাড়ি স্টার্ট হয়।
গাড়ির ভেতর নীরবতা।দেখতে দেখতে শহরের আলো দৌড়াতে থাকে।মিম হঠাৎ দাঁত চেপে
—“ব্যথা… ব্যথা বাড়ছে…আম্মু ”
জেসমিন বেগম তার হাত ধরে শক্ত করে
—“শ্বাস নে… আমার দিকে তাকা… তুই পারবি…”
ফারিয়া বেগম মিমের মাথায় হাত রাখেন—
রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ৭২ (২)
__“চোখ বন্ধ করো না। জ্ঞান ধরে রাখো।”
গাড়ির টায়ারের শব্দ, সাইরেনের মতো শহরের উত্তেজনা—সব মিলিয়ে সময় যেন দ্রুত দৌড়ায়।
গাড়ির ভেতরে মিমের ব্যথার ঢেউ—আর বাইরে পরিবারের ছুটে চলা। হাসপাতালের সামনে পৌঁছলে—
স্টাফরা স্ট্রেচার আনে। মিমকে তাতে তুলতে হয়।
উদ্বেগে মুখগুলো শক্ত হয়ে আছে।
জারা গভীর নিঃশ্বাস নেয়—একটা ভয়, একটা আশা, একটা অজানা ভবিষ্যৎ।মিমকে ওটিতে নিয়ে যাওয়া হয়। দরজা বন্ধ হয়। বাইরে দাঁড়িয়ে—ফারিয়া বেগমের চোখ লাল,জেসমিন বেগমের আঙুল প্রার্থনায় জোড়া,
জারা ঠোঁট কামড়ে ধরে,ফিহা ফোন হাতে রাশেদের অপেক্ষায়।
