রৌদ্রময় বালুচর শেষ পর্ব
সোহানা ইসলাম
অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে আজ সেই বহু প্রতীক্ষিত দিন। খান বাড়িটা যেন সকাল থেকেই অন্যরকম এক উৎসবের রঙে রঙিন। বাড়ির ভেতরে–বাইরে ব্যস্ততার শেষ নেই। আজ খান পরিবারের বড় ছেলে আরমান খানের একমাত্র সন্তান, ছোট্ট রাজপুত্র আরহাম নিশান খান-এর জন্মদিন।
বাড়ির গেট পেরোলেই চোখে পড়ে রঙিন বেলুন, ফিতা আর আলোয় সাজানো ডেকোরেশন। ডেকোরেশনের লোকজন দড়ির মতো করে ঝুলিয়ে দিচ্ছে লাইট, কেউ বেলুন ফুলাচ্ছে, কেউ ব্যাকড্রপ সেট করছে। রোহানদের সাথে জাহির দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে নির্দেশ দিচ্ছে,
—“এইটা আর একটু ডানে নাও… হ্যাঁ, ঠিক ওভাবেই। বেলুনগুলো একটু উঁচুতে লাগাও।”
জাহির আজ ভীষণ সিরিয়াস। একমাত্র ভাগ্নের জন্মদিন বলে কথা! সবকিছু একদম পারফেক্ট না হলে যেন তার মনই মানবে না। এইসবের মাঝেই আরহাম রিয়াত আর এক মামাকে সাথে নিয়ে পুরো বাড়ি দৌড়ে বেড়াচ্ছে। কখনো সিঁড়ি দিয়ে ওঠানামা, কখনো ড্রইংরুম, কখনো আবার বারান্দা। তার ছোট মামাকে আদো আদো করে বলে,
—“মামা ধলো ধলো! আমি সুপারহিলো। ধলতে পালবে না। ”
আরহামের কণ্ঠে উচ্ছ্বাস, চোখে অফুরন্ত আনন্দ। আজ যে তার দিন, সেটা সে ভালোভাবেই টের পাচ্ছে।
নিচতলায় রান্নাঘরে ভিন্ন এক ব্যস্ততা। জারা শাশুড়ি জেসমিন বেগমের সাথে রান্নার কাজে হাত লাগিয়েছে। বড় বড় হাঁড়িতে বিরিয়ানি চড়ছে, অন্য পাশে কাবাব, সালাদ, ডেজার্ট—সব মিলিয়ে যেন এক রাজকীয় আয়োজন। জেসমিন বেগম হাসিমুখে বলেন,
—“জারা মা, এইটা একটু নেড়ে দে তো।”
জারা সঙ্গে সঙ্গে এগিয়ে যায়।
—“জি ছোট আম্মু।”
ওর চোখেমুখে ক্লান্তি নেই, আছে এক ধরনের প্রশান্তি। সন্তানের জন্মদিন, পরিবারের উৎসব—এই ব্যস্ততাই তার কাছে আনন্দ। চা বানিয়ে জারা নিজ হাতে শ্বশুর আর বাবার কাছে নিয়ে যায়।
—“আব্বু, চা।”
কখনো শশুড়কে এগিয়ে দিয়ে বলে,
__“ আব্বু, তোমার চা।”
দু’জনেই খুশি হয়ে তাকান । শ্বশুর হেসে বলেন।
—“এই বাড়ির ছেলের বউ আর মেয়েগুলো একদম লক্ষ্মী,”
একপাশে জেরিন নূরকে নিয়ে বসে ফুল সাজাচ্ছে। ছোট ছোট ফুল হাতে নিয়ে নূর জিজ্ঞেস করে,
—“মামনহ, এইটা আরহাম ভাইয়ার জন্য?”
—“হ্যাঁ সোনা, আজ ওর স্পেশাল দিন।”
জিনিয়া আর মিম নিজেদের কাজে ব্যস্ত—কেউ গিফট প্যাক করছে, কেউ কেকের অর্ডার চেক করছে। পুরো বাড়িটাই যেন একটা ব্যস্ত মৌচাক। সব কাজ সেরে জারা চায়ের কাপগুলো ট্রেতে রেখে মাত্র ঘরের দিকে পা বাড়িয়েছে, এমন সময় উপর থেকে ভেসে আসে আরমানের ডাক,
—“আরহামের আম্মু! উপরে আসো, তাড়াতাড়ি!”
এই ডাক শুনে ড্রইংরুমে থাকা সবাই একসাথে জারার দিকে তাকিয়ে থাকে। হঠাৎ এমন নজর পড়ায় জারা একটু থমকে যায়। মুখটা লাল হয়ে ওঠে লজ্জায়।
ঠিক তখনই আবার আরমানের গলা বেসে আসে,
—“এই যে শুনছো? তাড়াতাড়ি আসো!”
জারা অপ্রস্তুত হয়ে পড়ে। এমন সময় রান্নাঘর থেকে বের হতে হতে জেসমিন বেগম মুচকি হেসে বলেন,
—“তুই যা মা। তোর স্বামীজান তোকে না দেখে পাগল হয়ে যাচ্ছে।”
এই কথা শুনে আশেপাশে থাকা সবাই হেসে ওঠে। জারার লজ্জা যেন দ্বিগুণ হয়ে যায়। সে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকে। ফারিয়া বেগম হাসতে হাসতে বলেন,
—“তোমরাও না একেবারে যা-তা! ওকে আর লজ্হা দিও না। হয়েছে লজ্জা না পেয়ে যা মা, আমার ছেলের জন্য কফিটা নিয়ে যা।”
জারা আর কিছু না বলে কফির কাপ তুলে নেয়।
—“জি আম্মু।”
সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে তার বুকের ভেতর অদ্ভুত এক অনুভূতি। এত লোকের সামনে ডাকাডাকি—এইসব সে এখনো অভ্যস্ত হতে পারেনি। উপরে এসে দেখে আরমান বারান্দার কাছে দাঁড়িয়ে। সাদা শার্ট, কালো প্যান্ট—আজও যথারীতি পরিপাটি। জারা কফির কাপ এগিয়ে দেয়।
—“এই নিন আপনার কফি।আর ষাঁড়ের মতো চেঁচাচ্ছেন কেনো?”
আরমান কফি নেয়, কিন্তু চোখ সরায় না জারার মুখ থেকে।
—“তোমাকে অনেক ক্ষন ধরে কাছে পাচ্ছিলাম না তাই ডেকে আনলাম।”
জারা হালকা করে বলে,
—“সবাই কাজ করছে, আমিও তো…”
আরমান মুচকি হাসে।
—“জানি। কিন্তু এখন তোমাকে খুব দরকার আমার।”
—“কেন?”
আরমান জারাকে নিয়ে বারান্দায় রাখা চেয়ার টায় বসে। কফিতে চুমুক দিয়ে বলে,
__“ কাল অফিস থেকে আসে দেখে মা আর ছেলে ঘুমিয়ে পরেছো। তোমাদের জন্য গিফট এনেছিলাম। তোমার টা বিছানায় রাখা আছে। আর আরহামের টা আলমারিতে। সন্ধ্যায় দুজন পরবে। ”
__“ আপনার জন্য এনেছেন? ”
__“ হুমমম! এনেছি! ”
কিছুক্ষণ চুপ থাকে দুজনেই। আরমান কফিটা শেষ করে কাপ টা পাশে রাখে। জারাকে নিজের কোলে ভালো করে বসিয়ে বলে,
__“ আমি ভাবচ্ছিলাম! তোমায় ভার্সিটিতে ভর্তি করিয়ে দিব। তোমার পড়াশোনা তো পুরো কমপ্লিট হয়নি। ”
আরমানের কথাটা খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতেই বেরিয়ে ছিলো। যেন এটা কোনো বড় সিদ্ধান্ত না, বরং স্বামী হিসেবে স্ত্রীর জন্য ভাবা একটা সাধারণ ইচ্ছা। কিন্তু পড়াশোনার নাম শুনেই জারা’র মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ে। সে এক ঝটকায় আরমানের দিকে তাকায়। চোখ বড় বড়, ভ্রু কুঁচকে গেছে। মুখের অভিব্যক্তি বদলে যায় মুহূর্তেই।
— “বিয়ে করেছি, বাচ্চা হয়েছে… এখন কিসের পড়াশোনা?”
জারা আবারও নাক-মুখ কুঁচকে সে প্রায় বিরক্তির সুরেই বলে ওঠে,
— “আপনি একজন আদর্শ স্বামী হতে ব্যর্থ, স্বামীজান।”
জারা’র কথায় আরমান যেন হঠাৎ চেয়ারে বসে থাকা মানুষটা থেকে একদম স্থির পাথর হয়ে যায়। চোখ দুটো বড় হয়ে যায়, ঠোঁট একটু আলগা হয়ে থাকে। সে নিজেও বুঝে উঠতে পারে না—কোথায় ভুল বলল!
সে একটু নড়ে-চড়ে বসে, গলা খাঁকারি দিয়ে বলে,
— “কেনো… কেনো! এই কথা বলছো কেনো তুমি আজ হঠাৎ?”
জারা আর অপেক্ষা করে না। এতদিনের জমে থাকা ভাবনাগুলো যেন হুড়মুড় করে বেরিয়ে আসে।
— “আমি একজন বিবাহিত নারী। আমার স্বামী আছে, সন্তান আছে। আমার দায়িত্ব তাদের আর এই সংসার সামলানো। আমি কেনো বাড়ির বাইরে গিয়ে পরপুরুষের কথা শুনবো? ক্লাস করবো? এসব আমি পারব না। ”
কথার মাঝেই সে একটু থামে, তারপর আরও শক্ত কণ্ঠে বলে,
— “আপনার তো উচিত ছিলো নিজের স্ত্রীকে জন্মের পর থেকেই পড়াশোনা না করানো। সেখানে আমি বারো বছর ধরে পড়াশোনা করেছি!”
এই একটানা কথাগুলো বলেই জারা থেমে যায়। বুক উঠানামা করছে। নিজের কথার ভারে নিজেই একটু কেঁপে ওঠে, কিন্তু পিছু হটে না। আরমান পুরোপুরি টাস্কি খেয়ে যায়। সে বোকার মতো বউয়ের দিকে তাকিয়ে থাকে। চোখে প্রশ্ন, বিভ্রান্তি আর একরাশ অবাক ভাব। “ আমি ওকে পড়াশোনার কথা বললাম বলেই আমি আদর্শ স্বামী না? এই প্রশ্নটাই মাথার ভেতর ঘুরতে থাকে।আরমান ধীরে বলে,
— “মানজারা…আমি তো তোমাকে জোর করছি না । আমি শুধু চাইছিলাম তুমি… নিজের জন্য কিছু করো।”
জারা ঠোঁট বাঁকায়।
— “আমার নিজের জন্য সবচেয়ে বড় কিছু হচ্ছে এই সংসার। আমার ছেলে। আপনি। পড়াশোনা কেনন্সেল। দুদিন পর আমার ছেলে স্কুলে যাবে আর আমি পড়াশোনা করব? কী আজব কথা? ”
আরমান দীর্ঘশ্বাস ফেলে।
— “তাহলে পড়াশোনা কি খারাপ কিছু?”
জারা চোখ নামিয়ে নেয়। কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে। তারপর নরম হলেও দৃঢ় গলায় বলে,
— “খারাপ না। কিন্তু আমার জন্য না। আমি এখন এই ঘরেই সুখী। মানুষ বলবে ছেলে মেয়ে পড়াশোনা করার বসেয়ে মা পড়াশোনা করছে? ”
আরমান ধীরে ধীরে বুঝতে চেষ্টা করে। এই নারীর ভয়টা কোথায়। সমাজের চোখ, মানুষের কথা, দায়িত্বের বোঝা—সব মিলিয়ে জারা নিজেকে আটকে ফেলেছে এক অদৃশ্য গণ্ডির ভেতর।আরমান হঠাৎ জিজ্ঞেস করে,
— “তুমি কি ভয় পাও?”
জারা চমকে ওঠে।
— “কিসের ভয়?”
— “এই যে… মানুষ কী বলবে। বউ হয়ে বাইরে পড়তে যায় কেনো—এইসব।”
জারা কোনো উত্তর দেয় না। কিন্তু নীরবতাই অনেক কিছু বলে দেয়। আরমান চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়। ধীরে ধীরে জারার সামনে এসে দাঁড়ায়।
— “শোনো, আমি তোমাকে বদলাতে চাই না। আমি শুধু চাই তুমি নিজেকে ছোট করো না।”
জারা মাথা তোলে। চোখে জল জমে গেছে।
— “আমি নিজেকে ছোট করছি না। আমি নিজের জায়গা জানি।”
আরমান খুব শান্ত কণ্ঠে বলে,
— “না,তুমি নিজেকে সীমাবদ্ধ করছো।”
এই কথাটা জারা মুখ ফিরিয়ে নেয়।
— “আপনি যাই বলুন আর তাই বলুন। আমি পড়ছি না ব্যাস।”
ঘরের ভেতর এক ধরনের অস্বস্তিকর নীরবতা নেমে আসে। বাইরে থেকে ভেসে আসে হাসি-গোলমালের শব্দ। জন্মদিনের বাড়ি, অথচ এই ঘরের ভেতর যেন দুজন মানুষ দুই প্রান্তে দাঁড়িয়ে। ঠিক তখনই নিচ থেকে ডাক আসে—
— “জানু।তাড়াতাড়ি নিচে আয় দেখ কে এসেছে!”
মিম ডাকছে। জারা যেন এই ডাকটাকেই সুযোগ হিসেবে নেয়। দ্রুত উঠে দাঁড়ায়।
— “মিম ডাকছে। আমাকে যেতে হবে।”
আরমান কিছু বলতে গিয়েও থেমে যায়। শুধু বলে,
— “আমরা এই কথা পরে আর বলবো না। এখন ছেলের পড়াশোনা নিয়ে ভাবুন। কারণ আপনার বউ পড়াশোনা করবে না ।”
জারা দরজার দিকে যেতে যেতে থামে। এই কথাটা আরমানকে আরও অস্থির করে তোলে। এই সব দিক দিয়ে ফাঁকি বাজি করে।
জারা নিচে নেমেই প্রথম যে দৃশ্যটা দেখে, তাতে তার মনটা হঠাৎ করেই আনন্দে ভরে ওঠে। ড্রইংরুমে নতুন মানুষের কোলাহল। চোখ ঘুরাতেই দেখে—ছায়মার মা–বাবা এসে গেছেন। অনেকদিন পর দেখা, তাই আর কিছু ভাবার সুযোগ না দিয়েই জারা দৌড়ে গিয়ে ছায়মার মাকে জড়িয়ে ধরে।
— “কেমন আছো তুমি ফুপ্পি?”
কথাটার সঙ্গে সঙ্গে জড়িয়ে ধরা হাত দুটো আরও শক্ত হয়ে আসে। ফুপ্পিও স্নেহভরা চোখে জারার মাথায় হাত বুলিয়ে দেন। দু’জনের মধ্যে টুকটাক কথা হয়—স্বাস্থ্য, পথের ক্লান্তি, বাড়ির আয়োজন—সব মিলিয়ে।কিছুক্ষণ পর ফুপ্পি বলেন, একটু রেস্ট নেবেন। জারা নিজে হাতে পানি এনে দেন, তারপর তাদের রুম পর্যন্ত এগিয়ে দেয়।
ঠিক তখনই উপরে থাকা আরমানও নিচে নেমে আসে। চোখে ক্লান্তি থাকলেও মুখে সেই চিরচেনা শান্ত হাসি। ফুপ্পি কে ভালো মন্দ জিজ্ঞেস করে। সে এক নজরে পুরো ঘরটা দেখে নেয়—সবাই আছে, বাড়িটা যেন উৎসবের আনন্দে ভরে উঠছে।
এদিকে আরহাম তখন নিজের মতো করে খেলায় মেতে আছে। রিয়াত আর নূরের সঙ্গে দৌড়াদৌড়ি করতে গিয়ে হঠাৎ একটা ভুল হয়ে যায়। খেলতে খেলতেই আরহাম ধাক্কা দেয়, আর নূর ভারসাম্য হারিয়ে পড়ে যায় মেঝেতে। পরমুহূর্তেই নূরের কান্নায় ঘরটা ভারী হয়ে ওঠে।
— “আম্মাহহহ…”
রোহান দৌড়ে এসে মেয়েকে কোলে তুলে নেয়। নূরের চোখে পানি, ঠোঁট কাঁপছে। রোহান মেয়ের পিঠে হাত বুলিয়ে শান্ত করার চেষ্টা করে। রিয়াত শক্ত হয়ে দাড়িয়ে আছে। এই দৃশ্যটা দেখেই জারার ভেতরটা কেঁপে ওঠে। সে দ্রুত এগিয়ে এসে আরহামের দিকে তাকিয়ে দমক দিয়ে বলে,
— “দিন দিন বড্ড পচা হয়ে যাচ্ছো তুমি আরহাম! বোনকে ব্যথা দিলে কেনো? ”
আরহাম থমকে যায়। চোখ দুটো বড় হয়ে আসে। সে কিছু বুঝে ওঠার আগেই জিনিয়া জারার পাশে এসে হালকা কণ্ঠে বলে,
— “আহ্হা জারা, ও বাচ্চা মানুষ। বুঝে করেনি।”
জারার রাগ তখনও পুরো নামেনি, কিন্তু সে আর কিছু বলার আগেই আরমান এগিয়ে আসে। সে আরহামকে কোলে তুলে নেয়, তারপর নূরের দিকেও হাত বাড়ায়। রোহান নূরকে আরমানের কোলে দেয়। আরমান খুব যত্ন করে নূরকে আদর করতে থাকে—মাথায় হাত বুলিয়ে, গালে আলতো চুমু দিয়ে।
— “কাঁদবে না মামুনি..?”
তার কণ্ঠে এমন এক শান্তি যে নূর ধীরে ধীরে চুপ করে যায়। এরপর আরমান নিজের কোলের ছেলের দিকে তাকিয়ে নরম গলায় বলে,
— “বোনকে সরি বলো, পাপা।”
আরহাম বাবার গলায় আদরের সুর পেয়ে সাহস পায়। সে ছোট্ট মুখে তোতলাতে তোতলাতে বলে,
— “তরি বোনু… ইত্তে কলে কলিনি আমি?”
এই কথা শুনে নূরের কান্না পুরোপুরি থেমে যায়। সে মামার কাঁধে মুখ লুকিয়ে শান্ত হয়ে বসে থাকে। এই সময় জাহির পাশ থেকে এসে জারার দিকে তাকিয়ে একটু কঠিন গলায় বলে,
— “এভাবে বাচ্চাকে দমক দেওয়ার কী দরকার ছিল? দেখ কেমন মন মরা হয়ে আছে?”
কথাটা জারার বুকের ভেতর গিয়ে লাগে। সে কিছু বলার আগেই আরমান সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে জাহিরের দিকে তাকায়।
— “ভাই, ভাইয়ের মতো থাকো। আমার স্ত্রী কিছু বলার অধিকার রাখে। সেটা আমি কাউকে কাড়তে দেই নি। আমার স্ত্রী তার সন্তান কে মারবে শাসন করবে কিন্তু তাকে কেউ কিছু বলবে না। তার জন্য আমি আছি।”
আরমানের কণ্ঠ শান্ত হলেও ভীষণ দৃঢ়। মুহূর্তেই চারপাশে একটা চাপা নীরবতা নেমে আসে। জাহির আর কিছু না বলে মুখ ফিরিয়ে নেয় এবং অন্যদিকে চলে যায়।
জারা অবাক হয়ে স্বামীর দিকে তাকিয়ে থাকে। তার বুকের ভেতর অজান্তেই একটা স্বস্তির ঢেউ বয়ে যায়।
এই ফাঁকে আরহাম বাবার কোলেই আরও আরাম পেয়ে যায়। একটু পরেই সে হঠাৎ মুখ বেঁকিয়ে কান্না শুরু করে দেয়। চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ে। ছোট ছোট হাতে বাবার জামা আঁকড়ে ধরে।
— “আম্মু আমায় বকেচে…”
আদো আদো করে মায়ের নামে বিচার দেয় সে।
আরমান ছেলের কথা শুনে ভীষণ সিরিয়াস মুখ করে বলে,
— “ওহ! তাই নাকি? ঠিক আছে, আম্মুর বিচার করব। খুব বড় শাস্তি দিব।”
এই কথা শুনে জারা অবাক হয়ে তাকায়।
— “এই! কী শাস্তি?”
আরমান হালকা হাসি চেপে রেখে বলে,
— “ আজ থেকে আম্মুর চকলেট খাওয়া বন্দ।”
চারপাশে হেসে ওঠে সবাই। জারা লজ্জায় মুখ নামিয়ে নেয়, কিন্তু ঠোঁটের কোণে হাসি লুকোতে পারে না।
আরহাম কান্না থামিয়ে বাবার কাঁধে মুখ গুঁজে দেয়। মনে হয় তার বিচার ঠিকঠাক হয়ে গেছে। রোহান পাশ থেকে হেসে বলে,
— “দেখেছো? বিচারেও পক্ষপাত।”
আরমান মজা করে জবাব দেয়,
— “আমার পৃথিবীতে পক্ষপাত চলবেই।”
ঘরের ভেতর আবার হাসি ফিরে আসে। নূর শান্ত হয়ে রোহানের কোলে বসে। আরহাম বাবার কাঁধে মাথা রেখে নিশ্চিন্তে নিঃশ্বাস নেয়। জারা দূর থেকে এই দৃশ্যটা দেখে মনে মনে ভাবে—এই মানুষটা শুধু ভালো স্বামী না, সে এক অসাধারণ বাবা।
সন্ধ্যার আলোটা খান বাড়ির জানালা দিয়ে ঢুকতেই ঘরের ভেতরের সাজানো আলো আরও উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। ডেকোরেশনের রঙিন বেলুন, ফেয়ারি লাইট আর ফুলের গন্ধে পুরো বাড়িটা যেন উৎসবের আবেশে ভরে গেছে। জারা নিজের ঘরে দাঁড়িয়ে আয়নার সামনে শেষবারের মতো নিজেকে দেখছে। আরমানের আনা পিংক শাড়িটা ওর গায়ে অপূর্ব মানিয়েছে। শাড়ির নরম কাপড়, হালকা কাজ আর রঙ—সব মিলিয়ে আজ জারাকে অন্যরকম লাগছে।
আরহাম অনেক আগেই রেডি হয়ে মামার হাত ধরে নিচে নেমে গেছে। ঘরে এখন জারা একাই। সে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে শাড়ির আঁচলটা ঠিক করে নেয়, চুলগুলো এক পাশে সরিয়ে কানের দুলে হাত বুলায়। ঠিক তখনই হঠাৎ পেছন থেকে দুটো হাত এসে ওকে জড়িয়ে ধরে। জারা চমকে উঠলেও গলার কাছের পরিচিত উষ্ণতা আর নিঃশ্বাসে বুঝে যায়, এটা তার স্বামীজান । আরমান আজ পুরো কালো আউটফিটে। কালো শার্ট, কালো প্যান্ট—চোখে সেই চিরচেনা আত্মবিশ্বাস। সে জারার বড় বড় চুলগুলো গা থেকে আলতো করে সরিয়ে দেয়, তারপর গলায় একটুখানি চুমু এঁকে দেয়। খুব ছোট, খুব নরম।
— “আজ তোমাকে ভীষণ সুন্দর লাগছে,”
আরমানের কণ্ঠটা নিচু, কিন্তু ভরা আবেগে। জারা লজ্জায় চোখ নামিয়ে নেয়।
— “এতো প্রশংসা করবেন না! লজ্জা করে!”
আরমান হাসে। জারার কোমর জড়িয়ে ধরে বলে,
— “ আচ্ছা আর লজ্জা দিলাম না। রাতের জন্য লজ্জা বাচিয়ে রাখবে বউ। আর আজ কিন্তু স্পেশাল হতে যাচ্ছে মনে আছে? ”
জারা হাত নাড়িয়ে হালকা গলায় বলে,
— “হুমম।”
তারপর দু’জন পাশাপাশি হাঁটতে হাঁটতে নিচে নামে। সিঁড়ি দিয়ে নামার সময়ই বোঝা যায়—ড্রইংরুমে থাকা সবাই যেন অপেক্ষা করছিল। জারা আর আরমান নামতেই হঠাৎ করে কথা থেমে যায়। চোখগুলো একসাথে তাদের দিকে ঘুরে আসে। কেউ কিছু বলছে না। শুধু তাকিয়ে আছে। জারা একটু অপ্রস্তুত হয়ে পড়ে। আরমান হালকা হাসে, যেন এসব তার কাছে খুব স্বাভাবিক। ঠিক তখনই আরহাম বাবাকে দেখে দৌড়ে আসে।
— “পাপা!”
আরমান মুহূর্তেই ছেলেকে কোলে তুলে নেয়। আরহাম বাবার গলায় হাত জড়িয়ে ধরে। জারা হাত বাড়ায় ছেলের দিকে।
— “আসো আমার কাছে, সোনা।”
কিন্তু আরহাম মুখ গোমড়া করে বলে,
— “ছলো, আমি দাবো না। আমাকে পতা বলসো তুমি।”
জারা হেসে জোর করে কোলে নিতে যায়।
— “ আহা! কতো অভিমান ? বাপের মতো এত জেদ করো কেন?”
আরমান তখন শান্ত কণ্ঠে বলে,
— “আরহাম আমার কাছেই থাকুক। তুমি নিলে শাড়ি এলোমেলো হয়ে যাবে।”
এই কথায় জারা আর কিছু বলে না। শুধু এক ঝলক মিষ্টি হাসি উপহার দেয়—যেটা সরাসরি আরমানের চোখে গিয়ে লাগে।
ড্রইংরুমে আবার কথাবার্তা শুরু হয়। আত্মীয়স্বজন, হাসাহাসি, ছোট ছোট আলাপ—সব মিলিয়ে উৎসব জমে উঠছে। কিন্তু জারা এক জায়গায় স্থির থাকতে পারছে না। ওর চোখ বারবার সদর দরজার দিকে চলে যাচ্ছে। মনে একটা অজানা অপেক্ষা। ঠিক তখনই মিম, জিনিয়া আর ফিহা জারার পাশে ঘিরে বসে থাকে। তিনজনের চোখেই আজ আলাদা উচ্ছ্বাস। জারার সাজগোছ দেখে তারা কেউ প্রশংসা লুকোতে পারে না। পিংক শাড়িটা জারার গায়ে যেন আরও নরম আর উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। শাড়ির আঁচল ঠিক করে দিতে দিতে মিম বারবার খেয়াল করছে, কোথাও যেন ভাঁজ এলোমেলো না হয়। জিনিয়া জারার চুলগুলো আঙুলে জড়িয়ে একটু ঠিক করে দেয়, যেন খোলা চুলগুলো আরও সুন্দরভাবে পিঠ বেয়ে নামে। ফিহা মিম আর জিনিয়াও কম যায় না। তারাও আজ যেনো নিজেকে আলাদা ভাবে তৈরি করেছে। তাদের খুব সুন্দর লাগছে। কিন্তু তারা জারা’র সৌন্দর্য নিয়ে মজা করছে।
জারা একটু লাজুক হাসি নিয়ে সবার যত্ন নিতে দেওয়া মাত্রই আরও সুন্দর লাগছে। তিন জন মিলে কখনো শাড়ির পাড় টেনে ঠিক করছে, কখনো কপালের টিপটা সামান্য সোজা করে দিচ্ছে। তাদের চোখে জারা শুধু এক সন্তানের মা নয়, আজ সে একেবারে নতুন করে সাজা এক নারী। চারপাশের হাসি, আলো আর উৎসবের আমেজে জারার লাজুক মুখটা আরও উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। বন্ধুদের এই ভালোবাসা আর আদরে তার মনটা অজান্তেই হালকা হয়ে যায়, উৎসবের আনন্দ যেন আরও গভীরভাবে ছুঁয়ে যায় তাকে।
হঠাৎ সদর দরজার সামনে জাহির দাঁড়ায়। হয়তো বাইরে কাউকে দেখতে বা কাউকে আনতে যাবে। ঠিক তখনই সামনে থেকে আসা কারও সাথে ধাক্কা লাগে।
জাহির এক পা পিছিয়ে গিয়ে নিজেকে সামলায়। সামনে তাকিয়েই সে থমকে যায়। সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটাকে দেখে যেন মুহূর্তেই সময় থেমে যায়।
ছায়মা। এক মুহূর্তে তাদের চোখাচোখি হয়। কয়েক সেকেন্ড—কিন্তু সেই কয়েক সেকেন্ডে কতগুলো বছরের স্মৃতি, কষ্ট, না বলা কথা, অসমাপ্ত অনুভূতি একসাথে ভিড় করে ওঠে।
জাহিরের বুকের ভেতর হঠাৎ করে কেমন করে ওঠে। নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হয়। আজ কতো বছর পর… কতো বছর পর সে এই মেয়েটাকে দেখছে। যে একসময় তার প্রতিদিনের ভাবনার কেন্দ্র ছিল।
ছায়মার চোখেও ঝড় বইছে। কিন্তু সে সেটা এক ফোঁটাও প্রকাশ করতে দেয় না। দৃষ্টি সরিয়ে নেয়। একেবারে অচেনা মানুষের মতো ভেতরে চলে যায়।
জাহির তখনও দরজার কাছে দাঁড়িয়ে। পা যেন মেঝেতে আটকে গেছে। ছায়মার চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে থাকে।
ভেতরে ছায়মা ঢুকতেই জারার চোখ জ্বলে ওঠে। সে বুঝে যায়—যাকে এতক্ষণ ধরে খুঁজছিল, সে এসে গেছে। জারা এগিয়ে গিয়ে ছায়মার হাত ধরে।
— “ ছায়মা আপু!”
ছায়মা হালকা হাসে। সেই হাসিতে অনেক কিছু লুকানো।
— “অনেক বড় হয়ে গেছো তুমি।”
জারা খুশিতে ভরে যায়।
— “তুমি সত্যিই এসেছো!”
__“হ্যাঁ এসেছি তো..! আরহাম কোথায় ? দেখছি না তো? ”
__“তোমার ভাইয়ার কোলে সে। ”
এতোক্ষণে ছায়মাকে সবাই গিরে ধরে। অনেক গুলো বছর পর মেয়েটাকে দেখে সবাই আবেগ ময় হয়ে যায়। তাকে নিয়ে সবাই কতো কথা, কতো অভিযোগ করছে। ছায়মা সব হাসি মুখে মেনে নেয়।
এই ফাঁকে আরমান দূর থেকেই সবকিছু লক্ষ্য করে। তার চোখ জাহিরের দিকেও পড়ে। জাহির এখনো অস্বাভাবিকভাবে চুপচাপ। আরমান কিছু বুঝতে পারে, কিন্তু কিছু বলে না। কিছু অনুভূতি আছে—যেগুলো ভাষায় বলা যায় না।
ড্রইংরুমে আবার কোলাহল বাড়ে। আরহাম বাবার কোলে বসে চারপাশ দেখছে। আজ তার দিন। কিন্তু বড়দের চোখে আজ আরও একটা পুরোনো গল্পের পাতাও উল্টে গেছে।
জাহির ধীরে ধীরে ঘরের ভেতরে আসে। চোখ পড়ে ছায়মার দিকে। কিন্তু এবার আর তাকিয়ে থাকে না। নিজের জায়গায় গিয়ে বসে পড়ে। কিন্তু তার বুকের ভেতরে জমে থাকা অনুভূতিগুলো আজ নতুন করে মাথাচাড়া দিচ্ছে।
রাতে খান বাড়ির ড্রইংরুমে আলোর ঝলকানি ও মোমবাতির নরম আলো ছড়িয়ে পড়েছে। আজ সেই দিন—আরহাম নিশান খানের জন্মদিন। ছোট্ট ছেলে বাবার কোলে বসে কেক কাটছে, আর পাশে মা জারা বসে, হাসি মুখে ছেলের দিকে তাকিয়ে আছে। আরহামের ছোট ছোট হাত দিয়ে কেকের ব্লেড ধরে রাখছে আরমান, যেন কোনো ভুল না হয়। কেকের মিষ্টি ঘ্রাণ পুরো ঘরকে ভরে দিয়েছে।
__“ ওয়ান, ট্যু, থ্রি .. কাটো, আমার সোনা,”
আরমান হাসি মুখে বলে। আরহাম নিজে ছোট্ট হাত দিয়ে ব্লেড ধরে কেক কেটে যায়। কেকের ছোট ছোট টুকরো নিচে পড়ে, আর জারা হেসে ফেলে। ঘরে উপস্থিত সকলেই হাত তালি দেয়। মিম, ফিহা, জিনিয়া, জাহির, রোহান—সবার চোখে আনন্দ, আর চোখের কোণে হাসি খেলা করে।রিয়াত আর নূর ছোট ভাইয়ের সাথে দাড়িয়ে আছে। জারা সাথে।
এই সময় জাহির বারবার আড় চোখে ছায়মার দিকে তাকাচ্ছে। চোখে অপ্রকাশিত অনুভূতি, লজ্জা ও আনন্দ মিশে আছে। আরমান লক্ষ্য করেই হালকা মুচকি হাসি ধরে রাখে। ছায়মা কোনো দিকে তাকাচ্ছে না, স্বাভাবিকভাবে কথা বলছে, কিন্তু চোখের ইঙ্গিত, —সবকিছু আরমানের নজরে। কেক কাটা শেষ হলে, আরমান গম্ভীর কণ্ঠে বলে,
__“আজ সবাই এখানে উপস্থিত। তাই আমি আজ একটি কথা বলতে চাই।”
সবার চোখ যেন আকৃষ্ট হয়ে যায়। জারা একপলকে হাসি মুখে আরমানের দিকে তাকিয়ে বলে,
__“এতো কিছু না বলে সোজাসুজি বলে দিলেই তো হয়।”
আরমান হেসে বলে,
__“ঠিক আছে, তাহলে তুমিই বলো।”
জারা খুশিতে গদগদ হয়ে ছায়মার দিকে এগিয়ে যায়। সে হেসে বলে,
__“ছায়মা আপু, আমি চাই তুমি আমার জাহির ভাইয়ার বউ হও।”
ঘরে হঠাৎ নীরবতা নেমে আসে। এক মুহূর্তের জন্য কেউ হাসছে না, কেউ শ্বাসও ফেলছে না। জাহির আর ছায়মা দুজনেই চকমকে উঠে। তাদের মুখে হাসি উধাও হয়ে গেছে। তখন আরিফ এগিয়ে এসে বলে,
__“এটা আর নতুন কি! এখন যখন ছায়মা দেশে এসে গেছে, আমরা বিয়ের দিন ঠিক করি।”
জাহিরের একটু অবাক লাগে, চোখে অবিশ্বাস । সে চুপচাপ মাথা নত করে দাড়িয়ে আছে। পরের কথা শুনার জন্য । আরিফ ফিরে ছায়মার বাবার দিকে তাকিয়ে বলে,
__“তুমি কী বলো।”
ছায়মার বাবা হাসি মুখে উত্তর দেন,
__“আপনারা যা ভালো মনে করেন। আমি বাদা দিব না। জাহিরও খারাপ ছেলে নয়। আমি দেখেছি, মানি এবং বিশ্বাস করি। জাহির আমার মেয়ের জন্য একেবারে যোগ্য।”
আনিছুর রহমান জোর দিয়ে বলেন,
__“ঠিক আছে, তাহলে সবাই একসাথে বসে বিয়ের দিন ঠিক করি।”
জাহির আর ছায়মা যেনো বার বার অবাক হচ্ছে। তার মা বাবা এ বিষয়ে সম্মতি দিচ্ছে দেখে। তাদের সিদ্ধান্ত কেউ যানতে চাইছে না। সবাই নিজেরাই সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। ছায়মা শক্ত হয়ে দাড়িয়ে আছে।জিনিয়া বার বার ছায়মার দিকে তাকাচ্ছে। যেনো কেউ পুরোনো ক্ষতে আবার খুঁচা দিয়েছে। একটু স্পর্শ পেলেই ভেঙে পরবে।
জাহিরও তাই। জারা আনন্দে ভরে ওঠে, চোখে ঝিলিক। ঘরে হালকা বাতাস বইছে। ফ্যানের ঘূর্ণন আর মোমবাতির আলো ছড়িয়ে পড়ছে। আরহাম এবং নূর খুশি হয়ে চিৎকার করছে। জারা আর আরমান একে অপরের দিকে তাকিয়ে হালকা হেসে নেয়। আরিফ খান, আসিফ খান, আনিছুর রহমান, ছায়মার বাবা—সবার মুখে হাসি।আরিফ বলে,
__“চলো, এখন বসে বসে বিয়ের তারিখ ঠিক করি,।”
সবাই যখন ড্রইংরুমে বসে বিয়ের তারিখ ঠিক করতে ব্যস্ত, ঠিক তখনই ছায়মার কণ্ঠটা হঠাৎ করে ঘরের মাঝখানে কেঁপে ওঠে।
__“আমি এই বিয়ে করতে পারব না।”
এক মুহূর্তে যেন সময় থমকে যায়। কারো হাতে ধরা চায়ের কাপ থেমে যায়, কারো মুখের হাসি জমে যায়। কিন্তু সবার থেকেও বেশি যিনি অবাক হন, তিনি জাহির। বিশ্বাসই করতে পারছে না সে—এই কথা ছায়মার মুখ থেকে বেরিয়েছে। জারা প্রথমে কিছু বুঝতে পারে না। ধীরে ধীরে ছায়মার দিকে তাকিয়ে মন খারাপ করা গলায় বলে,
__“কেন আপু? কেন এমন বলছো। ভাইয়াকে তোমার পছন্দ নয় ?”
ছায়মা চোখ নামিয়ে নেয়। খুব শান্ত কণ্ঠে, কিন্তু ভিতরে জমে থাকা ঝড় নিয়ে বলে,
__“এমনি। আমি এই বিয়ে করব না। ব্যাস।”
এই “ব্যাস” শব্দটার ভেতর যেন বহু বছরের কষ্ট লুকিয়ে আছে, কিন্তু কেউই তখন তা বুঝতে পারে না।
মারজিয়া বেগম ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে ছায়মার পাশে বসেন। মায়ের মতো স্নেহভরা গলায় বলেন,
__“কেন মা? আমাদের বা আমার জাহির কি তোমার পছন্দ নয়?”
ছায়মা কোনো উত্তর দেয় না। শুধু ঠোঁট শক্ত করে চেপে বসে থাকে। চোখের কোণে জল জমলেও সে তাকিয়ে থাকে মেঝের দিকে। আরমান তখনও চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। সে কিছু বলছে না, কিন্তু সব লক্ষ্য করছে। এই নীরবতা তার কাছে খুব পরিচিত—যে নীরবতায় অনেক না-বলা কথা থাকে। আরিফ খান গম্ভীর কণ্ঠে বলেন,
__ “ছায়মা আম্মু, জাহিরকে বিয়ে করতে তোমার সমস্যা কোথায়? খোলাখুলি বলো।”
এই প্রশ্নটা ছায়মার সহ্যের সীমা ভেঙে দেয়। সে হঠাৎ করেই দাঁড়িয়ে পড়ে।
__ “আমি বিয়ে করব না মানে করব না!”
তার গলার স্বরটা একটু বেশি তীক্ষ্ণ হয়ে যায়। কেউ কিছু বোঝার আগেই ছায়মা দ্রুত পা ফেলে ঘরের বাইরে চলে যায়। জাহির স্থির হয়ে বসে থাকে। মনে মনে ভাবে— ‘হয়তো এখন আর আমাকে ভালোবাসে না। হয়তো আমি ওর জীবনের অতীত মাত্র। আর এটা তো হওয়ারই ছিল।এর থেকে বেশি আর কি আশা করা যায়? সেও তো মেয়েটা কে কষ্ট দিয়েছে। আর বিয়ে না করাটা এখন স্বাভাবিক বিষয়। সে কেন এতো কষ্ট পাচ্ছে ।’
আনিছুর রহমান দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন,
__ “ছেলের মেয়ের সিদ্ধান্ত না জেনে আমরা এই বিষয়টা এগিয়ে নিতে চেয়েছিলাম। আমাদের ভুল হয়েছে।”
আরিফ খান আর কিছু বলেন না। শুধু চুপ করে বসে থাকেন। এই সময় ফারিয়া বেগম হঠাৎ মুখ ফসকে বলে ফেলেন,
__ “ওরা দু’জন তো একে অপরকে ভালোবাসত। তাই তো আমরা পাঁচ বছর আগেই বিয়ের কথা ভেবেছিলাম।”
এই কথা শুনে জাহির যেন আরও শক্তভাবে আঘাত পায়। ভালোবাসত? মানে এখন আর ভালোবাসে না? আী এাব কথা ওরা যানে কীভাবে? সে তো ছায়মাকে ফিরিয়ে দিয়েছিলো। রোহান, জাহেদ আর রাশেদ এসে নীরবে জাহিরের পাশে দাঁড়ায়। কেউ কিছু বলে না, কিন্তু উপস্থিতিটুকুই অনেক। আরমান ধীরে জারার দিকে তাকিয়ে বলে,
__“ছায়মা কোথায় গেল, দেখে আসো।”
মিম, জিনিয়া আর জারা তিনজন একসাথে বাগানের দিকে যায়। বাগানে গিয়ে তারা দেখে—ছায়মা সুইমিং পুলের ধারে বসে আছে। হাঁটুতে মুখ গুঁজে নিঃশব্দে কাঁদছে। কান্নাটা জোরে নয়, কিন্তু খুব গভীর।
জারা দৌড়ে গিয়ে তার পাশে বসে পড়ে।
__“আপু, এমন করছো কেন? কেন বিয়ে করবে না? তুমি তো ভাইয়াকে ভালোবাসো?”
মিম আর জিনিয়াও পাশে বসে পড়ে। ছায়মা মাথা তোলে। চোখ লাল, মুখ ভেজা। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে সে বলে,
__“যে মানুষটা আমাকে ভালোবাসে না, যে আমাকে সাত বছর আগে নিজে ফিরিয়ে দিয়েছে—আমি তাকে কীভাবে বিয়ে করব?”
জারা চমকে উঠে।
__“আপু, তুমি ভুল ভাবছো। ভাইয়া তোমাকে ভালোবাসে।”
ছায়মা হেসে ফেলে—কিন্তু সেই হাসিতে কোনো আনন্দ নেই।
__“মিথ্যা কথা। এটা হতে পারে না। উনি আমার মতো গায়ে-পোড়া মেয়েকে কেন ভালোবাসবে? আমার থেকে ভালো মেয়ে উনি পাবে। আর উনি আমাকে না করেছে আমার এই মুখ যেনো না দেখায়। আর এতো বছর ধরে আমি তাই করছিলাম। ভাগ্য ক্রমে আজ আবার দেখা হয়ে গেলো।”
এই কথাটা বলেই সে আবার কাঁদতে শুরু করে।
জারা তখন আর কিছু না বলে নিজের মোবাইলটা বের করে। কয়েক সেকেন্ড স্ক্রল করে একটা রেকর্ডিং প্লে করে। মোবাইল থেকে ভেসে আসে জাহিরের কণ্ঠ,
—“আমি ওকে ফিরিয়ে দিয়েছিলাম, কারণ আমি নিজেকে ওর যোগ্য মনে করতাম না। ও তখন পড়াশোনা, স্বপ্ন, নিজের একটা জীবন নিয়ে এগোচ্ছে। আর আমি? দায়িত্ব, সংসার, হিসাব–নিকাশে আটকে থাকা একজন মানুষ। আমি ভয় পেয়েছিলাম। ভয় পেয়েছিলাম—আমার জীবনে এসে ওর ডানা ভেঙে যাবে। আমি ছায়মাকে আজও ভালোবাসি। আমার মতো ধম্যবিদ্ধ পরিবারের ছেলেরা কখনো বড় ঘরের মেয়ের হাত চাইতে পারে না। আরমান ভাইয়া আমার বোন কে ভালোবেসে বিয়ে করে যন্তে রেখেছে। কারণ সে বড় ঘরের ছেলে। কিন্তু আমি বড় ঘরের মেয়েকে হয়তো ভালো রাখতে পারবো। তাই তাকে ভালোবেসেও পাওয়ার আশা কখনো করি নি। আমি ওকে সেদিন ফিরিয়ে দিয়েছিলাম। বোকা মেয়ে আমার মতো একজন অপারককে ভালোবেসে কতোই না কান্না করেছে। কিন্তু আমি ওকে আমার কাছে আটকাতে চাই না। ও যদি আমাকে না চায়, তবুও আমি ওর ভালোটাই চাই। ভালোবাসবো সবসময়। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত এই জাহিরের মনে ছায়মা ছাড়া আর কেউ কখনো আসবে না। আমি নিজেই আসতে দিব না। ছায়মা আমার না হলেও আফসোস নেই। ও ভালো থাকবে এটাই অনেক।”
ছায়মা একদম স্থির হয়ে যায়। চোখ বড় বড় করে মোবাইলটার দিকে তাকিয়ে থাকে। আরেকটা অংশ বাজে—
__“আমি ওকে ফিরিয়ে দিয়েছি ভাবছে, কিন্তু আসলে আমি ওকে নিজের কষ্ট থেকে বাঁচাতে দূরে সরে ছিলাম। ও আমার সাসে সুখি হতো না। ওর বয়স অল্প। আবেগের বসে এখন বলেছে ভালোবাসে। কিন্তু যখন পরিস্থিতি বুঝবে তখন আর আমাকে তার পছন্দ হবে না। তাই পরে কষ্ট পাওয়ার থেকে আগে কষ্ট পাওয়া অনেক ভালো। আল্লাহ যদি চায় তো ছায়মা আমার হবে না হলে তো নাই..? ”
একটু থামে জাহির। চোখ দুটো লাল। তারপর আবার বলতে থাকে,
__“ কিন্তু ভালোবাসা তো থামে নি ভাই। ছায়মা চলে যাওয়ার পর প্রতিটা রাত আমি ওর কথা ভেবে কাটিয়েছি। ওর নাম না নিয়ে আমি কোনো দোয়া করিনি এমন দিন নেই। আমি চাইনি ও জানুক, কারণ জানলে হয়তো ও থেমে যেত। আর আমি চাইনি ও থামুক আমার জন্য।”
আরমান ধীরে জাহিরের কাঁধে হাত রাখে। জাহির ফিসফিস করে বলে,
__“আজও আমি ওকে ভালোবাসি। আগের চেয়েও বেশি। কিন্তু সেই ভালোবাসা দাবি করে না। শুধু চায়—ও যেনো কখনো নিজেকে কম মনে না করে। আমি ফিরিয়ে দিয়েছিলাম ওকে, কিন্তু মন থেকে কোনো দিন ছেড়ে দিতে পারিনি।”
নেশার ঘোরে কথা গুলো বলে জাহির। এই কথা গুলো সেদিন আরমান রেকর্ড করে রাখে। জাহির মদ রেখে যখন নিজের মাঝে ছিলো না তখন আরমান তাকে ছায়মাকে নিয়ে প্রশ্ন করে। তখন জাহির কথা গুলো বলে।
ছায়মার হাত কাঁপতে থাকে।
__“এটা… এটা কখন?”
জারা নরম গলায় বলে,
__ “তুমি আমেরিকায় যাওয়ার অনেক দিন পর। আমি যখন প্রেগন্যান্ট ছিলাম তখন একবার এসেছিলো। ভাইয়া ভেবেছিল তুমি ওকে ঘৃণা করো। কিন্তু সে কখনো তোমাকে ভুলতে পারেনি। নিজের ভালোবাসা প্রকাশ না করলেও তোমায় সে ঠিকই ভালোবেসে। ভালোবাসার মানুষকে না পাওয়ার, না বলার কথা গুলো নিজেট মাঝে রেখে কষ্ট সহ্য করেছে।”
মিম ধীরে বলে,
__“আপু, কখনো কখনো মানুষ দূরে যায় ভালোবাসার জন্যই।”
ছায়মা মুখ ঢেকে কান্না করে ফেলে। এতদিনের জমে থাকা ভুল বোঝাবুঝি, অভিমান, কষ্ট—সব একসাথে ভেঙে পড়ে। জিনিয়া তার কাঁধে হাত রাখে।
__ “চল, এখন আর পালানোর দরকার নেই। জাহির ভাইয়া তোকে অনেক ভালোবাসে। তুই দেশ ছেড়ে না গেলে হয়তো এতো দিনে তোদের বিয়েটাও হায়ে যেতো! ”
ছায়মা জিনিয়ার মুখের দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে বলে,
__“ ম..মানে..?”
জারা ছায়মাকে জড়িয়ে ধরে বলে
__“মানে, তোমার আর ভাইয়ার বিয়ে অনেক আগেই দুই পরিবার মিলে ঠিক করে রাখে তোমাদের গোপনে। তোমার আরমান ভাইয়াই সব ঠিক করে আর কি দায়িত্ব নিয়ে । সবাই কে রাজি করেছে। কিন্তু তুমি দেশ ছেড়ে সব নষ্ট করে দিলে। ”
ছায়মা এতো এতো অবিশ্বাস্য ব্যাপার সহ্য করতে করছে না আর। কাঁদতে কাঁদতে বসে পরে। জারা’রা তিনজন মিলে অনেক বুঝিয়ে তাকে শান্ত হতে বলে। জাহির ভাইয়ার সাথে কথা বলে সব ঠিক করে নিতে।
কিছুক্ষণ পর ছায়মা উঠে দাঁড়ায়। চোখ মুছে নেয়। মুখে ক্লান্ত কিন্তু দৃঢ় ভাব। ছায়মা ভিতরে যেতে চায় না। বাধ্য হয়ে জারা বলে,
__“ এখানে অপেক্ষা করো। আমি ভাইয়াকে পাঠিয়ে দিচ্ছি। ”
বলে তিনজন আবার বাড়ির ভিতরে চলে যায়। সুইমিং পুলের কাছে এটা নীরবে দাঁড়িয়ে আছে শুধু ছায়মা। ঠোঁটের কোনে এক চিলতে হাসি।
জারা বাড়ির ভেতরে ঢুকেই বুঝে যায়—আজ আর তার সেখানে দাঁড়িয়ে থাকার জায়গা নেই। ড্রইংরুমে বড়রা ছাড়া কেউ নেই, পরিবেশটা ভারী, চাপা।বাচ্চাদের ও কোনো শব্দ নেই। সে কোনো কথা না বলে সোজা উপরে উঠে যায়। নিজের ঘরে ঢুকে দেখে আরহাম বিছানার মাঝখানে কাত হয়ে ঘুমাচ্ছে, ছোট্ট বুক ওঠানামা করছে শান্তিতে। ঘরের ভেতরে আরমান, রোহান, জাহেদ, রাশেদ আর জাহির—পাঁচজন একসাথে দাঁড়িয়ে ছিল। তাদের চোখেমুখে অস্বস্তি, চাপা চিন্তা। জারাকে দেখেই আরমান নিচু গলায় জিজ্ঞেস করে,
__“ওদিকের কী খবর লক্ষ্মী বউ ?”
জারা শান্ত কিন্তু দৃঢ় স্বরে বলে,
__“ভাইয়া, ছায়মা আপু বাগানে আছে। গিয়ে কথা বলো। নিজের ভালোবাসা প্রকাশ করো। অধিকার খাটাও। মেয়েটাকে আর কষ্ট দিও না। সে তোমার অপেক্ষায় বসে আছে।”
জাহির প্রথমে মাথা নাড়ে। যেতে চায় না। ভয়, অপরাধবোধ, দ্বিধা—সব একসাথে চেপে বসেছে তার ওপর। কিন্তু আরমান, রোহান কেউ ছাড়ে না। শেষ পর্যন্ত জাহির দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে বেরিয়ে যায়।
বাগানটা তখন আলো–আঁধারিতে ভরা। সুইমিং পুলের পানি হালকা নীল আলোয় ঝিলমিল করছে। ছায়মা পুলের কিনারায় বসে, পা দুটো পানিতে ডুবিয়ে রেখেছে। চোখ ফোলা, কিন্তু মুখ শক্ত করে রাখা। জাহির ধীরে ধীরে এগিয়ে আসে। শব্দ না করেই তার পাশে বসে, পা পানিতে ভিজিয়ে দেয়। কিছুক্ষণ নিঃশব্দ। শুধু পানির হালকা ঢেউ আর দূরের ঝিঁঝিঁ পোকার শব্দ। জাহির গলা পরিষ্কার করে বলে,
__“ক..কেমন আছো?”
ছায়মা তাকায় না। শুধু বলে,
__“ভালো।”
আর কিছু না। আবার নীরবতা। জাহির গুছিয়ে কথা খোঁজে।
__“বিদেশের জীবন… কেমন ছিল?”
__“ভালো।”
একই শব্দ। একই নির্লিপ্ততা। জাহির অস্বস্তিতে নড়ে।
__“পড়াশোনা… কেমন চলছে?”
বাগানের ঝোপের আড়াল দাড়িয়ে আছে চারজোটি।লুকিয়ে লুকিয়ে ছায়মা আর জাহিরের কথা শুনছে। কিন্তু জাহিরের এমন বোকা কথা শুনে আরমানের রাগ উঠে যায়। বকতে থাকে তাকে। জারাও নিজের ভাইয়ের অপমান সহ্য করতে না পেরে আরমানের হাতে চিমটি কাটে।আরমান আহ্ বলে লাফিয়ে উঠে।
এই প্রশ্নটা ছায়মার ভেতরের সব সংযম ভেঙে দেয়। সে হঠাৎ উঠে দাঁড়ায়। চোখে আগুন, গলায় কাঁপুনি।
__“এইসব বোকা প্রশ্ন করতে এসেছেন এখানে?”
বলেই সে হাত তুলে জাহিরের বুকে কিল বসায়। তারপর আরেকটা। তারপর ঘুষি। জাহির হতভম্ব।
__“আহ্… ছায়মা—”
কিন্তু ছায়মা থামে না। কান্না ভেঙে পড়ে।আরেকটা কিল মেরে বলে,
__“ভালোবেসেও আমাকে এত কষ্ট কেন দিলেন?এতগুলো বছর কেন নষ্ট করালেন? কেন বললেন না? কেন মুখ ফিরিয়ে নিলেন?”
জাহির আর চুপ করে থাকতে পারে না। সে উঠে দাঁড়িয়ে ছায়মার হাত দুটো ধরে ফেলে।
__“থামো… প্লিজ থামো। আমার কথা শুনো।”
ছায়মা হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করে, কিন্তু কাঁদতে কাঁদতে শক্তি হারিয়ে ফেলে। জাহির তাকে আলতো করে পুলের কিনারায় বসায়। নিজেও সামনে বসে পড়ে। জাহিরের গলা ভেঙে যায়,
__“শোনো,আমি তোমাকে ফিরিয়ে দিয়েছিলাম, কারণ আমি দুর্বল ছিলাম। ভালোবাসিনি বলে নয়, ভয় পেয়ে ।”
ছায়মা হেসে ওঠে—তীব্র, কষ্টভরা হাসি।
__“ভালোবাসা এভাবে হয়? ছেড়ে দিয়ে?”
জাহির চোখ নামিয়ে বলে,
__“আমি ভয় পেয়েছিলাম। আমি তখন নিজেকে যোগ্য মনে করতাম না। তুমি স্বপ্ন দেখছিলে, সামনে এগোচ্ছিলে। আর আমি—নিজের জায়গাতেই আটকে ছিলাম। আমি চাইনি তুমি আমার কারণে থেমে যাও।”
ছায়মা চিৎকার করে বলে,
__“আপনি কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার? আমার জীবন নিয়ে, আমার ভালোবাসা নিয়ে?”
জাহির মাথা নেড়ে বলে,
__“আমি জানি ভুল করেছি। প্রতিটা দিন আমি সেই ভুলের শাস্তি ভোগ করেছি। তুমি চলে যাওয়ার পর আমার রাতগুলো ছিল শূন্য। তোমার নাম না নিয়ে আমি কোনো দোয়া করিনি এমন দিন নেই।”
ছায়মার কান্না থামে না, কিন্তু হাত আর ওঠে না। ফিসফিস করে বলে,
__“আমি ভাবতাম তুমি আমাকে ভুলে গেছো,আমি ভেবেছি আমি তুচ্ছ। গায়ে পরা মেয়ে বলেই হয়তো তুমি লজ্জা পেয়েছিলে।”
এই কথায় জাহির যেন ভেঙে পড়ে।
__“না… কখনো না। তুমি আমার কাছে কখনো ছোট ছিলে না। আমি নিজেকে ছোট মনে করতাম।”
পুলের পানিতে ছায়মার চোখের জল পড়ে, ছোট ঢেউ ওঠে।
__“তাহলে এত বছর কেন চুপ ছিলে?”
জাহির কাঁপা গলায় বলে,
__“কারণ আমি জানতাম, একবার যদি বলি—তুমি থেমে যাবে। আর আমি চাইনি তুমি আমার জন্য থামো।আমি তোমাকে বিলাশ বহুল জীবন দিতে পারত না। তাই প্রকাশ ও করিনি ।”
এই সময় বাগানের ঝোপের আড়ালে থাকা চারজোড়া চোখ নীরবে সরে যায়। আরমান দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে। জারা চোখ মুছে নেয়। রোহান ফিসফিস করে বলে,
__“শেষ পর্যন্ত বললো তাহলে…”
পুলের ধারে আবার নীরবতা। এবার সেই নীরবতা আগের মতো কঠিন না। ভেজা, ভারী, কিন্তু সত্যি।
ছায়মা ধীরে বলে,
__“আপনি জানেন, এই আপনার অবহেলা আমাকে কতটা ভেঙে দিয়েছে? ”
জাহির মাথা নোয়ায়।
__“জানি। আর তাই আজ তোমার সামনে দাঁড়িয়ে আছি। যদি শাস্তি দাও, মেনে নেব। যদি ফিরিয়ে দাও, মেনে নেব। কিন্তু আর মিথ্যা বলব না। আমি সত্যি তোমায় খুব ভালোবাসি। ”
ছায়মা চোখ তুলে তাকায়। দীর্ঘ সময় তাকিয়ে থাকে।
__“আমি সহজে ক্ষমা করতে পারব না,কিন্তু আজ প্রথমবার মনে হচ্ছে—আমি পাগল ছিলাম না। আপনার ওই নেশার ঘোরে কথা গুলো শুনে। ”
জাহির অবাক হয়ে বলে,
__“ নেশার ঘোরে মানে..?”
__“ জারা আমাকে আপনার বলা আমার প্রতি ভালোবাসার কথা গুলো রেকর্ড করে শুনিয়েছে।”
জাহির কিছু বলে না। শুধু বসে থাকে। সে বুঝে গেছে এটা কার কাজ। ঠিক যেমন বহু বছর আগে থাকা উচিত ছিল। পুলের পানি নড়ে। রাতটা ধীরে ধীরে হালকা হয়। কিছু ক্ষত শুকাতে সময় লাগে।
কিন্তু সত্যি কথা বলার পর—আর অন্ধকার থাকে না।
জাহির একটু হালকা হাসি নিয়ে বলল,
__“এখন কী আমায় বিয়ে করতে কোনো আপত্তি আছে আপনার, ম্যাডাম?”
কথাটা শেষ হওয়ার আগেই ছায়মা কোনো উত্তর খোঁজার সময় নিল না। এক ঝটকায় সে জাহিরকে জড়িয়ে ধরল। এতটাই হঠাৎ যে জাহির নিজেকে সামলাতে পারল না। ভারসাম্য হারিয়ে দু’জনেই ঘাসের ওপর পড়ে গেল। পুলের ধারে নরম ঘাস, রাতের ঠান্ডা বাতাস—সব মিলিয়ে মুহূর্তটা অদ্ভুতভাবে নিঃশব্দ হয়ে গেল। ছায়মা জাহিরের বুকে মাথা রেখে ধীরে বলল,
__“কোনো আপত্তি নেই এখন। কিন্তু আমাকে কষ্ট দেওয়ার জন্য আপনি শাস্তি পাওনা আছেন। বিয়ের পর এক এক করে দেব।”
জাহির হেসে দু’হাত দিয়ে ছায়মাকে আগলে ধরল। তার কণ্ঠে দীর্ঘদিনের চাপা রাখা স্বস্তি,
__“আপনার শাস্তিগুলো আমার জীবনে সুখ হয়ে আসুক ম্যাডাম..!”
এই কথা বলেই সে আলতো করে ছায়মার ঠোঁটে চুমু দিল। মুহূর্তেই ছায়মার গাল লাল হয়ে উঠল। চোখ নামিয়ে সে কিছু বলল না, শুধু লজ্জায় হাসল। এতদিনের কষ্ট, ভুল বোঝাবুঝি, না বলা কথা—সব যেন এক নিমেষে নরম হয়ে গেল। ঠিক তখনই ঝোপের আড়াল থেকে হঠাৎ শব্দ। রোহান বড় বড় চোখ করে তাকিয়ে থেকে বলে,
__“আমরা কিছু দেখি নি!”
জাহেদ ও বলে,
__“একদমই না!”
একসাথে কয়েকটা কণ্ঠস্বর শুনে জাহির আর ছায়মা চমকে উঠে হুড়মুড়িয়ে সোজা হয়ে বসল। আরমান, রোহান, জাহেদ, রাশেদ আর জারা—সবাই একসাথে দাঁড়িয়ে আছে, কারও মুখে দুষ্টু হাসি, কারও চোখে স্বস্তি।
ছায়মা লজ্জায় মুখ ঢেকে ফেলে। জাহির মাথা চুলকে হাসে। জারা দুই হাত কোমরে রেখে নাটকীয় ভঙ্গিতে বলে,
__“আহা! কী লজ্জা লজ্জা ভাব! চল, ওদের আর লজ্জা না দিয়ে আব্বুদের জানাই। বিয়ের ব্যবস্থা পাকাপোক্ত করা দরকার।”
আরমান হেসে মাথা নেড়ে বলে,
__“এই নাটক অনেক হলো। এখন বিয়ের ব্যবস্থা করতে হবে ।”
সবাই হইহই করে বাড়ির ভেতরের দিকে চলে যায়। যাওয়ার সময় কেউ আর পেছনে তাকায় না, যেন ইচ্ছে করেই দু’জনকে একটু সময় দেওয়া হয়।
বাগানে আবার নীরবতা নামে। তবে এবার সেই নীরবতা আর ভারী নয়—হালকা, শান্ত। জাহির ধীরে ছায়মার দিকে তাকায়। ছায়মা মাথা নাড়িয়ে বলে,
__“বিশ্বাস করতে ভয় লাগছে। যদি আবার—”
জাহির তার হাত চেপে ধরে।
__“আর না। এবার যদি কোনো ভয় থাকে, সেটা একসাথে সামলাবো।”
ছায়মা প্রথমবারের মতো নির্ভয়ে তার চোখের দিকে তাকায়। দূরে বাড়ির আলো আরও উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। ভেতর থেকে হাসির শব্দ ভেসে আসে। হয়তো বিয়ের তারিখ, আয়োজন, ভবিষ্যৎ—সব নিয়ে আলোচনা শুরু হয়ে গেছে। ছায়মা উঠে দাঁড়ায়।
__“চলো, আমাদেরও যেতে হবে।”
জাহির উঠে তার হাত ধরে।
__“এই হাতটা ছাড়বে না তো?”
ছায়মা হালকা করে মাথা নাড়ে।
__“এত সহজে না মশাই ।”
দু’জন পাশাপাশি হাঁটতে হাঁটতে বাড়ির দিকে এগোয়। প্রতিটা পা যেন নতুন করে লেখা কোনো অধ্যায়ের শুরু। পেছনে পড়ে থাকে পুল, অন্ধকার বাগান, আর এতদিনের না বলা কষ্ট।
আরমানরা এসে বড়দের খবর দেয়। তাদের মাঝে ভুল বোঝাবুঝি সব ঠিক হয়ে গেছে। এখন বিয়ের ব্যবস্থা করতে পারে। এই খবর শুনে সকালে “আলহামদুলিল্লাহ ” বল। দরজার ভেতর থেকে পরিবারের কণ্ঠস্বর, আলো, উষ্ণতা—সব একসাথে এসে জড়িয়ে ধরে ওদের। আজ আর কোনো ভুল বোঝাবুঝি নেই, কোনো না বলা কথা নেই। শুধু সামনে তাকিয়ে থাকা একসাথে পথ চলা। বিয়ের দিন তারিখ ঠিক করে হয়। ছায়মা আর জাহির কে পাশে বসিয়ে। অনেক রাত হয়ে যায়। সকলে রাতে ডিনার করে যে যার রুমে চলে যায়।
জারা রুমে এসে ধীরে ধীরে চেঞ্জ করে নেয়। সারাদিনের ক্লান্তি শরীরের ভেতরে জমে আছে, তবু মনটা অদ্ভুত রকম শান্ত। বিছানায় শুয়ে থাকা আরহামের মুখের দিকে তাকিয়ে সে একটু হাসে। ছেলেটা গভীর ঘুমে, ছোট ছোট নিঃশ্বাসে বুক ওঠানামা করছে। জারা আলতো করে ওর পাশে শুয়ে পড়ে, চোখ বন্ধ করতে যাবে—ঠিক তখনই বাথরুমের দরজা খোলার শব্দ।
আরমান বেরিয়ে আসে। গায়ে হালকা ধুসর রঙের টাউজার, চুলে এখনো পানির ছোঁয়া। সে কিছু বলে না। একেবারে নিঃশব্দে এগিয়ে এসে জারাকে কোলে তুলে নেয়। আচমকা এই ঘটনায় জারা একটু চমকে ওঠে।
__“এই এই স্বামীজান! কী করছেন?”
তার কণ্ঠে প্রতিবাদ কম, বিস্ময় আর হাসি বেশি।
আরমান কোনো উত্তর দেয় না। জারাকে কোলে নিয়েই বারান্দার দিকে চলে যায়। রাতের বাতাস ঠান্ডা, বারান্দার লাইটটা নরম হলুদ। চেয়ারে বসে পড়ে আর জারাকে নিজের বুকে টেনে নেয়। জারা স্বাভাবিকভাবেই মাথা রাখে আরমানের বুকে।
__“কি হয়েছে আরহামের পাপা?”
জারার কণ্ঠে মায়া, কৌতূহল। আরমান গভীর শ্বাস নেয়। যেন অনেক কথা জমে আছে। খুব আস্তে বলে,
__“ভালোবাসি,”
জারা একটু হেসে তার দিকে তাকায়।
__“আমিও।”
আরমান আবার বলে, আগের চেয়ে দৃঢ় কণ্ঠে,
__“খুব ভালোবাসি… আরহামের আম্মু।”
জারা আর কিছু বলে না। শুধু আরমানের বুকে একটা আলতো চুমু দেয়।
__“আমিও খুব ভালোবাসি আপনাকে স্বামীজান ।”
তারপর দু’জনের মাঝে নিরবতা নেমে আসে। কোনো অস্বস্তিকর নিরবতা নয়, বরং এমন এক শান্ত নীরবতা যেখানে কথা না বললেও সব বলা হয়ে যায়। দূরে কোথাও কুকুরের ডাক, বাতাসে পাতার শব্দ—সব মিলিয়ে রাতটা জীবন্ত। হঠাৎ রুমের ভেতর থেকে ছোট্ট একটা শব্দ আসে। ঘুঁ ঘুঁ… আরহাম। জারা সঙ্গে সঙ্গে সোজা হয়ে বসে।
__“ওর ঘুম ভেঙে গেছে মনে হয়।”
সে উঠে ভেতরে চলে যায়। বিছানার পাশে গিয়ে দেখে আরহাম আধো ঘুমে কুঁকড়ে আছে, মুখটা একটু ভারী। মা-বাবাকে পাশে না পেয়ে অস্থির হয়ে উঠেছে।
জারা ছেলেকে কোলে তুলে নেয়।
__“এই তো আম্মু এখানে… ঘুমাও সোনা।”
আরহাম মায়ের কাঁধে মুখ গুঁজে ধরে। ছোট্ট হাত দিয়ে জামা চেপে ধরে রাখে, যেন আর ছেড়ে দেবে না।
জারা আবার বারান্দায় আসে। আরমান হাত বাড়িয়ে দেয়। জারা আরহামকে তার বুকে নিয়ে স্বামীজানের বুকে মাথা রেখে শুয়ে পরে । মুহূর্তেই তিনজন একসাথে জড়িয়ে যায়—একটা নিঃশব্দ, অদৃশ্য বৃত্তে।
আরমান দু’জনের কপালে আলতো চুমু দেয়।
__“তোমরা আমার পৃথিবী,এই পৃথিবী ছাড়া আমি কিছুই না। একদম অর্থহীন।”
জারা কিছু বলে না। তার চোখ ভিজে আসে। আরহাম বাবার বুকে মাথা রেখে আবার ঘুমিয়ে পড়ে, নিশ্চিন্ত।
আরমান একটু থেমে আবার কথা শুরু করে। কণ্ঠে আবেগ, কিন্তু শান্ত।
__“জানো মানজারা, কখনো ভাবিনি জীবনটা এমন হবে। একটা সময় ছিল, শুধু নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবতাম। এখন তোমাদের ছাড়া কোনো ভাবনাই নেই।”
জারা চুপচাপ শোনে। আরমান হালকা হাসে,
__“আমার সেই হাফ ইঞ্চির মেয়েটা,আজ আমার ঘরের ঘরণী। আমার সন্তানের জননী। কতো সুখ আল্লাহ আমার জন্য লিখে রেখেছে..! ”
জারা লজ্জায় চোখ নামিয়ে নেয়। সে জারার চুলে হাত বুলিয়ে দেয়।
__“তুমি জানো না, প্রতিদিন সকালে তোমাদের মুখ দেখেই আমি শক্তি পাই। বাইরে যত ঝড়ই থাকুক, এই ঘরটাই আমার আশ্রয়।”
জারা গভীর নিঃশ্বাস নেয়।
__“আমিও তো তাই। আপনি আর আরহাম—এই তো আমার সব স্বামীজান।”
আরমান চেয়ারটায় একটু হেলান দেয়। আকাশের দিকে তাকায়। তারারা ঝিলমিল করছে। আরমান ধীরে বলে।
__“সবসময় একরকম থাকবে না হয়তো,কখনো ঝগড়া হবে, কখনো মন খারাপ হবে। কিন্তু একটা কথা দাও—কখনো একা ছেড়ে যাবে না।”
জারা মাথা নাড়ে।
__“কথা দিলাম।”
আরহাম নড়েচড়ে উঠে বাবার গলা জড়িয়ে ধরে। আধো ঘুমে বিড়বিড় করে,
__“পাপা…”
আরমান হেসে পড়ে।
__“এই দেখো, আমাদের রাজা ডাকছে।”
জারা হাসে।
__“ও জানে, আমরা দু’জন এখানেই আছি।”
রাত আরও গভীর হয়। বারান্দার আলো নিভিয়ে তারা ধীরে ধীরে রুমে ফিরে আসে। আরহামকে মাঝখানে শুইয়ে দেয়। আরমান একপাশে, জারা আরেকপাশে। ছোট্ট পরিবারটা আবার একসাথে। ঘুম আসার আগে আরমান শেষবারের দু’জনকে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বলে,
রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ৮১
__“তোমরা দুইজন—এইটাই আমার জীবনের পুরো গল্প। যেদিন আমার কথা ফুরিয়ে যাবে, সেদিনও এই ভালোবাসা ফুরাবে না। তোমরাই আমার সমাপ্তি, আবার তোমরাই আমার শুরু। তোমরা তিন জন মিলে..এইটাই আমার পুরো পৃথিবী। খুব ভালোবাসি তোমাদের আমার নিস্পাপ পৃথিবী..! ”
সমাপ্ত
