লাভ বাই দ্যা ভিলেন পর্ব ৪১
লিজা মনি
নাজলী কান চেপে ধরে। ফিনিশড! কি ফিনিশড? মেয়েটাকে কি মেরে ফেললো? নাজলী কান্না করে উঠে। দুই হাতে ছন্ন ছাড়া হয়ে চুল খামছে ধরে। দরজা খুলার শব্দ পেতেই লুকানোর জন্য দৌড় দেয়। তবে পিছন থেকে নরপশুটার গগন কঁপানো ডাঁক,
” কে ওখানে?
ডাকটা শুধু এক ভয়ানক শব্দ ছিলো না। এই শব্দটা এই মুহূর্তে নাজলীর মেরুদণ্ড চিরে ভেতরে ঢুকে যায়। শরীরটা মুহূর্তে পাথর হয়ে গেছে। মনের ভিতরে যে ভয় বর্তমানে সেটা শীতল সাপের মতো তার শিরা-উপশিরায় পেঁচিয়ে ধরেছে। চোখ দুটো বিস্ফারিত হয়ে উঠেছে। ঠোঁট দুইটা কাঁপছে অননরত। নিঃশ্বাস থেমে আছে এক ফোঁটা শব্দের ভয়ে। অন্ধকারের বুকের মধ্যে দাঁড়িয়ে নিশ্বাস নিতেও ভয়ে পাচ্ছে। এখানে একটিমাত্র শব্দই যথেষ্ট, সবকিছু উল্টে দেওয়ার জন্য। গলা শুকিয়ে আসছে তৃষ্ণায়। লোকটার ধীর পা তার দিকে এগিয়ে আসছে। লোকটা যত এগিয়ে আসছে নাজলীর রক্ত যেন তত হীম হয়ে আসছে। সে পালাতে চাইছে কিন্তু আতঙ্ক এমনভাবে চেপে ধরেছে যে শরীর নড়া-চড়া করার শক্তিটাও নেই। ভয়ে শক্তভাবে জামার একাংশ চেপে ধরে রেখেছে। জীবন রক্ষার্থে পালানোর জন্য মনে সাহস সঞ্চয় করে তুলে। যে করে’ই হোক এই জানোয়ারটার দৃষ্টিসীমানার বাহিরে যেতে হবে। নাহলে তারও ঠিক সেই অবস্থা হবে যেমনটা কিছুক্ষণ আগে মেয়েটার হয়েছে। মেয়েটা গোঙ্গিয়েছে, চিৎকার করেছে কিন্তু শুয়রের বাচ্চা ছাড়ে নি তাকে। মেয়েটার জায়গায় নিজেকে কল্পনা করতেই আৎকে উঠে। চোখ -মুখ খিঁচে বিরবির করতে থাকে,
” শক্তি দাও আমাকে আল্লাহ…. প্লিজ আমার সম্মান অক্ষত রাখো। জানোয়ারের হাতে নিজের বান্দাকে পিষে যেতে দিও না। সাহস দাও। শক্তি দাও।
বিরবির করতে করতে নাজলী দৌঁড় দিতে যাবে। এমন সময় গাড়ির হর্নের শব্দে আবার ও থেমে যায়। সাহস করে অবশ হয়ে যাওয়া শরীরটাকে নড়ার জন্য সাহস জুগান করে। ভীত দৃষ্টিতে মাথা ঘুরিয়ে ধীরে ধীরে পিছনে ফিরে তাকায়। সাথে সাথে চোখে -মুখে আশার আলো ফুটে উঠে। যে লোকটা তার দিকে এগিয়ে আসছিলো সে উল্টো ঘুরে গাড়ির দিকে এগিয়ে যেতে থাকে। নাজলী আর এক মুহূর্ত অপেক্ষা করলো না। এক দৌঁড়ে ঝোঁপের আড়ালে চলে যায়। গাড়ির আলোতে আলোকিত হয়ে উঠে আশে-পাশের পরিবেশ। সে ঝোঁপের আড়াল থেকে সামনের প্রতিটা দৃশ্য দেখতে থাকে। লোকটাকে দেখে সে অবাক হয়ে যায়। লোকটার এক হাত নেই। এই ভাঙ্গা হাত নিয়ে মেয়েটাকে রে**প করেছে! অথচ মেয়েটা নিজেকে বাঁচাতে পারলো না। কুকুরের বাচ্চার কত ডিগ্রী উত্তেজনা হলে এই ভাঙ্গা হাত নিয়ে ফুলের মত নিষ্পাপকে অপবিত্র করে মেরে ফেলে। নাজলী রাগে কাঁপছে রিতীমত। ইচ্ছে করছে চাঁ**পাতি দিয়ে মেইন পয়েন্ট কেঁ*টে বিষাক্ত পোকা ছেড়ে দিতে। তাহলে কুলাঙ্গারের শিক্ষা হত।
ঠিক ততটা ছটফট করত যতটা ছটফট মেয়েটা করেছে। নাজলী বড় বড় নিশ্বাস নেয়। গাড়ি থেকে নেমে আসে তিনজন শক্তপোক্ত দেহের যুবক। তাদেরকে চিনতে তার একটুও ভুল হয় নি। এমন নরকীয় ঘটনায় নিক, আরিশ, অধিরাজকে দেখে যেন আরও কেঁপে উঠে। আরিশের রাগান্বিত মুখটার দিকে সে তাকায়। কেনো জানি এই মুহূর্তে আরিশকে এখানে দেখে নাজলীর রুহটা ছিঁড়ে যাচ্ছে। চোখের পাতা কাঁপতে কাঁপতে ভারী হয়ে আসছে তার। দৃষ্টির চারপাশ ঝাপসা দেখতে পাচ্ছে। তাদের মধ্যে কি কথা হচ্ছে জানা নেই তার। শুধু দেখতে পাচ্ছে গাড়িতে পড়ে থাকা মেয়েটাকে দুইজন গার্ড নিয়ে যাচ্ছে। মেয়েটার নগ্ন শরীরের উপর একটা কালো চাদর রাখা হয়েছে।পুরো শরীর শিরশির করে উঠে তার। আরিশের থেকে দৃষ্টি ঘুরিয়ে সে নিকের দিকে চাইলো। নিক লোকটাকে কিছু একটা বলছে। নাজলীর চোখ থেকে পানি পড়ছে অনবরত। অন্ধকারের মাঝেও সে অনুভব করছে ভয় কীভাবে তার শরীর দখল করছে। আঙুলগুলো অসাড় হয়ে আসছে। তবু ছন্নছাড়া হয়ে চুল আঁকড়ে ধরে। এ যেন নিজের অস্তিত্ব ধরে রাখার শেষ ব্যর্থ চেষ্টা। কান্না বেরোতে চাইলেও গলা তালাবদ্ধ হয়ে গেছে এই মুহূর্তে। অশ্রু গড়িয়ে পড়ল নিঃশব্দে। নিস্তেজ গলায় নাজলী নিশ্বব্দে আর্তনাদ করে উঠে,
” রাতের অন্ধকারে এত পৈশাচিকতা! জানোয়ার একটা মেয়েকে ধ্বংস করে দিয়েছে। আর হায়েনার দলেরা প্রমান মুছে দিতে আসছে! এই আমি কার মায়ায় জড়ালাম! যুদ্ধ, প্রতিহিংসার মধ্য দিয়ে কিভাবে বিমোহিত হয়ে গেলাম এই জঘন্য পুরুষটার প্রতি। উনি তো আমার বাস্তবতা নন। স্বামী নন আমার। ধ্বংরের এক স্তম্ভ তারা। যারা শুধু ধ্বংস করতে জানেন।
শেষ রাতের দিকে। ধরনীতে ধীরে ধীরে আলোর আগমন ঘটছে। চারপাশে আবছা আলোয় আলোকিত। বর্তমানে অধিরাজ আর নিক বাগান বাড়িতে এসেছে। আরিশ ডিভানে হেলান দিয়ে চোখ বন্ধ করে রেখেছে। রাগান্বিত গলায় বলে,
” ট্রাস্ট মি নিক, জানি না কবে তর এই নরখাদকে প্রানে মেরে ফেলি। মাদার্ফাক, কি প্রয়োজন ছিলো আজ রাতে এই ঘটনাটা ঘটানোর। আজ কোনো রিয়্যাক্ট করলি না কেনো? মেয়েটাকে একদম মেরে ফেলেছে।
নিক শান্ত গলায় বলে,
” এদের কাজ এই পুরুষদের বিছানায় যাওয়া। আজ এক পুরুষকে সহ্য করতে না পেরে মরে গেছে। এতে জেডের অপরাধ কোথায়?
আরিশ ভ্রুঁ কুচকে বলে,
” মানে?
নিক গ্রিবাদেশ নাড়িয়ে বলে,
” প্রস্টিটিউট ক্লাবের এই মেয়ে। ম্যাসিমোর গার্লফ্রেন্ড।
আরিশ অবাক হয়ে বলে,
” তুই জানলি কিভাবে? আমি তো কোনোদিন দেখিনি। তাছাড়া তুই তো ওখানে জীবনেও যাস না।
নিক অধরে বাঁকা হেসে ফুটিয়ে বলে,
” এই মেয়ে একবার এসেছিলো আমার কাছে। খবর পেয়েছি ও প্রস্টিটিউড ক্লাবের নর্তকী। ম্যাসিমোর সাথেও এক -দুইবার দেখেছিলাম।
আরিশ থমথমে গলায় বলে,
” ম্যাসিমোর মত জানোয়ারের গার্লফ্রেন্ড জেডের সাথে পেরে উঠলো না?
আরিশ দাঁত পিষে বলে,
” ম্যাসিমো জানোয়ার হলেও হুশ আছে। কিন্তু জেড মানুষ খেকো নরখাদক। মেয়ে দেখলে ও নিজের মধ্যে থাকে না। প্রচুর তফাৎ দুজনার । সঠিক সময় না পৌঁছালে হয়ত মেয়েটার কাচা মাংস আর রক্ত খুবলে খেত।
আরিশ ফুঁশ করে শ্বাস টেনে অধিরাজের দিকে তাকিয়ে বলে,
” কাজ শেষ?
অধিরাজ মাথা নাড়ায়,
” জি স্যার। টর্চার সেলে নেওয়ার সাথে সাথেই মেয়েটাকে এসিডে ডুবিয়ে দেওয়া হয়েছে।
আরিশ কিছুক্ষন চুপ মেরে বসে থাকে। মেয়েটা খারাপ, চরিত্রহীন। আর চরিত্রহীনরা নিকের দুই চোখের শত্রু। তাই বলে এতটা নৃশ্যংসতা!
আরিশ নিকের উদ্দেশে শান্ত গলায় বলে,
” আজ বউ রেখে আমাদের গলায় ঝুলে আছিস কেনো?
নিক ওয়াইনে চুমুক দিয়ে বলে,
” কাজ আছে।
” আজ কিসের কাজ? যত পাচার করা সব তো কমপ্লিট। জানামতে বর্তমানে কোনো কাজ নেই, যেটা তর রাত জেগে করতে হবে। আর রাত জেগে যেটা করতে হবে সেটা এখানে নয়, সেটা তর বউয়ের কাছে।
নিক বিরক্তির চোখে তাকায় আরিশের দিকে। আরিশের চোখ দুইটা অস্বাভাবিকভাবে লাল হয়ে আছে। কেমন ছন্ন ছাড়া দেখা যাচ্ছে তাকে। এই আরিশের রুপ নিক কম এই দেখেছে। ভ্রুঁ কুচকে ফেলে নিক,
” তর চোখ-মুখের এই অবস্থা কেনো?
আরিশ চট করে তাকায় নিকের দিকে। দুই হাত দু- পাশে ছড়িয়ে বলে,
” পুরো রাত নির্ঘুম তাই হয়ত এমন লাগছে।
” যাস্ট সেট আপ! নির্ঘুম থাকাটা আমাদের অভ্যাস। রাত -দিনের কোনো ভেদাভেদ নেই আমাদের কাছে। মাঝে মাঝে ফর্মালিটি করে বিছানায় যেতে হয়। আর এখন বউয়ের জন্য যেতে হয়। আমি তর কথা জিজ্ঞাসা করছি। ড্রাগস নিয়েছিস?
আরিশ ঠোঁট কামড়ে ধরে হাসে,
” অল্প নিয়েছি।
নিক কপাল কুচকে ফেলে। নিক প্রতিনিয়ত ড্রাগস নেয়। এইটা তার অভ্যাসে পরিনত হয়েছে। কিন্তু আরিশের ব্যাপারটা মানতে পারছে না। চোয়াল শক্ত করে ফেলে সে,
” শুয়রের আচ্চা ড্রাগস নিয়েছিস কেনো?
আরিশ হালকা হেসে বলে,
” যন্ত্রনা হচ্ছিলো তাই অল্প নিয়েছি। টেনশন করিস না। নেশা ধরবে না এই সামান্যতে।
নিক তীক্ষ্ণ দষ্টিতে তাকায় আরিশের পানে। গলার খাঁদ নামিয়ে প্রশ্ন করে,
” নাজলী কোথায়?
আরিশ বিরক্তিতে কপাল কুচকায়,
” খবরদার এই মেয়ের নাম আমার মুখে নিবি না।
নিক দাঁত পিষে,
” আর এই মেয়ের জন্য যে পাগলা কুকুর হয়ে যাচ্ছিস তার বেলায়? নাজলী কোথায়, আন্সার মি আরিশ?
আরিশ ঠোঁট চেপে ধরে নিকের দিকে তাকিয়ে হাসে,
” জীবনের প্রথম নিজের বন্ধুকে বুঝতে ভুল করলি নিক। ক্রিমিনাল লিডারের এতটাও অধঃপতন আসে নি যে, সামান্য মেয়ের জন্য পাগলা কুকুর হয়ে যাবে। এই মেয়েকে তো সহ্য করতে পারি না। আমার মাকে নিয়ে বাজে মন্তব্য করছিলো। বলছিলো আমি নাকি চরিত্রহীন মায়ের সন্তান। আ ভায়োলেন্ট রেইজ সার্জড ইনসাইড মি, ক্রেভিং আ সাইলেন্স সো অ্যাবসোলিউট দ্যাট ইভেন পেইন উড হ্যাভ নো ভয়েস।
নিকের কপালে ভাঁজ পড়ে। অধিরাজ শুকনো ঢোক গিলে। গলা কাঁপছে তার। কাঁপা গলায় বলে,
” উনাকে কি মেরে ফেলেছেন স্যার? একটা সুযোগ কি দেওয়া যেত না। মেয়েটা না বুঝে হয়ত রাগের মাথায় বলে ফেলেছিলো।
আরিশ ক্রুদ্ধ গলায় বলে,
” বাল আহাজারি কম কর। মারি নি আমি। বের করে দিয়েছি বাড়ি থেকে।
নিক গম্ভীরতা টেনে বলে,
” কখন বের করে দিয়েছিলি?
” হবে হয়ত এগারোটা -বারোটার দিকে। বাদ দে এইসব কথা। জাহান্নামে যাক আই ডোন্ট কেয়ার।
নিক মাথায় হাত রেখে বলে,
” যদি কায়াত, ইগরের হাতে পড়ে? একবার পড়তে পারলে রক্ষা নেই সিউর। কিন্তু এর জন্য আমার ঘরে থাকা বোকা মেয়েটা কথার আঘাতে আমাকে ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন করে দিবে।
আরিশ চট করে সোজা হয়ে বসে। চোখে-মুখে ক্লান্তির ছাপ উধাও। ছটফট গলায় বলে,
” ওদের হাতে পড়বে মানে? তুই তো বলেছিস ওরা জানে নাজলী মৃত। তাহলে মৃত ব্যক্তিকে তারা নজরে রাখবে কেনো?
নিক নিচের ঠোঁট কামড়ে রেখে বলে,
” ইগর, কায়াত ছাড়াও রাস্তাঘাটে কম জানোয়ার নেই। এই রাতের অন্ধকারে রাস্তাটা একটা মেয়ের জন্য কত জাহান্নামময় সেটা জানার কথা।
আরিশ আর এক মুহূর্ত দাড়ালো না। কোনো শব্দ না করে বড় বড় পা ফেলে রুম থেকে বেরিয়ে যায়। অধিরাজ অবাক হয়ে বলে,
” আরিশ স্যার কোথায় যাচ্ছে বস?
নিক কিছুক্ষণ চুপ থাকে। হুট করে দাঁড়িয়ে যায়। একই ভঙ্গিতে বাহিরে যেতে যেতে বাঁকা হেসে বলে,
” যেখানে ওর গন্তব্য।
সমুদ্রের নিকটবর্তী এই মনোরম দৃশ্যপটটি যেন প্রকৃতির এক সুগভীর ধ্যানমগ্ন কবিতা। দূর দিগন্তে নীল আকাশ ও নীল জলের মিলনরেখা অস্পষ্ট হয়ে এসে সৃষ্টি করেছে এক রহস্যময় বিস্তৃতি।যেখানে দৃষ্টির সীমা ক্লান্ত হয়ে আত্মসমর্পণ করে। বালুকাবেলায় ছড়িয়ে থাকা সূর্যালোক সোনালি আভায় ঝলমল করে। প্রতিটি বালুকণাকে করে তোলে দীপ্ত ও জীবন্ত। ঢেউয়ের পর ঢেউ সুশৃঙ্খল ছন্দে তীরে আছড়ে পড়ে। নোনাজল-ভেজা বাতাসে সামুদ্রিক শৈবাল ও লবণের গন্ধ মিশে পরিবেশকে করে তোলে গভীর ও তীক্ষ্ণ অনুভবযোগ্য। দূরে উড়তে থাকা সাদা-ধূসর গাঙচিলেরা তাদের কর্কশ স্ ডাকে সমুদ্রের নির্জনতা ভেঙে দেয়। চারপাশে এক অপার্থিব প্রশান্তি নেমে আসে। নাজলী ক্লান্তি শরীর নিয়ে চারপাশের দৃশ্য নিয়ে মুচকি হাসে। কত স্নিগ্ধ পরিবেশ। বন্দীদশায় সে ভুলে গিয়েছিলো আলো কি জিনিস? সৌন্দর্য কি জিনিস? রাতের ঘটনার কথা মনে পড়তেই চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ে। বর্তমানে তার একটা ফোনের দরকার। যে করেই হোক আর্জেন্ট নাভিদের খোঁজ নিতে হবে।
যে বোন কে বাঁচানোর জন্য খাঁচায় বন্ধী হয়েছিলো, সেই বোনকে সে একবার দেখতে পারলো না। বুকের সাথে মিশিয়ে শান্তনা দিতে পারলো না। এই আফসোসের ভাড়ে নাজলীর হৃদয়টা যেন বার বার কেঁপে উঠছে। চেয়ারে ক্লান্ত শরীরটা এলিয়ে দেয়। দুরে একটা পরিচিত মুখ দেখে কপাল কুচকে ফেলে। একটা মেয়ে সাদা জামা পড়া। চুলগুলো বাতাসের সাথে নড়ছে বার বার। পাঁচ -ছয়টা বাচ্চার সাথে খিলখিল করে হেসে উঠছে বার বার। নাজলীর অধরে হাসি ফুটে উঠে। নামটা বার বার মনে করতে থাকে। একসময় সফল হয়ে এগিয়ে যায় মেয়েটার দিকে। নাজলী একদম বাচ্চাদের কাছে গিয়ে দাঁড়ায়। মেয়েটা নাজলীকে দেখে অবাক হয়ে তাকায়। এমন ভাবে তাকিয়েছে যেন বহু দিন পর নিজের আপন জনকে দেখেছে। বাচ্চাদের হাত ছেড়ে দিয়ে হাসি দিয়ে বলে,
” নাজলী আপু, রাইট?
নাজলী মুচকি হেসে বলে,
” ইয়েস। রিদ্ধিমা?
রিদ্ধিমা ঠোঁট নেড়ে বলে,
” একবারের দেখাতে এখনও নাম মনে রেখেছো। দেন আই’ম রিয়্যালি ভেরি লাকি। সাজ আ বিউটিফুল গার্ল হ্যাজ রিমেম্বার্ড মাই নেম।
রিদ্ধিমার প্রানবন্ত হাসিতে নাজলী প্রচুর অবাক হয়। মেয়েটা প্রচুর মিশুক। কিন্তু এই চেহারার সাথে একজনের প্রচুর মিল রয়েছে। নাজলী কথাটা ভেবে চোখ বন্ধ করে ফেলে। এইসব ভাবনা কখনো পসিবল নয়। মুচকি হেসে বলে,
” তুমি তো আফ্রিকার স্থানীয় না। তোমার বাড়ি কোথায়?
রিদ্ধিমার মুখ কিছুক্ষণের জন্য চুপসে যায়। কিন্তু পর মুহূর্তে হেসে বলে,
” এইতো সামনে আমাদের চিলড্রেন্স হোম । এই বাচ্চারা আমার পরিবার
নাজলী অবাক হয়ে কপাল কুচকে ফেলে,
” পরিবার মানে? তোমার বাবা -মা কোথায়?
রিদ্ধিমা হুট করেই চুপ হয়ে যায়। হাসি-খুশি মুখটায় ঘন অন্ধকার নেমে আসে। রিদ্ধিমার অবস্থা দেখে নাজলী শান্তনা দেয়,
” ইটস ওকে, বলতে হবে না। এই মিষ্টি মুখে অন্ধকার মানায় না।
রিদ্ধিমা হেসে উঠে। মুচকি হেসে বলে,
” এই কেন্দ্রের মালিক আমার পালিত বাবা। উনাকে আমি বাবা বলে ডাকি। জন্ম না দিয়েও উনি আমার জন্মদাতার সমান। আমাদের পরিবারে আর কেউ নেই, আমি আর আমার বাবা ছাড়া। বাবা কোনো এক কারনে কোনোদিন বিয়ে করে নি। এই কেন্দ্রের প্রতিটা বাচ্চাকে ঘিরেই আমাদের সময় কাটে। সপ্তাহে একবার এখানে নিয়ে আসি। ওদের হাসি -খুশি মুখটা দেখতে ভালো লাগে।
নাজলী কৌতূহল বশত প্রশ্ন করে,
” তোমার বাবা -মা কোথায়?
রিদ্ধিমার মুখ মলিনতায় ডেকে যায়। মলিন হেসে বলে,
” জন্মদাতা -জন্মদাত্রীর খবর জানা নেই আপু। জানি না কে আমার আসল বাবা – মা। কোনোদিন দেখিও নি। তবে এতে আমার কোনো অভিযোগ নেই। আমার বাবা আছেন আমার কাছে। আমাকে কিন্তু এতিম ভাববে না। আমি এতিম নয়।
বাক্যগুলো উচ্চারন করতে করতে রিদ্ধিমার গলার স্বর পরিবর্তন হয়ে যায়। কান্না করতেও গিয়ে ও যেন আটকে যায়। নাজলী হেসে বলে,
” আমার বাবা তো নেই। আমার কথা না হয় থাক। কত বছর বয়স থেকে স্যারের মেয়ে হয়েছো?
রিদ্ধিমা দুই কদম সামনে এগিয়ে যায়। সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে বলে,
” বাবা আমার কাছে কিছুই লোকান নি। আমার বাবা কিন্তু গোয়ান্দা সংস্থার কর্মকর্তা ছিলেন। আমাকে নাকি কোনো এক পাচার কেন্দ্রে বিক্রি করে দিতে যাচ্ছিলো। শুধু আমাকে নয়। আমার মত আরও অনেক শিশু। শুনলে অবাক হবে তখন আমার নাকি মাতৃদুগ্ধ পান করার বয়স। বৃষ্টির রাত ছিলো সেদিন। তাই সময় মত অন্য দেশে পাঠাতো পারছিলো না। আর সে সময় বাবা -তারা পুরো টিম সেখানে অভিযান চালায়। হামলা করে প্রতিটা ব্যক্তির উপর। কেউ কেউ সেখানেই মারা যায়। এতে দুইজন পুলিশ অফিস্যার ও মারা গিয়েছিলো। আমাকে নিয়ে ত্রিশ জন বাচ্চা ছিলো। সবাইকে হেফাজতে নিয়ে যাওয়া হয় প্রশাসন কেন্দ্রে। সব বাচ্চারা কাঁদছিলো। অথচ আমি নাকি নিশ্চুপ ছিলাম। ফেঁল ফেঁল করে তাকিয়েছিলাম বাবার দিকে। আমার তাকানো দেখে বাবার মায়া হয়। উনি আমাকে কোলে তুলে নেয়। কোলে নেওয়ার সাথে সাথে খিলখিল করে হেসে উঠি আমি সেই ছোট্ট রিদ্ধিমা। একজন গোয়েন্দা অফিস্যারের শক্ত মন গলিয়ে ফেলি অজান্তেই। বাবার শার্টে এমনভাবে ধরেছিলাম যেন আমি উনার কন্যা। উনার সন্তান। ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস. ত্রিশ বাচ্চা থেকে আমাকে উনি নিজের আপন করে নেন। সর্বপ্রথম উনি আমার কপালে চুমু খান। আমার সামনে মুখ নিয়ে আসলে আমি নাকি নাকে চুমু খেয়েছিলাম। সেদিন রাতেই গোয়েন্দা অফিস্যার আমিনুল হক উসমান আমাকে দত্তক নেন। কাগজে -কলমে স্বীকৃতি দেন আমি উনার মেয়ে। নিয়ে আসেন সেই নোংরা পাচার কেন্দ্র থেকে তার রাজ প্রাসাদে। আমিও হয়ে উঠি উনার এক মাত্র মেয়ে রিদ্ধিমা। আমার বাবা এই আমার পৃথিবী। বাহিরের দুনিয়া জানি না। এই চাইল্ডস হোম এই আমার দুনিয়া।
কথাগুলো বলে রিদ্ধিমা থামে। চোখের পানি মুছে ঘুরে দাঁড়ায় নাজলীর দিকে। নাজলীর চোখেও পানি। কিন্তু দুজনের ঠোঁটেই তৃপ্তির হাসি।
নাজলী হেসে বলে,
” আমিও জানি না আমার বাবা -মা কে। আমি বড় হয়েছি এতিম বাচ্চাদের সাথে। সেখান থেকেই পড়াশুনা করেছি। নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করে নিজের জগৎ বানিয়েছি। আমার সাথে আমার বোন ছিলো।
রিদ্ধিমা এগিয়ে এসে বলে,
” সে কোথায়? আপনার ছোট বোন?
নাজলী বাচ্চাদের দিকে তাকিয়ে বলে,
” আমার বোন আছে একটা জায়গায়। সেটা না হয় গোপন থাকুক।
” যদি আপনার দুর্বলতা হয় তাহলে বলার প্রয়োজন নেই।
নাজলী রিদ্ধিমার দিকে তাকিয়ে আকস্মিক বলে,
” তোমার সাথে একজনের খুব মিল পাওয়া যায়। তোমার কোনো বড় ভাই ছিলো?
নিজের প্রশ্নে নাজলী নিজেই থমথমে খেয়ে যায়। হাসি দিয়ে বলে,
” এই মাত্র তোমার কাহিনী শুনে এখন এই ভুলে গিয়েছিলাম। যায় হোক হাউ মেনি পিপল ক্যান লুক দ্য সেইম… মেইবি দিস ইজ সামথিং লাইক দ্যাট।
রিদ্ধিমা সম্মতি জানিয়ে বলে,
” ইট’স পসিবল। বিসাইডস, আই ডো নট হ্যাভ এনিৱান হিয়ার। আপাযত আমার ইতিহাস থাক। আমি ভেবেছিলাম আপনারা হয়ত নিজের গন্তব্যে চলে গিয়েছেন। এখনও যান নি কেনো?
নাজলী বুকে হাত গুঁজে বলে,
” এই ইতিহাস অনেক। বলাটা পসিবল নয়।
” আচ্ছা। আপনার ভাই যে একজন ছিলো সে কি চলে গিয়েছে?
নাজলী এদিক – সেদিক তাকিয়ে বলে,
” ভাই বলতে ফ্রেন্ড। এক প্রকার ভাইয়ের মত।।তার খুঁজেই আছি।
রিদ্ধিমা অবাক হয়ে বলে,
” সে-কি, আপনি উনার সাথে নেই?
” নাহহহ। আমি কাজে অন্য জায়গায় ছিলাম। সব হারিয়ে ফেলেছি আসার সময়। ফোনটাও নেই যে মিসডকল দিব। তুমি ফোনটা দিলে উপকৃত হতাম।
রিদ্ধিমা অধৈর্য হয়ে প্যান্টের পকেটে হাত দেয়। অসহায় হয়ে নাজলীর দিকে তাকিয়ে বলে,
” আপু ফোন নিয়ে আসতে ভুলে গেছি।
নাজলীর শেষ আশার ঝলক ও নিভে যায়। চিন্তায় ঠোঁট কামড়ে ধরে নিজের। রিদ্ধিমা কিছু একটা আঁচ করে বলে,
” আপু আপনি আমার সাথে আসুন। কিছু খান নি হয়ত। ক্লান্ত দেখাচ্ছে খুব।
নাজলী মুচকি হেসে বলে,
” তার কোনো প্রয়োজন নেই বোন। তুমি অনেক মিষ্টি একটা মেয়ে। কষ্ট দিতে চাই না তোমাকে। আমি নিজের গন্তব্য খুঁজে নিব।
রিদ্ধিমা ঠোঁট উল্টে বলে,
” বয়সের ব্যবধান বেশি হব না। তাই ফর্মালিটি করবেন না আপু। আমার সাথে আমার বাড়িতে চলুন। আমাকে নিজের বোন বলেছেন। অথচ বোন কিছু বললে ফিরিয়ে দিচ্ছেন। আমি কিন্তু কষ্ট পাব। আর আপনাকে না নিয়ে আমি এক পা ও নড়ব না।
” কিন্তু….
রিদ্ধিমা বলতে না দিয়ে হাতে ধরে,
” না করো না প্লিজ। এই সুযোগে তুমি আমাদের কেন্দ্রটা ঘুরে দেখতে পারবে। অনেক বাচ্চা আছে এখানে। বাবার সাথেও আলাপ করিয়ে দিব। পুরো রাত গল্প করব দুজন। অনেক মজা হবে। চলো আপু, প্লিজ।
নাজলী একপ্রকার বাধ্য হয়ে বলে,
” ঠিক আছে। এইবার অন্তত শান্ত হও। এত চঞ্চল হলে চলবে।
রিদ্ধিমা খুশিতে বাচ্চাগুলোকে ইশারা করে,
” বাচ্চারা আজ এই পর্যন্ত। অন্য দিন নিয়ে আসব তোমাদের। আপাযত সবাই বাড়ির দিকে এগিয়ে যায়।
রিদ্ধিমার কথামত সবাই সামনে এগিয়ে যায়। পিছনে পিছনে রিদ্ধিমা আর নাজলী এগিয়ে যেতে থাকে। নাজলীর মুখে চিন্তার ছাপ। নাভিদের খোঁজ এই মুহূ্র্তে সব থেকে প্রয়োজন।
সকালের দিকে দুইজন বয়স্ক মেয়ে এসে এনিকে খাবার দিয়ে যায়। মহিলাগুলোকে দেখে চিত্রার কথা খুব মনে পড়ে যায়। এনি এক হাতের মাধ্যমে চোখের পানি মুছে খাবারের দিকে তাকায়। এই জীবনে যাকে সে মন থেকে ভালোবেসেছে সবাইকে সে হারিয়েছে। বাবা -মা – স্বজন হারা এক আঠারো বছরের রমণী। যে বয়সে মায়ের আচল ধরে হাটার কথা। এই বয়সে জীবনের সাথে যুদ্ধ করছে। যে বয়সটা বাবার থেকে ভিবিন্ন গল্প শুনার। এই বয়সে প্রতিনিয়ত লোকের আহাজারি, রিভলভারের আওয়াজ, ছুড়ির ফেঁচ-ফেঁচ শব্দ শ্রবণ করছে। এইটা কি কোনো স্বাভাবিক জীবন? উহুম এই জীবন কারোর জন্য স্বাভাবিক হতে পারে না। যে জীবনে প্রতি মুহূর্তে ভয় থাকে। মরণের ভয়, ইজ্জতের ভয় নিয়ে বাঁচতে হয় প্রতি মুহূর্তে।
একজনকে তো সব দান এই করে দিয়েছে। আফসোস সে তাকে পুরো দুনিয়া থেকে বাঁচালেও সব থেকে কষ্টদায়ক যন্ত্রনাগুলো এই পুরুষটা দিয়েছে। কিভাবে ভুলব আমি এইসব ঘটনা। যখন আমাকে চাবুক দিয়ে আঘাত করে রক্তাক্ত করেছিলো। বিকৃত খুনের দৃশ্য, আহাজারি দিয়ে মানসিক যন্ত্রনা দিয়েছিলো। যন্ত্রনা সহ্য করতে না পেরে ছটফট করতাম। কিভাবে ভুলব সেই কুৎসিত সময়গুলো যখন আমাকে পাচার কেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হয়েছিলো। মানুষ রুপী হিংস্র জানোয়ারগুলো শরীরের ভাঁজে কু-দৃষ্টি দিয়েছিলো। নিলামে তুলেছিলো আমার সতিত্বকে। যখন লোকের মুখ থেকে শুনতাম আমি কারোর রক্ষিতা। যখন আপনি আমাকে বলতেন রক্ষিতা তুই আমার। আমার জীবনে আছেই বা কি গ্যাংস্টার বস! এই ছোট্ট জীবন কত কিছুর সাথেই না পরিচয় হলাম। ছোট বয়সে পরিবার হারালাম। আর বড় না হতেই সম্মান।
এনি চোখ বন্ধ করে ফুঁপিয়ে উঠে। নাক টেনে চোখের পানি মুছে। অনেক আগে খাবার দিয়ে গিয়েছে। অথচ খাওয়ার রুচি আসে নি। হুট করেই ক্ষুধার জ্বালা তীব্র হয়ে উঠে। এনি মেঝে থেকে উঠে দাঁড়ায়। এরপর ট্রলিটা বিছানার কাছে নিয়ে যায়। বিছানায় পা তুলে বসে সামান্য পানি খায়। চামচে হাত দিতে যাবে এমন সময় কিছুর শব্দে দরজার দিকে তাকায়। নিক এসেছে ভেবে নিজেকে সিটিয়ে নেয়। চোখের পানি ভালোভাবে মুছে ফেলে। চামচটা যথাস্থানে রেখে অন্য পাশে ফিরে যায়। কালো হুডি পড়া লোকটা ধীরে ধীরে এগিয়ে আসে এনির দিকে। নিক তার দিকে আসছে সেটা এনি ভালোভাবেই অনুমান করতে পেরেছে। এনি গুটশুটি হয়ে এক পাশে শুয়ে পড়ে। লোকটা বিরতহীনভাবে বিছানায় বসে। পিছন থেকে এনিকে জড়িয়ে ধরে। এনির উন্মুক্ত পেটে হাত রেখে পিছন দিকে মুখ গুঁজে দেয়। উহুম মুখ গুঁজে দেওয়া নয়। কেমন অশালীন পাগলাটে আচরন। নিক ভেবে এনি প্রথম চুপ থাকলেও পরে ছটফট করে উঠে। নিকের হাত সরাতে সরাতে বলে,
” এইসব অশ্লীলতার মানে কি? সকালে রুমে ডুকেই এমন অসভ্যতামো করছেন কেনো?
লোকটার স্পর্শ ধীরে ধীরে কঠিন হতে থাকে। এনি হতভম্ভ হয়ে যায়। এইটা নিকের স্পর্শ নয়! হ্যা নিকের স্পর্শ রক্তাক্ত। যে স্পর্শে কোনো কোনো কোমলতা থাকে না। তবুও সেই স্পর্শ আলাদা এক নাম থাকে। আলাদা এক প্রশান্তি থাকে। কিন্তু এমন অস্বস্থিকর কেনো? পারফিউমের গন্ধটাও পরিচিত নয়। এনি হাতের দিকে তাকায়। আতঙ্কে গলা শুকিয়ে আসে এনির। এই হাত তো উনার না। এনি আর এক মুহূর্ত অপেক্ষা করলো না। নিজের সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে লোকটাকে ধ্বাক্কা দেয়। সাথে সাথে বেরিয়ে আসে কিছু বিশ্রি অপমানজনিত বিশ্রি গালি,,
” শালী ব্যশ্যা। তর মত মাগুর মাছরে নিক জেভরান সামলায় কিভাবে।
এনি দ্রুত শরীরে চাদর জড়িয়ে নেয়। বিছানা থেকে নেমে পড়ে। চোখে পড়ে শক্ত-পোক্ত দেহের একটা যুবককে। বয়স হয়ত পঁচিশ – ছাব্বিশ হবে। চুলগুলো কুকড়ানো। চোখের দৃষ্টি ধূসর। যেমনটা নিকের। কিন্তু নিকের দৃষ্টির মত ধ্বংসাত্বক নয়। এই দৃষ্টিতে আছে আবর্জনা। এনির শরীর থরথর করে কাঁপছে। একটা অপরিচিত লোক তাকে ছুঁয়েছে ভাবতেই এনির বমি আসছে। কিন্তু লোকটা আসলো কিভাবে এখানে? পুরো বাড়িতে তো গার্ডের নজরদারী। লোকটা রাগান্বিত চোখে তাকায় এনির দিকে। এনির হাতটা খপ করে ধরতে যাবে তার আগেই এনি পিছিয়ে যাবে।
চাদরটা শরীরে সাথে চেপে ধরে চেঁচিয়ে বলে,
” কুত্তার বাচ্চা! আমার শরীরে স্পর্শ করেছিস কোন কলিজা নিয়ে? খবরদার কাছে আসবি না। তুই জানিস না আমি কে? এই বাড়িতে ডুকেছিস কিভাবে? আমার রুমে এসেছিস কোন সাহসে?
লোকটা যেন মজা পেলো। পৈশাচিক হাসি দিয়ে বলে,
” আরে ব্বাস। রক্ষিতা মা*গীদের এত গলার জোর। এত এনার্জি কি নিক জেভরানে দান করেছে নাকি। আরে চিন্তা করিছ না। আমার কাছে আসলে এর থেকেও বেশি শক্তি দান করব। শরীরের অনেক জায়গা তো ভালো উন্নতি হইছে। আমার কাছে আসলে আরও হইব।
এনি কান চেপে ধরে। এত বিশ্রি ইঙ্গিতে যেন মাথা ঘুরে আসছে। এই মুহূর্তে দাড়াতে পারছে না সে। শরীরে যেন কেউ বিষাক্ত সূচ ডুকিয়ে দিয়েছে।। এনি চেঁচানোর জন্য মুখ খুলতেই লোকটা বিকৃত হেসে বলে,
” চেঁচিয়ে লাভ নেই। সবাই গভীর নিদ্রায় আচ্ছন্ন। ডাকলেও কেউ আসব না। আজ তরে এমন ভাবে ছি**ড়**ব যে নিক জেভরানের মেরুদন্ড ভেঙ্গে যাবে। মুখ থুবড়ে পড়বে আমার বসের পদতলে।
এনি পরোয়া করলো না কোনো কথা।।ভয়ে কাঁপছে সে রিতীমত। বন্ধ দরজার দিকে তাকিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে বলে,
” ভুল করছিস? এর মূল্য তকে বাজেভাবে দিতে হবে। উনি আসলে কিন্তু প্রলয় ঘটে যাবে। জীবন বাঁচাতে চাইলে চলে যা। সত্যি কাউকে কিছু বলব না।
এনির কথায় লোকটা পৈশাচিক ভাবে হাসতে থাকে। লোকটার হাসিতে এনির শরীর গুলিয়ে আসে। লোকটা হাসি থামিয়ে কামনার দৃষ্টি দিয়ে বলে,
” আজ তর খদ্দের ও কিছু করতে পারবে না।
এনি কাঁপা গলায় বলে,
” খদ্দের মানে?
লোকটা জিহ্বা বের করে অশালীনভাবে ঠোঁট ভেজায়,
” যার বিছানায় এত মাস ধরে রাত কাটাচ্ছিস তাকেই চিনিস না। শালী অভিনয় করিস? রক্ষিতা নাকি নিজের খদ্দেরকে চিনে না।
এনির শরীর ঝাঁকুনি দিয়ে উঠে। ক্লান্ত গলায় বলে,
” আমি কারোর রক্ষিতা নয়। আমি উনার স……
এনি আর বলতে পারলো না। লোকটা চিলের মত এসে এনির চাদর টেনে ধরে। এনির কলিজা বেরিয়ে আসার উপক্রম। লোকটার সাথে পেরে না উঠে দাঁত বসিয়ে দেয়। লোকটা ঘর কাঁপিয়ে চিৎকার দিয়ে উঠে। এনি চাদরটা রেখেই দরজার দিকে দৌঁড় দেয়। দরজা খুলে বের হতে যাবে তার আগেই লোকটা তার সোনালী কেশ ধরে হেচকা টান দেয়। এনি গিয়ে দেয়ালের সাথে ধ্বাক্কা খায়। এত জোরে ধ্বাক্কা লাগে যে সাথে সাথে কপাল ফেটে রক্ত বের হয়ে যায়। মাথা ঘুরে আসে তার। পুরো দুনিয়া অন্ধকার দেখতে পাচ্ছে। অশুভ কুকুরটা কেমন বিশ্রভাবে তাকাচ্ছে তার নারী অবয়বে। এনি মুখে হাত দিয়ে ডুকরে কেঁদে উঠে,
” কোথায় আজ আপনি? বাঁচানোর জন্য পুরো পৃথিবীর আড়াল করলেন। অথচ আজ সিন্ধুক ভেঙ্গে চুর ডুকে গিয়েছে। মালিকের খোঁজ নেই। মিথ্যে বলেছেন আমাকে।
এনি চোখ খুলতে পারছে না। শুধু বুঝতে পারছে লোকটা নিজের শার্ট খুলছে। এনি চেষ্টা করছে উঠার জন্য। দেয়ালের সাথে এমন বাজে ভাবে ধ্বাক্কা লেগেছে যে উঠার শক্তি নেই। সামান্য চোখ খুলার শক্তিটা সে পাচ্ছে না। কিভাবে বাঁচাবে সে নিজেকে? কি করে রক্ষা করবে নিজের সম্রম? তৃষ্ণায় গলা শুকিয়ে আছে। লোকটা নগ্ন শরীরটা নিয়ে এনির কাছে আসে। এনির দিকে ঝুঁকে কুকুরের মত গন্ধ টানে শরীরের। এনির গা গুঁলিয়ে আসে। হাত মুষ্টি করে ফেলে। লোকটা এনির দিকে চুলে হাত দিয়ে বলে,
” ভাবতেই অবাক লাগছে নিক জেভরানের দুর্বলতার ইজ্জত লুট করব। যাকে বিছানা নেওয়ার জন্য আঠারো জন শক্তিধর মাফিয়া যুদ্ধ করছে। তাকে বিনা যুদ্ধে সুধা পান করব। এমন ভাবে ছিঁড়ব যে নিকের রুহ পর্যন্ত পুড়বে। খা**** পোলারে আটকাবে আমার বস। তর খদ্দের, ওহহ সরি, জামাই ও এই মুহূর্তে আসতে পারবে না। মিনারের সামনে বোম রাখা। পা রাখবে সাথে সাথে টাটা – বাই, বাই। এখন আমার কাছে আসো বাবুই পাখি। আরাম পাবে।
লোকটার ঘৃন্য কথায় এনি আর সহ্য করতে পারলো না। জানা নেই দুর্বল শরীরে শক্তি আসলো কোথা থেকে। লোকটা হাসতে হাসতে এনির জামা ছিঁড়তে যাবে তার আগেই এনি এক অনাকাঙ্খিত ঘটনা ঘটিয়ে ফেলে। লোকটার পু**রু**ষাঙ্গে এমনভাবে লাথি বসায় যেন লোকটা চিৎকার করার শক্তিও হারিয়ে ফেলে। লোকটা পাগলা কুকুরের মত চেপে ধরে বসে যায়। এনি আর দেরী করলো না। দুর্বল শরীরটা নিয়েই সামনে দৌঁড় দেয়। লোকটা যন্ত্রনায় ছটফট করছে। ছটফট করা অবস্থায় এনির এক হাত চেপে ধরে বিশ্রি গালি দেয়,
” খান*** মা**গী! তর সাথে এত সোহাগ করে কথা বলা উচিত হয় নি। প্রথম এসেই আ্যকশন শুরু করে দেওয়া উচিত ছিলো। তাহলে এতক্ষণ রক্তাক্ত হয়ে পড়ে থাকতি।
এনি লোকটার হাত ছাড়ানোর জন্য শক্তি প্রয়োগ করতে থাকে। শক্তিতে পেরে না উঠে, আবার ও সর্বশক্তি দিয়ে কামড় বসিয়ে দেয়। লোকটা চেঁচিয়ে উঠে। কিন্তু এইবার এনি ছাড়লো না। কামড় দিয়ে অনেক্ষন থাকে। লোকটা হাত ঝাটকা মেরে ছটফট করতে করতে চিৎকার দিয়ে উঠে,
” তর তেজ যদি আজ না কমিয়েছি। দেখি কত নিতে পারিস।
এনি যেন কিছুই শুনছে না। এই মুহূর্তে তার বাহিরে যাওয়া প্রয়োজন। এমন এক জায়গায় যাওয়া দরকার যেখানে তাকে কেউ খুঁজে পাবে না। মুহূর্তেই এনির কপালের ভাঁজ সমান হয়ে যায়। কাবার্ডের দিকে নজর যায় ওর। দ্রুত কাবার্ডের দিকে যায়। কাবার্ডের গোপন থাক খুলে একটা ধারালো ছুঁড়ি বের করে। লোকটা এখনও অশ্লীলভাবে গালি গালাজ করছে। আর যন্ত্রনায় কাতরাচ্ছে। এনি এমনভাবে লাথি দিয়েছে যে আরেকটু হলে হয়ত মরে যেত। লোকটা কোনোমতে উঠে দাঁড়ায়। এনির চুলটাকে শক্ত করে ধরে পিছন থেকে গলা চেপে ধরে,
” আজ তরে তেজ মিটাব শালী। রক্ষিতার এত শক্তি। নিক জেভরানকে সামলাতে গিয়ে একটু ও শক্তি কমে নাই শালীর।
লোকটা এনির জামার এক অংশ ছিঁড়তেই এনি পিছনে ঘুরে ধাঁরালো অস্ত্রটা লোকটার পেট বরাবর বসিয়ে দেয়। লোকটার চোখ দুইটা বেরিয়ে আসার উপক্রম। এনি ছুঁড়িটা ঘুরাতে থাকে। দাঁত পিষে বলে,
” দেখতে আমাকে ভোলাভালা মনে হলেও প্রয়োজনের তাগিদে আমি ঠিক কতটা ভয়ংকর সেটা তদের ধারনাও নেই।
এনি থেমে যায়। ছুঁড়িটা আরো জোরে ডুকিয়ে বলে,
” সবার সাথে লড়াই করে জিতে গেলেও পারি নি শুধু গ্যাংস্টার বস নিক জেভরানের সাথে। হারিয়ে দিয়েছে এই লোক আমাকে। হেরে গিয়েছি এই পাপী পুরুষটার কাছে। তবে তর কাছে হারব ভাবলি কিভাবে হারামির বাচ্চা।
লোকটার মুখ থেকে রক্ত পড়তে থাকে। চোখ দুইটা রাগে যেন অগ্নি কান্ডে দাউ দাউ করে জ্বলছে। লোকটা দঁত কিড়মিড়ায়। দ্বিতীয় আঘাতটা করে বসে গ্যাংস্টার বসের প্রানভোমড়ার উপর। লোকটা পকেট থেকে ছোট ছুঁড়িটা বের করে একইভাবে এনির বুকে ডুকিয়ে দেয়। স্তব্দ হয়ে যায় এনি। চোখ থেকে পানি পড়ছে অনবরত। এনি নিজের পেটের দিকে তাকায়। যন্ত্রনায় মনে হচ্ছে এখনও রুহটা বেরিয়ে যাবে। লোকটার মুখে পৈশাচিক হাসি। এনি ক্ষীপ্ত হয়ে লোকটার পেট থেকে এক ঝটকায় ছুড়িটা বের করে। বুঝে উঠার আগেই গলায় বসিয়ে দেয়। এতটা রাগ আর উন্মাদনা নিয়ে আঘাত করেছে যে সাথে সাথে মাথা সামান্য ঝুলে যায়। লোকটার দেহ মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। লোকটা চিৎকার করতে পারে নি।।শুধু কেমন অদ্ভুত ভয়ানক আওয়াজ বের হচ্ছিলো। এনি আর ঠিক থাকতে পারলো না। তীব্র ব্যাথা আর যন্ত্রনায় দেয়াল ঘেষে বসে যায়। কানে এসে আঘাত করে এক তীব্র শব্দ,
লাভ বাই দ্যা ভিলেন পর্ব ৪০
” ব্লাড রোজ।
এনি চোখ তুলে তাকায়। পাগলার মত এগিয়ে আসছে এক বেপোরোয়া হার্টল্যাস পুরুষ। এই লোকটাকে চিনতে এনি ভুল করে নি। আগের বার ভুল করলেও এখন যে এসেছে সে সঠিক। এনি লুটিয়ে পড়ে মেঝেতে।।মেঝেতে পড়ার আগেই কেউ বুকের সাথে ঝাঁপ্টে ধরে। এনি তীব্র ব্যাথায় ছটফট করে বিরবির করে,
” ওদেরকে বলে দিন আমাকে যেন রক্ষিতা না বলে। কষ্ট হয় আমার। কলিজা ছিঁড়ে যায়।
এনি কথাটা শেষ করতে পারলো না। তার আগেই উন্মাদ হৃদয়হীন পুরুষটার ভাঙ্গা কন্ঠ কানে আসে,
” কলিজা আমার।
