Home লাভ বাই দ্যা ভিলেন লাভ বাই দ্যা ভিলেন পর্ব ৬৩

লাভ বাই দ্যা ভিলেন পর্ব ৬৩

লাভ বাই দ্যা ভিলেন পর্ব ৬৩
লিজা মনি

গভীর অরণ্যের অন্তঃস্থলে দাঁড়িয়ে আছে এক জীর্ণ প্রতারক নীরবতায় মোড়া প্রাচীন এক বিল্ডিং। বাহির থেকে পুরো বিল্ডিং এর মধ্যে ভাঙাচোরা দেয়াল ও শ্যাওলা ধরা ইট। কিন্তু ভেতরে পা রাখামাত্রই অনুভূত হয় এক অস্বস্তিকর আভিজাত্যের ছোঁয়া।
বিল্ডিং এর চারপাশ জুড়ে ছড়িয়ে থাকা শুনশান স্তব্ধতা এতটাই ঘন যে তা শব্দহীনতার সীমা অতিক্রম করে বর্তমানে এক ধরনের চাপা আতঙ্কে রূপ নিয়েছে মানুষের পায়ের আওয়াজ তো দূরের কথা নিঃশ্বাসের ক্ষুদ্র কম্পনের শব্দ ও নেই।
বিল্ডিংয়ের বাইরে অরণ্যের গভীর অন্ধকারে হিংস্র বনপশু ও বিচিত্র জীবজন্তুর গর্জন এক বিকৃত সিম্ফনির মতো প্রতিধ্বনিত হয়। সিংহ সহ ভিবিন্ন বনপশুদের গর্জনে কম্পমান হয়ে থাকে পুরো অরন্য। কিমতু প্রাসাদসদৃশ এই সাউন্ডপ্রুফ ঘরের ভেতরে সেই গর্জন প্রবেশের আগেই নিঃশেষ হয়ে যায়। রেখে যায় শুধু অস্বাভাবিক এক নীরবতার ভার।

বিল্ডিংটির গভীরতম স্তরে একাধিক প্রতারণামূলক করিডোর বায়োমেট্রিক লক আর বিভ্রান্তিকর আর্কিটেকচারের আড়ালে লুকিয়ে আছে একটা গোপন ল্যাব ও একটি নিষিদ্ধ আশ্রয়। যেখানে কেবলমাত্র গ্যাংস্টার বসের শরীরই চিকিৎসা করা হয়। আর এই ল্যাবের অস্তিত্ব শত্রুদের মানচিত্রে কখনোই স্থান পায়নি।
সেই ভয়ংকর চিকিৎসা কেন্দ্রের কেন্দ্রবিন্দুতে শীতল ধাতব অপারেশন বেডের ওপর নিঃশব্দে শুয়ে আছেন গ্যাংস্টার বস। একজন জীবিত মানুষ হয়েও তার চারপাশে শুধু যন্ত্র আর তার ছায়া। তাঁর শিরায় শিরায় প্রবেশ করানো হয়েছে ক্যানেলা। এই ক্যানুলাগুলো জীবনকে কৃত্রিমভাবে ধরে রাখার এক নিষ্ঠুর চুক্তির প্রতীক। রক্তের প্রবাহ পর্যন্ত নিয়ন্ত্রিত হয় হিসাবি যন্ত্রের নির্দেশ।

পাঁচ মাস আগে নিকের শরীরে প্রতিস্থাপিত নতুন চামড়া এখনও বহন করে এক অস্বস্তিকর ভিন্নতা। বোমা হামলায় আগুনের উত্তাপে এক পাশে পুড়ে গিয়েছিলো অনেকটা। গালের মাংশ খানিকটা ঝলসে যায়। সেই পুড়া চামড়াগুলোকে সরিয়ে নতুন চামড়া লাগানো হয়। এখনও পুরো পুরি সুস্থ হয় নি। তবে পাঁচ মাস ধরে এই এখানে চিকিৎসাধীন আছে। এমাথায় আঘাত পাওয়ার কারনে ডাক্তার আশা ছেড়ে দিয়েছিলেন যে বাঁচবে না। আরিশ সেদিন হাত -পা ছড়িয়ে বাচ্চাদের মত কেঁদেছিলো। দুশ্চিন্তায় খাওয়া – দাওয়া, ঘুম সব ছেড়ে দিয়েছিলো। মাথায় এতটা গুরুতর আঘাত ছিলো যে ডাক্তার অপারেশন করতে গিয়ে নিজেরাও হিমশিম খেয়ে উঠে। আজ নিক একদম সুস্থ। পুরো দেশ জানে গ্যাংস্টার বস নিক জেভরান মৃত। তিনি শত্রুপক্ষে বোমা হামলায় নিহত হয়েছেন। যার লাশটা ও কেউ খুঁজে পায় নি। লাশ খুঁজে পাবে কিভাবে আহত নিককে আরিশ -অধিরাজের সাহায্যে অনেক আগেই সরিয়ে ফেলেছে। নিক সহ বাইশ জন গার্ডকে আহত অবস্থায় চিকিৎসা কেন্দ্রে নিয়ে আসে। প্রথম এক মাস সে মিনারে যেতে পারে নি। বর্তমানে আরিশ অপেক্ষা করছে নিকের জ্ঞান ফেরার জন্য।

নিক চোখ খুলেছে বহু আগেই। কিন্তু বাস্তব স্মৃতি তার মস্তিকে সজাগ হচ্ছে না। চারপাশের পরিবেশ দেখে বুঝতে পারে এইটা তার নিজস্ব গোপন ল্যাব। যার ঠিকানা আরিশ ছাড়া কেউ জানে না। স্বয়ং তার পার্সোনাল এসিস্ট্যান্ট অধিরাজ ও নেই। নিক চট করে চারপাশে তাকায়। মস্তিষ্কে একটা নাম বার বার ঘুরছে ” এনি ”
নিক শুয়া থেকে উঠার চেষ্টা করে। ইতিমধ্যে আরিশ আর ডাক্তার প্রবেশ করে ভেতরে। নিক হাতের ক্যানেলা খুলতে খুলতে আরিশের উদ্দেশ্যে বলে,
” এনি কোথায় আছে? আমি এখানে কি করছি?
নিককে সুস্থ দেখে খুশিতে আত্নহারা হয়ে উঠেছে সে। চোখ বন্ধ করে খোদার দরবারে শুক্রিয়া জানায়। আরিশ নিককে ক্যানেলা খুলতে দেখে এগিয়ে যায়। ক্রিমিনাল লিডার নিজের আবেগ আটকাতে পারে নি। আচমকা জড়িয়ে ধরে নিককে। গলা কেঁপে উঠে তার,
” এই সুস্থ গ্যাংস্টার বসকে দেখার জন্য দিন -রাত কাতরে মরেছি। গভীর রাতে সৃষ্টিকর্তার কাছে কত ভিক্ষে চেয়েছি। খোদা আমার দোয়া কবুল করেছেন। আমার একমাত্র ছায়াকে আমার কাছ থেকে ছিনিয়ে নেয় নি। আমার হাতটাকে শক্ত করে ধরে যে সব সময় বিশাল সমুদ্র পাড়ি দিয়ে সাহায্য করে তাকে আমার থেকে দুরে সরিয়ে দেয় নি।
নিক কিছুক্ষন চুপ হয়ে বসে থাকে। আরিশের পাগলামো আচরন দেখে কপাল কুচকে আসে তার। বিরক্তি নিয়ে ধমক দেয়,

” মেয়েদের মত কাঁদছিস কেনো?
আরিশ ধমক খেয়ে হেসে বলে,
” তকে সুস্থ দেখতে পেয়েছি তাই। মি, গোত্র যখন বলেছেন তকে বাঁচানো প্রচুর রিস্ক তখন মনে হয়েছিলো এই বুঝি আমার মেরুদন্ড ভেঙ্গে গিয়েছে। আগুনে ঝলসে গিয়েছিলো তার ডান পাশ। জীবনে এতটা ভয় আমি কোনোদিন পায় নি। সেই নিকৃষ্ট আর জঘন্যতম পাচার কেন্দ্রে ও না। ঠিক তখনকার মত আতঙ্কে জমে গিয়েছিলাম যখন তকে হিংস্র নেকড়েদের মধ্যে ছেড়ে দিয়েছিলো। বলে ছিলো যুদ্ধ করে বেঁচে ফিরতে।
নিক গম্ভীর হয়ে উঠে। ধীরে ধীরে সেদিনের কাহিনী মনে হতে থাকে। জেটের পিছনে যেতেই বার্তা আসে কেউ বোমা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে চারপাশে। সামনে দাঁড়িয়ে থাকা কোনো এক গার্ডকে কিনে নিয়েছে শত্রুপক্ষ। আর তাকে বিরবির করে কারোর সাথে কথা বলতে শুনেছে হামলা নিয়ে। এই কথা শুনা মাত্রই নিকের কানে সংবাদ পাঠানো হয়। আর এই কারনেই সে সামনে থেকে পিছনে গিয়েছিলো। যে কোনো সময় আ্যটাক হতে পারে। নিক চাইলে তখন নিজে সরে যেতে পারত। সেদিন সাথে সাথে সরে গেলো আজ পুরো সুস্থ থাকত সে। জেটের সামনে থাকা সব গার্ডদের কানে সংবাদ পাঠাতে গিয়ে দেরী করে ফেলে। এত চেষ্টা করেও কারোর কানে এই সংবাদ দিতে পারে নি। এক সাথে নব্বই জন গার্ডের দেহ ঝলসে গিয়েছে। আহত হয়েছেন বিশ জন। আর দুইজন গার্ড চিকিৎসা কেন্দ্রেই নিশ্বাস বন্ধ করে ফেলে। এখানের প্রতিটা গার্ড ছিলো নিকের বিশ্বাস্ত। এদের প্রত্যেককে সে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে নিজের মত তৈরি করেছিলো। একদম বলিষ্ঠবান আর সাহসী। যারা শত্রুর সামনে মাথা না নুইয়ে আঘাতের মোকাবেলা করে।
নিক বড় বড় নিশ্বাস টানে। আরিশ সোজা হয়ে বসে নিকের উদ্দেশ্যে বলে,

” খারাপ লাগছে তর?
নিক আরিশের দিকে তাকিয়ে বলে,
” কয়জন গার্ড মরেছে?
আরিশ হতাশার গলায় বলে,
” নব্বই জন একদম ঝলসে গিয়েছে। তাদের অস্তিত্ব ও খুঁজে পায় নি। আর তর সাথে যারা ছিলো তারা আহত হয়েছেন। বাইশ জনকে আমি উদ্ধার করেছিলাম। এর মধ্যে বিশ জন জীবিত আছেন। আর দুইজন পনেরো দিনের মধ্যেই মারা যায়।
নিক কপাল কুচকে ফেলে,
” পনেরো দিনের মধ্যে মারা যায় মানে? তবে আমি কতদিন ধরে এখানে আছি?
আরিশ ঠোঁট ভিজিয়ে বলে,
” পাঁচ মাস ধরে আছিস। আজ জ্ঞান ফিরেছে তর।
নিকের কপালে আরও ভাঁজ পড়ে। চারপাশে তাকিয়ে কাউকে খুঁজতে খুঁজতে বলে,
” ও কোথায়?
আরিশ বুঝতে না পেরে জিজ্ঞাসা করে,
” ও কে?
নিক দাঁতে দাঁত চেপে দিশেহারা হয়ে গর্জে উঠে,

” আমার বউ কোথায় শুয়রের বাচ্চা!
নিকের ধককে ডাক্তার ভয় পেলেও সামান্য হাসে। এমন বউ পাগল ব্যাক্তি সে আগে কখনো দেখে নি। জ্ঞান ফেরার পরে নিজের শরীরের দিকে না তাকিয়ে বউয়ের জন্য উন্মাদ হয়ে উঠেছে।
আরিশ থমথমে গলায় বলে,
” শান্ত হ তুই। বলছি আমি সব কিছু।
নিক চারপাশে তাকিয়েও এনিকে দেখতে না পেয়ে হিংস্র এক গর্জনে ফেটে পড়ে। চোয়াল এমনভাবে শক্ত হয়ে ওঠে যে দাঁত চেপে ধরা শব্দে নিস্তব্ধতা কেঁপে ওঠে। প্রায় পাঁচ মাস ধরে সে যদি এখানে অচেতন অবস্থায় পড়ে থাকে তবে এনি একা কীভাবে টিকে আছে? এই প্রশ্ন তার মস্তিষ্কে বজ্রাঘাতের মতো আছড়ে পড়ে। কোন অবস্থায় আছে সে? বেঁচে আছে তো? শত্রুদের মুখগুলো চোখের সামনে ভেসে উঠতেই নিকের যুক্তিবোধ ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়। উন্মাদ ক্রোধে সত্তা দাউদাউ করে জ্বলে ওঠে। হাতে ধরা ক্যানেলাগুলো সে আছড়ে ছুড়ে ফেলে দেয়। ছিটকে পড়া আঘাতে ক্ষত খুলে যায়। রক্ত অনিয়ন্ত্রিত স্রোতে গড়িয়ে পড়ে। আরিশ আতঙ্কে শিউরে উঠে। ডাক্তার এগিয়ে এসে বলে,

” মি, জেভরান শান্ত হন আপনি। আপনার শরীর সুস্থ হয় নি। এখন ও অনেক অসুস্থ আপনি।
” বালের শান্ত হব আমি। যাকে একটা দিনের জন্য কখনো চোখের আড়াল করি না সে পাঁচ মাস ধরে আমার চোখের আড়ালে। অহহ গড!
নিক বেড থেকে নেমে শরীরে টি শার্ট জড়িয়ে নেয়। এই উন্মাদ গ্যাংস্টার বসকে কে সামলাবে এখন? এনির বর্তমান অবস্থাও ভালো না। এনিকে এই অবস্থায় দেখলে আরও উন্মাদ হয়ে পড়বে। আরিশ কোনো উপায় না পেয়ে নিকের পিছনে যেতে যেতে বলে,
” শান্ত হ ভাই। তর বউয়ের উপরে একটা আচর ও লাগতে দেয় নি আমি। এতটা বেপোরোয়া কেনো হচ্ছিস? কায়াত তারা অনেক চেষ্টা করেছে মিনারে ডুকার জন্য। কিন্তু আমি জীবিত থাকতে এইটা কোনো দিন ও সম্ভব ছিলো না। এনি একদম ঠিক আছে। কেউ কিছু করতে পারে নি তাকে।
নিকের হাটা থেমে যায়। দুই ঠোঁট চেপে ধরে কিছুক্ষন ঘন শ্বাস নেয়। পিছনে ফিরে আরিশের দুই কাঁধে হাত রেখে কাঁপা গলায় বলে,

” ঠিক বলছিস তুই? কিছু হয় নি ওর?
আরিশ কিছুক্ষণের জন্য মলিন করে ফেলে মুখ খানা। তবে সাথে সাথে ঠোঁটে হাসি ফুটিয়ে বলে,
” সামান্য আচর ও লাগতে দেয় নি।
নিক স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে এতক্ষণে। শ্বাস মনে হচ্ছিলো বন্ধ হয়ে আসছে তার। মাথায় হাত রেখে স্টিলের চেয়ারের মধ্যে বসে পড়ে।আরিশ পাশে বসেই নিকের উদ্দেশ্যে বলে,
” ভয় পেয়ে গিয়েছিলি?
নিক আচমকা তাকায় আরিশের দিকে।।ঠিক আগের মত গম্ভীরতা টেনে বলে,
” আমার ভেতরে কোনো ভয় নেই।
আরিশ উপহাস করে বলে,
” সেটা তর অবস্থা দেখেই বুঝা যাচ্ছে। বউয়ের চিন্তায় আরেকটু হলে শ্বাস আটকে মরে যেতি। এইবার অন্তত দুর্বলতা স্বীকার কর ভাই। এই অভিনয়টা আমার সামনে করিস না অন্তত। কারন তর সব কিছু আমার জানা। পুরো দেশের সামনে তুই সিংহ হলেও এনির সামনে একদম ভেজা বেড়াল।
নিক কপাল কুচকে তাকায়। আরিশ থমথমে গলায় বলে,

‘ ভুল বললাম কিছু?. মিথ্যে তো বলি নি। এইভাবে খেয়ে ফেলের মত তাকিয়েছিস কেনো? প্রমান হিসেবে এনি এসে তকে জড়িয়ে ধরুক। একদম মোমের মত গলে যাবি। জীবনে শত্রুকে ক্ষমা করতে দেখি নি তকে। পুরো দেশ ও যদি তর পায়ে ধরে মিনতি করত যে তাকে ছেড়ে দিন। কিন্ত তর ভেতরে দয়া -মায়া নেই। সবাইকে উপেক্ষা করে নৃশ্যংস ভাবে হত্যা করে ফেলবি। কিন্তু দেশের জায়গায় এনি এসে সামান্য হেসে বলুক, আপনি উনাকে ছেড়ে দিন। দেখা যাবে তর বহু যুগের ব্যক্তিত্বকেও চেইঞ্জ করে ফেলবি। নিজের শত্রুকেও বাঁচিয়ে মহান শাষকের পরিচয় দিবি। তর জীবনের এনির পাওয়ার কত সেটা আমার জানা আছে
নিক চুপ থাকে কিছুক্ষণ। উঠে পড়ে চেয়ার থেকে। আরিশের উদ্দেশ্যে বলে,
” সত্যি বললেও এত মধ্যে মিথ্যে আছে। ওর অনেক অনুরোধকে উপেক্ষা করে তার সামনে অনেক জনকে মেরেছি। তাই অতিরিক্ত কথা বলিস না।
” তাদেরকে মেরেছিস কারন তারা এনির শত্রু ছিলো। নিজের শত্রু হলে বাঁচিয়ে দিতি।
নিক ঠোঁট কামড়ে রহস্যময়ভাবে হাসলো। আরিশ ড্রাইভিং সিটে বসতেই আরিশের উদ্দেশ্যে বলে,
” তর শরীরের এই অবস্থা কেনো আরিশ? পুরো চোখ-মুখ একদম ফ্যাকাশে হয়ে আছে। আর স্বাস্থ্যের এই কি অবস্থা?
আরিশ সিট ব্যাল্ট বেঁধে বলে,

” এই যে বললাম মেরুদন্ড ভেঙ্গে গিয়েছিলো। ভাঙ্গা মেরুদন্ড নিয়ে ঠিক থাকি কিভাবে?
নিক গভীর নিশ্বাস ফেলে বলে,
” একজন মাফিয়া হয়ে এতটা আবেগী হওয়া উচিত নয়। যুদ্ধের ময়দানে নামলে মৃত্যু অনিবার্য।।হয় শত্রু পক্ষ মরবে নয়ত আমরা। এখানে একজন মরে গেলে আবেগ দিয়ে জীবন চলে না। তাই পরের বার থেকে এই আবেগ কাজে লাগাবি না।
আরিশ গাড়ি স্ট্রাট দিয়ে বলে,
” পরের বার যাতে এই সুযোগটা না আসে। তর বুকে ছুঁড়ি চালানোর আগে যাতে আমার বুক ভেদ করে যায়।
নিক নিশ্বাস ছেড়ে বলে,
” আমার মত একজন জানোয়ারকে এইভাবে ভালোবাসা উচিত নয়। স্বার্থের জন্য কখন তর উপর ও আক্রমন করে ফেলি বলা যায় না।
আরিশ মুচকি হেসে বলে,
” যদি কখনো আমার চোখে চোখ রেখে আঘাত করতে পারিস তবে সেদিন এই আঘাতটাকে আমার যত্ন হিসেবে গ্রহন করে নিব।

বিগত পাঁচটি মাস এনির জীবনে কেবল সময়ের প্রবাহ ছিল না, ছিল এক দুঃসহ ক্ষয়িষ্ণু অধ্যায়। সময়ের প্রতিটি পল অনুপল তাকে ঠেলে দিয়েছে এক অতলান্তিক অন্ধকারের দিকে। বর্তমানে তার মানসিক ও শারীরিক অবস্থা এতটাই শোচনীয় যে, চেতনার জগতে তাকে ধরে রাখা অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে।
নিকের অনুপস্থিতে এনির অন্তরাত্মাকে তছনছ করে দিয়েছে। যে শূন্যতা তাকে গ্রাস করেছে তা কেবল শোক নয় তা এক সংহারক ব্যাধি। নিককে হারানোর এই তীব্র হাহাকার এনিকে এক উন্মত্ত উন্মাদে পরিণত করেছে। তার মস্তিষ্ক এখন আর বাস্তবতার শৃঙ্খলা মানতে নারাজ। ফলে সারাক্ষণ এক দিশেহারা হাহাকারে সে প্রলাপ বকতে থাকে। এনির এই অদম্য পাগলামিকে সংযত করতে এখন নিবীর্য ঘুমের ইঞ্জেকশনই একমাত্র ভরসা। প্রতিবার ঘুমের ইঞ্জেকশম দিয়ে ওকে ঘুম পাড়িয়ে রাখতে হয়। সজাগ হলেই পাগলামো শুরু করে দেয়। তাই সব সময় কৃত্রিম নিদ্রার আড়ালে তাকে ডুবিয়ে রাখা হয় যেন জাগ্রত অবস্থার দহন তাকে ভস্মীভূত না করে।

চিকিৎসকরা জানিয়েছেন এনি এখন খাদের কিনারে দণ্ডায়মান। চিকিৎসকদের মতে এই প্রকার তীব্র মানসিক বিপর্যয় হৃদযন্ত্রের ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করে যার ফলে যেকোনো মুহূর্তে ঘটে যেতে পারে অকাল মৃত্যু। এই শ্রেণির রোগীদের ক্ষেত্রে আকস্মিক মৃত্যুশঙ্কা বা কার্ডিয়াক অ্যারেস্টের সম্ভাবনা প্রবল থাকে। এই ধ্রুব সত্যটি নাজলীর প্রতিটি মুহূর্তকে বিষিয়ে তুলেছে। এক অব্যক্ত আতঙ্ক তাকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরেছে। তার বোনটার কিছু হবে না তো? প্রেগিনেন্সির এই কঠিন সময় এনিকে আরও পাগল বানিয়ে দিচ্ছে। এনির দেহের দিকে তাকালে এখন আর চেনা যায় না সেই প্রাণোচ্ছ্বল তরুণীকে। এই পাঁচ মাসের অনাহারে আর অনিদ্রায় তার শরীর শুষ্ক কাষ্ঠখণ্ডে পরিণত হয়েছে। ​ যে মুখে একসময় স্নিগ্ধ কোমলতার বিচ্ছুরণ ঘটত,সেখানে এখন কেবল পাণ্ডুর বিবর্ণতা। শোক যখন পাথর হয়ে যায়, তখন মানুষ আর কাঁদে না। সে কেবল তিল তিল করে নিজেকে বিলীন করে দেয়। এনি এখন সেই বিলীন হওয়ার অন্তিম পথে যাত্রী। ডাক্তার কিছুক্ষণ আগে ইঞ্জেকশন পুশ করে দিয়ে গিয়েছে। এখন এনি গভীর নিদ্রায় আচ্ছন্ন।

নাজলী ডিভানে বসে বাস্তবতার ছক কষছিলো। এমন সময় হুট করে বাহির থেকে শোরগুল শুনা যায়। তীব্র গানের আওয়াজ আর হট্টগোলের আওয়াজ হচ্ছে। মনে হচ্ছে কোনো উৎসব হচ্ছে বাহিরে। নাজলীর বুদ্ধিতে আসছে না বাহিরে এমন কি হলো যে হুট করে এত শব্দ আর উল্লাস!
নাজলী বাহিরে যাওয়ার জন্য পায়তারা করছে। কিন্তু মেইন দরজা বাহির থেকে বন্ধ করে রাখা। এই দরজা তার পক্ষে খুলা অসম্ভব! শত্রুরা চার বার আক্রমন করেছিলো মিনারের উপর। নিকের যত গার্ড ছিলো সবাই সবটা দিয় মোকাবেলা করেছে। কেউ ভেতরে ডুকা সাহস পায় নি। নাজলী ভেবে প্রথম প্রথম অনেক অবাক হত। ওর জানা মতে এই জগতের সবাই ক্ষমতালোভী আর হিংস্র, পাষাণ, বিশ্বাস ঘাতক হয়। কিন্ত তার চিন্তা চেতনা কিছুটা পরিবর্তন হয়। গ্যাংস্টার বস নিক জেভরান ধ্বংস আর খারাপের প্রতীক হলেও বিশ্বস্ত সব দেহরক্ষী পেয়েছেন।।যারা তা মৃত্যুর পরও তার সাম্রাজ্যকে রক্ষা করছে।

স্তব্ধতা চিরে দিয়ে আচমকা সদর দরজাটি সশব্দে উন্মুক্ত হলো। বাইরের উন্মাতাল উল্লাস আর কর্কশ বাদ্যযন্ত্রের শব্দে তখন কান পাতা দায়। সেই কোলাহলকে সঙ্গী করে এক ঝলক হাড়হিম করা শীতল বাতাস অন্দরে প্রবেশ করল। আর সেই হিমেল হাওয়ার রেশ ধরেই দীর্ঘ পাঁচ মাস পর এই প্রাসাদে পদার্পণ ঘটল সেই প্রতাপশালী গ্যাংস্টার বসের— নিক জেভরান।পুরো মিনার তখন তার জয়ে প্রকম্পিত, অনুসারীদের উল্লাসে মুখরিত চারপাশ। কিন্তু নিকের ইন্দ্রিয় আজ সেই জয়োল্লাসে সাড়া দেওয়ার অবস্থায় নেই। দীর্ঘ পাঁচটি মাস এই মিনার তার পদচিহ্নহীন ছিল, কিন্তু আজ ফিরে এসেও সেদিকে তার ভ্রুক্ষেপ নেই। রাজকীয় অভ্যর্থনা কিংবা চারপাশের এই আড়ম্বর কোনো কিছুই তার দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারল না।নিকের দুই চোখে তখন কেবল একজনেরই ছবি। জগতের সমস্ত নিয়ম আর নিজের গাম্ভীর্যকে তুচ্ছ করে সে ঊর্ধ্বশ্বাসে সিঁড়ির দিকে ছুটে চলল। তার প্রতিটি পদক্ষেপ বলছে, সে আর এক মুহূর্তও বিলম্ব করতে রাজি নয়। পাঁচ মাসের সেই দীর্ঘ বিচ্ছেদ আর পুঞ্জীভূত হাহাকার তাকে এক দুর্নিবার বেগে এনির কক্ষের দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে।

​কোনো হুঙ্কার নয় আজ। কোনো আদেশ ও করে নি কাউকে। আজ এই গ্যাংস্টার বসের সমস্ত সত্তা জুড়ে কেবল এনিকে ফিরে পাওয়ার এক আদিম ও ব্যাকুল আর্তনাদ।
নিকের আকস্মিক আবির্ভাবে নাজলী এখনও কিংকর্তব্যবিমূঢ়। তার সমস্ত ইন্দ্রিয় যেন এক নিমেষে অসাড় হয়ে যায় । দীর্ঘ পাঁচ মাস ধরে যে মানুষটিকে সে মৃত বলে জেনে এসেছে যাকে ঘিরে শোকের ছায়া ঘনীভূত হয়েছিল এই মিনারে সেই নিক জেভরান আজ রক্ত-মাংসের শরীরে তার সম্মুখে দণ্ডায়মান! তার মানে উনি মারা যায় নি। উনি জীবিত আছেন!
নাজলীর হৃদস্পন্দন মুহূর্তের জন্য থমকে গিয়ে পরক্ষণেই দ্বিগুণ বেগে ধাবিত হতে শুরু করে খুশিতে। এক লহমায় শোকের কালো মেঘ চিরে আনন্দের বিদ্যুৎ খেলে গেল তার সত্তায়। প্রচণ্ড উত্তেজনায় আর খুশিতে সে নিজের মুখ চেপে ধরে নিজের। শরীরের প্রতিটি শিরায় তখন আনন্দের এক অনির্বচনীয় স্রোত বয়ে যাচ্ছে। সে নিজের অজান্তেই কাঁপছে। আনন্দের আতিশয্য যে বিষাদের চেয়েও বেশি স্তব্ধ করে দিতে পারে।
স্তব্ধ নাজলীর চেতনার অতল গহ্বরে যখন নিকের অস্তিত্ব নিয়ে সংশয় কাটছে না ঠিক তখনই এক অতর্কিত আলিঙ্গন তাকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে পিছন থেকে। পেছন থেকে আসা সেই সুদৃঢ় স্পর্শে নাজলীর সমস্ত সত্তা এক নিমেষে শিরশির করে কাঁপিয়ে তুলে। এই স্পর্শ তার অনেক পরিচিত। তার উন্মুক্ত গলায় ঠোঁটের ছোয়া পেতেই খামছে ধরে নিজের কাপড়। কান্নায় বুক ভেঙ্গে আসছে তার।
​এই স্পর্শ, এই শরীরের গন্ধ তার অনেক পরিচিত। সে ভালো করেই জানে তাকে স্পর্শ করা পুরুষটি কে! দীর্ঘ পাঁচটি মাস যে অস্তিত্বটি কেবল শূন্যতায় বিলীন ছিল আজ তাকে স্পর্শের সীমানায় পেয়ে নাজলী থরথর করে কাঁপতে থাকে।

​কিন্তু পরক্ষণেই আনন্দের সেই স্রোত ছাপিয়ে এক গভীর বিষাদ আর প্রচণ্ড অভিমান তার বুক ভার করে তুলে। ​নাজলীর মনে প্রশ্নের পাহাড় জমে উঠে । পাঁচ মাস, এই দীর্ঘ সময় আরিশ কোথায় ছিল? কেন সে একবারের জন্যও কোনো সংকেত দেয়নি? নাজলীর নিভৃত চারপাশ তখন অভিমানে রুদ্ধ হয়ে আসে । সে চেয়েও ফিরে তাকাতে পারছে না। আবার এই স্পর্শ থেকে নিজেকে মুক্ত করার শক্তিও সে হারিয়ে ফেলেছে। নাজলীর নিঃশ্বাস ভারী হয়ে উঠছে। চোখের কোণে জমে থাকা জলবিন্দুগুলো গাল গড়িয়ে পড়ছে।
​কথায় আছে,
” কিছু স্পর্শ কেবল সুখ দেয় না, বরং দীর্ঘদিনের জমানো নীরব যন্ত্রণাকেও সহসা জীবন্ত করে তোলে।”
নাজলীর শরীরের কম্পন আজ সেই অব্যক্ত অভিমানেরই ভাষা। নাজকীকে এমন শক্ত মূর্তির মত দাঁড়িয়ে থস্কতে দেখে আরিশ নাজলীর গালে ঠোঁট ছুঁইয়ে বলে,
” এত মাস পর আমি এসেছি। তোমার উচিত ছিলো আমার বুকে এসে আছড়ে পড়া। স্বামীকে এত মাস দেখতে না পাওয়ার বেদনায় কেদে কুটে একদম অস্থির হয়ে যাওয়া। সেটা না করে এমন শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে আছো কেনো?
নাজলী চোখের পানি আটকে রাখতে পারছে না। একবারের জন্য পিছনে ফিরেও তাকালো না। কোনোরকম নিজেকে সামলে নিয়ে শক্ত গলায় বলে,
” যে স্বামী দীর্ঘ পাঁচ মাস স্ত্রীকে না দেখে থাকতে পারে। সে স্বামীর জন্য কেঁদে -কুটে অস্থির হওয়া বোকামি ছাড়া কিছুই নয়। আমার চোখের পানির মূল্য অনেক। আর সেটা আমি অপাত্রে দান করি না। ছাড়ুন আমাকে! ভুলেও আমার কাছে আসার চেষ্টা করবেন না।
নাজলী কথাটা বলে এক মুহূর্তে দাড়াতে চাইলো না। আরিশ তাকিয়ে থাকে নাজলীর যাওয়ার পানে। এই অভিমান আর রাগ ভাঙ্গাতে অনেক যুদ্ধ করতে হবে।একই সাথে সমস্ত বড় বড় অদৃশ্য দেয়াল ভেঙ্গে ফেলবে সে।

নিক উন্মাদের মত রুমে ডুকে। বিছানায় ঘুমন্ত এনিকে দেখে এক মুহূর্তে দেরী করলো না। বিছানায় বসে চোখে -মুখে অসংখ্য চুমু খায়। ঘুমের ইঞ্জেকশন দেওয়ার ফলে এনি সজাগ হয় নি এখনও। নিক এক সাথে প্রায় হাজারের ও বেশি চুমু খেয়ে থামে। এনির পুরো মুখ একদম ভিজে যায়। নিক ভেজা মুখটাকে মুছে দিয়ে এনির গালে হাত রাখে। চিন্তায় কপাল কুচকে ফেলে সে। এতক্ষন হয়ে গেলো এখনও চোখ মেলছে না কেনো?
নিক হন্তদন্ত হয়ে দরজার কাছে আসতেই নাজলী সামনে এসে দাঁড়ায়। নাজলীকে দেখে নিক ভ্রুঁ কুচকে ফেলে। নাজলী কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে যায়। যত শত্রুতা হোক দিনশেষে নিককে দেখে সেও অনেক খুশি হয়েছে। নাজলী সামান্য হেসে বলে,

” আপনাকে সুস্থ দেখে খুব ভালো লাগছে।
নিক গ্রিবাদেশ নাড়িয়ে বলে,
” হাসি না আসলে অন্তত জোর করে হাসবেন না।
নাজলী কপাল কুচকে তাকায়। গম্ভীর নিশ্বাস টেনে বলে,
” আপনি কথার মাধূর্যতা বজায় রাখুন গ্যাংস্টার বস। আপনার সাথে তর্ক করার জন্য আসি নি। আমি এসেছি আমার বোনের জন্য। ওকে ঘুমের মেডিসিন দেওয়া হয়েছে। তাই এত সহজে উঠবে না ঘুম থেকে। ঘুম থেকে না উঠার ফলে আপনি রেগে যেতে পারেন। রেগে গিয়ে বলা তো যায় না কখন আঘাত করে বসেন। তার শারিরীক ও মানসিক অবস্থা ভালো না। প্লিজ একটু সরে দাড়ান। আমি ভেতরে প্রবেশ করব।
নাজলীর অন্য সব কথার গুরুত্ব হারিয়ে গেলো। যখন বলা হলো এনির শারিরীক ও মানসিক অবস্থা ভালো না। নিক প্রশ্ন করার প্রয়োজন মনে করে নি। ছুটে যায় এনির কাছে। নাজলী হালকা হেসে রুমের ভেতরে প্রবেশ করে। এনির মাথায় হাত দিয়ে প্রতিবারের মত ডেকে তুলার চেষ্টা করে।।ঘুম থেকে তুলার জন্য যা যা প্রয়োজন সব করে সে। অনেক্ষন পর এনি পিটপিট করে চোখ খুলে তাকায়। চোখের সামনে নাজলীর মুখ দেখে অস্ফূর্ত ভাষায় বলে,

” আপা! উনি এসেছেন?
নাজলী তাকায় নিকের দিকে। এই বাক্যটা তাকে প্রতিবার শুনতে হয়। প্রতিবার ঘুম থেকে উঠা মাত্রই এনির কমন প্রশ্ন ” উনি এসেছে?” যদি শুনত না এখনও আসে নি। এরপর শুরু হয়ে যেত পাগলামি। নাজলী এনির কপালে চুমু খেয়ে বলে,
” এসেছে।
এনি দুর্বলতা নিয়ে সামান্য হাসে। চোখ বন্ধ করে ফেলে,
” মিথ্যে বলছো আমাকে আপা? উনি আসে নি।
নাজলী কোনো উত্তর করলো না। নিকের দিকে এক পলক তাকিয়ে চুপ করে বের হয়ে যায়। এনি চোখ খুলে নাজলীকে দেখতে না পেয়ে ঘাড় ফিরাতেই অনুভব করলো কেউ একজন তার দিকে ঝুঁকে আছে। এনি নিকের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলো। কিন্ত পরক্ষণেই ঠোঁট ভেঙ্গে কেঁদে উঠে। প্রতিবার এই নিককে দেখতে পায়। কিন্তু ছুঁতে গেলেই কেউ নেই।এনি কাঁদতে কাঁদতে বলব,
” আবার ও এসেছেন আমার ভ্রম হয়ে? কষ্ট দিতে খুব ভালো লাগে আপনার? নিশ্চই অনন্দ অনুভব করেন দুর থেকে।।অবশ্য পূর্ব থেকেই তো কষ্ট দিয়ে আসছেন। এত কিসের রাগ আমার প্রতি আপনার? কেনো এত যন্ত্রনা দিচ্ছেন? ভুলেও আজ স্পর্শ করব না আপনাকে। কারন স্পর্শ করলেই আপনি হারিয়ে যান। নিষ্ঠুরের মত দুরে চলে যান আপনি। তখন আর কিছু দেখতে পায় না। আপনাকে দেখতে পায় না। অন্ধকার লাগে সব কিছু। পুরো পৃথিবী জাহান্নাম মনে হয়। আ….
এনি আর কিছু বলতে পারলো না। একটা শক্ত হাত তার কোমর চেপে ধরে নিজের শরীরের সাথে মিশিয়ে নেয়। এনি অনুভব করলো তার মাথাটা রাখা হয়েছে একটা চওড়া বুকে। এনির কান্না বন্ধ হয়ে যায়। কেমন স্তব্দ হয়ে পাথরের মত হয়ে আছে। অনুভব করছে নিকের হৃৎপিন্ড লাফানোর শব্দ। নিক এনির মাথায় চুমু খেয়ে বলে,

” জীবন আমার, কলিজা আমার! নিজের কি অবস্থা করেছিস জান? এইবার আমি আদর করব কোথায়?
এনি আরেকটু নড়ে-চড়ে উঠে। এখনও তার বিশ্বাস হচ্ছে না। ভ্রম ভেবে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে নিকের দিকে। নিক এনির চোখের পানি মুছে দিয়ে মুখের চুলগুলো পিছনে নিয়ে ঠিক করে দেয়। চোখের পানি মুছে চোখের পাতায় চুমু খায়। এনি আবেশে চোখ বন্ধ করে ফেলে। নিক পর পর ঠোঁটে গভীর চুমু খেয়ে এনিকে নিজের সাথে আরও মিশিয়ে নেয়।
নিক অত্যন্ত নিবিড়ভাবে এনির দুর্বল ও শীর্ণ মাথাটি নিজের প্রশস্ত বুকের ওপর চেপে ধরল। দীর্ঘ পাঁচ মাসের বিচ্ছেদ, হাহাকার আর মৃত্যুতুল্য যন্ত্রণার পর এই স্পর্শ যেন এক অলৌকিক উপাখ্যান। কিন্তু এনির জীর্ণ শরীরে আজ আর সেই প্রাণের স্পন্দন নেই যা এই মিলনকে উদযাপন করবে। নিকের বুকের ধকপকানি এনি অনুভব করতে পারছে। কিন্তু তার নিজের চেতনা যেন কোনো গভীর সুপ্তির অতলে তলিয়ে গেছে। চিকিৎসকের সেই আশঙ্কাই যেন সত্য হতে চলেছে। এনি এতটাই সংজ্ঞাহীন যে তার কাছে বাস্তবতা আর স্বপ্নের সীমানা মুছে গিয়েছে। সে কেবল চেয়ে রইল নির্বাক, নিথর ও বিমূঢ় হয়ে।
​”যখন শোকের মাত্রা সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে যায়, তখন পরম প্রাপ্তিও মানুষের কাছে কেবল একটি মিথ্যে মরিচীকা মনে হয়। এনির সেই নিশ্চল দৃষ্টি আজ সেই চরম মানসিক অবসাদেরই প্রতিচ্ছবি।
এনি নিকের দিকে তাকিয়ে বলে,
” এইটা সত্যি আপনি এসেছেন? নাকি আমাকে মিথ্যে শান্তনা দেওয়ার জন্য আবার ও আমার ভ্রম হয়ে এসেছেন। আপনাকে স্পর্শ করতে ভয় হচ্ছে। যদি প্রতিবারের মত হারিয়ে যান। একটু স্পর্শ করি আপনাকে? মিনতি করছি প্লিজ হারিয়ে যাবেন না!
এনি কথাটা বলে নিকের গালে হাত রাখে। সামান্য উচু হয়ে নিকের কপালে চুমু খায়। পর পর গালে, ঠোঁটে চুমু খেয়ে নিশ্বাস ছাড়ে।
নিক গভীর দৃষ্টি রাখে এনির নীলচে নেত্রে,

” তকে ছাড়া আমি অসহায় জান । এই নিষ্ঠুর পৃথিবীতে তকে একা রেখে কিভাবে যায়? বলেছিলাম না প্রয়োজনে তকে মারব পরে নিজে মরে যাব। এরপরও তকে পৃথিবীতে একা রেখে যাব না। নিক জেভরান প্রচুর খারাপ!
এনি তার কাঁপাকাঁপা দুই হাত বাড়িয়ে নিকের গাল দুটো স্পর্শ করে। দীর্ঘ পাঁচ মাস পর এই চেনা অবয়ব, এই উষ্ণতা সবই যেন তার কাছে এক নিদারুণ বিস্ময়। পরক্ষণেই সকল সংশয় ঝেড়ে ফেলে সে নিকের সুঠাম বুকের ওপর আছড়ে পড়ে। তার এই ঝাঁপিয়ে পড়ার মাঝে ছিল এক আদিম আকুলতা। যেন এই বুকে আশ্রয় না পেলে তার অস্তিত্বই ধূলিসাৎ হয়ে যাবে।
​প্রথমে যা ছিল কেবল নিঃশব্দ অশ্রুপাত।সময়ের ব্যবধানে তা এক বাঁধভাঙা আর্তনাদে রূপ নিল। পাঁচ মাসের সেই দুঃসহ নিঃসঙ্গতা, প্রতি রাতের দুঃস্বপ্ন আর তিলে তিলে নিজেকে শেষ করে দেওয়ার যন্ত্রণা আজ এক মরণপণ চিৎকারে ফেটে পড়ে। সেই গুমরে মরা কান্নার স্বর আজ এই বিশাল মিনারের প্রতিটি দেওয়ালে প্রতিধ্বনিত হতে থাকে। এটি কেবল শোকের বহিঃপ্রকাশ নয় এটি ছিল মৃতপ্রায় এক আত্মার পুনরায় বেঁচে ওঠার তীব্র সংগ্রাম।
​এনি তার সর্বশক্তি দিয়ে নিকের শার্টটি খামচে ধরে। তার শীর্ণ আঙুলগুলো কাপড়ের ওপর এমনভাবে গেঁথে বসে যেন সে নিককে আর কখনোই এই দৃশ্যপটের আড়ালে যেতে দেবে না। এই খামচে ধরা ছিল তার হারানো অধিকার ফিরে পাওয়ার এক অব্যক্ত জেদ। এই কান্নাটা ছিলো নিককে ঘিরে। তাই এই কান্না দেখে নিকের ঠোঁটে হাসি ফুটে উঠে।
এনি কান্নার জন্য কথা বলতে পারছে না। এই কান্না সবটা ছিলো নিককে ঘিরে। নিক অনুভব করে বিশ্বজয়ের হাসি দেয়।

” সবাই বলছিলো আপনার শরীর পুড়ে গিয়েছে। মারা গিয়েছেন আপনি। প্রতি রাতে আপনাকে চেয়েছি। দিশেহারার মত খুঁজেছি আপনাকে। প্রতি সেকেন্ড অনুভব করেছি আমার আত্নাটাকে কেউ ছিনিয়ে নিয়েছে। এই পাঁচ মাসে আমি জীবনের সেই কষ্ট অনুভব করেছি যা আমি কখনো পায় নি। এই যন্ত্রনা আমাকে মেরে ফেলছিলো ধীরে ধীরে। শুধু আপনার আমানত বাঁচিয়ে রাখার জন্য মস্তিষ্কের সাথে সংগ্রাম করে গিয়েছি। কেনো আসেন নি এত দিন? একবার ও কেনো আসেন নি?
এনির এই রুপ নিকের কাছে সম্পর্ণ নতুন। জয়ের হাসি ফুটে উঠে গ্যাংস্টার বসের ওষ্টদ্বয়ে। এনির চোখের পানি মুছে দিয়ে বলে,
” যাকে এতটা ঘৃনা করো তার জন্য এতটা উন্মাদ কেনো হলো?
” ঘৃনা করলেই কি সব সময় ঘৃনা করা যায় নিক? আপনি লাস্ট কয়দিনে কখনো আমার চোখের ভাষা বুঝার চেষ্টা করেছেন? যদি অনুভব করতে পারতেন আমি আপনাকে কতটা ভালোবাসি তবে এই পাঁচটা মাস দুরে সরে গিয়ে এমন মরন সমতুল্য যন্ত্রনা দিতেন না। প্রতিদিন আমি মরেছি আবার জন্ম নিয়েছি।মনে হচ্ছিলো মৃত্যুর সেই কঠিন কষ্ট অনুভব করছিলাম প্রতিদিন। যন্ত্রনা অনুভব করতে পারেন আপনি?
নিক এনির দিকে তাকিয়ে ঠোঁট কামড়ে ধরে নিজের। এনির মুখে প্রথমবারের মত নিজের নাম শুনে নিষ্পলকভাবে তাকায়।
” আমার মত এমন পাপীকে ভালোবাসতে বিবেকে বাঁধে নি?
এনি চোখে চোখ রেখে বলে,
” বিবেক যখন বাঁধা দিতে এসেছিলো তখন বিবেককে রাস্তা থেকে সরিয়ে দিয়েছে। তাই বাঁধা দেওয়ার মত কেউ ছিলো না।

” আমাকে ভালোবাসলে পস্তাতে হবে প্রচুর।আমার জীবন কিন্তু প্রচুর জটিল।
” জটিলতা না থাকলে ভালোবাসায় আনন্দ লাভ করা যায় না।
” প্রচুর রাগ আর হিংস্র আমি। রেগে গেলে নিজের মধ্যে থাকি না।
” নিজের মত করে সামলে নিব।
” যখন- তখন কাছে টানব। আদর করব, চুমু খাব। রাতে সবটা দিয়ে কাছে চাইব।
এনি লজ্জায় মাথা নিচু করে ফেলে। মিনমিন করে বলে,
” চলে যাব।
” কোথায় যাবে?
এনি লজ্জায় নিকের বুকে মাথা রাখে। এরপর চোখে চোখ রেখে বলে,
” আপনার কাছে।
নিক তাকিয়ে থাকে এনির দিকে। এনির কাঁপা শরীরটা নিজেত সাথে মিশাতে চাইলো। কিন্তু এনির বাড়ন্ত পেটের জন্য নিকের সমস্যা হচ্ছে প্রচুর। এনিকে একদম বুকের সাথে মিশিয়ে নিতে পারছে না। নিক এতক্ষণ খেয়াল করে নি বিষয়টা। মস্তিষ্ক সজাগ হতেই অধৈর্য হয়ে পেটের দিকে চোখ যায় তার।

লাভ বাই দ্যা ভিলেন পর্ব ৬২

” পেট এমন ফুলেছে কিভাবে? এসিডিটির সমস্যা! কষ্ট হচ্ছে নিশ্চই খুব। দশ মিনিট অপেক্ষা করো ডাক্তার চলে আসবে। একবার রুম থেকে বের হয় সব কয়টাকে মেরে নদীতে ভাসিয়ে দিয়ে আসব। আমি না হয় ছিলাম না। তাই বলে তোমার একটু খেয়াল রাখতে পারলো না? বেইমান!

লাভ বাই দ্যা ভিলেন পর্ব ৬৩ (২)