Home সে খলনায়ক সে খলনায়ক পর্ব ১৫

সে খলনায়ক পর্ব ১৫

সে খলনায়ক পর্ব ১৫
ফারহানা সানিয়াত

কিছুক্ষণ আগে মাগরিবের আজান শেষ হয়ে ধরণীতে নেমে এসেছে অন্ধকার। এ সময় আশ্রমে পরিবেশ একদম নিশ্চুপ থাকে কারণ ছেলেমেয়েরা তাদের ঘরে নিজেদের পড়তে বসায় মনোযোগ দেয়,, প্রাণপ্রিয়াও এই সময় পড়তে বসে তবে আজ পুরো আশ্রম সে উঠিয়ে নিয়েছে তার ফোন খুঁজে পায় না কোথায় রেখেছে কি করেছে কিছু মনে নেই,, মিসেস সেলিনা আশ্রমের ছেলেমেয়ের সাথে ইভানও তার সাথে খুঁজছে, কিন্তু নেই মানে তো নেই প্রাণপ্রিয়া ঠোঁট উল্টে দুই হাত দিয়ে মাথা চেপে ধরে সোফায় বসে পড়ে তার কান্না পাচ্ছে,,, ফোনটা সে কষ্ট করে অল্প অল্প টাকা জমিয়ে কিনেছিল এভাবে হারিয়ে ফেলবে ভাবি নি।
প্রাণপ্রিয়াকে কষ্ট পেতে দেখে ইভান তার পাশে বসে মাথায় হাত দিয়ে বলে,, আরে তুই মন খারাপ করছিস কেনো ঠান্ডা মাথায় ভাব কোথায় রেখেছিস আর কোথায় কোথায় গিয়েছিস।
মিসেস সেলিনা হতাশার শ্বাস ফেলে আশ্রমে ছেলেমেয়েদের খোজা থামাতে বলে নিজেদের ঘরে যেতে আদেশ করেন, তার আদেশ পেয়ে ছেলেমেয়েরাও সিঁড়ি দিয়ে উপরে চলে যায়।

__ প্রিয়া মাথা গরম করে খোঁজাখুঁজি করলে কিছুই পাওয়া যায় না ইভান যা বলেছে শুনো আমি রহমান ভাইজানের ওষুধ দিয়ে আসি বলেই তিনি চলে যান।
প্রাণপ্রিয়া নিচের দিকে তাকিয়ে ঠোঁট কামড়ে ধরে সে ভাবে আবরার মেনশন থেকে আসার পর সে সোজা নিজের ঘরে গিয়েছিল তারপর বিছানায় শুয়ে কিছুক্ষণের জন্য ঘুমিয়েছে এরপর! এরপর! তো সে ফোন হাতেই নেয় নি আর এখন খুঁজে পাচ্ছে না। প্রাণপ্রিয়া অস্থির হয়ে সোজা হয়ে বসে, পাশ থেকে ইভানের হাত এখনো তার মাথায়,,
__ কি মনে পড়েছে?
প্রাণপ্রিয়া কান্নার মাখা মুখ নিয়ে না সূচক মাথা নাড়ায়, ইভান হতাশা শ্বাস ফেলে সে কিছুক্ষণ আগে এসেছিল প্রাণ-প্রিয়ার সাথে দেখা করতে কিন্তু এসে দেখে এই মেয়ে মোবাইল খুঁজতে খুঁজতে প্রায় পাগল।
অস্থিরতা নিয়ে প্রাণপ্রিয়া বসা থেকে উঠে পায়ে চালি করা শুরু করে তার সকাল থেকে ভাবা উচিত, হ্যাঁ সকাল থেকে ভাবা উচিত ,প্রথম সে ঘুম থেকে উঠে আশ্রম পরিষ্কার করাতে লেগেছিল এরপর পুরো আশ্রম পরিষ্কারের করার পর নিজের ঘরে ছিল তারপর সুফিয়া আন্টি আসে তার সাথে কথা হয় এর মাঝে সে ফোন ধরেনি। এর-পর আবরার ম্যানসনে যাওয়ার জন্য পরিপাটি হয়ে রং, তুলি রং, ফোন ব্যাগে ঢুকিয়ে সুফিয়া আন্টির সাথে ওই বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হয় সেখানে গিয়ে আর্ট করার জন্য ব্যাগ থেকে ,,,,
থেমে যায় প্রাণপ্রিয়া এরপর তার চোখেই ভেসে ওঠে নিজের হাতে সে টেবিলের উপর রং রং তুলি ফোন রেখেছিল, এর মানে!!!!!

আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে দানিয়ান শার্টের বোতাম লাগাচ্ছে,, পিছে আহানাফ খাঁচায় থাকা পাখিটিকে বিরক্ত করতে ব্যস্ত, ছোট্ট পাখিটা তার ভয় ডানা ঝাঁপটে খাঁচার এদিক থেকে ওদিক যাচ্ছে,, আহনাফ হেসে ওঠে,,
এই ভীত পাখিকে খাঁচায় বন্দী করে রাখে কেনো, ছোঁয়ার চেষ্টা করলেই ছটফট করে উঠে।
সামনে থাকা দামিয়ান শার্টের হাতার বোতাম লাগাতে লাগাতে আহনাফের দিকে ঘুরে দাঁড়ায়,
__ ভীত, ছটফট করে বলেই তাকে বন্দি করে রাখে,নাহলে যা নিজে থেকে থাকে তা বন্দী করে মজা নেই।
আহনাফ পকেটে হাত গুজে,, হুম কিন্তু প্রকৃতির সৌন্দর্য বন্দী খাঁচায় মানায় না।
দামিয়ান ঠোঁট বাকিয়ে হাসে, প্রকৃতির সৌন্দর্য!!
আহানাফ নিজের কথায় নিজেই থতমত খেয়ে যায় সে নিজে একজন পাখি শিকারি হয়ে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য বলছে এই কথা কি তার মুখে মানায়!!
দামিয়ান মুখে উপহাসের হাসি নিয়ে পাখির খাচার সামনে এসে হাত বাড়িয়ে নিজে ও পাখিটিকে ভয় দেখানো শুরু করে পাখিটি আবার ছটফট করে ওঠে,,
সুন্দর জিনিসের উপর যখন মানুষের আকর্ষণ তীব্র থেকে তীব্র হয়ে ওঠে তখন জিনিসটার ইচ্ছার বিরুদ্ধে হলেও নিজের কাছে রাখার জন্য বন্দি করে রাখে।
আহনাফ ভাইয়ের কথায় পাখিটির দিকে তাকায়,

__ সেই আকর্ষণ কি স্থায়ী হয়?
দামিয়ান হাত সারায় তার দৃষ্টিও পাখিটি দিকে তবে তার চোখে এই পাখি ছটফট ওই আশ্রিতার কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে ,, আমার মতে কোনো আকর্ষণ ই স্থায়ী নয় বলেই সে চোখ সরিয়ে গাড়ির চাবি নিয়ে ঘর থেকে বের হয়ে যায়,,

রাস্তায় সোডিয়াম লাইটের আলোতে আশেপাশের সবকিছুই স্পষ্ট সুন্দর এক মনমুগ্ধকর পরিবেশ। কিন্তু এই পরিবেশ উপভোগ করার মত মন মানসিকতা আপাতত প্রাণপ্রিয় মধ্যে নেই, সে অস্থিরতা আর তার কষ্টের কেনা মোবাইল হারানোর বেদনা নিয়ে দ্রুত পায়ে হাঁটছে উদ্দেশ্য আবরার ম্যানসনের গেস্ট হাউস তবে একা যাচ্ছে না ইভান কে সাথে নিয়ে নিয়েছে,,
__ এমন অস্থির হয়ে হাঁটলে চলবে আস্তে হাট নাহলে পরবি, প্রাণপ্রিয়ার দূরত্ব হাঁটা দেখে ইভান সাবধান করার জন্য বলে কিন্তু সাথে সাথে তখনই প্রাণপ্রিয়া উষ্টা খেয়ে পড়তে নেয় ইভান ধরে ফেলে,
__ দেখেছিস বলতে না বলতেই উষ্টা খেলি!!
কালো রঙের গাড়ির বসে আছে দামিয়ান। পাশে আহানাফ ড্রাইভিং সিটে ,দুই ভাই মিলে নিজেদের মতো বাহিরে সময় কাটাতে যাচ্ছে। তবে মেইন গেট দিয়ে বের হয়ে কিছু দূর আসতে দামিয়ানের দৃষ্টি বাহিরে ওই ডক্টরের ছেলে আর আশ্রিতা কে দেখে যে পর্যন্ত তাদের দেখা যায় এরপর দুজনকে ক্রস ‌করতেই দামিয়ানের ঠোঁটে সূক্ষ্ম বাঁকা হাসি ফুটে ওঠে আর নিঃশব্দে কয়েকবার উচ্চারণ করে, প্রানপ্রিয়া,,

অন্ধকার গেস্ট হাউজের সামনে দাঁড়িয়ে দাঁত দিয়ে নখ কাটছে প্রাণপ্রিয়া, পাসে ইভান আসেপাশে কাউকে দেখা যায় নাকি দেখছে কারন গেস্ট হাউসে ঢুকতে হলে তো এই বাড়ির কাউকে না কাউকে নিয়েই ঢুকতে হবে না হলে এমনিই তো ঢুকা যাবে না।
খানিকক্ষণ পর,
সামনে থেকে ইভানের চোখে পড়ে একজন কম বয়সের ছেলে সার্ভেন্ট এই দিকে ই আসছে,,
__ আপনারা এখানে দাঁড়িয়ে আছেন কেনো? কিছুটা রুক্ষ ও কপাল কুচকে জিজ্ঞেস করে ,
প্রাণপ্রিয় মুখ থেকে হাত সরিয়ে কয়েক কদম এগিয়ে বলে ওঠে,, আসলে সকালে আমি এই গেস্ট হাউসে এসে আমার ফোনটা রেখে গেয়েছিলাম এখন নিতে এসেছি আপনি যদি একটু হেল্প ,, বাকি কথা বলার আগে সার্ভেন্ট নাকচ স্বরে বলে,,না না এখন সম্ভব না কাল সকালে আসবেন।
প্রাণপ্রিয়া কপালে কয়েকটা বাজে ফেলে সে অস্থির গলায় বলে,, কি বলছেন আপনি এখন সমস্যা কিসের?

__ এখন সমস্যা দামিয়ান স্যার বাসায় নেই আর সে না থাকলে গেস্ট হাউসে ঢুকার নিষেধ, তাই যান সকালে আসবেন বলেই বিরক্ত মুখ করে সার্ভেন্ট ঘুরে চলে যায়।
প্রাণপ্রিয়া ঠোঁটে কামড়ে পিছে ঘুরে ইভানের দিকে তাকায়, ইভান মাথা নাড়িয়ে হতাশার শ্বাস ফেলে,,
আমাদের হয়তো বড় সাহেবের কাছে যাওয়া উচিত তাকে বললে অবশ্যই আমার ফোনটা নিয়ে দিবে,
__ তুই পাগল হয়ে গেয়েছিস, ইভান অবাক হয়ে বলে উঠে,, সামান্য ফোনের জন্য হুমায়ূন আঙ্কেলের কাছে যাবি।
__ ফোন আমার জন্য সামান্য না ইভান, আমি অনেক কষ্ট করে টিফিনের টাকা অনেক ইচ্ছে পূরণ সেক্রিফাইস করে এরপর এই ফোন কিনেছি। আমার কাছে আমার জীবনের ছোট থেকে ছোট জিনিস খুব কষ্ট করে পাওয়া যা হারানো আমার কাছে অনেক কিছু।
ইভান‌ মাথা নাড়িয়ে পিছন থেকে প্রাণপ্রিয়ার দু কাধে হাত রাখে, আমি জানি সব কিন্তু এটা সবাই বুঝবে না তাই এখন চল মন খারাপ করিস না কাল সকালেই চলে আসিস আর ফোন তো এখানে ই আছে তাই না এখন চল ,,‍,
ইভান প্রানপ্রিয়া কে নানান ভাবে বুঝিয়ে সুঝিয়ে আবার তাকে আশ্রমের দিকে নিয়ে চলে,

পরদিন দুপুর, কলেজ ড্রেস পড়া প্রাণপ্রিয়া দৌড়ে দৌড়ে আবরার ম্যানশনে ঢুকছে তাকে দেখলে বোঝা যাবে সে যে কলেজ থেকে সোজা ‌এখানে এসেছে ,
পরনে সাদা রংয়ের থ্রি পিস কাঁধে ব্যাগ চুলগুলো দু বেনি করা চোখে মুখে অস্থিরতা অস্বস্তি।
সকালে ঘুম থেকে উঠে কলেজে যাওয়ার জন্য আসতে পারেনি তবে মনকে কোনোভাবেই মানাতে পারছিল না। ‌তাই কলেজ থেকে আসার পথে ই ছুটে আবরার ম্যানসনের গেস্ট হাউসে দিকে।
এরপর গেস্ট হাউজের সামনে এসে কোমরে হাত দিয়ে থেমে যায়। সে হাঁপাচ্ছে মনে মনে এখানে আশা নিয়ে ভীত কিন্তু তার ফোন নেওয়া জরুরী,, সে ঢোক গিলে সাহস যোগায় ঠোঁট গোল আকৃতির করে শ্বাস ছাড়ে এরপর গুটি গুটি পায় সামনের বিশাল গেস্ট হাউসের ভেতরে ঢুকে।
সোফার উপর বসে আছে দামিয়ান দৃষ্টি টেবিলের ল্যাপটপে,,সামনে নিকলাই দাঁড়ানো দুজনের মাঝে রাশিয়ান ভাষায় হালকা-পাতলা কথাও চলছে তবে দরজায় নক পড়তেই দুজন থেমে দরজার দিকে তাকায়,,
গুটি শুটি হয়ে প্রাণপ্রিয়া দরজার বাহির থেকে কয়েক কদম ভিতরে আসে মাথা তার নত করা,,

__ দু দুঃখিত আপনাদের ডিস্টার্ব করার জন্য,
দামিয়ানের চোখ সরু হয়, এখানে কি? (গম্ভীর কণ্ঠ তার)
প্রাণপ্রিয়া জিভ দিয়ে ঠোট ভেজায় কথা মুখ দিয়ে বের হচ্ছে না তবুও মিন মিন কণ্ঠে বলে,, আআসলে
আমার ফোন,,,,,,
দামিয়ানের ফোন বেজে ওঠে, থেমে যায় প্রাণপ্রিয়া, চোখ তুলে দামিয়ানের দিকে তাকায়,
দামিয়ান তার ফোন হাতে নিয়ে রিসিভ করে কথা বলা শুরু করে, ঠোঁট কামড়ে ধরে প্রাণপ্রিয়া সে পাশে দাঁড়ানো বিদেশি নিকলাইকে এক নজর দেখে যে দৃষ্টি নত করে রোবটের ন্যায় দাঁড়িয়ে আছে। এটা দেখে সুযোগে আশেপাশে চোখ বুলিয়ে নেয় কিন্তু কোথায়!!
দামিয়ান কথা শেষ করে নিকলাই কে উদ্দেশ্য করে বলে, মম আজ রাতে আসছে আমরা তাকে রিসিভ করতে যাব।
নিকলাই হালকা মাথা নাড়ায় ,জি স্যার,
দামিয়ান এবার প্রাণপ্রিয়ার দিকে দৃষ্টি ফেলে,,

__ বলো তুমি, (গম্ভীর কন্ঠ)
প্রাণপ্রিয়া আশেপাশে চোখ বুলানোর মাঝে গম্ভীর কণ্ঠ শুনে দৃষ্টি দামিয়ানের দিকে করে, তবে তাকে তার দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে সে দ্রুত দৃষ্টি নত করে ফেলে,,
দামিয়ান ঘাড় কাত করে প্রাণপ্রিয়ার পা থেকে মাথা অব্দি দেখে ,,
প্রাণপ্রিয়ার কাঁপা কাঁপা মিনমিন কণ্ঠে বলে,,আআসলে আমার ফোন,
__ আমার কাছে,
তড়িৎ গতিতে চোখ তুলে প্রাণপ্রিয়া দামিয়ানকে দেখে,
__ এটা বলতে চাও?
আবার এই কথা শুনে দ্রুত প্রাণপ্রিয়া না সূচক মাথা নাড়ায়, না না আমি এটা বলতে চাইনি,

সে খলনায়ক পর্ব ১৪

__ তাহলে গেট আউট বলেই দামিয়ান সামনে টেবিলের উপর থেকে সিগারেটের প্যাকেট আর গ্যাস লাইট নিয়ে বসা থেকে উঠে ঘরের জানালার দিকে চলে যায়।
প্রাণপ্রিয়া চোখ মুখ কুঁচকে মুখ অন্ধকার করে ফেলে। তার মুখের উপর কথা বলার সাহস নেই এমনি অনেক সাহস যুগিয়ে এখানে এসেছে তাই আর কিছু না বলে ঘুরে চলে যায়, কিন্তু তার ফোন!!
দামিয়ান প্রাণপ্রিয়া চলে যেতেই সিগারেট জ্বালিয়ে মুখ থেকে ধোঁয়া বের করে পাশে ড্রেসিং টেবিলের ড্রয়ারে দিকে তাকায়,,

সে খলনায়ক পর্ব ১৬