লাভ বাই দ্যা ভিলেন পর্ব ৭৬ (২)
লিজা মনি
বিভীষিকাময় এক আইল্যান্ড । তার সম্মুখভাগেই একটি বুলেটপ্রুফ গড়ি এসে অতর্কিতে দণ্ডায়মান হয়। প্রাইভেট জেট থেকে নির্মমভাবে হেঁচড়ে নামানো হয় একটি রক্তাক্ত কৃষ্ণবর্ণের বস্তা। তৎক্ষণাৎ গাড়ির পশ্চাৎভাগ (ডিকি) থেকে বের করা হয় কিছু মারাত্মক আগ্নেয়াস্ত্র।
সম্মুখে দৃশ্যমান সেই ভয়াবহ ও পৈশা টর্চার সেল । চারদিকের পরিবেশ এক চরম থমথমে ও আতঙ্কগ্রস্ত রূপ ধারণ করেছে। ঠিক যেভাবে নির্মমভাবে টেনে আনা হয়েছিল, অবিকল সেই নিষ্ঠুর ভঙ্গিতেই বস্তুটিকে টেনে-হেঁচড়ে নিয়ে যাওয়া হতে থাকে সেই টর্চার সেলের অভ্যন্তরে।
বস্তার ভেত্র থেকে ভেসে আসছিলো হাড় শীতল করা হৃদয়বিদারক আর্তনাদ। কলিজা ফাটানো তীব্র চিৎকার ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল চারপাশ অথচ, সুতীব্র ও যন্ত্রণাকাতর এই চিৎকারটিই একজনের অন্তরে এক পরম প্রশান্তি দিচ্ছিল।
সর্বসময়ের অভ্যস্ত সেই একই পোশাকে অবয়বকে আবৃত করে রেখেছে। প্রতিবারের মত শরীরের উপরিভাগে একটি দীর্ঘ ওভারকোট। মাথায় অন্তরালকারী হুডি। মুখমণ্ডলে সযত্নে পরিহিত একটি কালো মাস্ক৷
সবকিছু ছাপিয়ে কেবল তার অবাধ্য ও ধূসর অক্ষিযুগল উন্মুক্ত ছিল। চোখ দুইটা থেকে ঠিকরে আসছিল প্রচ্ছন্ন কোনো ক্ষোভ। সেই ধূসর চোখদুটি ক্ষুদে আগ্নেয়গিরির ন্যায় ধিকধিক করে জ্বলছিল। হুট করেই তার পা থেমে যায়৷ ঘাড় কাৎ করে কালো বস্তাটার দিকে তাকায়। তাজা রক্তে ভেসে উঠেছে। মাস্কের আড়ালে রহস্যময়ভাবে হাসলেন গ্যাংস্টার বস। ক্ষীপ্ত চোখ দুইটা দিয়ে সবার দিকে তাকায়। প্রতিটা গার্ড ভয়ে বরফের মত জমে আছে। আরিশ চোখ থেকে সানগ্লাসটা নামিয়ে নিকের দিকে তাকায়। অধিরাজ শুকনো ঢোক গিলে বলে,
” স্যার, বস থেমে গেলেন কেনো? কি করবে আবার?
আরিশ তীক্ষ্ণ চোখে নিকের দিকে তাকিয়ে বলে,
” জানা নেই। এই মুহূর্তে কিছু জিজ্ঞাসা ও করতে পারব না। খুনের নেশা মাথায় চাপলে নিজেকে আঘাত করতেও দুইবার ভাবে না। সেখানে আমি কিছু বলতে গেলে সোজা গলা টিপে মারবে।
অধিরাজ সহসা নিস্তব্ধ নিশ্চল হয়ে যায়। অশুভ নীরবতা গ্রাস করে চারপাশ। নিক কোনো প্রকার দ্বিধাবোধ না করে এক ঝটকায় উন্মোচন করে বস্তার সেই শক্ত বন্ধনী। সঙ্গে সঙ্গে সেখানে উপস্থিত প্রতিটি হৃদস্পন্দন এক মুহূর্তের জন্য থমকে দাঁড়ায়; উপস্থিত প্রত্যেকে তীব্র আতঙ্কে শিউরে ওঠে।
সেই অবরুদ্ধ অন্ধকার থেকে এবার দৃশ্যমান হয় দুটি মানবসন্তানের ক্ষতবিক্ষত, রক্তাক্ত ও মাংসপিণ্ডে পরিণত হওয়া দেহ। একজনের বয়স মাত্র পনেরো ছুঁইছুঁই এক কিশোর, অন্যজন ত্রিশোর্ধ্ব এক যুবক। যুবকের মস্তকটি এমনভাবে বিদীর্ণ করা হয়েছে যে, করোটি ও মগজ চুইয়ে পড়া রক্তে তার সমগ্র মুখমণ্ডল এক অবর্ণনীয়, বিকৃত ও পৈশাচিক রূপ ধারণ করেছে। তাদের সমগ্র নগ্ন শরীরে জমাটবদ্ধ কালচে রক্ত আর চটচটে লাল স্রোতের মাখামাখি।লজ্জানিবারণের সামান্য জীর্ণ অবশিষ্টাংশটুকু ছাড়া দেহে আর কোনো আচ্ছাদন নেই।
যুবকটির নিস্তেজ ও আধো-বোজা ঠোঁটের ফাঁক গলে কেবল ভৌতিক গোঙানির শব্দ চুইয়ে পড়ছে। আর সেই অবোধ কিশোরটি? ধারালো ছুরির নিচে ছটফট করা অর্ধ-জবাই হওয়া কোনো মোরগের মতোই নিজের শেষ রক্তবিন্দুর উষ্ণতায় মেঝের বুকে অবর্ণনীয় যন্ত্রণায় মোচড়াচ্ছে।
নিক তাদের দিকে তাকিয়ে চোয়াল পিষে হুংকার ছাড়ে,
” গ্যাদার এভরিওয়ান ইন আমেরিকা। ব্রিং অ্যাজ মেনি পিপল অ্যাজ ইউ ওয়ান্ট, বাট অ্যাট লিস্ট ওয়ান পারসন মাস্ট কাম। সবার সামনে এদের যন্ত্রনাদায়ক মরণ দিব । গ্যাংস্টার বসের অস্তিত্ব কে ছুঁতে আসা ব্যক্তিদের মৃত্যু কতটা যন্ত্রনাদায়ক হয় সেটা আমেরিকার মানুষ দেখবে। প্রকাশ্যে খুন করব আমি ওদের। ব্রিং এভরিওয়ান হিয়ার।
নিকের হুংকার পাওয়ার সাথে সাথে ছুটে যায় কিছু গার্ড আইল্যান্ডের বাহিরে। আরিশ চট করে চোখ তুলে তাকায়। নিকের চোখে – মুখে সেদিনকার মত সেই উত্তাপ। যে উত্তাপে একটা মানুষের কাচা কলিজা চিবিয়ে খেতেও দ্বিধা করে নি। আরিশ ঠোঁট ভিজিয়ে বলে,
” সবার সামনে মারার কি প্রয়োজন নিক? প্রতিবারের মত টর্চার সেলে মেরে দে।
নিক ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায় আরিশের দিকে। নিকের সূচালো দৃষ্টি দেখে আরিশ দমে যায়। মাথা নিচু করে বলে,
” প্রকাশ্যে এমন নির্মম ঘটনা ঘটলে আইনি কাজে ফেঁশে যেতে হবে। জানি তারা কিছু করতে পারবে না। তবুও ইট উইল ক্রিয়েট আ হিউজ কমপ্লিকেশন!
নিক গ্রিবাদেশ নাড়িয়ে অদ্ভুতভাবে হাসলো। অধিরাজ বা আরিশ কেউ বুঝলো বা এই হাসির অর্থ!
ত্রিশ মিনিটের ভেতরে চার হাজারের মত মানুষ হাজির হয় সেই বিশাল আইল্যান্ডে। প্রতিটা ব্যাক্তির হাত থাকে মোবাইল বা ক্যামেরা ছিনিয়ে নেওয়া হয়। প্রতিটা ব্যক্তির মুখ দেখে বুঝা যাচ্ছে চোখে অশ্রু আর মুখে অসহায়ত্বের ছাপ। নিক ঠোঁট কামড়ে হেসে রক্তাক্ত দেহের উপর পানি ঢেলে দেয়। কাটা স্থানে পানির স্পর্শ পেতেই দুই মানবের চিৎকার সবার শরীরে কাঁপন ধরাচ্ছিলো। নিক ঈগল চোখে তাকিয়ে বলে,
” চেনা লাগে ওদের? একজন কায়াতের একমাত্র ছেলে। যে বাপের ক্ষমতা কাজে লাগিয়ে আপনাদের মেয়েদের মলেস্ট করেছে। আর আরেকজন কায়াতের এসিস্ট্যান্ট যে কত জনকে ধর্ষণ করে হত্যা করেছে তাদের হিসেব নেই। আর হ্যা, আপনাদের অনেকের সম্পত্তি, ঘর বাড়ি ও হাতিয়ে নিয়েছে। এদের কি করা যায় বলুন তো??
অনেকের চোখ দেখে বুঝা যাচ্ছে প্রতিহিংসার আগুন জাগ্রত হয়েছে। আবার কারোর চোখের কোণে অশ্রু। ভীর থেকে একজন গলা উচু করে বলে,
” বস কিল হিম! এই কুত্তার বাচ্চা আমার আট বছরের ছোট্ট মেয়েটাকে রে* প করেছিলো। বিচার পায় নি।
আরিশ অবাক নয়নে তাকায় সব এত মানুষের দিকে। নিক ক্রুর হেসে দুইজনের সামনে গিয়ে বসে। কন্ঠ আচমকা ভয়ানক হয়ে যায়। গর্জে উঠে গ্যাংস্টার বস,
” আমার মেয়েটাকে কিভাবে মারতে পারলি তুই? শত্রুর দেহরক্ষী হওয়া সত্তেও শুয়রের বাচ্চা দুইবার বাঁচিয়েছি এই গ্রামবাসীদের হাত থেকে। আর তুই কি- না আমার অস্তিত্বের শরীরে বিষক্রিয়া ঘটালি? আজ এই গ্রামবাসীদের সামনেই তকে খন্ড – বিখন্ড করব। কুত্তার মত ঘেউ ঘেউ করবি কেউ আসবে না।
যুবকটা ক্ষত – বিক্ষত শরীরটা নাড়াতে পারছে না। শরীরটাকে টেনে – হিঁচড়ে নিয়ে যায় নিকের পায়ের কাছে। পায়ে হাত দিয়ে হাউমাউ করে কেঁদে উঠে,
” ক্ষমা! ক্ষমা করেন দিন বস। আ.. আমার ভুল হয়ে গিয়েছে। অনেক বড় ভুল করেছি। মাতাল অবস্থায় ছিলাম। মনের অজান্তে করেছি সব কিছু। ভেবেছিলাম মেয়ের মৃত্যুর খবর শুনে আপনার স্ত্রী ওইখানে যাবে। এরপর আমিও কায়াতের সাথে মিলে সুযোগের ব্যবহার করব। আমিও প্রথম থেকে পছন্দ করতাম তাকে। লালসায় উন্মাদ হয়ে ভুল করেছি। ক্ষমা করে দিন।
যুবকটা আহাজারি করার মধ্যেই মুখে ধরে গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে উঠে। তার জিহ্বা কেটে নেওয়া হয়েছে। আবার ও তাজা রক্তে ভেসে যাচ্ছে দেহহ। জিহ্বা থেকে টগবগিয়ে রক্ত পড়ছে। সাধারন জনগন চোখ খিঁচে ফেলে। নিকের উন্মাদ আর হিংস্র আচরন পুরো দেশ জানে। কিন্তু কেউ এই সামনে থেকে দেখে নি। আজ প্রথমবারের মত এত ভয়ানক কিছুর স্বাক্ষী হয়ে ভয়ে স্তব্দ। ইতিমধ্যে এনি, নাজলী, তানভী সবাই উপস্থিত হয়। চারদিন ধরে নিক মিনারে নেই। ফোন করেছে কিন্তু সুইচ অফ দেখিয়েছে প্রতিবার। এনি রাগে – দুঃখে শুধু কেঁদেই গিয়েছে এতদিন। এতদিন পর এমন দৃশ্য আকস্মিক দেখে দুই কদম পিছিয়ে যায়। দুইজন পুরুষের চিৎকারের আওয়াজ যেন দেয়ালগুলো ফেটে যাচ্ছে। এরিক এনির কোল থেকে ভয়ে কেঁদে উঠে। এক চিৎকারে আর থামার লক্ষণ নেই। এনি ভড়কে যায় এরিকের অবস্থা দেখে। নিজ অস্তিত্বের চিকন গলা শুনে হুঁশ আসে গ্যাংস্টার বসের । ঘাড় ঘুরিয়ে পিছনে তাকায়৷ মুহূর্তে চোখ – মুখ শক্ত হয়ে উঠে৷ হাতের রক্ত রোমাল দিয়ে মুছে করিডরের দিকে যায়। এনি ছেলেকে শান্ত করার জন্য অস্থির হয়ে পড়ে৷ ছেলের কান্না দেখে ভয়ে মেয়েটা কেঁদে দেয় একদম। এরিক নিশ্বাস নিচ্ছে না। চিৎকারের সাথে কেমন যেন স্তব্দ হয়ে গিয়েছে৷ ভেতরে ডুকে নাজলীর দিকে তাকিয়ে বলে,
” এমন করছে কেনো আপা? আমার ছেলেটা নিশ্বাস নিচ্ছে না৷ কিছু করো। আপা কিছু করো!
এনির কান্নার সুর বেড়েই চলছে। নাজলী নিজেই আতঙ্কে দিশেহারা। কিছু উপায় না পেয়ে হাতের সাহায্যে পিঠে কয়েকটা থাপ্পর দেয় জোরে। ছোট্ট শরীরে এত জোরে আঘাত পড়াতে মায়ের মন আরও দিশেহারা হয়ে উঠে। আঘাত করার পাঁচ সেকেন্ডের ভেতরে এরিক নিশ্বাস টানে। যে ছেলেটা সহজে কাঁদে না সেও কেমন অস্থির হয়ে গিয়েছে৷ এনির নিশ্বাস ফিরে আসলো যেন। এরিকের পুরো মুখে চুমু খেয়ে বুকের সাথে চেপে ধরে বুকের সাথে। এনির চোখের পানিতে এরিকের গাল ভেসে যাচ্ছে। হাত বুলিয়ে বিরবির করে,
” মাকে তো ভয় পাইয়ে দিচ্ছেলে বাবা৷ মা খুব দুর্বল তোমাদের প্রতি। পুরো দুনিয়ার সাথে যুদ্ধ করতে পারলেও তোমাদের সামনে অসহায় । এইভাবে কেউ নিশ্বাস আটকে রাখে? এখন যদি মায়ের নিশ্বাস আটকে আসত তবে কাকে মাম্মাম ডাকতে শুনি!
মা- ছেলের এমন মিষ্টি মুহূর্তের ব্যাঘাত ঘটে কারোর অস্থির পদচারনে। এনি সামনে তাকাতেই নিক ধমকে উঠে,
” কমনসেন্স নেই তোমার? কত বড় গাধা হলে বাচ্চাদের নিয়ে এই জায়গায় গিয়েছো?
নিকের ধমকে এনি কোনো উত্তর করলো না৷ নিজের কাজে সে নিজেই অনুতপ্ত। নিক এসেছে শুনে ছুঁটে গিয়েছিলো। কোলে যে এরিক জাগ্রত আছে সেটা ভুলে বসেছিলো একপ্রকার। ছেলের ঠোঁট ভাঙ্গে কান্না দেখে কপাল কুচকায় গ্যাংস্টার বস। নীল মনি দুইটা পানিতে ভিজে আছে। নাক – মুখ একদম লাল টুকটুকে হয়ে আছে। ঠোঁট দুইটা ভেঁঙ্গে ফুঁপাচ্ছে। নিজের অংশের এমন বেগতিক অবস্থা দেখে অস্থির হয়ে যায়। শরীরের রক্তাক্ত কোর্টটা খুলে ছুঁড়ে ফেলে দেয় নিচে। ছোট – কোমল দেহখানা অপরিপক্ক হাতে এনির কোল থেকে নিয়ে দাঁত পিষ,
” এইভাবে ফুঁপাচ্ছে কেনো? কি হয়েছে ওর?
এনি অনিচ্ছা সত্তেও উত্তর দেয়,
” শ্বাস বন্ধ হয়ে এসেছিলো। নিশ্বাস নিচ্ছিলো না অনেক্ষণ।
” হুয়াট!
ঘর কাঁপিয়ে চেঁচিয়ে উঠে টেরোরিস্ট। কেঁপে উঠে বুকে ল্যাপ্টে থাকা অংশখানাও৷ নিকের আকস্মিক আচরনে এনি কিছুটা মিলিয়ে যায়। নিকের চোখ-মুখের দিকে তাকানোর সাহস নেই। চোখ দুইটা থেকে যেন উত্তপ্ত লাভা বের হচ্ছে। ঝড়ের পূর্ভাবাস লক্ষ্য করে নাজলী শান্ত গলায় বলে,
” শান্ত হন আপনি । এইটা একটা এক্সিডেন্ট। এনি জানত না বাহিরে কি হচ্ছে। সব ঘটনা আকস্মিক ভাবে ঘটে যায়।
নিক ছেলের চোখের পানি নিজের রুমাল দিয়ে মুছে দিয়ে অধৈর্য ভাবে শুধায়,
” তোমাকে আমি খুন করব ব্লাডরোজ! যাস্ট খুন। আমার ছেলের যদি কিছু হত তোমাকে কি করে ফেলতাম নিজেও জানি না।।
এনির অভিমানে আঘাত করলো যেন কথাটা। শক্ত গলায় বলে,
” ওহহ রিয়েলি গ্যাংস্টার বস? সব এখন আমার অপরাধ হয়ে গেলো? এমন এক জায়গায় আমাদের কেনো রেখেছেন যেখানে এমন রক্তাক্ত ঘটনা ঘটে? প্রকাশ্যে দুইটা লোককে জবাই করার জন্য জমিনে রেখে দিয়েছেন। আর সেই স্থানে বাচ্চাদের রেখে তাদের মঙ্গল কামনা করছেন? কাল যখন বড় হবে তখন নিজ চোখে দেখবে বাবার শরীরে রক্ত লেগে আছে। বাহিরে লোকদের কু*পাচ্ছে! আজ শ্বাস বন্ধ হয়ে আসলে কাল এইসব সয়ে যাবে৷ নতুন -নতুন তাই ছেলে আমার সহ্য করতে পারে নি।
নিক যথাসম্ভব নিজেকে কন্ট্রোলের রাখার চেষ্টা করছে। চোখ বন্ধ করে বড় -বড় নিশ্বাস টেনে চোয়াল শক্ত করে একটা মেইডকে ইশারা করে। মেইড কাচুমুচু করে নিকের সামনে এসে দাঁড়ায়৷ নিক এরিককে মেইডের কোলে দিয়ে শক্ত গলায় বলে,
” রুমে নিয়ে যাবে। আর ভুলেও নিচে নামবে না।
মেইড এরিককে কোলে নিয়ে উপরে চলে যায়। নিক ডিভানের সামনে থাকা কাচটাকে লাথি মেরে সরিয়ে দেয়। এনি ভয়ে শুকনো ঢোক গিলে তাকায় কাচটার দিকে। নিক যতটা উগ্রতা আর বেপোরোয়া ভাব নিয়ে এসেছিলো, কাছে এসে ঠিক ততটা শান্ত হয়ে পড়ে। এনির ঘাড়টা চেপে ধরে নিজের মুখের কাছে নিয়ে আসে। এনি এখনও চোখ – মুখ শক্ত করে খিঁচে আছে। নিকের উত্তপ্ত নিশ্বাস পড়ছে এনির উপরে। শান্ত গলায় বলে,
” তুমি আমাকে শান্তি দিবে না ব্লাডরোজ? ওরা কারা তোমার আইডিয়া আছে? ওরা নিভ্রিতা হত্যার মেইন কালপ্রিট। একজন কায়াতের ছেলে আরেকজন তার সহকারী। সেদিন ওরাই কায়াতের আড়ালে বিষ দিয়েছিলো। এখন ওদেরকে আমি আমার মিনারে এনে গরু জবাই দিয়ে খাওয়াব? এতটা ভালো মনে করো আমাকে? গ্যাংস্টার বস নিক জেভরানের ব্যাক্তিত্বে ক্ষমা, দয়া, অল্প শাস্তি এইসব কোনো শব্দ নেই। জানো না?
শেষ কথাগুলো নিক গর্জে বলে। এনি অস্থিরভাবে চোখ খুলে তাকায়। ভেতরের যন্ত্রনা আরও তাজা হয়ে উঠে। ঘন – ঘন নিশ্বাস ফেলে পাগলাটে আচরন করে বলে,
” ওদের আমি মারব। আপনি না। আমার মেয়ের খুনীকে আমি মারব। বুঝতে পেরেছেন আপনি? আমি মারব! আমি!
কথাগুলো বলতে বলতে এনির চোখ-মুখ ক্ষিপ্ত হয়ে উঠে। নিক ঠোঁট কামড়ে ধরে স্ত্রীর কাঁপতে থাকা ঠোঁটে চুমু খায়। চোখের পানি মুছে দিয়ে বলে,
” এই দুই হাত দিয়ে তুমি আমাকে আর আমার বাচ্চাদের সামলাও, আমি পুরো দুনিয়া সামলে নিব।
কিছুক্ষণ থেমে গম্ভীর আওয়াজে বলে,
” আমি আগের নিক হলে তোমার হাতেই খুন করাতাম ব্লাডরোজ। কিন্তু যে দুইটা হাত দিয়ে আমার নিষ্পাপ বাচ্চাদের সামলাও সেই হাত রক্তাক্ত হতে দিতে চাই না। একজন মারলেই হয়৷ তুমি আর আমি কি আলাদা?
নিকের শেষ কথাটা এনির বুকে তীঁরের মত বিঁধে যায়৷ নিজেকে সামলাতে না পেরে আছড়ে পড়ে স্বামীর বুকে। চারদিন খোঁজ না নেওয়াতে যে রাগ আর অভিমান করে বসেছিলো সেটা ভুলে যায়। নিক ঠোঁট কামড়ে ধরে নিজের৷ শক্ত গলায় বলে,
” চাইলে তুমি দাঁড়িয়ে দেখতে পারো।
এনি মাথা তুলে তাকায়। চোখের পানি মুছে বলে,
” আমি ওই জানোয়ারদের ছটফট দেখতে চাই। যেভাবে আমার পাখিটা ছটফট করেছে তার থেকে দশগুণ ছটফটানি দেখতে চাই আমি।
নিক ক্রূঢ় হেসে বের হয়ে যায় করিডর থেকে। এনি নাজলীর হাত ধরে নিকের পিছন -পিছন আসে। গেইডের বাহিরে কত – শত মানুষ। এনির মুখে সাদা মাস্ক! এত মানুষ দেখে নিজেই ভয়ে শিউরে উঠে। নিককে দেখতে পেয়ে গুঞ্জন করা মানুষগুলো শান্ত হয়ে পড়ে। আগের মত ভয়ে তটস্থ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে একেকজন। নাজলী বার বার তাকাচ্ছিলো আরিশের দিকে। কিন্তু আরিশ ভুলেও নাজলীর দিকে তাকায় না। এতে যেন বুকের ভেতরটা কেউ চেপে ধরে রেখেছে। অজান্তেই চোখের পানি মুছে শক্তভাবে দাঁড়ায়। এনি নাজলীর উদ্দেশ্যে ভয়ে বলে,
” আপা উনি কি করছেন? প্রকাশ্যে খুন করছেন! এতে যদি আইনের কোনো ঝামেলাতে জড়ায় তখন?
নাজলী বিরক্ত হয়ে এনির কথায়। কপাট রাগ দেখিয়ে বলে,
“নিজের জামাই কে কি ফিডার খাওয়া বাচ্চা ভাবিস? ঝামেলা থাকলে কি আর প্রকাশ্যে মানুষ কো*পাত? এখানে দাঁড়ানো সবাই গ্রামের মানুষ। এদের সবাই অত্যাচারিত ছিলো কায়াত আর কায়াতের ছেলের হাতে। দেখছিস না সবার চোখে প্রতিশোধের আগুন! পুলিশকে ইনফর্ম করার মত কেউ নেই৷ কেউ যে ভিডিও ধারন করবে সেই ইলেকট্রনিক জিনিস ও নেই।
এনি গম্ভীর নিশ্বাস ফেলে। মাটিতে লুটিয়ে থাকা দুইটা দেহের দিকে তাকিয়ে ঘৃণায় চোখ-খিঁচে ফেলে। এই কুত্তার বাচ্চাগুলো তার কোলটাকে খালি করেছে! হাত নিশপিশ শুরু করে দেয়৷ ইচ্ছে করছে রাম দা নিয়ে ইচ্ছেমত কো*পাতে।
এনি চোখ খুলে আবার ও চারপাশে তাকায়। আইল্যান্ডের সংকীর্ণ ভূখণ্ডে সমবেত শত-সহস্র মানবাত্মা তখন এক পৈশাচিক জড়তায় আড়ষ্ট। পক্ষাঘাতগ্রস্তের ন্যায় স্তব্ধ হয়ে বসে আছে আরিশ। তার অক্ষিপটে তখন কেবলই আসন্ন ধ্বংসের কৃষ্ণচ্ছায়া। সেই নিস্পন্দ নীরবতা চূর্ণ করে নিকের পদাঘাত বালুকাস্তূপকে প্রকম্পিত করে। ডানহাতে ধৃত লৌহনির্মিত রাম দা-টি হাতে নিয়ে এক পা এক পা করে দুইজনের দিকে এগিয়ে আসে। নিকের চাক্ষুষ চাতুর্যে ও হিংস্র অবয়বে ফুটে উঠেছে এক আদিম পশুর জিঘাংসা।
লুটিয়ে থাকা দুটি শীর্ণ কায় অবর্ণনীয় ছটফটানিতে ভূতলস্থ ধূলিকণাকে রক্তাক্ত করে তুলছিল। কর্তিত জিহ্বার ক্ষতস্থান থেকে নিঃসৃত গাঢ় শোণিতধারা তাদের গ্রীবাদেশ বেয়ে নেমে যাচ্ছে। তারা সর্বশক্তি দিয়ে এক অবরুদ্ধ আর্তনাদ প্রকাশের নিষ্ফল প্রয়াস করছিল কিন্তু কণ্ঠনালী ভেদ করে কেবল এক অমানুষিক, ঘড়ঘড়ানি ধ্বনি নির্গত হচ্ছিল।
নিক নিজের কটিদেশে রাখা চর্মপেটিকা থেকে একে একে বের করল তার পৈশাচিক অস্ত্রোপচারের উপাদানসমূহ। প্রথমত, একটি সূক্ষ্ম অথচ দৃঢ় অস্থি-ছেদক করাত। করাত হাতে নিয়ে পৈশাচিক হাসিতে ফেটে পড়ে৷ এই মুহূর্তে কোনো মানুষের রুপে নেই। কেমন যেন জানোয়ারের মত দেখা যাচ্ছে। যার হৃদয়ে এখন বিন্দুমাত্র দয়া নেই। নিকের হাসিতে সবাই কম্পমান হয়ে যায়। নিক গ্রিবাদেশ নাড়িয়ে অদ্ভুত গলায় বলে,
” কি করে মারলে ভেতরের আগুন নিভে যাবে আমার? একবার যদি অনুভব করতে পারতি আমার ভেতরে কি আগুন জ্বলছে তবে সেই আগুনের তাপে তরা নিজেরাই পুড়ে মরতি৷ শালা মাদার্ফাক!
করাতের দাঁতাল ফলকটি দিয়ে কায়াতের সহকারীরের পায়ে আঘাত করে বসে। করাতের আঘাতে যুবকটা আকাশের দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে উঠে। ঘর্ষণের এক তীব্র কর্কশ শব্দ বাতাসের আর্দ্রতাকে বিদীর্ণ করে দেয়। নিক অত্যন্ত শীতল মস্তিষ্কে, ধীরলয়ে করাতটি চালাতে থাকে । অস্থির অভ্যন্তরে ইস্পাতের সেই দংশন শিকারের স্নায়ুতন্ত্রীকে ছিন্নভিন্ন করে দিচ্ছিল৷ যুবকের শরীরটি যন্ত্রনায় ধনুকের ন্যায় বেঁকে উঠে। অক্ষিগোলক দুটি কোটর থেকে ঠিকরে বেরিয়ে আসার উপক্রম হলো। কোনো চিৎকার নেই গলায়। অবর্ণনীয় দৈহিক মোচড় আর পৈশাচিক যন্ত্রণার ছটফট করতে থাকে।
প্রতিটা ব্যক্তি চোখ নামিয়ে ফেলে ভয়ে। নাজলীর মাথা ঝিমঝিম করে উঠে। মাথায় হাত দিয়ে চেপে ধরে চেয়ারে বসে পড়ে। চোখ বন্ধ করে ফেলে। এনি প্রশান্তি নিয়ে দেখছে প্রতিটা দৃশ্য। কোথাও যেন কলিজাটা শান্তি পাচ্ছে।
নিক করাত দুইটা পা আলাদা করে ফেলে হাটু থেকে। এরপর পিশাচের মত হেসে কায়াতের ছেলের দিকে তাকায়। নিক অগ্রসর হলো একটি দীর্ঘ, তপ্ত লোহার শলাকা হাতে নিয়ে।
উত্তপ্ত শালাকা ছেলেটার সামনে রেখে শান্ত গলায় বলে,
” তর বাপ খারাপ ছিলো কিন্তু তর মা না। কায়াত যখন আমার মেয়েকে মেরেছে তখন তকে ছেড়ে দিয়েছিলাম তর মায়ের আকুতিতে। আমি জানোয়ার হতে পারি কিন্তু এক মুহূর্তের জন্য হলেও অনুভব করেছি সন্তান হারানোর যন্ত্রনা কেমন! তকে ছেড়ে দিয়েছি তর মায়ের কথা ভেবে, কিন্তু আমি কিভাবে জানব এই খেলার আসল কালপ্রিট তুই। এর সাথে মিলে এইসব করেছিস? তর বাপ চতুর হয়েও জিততে পারে নি আর তুই তো এখনও কলি থেকেই বের হলি না বাইঞ্চ* বাচ্চা।
ছেলেটা ক্ষত-বিক্ষত রক্তাক্ত ঠোঁট নাড়িয়ে কিছু বলছিলো। চোখে-মুখে কত -শত আকুতি। এই আকুতি যেন নিককে আরও হিংস্র করে তুলেছে ৷ অগ্নিবর্ণ সেই শলাকাটি ছেলেটার নগ্ন বক্ষস্থলে সজোরে চেপে ধরে আচমকা। চর্ম ও মাংস পেশীর দহনজনিত এক তীব্র কটূ গন্ধ চারপাশের ছড়িয়ে পড়ে৷ ছেলেটা চিৎকার দেওয়ার মত শক্তি পেলো না। উত্তপ্ত লোহার সংস্পর্শে চামড়া কুঁচকে যায়। জ্বলন্ত আগুনে গলে যেতে থাকে মাংসগুলো। অন্তহীন যন্ত্রণায় তার অবশপ্রায় হাত-পাগুলো বালির বুকে শেষবারের মতো আছাড় খেতে থাকে। হৃৎস্পন্দন তখন রুদ্ধশ্বাসের চূড়ান্তে উপনীত।
নিকের অবয়বে তখন কোনো মানবিকতার লেশমাত্র অবশিষ্ট নেই। তার চিত্তে ভর করেছে এক আদিম, পৈশাচিক আনন্দের অট্টহাসি।শত্রুর প্রতিটি ছটফটানি, প্রতিটি যন্ত্রণাক্লিষ্ট মোচড় নিকের ভেতরের জিঘাংসাকে আরও তীব্রভাবে উসকে দিচ্ছিল। রক্তের তাজা গন্ধে কেমন পিশাচের মত উল্লাস করছে।
নিক চামড়া আলাদা করার চূড়ান্ত প্রক্রিয়ায় অবতীর্ণ হয় । প্রথমে সে চর্ম-উৎপাটক ছুরিকার তীক্ষ্ণ অগ্রভাগ দিয়ে কায়াতের সহকারীর গোড়ালি থেকে শুরু করে ঊরুদেশ পর্যন্ত টেনে নিয়ে আসে। চামড়া খুলে আসার শব্দ প্রতিটা মানুষের ভেতরে আতঙ্ক তৈরি করছে। সেই আলগা হওয়া চামড়ার প্রান্তে সে একটি বিশেষ ধাতব চিমটা সজোরে আবদ্ধ করায় । নিক তার সর্বশক্তি দিয়ে সেই চিমটা ধরে ওপরের দিকে টানতে থাকে। আর অন্যহাতে ছুরির সূক্ষ্ম ফলকটি দিয়ে মাংস ও চামড়াকে যুক্ত করে রাখা শ্বেতবর্ণের সূক্ষ্ম তন্তুগুলোকে একের পর এক কেটে আলাদা করতে থাকে।
যুবকের শক্তি নেই ছটফটানোর৷ তবুও দুই – হাত পা নাড়িয়ে জবাই হওয়া পশুর মত কাতরাচ্ছে। চামড়া তুলে এনে একটা ছুড়ি দিয়ে চোখ দুইটা তুলে নিয়ে আসে। রক্ত ছিটকে এসে পড়ে নিকের চোখে-মুখে৷ নিক বৃদ্ধা আঙ্গুল দিয়ে সেই রক্ত টুকু মুছে ফেলে। কায়াতের সহকারীর শরীর নিস্তেজ হয়ে আসে। কিন্তু নিকের চোখের হিংস্রভাব কমেনি। আরও পৈশাচিক আনন্দ নেওয়া বাকি। ধারালো ছুঁরি দিয়ে পেটটা দুই ভাগ করে ফেলে। রক্তে ভেসে যাচ্ছে পুরো মাটি। মনে হচ্ছে কুরবানির পশু জবাই করা হচ্ছে। প্রতিবারের ন্যায় উন্মাদের মত হাতড়ে বের করে সেই গুপ্ত জিনিসটা। টেনে – হ্যাঁচড়ে নিয়ে আসে হৃৎপিন্ড আর কলিজাটা। প্রান – পাখি উড়াল দেয় সেকেন্ডের ভেতরে।
গ্রামের প্রতিটা মানুষ ভয়ে বসে যায়। কেউ জ্ঞান হারিয়ে ঢলে পড়ে নিজ স্থানে। কেউ বমি করে ভাসিয়ে দিচ্ছে সব। কি এক নরকীয় ঘটনা!
একজনকে হত্যা করে আরেকজনের সম্মুখে যায়৷ কায়াতের ছেলে অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছে। ঘুমন্ত ছেলের উপরেই ঝাঁপিয়ে পড়ে গ্যাংস্টার বস। ছুঁরি দিয়ে শরীর থেকে চামড়া আলাদা করতে থাকে। চামড়া আলাদা হয়ে সাদা মাংস বের হয়ে এসেছে। সেই সাদা অংশ রক্তে লাল হয়ে উঠেছে। দুইজনের রক্তে নিকের শরীর লাল হয়ে গিয়েছে৷ চামড়া টানার নিম্ন শব্দ বিভৎস্য শুনাচ্ছে অনেক।
যন্ত্রণার এমন চরম অভিঘাতে চোখ দুটি উল্টে যায় আচমকা। কেবল চোখের সাদা অংশটুকু কোটর থেকে ঠিকরে বের হতে চাচ্ছ্ব । সমস্ত শরীর তীব্র আক্ষেপে আর যন্ত্রবায় ধনুকের মতো বেঁকে বেঁকে বালির বুকে আছাড় খাচ্ছিল। চামড়া আর মাংসের বিচ্ছেদের সেই আর্দ্র, চটচটে শব্দ নিকের কর্ণে যেন এক মধুর সঙ্গীত হিসেবে প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল। সে এক পৈশাচিক তৃপ্তিতে চোখ বুজে সেই যন্ত্রণার ঘ্রাণ আস্বাদন করল। শেষ এক হ্যাঁচকা টানে সম্পূর্ণ অবয়বের চামড়া দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। পেট দুই ভাগ করার আগেই প্রান চলে যায়। তবুও ক্ষ্যাঁন্ত হন নি গ্যাংস্টার বস। একইভাবে পেটে দুই ভাগ করে হিংস্রতা নিয়ে কলিজা আর হৃৎপিন্ডটা ছিনিয়ে নিয়ে এসেছে।
নিক সব গুলো হাতে নিয়ে উন্মাদের মত হেসে উঠে। গ্রাম বাসীর উদ্দেশ্যে বলে,
” দ্য গেইম ইজ ওভার। দুই মিনিটের সবাই মিনার ত্যাগ করো ফার্স্ট! একটা খবর ও যদি বাহিরে যায় তবে তার অবস্থা ঠিক এমন হবে।
নিকের ঠান্ডা আর উত্তপ্ত হুমকিতে সমস্ত গ্রামবাসী মিনার ত্যাগ করে। খালি হয়ে পড়ে পুরো আইল্যান্ড। কিছুক্ষণ আগেও যেটা মানুষে ভরপুর ছিলো এখন সেটা শূণ্য!
এনি এগিয়ে যাচ্ছিলো সেদিকে। নাজলীর দিকে তাকিয়ে থেমে যায়। জেগে উঠা হিংস্র ভাবটা ধপ করে নিভে যায়। কপালে ঘাম দিতে থাকে। এতক্ষণ কোন দুনিয়ায় ছিলো সে?নিজের চুল শক্তভাবে খামছে ধরে। হুটহাট নিজের বাস্তবিক জগত থেকে বহু দুরে চলে যায়। নজলী চোখ বন্ধ করে হেলে পড়ে আছে। এনি কপালে হাত দিয়ে আতঙ্কিত গলায় বলে,
” আপা! কি হয়েছে? চোখ বন্ধ করে আছো কেনো? নাজলী আপা চোখ খুলো!
শেষ কথাটা চেঁচিয়ে উঠে আকস্মিক। নিক সহ সবাই তাকায় ভেতরের দিকে৷ নাজলীকে এমন নিস্তেজ পড়ে থাকতে দেখে আরিশের বুক ধক করে উঠে। অস্ত্রগুলো এক পাশে রেখে ছুঁটে যায় প্রেয়সীর দিকে৷ কোলে তুলে নিয়ে অধৈর্য গলায় বলে,
” কি হয়েছে?
” হয়ত অজ্ঞান হয়ে পড়েছে।
” তোমার বোন কি এখানে প্রথম থেকেই ছিলো।
এনি উপর -নিচ মাথা নাড়িয়ে বলে,
” ছিলো তো। কিন্তু আপার তো রক্তে ফোবিয়া নেই। রক্তে আমার মাঝে মাঝে ফোবিয়া কাজ করে। আমি জ্ঞান হারায় নি অথচ সে জ্ঞান হারিয়ে পড়লো!
আরিশের চোয়াল শক্ত হয়ে আসে। ইচ্ছে করছে এখানেই আছাড় মেরে ফেলে দিতে৷ সজাগ থাকতে দুইটা চড় লাগাত গালে। নিজের উপর রাগ হচ্ছে বেশি৷ একবার তাকালে অন্তত ধমকিয়ে ভেতরে পাঠাতে পারত। আরিশ নাজলীকে নিয়ে ভেতরে চলে যায়।
এনি এগিয়ে যায় নিকের দিকে। নিজের ওরনা দিয়ে নিকের মুখের রক্তগুলো মুছতে মুছতে লাশগুলোর দিকে তাকায়৷ নিক এনির ধনুকের মত বাঁকানো কোমড়টা আকড়ে ধরে বলে,
” হ্যাপি?
এনি মাস্কের আড়ালে মুচকি হাসে,
” অনেক হ্যাপি!
অধিরাজ থমথমে গলায় তাকায় দুইজনের দিকে। কি সুন্দর করে রক্ত মুছে দিচ্ছে। অন্য মেয়ে হলে এমন পেট, চামড়া আলাদা হওয়া, চোখ ছাড়া ভয়ানক লাশ দেখলে চিৎকার দিয়ে এখানেই জ্ঞান হারাত। আর সে এসে স্বামীর মুখের রক্ত মুছে দিচ্ছে! অধিরাজ পানি খেতে খেতে ঠোঁট বঁকায়,
” দুইটা এই সাইকো!
নাজলীর জ্ঞান ফিরে ঘন্টাখানেক পড়ে৷ পিটপিট চোখ খুলে দেখে আরিশ চিন্তিত হয়ে পাশে বসে আছে। নাজলীর অধরে হাসি ফুটে উঠে৷ কিছুক্ষণ আগের সেই ঘটনা পড়ে করে আবার ও আৎকে উঠে। নাজলীকে তাকিয়ে থাকতে দেখে আরিশের কপালে ভাঁজ পড়ে। চিন্তাশীল ভাবটা সরে গিয়ে গম্ভীর একটা ভাব চলে আসে। ভিবৎস্য দৃশ্যগুলোর কথা মনে করে প্রশ্ন করে,
” এত জঘন্য ভাবে মানুষ খুন করেন? কলিজা কাঁপে না একবার ও?
আরিশের গম্ভীর গলায় খানিকটা ধমকায়,
” যা দেখার শক্তি নেই সেটা দেখতে কেনো গিয়েছো? আমাকে অশান্তিতে রাখতে ভালো লাগে তোমার?
নাজলী কিছু বলার জন্য মুখ খুলেছিলো তার আগেই আরিশ শক্ত গলায় বলে,
” আই রিপিট আমার বাচ্চার কিছু হলে হিসেব চুকাতে হবে।
নাজলী আহত গলায় বলে,
” আপনার একার? আমার বাচ্চা নয়?
আরিশ তাচ্ছিল্য হেসে তাকায় নাজলীর দিকে। ভ্রুঁ নাচিয়ে বলে,
” এইটা তুমি ভাবো একবার ও? আমার বাচ্চা বলেই তো এত হেলাফেলা করে চলো। নয়ত কোন মেয়ে অন্তসত্বা অবস্থায় বাহিরে যায়? তার উপর সে জানে বাহিরে শত্রুরা আছে জীবন ঝুঁকিতে পড়বে। এদিক থেকে সেদিক হলে কত কি ঘটে যেত! সেটা যদি তুমি জানতে তবে আমি একটু শান্তি পেতাম।
নাজলী অপরাধীর মত দৃষ্টি নামিয়ে ফেলে। কেঁপে উঠে কন্ঠস্বর,
” আমি সম্পূর্ণ নিরাপত্তা নিয়ে গিয়েছি আরিশ। বাচ্চার বিপদ হবে এমন কিছু কল্পনাতেও আনিনি।
আরিশ ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসলো। তাজা ঘাঁ আবার জাগ্রত হয়ে যায়। সেদিন নাজলীকে না পেয়ে পাগলের মত অবস্থা হয়ে পড়েছিলো তার। নিচে নামতেই একজন মেইড জানায় রিদ্ধিমার সাথে বাহিরে গিয়েছে। ভয়ে শ্বাস বন্ধ হয়ে এসেছিলো। রিদ্ধিমার নাম্বার ট্র্যাক করে নাজলীর সন্ধান পায়। সেখানে পৌঁছে দেখে সাথে সেই ছেলেটা যাকে আরও একবার দেখেছিলো। আরিশের মস্তিষ্কে আগুন ধরানোর জন্য এই দৃশ্যগুলো যথেষ্ট। ইথান নাজলীর হাত ধরে কিছু একটা বলছে আর নাজলী হাসছিলো। আরিশের ইচ্ছে করছিলো দুটোকেই মেরে নদীতে ভাসিয়ে দিয়ে আসতে। কিন্তু তা আর পারলো কই! তার আগেই ফের চলে আসে মিনারা। রাগ মিটাতে না পেরে ঘরের জিনিস পত্র ভেঙ্গেছে। এরপর নাজলী এসেছিলো তার রুমে। কিন্তু আরিশ নিজের মধ্যেই ছিলো না। সেই দুইটা লাইন কঠিন কথা বলে রমণীর বুকে আছঁড় ফেলে ইতালি চলে যায়। এরপর দিন অবশ্য নিক ও চলে গিয়েছে। চারদিন ধরে খোঁজ ছিলো না। এনি জানত নিক ব্যবসায়ী কাজে গিয়েছে তাই এত ভাবে নি৷
আরিশ কপাল ঘেঁষে নাজলীর দিকে তাকায়। নাজলীর চোখে পানি টুইটুম্বুর। নাক টেনে বলে,
” কিছু বলো।
” নিরাপত্তা নিয়ে গিয়েছো?
” হ্যা।
আরিশ রাগটাকে আর সামলাতে পারে নি৷ ফুলদানিটাকে আছড়ে ফেলে দেয় মেঝেতে। নাজলীর কাছে এসে শক্ত করে ধরে তার হাতটা। রাগে কাঁপছে রিতীমত। দাঁত পিষে বলে,
” তুমি যদি সুস্থ থাকতে তবে সত্যি বলছি আঘাত করে বসতাম। ওই বাহিরের ছেলেটা তোমার নিরাপত্তা ছিলো? আমার থেকে বেশি নিরাপদ ওই ছেলে? আর সেটা তুমি আমাকে আবার বলছো! হাউ ডিয়ার ইউ ফা*কিং বিচ !
নাজলী চোখ – মুখ খিঁচে ফেলে। আরিশের এক – একটা ধমকে কেঁপে উঠছে। বাচ্চাদের মত কেঁদে উঠে আচমকা। ব্যাথা পেয়ে কাঁদছে ভেবে আরিশ হাতটা ছেড়ে দেয়৷ দুরে সরে আসতে চাইলে নাজলী দুই হাত দিয়ে ঝাপ্টে ধরে। ছটফটিয়ে বলে,
” জেলাস! ক্রিমিনাল লিডার আরিশ ইলহাম তবে জেলস হয়েছে?
আরিশ নাজলীকে ছাড়াতে- ছাড়াতে তেজী গলায় বলে,
” জেলাসি মাই ফুট! যার সাথে ইচ্ছে যাও। শুধু আমার বাচ্চাটাকে আমার কাছে দিয়ে যাও।
নাজলী চোখের পানি মুছে আরও শক্ত করে ধরে আরিশকে। আরিশ বিরক্তি নিয়ে ধমকায়,
” সরো! অসহ্য লাগছে। চিপকাচ্ছো কেনো আমার সাথে?
নাজলী সরলমনে উত্তর দেয়,
” আপনি ছাড়া আর কার সাথে চিপকাব? কোথায় যাব আর?
” জাহান্নামে যাও।
নাজলী হাসলো সামান্য।
” শুনোন আমার কথা। ও বাহিরের ছেলে নয়। আমার বেস্ট ফ্রেন্ড ইথান। আমার ছোট কালের কোনো বন্ধু থাকলে সেটা হচ্ছে ইথান। নাভিদের সাথে দেখা করতে গিয়েছিলাম। নাভিদকে বর্তমানে ইথান সামলাচ্ছে। রাত হয়ে গিয়েছে বলে ও পৌঁছে দেয়। সত্যি বলছি আপনাকে বলতাম সব কিছু কিন্তু ভেবেছি আপনি ব্যাস্ত। তাই রিদ্ধিমার সাথে বের হয়ে গিয়েছি। ওইখানে রাত কিভাবে এত গভীর হলো খেয়াল ছিলো না। ভয়ে আর আপনাকে জানাতে পারিনি৷ একদম শান্তভাবে জানাব এই আশায় রুমে ডুকেছি। কিন্তু আপনি শুনলেন না। ফেলে চলে গেলেন এত গুলো কথা শুনিয়ে৷ একবার তাকিয়েও দেখেন নি কথাগুলো কতটা বিধ্বস্ত করেছিলো আমাকে। এতদিন পর এসেও সেই রাগ দেখাচ্ছেন?
আরিশের রাগ কমলো কিনা বুঝা গেলো না। মুখের গম্ভীর ভাব রেখে বলে,
” রাগ দেখাচ্ছি তুমি শুক্রিয়া করো। আই রিপিট সুস্থ থাকলে তোমাকে মেরে রশি দিয়ে ঝুঁলিয়ে রাখতাম। ইথান তোমার কি হয় সেটা আই ডোন্ট কেয়ার। বাট তুমি ওর সাথে কথা বলবে না।
নাজলী অবাক হয়ে বলে,
” কিন্তু কেনো?
” আমি বলেছি তাই। প্রশ্ন করলে থাপ্পর খাবে।
নাজলী ক্ষেপে যায়,
” একদম রাগ দেখাবেন না সব কথায়। ছয় – সাত দিন ধরে সহ্য করছি এইসব। ভুল নয়ত একটু করে ফেলেছি এতে এত রেগে যাওয়ার কি আছে? আপনার বাচ্চা ও সুস্থ আছে সাথে বউ ও। ইথান কি অপরাধ করেছে? ওর সাথে এমন ব্যবহার করছেন কেনো?
আরিশ কটমট চোখে তাকিয়ে বলে,
” লাঠি চালান খেতে ইচ্ছে করছে ?
নাজলী চুপ হয়ে যায়। আরিশ শার্টের বোতাম খুলতে -খুলতে বলে,
” ইথান তোমাকে ভালোবাসে নাজলী। আমি ভেবেই তোমাকে দুরে থাকতে বলেছি৷
নাজলীর চোখ দুইটা বের হয়ে আসার উপক্রম। আকস্মিক চেঁচিয়ে উঠে,
” হুয়াট? পাগল আপনি? ইথান আমাকে ভালোবাসতে যাবে কেনো?
আরিশ খালি শরীর নিয়ে ঝুঁকে পড়ে। পুরুষনালী শরীরে এ শুকনো ঢোক গিলে। লুচ্চা মন চলে যায় হাতের দিকে। আরিশ নাজলীর থুতনিতে ধরে কন্ঠে খাদ নামিয়ে বলে,
লাভ বাই দ্যা ভিলেন পর্ব ৭৬
” মেয়েদের চোখ থাকে ঈগলের দৃষ্টি।কেউ ভিন্ন চোখে তাকালে সহজে ধরে ফেলতে পারে। আর তোমার দৃষ্টি দিয়েছে কাকের৷ সারাদিন তাকিয়ে থাকলেও ফ্রেন্ড হিসেবে চালিয়ে দিবে৷ একটা পুরুষের দৃষ্টির গভীরতা বুঝলে তুমি ইথানের সামনে যাবে না। লোহার কাপড় পড়ে যেতে চাইলে যেতে পারবে নচেৎ না। আমার স্ত্রী বাজারের পণ্য নয় যে কেউ চোখ দিয়ে গিলে খাবে আর আমি আরিশ ইলহাম সেটা সহ্য করব।
